হাতির এতিমখানায়



জাকারিয়া মন্ডল
দুধ খাচ্ছে হস্তিশাবক। ছবি: আবীর আবদুল্লাহ

দুধ খাচ্ছে হস্তিশাবক। ছবি: আবীর আবদুল্লাহ

  • Font increase
  • Font Decrease

শ্রীলঙ্কা থেকে: সারি বেঁধে দুধ খেতে আসছে হস্তিশাবরা। যেগুলো বেশি ছোটো সেগুলোর মুখে বোতল পুরে দিচ্ছেন প্রশিক্ষিত কর্মীরা। একটু বয়সিদের দুধ দেওয়া হচ্ছে কর্কে ঢেলে নলের মাধ্যমে। বরাদ্দের সবটুকু এক নিঃশ্বাসে গিলে নিয়ে হস্তিশাবকেরা অনতিদূরে রাখা খাবারের পাত্রের দিকে হাঁটছে। একটা অতি আহলাদী শিশু হাতি এসে তার জন্য বরাদ্দ দুধে সন্তুষ্ট হতে চাইলো না। একটু বুঝি বেশিই খিদে পেয়েছিলো তার। শুঁড় বাড়ালো খাদ্যকর্মীর হাতে ধরা দুধের পাত্রের দিকে। মনে হলো, পাত্রটাই ছিনিয়ে নেবে।

হস্তিশাবকদের মিলেমিশে খাবার খাওয়া। ছবি: আবীর আবদুল্লাহ

কিন্তু, না। খাদ্য কর্মী মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই শান্ত শাবকটা। ঘুরলো। খাবার রাখা পাত্রের দিকে যাচ্ছে। যেতে যেতে শুঁড় তুলে হাঁক ছাড়লো। অন্যদের যেনো বলতে চাইছে, সব শেষ করে ফেলো না। একটু ধীরে খাও। আমি আসছি।

অবশ্য এর বেশী অস্থির হলো না শাবকটা। সঙ্গীদের সঙ্গে মিলেমিশে খাবারের পাত্রে মুখ নামালো। ওখানকার খাবার শেষ হলে পা বাড়ালো পাশেই ফেলে রাখা ডালপাতার দিকে। যেগুলোর খাওয়া এরই মধ্যে শেষ, তারা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে সেগুন ছায়ার নিচে।

এক হস্তিশাবকের গাছের পাতা খাওয়া। ছবি: আবীর আবদুল্লাহ

গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে শিশু হাতিদের খাওয়া দেখছিলো ওয়াভাভা। বয়স ১২। সাত ক্লাসের ছাত্র। ডালটুনু থেকে এসেছে হাতি শিশুদের খাওয়া দেখতে। শ্রীলঙ্কার শিক্ষার মান কেমন সেটা তার জড়তাহীন ইংরেজিতেই স্পষ্ট। জানতে চাইলাম, তুমি কি বাংলাদেশের কোনো ক্রিকেটারকে চেনো? অবাক করে দিয়ে ওয়াভাভা বললো, মাহমুদ উল্লাহ ইজ এ ভেরি কুল ম্যান।

চমক ভাঙার আগেই ওয়াভাভার পাল্টা প্রশ্ন। তুমি কি করুনারত্নেকে চেনো? হাসারাঙ্গা? শানাকা?

শ্রীলঙ্কান এক শিশুর দেশের প্রতি টান দেখে বিষ্ময় আরও ঘনীভূত হয়ে ওঠে। আরও কিছু জিজ্ঞাসা করার আগে ফের প্রশ্ন ছোঁড়ে ওয়াভাভা। তোমার মায়ের নাম কি?

