স্ট্রিট লিটারেচার



দেবদুলাল মুন্না
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

রুশ ফিউচারিস্ট কবি ও নাট্যকার ভ্লাদিমির ক্লেভনিকভ শিল্প সাহিত্যকে বলেছিলেন ‘বাচনিক বাজার’, যে বাজারকে দখল করার জন্য লেখকেরা ‘অদৃশ্য যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়েছেন। জার্মান লেখক গ্যেটে সাহিত্যকে ‘বৌদ্ধিক পণ্যের বিশ্ববাজার’ বলেছিলেন। ফরাসি কবি পল ভ্যালেরি বলেছিলেন, ‘সংস্কৃতি হচ্ছে পুঁজি’, আর সাহিত্য হচ্ছে এই সংস্কৃতিরই উজ্জ্বলতম শস্য। মানে শিল্পসাহিত্যেরও বাজার থাকে। সেই বাজার বইপাড়ায়। কিন্তু যে কবি কবিতার নেশায় বুঁদ হয়ে এসেছে শহরে, পায়নি তার লেখা কোনো প্রধান সাময়িকীগুলোতে ঠাঁই, এগিয়ে আসেন না প্রকাশক, তার কবি হওয়ার ইচ্ছা কি তবে মরে যাবে? একসময় বলা হতো কেন? বটতলায় যাও। বটতলাটা জানি কোনদিকে?

বটতলা কলকাতা তথা বাংলার মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পের পুরনো স্থান। বর্তমানে এটি কলকাতার একটি থানার নাম। শোভাবাজার-চিৎপুর এলাকার একটি বিশাল বটগাছকে কেন্দ্র করে এই নামের উৎপত্তি হয়। ঊনিশ শতকে বাংলার মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্প এখানেই শুরু হয়েছিল। এই বটগাছ এবং তার পাশের এলাকায় যে মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্প গড়ে উঠেছিল, তা প্রধানত সাধারণ ও অর্ধশিক্ষিত পাঠকের চাহিদা মেটাত। তাদের রুচি অনুযায়ী গ্রন্থ, যেমন পুথি, পাঁচালি, পঞ্জিকা, পুরাণ, চটি, লোককাহিনী ইত্যাদি এখান থেকে প্রকাশিত হতো। হীনার্থে ‘বটতলার পুথি’ নামে খ্যাত ছিল। তবে ঊনিশ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত দেশের প্রকাশনা শিল্পে বটতলা সাহিত্যের নিজস্ব একটা স্থান ছিল। এর যথার্থ প্রমাণ পাওয়া যায় বঙ্কিমচন্দ্রের একটি উক্তিতে। তিনি দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) উপন্যাসে বটতলার দেবীর নিকট নিজের লেখনীশক্তির বৃদ্ধি কামনা করেছেন, যাতে লেখার মাধ্যমে তিনি প্রচুর অর্থ লাভ করতে পারেন। এ উক্তির পেছনে প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গ থাকলেও এর মাধ্যমে তৎকালে বটতলা সাহিত্যের ব্যাপক বিস্তার ও প্রভাবের চিত্রটিই ফুটে উঠেছে।

ঊনিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত অধিকাংশ পুস্তক ও প্রচারপত্র এই বটতলা থেকেই প্রকাশিত হতো। কিন্তু ১৮৫০-এর দশক থেকে বটতলা মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে তার পূর্ব ঐতিহ্য হারাতে থাকে। কিন্তু যতদিন যায়, সময় পাল্টায়, প্রকাশনা শিল্পের উন্নতি হতে শুরু করে। রুচিসম্পন্ন লেখক ও প্রকাশকরা বটতলাকে একটি উপহাসের বিষয়ে পরিণত করেন। এসব হচ্ছে বাংলা সাহিত্যের শুরুর দিকের গল্প। মধ্যে একটা কথা বলি বাংলাদেশের রিজিয়া রহমানের যে ‘বটতলার উপন্যাস’ এটি কিন্তু বটতলার না। তবে চট্রগ্রামের রমা দেবী বন্দরনগরীতে ঠিকই নিজে বই লিখে হেঁটে হেঁটে ‘বই নেবেন বই’ বলে বিক্রি করতেন। রমা চৌধুরীর জন্ম ১৯৪১ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামে। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন । ১৯৬২ সালে কক্সবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেন। সেই থেকে ১৬ বছর শিক্ষকতা করেছেন ।কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বদলে দেয় তার জীবন। যুদ্ধে পাক বাহিনীর কাছে সম্ভ্রম হারিয়ে হন বীরাঙ্গনা। ’৭১-এর ১৩ মে, পাকহানাদার বাহিনী সর্বস্বান্ত করে তাঁকে। তাঁর স্বামী তখন ভারতে। সেদিন তিন সন্তান নিয়ে তিনি ছিলেন পোপাদিয়ায় তার বাবার বাড়িতে। ওই এলাকার পাকিস্তানী দালালদের সহযোগিতায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর লোকজন তাঁর বাড়িতে হানা দেয়। সে সময় সেখানে ছিল তাঁর মা ও তিন শিশু সন্তান। কোলে দুগ্ধপোষ্য সন্তান থাকা সত্ত্বেও নির্দয় পাকবাহিনী নিস্তার দেয়নি তাঁকে। পাঁচ বছর ৯ মাস বয়সী ছেলে সাগর ও তিন বছর বয়সী টগরের সামনেই তাঁকে ধর্ষণ করে পাকিস্তানী খানসেনা। পরবর্তী ধর্ষণের ভয়ে হানাদারদের কাছ থেকে কোনোমতে মুক্ত হয়ে পুকুরপাড়ে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকেন। শুধু নির্যাতন করেই ক্ষান্ত হয়নি নর পিশাচরা। চোখের সামনে গানপাউডার দিয়ে তাঁর বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় পাকসেনারা। নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিল পরিবারটিকে। ঘরের মূল্যবান মালামাল আর তাঁর লেখা সাহিত্য কর্মগুলো পুড়ছিল চোখের সামনেই।

আরো পড়ুন ➥ তবু সে দেখিল কোন ভূত

পরের ইতিহাস আরো করুণ আরো বেদনার। এবার শুরু হলো নিকটজন আর সমাজের কাছে লাঞ্ছিত হওয়ার পালা। সমাজের চোখে তখন তিনি একজন ধর্ষিতা নারী। সামাজিকভাবে লাঞ্ছনার শিকার রমা তখন সম্ভ্রম হারানোর মর্মান্তিক ঘটনাকে আড়াল করে তিন সন্তান আর মাকে নিয়ে পথে পথে। মেলেনি নিরাপত্তার আশ্রয়। দিনান্তে জোটেনি দু মুঠো ভাত। সহযোগিতা, সহমর্মিতা আসেনি কারো কাছ থেকেই। সবকিছু হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন রমা চৌধুরী। ‘একাত্তরের জননী’সহ ১৮টি বই লিখেছেন তিনি। জীবিকার প্রয়োজনে সেই বই ফেরি করেছেন পায়ে হেঁটে, চট্টগ্রামের পথে পথে। প্রথমে লিখতেন একটি পাক্ষিক পত্রিকায়। সম্মানীর বদলে পেতেন প্রত্রিকার ৫০টি কপি। পরে নিজের লেখা বই নিজেই প্রকাশ করে ফেরি করেছেন। বই বিক্রি করতে পারলে আহার জুটত, না হলে উপোস। সেই রমা চৌধুরীকে আমরা কি মনে রেখেছি? তাঁর বই না পড়ি তাঁর বেদনাগুলো পড়ার চেষ্টা করেছি। উত্তর সম্ভবত, না। ইউরোপে অবশ্য স্ট্রিট লিটারেচার মুভমেন্ট শুরু হয়েছিল অনেক আগে।

