ইসলামি আইন সমগ্র মানব জাতির কল্যাণের উৎস

ড. মাহফুজ পারভেজ, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ধর্মীয়, জাতিগত, ভাষাগত সংখ্যালঘুর মানবাধিকারের দাবিতে সোচ্চার বিশ্ব সম্প্রদায় আইনগত ও সামরিক-বেসামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেও বিশ্বব্যাপী নিপীড়িত মানবতার আহাজারি থামাতে পারছে না। বরং ইসলামে সংখ্যালঘুর অধিকার সংরক্ষণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত থাকার পরেও মুসলিমরাই হচ্ছে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত। ‘ইসলামে সংখ্যালঘুর অধিকার’ সম্পর্কে ঐতিহাসিক পর্যালোচনা: পর্ব- ৮

ইসলামে অমুসলিম ও সংখ্যালঘুদের সমানাধিকার, সম্মান, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত হওয়ার পরিপূর্ণ নিশ্চয়তা ধর্মীয় নৈতিকতা ও বিধিবদ্ধ আইন দ্বারা স্বীকৃত এবং তা পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধানের অংশ হিসাবে ইসলামি শাসন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দায়িত্বশীলতার আদর্শের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কযুক্ত। ইসলামে শাসন ব্যবস্থার মূল কথা হচ্ছে- তাওহিদের ভিত্তিতে সকল প্রশ্নের মীমাংসা করা এবং সকল নাগরিকের জন্য ন্যায়বিচার ও সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এজন্য শাসনকর্তার মধ্যে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও ভয়, জ্ঞানবত্তা, ন্যায়পরায়ণতা, জনসাধারণের অভাব-অভিযোগ ও আশা-আকাঙ্খা-প্রত্যাশা সম্পর্কে জ্ঞান থাকার প্রতিও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

বস্তুত পক্ষে, আল্লাহর ভয় সমস্ত কল্যাণের উৎস ও সমস্ত সুখের চাবিকাঠি। সফিউদ্দিন মুহম্মদ বিন আলী বিন তাবা, যিনি সাধারণে ইবনে তিকতাকা নামে পরিচিত এবং ‘শাসনকর্তাদের আচরণ ও ইসলামী শাসন বংশ’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন, তিনি বলেছেন, ‘রাজা যখন আল্লাহর উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকেন, তখন আল্লাহর বান্দারা শান্তি ও নিরাপত্তার আর্শীবাদ উপভোগ করতে পারে।’

তিনি আরও বলেছেন, ‘শাসনকর্তাকে ক্ষমা গুণের অধিকারীও হতে হবে। কারণ এটিই হচ্ছে সব সদগুণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।’

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শাসিতদের উপকারের জন্য শাসকদের সদা-জাগ্রত বাসনা থাকতে হবে আর তাদের অভাব-অভিযোগ সম্পর্কে তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। কারণ হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব সময় তার সাহাবাদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। আর আল্লাহতায়ালা কোরআনে কারিমে বলেছেন, ‘তাদের সঙ্গে সমস্ত বিষয়ে আলোচনা কর।’

প্রশাসনিক ব্যাপারে শাসকের কর্তব্য হচ্ছে- সরকারী আয়ের তত্ত্বাবধান করা, শাসিতের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান করা, শান্তি রক্ষা করা, দুস্কৃতিকারীদেরকে সংযত করা, ক্ষতি প্রতিরোধ করা। তাকে সব সময় তার কথা রক্ষা করতে হবে। অন্যদিকে, শাসিতদের কর্তব্য হচ্ছে আনুগত্য, কিন্তু কোনো শাসিত ব্যক্তিই উৎপীড়ককে মানতে বাধ্য নয়। ইবনে রূশদ উৎপীড়কের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে উক্তি করেছেন, ‘উৎপীড়ক হচ্ছে সে, যে ব্যক্তি নিজের জন্য শাসন করে, জনগণের জন্য নয়।’

যেখানে নিজের জন্য শাসন করারই সুযোগ নেই, সেখানে নিজের ভাষা, বর্ণ, বংশ, অঞ্চল বা অন্য কোনো প্রয়োজনে শাসনকে পথভ্রষ্ট করার সুযোগ ইসলামে নেই। এরচেয়ে বড় সমানাধিকারের নিশ্চয়তা আর কি হতে পারে? মূলত সমতার নীতিভিত্তিক আর সরলতা ও স্পষ্টতার দিক দিয়ে অসাধারণ-উজ্জ্বল ইসলামি শাসন ব্যবস্থা ও আইন-কানুন এমন কোনো আনুগত্য দাবি করে না, যা কষ্টসাধ্য। ফলে মুসলমানরা যে সকল দেশে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে, সে সকল দেশ সামন্ততান্ত্রিক অমানবিকতার সর্বনাশা কুফল থেকে রক্ষা পেয়েছে এবং সে সকল দেশের মানুষ ভূমি দাসের শৃঙ্খল থেকে বেঁচেছে। এবং ইসলামি আইন দু’টি অনবদ্য ফল উৎপন্ন করেছে। তা হলো-