এভাবেই মিলেমিশে খাবার খায় হস্তিশাবকরা। ছবি: আবীর আবদুল্লাহ

মা হারা হস্তিশাবকদের খাওয়া দেখতে দেখতে এসে উদাওয়ালাউই এলিফ্যান্ট ট্রানজিট হোমে মনটা ভারী হয়ে ওঠে।

সামনের হস্তিশাবকরা সবাই মা হারা। ২২ মাস গর্ভধারণের পর ওদের জন্ম দেয় মা। জন্মের পরও ওই মা-ই হয় তাদের বাঁচার প্রধান অবলম্বন। বাবার কাছে সাপোর্ট পায় না মোটেই। মা ছাড়া একদিনও টিকতে পারে না। ২/৩ ঘণ্টা পরপর মুখে পুরে মায়ের ওলান। মা ছাড়াও বোন, দাদির মতো আত্মীয়দের সঙ্গে সময় কাটায়। মানবশিশুর মতোই মা ছাড়া অচল ওরা। ঘাস চিবিয়ে খাওয়া শিখতেই বছর চারেক সময় লেগে যায়।

দলবেঁধে ঘুরে বেড়ায়। খায়। ঘুমায়ও গলাগলি করে। শীতের রাতে গায়ে গা ছুঁয়ে ওম নেয়। গরমে জলাশয়ে নেমে শান্তি খোঁজে। গায়ে কাদা মেখে গরম কমায়।

এলিফ্যান্ট ট্রানজিট হোমে। ছবি: আবীর আবদুল্লাহ

মা ছাড়া বনের ভেতর খুবই অসহায় ওরা। শিশুবয়সে হাতির মৃত্যুর হার খুবই বেশি। ওদের কথা চিন্তা করেই ১৯৯৫ সালে শ্রীলংকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয় এই এলিফ্যান্ট ট্রানজিট হোম। ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন এটি পরিচালনা করছে। দিনে সাত দফা এখানে দুধ খাওয়ানো হয় হস্তিশাবকদের। যখন ওরা নিজে নিজে খাবার খুঁজে নিতে শেখে, তখন আবার বনে ছেড়ে দেওয়া হয় তাদের।

আরও পড়ুন:সিংহ পাহাড়ে কশ্যপের কান্না

এই এলিফ্যান্ট ওয়াইল্ড লাইফে হস্তিশাবকদের খাওয়া দেখতে আসা মানুষের টিকিটের অর্থ এদের জন্যই ব্যয় করা হয়। এলা থেকে ক্যান্ডি, বা ক্যান্ডি থেকে এলা শহরে ঘুরতে যাওয়া ট্যুরিস্টরা খানিক থেমে খাওয়া দেখে যায় এদের।

ট্রানজিট হোমে হাতির মাথার শিল্পকর্ম। ছবি: আবীর আবদুল্লাহ

একটা হাতি বিষয়ক মিউজিয়ামও আছে। নান্দনিক এই জাদুঘরের দেওয়ালে ধাপে ধাপে হাতির জীবনচক্র, পরিচিতি, খাদ্যাভ্যাস, চরিত্র চিত্রকর্মে ফুটিয়ে তোলা। সঙ্গে প্রয়োজনীয় বিবরণ। এই জাদুঘর ঘুরে গেলে যে কেউ হাতি বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান পেয়ে যাবেন।

জাদুঘরের সামনের চত্বরে বসার জন্য যেসব বেঞ্চ পাতা, সেগুলোতেও হাতির ডিজাইন। অতিকায় একটা হাতির কঙ্কাল দাঁড়িয়ে মানুষের নিষ্ঠুরতা ঘোষণা করছে। তার গায়ে এখনও একটা বুলেট। মানুষকে শিক্ষা দিতেই ওই বুলেট যেখানে বিঁধেছিলো সেখানেই রেখে দেওয়া হয়েছে। এই শিক্ষা নিতে পারলেই মঙ্গল।

লেখক: প্রধান বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আমাদের বার্তা ও নির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স এসোসিয়েশন। 

আরও পড়ুন: বন পাহাড়ের কোলে

   

কদম



আকিব শিকদার
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঋতুটি শরৎ এখন পঞ্জিকার পাতায়।
বর্ষার আমেজ কাটেনি বুঝি, সারাটি আকাশ
কালো করে নামে বৃষ্টি।
একটানা ভিজে শালবন, মহুয়ার কিশলয়। সতেজ হয়-
লতানো পুঁইয়ের ডগা।