কবি-লেখকরা প্যারিসের রাস্তায় বসে বই লিখতেন শাদা কাগজে। এরপর এটিই কার্বনকপি করে বিক্রি করতেন। প্যারিসের মঁ মার্ত্র আর মুল্যাঁ রুজ দুটি ছিল ক্যাবারে কাফে। এর সামনে ভিড় জমাতেন কবি-শিল্পীরা। এঁকে যেতেন একের পর এক মানবীশরীর। সেইসঙ্গে তাদের ঘিরে সামাজিক অনুষঙ্গ। রেখায় অবাক করা বোল্ডনেস। সে যেন তাঁর মেজাজের মতোই একরোখা। অল্প কটি বলিষ্ঠ রেখায় ফুটে উঠছে সেসময়কার ডাকসাইটে সব সুন্দরীদের শরীরী বিভঙ্গ। দেহোপজীবিনীদের উন্মত্ত ব্যালে নাচ ক্যানভাসে ফুটে উঠত।

এগুলোর পাশে ছিল আরো পাশাপাশি কয়েকটা গলি। পাথুরে রাস্তায় বিকেলের রোদ্দুর। পেছনে পাহাড়। এসব গলিতে ছবি এঁকে চলেছেন শিল্পীরা। ছবি আঁকা দেখতে ভিড় জমে শিল্পীকে ঘিরে। কেউ আবার আঁকা ছবির পশরা সাজিয়ে বসেছেন। এ ছবি, ও ছবি দেখতে দেখতে কেউ কিনে নেন একটা। এভাবেই স্মৃতির এক টুকরো প্যারিস তাঁরা নিয়ে যাবেন নিজের শহরে। এদিকে ওদিকে সালঁ, রেস্তোরাঁ। সন্ধেকে স্বাগত জানিয়ে রাস্তার নিয়নবাতি জ্বলার আগে থেকেই সেখানে শুরু হয়ে যায় রঙিন নেশায় ভাসা। হাওয়ায় ভেসে আসে ভায়োলিনের সুর। যে সুরে যেন মন হুহু করে কেঁদে উঠে। চারদিকে এত অফুরন্ত প্রাণ, এত বেদনা। এত এত।

মঁ মার্ত্রেতে গেলেই যারা শিল্পবোদ্ধা তাদের মনে পড়বেই ফরাসি শিল্পের জগতে আরেক বিস্ময় তুলুস লোত্রেক-এর কথা। আর আমার মতো যারা যাননি তারা গুগলে সাধ মেটাবেন। লোত্রেকের ছবি দেখেছি। তাঁর জীবন উপলব্ধি না করলে বোঝা যায় না তাঁর ছবির সাবলীল আর শক্তিশালী রেখাগুলোর উৎস কী। যখন একটু একটু করে মানুষটাকে ধরা যায়, তখনই আরো বেশি করে চেনা যায় লোত্রেকের ছবির বলিষ্ঠ রেখা, রঙের আশ্চর্য বিন্যাস। মাত্র ৩৬ বছরের জীবন। এত কম সময় নিয়ে এসেছিলেন। জিনগত অসুখের প্রকোপে লোত্রেকের সারাটা জীবন কেটেছে অসীম শারীরিক ও মানসিক দোলাচলে। ছোটবেলায় পর পর দু বছর দু পায়েরই ফিমার ভেঙে গিয়েছিল মাঝখান থেকে। তাই মানুষটির উচ্চতাই আর বাড়ল না। আটকে গেলেন সাড়ে চার ফুটে। কিন্তু ক্ষুদ্রকায় এই মানুষটি তার ছবিকে নিয়ে গেলেন অসামান্য এক উচ্চতায়।

