ধানের দেশ ছেড়ে মরণ সাগরে ভাসি কেন?



প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম/ ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম/ ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এখন দেশে ধানের দাম কম, অনেকের ঘরে ভাত আছে। তবে কেন মরণপণ করে অবৈধপথে দেশান্তরী হতে চাই? কোন দু:খে, কেন চোরাই পথে এই সবুজ-শ্যামল ভূমি, সোনালি ধানের দেশ ছেড়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মরণ সাগরে ভাসি? সীমান্তে কাঁটাতার আছে, দু’দেশের পাহারাদার আছে। এয়ারপোর্টে পাসপোর্ট-ভিসা দেখে কঠিন নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করা হয়। তারপরেও ওরা অবৈধপথে সীমান্ত পার হয় কিভাবে?

তিউনিশিয়ার সাগর সীমান্তে ৬৪ জন বাংলাদেশি ক’দিন ধরে সাগরে ভাসার সংবাদ প্রসঙ্গে একজন তীর্যক স্বরে জানালেন- দেশে ভাত আছে, তবে ভালো কাজের অভাব প্রকট। যাদের কাজ আছে তাদের কষ্ট করে কাজ করার মানসিকতা নেই, তাই এদের কারো কারো সুখ-শান্তি নেই। সেজন্য পাসপোর্ট ছাড়াই পাইলট-ইমিগ্রেশন পার হয়ে বিদেশ চলে যায়। ইয়াবা সম্রাটের দেশের বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ হলেও মক্কায় ওমরাহ করতে দেখা যায়। ফেরারি রাজনৈতিক নেতাকে সীমান্তের ওপারে শিলং এর পথে ঘুড়তে দেখা যায়। আবার একজন ওসিকে দেশেই খুঁজে পেতে কষ্ট হয়। এদেরকে বিদেশে পালিয়ে যেতে দেয় কে বা কারা? নিশ্চয়ই সেটা ঘুষ-অথবা স্বজনপ্রীতি? পথে পথে অবৈধভাবে ছেড়ে দেয়ার সুযোগসন্ধানীরা সবসময় ওঁৎ পেতে আছেই। তা না হলে ধানেভরা সোনার দেশ ছেড়ে বার বার মরণ সাগরে ভেসে বিশ্বগণমাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছি কোন দু:খে?

এতে কি জাতি হিসেবে আমাদের বৈশ্বিক মান-মর্যাদা কমে না? ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে যাবার সময় সাগরের ওপারে দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে ক্রিকেটের জয়ে আমরা যখন উল্লাস করছি অন্যদিকে এপারে তখন আফ্রিকার আরেকটি দেশ তিউনিশিয়ার সমুদ্র জলসীমায় মিসকিন শরণার্থী হয়ে ভেসে মৃত্যুর প্রহর গুণছি- এটা আমাদের জন্য চরম অমর্যাদাকর।

সেজন্য সীমান্তে ও বিমানবন্দরে যারা অবৈধ অর্থ লেনদেন করে ওদেরকে সীমান্ত পার করার সুযোগ করে দেয় তাদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা দরকার। কারণ, চারদিকে তাদের অনৈতিকতার চর্চা, অদৃশ্য আয় ও অবৈধ অর্থ ব্যয়ের বাহারি ফুটানি আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা ও দেউলিয়াত্বকে প্রকাশ করে। এসব দুর্নীতিবাজদের জন্য আমরা বিশ্বদরবারে কেন বার বার হেয় প্রতিপন্ন হব?

এখানে ব্যক্তিমানুষের মর্যাদা নাই আবার সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার ভয় আছে পদে পদে। তাই বড় বড় ব্যাংকার, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার সবাই ভিসার জন্য উন্নত দেশের দূতাবাসে অফিসের কাজ ফেলে লাইন দেন।

আর একটা দিক হলো- এখানে অনেকেই রাজনৈতিক লেবাস লাগিয়ে কাজে ফাঁকি দিয়ে ফুটানি দেখানোর সাহসই শুধু করেন না-অন্যের কাজ করার স্বাধীনতার ওপরও অযাচিত হস্তক্ষেপ করেন। বিশ্বের মহান রাজনৈতিক নেতারা ছিলেন ত্যাগী ও নির্লোভ। তাদের ধন-সম্পত্তি তেমন ছিল না। তারা জ্ঞান-বুদ্ধি, বিবেক দিয়ে মানুষের কল্যাণ করতেন। বিন্তু এখনকার যুগে বিশ্বের বড় ব্যবসায়ীরাই বড় দেশের রাজনৈতিক নেতা বনে গেছেন। কারণ, টাকা ছাড়া রাজনীতি করা যায় না। সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে- বাংলাদেশেও শতকরা আশিভাগ রাজনীতিবিদ ও সাংসদ ব্যবসায়ী।

নানা কারণে দেশে ভাতের আবাদ হলেও তার সঠিক সংরক্ষণ ও সুষম বণ্টন নেই। আবাদিরা ক্ষতিগ্রস্থ ও হতাশ। একজন প্রান্তিক ধানচাষীর বার্ষিক উৎপাদন ও আয় আর একজন ছোট চাকুরীজীবীর বার্ষিক আয়ের মূল্য ও ব্যবধান অতি চরম। এই ধরনের আর্থিক ব্যবধান ও বৈষম্যের কাছে কল্যাণ অর্থনীতির সূত্র গোলমেলে হয়ে পড়েছে। এছাড়া আছে লাগামহীন দুর্নীতির সুযোগ। এছাড়া শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজের অভাব রয়েছে। তাইতো সবকিছু ভুলে, সবাইকে ফেলে অবৈধভাবে দেশান্তরী হয়ে মরণসাগরে ভাসতে দ্বিধা নেই!

এজন্য কেউ কেউ ভিটে-মাটি সহায় সম্বল বিক্রি করে হলেও বিদেশ যেতে চায়। বিদেশে পাড়ি জমানোর এই হিড়িক দেখে সুবিধাবাদী দালাল শ্রেণি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এদের কেউ মানব পাচার করে, কেউ পাচারে সহায়তা করে লাভবান হবার ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। এই ব্যবসা দেশের সংসদ থেকে শুরু করে গ্রামের ভাঙ্গা কুঁড়েঘর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। এজন্য একদিকে সাংসদ, অন্যদিকে ফেলানীরা অবৈধভাবে সীমান্ত পেরুনোর সুযোগ পায়। দুর্ভাগ্য হলো-মহারথীরা পার পেলেও ফেলানীদেরকে গুলি খেয়ে কাঁটাতারে ঝুলতে হয় অথবা অথৈ সাগরে ডুবে মরতে হয়!

