স্মরণীয় ১০ জন যারা পেয়েছিলেন রাষ্ট্রের অবমাননা ও অবিচার (পর্ব ২)



দেবদুলাল মুন্না
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

পেছনে ফিরে দেখি। কী দেখি? অতীত। কিন্তু যে দলছুট হয়ে স্রোতে ভাসা মানুষের ভিড় থেকে চলে যায় অনেক আগে তাকেও তো পেছনে ফিরে তাকাতে হয়। পা সামনে এগুনো। কিন্তু একটি মুখ মুখ ফিরিয়ে দেখছে। সে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের সব বেদনা। একটু আলো জ্বেলেছিল। আমরা হয়তো বুঝিনি। হয়তো ড্যাশ ড্যাশ ড্যাশ। কিন্তু তার ওই দলছুট হয়ে এগিয়ে যাওয়ায় কম যন্ত্রণাবিদ্ধও হয়নি। মনে রেখেছি সেইসব মুখদের! তাদের অনেককেই তদানীন্তন সমাজ, শাসক, তথা রাষ্ট্রের চরম অবমাননা এবং অবিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এত এত মুখ। বলি মাত্র ১০ জনের কথা এ কিস্তিতে।

 স্মরণীয় ১০ জন যারা পেয়েছিলেন রাষ্ট্রের অবমাননা ও অবিচার (পর্ব ১)

জোয়ান অব আর্ক

জোয়ান অব আর্ক ব্রিটিশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফ্রান্সকে বিজয়ী করতে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। অথচ তাকে ডাইনি আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। যদিও পুড়িয়ে মেরে ফেলার পর তার মৃত্যুর ২৫ বছর পর পোপ ক্যালিক্সটাস-৩ তার এই হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজ নতুন করে শুরু করেন এবং সেই বিচারে জোয়ান নিষ্পাপ ও সন্ত (সেন্ট) এবং শহীদ প্রমাণিত হয়। মৃত্যুপরবর্তী বিচারে জোয়ান নির্দোষ প্রমাণিত হলে তাকে সন্ত বা সেইন্ট ঘোষণার সাথে সাথে তার নির্মম হত্যাকাণ্ডের সূত্র ধরে ফরাসিরা ফ্রান্স থেকে চিরতরে ইংরেজদের সকল অধিকার ও চিহ্ন মুছে দেওয়ার প্রয়াস শুরু করে। কিন্তু পেছনে তাকালে দেখি এই জোয়ান অসম্ভব সরল এক কিশোরী ছিল। ১৪১২ খ্রিস্টাব্দে জোয়ানের জন্মের সময়কালে ফ্রান্সের রাজা ষষ্ঠ চার্লস উন্মাদ হয়ে যান ও রাজ্য পরিচালনায় অক্ষম হয়ে পড়েন এবং রাজার ভায়েরা রাজক্ষমতার জন্য কলহে লিপ্ত হন। ইংলিশ রাজা পঞ্চম হেনরি এর পুরো সুযোগ নিয়ে ১৪১৫ সালে ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলের শহরগুলো দখল করে নেন। এদিকে সপ্তম চার্লসের চার ভাই মারা গেলে, তিনি মাত্র ১৪ বছর বয়সে ফ্রান্সের সিংহাসনে বসেন। আর বার্গুন্ডিয়ানরা ইংরেজদের সঙ্গে হাত মেলায়। কথিত আছে, মাত্র ১৩ বছর বয়সে মাঠে ভেড়ার পাল চরানোর সময় কৃষককন্যা জোয়ান দৈববাণী শুনতে পান যে, তাকে মাতৃভূমির স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার ও ফ্রান্সের প্রকৃত রাজা মুকুটবিহীন সম্রাট সপ্তম চার্লসকে ক্ষমতায় ফের বসানোর জন্য বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। তাই ১৪২৯ খ্রিস্টাব্দের ২৮ এপ্রিল, জোয়ান পুরুষ নাইটদের পোশাক পরিধান করে একটি সাদা ঘোড়ায় চরে পঞ্চক্রূশধারী তরবারি হাতে ৪০০০ সৈন্য নিয়ে অবরুদ্ধ নগরী অর্ল্যান্ডে ঢুকে পড়েন এবং তিনি তৎকালীন ফ্রেঞ্চ নেতৃত্বের রক্ষণাত্মক রণকৌশল পরিহার করে আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন করে অর্ল্যান্ডকে মুক্ত করেন। পরের দৃশ্যে আমরা দেখি, ১৬ জুলাই ১৪২৯ সাল। সপ্তম চার্লস ফ্রান্সের রাজা হিসেবে পুনরায় সিংহাসনে অভিষিক্ত হন এবং জোয়ানকে তার অসামান্য সাহসিকতা এবং বুদ্ধিমত্তার জন্য ফ্রান্সের রাজসভায় একটি বিশেষ সম্মানিত পদে অভিষিক্ত করেন।

