Barta24

সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৯, ১১ ভাদ্র ১৪২৬

English

মাওলানা আজাদ: রাজনীতিতে ধর্মীয় সম্প্রীতির অগ্রদূত

মাওলানা আজাদ: রাজনীতিতে ধর্মীয় সম্প্রীতির অগ্রদূত
ছবি: সংগৃহীত
ড. মাহফুজ পারভেজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
বার্তা২৪.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

মাওলানা আবুল কালাম আজাদ (১৮৮৮-১৯৫৮) দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম চিন্তাবিদদের মধ্যে অন্যতম আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে ধর্ম-গোত্র-সম্প্রদায়গত ঐক্যের প্রবক্তা তিনি। রবিবার (১১ অক্টোবর ছিল তাঁর ১৩০তম জন্মবার্ষিকী। তাঁর মূল নাম মাওলানা সাইয়েদ আবুল কালাম গোলাম মুহিউদ্দিন আহমাদ বিন খায়রউদ্দিন আল হোসাইনি।

পবিত্র নগরী মক্কায় জন্মগ্রহণকারী আজাদের মাতা আরবীয়, পিতা মাওলানা খায়রউদ্দিন আফগান বংশোদ্ভূত বাঙালি মুসলমান, যিনি ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের বিরূপ পরিস্থিতিতে হিজরত করে ভারত ছেড়ে মক্কায় চলে যান এবং ১৮৯০ সালে আবার সপরিবার কলকাতায় প্রত্যাবর্তন করেন।

আরবি মাতৃভাষা হওয়ায় এবং ধর্মের প্রতি একনিষ্ঠ ও দৃঢ় বিশ্বাসী পারিবারিক পটভূমির কারণে প্রচলিত ধারায় ইসলামী শিক্ষার চর্চা করা ছাড়া আজাদের অন্য কোনো বিকল্প ছিল না। প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিক শিক্ষা লাভ না করলেও ব্যক্তিগতভাবে অধ্যয়ন ও ব্যাপক পাঠাভ্যাসের মাধ্যমে তিনি উর্দু, ফারসি, হিন্দি ও ইংরেজিতে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তাঁর সময়ের অনেক যশস্বী ব্যক্তিদের মতো তিনিও নিজ চেষ্টায় শিক্ষিত হওয়ার পথ অনুসরণ করেন এবং বিশ্ব ইতিহাস ও রাজনীতি সম্পর্কে বিপুল জ্ঞানের অধিকারী হন।

পবিত্র কুরআন, হাদিস, ফিকাহ্ ও কালামের নতুন ব্যাখ্যা প্রদান করে তিনি অনেক লেখা প্রকাশ করেন। তাঁর পান্ডিত্যই ‘তাকলিক’ (সাদৃশ্যের ঐতিহ্য) পরিহার এবং ‘তাজদিদ’ (নতুন প্রথা প্রবর্তন) গ্রহণের পথে তাঁকে পরিচালিত করে।

তাজদিদ সম্পর্কে তাঁর ধারণা তাঁকে এ বিশ্বাসের দিকে চালিত করে যে, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে ভারতের সকল ধর্ম ও গোত্রের জনগণ তাদের ধর্মবিশ্বাস ও কৃষ্টির সুসমন্বয় ঘটাতে পারে এবং তিনি বিশ্বাস করতেন যে, তা একমাত্র তখনই সম্ভব যখন সে রাষ্ট্র গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়।

স্বাধীন রাষ্ট্র ভারতের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতা ভিত্তিক গণতন্ত্রের ধারণাকে ভারতের যেসব রাজনৈতিক চিন্তাবিদ সর্বাগ্রে সংজ্ঞায়িত ও ব্যাখ্যা করেছেন আজাদ সম্ভবত তাঁদের অন্যতম। ধর্মীয় উদারতার মাধ্যমে রাজনৈতিক হিংসা প্রশমনে তিনি ছিলেন অগ্রণী ব্যক্তিত্ব।

যে পারিবারিক পরিবেশে তিনি বেড়ে উঠেছেন এবং যে ধরনের শিক্ষা লাভ করেছেন, তাতে তাঁর ধর্মীয় নেতা হওয়ারই কথা। তাঁর পূর্বপুরুষদের অধিকাংশই ধর্মবেত্তা ছিলেন বলে তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তা হন নি। তবে রাজনীতির প্রতি আজাদের ঝোঁক ছিল। খুব অল্প বয়সেই তিনি রাজনীতির ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

