বেশি ভালো ভালো না

সেরাজুল ইসলাম সিরাজ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

পঞ্চগড় থেকে: শীতের রাজধানীতে তখন ১১ ডিগ্রি তাপমাত্রা, পকেটের বাইরে হাত রাখাও দুরহ। পঞ্চগড় সুগারমিল গেটে বাসের অপেক্ষায় শরীর যেনো কুকড়ে আসতে চাইছিলো। কতক্ষণে বাস আসবে, সেই বাসে সিট পাওয়া নিয়ে ভেতরে ভেতরে টেনশন।

আরও কয়েকজন যাত্রীর উপস্থিতি টেনশন আরও বেড়ে গেলো। মিনিট দশেক পরে বিআরটিসির একটি বাসে উঠে সিট পেয়ে বেশ প্রশান্তি লাগলো। তখন বাসটিতে সবগুলো সিট পূর্ণ। পঞ্চগড় শহর ছেড়ে বোদা বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে দাঁড়াতেই  জনা বিশেক শ্রমিক পরিমরি করে উঠলে বাস ভরে গেলো। অনেকে জায়গা না পেয়ে সিটের যাত্রীর গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।

বেশ বিরক্ত বোধ হচ্ছিলো। তখন মনে হচ্ছিলো কখন লোকজন নেমে যায় তাহলে রক্ষা। প্রায় মিনিট ত্রিশেক চলার পর আসে ঠাকুরগাঁও শহর। এখানে এসে বেশিরভাগ যাত্রী নেমে যাওয়াতে অনেক সিট খালি হয়ে পড়ে। মনে মনে বেশ স্বস্তিবোধ করছিলাম। কিন্তু সেই স্বস্তিতে কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে সেটা ভাবনার মধ্যেও ছিলো না।

ঘড়িতে তখন সকাল সাড়ে ৮টার মতো। সূর্যের দেখা নেই, হালকা কুশায়ার সঙ্গে কনকনে ঠান্ডা। চাকার গতি বাড়ার সঙ্গে লক্কড়ঝক্কর বাসটিতে হু হু করে ঠান্ডা বাতাস ঢুকে কলিজায় কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছিলো। এতক্ষণে লক্ষ্য করলাম বিআরটিসির ১৯৮৬ মডেলের বাসটির কোনো জানালাতেই লক নেই। লাগিয়ে দিলে আবার ঝাঁকুনিতে ফাঁক হয়ে যাচ্ছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Dec/27/1545849769960.jpg

আগে সব সিটে যাত্রী থাকায় খুলে গেলেই লাগিয়ে দিচ্ছিলো। তাই টের পাইনি। কিন্তু যাত্রীরা নেমে যাওয়ায় খুলে গেলে বন্ধ করার লোক নেই। এবার মনে মনে যাত্রীর অপেক্ষায় থাকলাম। দেবীগঞ্জ বাস স্ট্যান্ডে এসে সেই মনোসকামনা পুর্ণ হলো। এবার বাসের যাত্রীরা কিছুটা হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। তখন মনে হলো আসলে বেশি ভালো ভালো না।

বাসটির সিটগুলোর বেহাল অবস্থা। তেল চিটচিটে সিটের কভার বেশিরভাগ ছেড়া। ভেঙে গেছে অনেক হাতল। ভেঙে যাওয়া সিটগুলো ঝালাই দিয়ে আটকে দেওয়া। চলার সময় ইঞ্জিনের কাপুনিতে দাঁড়িয়ে থাকা দায়। হেলপার হযরত আলী বার্তা২৪.কমকে বলেন, এরশাদের আমলের এই বাসটি এখনও চলছে এটাই ভাগ্যের। এরপর অনেক বাস এসেছে যেগুলো নষ্ট হয়ে ডাম্পিংয়ে চলে গেছে। বাসটির বয়স ৩০ পেরিয়ে গেছে, মাঝে মধ্যেই রাস্তায় বিগড়ে যায়।

বাসটির সামনের গ্লাসে বড় করে বরিশাল টু পঞ্চগড় লেখা দেখে বেশ অবাক লাগলো। ছোট বেলায় পঞ্চগড় থেকে রংপুর যেতে তিনটি গাড়ি পরিবর্তন করতে হয়েছিলো। আর এখন কোথায় পঞ্চগড় আর কোথায় বরিশাল। ঘণ্টায় ঘণ্টায় চলছে গাড়ি। এটা আসলে এখন ডালভাতের মতো হয়ে গেছে। দেশের সর্বোচ্চ গন্তব্য তেঁতুলিয়া থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত এক গাড়িতে যাওয়া যায়। দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের বাস এখন পায়ের নাগালে। পঞ্চগড় শহরে এনা, হানিফ ও শ্যামলী পরিবহনের এসি বাসের আসা-যাওয়া ২০০০ সালেও ছিলো অকল্পনীয়।

বাংলাদেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে এটার তার একটি জলন্ত উদাহরণ। সম্প্রতি দক্ষিণবঙ্গ সফরে সেখানে যা দেখে এসেছি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে অবাক লাগে। বরিশাল থেকে বিশাল হাইওয়ে কুয়াকাটায় গিয়ে মিশেছে। আগে যেখানে পৌঁছতে হলে প্রায় তিনটি ফেরী পার হতে হতো। যা ছিলো অনেক সময় সাপেক্ষ বিষয়।

বিকেলে কুড়িগ্রাম শহরে পৌঁছে এখানকার উন্নয়নও অবাক হওয়ার মতো। শহরের উপর দিয়ে বিশাল রোড সোনাহাট স্থল বন্দরে গিয়ে মিশেছে। ধরলার উপর শোভা পাচ্ছে সুরম্য সেতু। স্থানীয়রা জানালেন আগের সেই কুড়িগ্রাম এখন আর নেই। এখানে ন্যাশনাল সার্ভিসের মাধ্যমে সবার ঘরে চাকরি, উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নজর বদলে দিয়েছে কুড়িগ্রামকে। মঙ্গা এখন নির্বাসিত।

আপনার মতামত লিখুন :