সৈয়দ শামসুল হক: তিনি আছেন পরানের গহীন ভিতরে



অসীম নন্দন, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট
সৈয়দ শামসুল হক

সৈয়দ শামসুল হক

  • Font increase
  • Font Decrease

সব্যসাচী কথাটার অর্থ হচ্ছে যার দুই হাতই সমানভাবে কাজ করে। আর সব্যসাচী লেখক মানে যিনি সাহিত্যের সকল শাখায় সফলভাবে বিচরণ করেন। এমন প্রতিভা খুব কম মানুষেরই থাকে। সৈয়দ শামসুল হক সেই বিরল ভাগ্যবান লেখকদের মাঝে অন্যতম একজন। মাত্র এগারো বছর বয়সেই তিনি ছড়া লেখার চেষ্টা করেছিলেন। গদ্যকার হিসেবেই তিনি বাংলাসাহিত্যে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন।

১৯৫১ সালে মাত্র ষোলো বছর বয়সে ‘অগত্যা’ নামে ম্যাগাজিনে তাঁর লেখা গল্প প্রথমবার প্রকাশিত হয়। ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্পের বই ‘তাস’। যদিও গদ্যকার হিসেবেই সাহিত্যে তিনি আত্মপ্রকাশ করেছিলেন, পরবর্তীতে সাহিত্যের অন্যতম প্রধান শাখা কবিতাতেও তিনি বিশেষ স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি একাধারে ছিলেন কবি, গীতিকার, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, শিশুসাহিত্যিক। তবে এখানে আমরা তাঁর কাব্যভাবনা বিষয়েই বিশেষভাবে আলোচনা করবো।

সৈয়দ শামসুল হকের কবিতার বৈশিষ্ট্যে আমরা কখনো পেয়েছি অন্তর্মুখীস্বভাব আবার কখনো পেয়েছি বহির্মুখীস্বভাব। তিনি সকলরকম ছন্দেই কাব্যচর্চা করেছেন। কবিতায় তিনি বারবার নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়তে চেয়েছেন। এজন্যই হয়তো তাঁর প্রথম জীবনের কবিতায় আমরা তাকে তেমন আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে পারি না। কারণ তিনি সেই সময়কার সমসাময়িক কবিদের রচনাশৈলীকেই অনুসরণ করেছিলেন। পরবর্তী জীবনেও তিনি বারবার নিজের রচনাশৈলীর পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। কবিতায় তিনি কখনো গদ্যরীতি ব্যবহার করেছেন, আবার কখনো পয়ার, কখনো অক্ষরবৃত্তে অন্ত্যমিলের চর্চা করেছেন।

তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘একদা এক রাজ্যে’ প্রকাশিত হয় ১৯৬১ সালে। তবে এতে তিনি নিজেকে তেমন উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ করতে পারেননি। দীর্ঘকবিতা, কাব্যনাট্যে এবং আঞ্চলিক ভাষার সফল প্রয়োগের ক্ষেত্রে সৈয়দ শামসুল হক নিজের প্রজ্ঞা'র বিশেষ পরিচয় দিয়েছেন। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর প্রথম দীর্ঘকবিতার বই ‘বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা’। এই রচনাটিতে আমরা তাঁর অন্তর্মুখীস্বভাবকে বারবার পাই। এখানে কয়েকটা পঙক্তি থেকে পাঠ করলে আমরা অন্তর্মুখীস্বভাব বা আত্মকেন্দ্রিকতার ব্যাপারটা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবো।

“এমন বিশ্বাস ছিল শুধু কবিতায়,/ প্রথমে করব জয় সুরূপা, বিরূপা;
তারপর পরিবার, যারা রোজ বলে,/ ‘কবিতার সরোবরে ফোটে অনাহার,

ছেঁড়া চটি, শস্তা মদ, আসক্তি বেশ্যায়’;/ তারপর বাংলাদেশ এশিয়া আফ্রিকা;