কাউন্টের ছেলে লোত্রেক স্বাভাবিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে না পেরে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন রঙের জগতে, ছবির দুনিয়ায়। তাঁর অনেক ছবিই আঁকা মঁ মার্ত্র আর মুল্যাঁ রুজে বসে। কখনো কখনো বিয়ারের টাকার ঘাটতি দেখা দিলে দাঁড়িয়ে যেতেন রাস্তায়। বেশি না, অল্প কিছু ফ্রাঁ। যতটুকু ফ্রাঁ হলে নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা যায়। এঁকেছেন একের পর এক মানবীশরীর। সেইসঙ্গে তাদের ঘিরে সামাজিক অনুষঙ্গ। রেখায় অবাক করা বোল্ডনেস। সে যেন তাঁর মেজাজের মতোই একরোখা। অল্প কটি বলিষ্ঠ রেখায় ফুটে উঠছে সেসময়কার ডাকসাইটে সব সুন্দরীদের শরীরী বিভঙ্গ। দেহোপজীবিনীদের উন্মত্ত ব্যালে নাচ তাঁর ক্যানভাসে ফুটে উঠছে আশ্চর্য ক্ষিপ্রতা আর অসামান্য ভারসাম্যে। পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট যুগের সমকালীন শিল্পীরা মুগ্ধ ছিলেন তাঁর ড্রয়িংয়ে।

শেষ জীবনে অনেকদিন আর ছবিই আঁকতে পারেননি লোত্রেক। দু’পা অকেজো হয়ে যায় ক্রমশ। অনিয়ন্ত্রিত, বোহেমিয়ান জীবনযাপনে দু-দু’বার হৃদরোগ। শরীরে সিফিলিসের বিস্তার। তবু সেই অপরিসীম শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যেও তাঁর ছবির সংখ্যা সাড়ে ছয় হাজারের ওপর। তার মধ্যে ৭৩৭টি ক্যানভাস অনায়াসে তাঁকে নিয়ে যায় প্রতিষ্ঠার শিখরে। তাঁর শিল্পসৃজনকে স্বীকৃতি দেয় ইতিহাস। স্পেস সৃষ্টির ক্ষেত্রে লোত্রেকের ছবিতে জাপানী শিল্পের প্রভাব পড়েছিল। পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট আর্টকে সেটাই খোঁজ দিল নতুন দিগন্তের।

মুল্যাঁ রুজ ধরা দিয়েছে লোত্রেকের ক্যানভাসজুড়ে। শুধু লোত্রেকেরই নয়, ভ্যান গঘেরও মুল্যাঁ রুজের জীবন শিল্পের দুনিয়ায় যুক্ত করেছে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। মুল্যাঁ রুজ ১৮৮৯ সালে প্রথম তৈরি হয়েছিল। প্যারিসে বেড়াতে গিয়ে মুল্যাঁ রুজের ফেরি শো আর ফ্রেঞ্চ ক্যানক্যান ডান্স না দেখতে পেলে অনেকেরই খুব আফসোস হয়। মুল্যাঁ রুজ নিয়ে ছবিও হয়েছে। একবার ১৯৫২-তে। পরে ২০০১-এ আর একবার। সেটা ছিল নিকোল কিডম্যান অভিনীত এক হলিউডি মিউজিক্যাল।

শুধু কি প্যারিসের লোত্রেককে মনে পড়লে হয়? লোত্রেককে মনে পড়া মানেই ইতালির মিলান শহরের ভেনিচে রেস্তেরাঁর পাশের গলিতে যে কবি কবিতা লেখে বিক্রি করতেন সেই মহান সংগ্রামী লিওপার্দিকে ভুলে যাব? সেই করুণ জীবন। ইতালির লিওপার্দি (১৭৯৮-১৮৩৭) যিনি ছিলেন রোমান্টিকতাবাদী কবি। তাঁর কবিতাগুলো অনুবাদ করেই প্রকাশ করা হয় ‘কমপ্লিট পোয়েমস বাই গিয়াকোমো লিওপার্দি’।

