কবি মুশাররাফ করিম আর নেই

ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম 
কবি মুশাররাফ করিম

কবি মুশাররাফ করিম

  • Font increase
  • Font Decrease

জীবনের পুরোটা সময়ই তিনি কাটিয়েছেন ঢাকা ও ময়মনসিংহে। সত্তর, আশি ও নব্বুই দশকে সাংবাদিকতা করেছেন। যুক্ত ছিলেন কাব্যচর্চায়। বৃহস্পতিবার (৯ জানুয়ারি) ছিল কবি মুশাররাফ করিমের (১৯৪৬-২০২০) ৭৫তম জন্মদিন।  একদিন পর শনিবার (১১ জানুয়ারি) চির বিদায়ের পথে চলে গেলেন তিনি।

কবির ৭৫তম জন্মদিনে ময়মনসিংহে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শুভাকাঙ্ক্ষীরা তার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। অসুস্থতা নিয়েও তিনি সকল আয়োজনে যুক্ত ছিলেন। কথা বলেছেন কবিতা নিয়ে। তখন কে জানতো মাত্র একদিন পরই তিনি এই পৃথিবী ও পরিজনের কাছ থেকে শেষ বিদায় নেবেন।

১১ জানুয়ারি শনিবার রাত সোয়া ১০টার দিকে ময়মনসিংহের একটি বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী সখিনা আক্তার, এক কন্যা সন্তানসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস ও বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। সম্প্রতি তার পায়ের দুইটি আঙুল অস্ত্রোপচার করে অপসারণ করা হয়েছিল।

তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ: ‘কোথায় সেই দীর্ঘ দেবদারু’, ‘ঘাসের ডগায় হলুদ ফড়িঙ’, ‘পাথরের পথে’, ‘সে নয় সুন্দরী শিরিন’ ইত্যাদি। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস: ‘পূর্ব-পুরুষগণ’, ‘প্রথম বৃষ্টি’ ইত্যাদি। শিশু সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ২০০৩ সালে তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনি ২৫টির বেশি গ্রন্থের রচয়িতা।

কবি মুশাররাফ করিম ষাটের দশকের আয়ুববিরোধী ছাত্রগণ আন্দোলনে বিশেষ  ভূমিকা পালন করেন। এছাড়াও তিনি ময়মনপসিংহ সাহিত্য সংসদের প্রতিষ্ঠাতা ও নেত্রকোনার বিরিশিরির উপ-জাতীয় কালচারাল একাডেমির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

কবি ও সাংবাদিক মুশাররাফ করিমের উত্থান দৈনিক দেশ পত্রিকার মাধ্যমে। সেখানে তিনি সহ-সম্পাদক ছিলেন। দৈনিক দেশ-এ বর্ষীয়ান সম্পাদক সানাউল্লাহ নূরীর নেতৃত্বে একদল মেধাবী সাংবাদিক-লেখক সংযুক্ত হয়েছিলেন। যাদের মধ্যে কবি সমুদ্র গুপ্ত, কবি মাশুক চৌধুরী, কথাসাহিত্যিক আবু সাঈদ জুবেরী ও কবি আবিদ রহমান, সম্পাদকীয় বিভাগে সহকারী সম্পাদক কবি মাহবুব হাসান, রিপোর্টিং বিভাগে স্টাফ রিপোর্টার ছড়াকার আবু সালেহ,  সৈকত রুশদী, কাজিম রেজা ছাড়াও ছিলেন সাহিত্য সম্পাদক কবি হেলাল হাফিজ।

পরবর্তীতে মুশাররফ করিম বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করলেও দৈনিক দেশ পত্রিকার ইমেজই তাকে পরিচিত করেছে। রাজনৈতিকভাবে তিনি ছিলেন বিএনপি ঘরানার মানুষ। তদুপরি তার সঙ্গে সকল দল ও মতের মানুষের আন্তরিক সম্পর্ক ছিল।

আড্ডাবাজ ও বন্ধুবৎসল ছিলেন তিনি। চেনা-স্বল্প চেনা সকলের সঙ্গে জম্পেশ আড্ডায় মশগুল হতে সময় লাগতো না তার। পরিচিত মহলে তিনি সকলের কাছে ছিলেন প্রিয় মঞ্জু ভাই।

রাজধানী ঢাকায় পেশাজীবন অতিবাহিত করলেও তিনি ছিলেন ময়মনসিংহ-অন্তঃপ্রাণ। ময়মনসিংহ, ব্রহ্মপুত্র, উত্তরের গারো পাহাড়ের টান, হাওরের উথাল-পাতাল তিনি সব সময়ই অনুভব করতেন। কথাও বলতেন ময়মনসিংহের আঞ্চলিক টানে। অফিস করেই শেষ ট্রেন ধরে চলে যেতেন ময়মনসিংহে। ঢাকার স্থায়ী চাকরিকালেও তার অস্থায়ী আবাস ছিল ঢাকায় আর স্থায়ীবাস ময়মনসিংহে। চাকরিজীবনের শেষে তিনি একেবারে চলে আসেন তার প্রিয় জনপদ ময়মনসিংহেই। বসবাস করেন পৈত্রিকভিটা শহরের সেহড়া এলাকার বড়বাড়ি নামক বৃহত্তর পরিবারের সঙ্গে। 

কবি মুশাররাফ করিম সম্পূর্ণভাবে নিজস্ব ধরনের জীবন-যাপন করেছেন, যা ছিল অনেকের চেয়ে আলাদা। মনে হতো সাংবাদিকতা ও কাব্যচর্চার একটি ঘোরের মধ্যে অতিক্রান্ত হচ্ছে তার জীবন, জগৎ, পারিপার্শ্বিক সব কিছু।

সেই শেষ সত্তর ও আশি দশকে ঢাকায় তখনো এতো ভিড়, এতো ব্যস্ততা, এতো বৈষয়িকতা এসে আছড়ে পড়েনি। জীবন ছিল একরৈখিক ও সরল। তার মধ্যে কিছু চরিত্র ছিলেন, যারা শিল্প, সাহিত্য, সাংবাদিকতার মগ্নতায় নিমজ্জিত ছিলেন। কবি মুশাররাফ করিম ছিলেন তেমনই এক চরিত্র, যাকে তার জীবনচর্চা ও নিজস্বতার জন্য আলাদাভাবে শনাক্ত করা যেতো। 

হায়! পরিবর্তমান বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সেই রমনীয় ঢাকা ক্রমশঃ হারিয়ে গেছে। লুপ্ত হয়ে গেছে সেইসব মানুষ, যারা ছিলেন নগর কাঠামোর স্বতন্ত্র মুখ। কবি মুশাররাফ করিমের চির প্রস্থানে হারিয়ে যাওয়া ঢাকার মতো হারিয়ে গেলো আরেকজন কাব্যঘোরাক্রান্ত বিশিষ্ট মানুষ।

তার চির কল্যাণ কামনা করি।