ফর্মায় ফর্মায় ক্রমে বেড়ে উঠে হবে/ কবিতার সংকলন খদ্দরে বাঁধানো,

যে কোনো ঋতুতে যে কোনো উৎসবে/ পাটভাঙ্গা পাঞ্জাবীতে লম্বমান যুবা

পড়বে সে বই থেকে; বাংলার তারিখে/ আমার জন্মের দিন হবে লাল ছুটি।”

অসম্ভব স্বপ্নগ্রস্তের মতন তিনি নিজের স্বপ্নের কথা বলে গেছেন কবিতার এই অংশটুকুতে। কবিতার যেই সময়টাতে দীর্ঘকবিতার দিন প্রায় ফুরিয়ে এসেছে, ঠিক সেই সময়েই তিনি এরকম ২৪ পৃষ্ঠা দীর্ঘ কবিতাচর্চা করেছিলেন। যদিও রচনাশৈলীর দিক থেকে এবং ভাষাশৈলীর দিক থেকে এরকম সংযোজন নতুন কিছু ছিল না। তবে দীর্ঘকবিতার কথা ভাবলে বলতে হয়, তিনি নিজেকে ঠিক এই জায়গাটাতেই ভেঙে গড়েছেন।

লেখক আনিসুল হক তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, “তিনি যদি অন্য সব বাদ দিয়ে দুটো বই লিখতেন ‘পরানের গহীন ভেতর’ এবং ‘বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা’ তাহলে এ দুটো বই তাকে অমর করে রাখত। তিনি যদি শুধু তার কাব্যনাট্যগুলো লিখতেন ‘নুরলদিনের সারাজীবন’ এবং ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ তাহলেও আমরা চিরদিনের জন্য তাকে বাংলা সাহিত্যে স্মরণ করতে বাধ্য থাকতাম। তাঁর কবিতা-নাটক-কলাম সবটা মিলিয়ে যে ব্যক্তিত্বটি দাঁড়ায় তা তুলনারহিত।”

আনিসুল হক সাহেব তাঁর সম্পর্কে এদিক থেকে খুব বেশি বাড়িয়ে বলেননি। প্রচুর সংখ্যক লেখার মধ্য দিয়ে এবং নিজেকে বারবার ভেঙে-গড়ার মধ্য দিয়েই হয়তো তিনি তাঁর এই অনন্য সৃষ্টিকর্মগুলো রচনা করতে পেরেছিলেন। ‘পরানের গহীন ভিতর’- সৈয়দ শামসুল হকের জনপ্রিয় বইগুলোর একটি। বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮০ সালে। এই বইটি ৩৩টি সনেটগুচ্ছ নিয়ে সাজানো। মানভাষা এবং আঞ্চলিক ভাষার সংমিশ্রণে লেখা কবিতাগুলো ভাষা-শৈলীতে অনন্য। যদিও কবিতার বিষয়বস্তু গ্রাম্য-সংসারী জীবনের প্রেম, হিংসা, মান-অভিমান এবং বাস্তবতার বিষয়ে- বলা যায় প্রায় একরকম আত্মমগ্নতারই কথা। তবে এই কবিতার বইয়ের বিশেষ ভাষা-শৈলী এবং গ্রামবাংলার মানুষের অনুভূতির বিন্যাসে লেখা কবিতাগুলো পাঠকের মনের মণিকোঠায় উজ্জ্বল জায়গা করে নিয়েছে। একইসাথে বাংলাসাহিত্যে এই বইটি একটি অনুপম সৃষ্টিকর্ম। বইটি থেকে আমরা একগুচ্ছ পঙক্তির পাঠ নিতে পারি।

“মানুষ এমন ভাবে বদলায়া যায়, ক্যান যায়?
পুন্নিমার চান হয় অমাবস্যা কিভাবে আবার?
সাধের পিনিস ক্যান রঙচটা রোদ্দুরে শুকায়?
সিন্দুরমতির মেলা হয় ক্যান বিরান পাথার?
মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর
নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর।।”