এ বর্ষণ দেখার সৌভাগ্য আমার নেই। দূর পরবাসে
বসে আমি ভাবি- আহ, কি সহজেই ভুলে গেলাম, ভুলে গেলাম
প্রিয় ফুল কদমের কথা...!
পড়ার টেবিলে দুটো কদম, আষাঢ় শ্রাবণে তরতাজা দুটো কদম
জিইয়ে রেখেছি কতো-
কাচের বোতলে। ভেজা বাতাসে কদমের হালকা সুবাস।
তিনটে বছর, মাত্র তিনটে বছর
ভুলিয়ে দিলো চব্বিশ বছরের বর্ষার স্মৃতি, যেন চব্বিশ বছর
পরাজিত তিন বছরের পাল্লায়।

পরিজন ফোন করে খবর নিতে- ‘কি পাঠাবো বল...?
কাঠালের বিচি ভাজা, চিনে বাদাম, ঝুনা নারকেল
নাকি আমের আচার...?’-ওদের তালিকায়
আমার পছন্দ অনুপস্থিত।

সাহেবদের বিলেতী ফুলের ভীড়ে
ঠাঁই নেই কদমের-
যেমন আছে কাঁদা মাটির সুঁদাগন্ধ ভরা বাংলায়।
ক্যালেণ্ডারের পাতায় দেখি
ফুটফুটে কদমের শ্বেত রেণু বিনিময়, আর অন্তরে অনুভবে
রূপ-রস-গন্ধ।

;

একগুচ্ছ কবিতা



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পরাবাস্তবতা-জাদুবাস্তবতা
আপাতদৃষ্টিতে অবাস্তব অথচ বাস্তবের অধিক
অসম্ভব তবু প্রতিনিয়ত সম্ভাবনার শঙ্কা জাগায়
তারই নাম পরাবাস্তবতা
অন্যভাবে বলতে জাদুবাস্তবতা:
যেমন, এই যে আশ্চর্য সকাল
এর কতtটুকু তুমি দেখো
কতটুকু আমি
আর কতটুকু দিগন্তের ওপাশে অদেখার!
জলের উপর একলা মুখ ঝুঁকিয়ে থাকা
শেষবিকেলের মর্মবেদনা জানে
শিরীষ কিংবা কৃষ্ণচূড়ার ভাসমান পাতা
তুমি আর আমি কতটুকু জানি!
অর্থবোধ্য সীমানা পেরিয়ে
আমাদের যাতায়াত নেই
এমন কোনো ঠিকানায়
যার দিক নেই, চিহ্ন নেই, প্রতীক নেই!

সম্পর্ক

প্রিজমের টুকরোয় ছিটকে পড়া আলোয়
অধ্যয়ন করছি সম্পর্ক
সম্পর্কের উত্থান-পতন
বাঁক ও শিহরণ
লগ-ইন বা লগ-আউটে
নিত্য জন্মাচ্ছে নতুন সম্পর্ক
সম্পর্কের বিভিন্ন রং
লিখে লিখে মুছে দিচ্ছে ফেসবুক
সন্তরণশীল সম্পর্ক খেলা করছে
মানুষের জীবনের বহুদূরের ভার্চুয়ালে
সম্পর্ক হয়ে গেছে স্বপ্নময় জগতে
মনকে জাগ্রত রাখার কৌশল

জোনাকি

দূরমনস্ক দার্শনিকতায়
রাতের পথে যারা আসে
তারা যাবে দিগন্তের দিকে
আত্মমগ্ন পথিক-পায়ে।
এইসব পদাতিকের অনেকেই আর ফিরবে না
ফিরে আসবে অন্য কেউ
তার চিন্তা ও গমনের ট্র্যাপিজ ছুঁয়ে
অন্য চেহারায়, অন্য নামে ও অবয়বে।
তারপর
গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে সরল রেখায়
আলোর মশালে জ্বলে উঠবে
অনুভবের অসংখ্য জোনাকি।