বিশ্ববিশ্রুত পণ্ডিত জামালউদ্দীন আফগানির প্যান ইসলামী মতবাদ ও স্যার সৈয়দ আহমদ খানের আলীগড় চিন্তাধারার প্রতি তিনি বিশেষভাবে মনোযোগী হয়ে ওঠেন। প্যান ইসলামী চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি আফগানিস্তান, ইরাক, মিশর, সিরিয়া ও তুরস্ক সফর করেন। তারপর জীবন ও রাজনীতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন এক উপলব্ধি নিয়ে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন।

ইরানে সাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামরত নির্বাসিত বিপ্লবীদের সঙ্গে তিনি ইরাকে সাক্ষাৎ করেন। তিনি মিশরে শেখ মুহম্মদ আব্দুহ্ ও সাঈদ পাশা এবং আরব বিশ্বের অন্যান্য বিপ্লবী কর্মীদের সঙ্গে দেখা করেন। কনস্টান্টিনোপলের তরুণ তুর্কিদের আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে তাঁর প্রাথমিক জ্ঞান ছিল। এসব গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ ও সংস্পর্শ তাঁকে একজন জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীতে পরিণত করে। ধর্ম ও জীবনের সংকীর্ণ ধারণার শৃঙ্খলমুক্তির স্মারকস্বরূপ তিনি লেখক হিসেবে ‘আজাদ’ নাম গ্রহণ করেন।

বিদেশ থেকে ফিরে এসে আজাদ পূর্ব ভারতের দুজন নেতৃস্থানীয় বিপ্লবী শ্রীঅরবিন্দ ঘোষ ও শ্রীশ্যামসুন্দর চক্রবর্তীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ব্রিটিশ শাসন বিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দেন। প্রকৃতপক্ষে একদিকে তিনি ছিলেন একজন গোপন বিপ্লবী এবং অন্য দিকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রকাশ্য কর্মী।

তিনি যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হবে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য, আর সে ঐক্যের ভিত্তিমূল হবে রাজনীতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ ধারণা। কংগ্রেসের মঞ্চ থেকে তিনি তুরস্কের খিলাফত আন্দোলনকে সমর্থন করেন, পুরানো শাসকদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে নয় বরং নবীন তুর্কিদের হাতকে শক্তিশালী করার জন্য। তাঁর মতে, 'নবীন তুর্কিরাই ছিলেন খিলাফতের মূল বিধানের সত্যিকার প্রতিনিধি।'

১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত আজাদের উর্দু সাপ্তাহিক সংবাদপত্র 'আল-হেলাল' প্রকাশ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতে এর অপকর্মের আক্রমণাত্মক সমালোচনা করে। এ পত্রিকা কংগ্রেস ও জাতীয়তাবাদী মতামত প্রকাশে একটি শক্তিশালী বিপ্লবী মুখপত্রে পরিণত হয়। সম্প্রদায় ভিত্তিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সৃষ্ট শত্রুতার পর হিন্দু-মুসলমান ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে 'আল-হেলাল' গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ব্রিটিশ সরকার আল-হেলাল সাপ্তাহিকীকে বিপজ্জনক মতামত প্রচারে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করে এবং সে কারণে ১৯১৪ সালে পত্রিকাটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। আজাদ তখন এটির নাম পরিবর্তন করেন এবং 'আল-বালাগ' নামে অপর একটি সাপ্তাহিকী প্রকাশ করেন। এ পত্রিকারও উদ্দেশ্য ছিল অভিন্ন অর্থাৎ হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের ভিত্তিতে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও বিপ্লবী ধ্যান-ধারণা প্রচার করা। কিন্তু ১৯১৬ সালে সরকার এ পত্রিকাও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং আজাদকে কলকাতা থেকে বহিষ্কার করে রাঁচিতে অন্তরীণ করে রাখে। সেখান থেকে তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২০ সালে মুক্তি পান।