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সাহেব বিবিসি বাংলায় তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, “আমাদের সাহিত্যিকদের মধ্যে সৈয়দ শামসুল হক ভাষার ব্যবহার নিয়ে যে লিখেছেন 'হৃৎকলমের টানে' বা 'কথা সামান্যই' এগুলো কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তিনি একইসঙ্গে একজন সৃষ্টিশীল লেখক এবং ভাষার ব্যবহারে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন।”

ভাষার ব্যবহারে সৈয়দ শামসুল হক যে ভীষণ সচেতন ছিলেন তা আমরা তাঁর সৃষ্টিকর্মের দিকে নজর দিলেই বুঝতে পারি। কেননা প্রথম জীবনে তিনি অন্যান্য সমসাময়িক লেখকদের মতন কলকাতার মানভাষা ব্যবহার করলেও, পরবর্তীতে তিনি ভাষার ব্যবহারে আরো সচেতন হয়ে উঠেছিলেন। যে কারণে আমরা ‘পরানের গহীন ভিতর’ কিংবা ‘নুরুলদীনের সারাজীবন’ এর মতন সৃষ্টিকর্ম তাঁর কাছ থেকে পেয়েছি।

যদিও কবিতা নিয়েই আমাদের আলোচনা তবুও কাব্যনাট্য নিয়ে কথা না বললে আসলে কথা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। আধুনিক যুগে যেখানে কবিতাও গদ্যের দিকেই প্রবাহিত হচ্ছে, সেখানে সৈয়দ শামসুল হক কাব্যনাট্যে মনোযোগী হয়েছিলেন। আর কাব্যনাট্য নাটক হলেও তো তা কাব্যেই লেখা। তাঁর প্রথম কাব্যনাট্য ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৬ সালে।

মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা এই কাব্যনাট্য'কে আমরা বৈচিত্র্য এবং বিন্যাসের দিক থেকে বাংলাসাহিত্যে অন্যতম সংযোজন বলতে পারি। আঞ্চলিক ভাষা-শৈলীতে এবং মৈমনসিংহ-গীতিকা'র ঢঙে লেখা এই কাব্যনাট্য মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাস ও মানব-মনের অন্তর্গত অনুভূতিকে স্পর্শ করেছে। পাঁচ অঙ্কে লেখা এই কাব্যনাট্যে গ্রামীণ ইতিহাস ফুটে উঠেছে।

মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকাকে ফুটিয়ে তুলতে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন গ্রামীণ-মানুষ, মুক্তিযোদ্ধা এবং মাতবর চরিত্রে। গ্রামের মাতবর যে-কিনা পাকিস্তানিদের সাথেই হাত মিলিয়েছিল। যে মাতবর দেশের জন্য কালসাপ। যে মাতবর দেশের শত্রু। দেশের মানুষের শত্রু। এই কাব্যনাট্যের মধ্য দিয়ে আমরা সৈয়দ শামসুল হকের ইতিহাস-সচেতনতার দিকটি জানতে পারি। এই রচনাটিতে রাজাকারই কেন্দ্রীয় চরিত্র কিংবা অন্য অর্থে নায়কও বলতে পারি,যে মানুষ কিনা নিজের মেয়েকে নিজেই পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিতে চায়। এই দিক থেকে আমরা দেখতে পাই, একজন লোভী-সুবিধাবাদী-অসৎ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন। আর একইসাথে জানতে পারি যুদ্ধ বিজয়ের পর গ্রামের মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের মনস্তত্ব।

কাব্যনাট্য বিষয়ে আলোচনা করলে কোনোভাবেই আমরা ‘নুরলদীনের সারাজীবন’ কাব্যনাট্যকে বাদ রেখে আলোচনার সমাপ্তি ঘটাতে পারি না। ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন ফকির-বিদ্রোহের পটভূমিতে রচিত এই কাব্যনাট্য আমাদেরকে প্রায় ভুলতে যাওয়া ইতিহাসকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয়। এই বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮২ সালে। এখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র নুরুলদীন ফকির-আন্দোলনের একজন নেতা। আসলে নুরুলদীনকে আমরা অসাম্প্রদায়িক বিপ্লবের চেতনাও বলতে পারি। যে কিনা নতুন দিনের আশায় অত্যাচারীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করেছে।