১. মানব রচিত আইনগুলো যে সকল মিথ্যা ও অত্যাচারের বোঝা চাপিয়েছিল, সেগুলো থেকে মানবাত্মার মুক্তি; ও
২. অধিকারের পূর্ণ সমতা সম্পর্কে ব্যক্তিকে নিশ্চয়তা দান।

অতএব, মুসলমান, অমুসলমান, সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু, সকল মানুষের শারীরিক ও আত্মীক মুক্তি আর মৌল-অধিকারের তত্ত্বগত ও ব্যবহারিক নিশ্চয়তার অপর নাম ইসলাম। সামগ্রিক ইসলামি জীবন ব্যবস্থার অংশ হিসাবে ইসলামি রাষ্ট্র-সমাজ-অর্থ ব্যবস্থায় নিহিত রয়েছে ধর্ম-বর্ণ-ভাষা-অঞ্চল-লিঙ্গ-সংস্কৃতি নির্বিশেষে আপামর মানবতার উজ্জ্বল উদ্ধার; জাগতিক ও পারলৌকিক কল্যাণ, শান্তি ও মুক্তি।

যদিও অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো- এটাই যে, সকল ধরণের সংখ্যালঘুকে কার্যকর ক্ষেত্রে নিরাপত্তা দিয়েছিল ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা এবং ইসলামের মতাদর্শে সুস্পষ্টভাবে সংখ্যালঘুর স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত রয়েছে, তথাপি বর্তমান বিশ্বে নির্যাতিত-নিপীড়িত জাতিসত্ত্বার নাম ইসলাম। বিশ্বের যেসব দেশে মুসলমানরা সংখ্যালঘু ও দুর্বল, সেখানেই তাদেরকে পিষে মারা হচ্ছে। ভাষা, জাতীয়তা, ধর্ম, বর্ণ ইত্যাদি দিক থেকে বহু রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুরূপে বসবাসকারী মুসলমানরা চরমভাবে লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত হচ্ছে। মুসলমানের মানবাধিকারের নূন্যতম অধিকারকেও স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না। রক্ত, মৃত্যু, গৃহত্যাগ মুসলমানের নিয়তিতে পরিণত করেছে ক্ষমতাসীন-সবল জনগোষ্ঠী।

শুধু সংখ্যালঘু হিসাবেই নয়, যেসব দেশে মুসলমানরা সংখ্যালঘু, সেখানেও চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে যুদ্ধ, বিগ্রহ, দাঙ্গা, হাঙ্গামা। বিশ্বের দেশে দেশে বয়স্ক ও সাবালক মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নিধনের পর শিশু-কিশোরদেরকে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে মৃত্যুও মিছিলে। সকল ধরনের অমানবিক ও বর্বর যৌন ও শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে- মুসলিম তরুণী ও নারীদের। নিজস্ব ঘর-বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে শরণার্থী শিবিরে। বিশ্বের মোট শরণার্থীর ৮০%ভাই মুসলিম।

এ হলো ইতিহাসের নির্মম পরিহাস যে, একদা যারা মানবতাকে রক্ষা করেছে, তারাই অমানবিক নির্যাতন ও জুলুমের শিকার। যারা সংখ্যালঘু ও দুর্বলকে বাঁচিয়েছে, হেফাজত করেছে, সেই মুসলমানরাই আজ সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীন এবং হত্যা ও নির্যাতনের মুখোমুখি।

কি কারণ রয়েছে এর পেছনে? কেন শুধু মুসলমান জনগোষ্ঠীই বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় চরম ক্ষতির সম্মুখীন? কেন মানবতার নিরাপত্তা প্রদানকারী ধর্মানুসারীরা পাচ্ছে না শান্তি ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি? কেন বেছে বেছে শুধুমাত্র মুসলিম দেশগুলোতে দাঙ্গা-হাঙ্গামা-বিভেদ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে?

গভীরভাবে এসব প্রশ্নের উত্তর তলিয়ে দেখা আজকে শুধু মুসলমানদের নয়, মানবতাপন্থী ও বিশ্বশান্তি প্রত্যাশী সকলেরই দায়িত্ব। সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের কথা যারা বলেন, তাদেরকে অবশ্যই এসব প্রশ্নে উত্তর খুঁজে বের করে হানাহানি ও রক্তপাতে প্লাবিত বিশ্বকে বাঁচাতে হবে; রক্ষা করতে হবে মানুষ ও মানবতাকে।

আরও পড়ুন: পর্ব-৭: ইসলামে সংখ্যালঘুর অধিকার প্রতিষ্ঠিত বিষয়

আপনার মতামত লিখুন :