পিটার শ্লেমিল : এক ছায়াহীন মানুষের কাহিনী



এনামুল রেজা
আডেলবার্ট ফন শামিসো ও তাঁর বই

আডেলবার্ট ফন শামিসো ও তাঁর বই

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের দোকানে লক্ষ্য ঠিক করে খুব কমই গিয়েছি আমি। সুযোগ পেলেই বাংলামোটোর হয়ে শাহবাগ বা নিউমার্কেট এরিয়ার গ্রন্থবিতানগুলোতে এত ঢুঁ মারা হয়, প্রত্যেকবার লক্ষ্য ঠিক করে রাখা সম্ভব না আসলে। এই ব্যাপারটার মধ্যে চাপা উত্তেজনা আছে। অপ্রত্যাশিতভাবে এমন কিছু বই একেকবার হাতে চলে এসেছে, সেসব পাঠান্তে আমি আমার নিরুদ্দেশ ওইসব ভ্রমণকে গোপনে ধন্যবাদ জানিয়েছি।

এভাবেই কোনো এক গ্রীষ্মের দুপুরে ছোট্ট বইটার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। শেলফে ঘুমিয়ে ছিল। হাতে তুলে নিতেই যেন সে জেগে উঠল করতলে, আঙুলের ফাঁকে। বিড়বিড় করলাম, ‘অদ্ভুত তো, ছায়া হারিয়ে ফেলা এক লোকের গল্প। নাম ‘ছায়াবিহীন’। ক্লাসিকের মর্যাদা পাওয়া এক জার্মান নভেলা পিটার শ্লেমিল (Peter Schlemihl)। লেখক আডেলবার্ট ফন শামিসো। ইংরেজি অনুবাদ থেকে সেটি বাংলায় নামিয়েছেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়।

আকারে ছোট হলেও উপন্যাসিকাটির বিষয়বস্তুকে কেন জানি না, খুবই ভারী বলে মনে হলো আমার। কিন্তু ফাউস্তিয়ান কিংবদন্তির নেশাধরানো আমন্ত্রণ খুব বেশিদিন এড়িয়ে থাকা সম্ভব হলো না। এক উইকেন্ডের রাতে বইটা নিয়ে বসে গেলাম।

আমাদের নায়ক পিটার শ্লেমিল জাহাজে চেপে নতুন এক শহরে হাজির হয়েছে যেখানে সে তার ভাগ্যকে বাজিয়ে দেখতে চায়। সম্বল সামান্য একটা ব্যাগ, অল্প কিছু অর্থ। ভাঙাচোরা সস্তার একটা সরাইখানায় সে আশ্রয় নিল।

খুঁজে পেতে যার সন্ধান সে বের করতে চাইল, তিনি শহরটির অন্যতম ধনী ব্যক্তি মিঃ জন। শহর থেকে একটু দূরে এক জমকালো বাড়ি আর পাহাড়ী গোলাপবাগানে লোকটিকে খুঁজে পেল পিটার। মান্যগণ্য পুরুষেরা মিঃ জনকে ধন্য ধন্য করছে। সুন্দরীরা তার সঙ্গ পাবার জন্য আকুল। এসবের মাঝখানে নিজেকে খুবই বেচারা, অসহায় আর অনাহুত মনে হলো তার। কিন্তু মিঃ জন হতাশ করলেন না, যেহেতু তার সম্পদের কোনো কমতি নেই, আশ্বাস দিলেন যে পিটারের ব্যাপারটা দেখবেন তিনি।