জোয়ান শিক্ষিত ছিলেন না, কিন্তু তার মেধা এবং অসম্ভব বীরত্বের জন্য ফ্রান্সের রাজসভার অন্যান্য পুরুষ সদস্যগণ তাকে মনে মনে হিংসা ও অপছন্দ করতে শুরু করল। তারা তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভয় পেয়ে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রেও লিপ্ত হলো, কেননা রাজা সপ্তম চার্লস জোয়ানকে ভীষণ পছন্দ এবং বিশ্বাস করতেন। জোয়ান ইংরেজদের সাথে একটি যুদ্ধে লিপ্ত হলে রাজসভার ধর্মব্যবসায়ী যাজকরা রাজাকে বোঝান জোয়ানের এই ধর্মযুদ্ধ রাজাকে ফরাসিদের কাছে ‘শয়তানে’ পরিণত করবে। তৎক্ষণাৎ রাজা জোয়ানকে ডেকে যুদ্ধ বন্ধ করার নির্দেশ দেন এবং ইংরেজদের সাথে সমঝোতায় আসতে বলেন। কিন্তু একরোখা এবং জেদী জোয়ান রাজার আদেশ অমান্য করেই যুদ্ধ চালিয়ে যান। ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দের ২৩ মে সেনাবাহিনীর একটি অংশ তাকে আটক করে ফেলে। প্রাথমিকভাবে তিনি আত্মসমর্পণ করেননি। আটক অবস্থায় জোয়ান কয়েকবার পালানোর চেষ্টা করেন। একবার তিনি ৭০ ফুট উঁচু টাওয়ার থেকে নিচের মাটিতে লাফিয়ে পড়ে বার্গুন্ডিয়ান শহর আরাসে পালিয়ে যান। ব্রিটিশ সরকার তাকে বার্গুন্ডিয়ান ডিউক ফিলিপের কাছ থেকে কিনে নেয়। এক ইংরেজ ধর্মজীবী পাদ্রির অধীনে ১৪৩১ সালের ৯ই জানুয়ারি তার বিচার কার্যক্রম আরম্ভ হয়। প্রহসনের এ বিচারে তাকে কোন আইনজীবী দেয়া হয়নি।

বিচারে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে ‘তার ওপর ঈশ্বরের বিশেষ দয়া আছে’—তিনি এমন বিশ্বাস পোষণ করেন কিনা। জবাবে জোয়ান বলেছিলেন, “যদি আমি তা বিশ্বাস না করি তবে ঈশ্বর যেন আমাকে যেখানে আছি সেখানেই রেখে দেন, আর যদি বিশ্বাস করি তবে ঈশ্বর যেন আমাকে রক্ষা করেন।” আসলে এই প্রশ্নটিই ছিল সাংঘাতিক চালাকিপূর্ণ। যদি জোয়ান বলতেন, “হ্যাঁ করি”, তবে তাকে ধর্মের বিরুদ্ধে যাবার অভিযোগ আনতেন আর যদি জোয়ান বলতেন “না”, তবে বলা হতো তিনি নিজের অভিযোগ নিজেই স্বীকার করেছেন। ছলচাতুরি বিচারে আদালত তাকে ১২ নম্বর আর্টিকেল অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত করে। বিচারে তার কার্যকলাপকে প্রচলিত ধর্মমতের বিরোধী আখ্যা দিয়ে তাকে ‘ডাইনি’ সাব্যস্ত করা হয়। ... তার কোনো আইনজীবী না থাকাতে জোয়ানকে রায় বিস্তারিত পড়ে শোনানোও হয়নি এবং জোয়ান প্রাথমিকভাবে বুঝতেও পারেননি, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ১৪৩১ খ্রিস্টাব্দের ৩০ মে ফ্রান্সের রোয়েনে ফরাসি বীরকন্যা জোয়ান অব আর্ককে ডাইনি অপবাদ দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়। সে সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৯। জোয়ানের মৃত্যুর পর ব্রিটিশরা তার কয়লা হয়ে যাওয়া শরীরকে প্রদর্শন করে যাতে কেউ কোনোদিন দাবি না করতে পারে জোয়ান বেঁচে পালিয়ে গেছে।