১৭৭১ সালের ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ হচ্ছে বাংলার মাটিতে প্রথম সংগঠিত বিপ্লবের নাম। যে বিপ্লবীদের ব্রিটিশরা দস্যু নামে অবিহিত করেছিল। ব্রিটিশরা ও জোতদারেরা যখন তীর্থে যাবার সময়েও সন্ন্যাসীদের কাছ থেকে কর আদায় করতে চেয়েছিল, জমিদারেরা যখন ঋণ দেবার নাম করে চড়া সুদে সাধারণ গ্রামীণ-চাষীদের জমি কেড়ে নিচ্ছিল, নীল-চাষে বাধ্য করছিল, ঠিক তখন ফকির-সন্ন্যাসীরা বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল।

এই কাব্যনাট্যে নুরুলদীনের প্রথম সংলাপই হচ্ছে, ‘জাগো বাহে-এ, কোনঠে সবা-য়’। মানে নুরুলদীন আপামর জনগণকে ঘুম থেকে জেগে উঠতে বলছে। বিপ্লবের চেতনায় জেগে উঠতে বলছে। সংগ্রামী হবার স্বপ্নের কথা বলছে। অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার কথা বলছে। যে নুরুলদীন নবাব হতে চায় না, দেবতাও হতে চায় না। কেবল এবং কেবলমাত্র বিপ্লবীই হতে চায়। সে কেবল তার চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে চায় সবার মাঝে।

নুরুলদীন ছাড়া এই কাব্যনাট্যে আছে লালকোরাস, নীলকোরাস, আম্বিয়া, আব্বাস এবং কয়েকটি ব্রিটিশচরিত্র। এখানে লালকোরাস আদতে বাঙলার আপামর শোষিত শ্রেণীর কণ্ঠস্বর। যারা বিপ্লবের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে চায়। নীলকোরাস হচ্ছে শোষকের কণ্ঠস্বর। যারা বিপ্লবকে দুমড়েমুচড়ে নিঃশেষ করে দিতে চায়। আব্বাস হচ্ছে নুরুলদীনের বন্ধু এবং একইসাথে সমাজের পিছুটানের রূপক প্রকাশ। এবং আম্বিয়া হচ্ছে নুরুলদীনের ভালোবাসার নাম। তাঁর স্ত্রী। তাঁর সংসার। যে সংসার সবসময় মানুষকে মায়ার বাঁধনে বেঁধে পিছুটানের সৃষ্টি করে। যাকে নুরুলদীন বিপ্লবের জন্য ত্যাগ করেছে। আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারে এবং পটভূমির গুরুত্বে এই রচনা বাংলাসাহিত্য একটা বিশেষ সংযোজন।

অনেকেই তো অনেক রকম কথা বলে থাকেন। অনেকে বলেন, সৈয়দ হক বারবার নানানভাবে প্রভাবিত ছিলেন। কখনো তিনি তাঁর সমসাময়িক লেখকদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন আবার কখনো বিশ্বসাহিত্যে প্রভাবিত হয়েছেন। কিন্তু প্রভাব ছাড়া তো কোনো লেখকই নিজেকে ফুটিয়ে তুলতে পারেন না। নিজেকে যে যতভাবে যতবার ভেঙে নতুন করে গড়ে তুলতে পারেন তিনিই তো হয়ে উঠেন শক্তিশালী লেখক। আর সৈয়দ শামসুল হক সেই কাজটাই করতে পেরেছেন। এবং বাংলাসাহিত্যে বাঙালির মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত মনস্তত্বে তাঁর যা সংযোজন; সেজন্যই তিনি হয়তো বহুযুগ ধরে পাঠকের পরানের গহীন ভিতরে থেকে যাবেন।

