বর্ষাকালে বিশেষ প্রজাতির ব্যাঙের ডাক

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ভোটারদের ক্রমাগত নির্বাচনবিমুখতা মানুষের মনে নানা প্রশ্নের উদ্রেক করে চলেছে। সাধারণ ভোটার শুধু নন, খোদ নির্বাচন কমিশনারও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ভোটারদের নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ নেই। তারা মনে করেন, ভোটকেন্দ্রে গিয়ে কী হবে? ভোট সে তো ওরাই করবে, ওরাই দেবে! ভোটকেন্দ্রে খামাকা গিয়ে আমার কী লাভ? আমার ভোট প্রদান করেই কী আর না করেই বা কী? ভোট সে তো ওরাই গুণবে, ওরাই জিতবে! আমি টিভিতে বসে ‘ওদের’ জয়ের সংবাদই শুনব। এই ‘ওরা’ কারা?

সেদিন একজন ভোটারকে সপ্তম পর্যায়ের উপজেলা নির্বাচনে ভোট দিতে যেতে অনীহা কেন—জানতে চাইলে ‘ওরা’ কথাটি বার বার শুনতে হলো। তিনি উত্তরে একটু ঘুরিয়ে বললেন, ওরা তো ওরাই! নাম বলতে হবে কেন? অচেনা মানুষকে নাম বলতে মানা! শিক্ষিত মানুষ আপনি। সেকথা জানেন না?

ভোট তো এখন শুধু নির্বাচন কমিশনের বিষয় নয়। তারা তো শুধু ঘোষণা দেন, আদেশ করেন। ভোটগ্রহণে সহায়তা করেন মাঠ পর্যায়ে কর্মরতরা। তাদের সিংহভাগই নির্বাচন কমিশন অফিসের বাইরের লোক। যাদের সঙ্গে জেলা-উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকে। যা নির্বাচন কমিশন অফিসে কর্মরতদের সঙ্গে সচরাচর থাকে না। ফলে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কাজের নিয়ন্ত্রণ নির্বাচন কমিশন অফিসের বাইরের লোকদের হাতে চলে যায়। নির্বাচন কমিশন অফিসের কোন কার্যকর কর্তৃত্ব দেখানো বা ফলানোর সুযোগ আমাদের দেশের নির্বাচন কমিশন অফিসের সিস্টেম থেকে বহু দূরে থাকে। ফলস্বরুপ, নির্বাচনী কাজের কার্যকর কর্তৃত্ব স্থানীয় প্রশাসন ও নেতৃত্বরাই নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ পায়। আর একথাটাই একজন নির্বাচন কমিশনার আক্ষেপ করে লিখিতভাবেই জাতির সামনে তুলে ধরেছেন।

একজন কমিশনার বলেছেন, ‘এবার উপজেলা নির্বাচনে সবচেয়ে আশঙ্কার দিক হচ্ছে ভোটারদের নির্বাচনবিমুখতা। নির্বাচনবিমুখতা জাতিকে গভীর খাদে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।’

উপজেলা পর্যায়ের ভোটে ভোটারদের উপস্থিতি কম ছিল। গেল সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনেও ভোটারদের উপস্থিতি কম ছিল। ভোটারদের উপস্থিতি এভাবে কমে যাওয়াটা ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে না যাবার প্রতীজ্ঞা কি? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে? তার এক হলো প্রার্থীদের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী বা কোন প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকা। আর কোথাও সেটা থাকলেও তাদের ভোটের মাঠে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণে বাধা দেয়া।

কার্যকর নির্বাচনের অভাবে মাইকে অনুরোধ করা সত্ত্বেও ভোটাররা কানে আঙুল দিয়ে সেটা অগ্রাহ্য করেছেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডাকাডাকি করে ভোটারদের কেন্দ্রে হাজির করতে না পারলে এবং ভোটাররা যদি এভাবে আর কোনদিন ভোট দিতে কেন্দ্রে যেতে না চান তাহলে নির্বাচন কমিশন নামক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই তো ভবিষ্যতে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। প্রতিষ্ঠান না থাকলে কমিশনের এত লোকবলেরও প্রয়োজন হবে না। এছাড়া অনেকে মজা করে বলেন- প্রযুক্তির নিয়ত পরিবর্তনের যুগে ইভিএম ব্যবহার করার জন্য একসময় ভোটারই লাগবে না- ভোটারদের কার্ডগুলো জড়ো করে স্ক্যান করলেই হলো! কারণ, এখনো বায়েমেট্রিক পদ্ধতিতে সবার ভোটার আইডি কার্ড তৈরি করা হয়নি। এছাড়া বায়েমেট্রিক পদ্ধতিতে সবার ভোটার আইডি কার্ড চালু হলে জালিয়াতি করার সুযোগ না থাকলে ‘ওরা’ তো কখনো কখনো চিহ্নিত বিশেষ কাউকে জিতিয়ে দিতে পারবে না। সুতরাং ভোটদানের ক্ষেত্রে উন্নত ডিজিটাল পদ্ধতি বহুল ব্যবহারের পরিকল্পনা আপাতত শিকেয় তুলে রাখেন! কারণ, সেটা দিয়ে আরো সুকৌশলে হ্যাক করে কেউ জালিয়াতি করার সুযোগ তৈরি করে দিলে এই পদ্ধতি হিমঘরে চলে যাবে।

আরেকজন ডাকসাইটে প্রবীণ রাজনীতিবিদ আক্ষেপ করে বলেছেন- 'এবারের উপজেলা নির্বাচনে ভোটের দিন মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা দিয়েও মানুষকে ভোটকেন্দ্রে আনা যাচ্ছে না। ভোট দেওয়া-নেওয়া নিয়ে মানুষ হতাশ।’

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বিরোধীদলের ক’জনমাত্র সদস্য যোগদান করেছেন। তাদের কেউ কেউ সামান্য দু’একটি বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করছেন। এতেই ক্ষমতাসীনদের উত্তর দিতে নাভিঃশ্বাস উঠে যাচ্ছে। কেউ আবার গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি-র কথায় ‘বর্ষাকালে বিশেষ প্রজাতির ব্যাঙের ডাক’ শুনতে পাচ্ছেন। যেটাকে কোন কোন গ্রামাঞ্চলে অশুভ, কোথাও মঙ্গলের ডাক হিসেবে মনে করার কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। তবে যে অভিধায় নেয়া হোক না কেন, জনগণও কিন্তু সে ব্যাঙের ডাকের মধ্যে মঙ্গলের হিসেব করছেন।

এই মানুষগুলোর ভোটকেন্দ্রে যাবার পথ মুক্ত হোক। তাহলে মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা দিয়েও মানুষকে ভোটকেন্দ্রে আনার জন্য আঁকুতি জানাতে হবে না। মানুষ এমনিতেই দায়িত্ব মনে করে নিজে নিজেই ভোটকেন্দ্রে যাবার অনুপ্রেরণা খুঁজে পাবে।

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

আপনার মতামত লিখুন :