গ্যালিলিও

বিজ্ঞানী গ্যালিলিও একজন ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ এবং দার্শনিক যিনি বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সাথে বেশ নিগূঢ়ভাবে সম্পৃক্ত। তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদানের মধ্যে রয়েছে দূরবীক্ষণ যন্ত্রের প্রভূত উন্নতি সাধন যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা। নিউটনের গতির প্রথম এবং দ্বিতীয় সূত্র এবং কোপারনিকাসের মতবাদের পক্ষে অতি গুরুত্বপূর্ণ অবজারভেশন ছিল তার। বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের মতে আধুনিক যুগে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের এত বিশাল অগ্রগতির পেছনে গ্যালিলিওর চেয়ে বেশি অবদান আর কেউ রাখতে পারেনি। বৃহস্পতির উপগ্রহ আবিষ্কার থেকে চার্চের প্রভাবশালী পোপদের সাথে বিবাদ, তার জীবন ছিল ব্যাপক বৈচিত্রময়। তাই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ তার গুণের চর্চা করছে আর তার জীবন থেকে সাথে পাচ্ছে অফুরন্ত প্রেরণা। বিজ্ঞান আর ধর্মের বিরোধপূর্ণ এক সমাজে জন্মে অসম সাহসিকতায় বিজ্ঞানকেই বেছে নিয়েছিলেন গ্যালিলিও গ্যালিলি।

তিনি যখন বিজ্ঞান চর্চা শুরু করেন, তখন সমাজে তিনটি বিষয়ে তীব্র দ্বন্দ্ব ছিল। প্রথমত, সমাজের একটি শ্রেণী সবকিছুকে বৈজ্ঞানিকভাবে চিন্তাভাবনা করত। আরেক শ্রেণী ছিল যারা অ্যারিস্টটলের ভুল তত্ত্বগুলোতে বিশ্বাস করত। কিন্তু তৃতীয় আরেকটি শ্রেণী ছিল, যারা ছিল সংখ্যায় সবচেয়ে বড় এবং একই সাথে অত্যন্ত প্রভাবশালী, তারা হলো গির্জা, তার পাদ্রী এবং তাদের অনুগত অমাত্যবর্গ এবং ক্যাথলিক চার্চের পোপরা সরাসরিই বিজ্ঞানের বিরোধিতা করত। বিজ্ঞানীদের কোনো কথা বাইবেলের বিপরীতে গেলেই তাদের জীবনে নেমে আসত অকল্পনীয় শাস্তি। জীবনের শেষ আটটি বছর তিনি কাটিয়েছিলেন গৃহবন্দী হয়ে। তার সামনে তার মেয়েকে এনে রেপ করে ফেলার ভয় দেখানো হতো। রাতে ঘুমাতে পারতেন না তিনি। মেয়ের মুখ ভাসত একদিকে। অন্যদিকে তার সত্য প্রকাশের প্রতিশ্রুতি। নিষিদ্ধ করা হয় তার লেখা বইও। কিন্তু শেষ অব্দি জয় হয় সত্যের। ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে গ্যালিলিও তার বিখ্যাত বই ‘ডায়ালগ’ প্রকাশ করেন।