মওলানা আবুল কালাম আজাদ তখন নিখিল ভারত জাতীয় কংগ্রেসে মতিলাল নেহরু, জওহরলাল নেহরু এবং সি. আর. দাসের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অন্যতম সদস্য এবং গান্ধীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত ঘনিষ্ঠ সহচরদের একজন হিসেবে স্বীকৃত। তিনি দিল্লি (১৯২৩) ও রামগড়ে (১৯৪০) কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। বিশ শতকের ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে ভারতীয় রাজনীতির উত্তাল দিনগুলিতে আজাদ মহাত্মা গান্ধীর সবচেয়ে অন্তরঙ্গ উপদেষ্টা হিসেবে আবির্ভূত হন। ক্রিপস মিশন (১৯৪২) থেকে শুরু করে কেবিনেট মিশন (১৯৪৬) পর্যন্ত সকল আলোচনায়, বিশেষত ভারতের সাংবিধানিক বিষয়ে ও সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে, আজাদের সঙ্গে গান্ধী ঘনিষ্ঠভাবে পরামর্শ করেছেন। ক্রিপস মিশন (১৯৪২) এবং কেবিনেট মিশন (১৯৪৬) এ উভয় সময়েই সমঝোতা-পূর্ব আলোচনা বৈঠকে আলোচকদের মধ্যে আজাদ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

কিন্তু পাকিস্তান আন্দোলন শক্তিশালী হওয়ায় এবং হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের অবনতি ঘটার ফলে আজাদের প্রভাব হ্রাস পায়। তাঁর লেখা চিঠিপত্র এবং আত্মজীবনীতে তিনি এ প্রসঙ্গে তাঁর হতাশার কথা উল্লেখ করে বলেছেন যে, 'ভারতের বিভক্তি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হতো যদি কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে আপসমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে তাঁর (আজাদের) মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতেন।'

আজাদ নেহরুর অভিপ্রায়ের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে, নেহরুর মনোভাব কেবিনেট মিশন পরিকল্পনাকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ধর্মের ভিত্তিতে ভারতকে বিভক্তির দিকে চালিত করে। কিন্তু শেষের দিকে সৃষ্ট রাজনৈতিক মতপার্থক্য দুই নেতার বন্ধুত্বকে ম্লান করতে পারে নি। তিনি তাঁর বিখ্যাত আত্মজীবনী গ্রন্থ 'ইন্ডিয়া উইন্স ফ্রিডম' নেহরুর নামে উৎসর্গ করে তাঁর সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন তিনি। সর্বজনীন শিক্ষা এবং মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় জীবনভর কাজ করেছেন তিনি।

আপনার মতামত লিখুন :

ভবিষ্যতের যে আবিষ্কারগুলো বদলে দেবে পৃথিবীর ভাগ্য

ভবিষ্যতের যে আবিষ্কারগুলো বদলে দেবে পৃথিবীর ভাগ্য
কিছু আবিষ্কার বদলে দেবে আগামীর পৃথিবীকে

মানুষের অতীত অভিজ্ঞতা শুভ নয়। মাইগ্রেশন, যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অন্যান্য কারণে তাকে শিখতে হয়েছে পদে পদে। মানুষকে আবিষ্কার করে নিতে হয়েছে তার নিজের চাহিদা। একসময় মানুষ নিতান্ত অসচেতনতায় আগুনের রহস্য উন্মোচন করেছিল। শিল্পবিপ্লবের পরে পরিচিত হলো স্টিম ইঞ্জিনের মতো নতুন অনেক প্রযুক্তির সাথে। বিশ শতকে সামনে আসলো ইন্টারনেট, কম্পিউটার, মোবাইলের মতো যুগ বদলানো আবিষ্কার। কিন্তু এ-ই কি মানবজাতির ভাগ্যে সমাপ্তির গল্প?

অবশ্যই না। ভবিষ্যত বরাবরই কৌতূহল আর দূরদৃষ্টির সাথে সম্পর্কিত। বর্তমান দিনগুলোতে আমরা এমন সব জীবন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে চলছি, যা আগে কল্পনাও করা যায়নি। বর্তমানের প্রতিটি বছর প্রাচীন কয়েক হাজার বছরের থেকেও বেশি পরিবর্তন একত্রে নিয়ে আসছে। ভবিষ্যতের বিপ্লাবাত্মক আবিষ্কারগুলো নিয়ে হয়তো তেমন কথা হয় না। আমাদের আজকের আয়োজন তাদের নিয়ে। অবশ্যই সম্ভাবনার ওপর ভরসা রেখে।

