পঙ্গুত্বকে জয় করে হয়েছেন প্রতিবন্ধীদের দিকনির্দেশক

এস এম জামাল, ডিস্ট্রিক করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

পাঁচ বছর থেকে ২০ বছর বয়স পর্যন্ত যে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধীদের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন পান্না। প্রতিবন্ধীদের মানসিক বিকাশে শিক্ষার পাশাপাশি দিচ্ছেন নানা রকম দিক নির্দেশনাও। পুরো নাম আবু সালেহ মজনুল কবির পান্না।

তিনি কুষ্টিয়ারে দৌলতপুর উপজেলার রিফায়েতপুর ইউনিয়নের হরিণহাছি গ্রামের মৃত আব্দুল করিমের ছেলে। সহকারী আইনজীবীর পাশাপাশি ব্যবসায়ী ছিলেন পান্না। কিন্তু ২০০৮ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ববরণ করেন তিনি। তখন থেকেই নিজের এ পঙ্গুত্ব জীবনকে উপলব্ধি করেত থাকেন অন্যসব পঙ্গু কিংবা প্রতিবন্ধীদের।

তাদের দুঃখ কষ্ট লাঘবের চিন্তাও করে ২০০৯ সালে দৌলতপুর উপজেলার চন্দনাপাড়া নিজ বাড়িতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ‘পঙ্গু ও বিকলাঙ্গ শিক্ষালয়’ নামে প্রতিবন্ধীদের জন্য একটি বিদ্যালয় গড়ে তোলেন পান্না। পরে ২০১৫ সালের শুরুর দিকে ‘দৌলতপুর প্রতিবন্ধী ও অটিজম বিদ্যালয়’ নামে উপজেলার সোনাইকান্দিতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধনকৃত ঊসদা সমাজকল্যাণ স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সার্বিক সহযোগিতায় সাড়ে ১২ শতাংশ জমির ওপর গড়ে তোলা হয় বিদ্যালয়টি।

পান্নার এ কাজে সহযোগিতা করেন তার স্ত্রী মোছা. নাসরীন সুলতানা। তিনি দৌলতপুর পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।

প্রথমে ৩০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে এ বিদ্যালয়টি শুরু হলেও বর্তমানে ২২০ জনকে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। এদের মধ্যে সম্প্রতি তিনজন সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সাফল্য অর্জন করেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Dec/25/1545720251602.jpg

স্থানীয়দের দান করা ভ্যানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় শতাধিক প্রতিবন্ধী এখানে শিক্ষা নিতে আসে। স্কুল থেকে ২০-৩০ মাইল দূর থেকেও ভ্যানে করে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসা এবং পৌঁছে দেওয়া হয় তাদের।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, নামমাত্র ভর্তি ফি নেওয়া হলেও কোনো প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মাসিক বা বাৎসরিক খরচ নেওয়া হয় না। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত স্কুল খোলা রেখে শিক্ষা ও সেবা দেয়া হয়ে থাকে।

প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে দেখা যায়, ছয়টি রুমের মধ্যে চারটি ক্লাস ও সেবা রুম, একটি অফিস কক্ষ ও একটি শিক্ষক মিলনায়তন তৈরি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে প্রধান শিক্ষকসহ ৩০ জন শিক্ষক ও কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। এদের মধ্যে একজন প্রধান শিক্ষক, পাঁচজন সিনিয়র সহকারী শিক্ষক, ১২ জন সহকারী শিক্ষক, আটজন শিক্ষা সহকারী, একজন অফিস সহকারী, একজন এমএলএসএস ও একজন ভ্যান চালক এবং এক জন নৈশ প্রহরী রয়েছেন।

প্রতিবন্ধীদের জন্য ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে তোলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘দৌলতপুর প্রতিবন্ধী ও অটিজম বিদ্যালয়’ বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জরিত। প্রতিষ্ঠানটির ওপর সরকারের দৃষ্টি না পড়ায় এখনো কোনো প্রকার সরকারি সহযোগিতা জোটেনি। বেতন-ভাতা ছাড়াই কাজ করছেন শিক্ষকরা। সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে নিরলসভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক আবু সালেহ মজনুল কবির পান্নার সঙ্গে কথা হয় বার্তা২৪ এর। তিনি বলেন, ‘আমি সহকারী আইনজীবী হিসেবে কর্মরত অবস্থায় ২০০৮ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ববরণ করি। তখন থেকে নিজেকে পঙ্গুত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে এবং তাদের (বিকলাঙ্গ/প্রতিবন্ধীদের) কথা মাথায় রেখে তাদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করি। প্রতিবন্ধী স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করার সময় থেকে এলাকাবাসীর ব্যাপক অনুপ্রেরণা এবং সহযোগিতা পেয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোনো বেতন-ভাতা ছাড়াই শিক্ষার্থীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষক ও কর্মচারীরা। তবে বেতন-ভাতা ছাড়া কত দিন এভাবে সেবা দিতে পারবো তা বলতে পারি না।’

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Dec/25/1545720276004.jpg

তবে সরকার থেকে সহযোগিতা পেলে আরও সুবিধা হতো বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য আমাদের স্কুলটিতে শিক্ষার্থীদের আনা নেওয়ার জন্য মাইক্রোবাস, কম্পিউটার, প্রজেক্টর সাউন্ড সিস্টেম ও অনেক খেলনা প্রয়োজন। এছাড়া আরও ক্লাস রুমের দরকার। পর্যাপ্ত ক্লাস রুম না থাকায় অধিকাংশ সময় খোলা আকাশের নিচে ক্লাস নিতে হয়। বৃষ্টির সময় পাঠদানে তাদের ব্যাপক সমস্যা হয়।

অভিভাবকরা বার্তা২৪.কমকে জানান, স্কুলে যাওয়ার পর থেকে আমাদের সন্তানদের আচরণ আগের থেকে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তাদের ব্যবহার ও আচার আচরণ পরিবর্তন হওয়ায় আমরা খুশি।

বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমিন আক্তার বার্তা২৪কে জানান, বিদ্যালয়ের সকল সমস্যা নিরসনের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি সরকারি করণের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।

দৌলতপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল হক চৌধুরী বার্তা২৪কে জানান, উপজেলার মধ্যে একটিমাত্র প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় এটি। এখানে যেভাবে প্রতিবন্ধীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিয়ে এনে শিক্ষাদান করানো হয় তাতে আমি অভিভূত। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।

এছাড়া সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ এবং বিত্তশালীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

আপনার মতামত লিখুন :