বইটি প্রকাশের সাথে সাথে গির্জার পাদ্রীগোষ্ঠী তাদের প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং গ্যালিলিওকে রোমে ডেকে পাঠায়। ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর থেকে ১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাস অব্দি গ্যালিলিওর বিচার কাজ চলে। এ সময় গ্যালিলিওকে জেলে যেতে হয়নি। জেরায় গ্যালিলিও প্রথমে স্বীকার করতে না চাইলেও শেষ পর্যন্ত তাকে শারীরিক নির্যাতনের হুমকি দিয়ে স্বীকার করানো হয় যে, তিনি ডায়ালগে কোপারনিকাসের তত্ত্বকে সমর্থন করেছেন। তাকে ধর্মবিরোধিতার কারণে অভিযুক্ত করা হয়। তাকে গৃহবন্দী করা হয় এবং দুটি আদেশ দেওয়া হয়—ক) বাইরের কোনো মানুষের সাথে দেখা করতে পারবেন না। (খ) ইতালির বাইরে তার কোনো গবেষণা কাজ প্রকাশ করা যাবে না। বলা বাহুল্য তিনি একটিও পালন করেননি। গৃহবন্দী থাকা অবস্থায় তার ডায়লগের একটি কপি হল্যান্ডে ১৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। এসময় তিনি গতিবিজ্ঞানের ওপর তার সারাজীবনের কাজ নিয়ে ‘টু নিউ সায়েন্সেস’ বইটি লেখেন, যা হল্যান্ড থেকে ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। ততদিনে গ্যালিলিও অন্ধ এবং গুরুতর অসুস্থ হয়ে গৃহবন্দীর থাকার ৮ বছরের মাথায় ৭৭ বছর বয়সে ইতালির ফ্লোরেন্সের নিকটে আর্সেট্রি নামক স্থানে ১৬৪২ খ্রিস্টাব্দের ৮ জানুয়ারি মারা যান।

ওয়াল্টার রালেহ

অনেকটা গল্পের মতো। ইংরেজ কবি স্যার ওয়াল্টার রালেহ রানি এলিজাবেথের সামনে কাদামাখা পথে নিজের আলখাল্লা বিছিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে রানির পায়ে কাদা না লাগে! রানি এলিজাবেথকে ভালোবাসতেন তিনি? এটি জানা যায়নি। তবে একথা সত্য তিনি রানির পায়ে যাতে ধুলো না লাগে সে জন্য কাপড় বিছিয়ে দিতেন। ২০০১ সালে জেমস কিভ্যাস নামের বিট্রিশ ইতিহাসবিদ ‘আনটোল্ড স্টোরি এবাউট কুইন এলিজাবেথ’ নামের বইতে লেখেছেন, রালেহ’র সাথে গোপনে দেখা করতেন এলিজাবেথ। দুজনের মধ্যে প্রেমের রিলেশন গড়ে উঠেছিল। এলিজাবেথ রালেহ’র কবিতার ভক্ত ছিলেন। দুজনের মধ্যে শারীরিক সম্পর্কও হয়েছিল কয়েকবার। এটি এক সৈনিকের বরাতে ইতিহাসবিদ জানান। সেটি সম্ভব ছিল হয়তোবা তিনি কবি ছিলেন বলেই! শুধু কবি নন, ইতিহাসবিদ, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক, সৈনিক ছিলেন। তিনিই আমেরিকাতে প্রথম ইংরেজি উপনিবেশের প্রতিষ্ঠাতা যিনি, ভার্জিনিয়া থেকে তামাক এনে ইংল্যান্ডের মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তার জীবনেও অপেক্ষা করছিল ট্র্যাজেডি। যিনি প্রতি রাতে বস্তিতে যেতেন, উদ্যানে যেতেন, গিয়ে দেখতেন কেউ ক্ষুধার্ত আছে কিনা, থাকলে খাওয়াতেন। যিনি একজন সৈনিক হিসেবে ছিলেন তুখোড়, সেই তাকেই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মরতে হয়েছিল।