তবে এখন কেউ আর দেশে বড় দু:খের কারণে সখিনাকে দুবাই যেতে পীড়াপীড়ি করে না। সখিনারা নিজেই সুখের আশায় দুবাইয়ে পাড়ি জমাতে চায়। কারণ, ঘরে ধান থাকলেই ধনী হওয়া যায় না, দাম না থাকায় সোনার ধান ফলানোর পরেও হতাশা-কষ্ট কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।এর অর্থ হলো- দেশে ভাল কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। মানুষের ব্যক্তিমর্যাদার যথার্থ স্বীৃকতি ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। সামাজিক বৈষম্য কমাতে অদৃশ্য ও অবৈধ আয়ের মানুষদের সম্পদের সঠিক জরিপ করে ও তা নিরুপণ করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এরা দেশের কর প্রদান করতে গেলে ধরা পড়তে পারে তাই সঠিক পরিমাণ কর দেয় না অন্যদিকে ধর্মীয় ও নৈতিকতাবোধ না থাকায় যাকাত প্রদানেও বিরত থাকে। তাই এদের দ্বারা রাষ্ট্রের আর্থিক কোন মর্যাদা বাড়ে না, দরিদ্র মানুষের কল্যাণও হয় না।

দেশে যাদের বড় চাকরি আছে তারা কেন সেটা ছেড়ে দিয়ে একবারে বিদেশে যাবেন? দেশের একজন ব্যাংকের এজিএম কেন চাকরি ফেলে কানাডায় গিয়ে স্বল্প বেতনে আবাসিক ভবনের দারোয়ানগিরি করবেন- এ যুক্তি মাথায় আসে না। দেশে অসহনীয় যানজট, সড়ক দুর্ঘটনা ও যথাযথ চিকিৎসা সুবিধা না থাকার বিষয়টি অনেকে মেনে নিতে পারেন না। লাগামহীন দুর্নীতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন পিছু ছাড়ছেই না।

এদিকে অস্ট্রেলিয়া ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আই.ই.পি-র প্রতিবছরের মতো এবারের রিপোর্টে প্রকাশ- ২০১৮ সালে বিশ্ব শান্তি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৯২-তে থাকলেও ২০১৯ সালের জুনে এসে তা ৯ ধাপ পিছিয়ে ১০১তম হয়েছে। বিশ্ব শান্তি সূচকে এক বছরে নয়ধাপ অবনমন আমাদের দেশের জন্য ভয়ংকর অশনি সংকেত। মানুষ আসলে শান্তির আশায় হন্যে হয়ে বিদেশে ছুটে যেতে চায়। তাইতো দেশের সব মানুষের স্বাচ্ছন্দ্য ও শান্তিতে বসবাসের জন্য কর্মসূচি নিয়ে আজকেই ভাবনা শুরু করা দরকার ।

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

   

উৎসব-আবেগ, উন্নয়নের সুফল ও আমাদের মনোবৃত্তি



আশরাফুল ইসলাম পরিকল্পনা সম্পাদক, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রচলিত একটি কথা আছে, সুখের দিনে আমরা পেছনের স্মৃতিকে দ্রুতই ভুলে যাই। আবার আমরা যত পেতে থাকি আমাদের প্রত্যাশাও ততই বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক দশকে আমূল বদলে যাওয়া প্রযুক্তিগত ও যোগাযোগ অবকাঠামোর কথা উল্লেখ করলে উপরের কথার সারমর্ম বোঝা কঠিন হবে না।

উৎসবপ্রিয় বাঙালির আবেগের ঘনঘটা দেখা যায় প্রধান উৎসবের সময়গুলোতে। জনসংখ্যাধিক্যের বিচারে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ায় ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাতেই যে রাজধানী বা অন্য শহর থেকে জনস্রোত দেশের গ্রাম অভিমুখে দেখা যায় তাই নয়; বছরের কোন সময়ে লম্বা ছুটি পেলেও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য বাঙালিআবেগ লক্ষ্য করার মতো। যা বিশ্বের অন্য কোথাও দেখা যাবে কিনা তা অনুসন্ধানের বিষয়।

প্রায় দুই দশকের মতো রাজধানী থেকে উৎসবের সময়ে গ্রামে যাওয়ার এই স্রোতে শামিল হয়ে নানা রকম অভিজ্ঞতার সঞ্চয় হয়েছে। যেটি বেশ প্রমাণিত সত্য-তা হচ্ছে, এখানকার বাঙালি আবেগ চরিতার্থ করতে উৎসবপ্রিয় মানুষেরা যে কোন ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। এর প্রমাণ মিলবে অন্তত কয়েক দশক ধরে ঈদের কয়েক দিন আগে বা পরের ঈদযাত্রা নিয়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত ছবিগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে। সংবাদপত্রের আলোকচিত্রীদের মধ্যে ঈদে ঘরমুখো মানুষদের ছবি তোলার একরকম প্রতিযোগিতা চলে। কে সবচেয়ে বেশি ঝুলন্ত মানুষদের ছবিটি তুলে আনতে পারল!

এবারও যে ট্রেনে বা অন্য যানবাহনে ঝুলে কিছু মানুষ বাড়ি ফেরেনি তা নয়, কিন্তু ঈদে ঘরে ফেরা মানুষদের চিরায়ত যে চিত্র গত কয়েক দশক লক্ষ্য করে এসেছি-তা বোধহয় আর খোঁজে পাওয়া যাবে না। আমরা লক্ষ্য করেছি, গেল এক-দেড় দশকে দেশের যোগাযোগ অবকাঠামোর যে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তা প্রতিটি জনপদকে রাজধানীর সঙ্গে সহজ যোগাযোগ নেটওয়ার্কের আওতায় এনেছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহসহ দেশের অনেকগুলো মহাসড়কই বেশ কয়েক বছর আগেই চার লেনে রূপান্তরিত হয়েছে। আলোচিত যোগাযোগ অবকাঠামো পদ্মাসেতুও দৃশ্যমান বাস্তবতা, ২০২২ সালের ২৫ জুন থেকেই পুরো দক্ষিণবঙ্গকে এই সেতু সহজ যোগাযোগ নেটওয়ার্কে নিয়ে এসেছে। এছাড়া অগণিত বৃহৎ যোগাযোগ অবকাঠামো মানুষের যাতায়াতকে করেছে অনায়াসসাধ্য।

এবারের ঈদযাত্রার অভিজ্ঞতা ছিল অতীতের সবগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কর্মস্থল রাজধানীর বাংলামটর থেকে আমার গ্রাম গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার শিমুলতলার দুরত্ব (গুগল ম্যাপ অনুযায়ী) ৭৪.৫ কিলোমিটার। রাজধানী সংলগ্ন শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত এই জনপদে যেতেও ঈদ মৌসুমে সময়ভেদে ৫-৬ ঘন্টা পথেই আটকে থাকা যেন অবধারিত হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের যানবাহনের মিলনস্থল আবদুল্লাহপুর আর গাজীপুর চৌরাস্তা হওয়ায় রাজধানী থেকে বেরুনোর এই দুই প্রবেশপথে ২-৩ ঘন্টা একই স্থানে আটকে থাকতে হতো।

এবার পরিস্থিতি কিছু স্থানে পাল্টেছে। বিশেষ করে রাজধানীর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও গাজীপুরপ্রান্তে বিআরটি প্রকল্পের সুফল এবারের ঈদে ব্যাপকভাবে পেয়েছে মানুষ। যার জন্য রাজধানীর প্রবেশপথের যানজট অনেকটাই এড়ানো গেছে এবার। সড়ক দুর্ঘটনার হারও কমেছে। যদিও ঈদের দিন দুপুরে শ্রীপুর থেকে মাত্র ১ ঘন্টায় গন্তব্যে পৌছে, জানতে পারলাম সদরঘাটে রশি ছিড়ে লঞ্চের ধাক্কায় একই পরিবারের ৩জনসহ মোট ৫ জনের মৃত্যুর খবর। আনন্দের ঈদ যাত্রার মাঝে বিষাদের ছায়া নিয়ে এল এই খবর।