আরো পড়ুন ➥ প্রেম ও পুরুষের পৃথিবীতে

এই ধনী লোকদের আসরের মাঝখানেই ধূসর কোট পরা লম্বা এক লোককে ঘুরে বেড়াতে দেখল পিটার শ্লেমিল। ব্যাখ্যার অযোগ্য তার ক্ষমতা, সন্দেহজনক তার আনুগত্য ও বিনয়। যে যা চাইছে, নিজের কোটের পকেট থেকে সে জিনিসটাই নিমেষে তাকে বের করে দিচ্ছে লোকটা। সামান্য একটা কোটের পকেট থেকে এত কিছু কিভাবে বের হচ্ছে, পিটার ভেবে বের করতে পারল না। এক সময় ব্যাপারটা তার সহ্যের সীমানা ছাড়িয়ে গেলে ওখান থেকে সরে পড়াই বুদ্ধিমানে কাজ মনে হলো। আর তখনই সেই রহস্যময় লোক আচমকা পথ আঁটকে দাঁড়াল, ব্যাপারটা যেন এরকম, ‘আরে যাচ্ছেন কোথায়? আপনার সঙ্গেই তো আমার আসল কারবার।’

কী এই আসল কারবার?

লোকটি পিটারকে বলল যে তার ছায়াটি বড় চমৎকার, অমূল্য। এমন নিখুঁত ছায়া পৃথিবীতে খুব অল্প মানুষেরই হয়। পিটার যদি ছায়াটি বিক্রি করতে রাজি থাকে, খুব যোগ্য বিনিময় দিতে রাজি আছে সে। এই কথা বলে কোটের পকেট থেকে সে বের করল এমন এক থলি, যা থেকে অনিঃশেষ স্বর্ণমুদ্রা বের হয়।

দরিদ্র্য পিটার শ্লেমিল হতভম্ব হয়ে গেল এই কাণ্ড দেখে। একটা সামান্য বিনিময়ে ওই অসম্ভব ঐশ্বর্যের খনি? কিছুক্ষণ দোটানায় ভুগলেও লোকটির প্রস্তাবে সে রাজি হয়ে গেল। বিক্রি করে দিল নিজের ছায়া।

এই ঘটনার পর থেকেই আসলে শুরু হলো তার জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্দশাগ্রস্ত আর অস্তিত্ব সংকটে ধুকে ধুকে কাটাবার পর্ব। শ্লেমিল শব্দটা হিব্রু, এর অর্থ হলো হতভাগ্য। যে লোকের ছায়াই নেই, সে কিভাবে সাধারণ মানুষের মাঝে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারে?

শুরুতেই বলেছি, এই গল্পের উৎসবিন্দু হচ্ছে ফাউস্তিয়ান কিংবদন্তি। ফাউস্ত ছিলেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এক বিখ্যাত মানুষ। কিন্তু জ্ঞানের অসীম তৃষ্ণা মিটছিল না তার। সুতরাং, শয়তান এসে তাকে দেখা দিল আর দিল বিচিত্র এক প্রস্তাব। ফাউস্ত শয়তানকে নিজের আত্মা বিক্রি করলেন, বিনিময়ে পেলেন পৃথিবীর সমস্ত জ্ঞান আর অফুরান ধনসম্পত্তি।

এই এক জার্মান উপকথা গোটা ইউরোপে দারুণ প্রভাব বিস্তার করে আছে চিরকাল। ক্রিস্টোফার মারলো থেকে গ্যেটে থেকে টোমাস মান, ফাউস্তের ট্র্যাজেডি নানাভাবেই রিক্রিয়েট হয়েছে সাহিত্যে। আরো হয়তো হবে এবং হচ্ছেও।

আরো পড়ুন ➥ সিয়েরভা মারিয়ার স্মৃতি

কিন্তু পিটার শ্লেমিল পড়তে গিয়ে মনে হলো, নিজের আত্মজৈবনিক হতাশাকে ধরে রাখতে শামিসো কি ফাউস্তের চেয়ে জবর কোনো টুলস আর খুঁজে পেতেন? সেই অমোঘ নিয়তির মতো বই পড়তে পড়তে লেখকের ব্যক্তিজীবনে ডুব মারার বিরক্তিকর স্বভাবটা মুহূর্তেই আমাকে আচ্ছন্ন করল। সব লেখকের ক্ষেত্রে এমনটা না হলেও রচনায় লেখকের নিজস্ব যাপনের কিছু কিছু ছায়া তো থেকেই যায়, এমনকি অন্যদের জীবনকে নিজের জীবনের মতো করে গল্প তৈরির ক্ষমতাও থাকে একজন শক্তিমান রচয়িতার।

