রেললাইনের কবিতারা



তানিয়া চক্রবর্তী
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

“In the shades
I have three agonies: Drift, Love, Survival
I have three happinesses: Poems, Throne, The Sun”

মাত্র পঁচিশ বছরের জীবন এই কবিতার স্রষ্টার। আত্মহত্যা করেছিলেন কবি। ১৯৬৪ সালে চীনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বর্তমানে তিনি চীনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত কবি, যার কবিতার উদ্ধৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৮৯ সালে রেললাইনে আত্মহত্যা করেছিলেন তিনি। তার মৃত্যুকে বর্তমানে কৃষি সংস্কৃতির মহান আত্মত্যাগ হিসেবেও দেখা হয়। কিছু দ্বিমত আছে এই প্রসঙ্গে।

আসলে তিনি জন্মেছিলেন এক কৃষক পরিবারে। জীবনের ও অনুভূতির মধ্যে তার প্রকৃতিপ্রেম এই কৃষিজ বোধকে ঘিরেও ছিল অনেকখানি। আবার বলা হয় তিনি তিব্বতীয় ভাবনায় উজ্জীবিত হয়ে সেই সংস্কৃতির অতিপ্রাকৃত তন্ত্রের প্রতি অনুরক্ত হয়েছিলেন। ফলে মৃত্যুর কারণ অনেক্ষেত্রে এই সংযুক্তিকেও মানা হয়। মৃত্যুর পর তার কাছে যে জিনিসগুলো পাওয়া গেছিল তা হলো—বাইবেল, যোশেফ কারনাডের গল্প সংকলন, লেখক হেনরি ডেভিড থেরোর ‘ওয়ালডেন’, থর হেয়েরদলের ‘কনটিকি’। আসলে জীবনের মতোই মৃত্যুও সমান প্রভাবশালী। জীবনের কত কত ক্ষেত্রে মৃত্যু ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে তা কেউ জানে না। না হলে যা ঘটেনি অথচ ঘটবে তার প্রাসঙ্গিকতা এভাবে কেন উঠে আসে?

মৃত্যুর আগেই মরে গেছি আমি
বিচ্ছিন্ন করেছে আমাকে আগেই ট্রেন
কেবল চলে গেছে আমার রক্তদাগের ওপর, কেবল
আমার অনাহার নিয়েছে, ঠেলে দিয়েছে গৌরব হ্রদের ভেতর
আজ আমিই হ্রদের ভেতর পুঁতছি কল্পকাহিনী
আর হ্রদের বুনো ফুলের ওপর আঁকছি রেললাইন
আমি সেই লোক, আমার চারিদিকে জীবন,
পাহাড়ি ছাগল, মুখ বুনোফুলের ভেতর ডোবানো
          (অনুবাদ-রুদ্র কিংশুক)

মৃত্যুর তিরিশ বছর পরে চীনের সাহিত্য-সংস্কৃতি হাই-জিকে নিয়ে মেতে উঠেছে

এই কবিতার শরীরে কি সব চিহ্নিত করা নেই! একজন উজ্জ্বল ছাত্র যার দশ বছরের কবিতাজীবনে মুখরিত হয়েছিল অজস্র লেখালেখি। তার মৃত্যুর তিরিশ বছর পরে চীনের সাহিত্য-সংস্কৃতি তাকে নিয়ে মেতে উঠেছে—এরকমই তো সৃষ্টির নিয়তি। প্রায় ২৫০টি ছোট কবিতা, ৪০০ পৃষ্ঠার দীর্ঘ কবিতা, ছোটগল্প, নাটক তিনি এইসময়ের মধ্যে লিখে গেছেন। ১৯৯৭ সালে তাকে নিয়ে পূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশ করেন তার কবিবন্ধু চুয়ান। মাত্র ঊনিশ বছর বয়সে গ্র্যাডুয়েশন শেষ করেন। মাত্র পনের বছর বয়সে তিনি পিকিংয়ে পড়তে গিয়েছিলেন সেইসময় পত্র-পত্রিকাতে তার কবিতা প্রকাশিত হতে শুরু করে। অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন, পড়াতেন পলিটিক্যাল সায়েন্স এবং আইন।

মৃত্যুর আগে তিনি হতাশাপূর্ণ, নিঃসঙ্গতার জীবন কাটাচ্ছিলেন। বলা হয় হয়তো ভয় পাচ্ছিলেন আরো আরো একা ও অসুস্থ হয়ে যাওয়ার। সৃষ্টিশীল মানুষরা আপাত কারণে অনেক অনেক বেশি একা হয়ে যান সেই কারণেই বোধহয় এই যন্ত্রণা এই নিঃসঙ্গতাকে উপভোগ করে, ধারণ করে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখিয়েছিলেন আরেক চূড়ান্ত কবি রাইনার মারিয়া রিলকে। দুঃখ থেকে পালিয়ে যেতে না করেছেন তিনি। বারবার তাকে প্রতিস্থাপন করতে না করেছেন সুখ ও নিরাপত্তা দিয়ে। শুধু তাকে বয়ে দিতে যেতে বলেছিলেন, না হলে কিছুই না কেবল লুপ্ত হয়ে যেতে হবে। হাই-জির অনুভূতিও পারেনি সেই অমীমাংসিত মুহূর্তদের জয় করতে। তিনি লিখছেন—

“In the night, I hear distant sounds of Swans/ flying across the bridge/ the river in my body/ echoes them/ as they fly across the soil of birthing days/ the soil of dusk/ there is a wounded Swan/ only the beautiful, blowing wind knows/ she is wounded, but she keeps flying.”

কবিতাটির নাম ‘THE SWAN.’ তার মৃত্যু, তার লেখনী, তার জীবন সবকিছুই এখন চীনে তীব্র আলোচিত ও রহস্যে ঘেরা এক উচ্চকিত সাহিত্য হিসেবেই গৃহীত। ভ্যান গঘ ছিলেন তার প্রিয় শিল্পী। কোন আদর্শে, কোন প্রাচুর্যতার সৌজন্যে কিম্বা কোন কোন অভাবে তার জীবন জর্জরিত বা উদযাপিত হয়েছে কেউ কখনো জানবে না। শুধু তার সৃষ্টি সেই রহস্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার নমুনা মাত্র আমরা কেবল ছুঁয়ে ছুঁয়ে শিহরিত হতে পারি।