ব্যক্তিগত রোবট সহকারী

অনেক দিন ধরেই রোবট ব্যবহারের কথা চলছে বিজ্ঞানী মহলে। অনেক ক্ষেত্রে হয়েছেও। চিন্তায় বুঁদ মানুষ জন্ম দিয়েছে সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস ও সিনেমা। আইজ্যাক আসিমভ বা আর্থার সি ক্লার্কের মতো পণ্ডিতেরাও আছেন সেই তালিকায়। সে যাই হোক, গত এক দশক ধরে রোবট বিস্ময়কর দক্ষতার সাথে ব্যবহৃত হচ্ছে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে। সোফিয়ার কথা সর্বজন বিদিত। হাল আমলে কয়েকেটি দেশ তো নিরাপত্তা বিভাগে পর্যন্ত রোবটের নিয়োগ দিয়েছে। যদিও ব্যক্তিগত রোবট নির্মাণ চেষ্টায় হালে পানি পাওয়া যাচ্ছিল না।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/25/1566741730059.jpg
রোবটবিপ্লব সভ্যতাকে দেখাতে পারে নতুন গতিমুখ


অ্যামাজোনের Alexa কিংবা অ্যাপলের Siri এই ক্ষেত্রে কয়েক ধাপ সামনে। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে তাৎর্যপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত এগিয়ে নিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI- কে। সার্বিকভাবেই সরে যাচ্ছে মেঘ। অদূর ভবিষ্যতে দেখা যাবে ব্যক্তিগত রোবটের ব্যবহার। আর এই রোবটবিপ্লব মানব সভ্যতাকে নতুন করে বাধ্য করবে নিজের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবতে।

ইমারসিভ ভার্চুয়াল রিয়েলিটি

ভবিষ্যতের যতগুলো সম্ভাবনা আছে, তার মধ্যে অগ্রগণ্য পুরোপুরি ইমারসিভ ভার্চুয়াল রিয়েলিটি। পারিপার্শ্বিক বাস্তবতাকে ভার্চুয়াল জগতে ফুটিয়ে তুলবে পুরোদমে। সত্যি বলতে বাস্তব এবং অবাস্তবের ধারণায় ফারাক থাকবে না মোটেও। সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির অসহযোগিতার জন্য হয়তো এখনো অতটা এগিয়ে যাওয়া যায়নি। তবে ভিন্ন মাত্রা নিয়ে ক্রমে সমৃদ্ধ ও পরিণত হওয়া ভার্চুয়াল জীবন নতুন আশ্রয় হিসাবে উপস্থাপিত হচ্ছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/25/1566741783104.jpg
ইমারসিভ ভার্চুয়াল রিয়ালিটি সরিয়ে দেবে বাস্তব আর অবাস্তবের ব্যবধান


ইদানীং গেইমের মতো বিষয়গুলোও প্রায় চলে গেছে এর নিয়ন্ত্রণে। মাঝরাতে ঘুরে ফিরে বিনোদন অর্জনের কি দরকার, যদি একই কাজ ঘরে বসে করা যায়?

ক্রাইয়োনিক্স

বয়স যেন সচেতন শত্রুর মতো বেড়ে যায় প্রতিনিয়ত। আর একসময় গ্রাস করে নেয় মৃত্যু। মানব সভ্যতার গোড়া থেকেই মানুষ অমরত্ব খুঁজেছে। গড়ে উঠেছে অজস্র আখ্যান ও অভিযান। ব্যাবিলনীয়ান মহাকাব্য গিলগামেশ থেকেই তার নজির পাওয়া যায়। সেদিন গিলগামেশ অমর হতে ব্যর্থ হয়েছিল। আজকের বিজ্ঞান কিন্তু হতাশ করছে না।
মৃত্যুকে পরাজিত করার অদ্ভুত এক পদ্ধতির কথা বলছেন কেউ কেউ। আমাদের শরীরকে সত্যি সত্যি বরফে জমিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। ঠিক এইখানেই ক্রাইয়োনিক্স—নিজেকে বিজ্ঞান বলে দাবি করে। এমন বিজ্ঞান যেখানে মানুষের লাশকে বরফে রেখে অবিকৃত অবস্থায় রাখা হয়, যেন কোনোদিন তাকে পুনরায় জাগিয়ে তোলা যায়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/25/1566741836490.jpg
সামনের পৃথিবীতে ক্রাইয়োনিক্স গেইমচেঞ্জারের ভূমিকা পালন করতে পারে