এক নজরে জীবনপঞ্জি:

জন্ম: ২৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫ সাল
জন্মস্থান: কুড়িগ্রাম, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত।
মৃত্যু: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ সাল
উল্লেখযোগ্য রচনাবলি: নিষিদ্ধ লোবান, খেলারাম খেলে যা, পরানের গহীন ভিতর, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, নুরুলদীনের সারাজীবন।
উল্লেখযোগ্য পুরস্কার: বাংলা একাডেমি(১৯৬৬), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৮২), একুশে পদক(১৯৮৪)।

ভ্রমণগদ্য হোক সৃজনশীল চর্চার গন্তব্য



জাকারিয়া মন্ডল
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ভ্রমণ বিষয়ক লেখা সাহিত্য কি না তা নিয়ে বিতর্ক আছে। গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিস, চৈনিক ফা হিয়েন ও হিউয়েন সাং, আরব পর্যটক সুলেমান ও আল মাসুদি, পারস্যের পর্যটক আল বিরুনি, ইতালির মার্কো পোলো, মরক্কোর ইবনে বতুতা প্রমুখ বিশ্বখ্যাতরা সাহিত্য করেননি। তারা করেছিলেন ডকুমেন্টেশন। যা দেখেছিলেন তাই লিখেছিলেন। ঘটনার বিবরণ দিয়েছিলেন। মুঘল, নবাবী, এমনকি ব্রিটিশ আমলের পর্যটকদের বিবরণেও ওই ধারাটাই বজায় ছিলো। এখনও অনেক পর্যটক এ ধারার চর্চা করে চলেছেন।

তবে পৃথিবী আধুনিকতার পথে ধাবিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিন্নধারার চর্চার চলও শুরু হয়ে যায়। যেমন, সৈয়দ মুজতবা আলীকে আমরা ডকুমেন্টেশনের চেয়ে রম্যরসে অধিক মনোযোগ দিতে দেখি। পরবর্তীতে আরও অনেকে এমন চর্চার অনুসারি হয়ে ওঠেন। ফলে ভ্রমণের বিবরণ সাহিত্যঘেঁষা হয়ে উঠতে শুরু করে। ভ্রমণের বেসিক বিবরণ ও সাহিত্যের মধ্যে ব্যবধান কমতে শুরু করে। এখন অনেকেই ভ্রমণ লেখাকে সাহিত্যে আত্তীকরণ করতে আগ্রহী। সাংবাদিক ও কবি মাহমুদ হাফিজ ভ্রমণগদ্য নামে যে ত্রৈমাসিক পত্রিকাটি বের করে চলেছেন, তাতে পত্রিকার নামের সঙ্গে লেখা রয়েছে ‘ভ্রমণ সাহিত্যের কাগজ’।

‘ভ্রামণিক’ নামে ভ্রমণ লেখকদের নতুন একটা পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করারও অন্যতম পুরোধা বলা যায় মাহমুদ হাফিজকে। সদালাপী ও বিনয়ী মানুষটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় বছর কয়েক আগে, এয়ার এশিয়ার কুয়ালালামপুরগামী এক ফ্লাইটে। অল ইউরোপিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (আয়েবা) নামে একটি সংগঠন তখন মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে সম্মেলন আয়োজন করেছিলো। সেখানে আমন্ত্রণ ছিলো ঢাকা শহরের বাঘা বাঘা সম্পাদক ও সাংবাদিকদের। বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার জনক আলমগীর হোসেন তখন তারই জন্ম দেওয়া বাংলানিউজ২৪.কমের এডিটর ইন চিফ। তারও আমন্ত্রণ ছিলো আয়েবা সম্মেলনে। কিন্তু, তিনি নিজে না গিয়ে তার প্রতিনিধি হিসেবে আমাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। ঢাকার সাংবাদিক অতিথিদের একই ফ্লাইটে কুয়ালালামপুর নেওয়া হচ্ছিলো।

