আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীর সঙ্গে আল্লাহ সম্পর্ক ছিন্ন করেন

মাওলানা হাবিবুর রহমান, অতিথি লেখক, ইসলাম
কোরআন ও হাদিসে আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখার ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে, ছবি: সংগৃহীত

কোরআন ও হাদিসে আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখার ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আনাস ইবনে মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের রিজিক প্রশস্ত হওয়া এবং নিজের আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি পাওয়া পছন্দ করে সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।’ –সহিহ বোখারি ও মুসলিম

হাদিসের ব্যাখ্যা
বর্ণিত হাদিসে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। কেননা মানুষের মাঝে ভালোবাসা, স্নেহ, মমতা, দয়া ও সহযোগিতার মূলভিত্তি হচ্ছে আত্মীয়তার সম্পর্ক। এ সম্পর্ক নষ্ট হলে সমাজ উচ্ছন্নে যাবে। বর্তমান সমাজের দিকে তাকালে দেখা যায়, সমাজের অনেক মুসলমানই পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য ও আত্মীয়-স্বজনের অধিকার সম্পর্কে একেবারেই অসচেতন। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে মিলনের সেতুবন্ধকে ছিন্ন করে চলেছেন। আপন পিতা-মাতাকে পাঠাচ্ছেন বৃদ্ধাশ্রমে। আবার অনেক পিতা-মাতা ছেলেমেয়ে বেঁচে থাকার পরও জীবিকা নির্বাহের জন্য ভিক্ষা করে বেড়াচ্ছেন।

ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মীয় কারা
ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক বলতে বুঝায় মা ও বাবার দিক থেকে রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়দেরকে। সুতরাং পিতা-মাতা, ভাই-বোন, চাচা, ফুফু, মামা, খালা এবং তাদের ঊর্ধ্বতন ও নিম্নতম ব্যক্তিবর্গ ও সন্তানগণ। এরা সবাই আরহাম রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়ের অন্তর্ভুক্ত। এদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করা জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম কারণ বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

এ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘এবং তারা (রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়) আল্লাহর বিধান মতে তারা পরস্পর বেশি হকদার।’ -সূরা আহজাব: ৬

কারও কারও মতে আত্মার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিকে আত্মীয় বলা হয়। সাধারণত রক্ত, বংশ কিংবা বৈবাহিক সূত্র থেকে আত্মীয়তার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। শরয়ী বিধান অনুযায়ী আত্মীয়-স্বজনের আলাদা আলাদা অধিকার আছে। তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করা ওয়াজিব। শরয়ী কারণ ছাড়া সম্পর্ক ছিন্ন করা সম্পূর্ণ হারাম।

আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্ব
কোরআন ও হাদিসে আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখার ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে আল্লাতায়ালা বলেন, ‘তোমরা এক আল্লাহতায়ালার ইবাদত করো, কোনো কিছুকেই তার সঙ্গে অংশীদার বানিয়ো না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো, যারা (তোমাদের) ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, এতিম, মিসকিন, আত্মীয় প্রতিবেশী, কাছের প্রতিবেশী, পাশের লোক, পথচারী ও তোমার অধিকারভুক্ত (দাস দাসী, তাদের সঙ্গেও ভালো ব্যবহার করো), অবশ্যই আল্লাহতায়ালা এমন মানুষকে কখনও পছন্দ করেন না, যে অহংকারী ও দাম্ভিক।’ -সূরা আন নিসা: ৩৬

হাদিসের আলোকে জানা যায়, কেউ আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করলে আল্লাহ তার সঙ্গে নিজ সম্পর্ক ছিন্ন করেন। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, সাহাবি হজরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) হতে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)বলেন, আল্লাহ বলেন, ‘আমি রহমান (দয়াময়), আমি রাহেমকে (আত্মীয়তার বন্ধন) সৃষ্টি করেছি। রাহেম নামটিকে আমি নিজের নাম থেকে নির্গত করেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে, আমি তার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখব। আর যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে আমিও তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করব।’ –সহিহ বোখারি ও তিরমিজি

নবী করিম (সা.) আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না বলে ঘোষণা করেছেন। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত জুবাইর ইবনে মুতঈম (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ –সহিহ বোখারি ও মুসলিম

আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারীর আমলও আল্লাহতায়ালা কবুল করেন না। ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার মূর্তপ্রতীক। হজরত আবু সুফিয়ান (রা.) ইসলাম গ্রহণের আগে বাণিজ্য সফরে শাম দেশে গেলে বাদশা হিরাক্লিয়াস তার কাছে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) সম্পর্কে বিবরণ জানতে চান। তিনি বিবরণ তুলে ধরেন এভাবে যে, ‘তিনি আমাদের আল্লাহর ইবাদত, নামাজ, সত্যবাদিতা, চারিত্রিক শুভ্রতা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার আদেশ করেন।’

আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হকদার হলেন- পিতা-মাতা। কোরআন ও হাদিসের আলোকে পিতা-মাতার আনুগত্য ও সেবা অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফরজ আইন ইবাদত। কোরআনে কারিমে আল্লাহতায়ালা বারবার তার নিজের ইবাদতের করার পর পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন।

ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন, তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়; তবে তাদের ‘উহ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিও না এবং তাদের শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলো। তাদের সামনে ভালোবাসার সঙ্গে, নম্রভাবে মাথা নত করে দাও এবং বলো: হে পালনকর্তা! তাদের উভয়ের প্রতি রহম করো, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন। -সূরা বনি ইসরাইল: ২৩-২৪

শিরকের পরে ভয়ঙ্করতম কবিরা গুনাহ হলো- পিতা-মাতার অবাধ্যতা। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কঠিনতম কবিরা গুনাহ আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা, এরপর পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া।’ –সহিহ বোখারি

আধুনিক সভ্যতায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনে পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি অবহেলা সীমাহীন। ফলে আমাদের মাঝ থেকে শ্রদ্ধা, স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা ইত্যাদি লোপ পাচ্ছে এবং পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন নষ্ট হচ্ছে। অথচ পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজন হক আদায় করা একজন মুমিনের জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম হতে পারে এ ব্যাপারটি অনুধাবন করা সকলের জন্য একান্ত জরুরি।

আপনার মতামত লিখুন :