আরো পড়ুন ➥ মহান শিল্পীদের ক্ষত ও ভালোবাসাসমূহ

লর্ড কোভাম এবং অন্যান্যদের সঙ্গে জেমস ১-কে হত্যা করার এবং লেডি আরবেলা স্টুয়ার্টকে সিংহাসনে বসানোর জন্য ষড়যন্ত্র করার দোষে অভিযুক্ত করা হয়েছিল তাকে। ১৬০৩ খ্রিস্টাব্দে জুলাই মাসে, রানী এলিজাবেথ ১-এর প্রাক্তন প্রিয় স্যার ওয়াল্টার ররালেহকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে বিচার করা হয়েছিল, দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল এবং মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হয়েছিল। লন্ডনের টাওয়ারে তাকে ‘জিজ্ঞাসাবাদ’ করার পরে ‘লর্ড কোভামের’ স্বাক্ষরিত স্বীকারোক্তি তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রমাণ হিসাবে গণ্য করা হয়েছিল। তবে শেষ অব্দি স্যার ওয়াল্টার রালেহ’র মৃত্যুদণ্ড হয় ১৬১৮ সালের ১৬ অক্টোবর, তাঁর আইনত মৃত্যুর ১৫ বছর পরে।

ফিওদর দস্তয়ভস্কি

দস্তয়ভস্কির পিতা মিখায়েল আন্দ্রিয়েভিচ ছিলেন মস্কোর এক হাসপাতালের ডাক্তার। তাঁর মায়ের মৃত্যুর পরে বাবা মিখায়েল আন্দ্রিয়েভিচ হাসপাতালের চাকরি ছেড়ে দিয়ে পাকাপাকিভাবে গ্রামে গিয়ে বসবাস করতে আরম্ভ করলেন। দস্তয়ভস্কি আর তার ভাইকে ভর্তি করে দিলেন মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং একাডেমিতে। গ্রামে গিয়ে অল্পদিনেই সম্পত্তি বাড়িয়ে ফেললেন মিখায়েল। কিন্তু, মিখায়েলের অত্যাচার এবং অন্যায় আচরণে তার গ্রামের প্রজাদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বেঁধে উঠতে থাকে। কয়েকজন প্রজা তার নিজের গাড়িচালকের সাথে শলাপরামর্শ করে নির্জনে নিয়ে গিয়ে মিখায়েলকে হত্যা করে। বাবার এ মৃত্যু দস্তয়ভস্কির জীবনে নিয়ে আসে বিরাট আঘাত। একদিকে বাবাকে ঘৃণা করতেন অন্যদিকে বাবার মৃত্যুর সময় পাশে না থাকায় মিখাইল মারা যাওয়ার পর এক অপরাধবোধ তার মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। বাবার মৃত্যুর পর নিজেকেই অপরাধী বলে মনে হলো তার। এর থেকে জন্ম নিল এক অসুস্থ মনোবিকার। তাই পরবর্তীকালে কোনো মৃত্যুশোক, আঘাত বা উত্তেজনার প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে এলেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়তেন, ঘন ঘন দেখা দিত মৃগীরোগ। সারা জীবনে আর তিনি এই অসুখ থেকে মুক্তি পাননি।

নিঃসঙ্গতা, ক্লান্তি ভোলার জন্য জুয়া খেলা ধরেছিলেন দস্তয়ভস্কি। অধিকাংশ দিনই নিজের শেষ সম্বলটুকু জুয়ায় হারিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে আসেন। মাইনের টাকা কয়েক দিনের মধ্যেই ফুরিয়ে যায়। অর্থ সংগ্রহের তাগিদে ঠিক করলেন ফরাসি জার্মান সাহিত্য অনুবাদ করবেন। তিনি এবং তার ভাই মিখায়েল একসঙ্গে ফরাসি সাহিত্যিক বালজাকের উপন্যাস অনুবাদ করতে আরম্ভ করেন। ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে একটি রাশিয়ান পত্রিকায় তা প্রকাশিত হতে থাকে। ক্রমশই চাকরি অসহ্য হয়ে উঠল। সাহিত্যজগত তাকে দুর্নিবারভাবে আকর্ষণ করছিল। তিনি চাকরি ছাড়লেন। নিজেকে পুরোপুরি সাহিত্য রচনায় ব্যস্ত রাখলেন। ৩০ সেপ্টেম্বর ১৮৪৪ তার ভাইকে একটা চিঠিতে দস্তয়ভস্কি লিখলেন, “একটা উপন্যাস শেষ করলাম। এটা সম্পূর্ণ আমার নিজের লেখা। এখন পাণ্ডুলিপি থেকে নকল করছি। একটা পত্রিকায় পাঠাব। জানি না তারা অনুমোদন করবে কিনা। তা আমি এই রচনায় সন্তুষ্ট হয়েছি।”