আরো পড়ুন ➥ সাহিত্যে যৌনতা

লিওপার্দির বেশিরভাগ কবিতায় গভীর জীবনবোধ প্রকাশিত হয়েছে। জীবনের দুঃখ ও ভোগান্তিকে তিনি ক্ষণস্থায়ী বলেছেন। তিনি বলেছেন, মৃত্যুই মানুষকে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও সুখ এনে দিতে পারে। শুধু জীবনবোধ নয়, প্রকৃতির সৌন্দর্য নিয়ে লিখেছেন মুগ্ধ কবি লিওপার্দি। এই লিওপার্দি মিলান শহরের একটি গলিতে কবিতা লিখতেন এবং বিক্রি করতেন। শাদা কাগজে লিখে বিক্রি করতেন। তখনও তার বই বের হয়নি। পরে প্রথম বই ‘দ্য বুক অব ডার্কনেস’ও রাস্তাতেই ফেরি করে বিক্রি করেছেন। সাহিত্যমহলে তিনি তখনও অস্পৃশ্য। পুরো নাম গিয়াকোমো তালদেগার্দো ফ্রান্সেসকো দি সেলস সাভেরিও পিয়েত্রো লিওপার্দি। ইতালীয় এই কবির জন্ম ১৭৯৮ সালের ২৯ জুন। ইতালির মাখশে অঞ্চলের রেকানাতির এক অভিজাত পরিবারের জন্ম লিওপার্দির। তাঁর বাবা ছিলেন একজন সাহিত্যপ্রেমী। সুখী পরিবারে বেড়ে ওঠা লিওপার্দির শৈশব ছিল আনন্দময়। খুব অল্প বয়স থেকেই তিনি বিভিন্ন বিষয় পড়তে শুরু করেন। এটাই তাঁর কবি হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। পরিবারের ঐতিহ্য অনুযায়ী লিওপার্দির লেখাপড়া শুরু হয় যাজকদের কাছে। তবে তাঁর বেশিরভাগ সময়ই কাটত বাবার পাঠাগারে। সেখান থেকেই তিনি বিভিন্ন বিষয়ে জানতে শুরু করেন। এটাই তাঁর মনের বন্ধ দুয়ার খুলে দেয়। বাবার তত্ত্বাবধানে অল্প সময়ের মধ্যেই ধ্রুপদি সংস্কৃতি ও দর্শনে ভালো দখল চলে আসে লিওপার্দির। কিন্তু সময়ের চাইতে এগিয়ে তাকা লিওপার্দি সেই নিঃসঙ্গ শেরপা যিনি হঠাৎ নিজেকে আবিষ্কার করেন জগতের সবচেয়ে একা ও সঙ্গীহীন মানুষ হিসেবে। শুরু হয় মাদক সেবন। শৈশবের শহর ছেড়ে চলে আসেন মিলানে। তখন তার বয়স কতই বা হবে, মাত্র তেইশ।

১২ থেকে ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত প্রচুর লেখাপড়া করেন লিওপার্দি। লাতিন, গ্রিক ও হিব্রু ভাষায় অনর্গল বলতে ও লিখতে পারতেন তিনি। ধর্ম, দর্শন ও সাহিত্যে তাঁর জানার পরিধি বিশাল ও বিস্তৃত। এসবই পরে তাঁর লেখালেখিকে প্রভাবিত করেছে। ও আচ্ছা মিলানের সেই ভেনিচে রেস্তেরাঁয় অভিজাতরা আড্ডা দিতে যেতেন। সেসময় নেশাতুর ঢুলুঢুলু চোখে লিওপার্দি প্রায় ভিক্ষুকের মতোন বলতেন, ‘একটা নতুন কবিতা, প্লিজ কিনে নেন। আমাকেও আনন্দের ভাগীদার করুন।’ আজ তিনি বিশ্বসেরা। সেই তিনি ১৮৩৭ সালের ১৪ জুন মারা যান।