পিটার শ্লেমিল পড়তে গিয়ে এই দুটি ব্যাপারই আবিষ্কার করলাম। পিটার একজন বাস্তব মানুষ, আর আডেলবার্ট ফন শামিসোকে মূলত নিজের দুর্ভাগ্যের কাহিনী সে শোনাচ্ছে, এমন কয়েকটা দৃশ্য আছে গল্পটিতে। এমনকি পিটারের স্বপ্নে ফন শামিসোকেও আমি দেখতে পাই, কাচের জানালার ওপাশে শামিসোর টেবিলে একটা বই এবং নিশ্চিতভাবেই বইটা গ্যেটের লেখা ফাউস্ট।

আডেলবার্ট ফন শামিসো এক এরিস্টোক্র্যাট ফরাসি পরিবারের সন্তান ছিলেন। ফরাসি বিপ্লব চলছে যখন, ১৭৯০ সালে বাবা-মায়ের সঙ্গে বালক শামিসোকে পাড়ি জমাতে হইয়েছিল জার্মানিতে। ফরাসি হয়েও জার্মানিতে বসবাস আর জার্মানিতে থেকেও তারা যে ফরাসি, এই ব্যাপারটা তিনি কখনোই মেনে নিতে পারতেন না।

এমনকি সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে ১৭৯৮ সালে নিজের জন্মভূমি ফ্রান্সের বিরুদ্ধে আশ্রয়দাতা জার্মানের পক্ষ হয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে হয়েছিল তাকে। যদিও জার্মানির লোকজন তাকে নিজেদের মানুষ হিসেবেই স্বীকৃতি দিয়েছিল, শামিসো ভাবতেন যার দেশ নেই, তার কি কোনো অস্তিত্ব আছে? জাতীয়তাবাদের এক গর্বোদ্ধত যুগে তার সাবকনশাসে এমন ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যাওয়াটাকে ভয়ানক এক ক্ষত হিসেবেই অনুমান করা যায়। পৃথিবীর সকল মানুষই কোনো না কোনো দেশের নাগরিক, আর এই দেশ ধারণাটি তাকে পৃথিবী থেকে বড় দূরে সরিয়ে দেয়। তার মনে সংকট তৈরি করে। এমনকি দেশের মাঝে যে ছোট ছোট দেশ, সেসব স্থানে বেঁচে-বর্তে থাকা লোকজনও এ সংকট থেকে মুক্তি পায় না।

পিটার শ্লেমিলের ছায়াহীনতাকে মূলত লেখকের বিপন্ন অস্তিত্বের রূপকই মনে হয় আমার। আমি পড়িও সেটা ধরে নিয়েই। অর্থবিত্তের অভাব না থাকলেও সমাজ যখন দেখে শ্লেমিলের ছায়া নেই, তখনই তাকে আর মেনে নিতে পারে না। তার জীবন হয়ে ওঠে একজন পলাতকের জীবন। দিনের আলো যে ভয় পায়, রাতের নির্দিষ্ট সময় ছাড়া মানুষের সামনে নিজেকে তুলে ধরতে চায় না। প্রতি মুহূর্তে আত্মপীড়ায় নিজেকে সে রক্তাক্ত করে।