অনেক বিজ্ঞানীই একে হাতুড়ে মতবাদ বলে অবজ্ঞা করতে চান। কিন্তু তাতে দমে যাবার পাত্র নয় একটা শ্রেণী। বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ ক্রাইয়োনিক্স অর্গানাইজেশনের প্রেসিডেন্ট ডেনিস কোয়ালস্কি। তিনি শুধু বলেছিলেন, আমরা গ্যারান্টি দিতে পারি না যে, কাউকে ফিরিয়ে আনতে পারব। তবে এইটা সত্য, যদি আপনাকে পুতে ফেলা হয় কিংবা পুড়িয়ে ফেলা হয়; তবে আর পাওয়া যাবে না।

নেহাৎ অবজ্ঞার হলেও এই হাতুড়ে গবেষকদের চিন্তাই গেইমচেঞ্জার হিসাবে আবির্ভুত হতে পারে। হাজার হাজার দেহ এখন অব্দি বরফে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ইয়েল ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা সাম্প্রতিক সময়ে মৃত শূকরের ব্রেইন নিয়ে গবেষণা করে তাকে কাজ করাতে সক্ষম হয়েছেন। আর সেই ফলাফল টনক নড়িয়ে দিয়েছে মানবজাতিকে আরো একধাপ এগিয়ে যাবার জন্য।

এক্সোস্কেলিটন

এক্সোস্কেলিটন কোনোভাবেই নতুন প্রযুক্তি না। সামরিক উদ্দেশ্যে বিস্তর গবেষণা ও অগ্রগতিতে এই প্রযুক্তি চালু আছে ১৯৬০ সালের দিক থেকে। সংজ্ঞাগতভাবে, এক্সোস্কেলিটন বাইরে থেকে নিযুক্ত কৃত্রিম অস্থি বা কঙ্কাল, যা শরীরকে সাহায্য বা সুরক্ষা দিতে ব্যবহৃত হয়।
এক্সোস্কেলিটন কোটি মানুষের জীবনই বদলে দিতে পারে অদূর ভবিষ্যতে। গবেষকেরা মনে করেন, শিল্পকারখানায় এর দৈনন্দিন ব্যবহার বাড়বে আসছে দিনগুলোতে। বিশেষ করে যেখানে কর্মচারীদের অধিক শক্তির প্রয়োজন হয় এবং কাজটা রোবটের দ্বারা করা সম্ভব না। তারচেয়ে বড় কথা, এক্সোস্কেলিটনেরই একটা বিশেষ প্রকার দেশের বয়স্ক ও অসুস্থদের চলাচলে দেবে নতুন মাত্রা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/25/1566741939614.jpg
এক্সোস্কেলিটনের ব্যবহার অনেক অসম্ভবকে পরিণত করবে সম্ভবে


The Verge এর প্রতিবেদক সম্প্রতি মোটরনির্মিত এক্সোস্কেলিটনের কথা বলেছেন, যা আবিষ্কার করেছে SuitX। এই এক্সোস্কেলিটন গায়ে জড়ালে একজন প্যারালাইজড ব্যক্তি হাঁটার সক্ষমতা পাবে।

উড়ন্ত গাড়ি

বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই উড়তে সক্ষম গাড়ির কথা শুনিয়ে এলেও তা এখনো লোকদৃষ্টির অগোচরেই রয়েছে। তবে এবার বেশ কিছু ঘোষণায় ধারণা করা হচ্ছে তার খুব দেরি নেই। সম্প্রতি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান Uber দাবি করেছে, শীঘ্রই তাদের এয়ার ট্যাক্সি বহর চালু করার চিন্তা আছে। সেই সাথে নিযুক্ত আছে নানা গবেষণা সংস্থা।

যদি সত্যিই সফল হওয়া যায়, মানব সভ্যতা এক নতুন যুগে প্রবেশ করবে। ছোট আকারের কোয়াডকপ্টার ড্রোনের মতো হলেও খুব শীঘ্রই পাবে স্বাভাবিক আকৃতি ও গতি। সম্প্রতি সময়ে বিভিন্ন মেগাসিটিতে জ্যাম কিংবা নাগরিক ভোগান্তি থেকে কেবল মুক্তি নয়। এই আবিষ্কার গঠন করবে যোগাযোগের নতুন সংজ্ঞা। বিখ্যাত সিনেমা ব্লেড রানারের কথা স্মরণ করা যেতে পারে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/25/1566742012256.jpg
উড়ন্ত গাড়ির স্বপ্ন হয়তো খুব বেশিদিন স্বপ্ন হয়ে থাকবে না