নিঃসঙ্গতা

নিঃসঙ্গতা শীতের কুয়াশার মতো প্রগাঢ়
তমসাচারী মৃত পাখির নিঃশব্দ কুহুতান-স্মৃতি
নিহত নদীর শ্যাওলাজড়ানো জলকণা
দাবানল-দগ্ধ বনমর্মর:
মায়ায় মুখ আড়াল করে অনন্য বিমূর্ত বিবরে
নিঃসঙ্গতা কল্পলোকে রঙ মাখে
নীলাভ স্বপ্নের দ্যুতিতে
অস্তিত্বে, অনুভবে, মগ্নচৈতন্যে:
জীবনের স্টেজ অ্যান্ড স্ক্রিনে!

আর্কিওপটেরিক্স

পনেরো কোটি বছরের পাথরশয্যা ছেড়ে তিনি
প্রত্নজীববিদের টেবিলে চলে এলেন:
পক্ষী জীবাশ্ম দেখে প্রশ্ন শুরু হলো পৃথিবীময়
‘ডানার হলেই তাকে পাখি বলতে হবে?‘
তাহলে ‘ফ্লাইং ডাইনোসরস‘ কি?
তাদের শরীরে রয়েছে ডানা, কারো কারো দুই জোড়া!
পাখি, একলা পাখি, ভাবের পাখি খুঁজতে খুঁজতে হয়রান
বিজ্ঞানী থেকে বিপ্লবী কবিগণ
আর্কিওপটেরিক্স কি পাখির আদি-জননী?

;

কবি অসীম সাহা আর নেই



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি অসীম সাহা মারা গেছেন। ৭৫ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বাংলা সাহিত্যের এই খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব।

মঙ্গলবার (১৮ জুন) বিকেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

বিষযটি নিশ্চিত করেছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ও কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

তিনি জানান, মাঝখানে দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর অসীম সাহা মোটামুটি সুস্থই ছিলেন। অল্প ক’দিন আগেই আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আজ শুনি তিনি আর নেই। বর্তমানে অসীম সাহাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে রাখা হয়েছে। তাকে দেখতে সেখানেই যাচ্ছি।

অসীম সাহার শেষকৃত্য সম্পর্কে তাঁর ছোট ছেলে অর্ঘ্য সাহা বলেন, তাঁর বাবা মরদেহ দান করে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে গেছেন।

চলতি বছরের শুরুর দিকেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন কবি অসীম সাহা। চিকিৎসকরা তখন জানিয়েছিলেন, বিষণ্নতায় ভুগছেন কবি। এছাড়া পারকিনসন (হাত কাঁপা রোগ), কোষ্ঠকাঠিন্য ও ডায়াবেটিস রোগেও আক্রান্ত হন।

১৯৪৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি নানারবাড়ি নেত্রকোণা জেলায় জন্ম গ্রহণ করেন কবি অসীম সাহা। পড়াশোনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্য বিভাগে। সামগ্রিকভাবে সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১২ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। পরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে।

;

অনন্তকাল দহন



আকিব শিকদার
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ঝিঝির মতো ফিসফিসিয়ে বলছি কথা আমরা দুজন
নিজেকে এই গোপন রাখা আর কতোকাল?
: অনন্তকাল।

বাঁশের শুকনো পাতার মতো ঘুরছি কেবল চরকী ভীষণ
আমাদের এই ঘুরে ঘুরে উড়ে বেড়ানো আর কতোকাল?
:অনন্তকাল।

তপ্ত-খরায় নামবে কবে প্রথম বাদল, ভিজবে কানন
তোমার জন্য প্রতিক্ষীত থাকবো আমি আর কতোকাল?
: অনন্তকাল।

তোমার হাসির বিজলীরেখা ঝলসে দিলো আমার ভুবন
এই যে আগুন দহন দেবে আর কতোকাল?
: অনন্তকাল।

;