তবে উন্নয়নের সুফল ভোগের সঙ্গে আমাদের নাগরিকদের একথাও মনে রাখা উচিত যে, আমাদের অতীতটা কেমন ছিল। প্রত্যাশা আমাদের থাকতেই হবে, এটি মানবমনের এক অনুষঙ্গ। স্বপ্ন না থাকলে যেমন আমরা এগিয়ে চলি না, বলা হয়ে থাকে মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। কিন্তু সাম্প্রতিক বাংলাদেশের বিশাল সব উন্নয়নযজ্ঞ বাস্তব রূপ নেওয়ার সঙ্গে আমাদের নাগরিকদের মন-মানসিকতারও পরিবর্তন আসা উচিত। মনের সংকীর্ণতাকে সরানো না গেলে আমাদের প্রকৃত উন্নয়ন হবে না।

অন্ততঃ গেল কয়েকটি বছর প্রবীণ অনেক নাগরিকদের কণ্ঠেই শুনতে পাই, জীবদ্দশায় এমন উন্নয়ন দেখে যেতে পারা তাদের কাছে রীতিমতো বিস্ময়কর! তবে নাগরিকদের কেউ কেউ আবার এই উন্নয়নের সুফল ভোগ করলেও তা স্বীকার করতে কার্পণ্য করেন, সমালোচনায় মুখর হন। এই প্রবণতাও কম মানুষ পোষণ করেন না।

যে উন্নয়নের সুফল জনগণ ভোগ করে, দেশের অর্থনৈতিক গতি-প্রবাহ বাড়ে তা নিঃসন্দেহে প্রণিধানযোগ্য সাফল্য। সকল সরকারেরই সমালোচনার ঢের বিষয় থাকবে। এই সরকারেরও আছে নিশ্চয়ই। কিন্তু উন্নয়ন সাফল্য স্বীকার করতে কুণ্ঠিত হওয়া উচিত নয়। ভারতবর্ষের মুঘল শাসক শাহ জাহান তাঁর প্রিয়তমাপত্নী মুমতাজ মহলের স্মৃতি ধরে রাখতে সমাধিসৌধ তাজমহল নির্মাণে রাজকোষ প্রায় খালি করে ফেলেছিলেন বলে ইতিহাসে লেখা আছে। সেই বিশাল নান্দনিক স্থাপনা বিশ্বের পর্যটকদের আকৃষ্ট করলেও সেই সময়ের জনগণের তা কি কাজে লেগেছিল সেই প্রশ্নও রয়েছে। প্রশ্ন আছে জনহিতের চেয়ে হিন্দুস্থানের শাহেনশাহ ব্যক্তিগত আকাঙ্খাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

সেই বিচারে আমরা সাম্প্রতিক দশকে বাংলাদেশের বৃহৎ সব যোগাযোগ অবকাঠামো জনকল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে-এনিয়ে কোন সংশয় নেই। উন্নয়নের নানা মানদণ্ডে আলোচনা-সমালোচনা সমকালীন শাসকদের নিয়ে করাই যাবে। বলতে গেলে কেউই তা এড়াতে পারেন না এই সমালোচনা কিন্তু উন্নয়নে জনগণের স্বস্তির ইতিবাচক দিকটিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

বাংলাদেশের আমূল বদলে যাওয়া তখনি পুরোপুরি সম্ভব হবে, যখন বস্তুগত উন্নয়নের সঙ্গে মানুষের মনেরও উন্নয়ন ঘটবে। মনের উন্নয়নের এই আকাঙ্খায় আমরা এখনও অনেক পিছিয়েই আছি বলা যায়।

কবি অতুল প্রসাদের ভাষায় বলতে হয়, ‘আছে তোর যাহা ভালো/ফুলের মতো দে সবারে/নইলে মনের কালো ঘুচবে নারে’।

 

;

বিশ্বব্যাংকের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস, বাস্তবতা ও অর্থনীতি মূল্যায়ন



ড. মোঃ আইনুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ওয়াশিংটনভিত্তিক ঋণদাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক বলছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, আমদানি বিধি-নিষেধ এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতার কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে (সরকারি লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৭ শতাংশ)। সংস্থাটির মতে, গত জানুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হওয়ায় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমে এলেও দৃষ্টিভঙ্গিতে নেতিবাচক ঝুঁকি রয়ে গেছে। এ ছাড়ামুদ্রা ও বিনিময় হার সংস্কারে অগ্রগতি পর্যাপ্ত না হওয়ায় রিজার্ভ আরও কমতে পারে, মূল্যস্ফীতিও আরও বাড়তে পারে এবং তারল্য সংকট ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশেশের আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে রাজস্ব ঘাটতি, সম্ভাব্য আর্থিক দায় ও ঘাটতি নগদীকরণ। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে বর্তমানে চার ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক খাতের ঝুঁকি। ক্রমাগত মূল্যস্ফীতি বেসরকারি কেনাকাটায়ও প্রভাব এবং জ্বালানি ও আমদানি উপকরণের ঘাটতি সৃষ্টি করতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের এসব মূল্যায়ন উঠে এসেছে ২ এপ্রিল প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট বা বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ’ প্রতিবেদনে। এতে আরও বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে রেজুলেশন ফ্রেমওয়ার্ক প্রয়োজন। এ জন্য বড় ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান পর্যালোচনা, খেলাপি ঋণ কমাতে আইনি কাঠামো, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর করপোরেট সুশাসন বাড়ানো ও দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য দ্রুত সংশোধন কর্মসূচির মতো বিধানগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। বিশ্বব্যাংক মনে করে, বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারে সরকারের বড় বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নে সহায়তার প্রয়োজন। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য মন খারাপ করা মূল্যায়ন করা হলেও সংস্থাটি আশাবাদ প্রকাশ করে বলেছে, সঠিক আর্থিক নীতি, বিনিময় হার ও আর্থিক কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়িত হলে মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ক্রমশ বাড়তে পারে বলে। সংস্থাটির মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা আছে, যা কোভিড-১৯ মহামারি থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় বাংলাদেশের অর্থনীতি তার শক্তিমত্তা দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এখন বাংলাদেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান, মজুরিও অনেকটা একই জায়গায় আটকে আছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রবৃদ্ধি নিয়ে এই পূর্বাভাস এবং অর্থনীতি নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করাকে মূলধারার বাইরের অনেক অর্থনীতি বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষক অনেকটা শাপের দংশন ও ওঝার ঝাড়ফুকের সঙ্গে তুলনা করছেন। তাদের মতে, বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ ও নীতি পরিকল্পনা অনুসরণ করেই বাংলাদেশ অর্থনীতির অনেক কিছু প্রণীত হয়েছে, নির্ধারিত হয়েছে। বাংলাদেশ তাতে যত না বেশি উপকৃত হয়েছে, তার চেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে। বিশ্লেষকদের এই অভিমত নিয়ে আলোচনার আগে আইএমফ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রবৃদ্ধিবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা প্রয়োজন। গত বছরের ৯ অক্টোবর এক পূর্বাভাসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংশোধন করে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনে,যা এর আগে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল।