এই দুর্দশার মধ্যেও শ্লেমিল কিন্তু খুঁজতে থাকে সেই ধূসর কোট পরা লোকটিকে। সে এই করুণ জীবন থেকে পরিত্রাণ চায়, অনিঃশেষ স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে লাভ কি যদি তার ছায়াই না থাকে? বহুদিন পার হলে অবশেষে লোকটি আসেও। তবে নতুন এক প্রস্তাব নিয়ে। নিজের বহু মূল্যবান ছায়াটি পিটার ফেরত পেতে পারে, কিন্তু এবার বিনিময় হিসেবে লোকটি চায় তার আত্মা।

এবার সে কী করবে? ফাউস্টের মতো সেও কি তার আত্মা বিক্রি করে দেবে? যেন চাইলেই ফ্রান্সের নাগরিকত্ব ফিরে পাবেন লেখক শামিসো, কিন্তু এতদিন যে দেশ তাকে আশ্রয় দিল, তার সঙ্গে করতে হবে বেঈমানী!

বইটির ন্যারেটিভ খুবই সমান্তরাল। একটা মোক্ষম শুরু এবং অভাবনীয় সমাপ্তি আছে। সেই সমাপ্তি উন্মুক্ত। যেন আরো বিচিত্র সব অভিযানে অংশ নেবার জন্য পাঠককে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। লেখক ও বৃক্ষবিদ ফন শামিসো তার কাহিনীতে যে কল্পনা ও উপকথার মিশেল ঘটিয়েছেন, তাকে জাদুবাস্তবতার আদিকাণ্ড হিসেবেও ধরে নেওয়া যায়।

নিজে সমাজের যেই অংশের প্রতিনিধি ছিলেন, তাদের সম্পর্কে শামিসোর মনোভাব স্বস্তিকর কিছু ছিল না, তিনি ভাবতেন এরা সবাই মূলত শয়তানের কারবারি, আর সাধারণ মানুষেরাও যে ধনীদের স্তুতি করত তা কেবলমাত্র সম্পদের লোভেই। শহুরে মানুষের এই দুই শ্রেণী কেউ কাউকে বিলং করে না কিন্তু একে অন্যকে ছাড়া টিকতেও পারে না, এ ব্যাপারটিকেও বিদ্রুপের কাঁটায় তিনি হয়তো বিদ্ধ করতে চেয়েছেন।

তবে এভাবে না দেখে, এমনকি যে পাঠক শামিসোকে চেনেন না একদম, কোনো রকম প্রস্তুতি ছাড়াই পিটার শ্লেমিলকে পড়ে নিতে পারেন।

অন্ধকার থেকে আলোয় উঠে আসতে চাওয়া জীবনের এক অপূর্ব গল্প এটি। যেখানে আছে শয়তানের ধোঁকা, ফরচুনেটাসের থলি যার ভিতরে হাত গলিয়ে দিলেই মেলে মুঠো মুঠো সোনার মোহর, আজব পাখির বাসা যা মাথায় দিলে মানুষ অদৃশ্য হয়ে যায়, সপ্তসিন্ধু জুতো যা পায়ে দিলে অনবরত ঘুরে বেড়ানো যায় পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চোখের পলকেই। আর চূড়ান্তভাবে আছে অশুভের বিরুদ্ধে মানবাত্মার সেই চিরায়ত যুদ্ধের কথা, যে যুদ্ধে জিতে গেলেই মুক্তি মিলতে পারে, হেরে যায় শয়তান, আত্মার যেই মুক্তির কাছে পৃথিবীর সমস্ত ধন-সম্পদ তুচ্ছ। কিন্তু এই জিতে যাওয়াটা কি সম্ভব?