অটোমোবাইলের আবিষ্কার অনেকটাই বদলে দিয়েছিল আমাদের জীবনযাত্রার মান। গাড়িঘটিত সমস্যাদি থেকে মুক্তির জন্যও আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে সভ্যতা।

হলোগ্রাফি

অন্যান্য প্রযুক্তি ও গবেষণায় বোধ হয় অনেকটা চাপা পড়ে গেছে ত্রিমাত্রিক হলোগ্রামের কথা। একসময় এর ব্যবহার ছিল ব্যাপক। তবে বেশ কিছু দেশ একে নিয়ে কাজ করে চলছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/25/1566742045529.jpg
অগোচরেই হলোগ্রাফ নিয়ে আসতে পারে নতুন বিপ্লব


ভবিষ্যতে হলোগ্রাফে বিশেষ ধরনের চশমার প্রয়োজন পড়বে না। সেই সাথে স্তরবিহীন থ্রি-ডি হলোগ্রাম হাজার মাইল দূরের কারোসাথে বিরামহীন যোগাযোগে সক্ষম করে দেবে। মনে হবে যেন তারা বসে আছে পাশেই।

কৃত্রিম মধ্যাকর্ষণ

বর্তমান বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান সমস্যা—মহাকাশে আমরা মধ্যাকর্ষণ শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। ফলে সম্ভব হয় না অনুকূল পরিবেশ তৈরি। কৃত্রিম মধ্যাকর্ষণ সৃষ্টির সক্ষমতা মহাকাশীয় অনেক ফাঁদ থেকেই বের হয়ে আসার পথ উন্মোচন করে দেবে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/25/1566742101356.jpg
কৃত্রিম মধ্যাকর্ষণ মহাকাশে দেবে নতুন পরিচয়


তাত্ত্বিকভাবে বলকে কেন্দ্রীভূত করার মাধ্যমে কৃত্রিম মধ্যাকর্ষণ সৃষ্টি করা সম্ভব। এজন্য দরকার বেশ ভারি পরিমাণে মহাশূন্য দ্রব্যাদি। যেমনটা আর্থার সি ক্লার্কের 2001: A Space Odyssey কিংবা অন্যান্য অনেক সায়েন্স ফিকশনেই দেখা গেছে।

মহাকাশে বসবাস

১৯৭০ সালের দিকে নাসা মহাশূন্যে বসতি নির্মাণের খসড়া ইশতেহার প্রণয়ন করে। প্রক্রিয়ায় বাজেট রাখা হয়েছিল কমবেশি ৩৫ বিলিয়ন ডলার। এই চিন্তাটা পৃথিবীকে কল্পনার অন্যতম উচ্চতায় নিয়ে গেছে। মানুষ নিজেকে ভাবতে শুরু করেছে মহাবিশ্বের একচ্ছত্র নায়ক হিসাবে। এই ক্ষেত্রে অন্তত তিনটা নাম না আনা অপরাধ হবে—বার্নাল স্ফিয়ার, স্ট্যানফোর্ড টোরাস এবং ও’নেইল সিলিন্ডার।
কলোনিগুলো অবস্থিত হবে ল্যাগ্রানজিয়ান পয়েন্টে, যাকে বলা হয় L5। জায়াগাটা চাঁদ, সূর্য এবং পৃথিবী থেকে ভারসম্যপূর্ণ দূরত্বে থাকার কারণে বেশ নিরাপদ। প্রতিটি কলোনিই হবে স্বনির্ভর এবং পর্যাপ্ত কৃষি এলাকা নিয়ে গঠিত।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/25/1566742152579.jpg
মহাশূন্যে বসবাস হবে সৌর জগতের বাইরে বসবাসের সিঁড়ি


ও’নেইল সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে এটি হবে ৫ মাইল প্রশস্ত এবং ২০ মাইল লম্বা। তিন টুকরো ভূমি পরস্পর যুক্ত থাকবে। কলোনিগুলো সক্ষম থাকবে নিজের মধ্যাকর্ষণকে নিয়ন্ত্রণ করতে। এই ধরনের মহাকাশীয় ব্যবস্থা আমাদের অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবীর বাইরেই কেবল নয়; সৌর জগতের বাইরে বসবাস করার স্বপ্ন দেখায়।