তবে ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসের হালনাগাদ তথ্যে সংস্থাটির অক্টোবরে করা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস শূন্য দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়িয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ নির্ধারণ করলেও বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলেনি। ২০২৫ সালের জন্যেও সংস্থাটি একই পূর্বাভাস দেয়। অন্যদিকে ১৭ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশিত মুদ্রানীতিতে অর্থনীতিতে চলমান চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য জিডিপি পূর্বাভাস ৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছিল। আইএমএফের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার পর বাংলাদেশ ব্যাংকও প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস কমানোর ঘোষণা দেয়।

মূলধারার বাইরের অর্থনীতি বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বিশ্বব্যাংক তার সর্বশেষ হালানাগাদ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে যেসব মূল্যায়ন করেছে, তার অনেক কিছুর সাথে সহমত পোষণ করার সুযোগ রয়েছে। খেলাপি ঋণ, ব্যাংক ব্যবস্থা, মুদ্রানীতি নিয়েও ভালো ভালো কথাবলা হয়েছে। এসবের অনেক কিছু সত্যি। কিন্তু এসব বাংলাদেশের অনেক পুরোনো সমস্যা। অনেক আগেই সরকারকে স্বপ্রণোদিত হয়ে এসব সমস্যা দূর করা উচিত ছিল।কেননা বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন প্রকৃত অর্থেই নানামাত্রিক সংকটে রয়েছে। কিন্তু বিশ্বব্যাংক যেভাবে ‘হায় হায়’ অবস্থা তুলে ধরছে, অর্থনীতি সম্ভবত একেবারে তেমন অবস্থায় নেই। অযাচিত হস্তক্ষেপ না করলে বাংলাদেশ এই সমস্যা থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসবে।

কারণ, এসব সংকটের পেছনে সরকারের কিছু ভুল নীতি ও বাংলাদেশের সংখ্যাস্বল্প প্রচণ্ড পূজিলোভী মানুষের কার্যকলাপের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক-আইএমফের দীর্ঘদিনের নীতি-পরিকল্পনারও অনেক দায় আছে। যেমন মূল্যস্ফীতি বিষয়ে সংস্থাটির সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে এবং এতে দরিদ্র মানুষ খুব চাপে থাকবে ইত্যাদি। প্রয়োজনের জায়গায় ক্রমাগত ভতুর্কি তুলে দেওয়ার চাপ দিয়ে, অপ্রয়োজনীয় ভতুর্কির বিষয়ে চুপ থাকলে এবং প্রয়োজনের জায়গায় সংস্কার করতে না বলে সরকারকে বেকাদায় ফেললে মূল্যস্ফীতি তো অবশ্যই বাড়বে। বিশ্বব্যাংক বলছে, খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে রেজুলেশন ফ্রেমওয়ার্ক করতে হবে, বারবার ঋণখেলাপিদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব কথা বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদরা একদশক আগে থেকেই উচ্চকণ্ঠে বলে আসছেন। এখন চারিদিক থেকে শোরগোল জোরদার হওয়ায় বিশ্বব্যাংকও এতে শামিল হয়েছে।

আসলে আইএমএফের কাছ থেকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি এবং আরও কিছু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণ নেওয়ার পর থেকে বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীরা (বিশ্বব্যাংক-আইএমফের ভাষায় তারা দাতা সংস্থা) যেভাবে বাংলাদেশকে চেপে ধরেছে, দেদারছে সংস্কারের চাপ দিচ্ছে; তাতে প্রয়োজনীয় অনেক কাজই বাদ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে করে সংকট আরও ঘণীভূত হতে পারে। বিশ্বব্যাংক এখন বাংলাদেশে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি আরও কঠোর করার পরামর্শ দিয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিত্যপণ্যের শুল্ক আরও কমানোরও কথা বলছে। মুদ্রানীতিতে দুর্বলতা রয়েছে, এ কথা অনস্বীকার্য। কিন্তু এসব মুদ্রানীতির দুর্বলতা তো অতীতের জাতীয় বাজেট প্রণয়ন ও মুদ্রানীতি প্রণয়নের সময় মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যালয়ে অযাচিতভাবে প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে বিশ্বব্যাংক, আইএমফ ও ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত চাপের মাধ্যমেই প্রণীত হয়েছে। আমদানিতে কম শুল্কের পাশাপাশি ছাড় দিয়েও তো মুনাফাকামী ব্যবসায়ীদের বাগে আনা যাচ্ছে না। এদের বাগে আনার কৌশল নিয়ে বিশ্বব্যাংক কোনো কথা বলছে না।

এদিকে গত বছর আইএমএফ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সঙ্গে এক বৈঠকে জানতে চেয়েছিল, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বারবার নির্ধারণ করতে পারবে কি না। জবাবে বিইআরসি বলেছিল, আইন সংশোধন করা হয়েছে। ফলে কেউ আবেদন করলে তা করার সুযোগ আছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া (ক্যাপাসিটি পেমেন্ট) নিয়েও সংস্থাটি কথা বলেছিল। কিন্তু পরে দেখা যায়,গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বারবার নির্ধারণের বিষয়টি কার্যকর হয়েছে। কিন্তু বসিয়ে বসিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়টি আগের অবস্থাতেই রয়ে গেছে। এমনটাই হওয়ার কথা। কারণ অতীত ইতিহাস বলে, নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর জন্য সুবিধাজনক কোনো বিষয়ে দৃষ্টিগ্রাহ্য বা শক্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার বা চাপ সৃষ্টি এসব সংস্থা সন্তর্পণে এড়িয়ে চলে। এর মূল কারণ, উদার বাজারব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষকতাকারী আন্তর্জাতিক এসব উন্নয়ন সংস্থার মতাদর্শ ও কর্মকা-ের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীই তো সমাজের গুটিকয় মানুষের স্বজনতোষী এসব শ্রেণি-ই, যাদের কারণে সরকারের নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো চাপের মধ্যে রয়ে গেছে।

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের চাপে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ঘোষণার পর থেকেই বাংলাদেশে হু হু করে বেড়েছে দ্রব্যমূল্য। কিছুদিন আগেও বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম সমন্বয়ের নামে বাড়ানো হয়েছে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে। আসলে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ অনুরূপ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরামর্শকদের কথা শুনে নিও-লিবারেল প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়ন করলে পরিণতি এমনটাই হয়। এমনটা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অতীতে দেখা গেছে। বাংলাদেশের প্রয়োজন সংবিধানে বিধৃত নির্দেশনা অনুযায়ী বৈষম্য হ্রাসকারী দেশজ উন্নয়নদর্শন গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। কিন্তু বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ এই নীতির ঘোর বিরোধী। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ^ব্যাংক-আইএমএফের চাপ ও ব্যবসায়নির্ভর শাসন ব্যবস্থা পরোক্ষ কর বা ভ্যাট বেশি করাকেই পছন্দ করে। কারণ ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে সবাইকেই একই দ্রব্যের ওপর একই হারে অন্যায় ও সবচেয়ে নিকৃষ্ট এই কর দিতে হয়। এতে করের ভিত্তি প্রশস্ত হয়। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো চলে; আরো ঋণ দেওয়া যায়, ফেরতও পাওয়া যাবে। কিন্তু শেষপর্যন্ত এতে যে দেশ ও সমাজে বৈষম্য বাড়ে, ক্ষতিগ্রস্ত হয় ধনী ছাড়া সবাই; তাতে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের কোনো কিছু আসে-যায় না। আর এ জন্যেই বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ অর্থনীতির নানা দিক তুলে ধরলেও কখনো বৈষম্য নিয়ে বিন্দুমাত্র শব্দ করে না।