কতভাবেই না একটা বই লেখা যেতে পারে, আর বিচিত্র পাঠক কতভাবেই না সে বইটি পড়তে পারেন।

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন আহমদ রফিক ও মাসরুর আরেফিন



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

  • Font increase
  • Font Decrease

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিক।

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০১৯ পেয়েছেন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন। ‘ভাষা আন্দোলন: টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ প্রবন্ধের জন্য আহমদ রফিককে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসের জন্য মাসরুর আরেফিনের নামের পাশে যোগ হয়েছে পুরস্কারটি।

করোনা মহামারির কারণে এবার অনলাইনের মাধ্যমে নির্বাচিত দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিককে সম্মাননা জানানো হয়। গত ১৫ জানুয়ারি এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। এছাড়া ছিলেন আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী শাহ এ সারওয়ার।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সমসাময়িক লেখকদের স্বীকৃতি দিতে আইএফআইসি ব্যাংক ২০১১ সালে চালু করে ‘আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার’। প্রতিবছর পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয় সেরা দুটি বই। নির্বাচিত প্রত্যেক লেখককে পাঁচ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র পেয়ে থাকেন।

;

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;

কল্পনা ও ইতিহাসের ট্রাজিক নায়িকা আনারকলি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আনারকলির নাম উচ্চারিত হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহে এক করুণ-মায়াবী প্রেমকাহিনী সবার মনে নাড়া দেয়। ইতিহাস ও কল্পকথায় আবর্তিত এই রহস্যময়ী নতর্কীর পাশাপাশি শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাট আকবর, সম্রাজ্ঞী যোধা বাঈ চোখের সামনে উপস্থিত হন। ভেসে আসে পরামক্রশালী মুঘল আমলের অভিজাত রাজদরবার ও হেরেম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশ-পূর্ব উপমহাদেশের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক দ্যুতি, বহুত্ববাদী পরিচিতির রাজকীয় অতীত এসে শিহরিত করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিকদের। 

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত ৩৩১ বছরের বিশ্ববিশ্রুত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বহু সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদীর নাম বীরত্বে ও বেদনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আনারকলির নাম বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক বিবরণের কোথাও লেখা নেই, যদিও মুঘল হেরেমের এই রহস্যময়ী নারীর নাম আজ পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ও লোকশ্রুতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্রাজ্ঞী, শাহজাদী কিংবা কোনও পদাধিকারী না হয়েও মুঘল সংস্কৃতির পরতে পরতে মিশে থাকা কে এই নারী, আনারকলি, যিনি শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছেন, এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। ইতিহাসে না থাকলেও শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে চিত্রিত হচ্ছেন তিনি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তায়। ইতিহাস ও মিথের মিশেলে তাকে নিয়ে আখ্যান ও কল্পকথার কমতি নেই। তার নামে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে মাজার, সমাধি স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাজার, মহিলাদের পোষাকের নান্দনিক ডিজাইন। ইতিহাসের রহস্যঘেরা এই নারীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’। রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ ও গবেষণা।

যদিও বাংলা ভাষায় আনারকলিকে নিয়ে আদৌ কোনও গ্রন্থ রচিত হয়নি, তথাপি উর্দু সাহিত্যে তাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক নাটক ও উপন্যাস। ইংরেজিতে রয়েছে বহু গ্রন্থ। বিশেষত উর্দু ভাষার বলয় বলতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের যে বিশাল এলাকা পূর্বের বিহার থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত, সেখানে আনারকলি একটি অতি পরিচিত ও চর্চিত নাম। সাহিত্যে ও লোকশ্রুতিতে তিনি এখনও জীবন্ত। অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে রয়েছে আনারকলি মাকবারা। মাকবারা হলো কবরগাহ, সমাধিসৌধ। মুঘল স্মৃতিধন্য শহর দিল্লি, লাহোরে আছে আনারকলি বাজার। সাহিত্য ও লোককথার মতোই আনারকলিকে নিয়ে নির্মিত নানা লিখিত ও অলিখিত উপাখ্যান। 