প্লেন আকাশে ওঠার পর মাহমুদ হাফিজ ভাই আমাকে খুঁজে বের করলেন। ওটাই যে প্রথম পরিচয়, কথা শুরুর পর সেটা ভুলেই গেলাম। এরপর গত কয়েক বছরে বহুবার হাফিজ ভাই এর সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। কখনোই ভ্রমণ ছাড়া আর কোনো বিষয়ে তাকে কথা বলতে শুনিনি।

ঢাকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ লেখকদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। ভ্রমণ নিয়ে কথা বলেন। নিজে লেখেন। অপরকে লেখতে উৎসাহিত করেন। তার উৎসাহে অনেক ভ্রামণিক লেখক হয়ে উঠেছেন। ভ্রমণ লেখকদের নিয়ে নিয়মিত ‘প্রাতরাশ আড্ডা’ আয়োজনেরও প্রধান উদ্যোক্তা তিনি। ভ্রমণ লেখকদের যেমন সংগঠিত করেছেন, তেমনি লেখা প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছেন ‘ভ্রমণগদ্য’ পত্রিকায়। যে পত্রিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ এবং প্রবাসী লেখকদের লেখা নিয়মিত প্রকাশ করে চলেছেন তিনি।

এরই মধ্যে পঞ্চম বছরে এগিয়ে চলেছে ভ্রমণগদ্য। প্রকাশিত হয়েছে ৯টি সংখ্যা। সর্বশেষ সংখ্যাটি প্রকাশ পেয়েছে এ বছরের বইমেলায়। এ সংখ্যায় ভ্রমণগদ্যের পাশাপাশি কবিতাও দেখা গেছে।

যেহেতু যোগাযোগ ও যাতায়াত সহজ হওয়ার জন্য দিন দিন ভ্রমণপিপাসু মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, সেহেতু ভ্রমণ লেখকের সংখ্যাও বাড়ছে। ঘুরে এসে অনেকেই কিছু না কিছু লিখতে চান। তাই মাহমুদ হাফিজের ভ্রমণগদ্য প্রতিষ্ঠিত ভ্রমণ লেখকদের পাশাপাশি নতুনদের জন্যও নিঃসন্দেহে আশা জাগানিয়া প্ল্যাটফর্ম। এমন উদ্যোগের সমালোচনা চলে না। তবু দুএকটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা আবশ্যক বৈকি।

ফেসবুকীয় যুগের লেখকদের সাহস পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত লেখকদের চেয়ে অনেক বেশি। ভ্রমণগদ্যের কোনো কোনো লেখাতেও আমরা এমন সাহসী হঠকারিতার ছাপ পাচ্ছি। কেউ কেউ যা ইচ্ছা তাই লিখে দিচ্ছেন। ভ্রমণস্থলের চেয়ে ঢের বেশি আমিময় হয়ে উঠছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভ্রমণের গল্প পড়ছি, নাকি লেখকের ভাবনা, ইচ্ছা, অনিচ্ছা, পছন্দের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি তা বুঝে ওঠা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। ছবিতে বিষয়বস্তু, স্থান বা স্থাপনার চেয়ে নিজেই অধিক প্রকট হচ্ছেন লেখক। লেখার টেবিলে সময় কম দেওয়ার কারণে কাউকে কোট করার ক্ষেত্রে বই এর নাম, এমনকি লেখকের নামেও ভুল রয়ে যাচ্ছে। এমন উদাহরণ যতো এড়ানো যায় মতোই মঙ্গল।

মনে রাখতে হবে, ভ্রমণ লেখা হলো সরেজমিন প্রতিবেদনের মতো, যা অকাট্য দলিল হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে। প্রকাশনার এই সঙ্কটকালে লেখালেখি চর্চার যে প্লাটফর্ম ভ্রমণগদ্য তৈরি করে দিয়েছে, সেটা যেনো নষ্ট না হয়। আমরা আশা করবো, মাহমুদ হাফিজ সম্পাদিত ভ্রমণগদ্য ভ্রামণিকদের সৃজনশীল চর্চার প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠবে।