এই সময় দস্তয়ভস্কির জীবনে নেমে এলো ট্র্যাজেডি। রাশিয়ার সম্রাট জার ছিলেন এক অত্যাচারী শাসক। তার শাসনের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠেছিল ছোট ছোট সংগঠন। এক বন্ধুর মারফত দস্তয়ভস্কি পরিচিত হলেন এর একটি সংগঠনের সাথে। এদের আসর বসত প্রটাসভস্কি নামে এক তরুণ সরকারি অফিসারের বাড়িতে। কিন্তু অত্যাচারী জার প্রথম নিকোলাসের গুপ্তচরের নজর এড়াল না। তাদের মনে হলো এরা রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। রিপোর্ট গেল সরকারি দপ্তরে। যথারীতি একদিন প্রটাসভস্কির আসর থেকে বাড়িতে ফিরে এসে খাওয়া-দাওয়া করে রাতে ঘুমিয়ে পড়লেন দস্তয়ভস্কি। হঠাৎ শেষ রাতে পদশব্দে তার ঘুম ভেঙে গেল। চেয়ে দেখলেন তার ঘরে জারের পুলিশ বাহিনী। কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই তাঁকে গ্রেফতার করা হলো (এপ্রিল ১৩, ১৮৪৯)।

অন্য অনেকের সাথে তাকে বন্দী করে রাখা হলো আলোবাতাসহীন ছোট একটি বন্দীশালায়। দিনে মাত্র তিন-চারবার ঘরের বাইরে আসার সুযোগ মিলত। এক দুঃসহ মানসিকতার মধ্যেই তিনি লেখেন একটি ছোট গল্প ‘ছোট্ট নায়ক’। শুরু হলো বিচার। বিচারে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য দণ্ডাদেশ পত্র পাঠিয়ে দেওয়া হলো সম্রাট নিকোলাসের কাছে। সম্রাট তাদের মৃত্যুদণ্ড রোধ করে সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দিলেন। দস্তয়ভস্কির চার বছরের জন্য সাইবেরিয়ায় নির্বাসন আর তারপর চার বছর সৈনিকের জীবন যাপন করার আদেশ দেওয়া হলো। ক্রিসমাস ডে-তে পায়ে চার সের ওজনের লোহার শেকল পরিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো সাইবেরিয়ার বন্দীনিবাসে (জানুয়ারি ১৮৫০)।

চারদিকে নরকের পরিবেশ। খুনি বদমাইশ শয়তানের মাঝখানে দস্তয়ভস্কি একা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। ছোট অন্ধকার কুঠুরিতে শীতকালে অসহ্য ঠান্ডা। ছাদের ফুটো দিয়ে বরফ ঝরে পড়ে মেঝেতে পুরু হয়ে যায়। কনকনে তুষারঝড়ে হাত-পা ফেটে রক্ত ঝরে। গ্রীষ্মের দিনে আগুনের দাবদাহ। তারই মাঝে হাড়ভাঙা খাটুনি। ক্লান্তিতে, পরিশ্রমে শরীর নুয়ে পড়েছে। সে তার জীবনের এক মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতার কথা পরবর্তীকালে জ্বলন্ত অক্ষরে লিখে গিয়েছেন তার ‘দ্য হাউস অফ দ্য ডেড’ (মৃত্যুপুরী) উপন্যাসে। দীর্ঘ চার বছর (১৮৫০-১৮৫৪) সাইবেরিয়ার বন্দীনিবাসে কাটিয়ে অবশেষে লোহার বেড়ির বন্ধন থেকে মুক্তি পেলেন। ওমস্কের বন্দীনিবাস থেকে দস্তয়ভস্কিকে পাঠানো হলো সেমিপালতিনস্ক শহরে। কিন্তু সামরিক জীবনের নিয়ম-শৃঙ্খলা কুচকাওয়াজ তার রুগ্ন শীর্ণ অসুস্থ অনভ্যস্ত শরীরে মাঝে মাঝে অসহনীয় হয়ে উঠত। তবুও নিজের যোগ্যতায় কিছুদিনের মধ্যেই সামরিক বিভাগে উঁচু পদ পেলেন।

