জীবনের রঙ্গমঞ্চে পরাজিত যাত্রা শিল্পী অনুকুল

ছোট্ট একটি দো-চালা ছাপড়ার মধ্যে চা বিক্রি করে সংসার চলে এক সময় যাত্রামঞ্চ কাঁপানো অনুকুলের।

সোহেল মিয়া, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, রাজবাড়ী

যাত্রা বাঙালির জীবনের একটি গৌরবময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সাম্য মৈত্রীর আহবান প্রতিনিয়তই উচ্চারিত হয় যাত্রাপালার শিল্পীদের কণ্ঠে। অন্যায় আর অসত্যের বিরুদ্ধে সব সময় প্রতিধ্বনি হয় যাত্রার মঞ্চে।  একটা সময় যাত্রা শিল্পীদের ব্যাপক কদর ছিলো। বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তির প্রভাবে ধুকে ধুকে মরতে হচ্ছে যাত্রা শিল্পীদের।

প্রশাসনিক জটিলতা, ভীনদেশীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন আর আকাশ সংস্কৃতির অবাধ বিচরণের ফলে আজ ধ্বংসের মুখে দেশীয় যাত্রা শিল্প। এক সময় যারা যাত্রা শিল্পকে পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছিল আজ তারা অনাহারে অর্ধাহারে না খেয়ে মরতে বসেছে।

এমন এক যাত্রাশিল্পী দম্পতি রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের তেতুলিয়া গ্রামের অনুকুল চন্দ্র ও চায়না সরকার। কখনো একবেলা আবার কখনো বা না খেয়ে জীবন কাটে তাদের। সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত মানুষ এখন এরা। দারিদ্রতার কষাঘাতে জীবন সংগ্রামে জীবনের রঙ্গমঞ্চে এরা এখন পরাজিত সৈনিক। ভাগ্যেও জোটেনি সরকারি কোন সহযোগিতা।

তেতুলিয়া বাজারে সরকারি জায়গার উপর পাটকাঠি দিয়ে তৈরি ছোট একটা দো-চালা ছাপড়ার মধ্যে চা বিক্রি করে যা আয় হয় তাই দিয়ে কোন রকম সংসার চলে এক সময় যাত্রামঞ্চ কাঁপানো এই শিল্পী দম্পতির।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Feb/06/1549427965923.jpg

তেতুলিয়া বাজারে অনুকুল চন্দ্র সরকারের চায়ের দোকানে অনুকুল চন্দ্র ও চায়না সরকারের সঙ্গে কথা হয় বার্তা ২৪.কমের। আলাপচারিতায় অনুকুল সরকার আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, যৌবনটাই কাটিয়ে দিয়েছি যাত্রা পালায়। মা হলো বন্দী, আনারকলি, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা, সিঁদুর নিওনা মুছে , শাখা-সিঁদুর আলতা, সাত পাকে বাঁধা, লালন ফকীর, মা মাটি মানুষ, কাসেম মালার প্রেম, ভিখারির ছেলে, কাজল রেখা, অচল পয়সার মতো সুপার হিট যাত্রা পালায় কমেডিয়ানের অভিনয় করে অসংখ্য দর্শক-শ্রোতার মন জয় করেছি।

যাত্রা পালার মঞ্চে  সার্থক একজন  অভিনেতা হতে পারলেও জীবনের এই শেষ প্রান্তে বাস্তবতার রঙ্গমঞ্চে আমি ব্যর্থ একজন অভিনেতা। কেউ র আমাদের খোঁজ রাখেনা। ছোট এই চায়ের দোকানের উপরই আমাদের শেষ ভরসা বলে আক্ষেপ করলেন এই অভিনেতা।  

সত্তরোর্ধ্ব এই যাত্রা শিল্পী বলেন, তার বয়স এখন ৭২ বছর। এখন প্রায় না খেয়ে থাকতে হয়। প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে ৪ শ টাকা বিক্রি হয়। এর মধ্যে আবার বিদ্যুৎ বিল, বাজার পাহারার টাকা দিতে হয়। বাকি টাকার উপর নির্ভর করেই তাদের চিকিৎসা-খাওয়া ও দৈনন্দিন সব কাজ করতে হয়।  ৬৫ বছর বয়স হলে সরকার বয়স্ক ভাতা দেয়, কিন্তু আমি পাইনি।  পাব কিনা জানি না।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট দাবী অনুকুলের কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন। এগুলো হলো,  যাত্রা পরিবেশনের জন্য সহজেই প্রশাসনের অনুমতি প্রদান, যাত্রার নামে অশ্লীল ও অশোভন কার্যকলাপ বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ, শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে মাসব্যাপি যাত্রাপালার আয়োজন ও দরিদ্র শিল্পীদের সরকারি ভাতা প্রদানের ।

অনুকুল চন্দ্র সরকারের স্ত্রী চায়না সরকার বার্তা ২৪.কমকে জানান, তারা দু’জনেই একই দলে কাজ করতো। সেখান থেকেই তারা একে অপরকে ভালোবেসে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। বেশ ভালোই চলছিলো তাদের অভিনয় ও সংসার জীবন। কিন্তু হঠাৎ করে যাত্রা শিল্পের বিপর্যয় ঘটায় আজ তারা ভীষণ মানবেতর জীবন যাপন করছে। সময় পেলেই তিনি স্বামীর চায়ের দোকানে গিয়ে তাকে সহযোগিতা করেন। 

তিনি আরো জানান, বছর তিনেক আগে বড় ধরণের অসুখে পড়েছিলেন তিনি। চিকিৎসার খরচ মেটানোর জন্য তার বাবার দেওয়া বসত ভিটার ১ শতাংশ জমি ও  টিনের ঘর সহ ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন। ঘর বিক্রির পর আর আজ পর্যন্ত  কোন ঘর তারা তুলতে পারেনি। এখন তারা পাটকাঠির তৈরি বিদ্যুতবিহীন একটা কুড়ে ঘরের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী বসবাস করছেন।

অনুকুল চন্দ্র সরকারের বয়স্ক ভাতা ও সরকারি কোন সুযোগ না পাওয়ার কারণ জানতে চাইলে  বহরপুর ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নাদের আহমেদ বার্তা ২৪.কমকে জানান, ইতিমধ্যে আমি তার বয়স্ক ভাতার জন্য উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তার নিকট আবেদন করেছি। আশা করছি খুব দ্রুতই সে বয়স্ক ভাতার কার্ড পাবে। এ সময় তিনি অনুকুল চন্দ্রের নামে একটি রেশন কার্ড দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দেন।

ফিচার এর আরও খবর

মানসম্পন্ন বই

বাংলা একাডেমীর অমর একুশে বইমেলা শেষ হলে একটি পরিসংখ্যান বের হয়। তাতে কত টাকা বিক্রি হয়েছে সে তথ্য অত্যন্ত গুরুত্...

বহু ভাষার জগৎ

এ জগৎ বহু ভাষার মানুষে পূর্ণ। এ জগৎ বহু বর্ণের মানুষে ভরা। এ জগৎ বৈচিত্র্যে এক অপার ভাণ্ডার।