জাকারিয়া মন্ডল: প্রধান বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আমাদের বার্তা

;

ভ্রামণিক কবি কাজল চক্রবর্তী ১২ দিনের সফরে বাংলাদেশে



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কবি কাজল চক্রবর্তী

কবি কাজল চক্রবর্তী

  • Font increase
  • Font Decrease

পশ্চিমবঙ্গের আশির দশকের স্বনামখ্যাত ভ্রামণিক, কবি ও সাংস্কৃতিক খবর সম্পাদক কাজল চক্রবর্তী এখন বাংলাদেশে। ভ্রমণ ও দেশের বিভিন্ন জেলায় বেশ কয়েকটি সাহিত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি শনিবার (১৪ মে) বিকেলে ঢাকা এসে পৌঁছেছেন। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান ঢাকার কবি সাবেদ আল সাদ। আজ (১৫ মে) থেকে দেশজুড়ে কাজল চক্রবর্তীর সাহিত্যসফর শুরু হচ্ছে।

রোববার বিকালে টাঙ্গাইল সাহিত্য সংসদ স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে স্বরচিত কবিতাপাঠ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। কলকাতার কবি কাজল সেখানে প্রধান অতিথি থাকবেন। টাঙ্গাইল পাবলিক লাইব্ররি মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের মুখ্য উদ্যোক্তা কবি মাহমুদ কামাল। সভাপতিত্ব করবেন কবি সাবেদ আল সাদ।

সোমবার বিকাল সাড়ে চারটায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন চত্ত্বরে মৃদঙ্গ লিটল ম্যাগাজিন আয়োজন করেছে ‘মতিহারের সবুজে’ শীর্ষক কবিতা আড্ডা। কবি অনীক মাহমুদের সভাপতিত্বে আয়োজিত আড্ডার কবি কাজল চক্রবর্তী। প্রধান ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কবি মাহমুদ কামাল ও কবি সাবেদ আল সাদ।

রাজশাহী থেকে পরদিন মঙ্গলবার কাজল চক্রবর্তী ছুটবেন বগুড়ায়। সেখানে ইসলাম রফিকের পরিচালনায় আয়োজিত হবে বগুড়া লেখক চক্র কর্তৃক সাহিত্য অনুষ্ঠান। কাজল চক্রবর্তী থাকবেন মুখ্য অতিথি। কবি মাহমুদ কামাল ও কবি সাবেদ আল সাদ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

১৮ থেকে ২১ মে পর্যন্ত কবির ঢাকাবাসকালে আয়োজিত হচ্ছে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান। ২০ মে শুক্রবার ভোরে মাহমুদ হাফিজ সম্পাদিত ভ্রমণগদ্য লিটল ম্যাগাজিন ঢাকায় ভ্রামণিক-কবিদের এক প্রাতঃরাশ আড্ডার আয়োজন করেছে। কবি ও ভ্রামণিক কাজল চক্রবর্তী আড্ডার অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এই আড্ডাটি শুধু আমন্ত্রিতদের জন্য।

এদিন বিকালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র্রে কবি আনোয়ার কামালের ‘এবং মানুষ’ আয়োজিত ‘এবং উৎসব’কবিতাসন্ধ্যায় কাজল চক্রবর্তী মুখ্য অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

২১ মে শনিবার বিকালে কাটাবনের কবিতা ক্যাফেতে ‘বিন্দু বিসর্গ’ পত্রিকা কাজল চক্রবর্তীকে সংবর্ধনা দেবে। অনুষ্ঠানটি সকলের জন্য উন্মুক্ত। পরদিনই কাজল রওনা হবেন চট্টগ্রাম। ২২ মে রোববার চট্টগ্রামের হাটখোলা ফাউন্ডেশন আয়োজন করেছে কথা ও কবিতা অনুষ্ঠানের। আবৃত্তি ও কবিতাপাঠের অনুষ্ঠানটি হবে চট্টগ্রাম মোহাম্মদ আলী সড়কে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বিপরীতে প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের কার্যালয়ে।