এরা কখনো সরকারকে প্রশ্ন করে না যে বাংলাদেশে ধনী-অতিধনীরা কত আয় করে, আর কত আয়কর দেয়। কোনো দিন প্রশ্ন করে না যে বাংলাদেশে বছরে কত ঘুষ লেনদেন হয়, দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীদের বছরে কী পরিমাণ কর-শুল্ক দেওয়ার কথা আর কী পরিমাণ আদায়ই বা হয়। কোনো দিন সরকারকে এরা জিজ্ঞেস করে না, বাংলাদেশে বছরে কী পরিমাণ সম্পদ কর আহরিত হওয়ার কথা, আর কী পরিমাণ হয়। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ৫২ বছরে কোনো দিন বিশ্বব্যাংক জিজ্ঞেস করেনি যে, বাংলাদেশে কালোটাকার পরিমাণ কত আর অর্থ পাচার হয় কত। কোনো দিন এরা বলবে না যে, ব্রিটিশ উপনিবেশ প্রভুদের প্রায় ২০০ বছর শোষণ, পাকিস্তান উপনিবেশ প্রভুদের ২৪ বছর শোষণ এবং বিশ^বাজারে মুক্তবাজার বিশ^ায়নের অন্যায্যতার ফলে বিগত ৫০ বছরে আমরা যেভাবে ঠকেছি, তার প্রতিকার কী কিংবা কীভাবে বৈশ্বিক প্লাটফর্মে এসব বিষয় তুলে ধরে বাংলাদেশ উপকৃত হতে পারে।

বিশ্লেষকেরা বলেন, বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ-ভূমিকা ও পূর্বাভাস সবকিছুই যে মন্দ, তা নয়। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের স্বদেশজাত উন্নয়ন দর্শন বাস্তবায়ন করতে না পারায় বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের ঋণে আসলে তাদের তেমন কোনো উন্নতি হয় না, উপকার হয় না। তারা ঋণের দুষ্টচক্রেই আটকে থাকে। ফলে খবরদারী করা সহজ হয়। আর এর জন্য বিশ্বব্যাংকের নানা দ্বিচারী ভূমিকা ও কার্যকলাপই দায়ী। অথচ ৮০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক সৃষ্টির মূল লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ দূর করা। কিন্তু বিশ্বে দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ আদৌ কমেছে? ফিলিস্তিনে মানব ইতিহাসে প্রথবারের মতো মনুষ্যসৃষ্ট মতো দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। কিন্তু সংস্থাটি এ নিয়ে এখন পর্যন্ত একটি শব্দ উচ্চারণ করেনি। শুধু বলেছে ২০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, ভবিষ্যতে বিপুল পরিমাণ ঋণ লাগবে। বিশ্বব্যাংকের ওয়েবসাইটে সব দেশকে দেওয়া ঋণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হলেও ইসরায়েল-সম্পর্কিত কোনো তথ্যই পাওয়া যায় না।

এমনকি গত বছর ৯ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্টের পরামর্শে বিশ্বব্যাংক উগান্ডাকে সমকামিতাবিরোধী আইন পাস করায় প্রতিশ্রুত ঋণ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এ রকম নানা দ্বিচারী কার্যকলাপের ইতিহাস বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের আছে। অথচ বাংলাদেশেরও বিশ্বব্যাংকে মালিকানা রয়েছে, প্রতিবছর চাঁদা দিয়ে সংস্থাটির তহবিল বৃদ্ধি করে থাকে এবং সংস্থাটির কাছ ঋণ নিলেও আসলসহ বিপুল পরিমাণ সুদসহ পরিশোধ করে। আর সংকটের সময় ঋণ চাইলেই নানা তোড়জোড় শুরু করে, সংস্কার কর্মসূচি চাপিয়ে দেয়। এখানে উল্লেখ্য, মূলত মার্শাল পরিকল্পনা অনুযায়ী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তোর ইউরোপকে পুনর্বাসনের জন্য যে তহবিল জোগান দেওয়া হয় তার ধরন থেকেই পরে বিদেশি দাতা নামে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীকালে এই বিদেশি সাহায্যকেই একটা লাভজনক বিনিয়োগ ও তৃতীয় বিশ্বের অর্থনীতিতে অতি প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা ও রাষ্ট্র ব্যবহার করতে থাকে। এখন বাংলাদেশও এর ভুক্তভোগী।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের মাত্র ৩৩ শতাংশ বা ১৮ দশমিক ১২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নেওয়া হয়েছে বিশ্বব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) থেকে। এই পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশের অতিধনী কয়েকজন মানুষের নানা উপায়ে উপার্জিত অর্থের কিয়দংশের সমান। কিন্তু বাংলাদেশের বাজেট ঘোষণার আগে সাম্প্রতিক এই প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস সরকারের নীতিপরিকল্পনা প্রণয়নকে নিশ্চিতভাবে প্রভাবিত করবে। প্রবৃদ্ধির বাড়তি রূপ কিংবা নিচে নামার ধরণ বিষয়ে পূর্বাভাস-আভাস দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের উপকার হবে না। উপকার হবে, সংবিধান অনুসারে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার রূপরেখা বাস্তবায়ন করতে দিলে।

বাংলাদেশ সরকারকে মনে রাখতে হবে, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের পরামর্শ মেনে প্রবৃদ্ধির পেছনে ছুটে চলা আসলে কখনোই মানুষের উন্নতি নিশ্চিত করতে পারবে না। কারণ এই প্রবৃদ্ধি যদি সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দূর না করে, মানুষের সুস্থ-দীর্ঘায়ু নিশ্চিত না করে, যদি মানুষের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নতি না ঘটায় এবং যদি প্রবৃদ্ধি বলতে মনমতো বেসরকারীকরণ বোঝায়, নির্বিচার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বোঝায়, বেশি বেশি বিদেশি ঋণ বোঝায়, কৃষকের অন্যায্য মূল্যপ্রাপ্তি বোঝায়, বেকারত্ব বৃদ্ধি বোঝায়; তাহলে ওই প্রবৃদ্ধি দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ-কষ্ট কোনো দিন দূর হবে না, বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রও হতে পারবে না।

ড. আইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়; সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশে অর্থনীতি সমিতি।

;

ঈদযাত্রায় এবারও জনসুনামি ট্রেনের ছাদ!