এমিলি ব্রন্টির মুখ ভাসছে। একটু পরাবাস্তবভাবে। কালো শ্লেট। এর দিকে আমি তাকিয়ে আছি। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় আকাশ যেমন টুকরো টুকরো মতোন ভেঙে পড়ে, ঠিক সেরকম কালো শ্লেটের ভেতরে একটি গোল্ডেনহোল বড়ো হয়ে উঠছে। একটি মেয়ে গম ক্ষেত দিয়ে দৌড়াচ্ছে। কিশোরী। এরপর লন্ডনের রাস্তা। এক তরুণী তার বই বিক্রি করার জন্য ট্র্যাফিক মোড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। গাড়িগুলো উল্কাগতিতে এসে থামলেই যেন সেই তরুণীর কাজ একটা বই এগিয়ে দিয়ে বলা ‘এটি আমার লেখা নভেল। নেবেন?’ এই বলার মধ্যে একটু জড়তা। কিন্তু কী করবেন। তিনি বই বের করেছেন। এই বই বিক্রি করেই তো চলতে হবে যে। আমাদের রমা চৌধুরীর মতো।

এমিলি ব্রন্টি একজন ইংরেজ ঔপন্যাসিক ও কবি। তাঁর একমাত্র উপন্যাস ‘উদারিং হাইটস’। এই বই বিক্রির ফলেই তিনি হয়ে ওঠেন সর্বাধিক পরিচিত। এই বইটিকে এখন ইংরেজি সাহিত্যে একটি ধ্রুপদি রচনা মনে করা হয়। ১৮১৮ সালের ৩০ জুলাই উত্তর ইংল্যান্ডের ওয়েস্ট রাইডিং অব ইয়র্কশায়ারের থর্নটন গ্রামে এমিলি ব্রন্টির জন্ম। তার মায়ের নাম মারিয়া ব্র্যানওয়েল ও বাবার নাম প্যাট্রিক ব্রন্টি। বাবা ছিলেন আইরিশ। ১৮২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তার মায়ের মৃত্যু ঘটে। এমিলির বয়স সেই সময় ছিল তিন। তার তিন দিদি মারিয়া, এলিজাবেথ ও শার্লট কওন ব্রিজের ক্লার্জি ডটার্স স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে তাদের নিগ্রহ ও দারিদ্র্যের সম্মুখীন হতে হয়। এই অভিজ্ঞতার উল্লেখ পাওয়া যায় শার্লটের জেন আয়ার উপন্যাসে। ছয় বছর বয়সে কিছু দিনের জন্য এমিলি তার দিদিদের সঙ্গে একই স্কুলে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। ১৮২৫ সালের জুন মাসে তিনি শার্লট ও এলিজাবেথের সঙ্গে এমিলিও স্কুল ছাড়েন। প্রথাগত শিক্ষা না পেলেও এমিলি ও তার ভাইবোনরা অনেক বইপত্র পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তাদের প্রিয় ছিল ওয়াল্টার স্কট, লর্ড বায়রন ও শেলির রচনা এবং ব্ল্যাকউড’স ম্যাগাজিন। ১৮৪৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। সেই এমিলি ব্রন্টি কি বলতেন জানেন, এটিকে তার বিখ্যাত উক্তি হিসেবেও অনেকে মুখস্থ করেছেন। সেই উক্তিটি ছিল, ‘মানুষ ভীষণ অদরকারি কথা বলে জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটায়!’

এমিলি ব্রন্টিকে না ভালোবেসে পারি? যে প্রতিসকালে ঘুম থেকে উঠে ভাবত আজই তার জীবনে শেষ দিন। আর দিনের শুরুটা করত আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে সম্বোধন করেই ‘হ্যালো এমিলি, লাইফ ইজ বিউটিফুল।’

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;