হালালের প্রতি ভালোবাসা

ফরিদ আহমদ
ফরিদ আহমদ, ছবি: বার্তা২৪.কম

ফরিদ আহমদ, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

অনেকের মনে থাকার কথা, নব্বই দশকের দ্বিতীয়ার্ধে অ্যারোমেটিক সাবান প্রথম ‌হালাল' সাবান হিসেবে বাংলােেদেশর বাজারে আসে। শতভাগ হালাল সাবান। বর্তমানে হালাল কসমেটিকসের জন্য বিশ্বজুড়ে যে নতুন ট্রেন্ড শুরু হয়েছে, বাংলাদেশ অনেক আগেই এই বিষয়ে ইনোভেটিভ চিন্তা করেছে। সেই সময়টাতে অ্যারোমেটিক সাবানের বিপুল চাহিদার পেছনে হালাল শব্দটিই ছিলো প্রধান কারণ।

বিশ্বজুড়ে সচেতন মুসলমান ভোক্তাদের মধ্যে হালাল বিউটি প্রোডাক্টের আগ্রহ দিন দিন বেড়ে চলছে। হালাল প্রসাধন প্রীতি কেবল মুসলিমদের মধ্যেই নয়, অমুসলিমদের মধ্যেও বাড়ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালে বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা কেবল প্রসাধনেই ব্যয় করেছে ৪৬০০ কোটি মার্কিন ডলার। ২০১৯ সালে এই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে প্রায় ২৩৪০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে হালাল প্রসাধনের জন্য। এই ট্রেন্ড আন্তর্জাতিক প্রসাধন ব্র্যান্ডগুলোকে নতুন সম্ভাবনাময় মার্কেটের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। তাদের ব্র্যান্ডিংয়ের নতুন এই মেরুকরণ আসলে বাজার বিস্তার তথা অধিক মুনাফার জন্য।

পৃথিবীর সব আসমানি কেতাবে হালাল-হারামের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। হালাল শব্দের অর্থ হচ্ছে বৈধ, উপকারী, কল্যাণকর বস্তু এবং কাজসমূহ। আর হারাম শব্দের অর্থ হচ্ছে ক্ষতিকর, অবৈধ, অকল্যাণকর কাজ ও বস্তুসমূহ। হালাল বিধান পালনেই রয়েছে আমাদের আত্মার ও দেহের কল্যাণ এবং বিবেক-বুদ্ধির সুস্থতা।

হারাম পরিহার করলে বিনিময়ে তার চেয়ে বেশি উত্তম কিছু যে পাওয়া যায় মানুষ তার জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে তা অবশ্যই উপলব্ধি করতে পারে। ধর্মীয় বিধান মোতাবেক কোনো বস্তু বা কাজ অবৈধ হিসেবে প্রমাণিত না হলে সব কিছুই বৈধ। জগতের বুকে সব সৃষ্টজীব, সৃষ্টি, আবিষ্কার, উদ্ভাবন, আসবাব মূলগতভাবে বৈধ। ইমাম সুয়ূতি বলেন, ‘বস্তুর ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো বৈধ।’ -আল আশবাহ লিস সুয়ূতি: ১৩৩

বিশ্বব্যাপী হালাল পণ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ার সাথে সাথে হালাল কসমেটিকস নিয়ে আমরা যতোটা মাথা ঘামাচ্ছি, ব্যক্তিগত জীবনে হালাল উপার্জন এবং হারাম আয় ও ব্যয় থেকে বেঁচে থাকা বা দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে সততার বিষয়ে আমরা ঠিক ততোটা মাথা ঘামাচ্ছি না। আমাদের জন্য হালাল খাবার যতটা বাধ্যতামূলক, হালাল প্রসাধনী ব্যবহার যতটা উত্তম; সৎকর্মের বিষয়ে ঠিক ততোটা বা তার চেয়েও বেশি তাগিদ রয়েছে।

আমাদের সবার উচিত সর্বদা হালাল বা বৈধ পথ, পেশা ও পদ্ধতি অবলম্বন করে হালাল উপার্জন করা। শুধুমাত্র হালাল পথ অবলম্বনের মাধ্যমেই ইহজাগতিক ও পরজাগতিক প্রশান্তি ও সমৃদ্ধি লাভ করা যায়।

বিশ্বনবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং উত্তম পন্থায় জীবিকা অন্বেষণ করো। যা হালাল তাই গ্রহণ করো এবং যা হারাম তা বর্জন করো।’ -ইবনে মাজা: ২১৪৪

সৎ, আদর্শগত বাস্তব চিন্তা ও কর্মের মাধ্যমে সকলের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে হবে। সামষ্টিক পর্যায়ে প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা হলে ব্যক্তির প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকে না। আল্লাহতায়ালা কোরআনে কারিমে বলছেন, ‘সে সমস্ত লোক যারা রাসূল (সা.)-এর আনুগত্য করে, যিনি উম্মী নবী, যার সম্পর্কে তারা নিজেদের কাছে থাকা তাওরাত ও ইঞ্জিলে লেখা দেখতে পায়, তিনি তাদেরকে সৎকর্মের নির্দেশ দেন, অসৎকর্ম থেকে বারণ করেন; যাবতীয় পবিত্র বস্তু তাদের জন্য হালাল ঘোষণা করেন ও হারাম বস্তুসমূহকে করেন নিষিদ্ধ এবং তাদের ওপর থেকে সে বোঝা নামিয়ে দেন এবং বন্দীত্ব অপসারণ করেন যা তাদের ওপর বিদ্যমান ছিল। সুতরাং যেসব লোক তার ওপর ঈমান এনেছে, তার সাহচর্য অবলম্বন করেছে, তাকে সাহায্য করেছে এবং সেই নূরের অনুসরণ করেছে যা তার সঙ্গে অবতীর্ণ করা হয়েছে, শুধুমাত্র তারাই নিজেদের উদ্দেশ্য সফলতা অর্জন করতে পেরেছে।’ -সূরা আরাফ: ১৫৭

কবি ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্তের নৈতিক শিক্ষামূলক কবিতা ‘কে?’ এর মতো রাইম স্কুলের পাঠ্যবইয়ে অধুনা অন্তর্ভূক্ত আছে কিনা জানি না। ‘বল দেখি এ জগতে ধার্মিক কে হয়,/সর্ব জীবে দয়া যার, ধার্মিক সে হয়। ....বল দেখি এ জগতে বিজ্ঞ বলি কারে,/হিতাহিত বোধ যার, বিজ্ঞ বলি তারে।....বল দেখি এ জগতে সাধু বলি কারে,/পরের যে ভালো করে, সাধু বলি তারে।/বল দেখি এ জগতে জ্ঞানী বলি কারে,/নিজ বোধ আছে যার, জ্ঞানী বলি তারে।’ আমরা সবাই ধার্মিক, বিজ্ঞ ও সাধু হতে চাই। হতে চাই জ্ঞানী ও সাদা মনের মানুষ। তাই প্রার্থনা- আমাদের হৃদয় ভরে উঠুক হালালের প্রতি ভালোবাসার নির্যাসে।

ফরিদ আহমদ: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এপ্রোপ্রিয়েট টেকনোলজির (আইএটি) সহকারী অধ্যাপক।

আপনার মতামত লিখুন :