প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঈদের ওপর আঁকা কার্টুনগুলো আমার খুব ভালো লাগে। তাই সবসময় কোনো ছাপানো ঈদসংখ্যা হাতে পেলে অথবা অনলাইনে দেখতে পলে খুব মনযোগী হয়ে উঠি। এবার এপ্রিলের ৯ তারিখ সকালে রনবীর চোখে ঈদ নামক পাঁচমিশালী কার্টুন সামনে পেয়ে আগ্রহ সহকারে পড়ছিলাম। সেখানে পেঁয়াজ, গোস্ত, কাক, মেট্রো, ইয়াবার গোলা, পাগল-টোকাই ইত্যাদি সবকিছুই আছে। এক ব্যক্তি বলছেন, ‘ঈদের আক্রা বাজারে আমাগো করণীয় কী? পাগল সেজে ঘরে থাকা আর বলতে থাকা.. ‘খাইতে চাইনা সাজারে, আর যামু না বাজারে’। মশারা বলছে, ‘চল যাই মেট্রোরেলে, কেউ মারতে পারবে না, সবার দুই হাতই হাতলে ধরা থাকে।’ কার্টুনে একজনের স্ত্রীর মন্তব্য, ভিনগ্রহের মতো আমাদের প্রিয় পৃথিবীতে তো অনেকগুলো চাঁদ নেই! তাই একটি চাঁদ ওঠার ওপর ভরসা করে ঈদের দিনক্ষণ ঠিক করতে হয়। এসব বিষয় নিয়ে বেশ মজা করছিলাম অন্যদের সাথে।

কিন্তু কার্টুনে এবার যানজট বা যানবাহনে হেনস্থা হবার বিষয় নেই। তাই বেশ ফুরফুরে ছিলাম এই ভেবে যে কয়েক ঘণ্টায় বাড়ি যাওয়া যাবে। কিন্তু ৯ এপ্রিল টিভির সংবাদের দিকে তাকাতেই হঠাৎ গত ক’দিনের ঈদযাত্রার স্বস্থির খবরগুলো ওলটপালট হয়ে গেল।

এপ্রিলের দশ তারিখে মধ্যপ্রাচ্য, দূরপ্রাচ্য, ইউরোপ-আমেরিকা সবজায়গায় ঈদুল ফিতর হবে। আমাদের দেশেও সেদিন ঈদ হতে পারে কিন্তু চাঁদ না ওঠায় একদিন পিছিয়ে এগার তারিখ ঈদ হবে। তাই নয় তারিখে চাঁদ ওঠতে পারে ভেবে সরকারি শেষ কর্মদিবস এবং হাজার হাজার গার্মেন্টস কারখানা একসঙ্গে ছুটি হওয়ায় হঠাৎ করে বাড়ি ফেরার জন্য পাগল হয়ে ওঠে সাধারণ কর্মজীবি ও শ্রমিকরা। বাড়ি যাবার জন্য আকুলতা যেন সবাইকে গ্রাস করে দেয়।

সেজন্য গত কদিনের ঈদযাত্রার স্বস্থির খবরগুলোকে ভেঙেচুরে দিয়ে আজ জনতার ঢেউ উথলে ওঠে রেল, বাস ও লঞ্চঘাটগুলোতে। বিশেষ করে এবারের ঈদযাত্রায় প্রস্তুত বনেদী ট্রেনগুলোর জন্য তৈরি সিস্টেম ভঙ্গ করে হঠাৎ করে জনস্রোতে যেন সুনামির রূপ ধারণ করে নিরাপত্তার বলয় ভেঙে প্লাটফর্মে ঢুকে পড়েছে। তাদেরকে চেক বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। তারা অনেকে বরাবরের মতো কালোবাজারিতে স্টান্ডিং টিকিট কিনে অথবা বিনা টিকিটে না পেয়ে ট্রেনের ছাদে উঠে বসে পড়েছে।

এই দৃশ্য দেখে টঙ্গীর ইজতেমা শেষের অথবা ২০-৩০ বছর আগের বাংলাদেশের ঈদের সময়কার ট্রেনের চিত্র ফুট উঠেছে বলে মনে হলো। অতীতে আন্তর্জাতিক ফটোপ্রদর্শনীতে আমাদের রেলগাড়ি না মানবগাড়ি শিরোনামে অনেক ফটো প্রদর্শিত হয়েছে। যেখানে পুরো চলন্ত ট্রেনে শুধু মানুষের মাথা দেখা যেত। মনে হতো যেন ট্রেন নয়- মানুষের মাথাগুলো দুলে দুলে চলছে!

ভেবেছিলাম, আমাদের সেই অবস্থা পরিবর্তন হতে চলেছে। তাই এবারের ঈদে ঘরফেরা মানুষের সংবাদগুলো খুব পজিটিভ মনে হচ্ছিল। কিন্তু আজকের সব ধরণের গণপরিবহনে হঠাৎ করে যাত্রীসেবার বিপর্যয় যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল- আমরা এখনও আগের মতোই আছি। পরিবর্তন যা কিছু হয়েছে সেটা বিশেষ শ্রেণির সুবিধার জন্য। সর্বজনীন গণপরিবহনের সুবিধার বিষয়টি এখনও যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছে।

আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকগণ কোন সেক্টরের দুর্বলতা ধরিয়ে দিলে মন খারাপ করেন, ক্ষেপে যান। তারা আত্মতুষ্টির প্রচারে আগ্রহী। সাধারণ জনতুষ্টির বিষয়টিকে পাত্তা দিতে চান না। বিশেষ করে দেশে নিম্ন আয়ের মানুষ ও শ্রমিক, দিনমজুর, ভিক্ষুক ও ভাসমান মানুষের সংখ্যা কত বেশি সেটা আমলে নিতে চান না। রাজধানী ঢাকায় দুই-আড়াইকোটি মানুষের মধ্যে কতজন কোন লেভেলে আয় করেন অথবা কিভাবে বেঁচে আছেন সেটা তাদের মাথায় কাজ করে না।

আজকের ঈদযাত্রার বিড়ম্বনা ঘিরে তাদের অবদান কতটুকু এবং তারা ঈদযাত্রার জন্য তৈরি সাজানো সিডিউল ভেঙে কেন এই নিয়ন্ত্রণহীনতা তৈরি করলেন তা-কি একটু ভেবে দেখছেন? শুধু আজকে নয়- গত কয়েকদিন ধরে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলো গাজীপুর স্টেশনে থামলেই মানুষের ভিড়ে ট্রেনের ভেতর পা ফেলার জায়গা থাকেনা বলে সংবাদের ছবি শিরোনাম হয়েছে। প্রতিদিন শুধু কমলাপুর রেলস্টেশনের ছবি গণমাধ্যমে দেখানো হলেও দেশের অন্যান্য জায়গার ট্রেনের ছাদের চিত্র দেখে সহজেই বোঝা যায় জীবনের কোনো দাম নেই যাত্রীদের কাছে। ট্রেনের ছাদে ওঠা যাত্রীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই কর্তৃপক্ষের। কমলাপুরের বাইরের স্টেশনগুলো কি অবৈধ যাত্রী নিয়ন্ত্রণের ভেন্যু নয়?

দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে অনেক কিছু করা হচ্ছে কিন্তু তথ্যজ্ঞান ও আয় বৈষম্যের কারণে যাত্রীসাধারণের মধ্যে শ্রেণিবৈষম্য এত বেশী চোখে পড়ছে যে তা বলার মতো নয়। এসি ট্রেন, বাস, লঞ্চ সবকিছুই শিক্ষিত, উচ্চ বা মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য। তা ছাড়া কিছু সুবিধাভোগী সরকারী মানুষ সেগুলোতে যাত্রী হবার সুযোগ পান। ডিজিটাল টিকিট ব্যবস্থাপনায় গিয়েও টিকিট কালোবাজারী নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভবপর হচ্ছে না। কারণ, সেখানে ডিজিটাল চক্র অত্যাধুনিক ফাঁদ পেতে দ্রæত লগইন করে টিকিট ছাড়ার সাথে সাথে নিজেরা কিনে নিয়ে সেটা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং ভিন্নভাবে কালোবাজারে বিক্রি করছে। সাধারণ মানুষ যারা অনলাইনে ঢুকে ই-টিকিট কিনতে জানেন না। অনেকে ই-টিকিট কিনতে গিয়ে মোবাইলে নেটের নি¤œগতি বা পর্যাপ্ত ব্যালান্স না থাকার কারণে একটু দেরীতে লগইন করলে দেখানো হচ্ছে- টিকিট শেষ! এটাই অনেকের ভাগ্যে ঘটছে প্রতিনিয়ত। তারা টিকিট কিনতে না পেরে হতাশ হয়ে স্টেশনে বা অন্যত্র কালোবাজারীতে বেশীদামে টিকিট বা স্টান্ডিং কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক যাত্রী সেখানেও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। টিকিট অনলাইনে ছাড়ার সাথে সাথে কয়েক মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে যাবার মতো ভুতুড়ে পলিসি পরিবর্তন করতে না পারলে যাত্রীসেবার বিষয়টি ডিজিটাল প্রতারণার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। যা ইতোমধ্যে নানা প্রশ্নের অবতারণা করেছে।

বাসের ক্ষেত্রে নতুন চাতুরী দেখা গেছে। সিটি রুটে চলাচলকারী বাসগুলো কয়েকদিন আগ থেকেই এত কমে গেছে যে একঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়েও বাসের সন্ধান মেলেনি। রাজধানীর বুকে সিটিরুটের নিত্য চলাচল কারী পুরাতন বাসের সত্তরভাগ গাড়ির বডি রং করে ঈদের সময় দূরপাল্লায় চলাচলের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে-যা খুবই ভয়ংকর। কারণ ফিটনেসবিহীন পুরাতন লোকাল বাসকে নতুন ড্রাইভার দিয়ে দূরপাল্লায় চালানোর জন্য পাঠানোর ফলে প্রতিবছর ঈদের সময় অনেক বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এরা রাস্তায় চাঁদা দিয়ে চলাচল করে। তাই এসব বাসে যাত্রীদের নিকট থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়। এবছর তিনশত টাকার ভাড়া একহাজার করে নেয়ার ব্যাপার ঘটেছে।

ট্রেনের মতো লঞ্চে উঠার জন্য শেষ কর্মদিবসে একই সংগে দুই-তিনলাখ যাত্রী সদরঘাটে ভিড় করেছে। এবারে ঈদের ছুটি দীর্ঘ হওয়ায় ঘরমুখো মানুষের সংখ্যাও বেশী। এই সংগে সবার ছুটি হয়ে যাওয়ায় রাস্তায় যানবাহনের ওপর চাপ বেড়ে গেছে। বেড়েছে ফিটনেসবিহীন গাড়িকে দূরপাল্লার রুটে অবৈধভাবে ব্যবহার করার প্রতিযোগিতা। এসব অবৈধ যানবাহন ব্যবহারে সড়ক দুর্ঘটনায় নিরীহ মানুষের প্রাণ হারানোর ঘটনায় কোন ইতিবাচক সুরাহা করা সম্ভব হয়ে উঠে না।
তাই প্রতিবছর ঈদযাত্রার মতো আনন্দের যাত্রা অনেকের কাছে বিষাদের ছায়া বয়ে নিয়ে আসে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঈদের বাড়ি আসা-যাওয়ার বিষয়টি প্রতবছর আলোচিত হয় কিন্তু রাজধানী ছেড়ে যাওয়া এক-দেড়কোটি মানুষের নিরাপদ চলাচলের জন্য সব শেণির যাত্রী বা মানুষের কথা মোটেই চিন্তা করা হয় না। যে শ্রেণিপেশার মানুষগুলোর আয় অতি নগণ্য। কিন্তু তাদের বাড়ি ফেরার জন্য নাড়ির টান খুবই প্রবল। তারা এত আকুলতার মাধ্যমে এদিনটির জন্য অপেক্ষা করে যে রোদ-বৃষ্টি ঝড় মাথায় নিয়ে দ্রæতগামী ট্রেন-বাসের ছাদে বসে রাতদিন কাটিয়ে ভ্রমণ করতে মোটেও ভয় করে না।

তাই এবছর নয় এপ্রিলের ঈদযাত্রায় নিয়ন্ত্রণহীন উত্তাল যাত্রীসুনামীর কথা মাথায় রেখে আগামী দিনের ঈদযাত্রার পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। নিম্নআয়ের যাত্রীসহ সব যাত্রী সাধারণের জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে একটি নিরাপদ ও সস্তা ঈদযাত্রীসেবা পরিবহন ব্যবস্থার কথা চিন্তা করাটা বেশি জরুরি।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

;

বাঙালির ঈদ উৎসব: ঐতিহ্য-আনন্দ ও সাংস্কৃতিক সমাহার



ড. মতিউর রহমান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা বাঙালি মুসলমানদের কাছে কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে অনেক বেশি। এটি একটি সাংস্কৃতিক উৎসব যা আনন্দ, উদ্‌যাপন এবং পরিবারের সাথে মিলিত হওয়ার সময়।

ধারণা করা হয়, ১২০৪ সালে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ঈদ পালিত হতে শুরু করে। তবে, সে সময় ঈদের আনুষ্ঠানিকতা ছিল সীমিত এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যেই প্রচলিত ছিল। মসজিদে নামাজ আদায়, গরিবদের ফিতরা বিতরণ, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ এইসব ছিল তখনকার ঈদের মূল আকর্ষণ।

মুঘল আমলে ঈদ উৎসব আরও জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে ওঠে। নবাব ও সম্রাটরা ঈদ উপলক্ষে শানশওকত প্রদর্শন করতেন। ঈদগাহে নামাজ আদায়ের পর মেলার আয়োজন করা হত। এই মেলাগুলোতে বিভিন্ন ধরনের খাবার, পোশাক ও জিনিসপত্র বিক্রি হত। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা, আতশবাজি - এইসবের মাধ্যমে ঈদের আনন্দ উদযাপন করা হত।

ব্রিটিশ আমলে ঈদ উৎসব ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বাইরেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়। ঈদ উপলক্ষে সরকারি ছুটি দেওয়া হত। শহর ও গ্রামে ঈদের আয়োজন করা হত। ঈদ মেলার আকর্ষণ আরও বৃদ্ধি পায়। ঈদে নতুন পোশাক পরা, আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ, মিষ্টি খাওয়া, ঈদ বাজারে কেনাকাটা - এইসব ঈদের নিয়মিত রীতিনীতিতে পরিণত হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ঈদ উৎসব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঈদকে জাতীয় উৎসব হিসেবে পালন করা হয়। সরকার ঈদ উপলক্ষে ছুটি ঘোষণাসহ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচারিত হয়। ঈদ মেলার আয়োজন আরও ব্যাপক ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ঈদের আনন্দকে আরও বৃদ্ধি করেছে।