পরবর্তী চারদিন কাজল চক্রবর্তী পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি ও বান্দরবানের ভ্রমণস্থানগুলো ভ্রমণ করবেন। ২৬ মে তার কলকাতায় ফেরার কথা রয়েছে।

;

আমার গহীন স্বপ্নাচড়ে



সহিদুল আলম স্বপন
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

বৃষ্টি ঝড়া মিষ্টি চোখে ভালোবাসার

এক ঝিলিক রোদের
আকাশ হলে তুমি,
ইলোরার রংধনুরা পালিয়ে গেল
অমিষেয় ভীষন ল্জ্জায়,
এ বুঝি স্বপ্নের ভেলায় দিগন্ত পাড়ে
লাজুক প্রেমের লুকোচুরি লুকেচুরি খেলা।

আবিরের ঐ আলতা মেশানো গোধূলিরা
যেন মেঘ হতে চায়
নিজের রং বিকিয়ে;
আনমনে শুনি আমি সুখের
রিনিঝিনি তোমার চিরায়ত ভালোবাসার সপ্তসুরে।

ম্যাকব্যাথের উচ্চাভিলাষী সুখের কাছে
ট্রয়ের ধ্বংস বড়ই বেমানান,
যেখানে প্রেমের ফেরিওয়াল চিৎকার করে
প্রেম সওদা নিয়ে ঘুড়েনা
জীবনের বাঁকে বাঁকে
প্রেমের সিন্দাবাদ হয়ে তুমি সাঁতরে বেড়াও
আমার গহীন স্বপ্নাচড়ে।


--জেনেভা, সুইটজারল্যান্ড।

;

মনোহারী মধুকর



শরীফুল আলম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি তাঁকে আজও দেখিনি
অথচ আমি তাঁর প্রেমে পড়ে আছি
বোঝা গেল প্রেমে পড়ার জন্য
দেখাটা খুব জরুরি নয়
তবে অনিবার্য কিনা তা বলতে পারবনা
তবুও ক্রমশ নীল ডানা মেলে
বেগচ্যুত বাতাস মায়াবী রোদের পানে যায়
অতল পিয়াসি এই মন সমর্পণ করে নূহের প্লাবন
বিরামচিহ্নহীন ভাবে আমি তাঁর পানে চেয়ে থাকি
হৃদপিণ্ডে ক্রমশই বাড়ে হৈচৈ ,
আমি তাঁর জ্যোৎস্না লুটে নেই
হিমু সেজে আড়ালে দাঁড়াই
ঠিক তাঁর লাবণ্য রেখা বরাবর।

জানি তুমি দিগন্তের চাইতেও বহু দূরে
কখনো তাঁতের শাড়ি, গায়ে আলতা, হাতে রেশমি চুড়ি ,
প্রিয়ন্তি, ওটি আমার দেয়া নাম
তাঁর খুব পছন্দ হয়েছিল
তবুও মাঝেমধ্যে আমরা তর্কে জড়াতাম ,
তিনি ছিলেন সেক্যুলার
আর আমি?
সময়ের ক্রীতদাস
আজও রোদের হলুদ মেখে বসে থাকেন তিনি
সমান্তরাল শব্দ শুনবে বলে
আমি তাঁর নীল মুখ দেখে পরাজয় মেনে নেই
তাঁর বাদামি শরীরে তখনও জ্যোৎস্নার প্লাবন
অশান্ত বারিধারা মনোহারী মধুকর
অথচ অজস্র দ্বিধা আমারও আছে
আমরাও আছে আদর্শের খসড়া, বসন্তের নির্দয়,
আমি তাঁর লুকোনো হারেম আজও দেখিনি
তবুও অজানা মেলোডি বুকে নিয়ে
নির্বিকার স্বপ্ন দেখি
লোভীর মতই তাঁকে ভালবাসতে চাই।

;