ফিউশন শক্তি

জীবাশ্ম জ্বালানী যে হারে আমরা ব্যবহার করছি, তাতে বেশিদিন টিকবে বলে মনে হয় না। প্রায় একই কথা প্রযোজ্য অন্যান্য শক্তির উৎসের জন্য। সেক্ষেত্রে ফিউশন বিক্রিয়ায় উৎপন্ন শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। শক্তি ব্যবহারের নির্ভরশীলতায় এমন নাটকীয় পরিবর্তন ভবিষ্যৎ মানব সভ্যতার গতিমুখ নির্ধারণেও সাহায্য করবে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/25/1566742204496.jpg
ফিউশন শক্তির সফলতা প্রতিস্থাপিত করবে অন্যান্য শক্তির উপর নির্ভরশীলতা


১৯৫০-এর দশক থেকে ফিউশনের অগ্রগতির জন্য গবেষণা চলছে। যদি তৈরি করা হতো, আমরা এতদিনে প্রভূত শক্তির অধিকারী হতাম। বিজ্ঞানীরা দেখিয়ে দিয়েছেন, মাত্র এক কিলোগ্রাম ডিউটেরিয়াম থেকে যে পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়; তা দিয়ে দশ লাখ বাড়িকে বিদ্যুতের আওতায় আনা সম্ভব। অথচ ওই ডিউটেরিয়াম আসবে পানি থেকে। বিষয়টা কঠিন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের আবিষ্কার এবং সফলতাগুলো ভবিষ্যতের জন্য আশা জাগায়।

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ : আমৃত্যু প্রগতিশীল ও নীতিবান এক রাজনীতিক

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ : আমৃত্যু প্রগতিশীল ও নীতিবান এক রাজনীতিক
সৎ ও নীতিবান রাজনীতিক হিসেবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ

নির্লোভ ও ত্যাগী এক বরেণ্য রাজনীতিকের প্রতিকৃতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। রাষ্ট্রীয় পদক ও সম্মান সবারই আরাধ্য থাকলেও জনগণের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করাটাই ছিল তাঁর কাছে প্রধান দায়িত্ব। তাই তো, ২০১৫ সালে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পদক’ গ্রহণ করার প্রস্তাব। তাঁর মত ছিল, “রাজনীতির অর্থ দেশসেবা, মানুষের সেবা। পদ বা পদবির জন্য কখনো রাজনীতি করিনি। পদক দিলে বা নিলেই সম্মানিত হয়, এই দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাস করি না আমি।”

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় নিষ্ক্রিয় ও বিভক্ত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সভাপতি ছিলেন তিনি। তবে শুধু এটুকু দিয়ে তাঁর বর্ণাঢ্য ও সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনকে পরিমাপ করা যাবে না। পাকিস্তান আমলে, মুক্তিযুদ্ধের সময় ও দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন প্রভাবশালী এক ব্যক্তিত্ব। ২৩ আগস্ট, ২০১৯ দীর্ঘ ৯৭ বছরের কর্মময় জীবন ছেড়ে চিরপ্রস্থান করেন এই মহান নেতা।

মোজাফফর আহমদের জন্ম ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামে। তাঁর বাবার নাম আলহাজ কেয়াম উদ্দিন ভূইয়া, মায়ের নাম আফজারুন্নেছা। বাবা ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক। মোজাফফর আহমদ যথাক্রমে হোসেনতলা স্কুল ও জাফরগঞ্জ রাজ ইনস্টিটিউশনে প্রাথমিক, দেবিদ্বার রেয়াজউদ্দিন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক এবং ভিক্টোরিয়া কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি গ্রহণ করেন এবং ইউনেস্কো থেকে লাভ করেন একটি ডিপ্লোমা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র মোজাফফর দীর্ঘদিন বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা করেন। শেষমেশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেন ১৯৫২ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত। অত্যন্ত বর্ণিল তাঁর রাজনৈতিক জীবন। রাজনীতি অঙ্গনে তাঁর শুভসূচনা হয় ১৯৩৭ সালের দিকে। তিনি ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যান। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিজ জেলা কুমিল্লার দেবিদ্বার আসনে মুসলিম লীগের শিক্ষামন্ত্রীকে পরাজিত করে তাক লাগিয়ে দেন রাজনীতির ময়দানের সবাইকে। আওয়ামীলীগের বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদে ন্যাপ-এর প্রতিনিধি নেতা হিসেবে অধ্যাপক মোজাফফর আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। এসকল কারণে, সামরিক শাসক আইয়ুব সরকার তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ও হুলিয়া জারি করে ১৯৫৮ সালের দিকে। তাকে ধরিয়ে দিলে পুরস্কার প্রাপ্তির ঘোষণা পর্যন্ত করা হয়। আত্মগোপন থাকা অবস্থায় তিনি আইয়ুব সরকার শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সুসংগঠিত করেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/25/1566732810704.jpg
মোজাফফর আহমদ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুজিবনগর সরকারের ছয় উপদেষ্টার একজন