ঈদের আরেকটি ঐতিহ্য হল নতুন পোশাক পরা। ঈদের আগে সবে নতুন জামাকাপড় কেনেন এবং ঈদের দিন সকালে নতুন পোশাক পরে নামাজ আদায় করেন। নতুন পোশাক ঈদের আনন্দকে আরও দ্বিগুণ করে দেয়।

ঈদের দিন সকালে ঈদের জামাতে একত্রিত হয়ে নামাজ আদায় করা হয়। ঈদের নামাজের পর সবে জাকাত বিতরণ করে। ঈদের আচার-অনুষ্ঠান ঈদের আধ্যাত্মিক গুরুত্বকে তুলে ধরে। নামাজের পর একে অপরকে ঈদের শুভেচ্ছা জানায়। "ঈদ মোবারক"সহ বিভিন্ন ধরনের শুভেচ্ছা বার্তা ঈদের আনন্দকে আরও মধুর করে তোলে।

ঈদ জামাতের পর প্রতিবেশীর সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করে। মিষ্টি খায় এবং বিভিন্ন ধরনের খাবার পরিবেশন করে। ঈদের খাবারে ঐতিহ্যের ছোঁয়া স্পষ্ট। বিভিন্ন ধরনের পিঠা, পায়েস, মাংস, খিচুড়িসহ নানাবিধ উপাদেয় খাবার খাওয়া হয়। প্রতিটি পরিবারের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী খাবার রয়েছে যা ঈদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

ঈদের সময় আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করা ঐতিহ্যের অংশ। ঈদের ছুটিতে অনেকে গ্রামে বাড়ি ফিরে আত্মীয়স্বজনের সাথে সময় কাটান। ঈদের আনন্দ আত্মীয়স্বজনের সাথে ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে আরও বৃদ্ধি পায়।

ঈদের দিন আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে উপহার বিনিময় করা হয়। এই উপহার বিনিময় ঈদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তোলে। ঈদের দিন সরকারি ছুটি থাকে। এই ছুটির দিনগুলোতে অনেকে ভ্রমণে যান বা বিভিন্ন বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন।

ঈদের দিন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। গান, বাজনা, নাচ, থিয়েটার - বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ঈদের আনন্দকে আরও বর্ণিল করে তোলে। সময়ের সাথে সাথে ঈদ উদযাপনের রীতিনীতিতে কিছু পরিবর্তন এসেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া ঈদের আনন্দকে কিছুটা ভিন্ন করে তুলেছে। তবে ঐতিহ্য এখনও ঈদ উৎসবের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে টিকে আছে। ঐতিহ্য ঈদ উৎসবকে আরও আকর্ষণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলে।

ঈদ বাঙালিদের জন্য আনন্দের উৎসব। রমজানের এক মাস রোজা রাখার পর ঈদের দিন সবাইে নতুন পোশাক পরে, সুস্বাদু খাবার খায় এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সাথে সময় কাটায়। ঈদুল ফিতর কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে অনেক বেশি। এটি একটি সাংস্কৃতিক উৎসব যা আনন্দ, উদ্যাপন এবং পরিবারের সাথে মিলিত হওয়ার সময়। ঈদের আনন্দ শুধু মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সব ধর্মের মানুষ এই আনন্দে অংশীদার হয়। ঈদের আনন্দ আমাদের মনে আশা, সুখ ও ভালোবাসার বার্তা বহন করে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঈদ উদযাপনের রীতিনীতিতে কিছুটা বৈচিত্র্য দেখা যায়। ঢাকা ও ঢাতার বাইরে ঈদ জামাতে লাখ লাখ মুসলমান একত্রিত হয়, যা বিশ্বের বৃহত্তম ঈদের জামাতের একটি। চট্টগ্রামে ঈদের দিন নৌকা বাইচের আয়োজন করা হয়। ঈদের খাবারেও আঞ্চলিক বৈচিত্র্য দেখা যায়। সময়ের সাথে সাথে ঈদ উদযাপনের রীতিনীতিতে কিছু পরিবর্তন এসেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া ঈদের আনন্দকে কিছুটা ভিন্ন করে তুলেছে।

ঈদের খাবারে ঐতিহ্যের ছোঁয়া এখনও স্পষ্ট। তবে আগে যেখানে ঘরে তৈরি খাবারের উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হত, এখন বাইরের খাবারের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঈদের দিন আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে উপহার বিনিময়ের রীতি এখনও প্রচলিত আছে। তবে আগে যেখানে ঐতিহ্যবাহী উপহারের উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হত, এখন আধুনিক উপহারের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ঈদের দিন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তবে আগে যেখানে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হত, এখন আধুনিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঈদের ছুটিতে অনেকে ভ্রমণে যান। তবে আগে যেখানে দেশের ভেতরে ভ্রমণের উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হত, এখন বিদেশ ভ্রমণের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে।

আধুনিকতার প্রভাবে ঈদ উদযাপনের রীতিনীতিতে কিছু পরিবর্তন এসেছে। মানুষ এখন আর আগের মতো ঐতিহ্যের উপর বেশি গুরুত্ব দেয় না। জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে মানুষ এখন আরও বেশি টাকা খরচ করে ঈদ উদযাপন করে।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে মানুষ এখন দ্রুত ও সহজে দূর-দূরান্ত স্থানে যেতে পারে। এর ফলে ঈদের ছুটিতে অনেকে দেশের ভেতরে ও বাইরে ভ্রমণে যান। ঈদ উদযাপনের রীতিনীতিতে পরিবর্তন আসলে ঈদের আনন্দকে কিছুটা ভিন্ন করে তুলেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া ঈদের আনন্দকে আরও বর্ণিল করে তোলে।

ঈদ উৎসব অর্থনীতির ওপরও একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ঈদের আগে নতুন জামাকাপড়, খাবার, ঘরবাড়ি সাজানোর জিনিসপত্র কেনার জন্য বাজারে প্রচুর কেনাকাটা হয়। এর ফলে ব্যবসায়ীদের ব্যবসা বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনীতি গতিশীল হয়। ঈদের ছুটিতে অনেকে ভ্রমণে যান। এর ফলে পর্যটন শিল্প বিকশিত হয় এবং স্থানীয় অর্থনীতি লাভবান হয়।

ঈদ উৎসব মানুষের মানসিক উপরও একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। রমজান মাসের এক মাস সিয়াম সাধনা করার পর ঈদ আসে। ঈদের আনন্দ মানুষের মনকে প্রফুল্ল করে তোলে এবং তাদের মধ্যে আশাবাদের সঞ্চার করে। ঈদের দিন মানুষ একে অপরের প্রতি ক্ষমাশীল হয় এবং ভালোবাসার বার্তা ছড়িয়ে দেয়।

ঈদ উৎসব কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে অনেক বেশি। এটি একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক উৎসব যা আমাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাঙালির ঈদ উৎসব ঐতিহ্য, আনন্দ এবং সাংস্কৃতিক সমাহারের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। ঈদের আনন্দ শুধু মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সব ধর্মের মানুষ এই আনন্দে অংশীদার হয়। ঈদ বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী

 

;