অথচ মুঘল রাজদরবার স্বীকৃত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর কোথাও উল্লেখিত হন নি আনারকলি। প্রায়-প্রত্যেক মুঘল রাজপুরুষ লিখিত আকারে অনেক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখলেও তার নাম আসে নি কোনও মুঘলের আত্মস্মৃতি বা ইতিহাস গ্রন্থে। তাহলে কেবলমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে তার নাম অর্ধ-সহস্র বছর ধরে লোকমুখে প্রচারিত হলো কেন এবং কেমন করে? সত্যিই আনারকলি বলে কেউ না থাকতেন কেমন করে সম্ভব হলো পাঁচ শতাধিক বছর ধরে নামটি টিকে থাকা? এসব খুবই বিস্ময়কর বিষয় এবং আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

ভারতবর্ষে মুঘল ইতিহাসের এক রহস্যময় নারী চরিত্র রূপে আনারকলিকে নিয়ে আগে বহু চর্চা হলেও সবচেয়ে সফল ও ব্যাপকভাবে তিনি চিত্রিত হয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রস্থল বলিউডের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেরা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’-এ। ছবির কাহিনী মুঘল-ই-আজম তথা শাহানশাহ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের দরবারে আবর্তিত। আকবরপুত্র শাহজাদা সেলিম, যিনি পরবর্তীতে হবেন সম্রাট জাহাঙ্গীর, মুঘল দরবারের এক নবাগত নর্তকী আনারকলির প্রেমে বিভোর। দীর্ঘ ছবিটি সেলিম-আনারকলির প্রণয়ের রোমান্টিকতায় ভরপুর। কিন্তু সম্রাট আকবর সেই ভালোবাসা মেনে নিতে নারাজ। প্রচণ্ড ক্রোধে আকবর আনারকলিকে শাহজাদার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, সম্রাটপুত্রকে ভালোবাসার অপরাধে তুচ্ছ নর্তকী আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করেন। 

প্রশ্ন হলো, সত্যিই যদি আনারকলি নামে কোনও চরিত্র না-ই থাকবে, তাহলে এতো কাহিনীর উৎপত্তি হলো কেমন করে? সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে আনারকলিকে কেন্দ্র করে যা বলা হয়েছে বা দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা কতটুকু? সত্যিই কি আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? নাকি আনারকলি বলে ইতিহাসে কোনও চরিত্রই ছিল না? নাকি সব কিছুই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কোনও মিথ, উপকথা বা গল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও মেলে নি।

আনারকলি যদি ‘কাল্পনিক’ হবেন, তাহলে, মুঘল আমলে ভারতে আগত ইংরেজ পরিব্রাজকের বর্ণনায়, লখনৌর লেখকের উপন্যাসে, লাহোরের নাট্যকারের নাটকে, বলিউডের একাধিক সিনেমায় আনারকলি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন কেন? কেন শত শত বছর কোটি কোটি মানুষ আনারকলির নাম ও করুণ ঘটনায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন? কেন আনারকলির নামে ভারতের প্রাচীন শহরগুলোতে থাকবে ঐতিহাসিক বাজার? লাহোরে পাওয়া যাবে তার কবরগাহ, যেখানে শেষ বয়সে শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর হাজির হয়ে নির্মাণ করবেন সমাধিসৌধ আর রচনা করবেন করুণ প্রেমের কবিতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্যে ‘কিছুটা ঐতিহাসিক, কিছুটা কাল্পনিক চরিত্র আনারকলি’ ও তাকে ঘিরে প্রবহমান প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ভিত্তিক এই রচনা। আমার রচিত ‘দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো’ (প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ) গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করায় মুঘল মূল-ইতিহাসের বাইরের এই রহস্যময়ী চরিত্র ও আখ্যানকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনে উৎসাহী হয়েছি। উর্দু ও ইংরেজিতে আনারকলির ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক ইতিহাস নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। যেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। আনারকলির প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে নির্মিত অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’ সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। চেষ্টা করেছি ইতিহাস ও মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুঘল হেরেমের রহস্যময়ী নতর্কী ও বিয়োগান্ত প্রেমের নায়িকা আনারকলিকে অনুসন্ধানের।

;