এই সময় শহরের প্রধান সেনানায়ক জানতে পারলেন তার সৈন্যদলের মধ্যে একজন শিক্ষিত লেখক আছেন। তিনি দস্তয়ভস্কিকে ডেকে পাঠালেন। তারপর থেকে প্রতিদিন দস্তয়ভস্কি তার বাড়িতে গিয়ে তাকে খবরের কাগজ পড়ে শোনাতেন। এখানেই একদিন পরিচয় হলো এক মদ্যপ সরকারি কর্মচারী আলেকজান্ডার ইসায়েভ এবং তার সুন্দরী তরুণী স্ত্রী মারিয়া ডিমিট্রিয়েভনার সাথে। তারপর থেকে মারিয়ার আকর্ষণে শুরু হলো তার সেখানে যাতায়াত। এর কিছুদিনের মধ্যে ইসায়েভ বদলি হয়ে গেলেন ৪০০ মাইল দূরের এক শহরে। মারিয়ার অদর্শনে আবার মানসিক দিক থেকে বিপর্যস্ত হয়ে গেলেন দস্তয়ভস্কি। কয়েক মাস পর মারিয়ার স্বামী ইসায়েভ মারা গেলেন। বছর খানেক পর একদিন দস্তয়ভস্কি গেলেন মারিয়ার কাছে। সেখানে গিয়ে যা দেখলেন তাতে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। মারিয়া ইতোমধ্যেই এক তরুণ স্কুলশিক্ষকের প্রেমে পড়েছে। অনেক অনুনয়-বিনয় করে তার মত পরিবর্তন করতে সক্ষম হলেন। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে দুজনের বিয়ে হলো। সারা দিনের পরিশ্রম উত্তেজনায় বাসরঘরেই মূর্ছিত হয়ে পড়লেন দস্তয়ভস্কি। সুখের পাত্র পূর্ণ হওয়ার আগেই অপূর্ণ রয়ে গেল সব আকাঙ্ক্ষা। আরো ২ বছর থাকার পর শেষ হলো তার বন্দীজীবন। সামরিক বিভাগের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে এসে বাসা বাঁধলেন মস্কোর কাছাকাছি টিভর শহরে। এখানেই তিনি লিখেছিলে ‘দ্য হাউস অফ দ্য ডেড’ (মৃত্যুপুরী) উপন্যাস।

আরো পড়ুন ➥ বিখ্যাত সৃষ্টিশীলদের অবসাদ ও স্যাটায়ার

এই উপন্যাস প্রকাশের সাথে সাথে দস্তয়ভস্কির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। খ্যাতির সাথে অর্থও আসতে আরম্ভ করল। কিন্তু মারিয়ার বিলাস-ব্যসনের সাথে তাল রাখতে ব্যর্থ হলেন দস্তয়ভস্কি। যন্ত্রণা হতাশা ভোলার জন্য ক্রমশই তিনি সৃষ্টির গভীরে ডুব দিলেন। এই সময় দস্তয়ভস্কির জীবনে এলো পলিনা। এক প্রাণোচ্ছল সুন্দরী তরুণী। দুজনে গেলেন ফ্রান্সে। কিন্তু পলিনাকে কাছে পেলেন না দস্তয়ভস্কি। এক পুরুষে মন ভরে না পলিনার। ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল পলিনার সঙ্গে। ততদিনে হাতের অর্থও ফুরিয়ে এসেছে। জুয়ার নেশায় মাতাল দস্তয়ভস্কি। এক একদিন সব হারিয়ে গায়ের কোট খুলে দিয়ে আসতেন। কোনো দিন বা জিততেন কিন্তু তার পরদিন আবার সব হারাতেন। এই জুয়াড়ি জীবনের অভিজ্ঞতাকে অবলম্বন করেই পরবর্তীকালে লিখেছিলেন ‘জুয়াড়ি’। ইতোমধ্যে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল মারিয়া। তার সেবা-যত্নের কোনো ত্রুটি করলেন না। কিন্তু তার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে মারা গেল মারিয়া। স্ত্রীর মৃত্যুর মাত্র তিন মাস বাদে মারা গেলেন বড় ভাই মাইকেল। মাইকেলের মৃত্যু তার কাছে অনেক বেশি আঘাত নিয়ে এলো। তার জীবনের অনেকখানি জুড়ে ছিল ভাইয়ের অস্তিত্ব!

