কফি হাউসের আড্ডা: কবিতা, সিনেমার আলাপ কবে ফিরবে?



সুমন ভট্টাচার্য
আবহমানকালের কফি হাউস। সংগৃহীত

আবহমানকালের কফি হাউস। সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আর নেই, কোথায় হারিয়ে গেল সোনালি বিকেলগুলো....’। কফি হাউসের কথায় মান্না দে'র সেই অবিস্মরণীয় গান সামনে চলে আসবেই।

লকডাউনের মাঝে আবার কফি হাউস খোলার পর ইনফিউশন অর্ডার করে বসার পর আমারও অনেকের মতো মান্না দের কালজয়ী গানটার কথাই মনে পড়ে গেল। জুনের বর্ষণ সিক্ত ও করোনা তাপিত এই সময়টায় কলকাতার বিকেলগুলো খুব সোনালী নয়, চিরপরিচিত কলেজ স্ট্রিটও কেমন যেন অপরিচিত ঠেকে। সারি সারি বন্ধ দরজা, ফাঁকা রাস্তা, মন খারাপ করা বিকেল আর যাই হোক, পুরনো-নস্টালজিক পুলক দেয় না।

তবু কলেজ স্ট্রিটের সঙ্গে আমার এমন একটা নাড়ির, না নারীর টান, যে কফি হাউস খুলেছে শুনলে আসতেই হয়। জানলা দিয়ে চুপচাপ পাশের স্কুল বাড়িটা দেখতে হয়, যে স্কুলবাড়িতে জীবনের বেশ কিছু বর্ষা এবং বসন্ত আমার কেটেছে। ছোটবেলায় ওই স্কুল বাড়িটায়, মানে ডিরোজিও, মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিধন্য হিন্দু স্কুলে ক্লাসে অন্যমনস্ক হলে স্যাররা ধমক দিয়ে বলতেন, এমন চড় মারব, সোজা কফি হাউসের সামনের রাস্তায় গিয়ে পড়বি। যেহেতু কৈশোরের ওই বয়সে অন্যমনস্ক হওয়ার অনেক কারণ ছিল, তাই মনে হতো থাপ্পড় খাওয়াটাই বোধহয় ভালো, সোজা কফি হাউসে ঢুকে যাওয়া যাবে।

কে জানতো, তিরিশ বছরের একটু বেশি সময়ের ব্যবধানে আমার স্কুলের সেই স্যার আর চড় মারার জন্য থাকবেন না ঠিকই, কিন্তু এক ভাইরাস এমন থাপ্পড় মারবে, যে কফি হাউসে ঢুকে তো পড়তে পারব, কিন্তু কোনো টেবিলে বসে থাকা কোনো পরিচিত হাত নেড়ে ডাকবে না। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা গানের প্রতিটি শব্দ সত্যি মনে হবে করোনা কালের কফি হাউস। দেড় বছরের এই অতিমারি সত্যিই তো জানিয়ে দিয়ে গিয়েছে, আড্ডার কোনও কোনও বন্ধু আজ কবরে বিলীন কিংবা চিতার ছাই হয়ে গিয়েছে।

প্যারিসের যে আড্ডা দেখে ফিরে আসার পর সুরকার সুপর্ণকান্তি ঘোষ গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারকে কফিহাউসের আড্ডা নিয়ে গান লিখতে অনুরোধ করেন, সেই সব ক্যাফেতে বিশ্বনন্দিত সব লেখকরা আড্ডা দিতেন। কামু থেকে কাফকা, কে নন। সুপর্ণকান্তির সেই অনুরোধেই গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউসের আড্ডা, সাহিত্যবাসর, মজলিশি মেজাজকে নিয়ে এমন গান লিখলেন, যা পরের চার দশক ধরে বাঙালিকে এক অদ্ভুত স্মৃতিমেদুর রোমান্টিকতায় বুঁদ করে রেখেছে। কফি হাউস মানেই কবিদের আড্ডা, শিল্পীদের মিলিউ কিংবা ভাবী চলচ্চিত্র পরিচালকদের চিত্রনাট্য নিয়ে কাঁটাছেড়া।

এবং গৌরকিশোর ঘোষের ‘প্রতিবেশী’ উপন্যাসের মতো এখনও কফি হাউসের নীচে কোনো শামীম আর অমিতার দেখা হওয়ার কথাও।

তাই কফি হাউস খুলে যাওয়াটা আমার জন্য বাধ্যতামূলক। আজকের কোনও সুজাতা আমার জন্য চিকেন ওমলেট এর অর্ডার দেবে না নিশ্চিত জেনে নিজের জন্য সেইসব কিছুই বলে দিয়ে স্মার্ট ফোনে ছবি তুলে প্রবাসী সুজাতাদের পাঠিয়ে দিই এবং মনে মনে এই ভেবে পুলকিত হই যে নিশ্চয়ই এখনও ঈর্ষার রং সবুজই। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতো কবিতা নাই লিখতে পারলাম, কিন্তু নীরাকে ভেবে নিতে অসুবিধে কোথায়!

আসলে কলেজ স্ট্রিট জায়গাটা এমনই একটা পাড়া যে এখনও এখানে মার্সিডিজ বা বিএমডব্লিউ চড়ে আসা বিত্তবানের চাইতে কাঁধে ঝোলা নিয়ে মফস্বল থেকে বই কিনতে আসা অধ্যাপকের কিংবা তরুণ নাট্যকারের কদর বেশি। এখনও ভীরু তরুণী লেখকদের অটোগ্রাফ চায়, ব্র্যান্ডেড শার্টের চাইতে চে'র ছবি আঁকা টি শার্ট নিয়ে কৌতুহল বেশি থাকে।

সেই জন্যই কলেজ স্ট্রিট মানেই কফি হাউস, কলেজ স্ট্রিট মানেই প্যারামাউন্টের শরবত, পুঁটিরামের কচুরি আর ছোলার ডাল। কফি হাউসের যদি শিকড় থাকে অ্যালবার্ট হলে, তাহলে প্যারামাউন্টও তো ১০০ বছর পেরিয়ে যাওয়া ডালপালা বিস্তৃত মহীরুহের মতো একটা শরবতের দোকান। ১৯১৮ তে বিপ্লবী আন্দোলন শুরুর সময় বরিশাল থেকে কলকাতায় চলে আসা নীহার রঞ্জন মজুমদার যে ঐতিহ্যের গোড়াপত্তন করে গিয়েছিলেন। আপনি যতোই সিডনি অপেরা হাউসের পাশে বসে ওরেও শেক খেয়ে থাকুন, প্যারামাউন্টের কাঠের বেঞ্চিতে বসে আম পোড়া শরবৎ না খেলে কলকাতাকে চেনা হয়নি। যে শরবৎ আর সিরাপ নাকি নেতাজি আর নজরুলকে বারবার টেনে আনতো, তা তো করোনাকালেও অমৃতসুধা আর কলকাতার বহতার নাগরিক স্মৃতির চিরায়ত প্রবাহ।

সুমন ভট্টাচার্য, কলকাতার বিশিষ্ট সাংবাদিক। কবি ও কথাশিল্পী।