দীর্ঘ আট বছর সময়ব্যাপী আত্মগোপনে থাকবার পর ১৯৬৬ সালে তিনি প্রকাশ্য রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করেন। প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী বাম রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ১৯৬৭ সালের ৩০ নভেম্বর রংপুর জেলায় অনুষ্ঠিত এক কাউন্সিল অধিবেশনের পর চীনপন্থী ও মস্কোপন্থী—এ দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। চীনপন্থী ন্যাপের সভাপতি হন মাওলানা ভাসানী এবং মস্কোপন্থী ন্যাপের সভাপতি হন সীমান্ত প্রদেশের খান আবদুল ওয়ালী খান। মস্কো শিবিরে পূর্ব পাকিস্তানপন্থী ন্যাপের সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। এ অংশ পরিচিত ছিল মোজাফফর-ন্যাপ নামেও। অবিভক্ত পাকিস্তান ন্যাপের যুগ্ম সম্পাদকও ছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব সরকারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি কারাবরণও করেছেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার তথা মুজিবনগর সরকার ছয় সদস্যের যে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছিল, তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। উপদেষ্টা কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন মাওলানা ভাসানী, মণি সিংহ, মনোরঞ্জন ধর ও খোন্দকার মোশতাক আহমদ। স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফর করেন তিনি। সে সময় তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ন্যাপ, সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়ন থেকে নিজস্ব উনিশ হাজার মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনে অধ্যাপক আহমদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বয়সে তিনি বঙ্গবন্ধুর দুই বছরের ছোট। কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। মাঝে মাঝে রসিকতা করে তিনি বলতেন, বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা হলে আমি তো জাতির চাচা।

তবে, স্বাধীনতার পর নিরিবিলি রাজনীতি করার সুযোগ তিনি পাননি তেমনটা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে নিহত হওয়ার পর তাকে আবার আত্মগোপনে যেতে হয়। শুধুমাত্র রিক্সাভাড়া পকেটে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তিনি।

১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলে তিনি ন্যাপ, সিপিবি এবং প্রগতিশীল শক্তির পক্ষে প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। স্বৈরাচারী শাসক এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনের শুরুতে অধ্যাপক আহমদ কারারুদ্ধ হন। তখন, তার স্ত্রী আমিনা আহমদ স্কুলে চাকরি করে সংসার চালাতেন।

রাজনীতি জীবনে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, সোভিয়েত ইউনিয়ন, বুলগেরিয়া, অস্ট্রিয়া, দক্ষিণ ইয়েমেন, লিবিয়া, আফগানিস্তান, ভারত, মধ্যপ্রাচ্যসহ পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের নানান দেশে সফর করেন। তাঁর সহধর্মিণী আমিনা আহমদ বর্তমানে ন্যাপের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং সভানেত্রী হিসেবে আছেন বাংলাদেশ নারী সমিতিতে।

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ছিলেন সৎ ও ত্যাগী রাজনীতিকের মূর্ত প্রতীক। অত্যন্ত সাদাসিদে জীবনযাপন করতেন তিনি। নিজেকে তিনি সবার কাছে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন ‘কুঁড়েঘরের মোজাফফর’ হিসেবে। নিজে সাম্যবাদী ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শে রাজনীতি করলেও ধর্ম-কর্মের প্রতি বিশ্বাস ছিল তাঁর। আল্লাহর ওপর ছিল তার অগাধ বিশ্বাস ও আস্থা।

বয়সের দিকে জীবনের সেঞ্চুরি তিনি পূরণ করতে পারেননি একটুর জন্য। তেমনি রাজনীতিবিদ হিসেবে দেশকে নিয়ে, দেশের মানুষকে নিয়ে তাঁর দেখা অনেক স্বপ্নও হয়তো পূরণ হয়নি। কিন্তু, একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রাখা ও পালন করা তাঁর ভূমিকা দল-মত নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে তাঁকে চির-স্মরণীয় করে রাখবে, একথা বলাই যায়।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র