১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দের ৪ অক্টোবর, ২০ বছরের অত্যন্ত সাদামাটা চেহারার এক স্টেনোগ্রাফার হিসাবে দস্তয়ভস্কির কাছে কাজ করতে আসা অ্যানার সঙ্গে পরিচয় হয় দস্তয়ভস্কির। দস্তয়ভস্কির মনে হলো মারিয়া, পলিনা তাকে যা দিতে পারেনি, সেই সংসারের সুখ হয়তো দিতে পারবে অ্যানা। তাই সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। দস্তয়ভস্কির বয়স তখন ৪৫, অ্যানার ২০। সকলের বিরোধিতা সত্ত্বেও তাদের বিয়ে হলো। ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হলো ‘দি ব্রাদার্স কারামাজোভ’। এক মহাকাব্যিক উপন্যাস। ব্যাপ্তিতে, গভীরতায়, চরিত্র সৃষ্টিতে ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্টের পাশাপাশি এই উপন্যাসও তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। সমস্ত দেশ জুড়ে তিনি পেলেন এক অভূতপূর্ব শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা। তাকে বলা হলো জাতির প্রবক্তা। ক্রমশই তার শরীর ভেঙে পড়ছিল। শেষে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ১৮৮১ সালের ৯ সালে মারা যাওয়ার আগে সেই বিখ্যাত উক্তি করেন, “লাইফ ইজ এ লাই।”

লর্ড বায়রন

বায়রন একজন ব্রিটিশ কবি এবং রোমান্টিক আন্দোলনের অন্যতম মুখ্য ব্যক্তি। কিন্তু ব্রিটিশ হলেও তিনি গ্রিসের পক্ষে যুদ্ধ করেন। বায়রনের বিখ্যাত কর্মের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ বর্ণনামূলক কবিতা ডন জুয়ান এবং চাইল্ড হ্যারল্ড’স পিলগ্রিমেজ এবং ছোট গীতি কবিতার মধ্যে রয়েছে ‘শি ওয়াকস ইন বিউটি’। ইংরেজি সাহিত্যের সবচেয়ে আলোচিত কবিদের একজন লর্ড বায়রন। মূলত রোমান্টিক ঘরানার এ কবির জন্ম ব্রিটেনের লন্ডনে। কিন্তু তাঁর মৃত্যু হয় একজন গ্রিক বীর হিসেবে। ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে বিভিন্ন কারণে ইংল্যান্ড ছাড়েন বায়রন। অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন গ্রিসের স্বাধীনতাযুদ্ধে। একসময় তিনি আবিষ্কার করেন গ্রিক নেতাদের অন্তর্দ্বন্দ্বই স্বাধীনতার পথে প্রধান অন্তরায়। ১৮২৩ থেকে এই দ্বন্দ্ব মেটানোয় মনোনিবেশ করেন তিনি। কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশে অসুস্থ হয়ে ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৯ এপ্রিল, মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মারা যান। গ্রিসের অ্যাটোলিয়ায়। বায়রনই বলতে পেরেছিলেন, “স্বাধীনতাকামী যে কোনো জাতির পক্ষে লড়াই করে জীবন দেওয়া অনেক বীরত্বের।”

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;