রণজিৎ দাশের কবিতা



তানিয়া চক্রবর্তী
গ্রাফিক: বার্তা২৪.কম

গ্রাফিক: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রান্তিকতাকে পেরিয়ে কবিতার মুহূর্তের মধ্যে ঢুকে গেলে, হাঁটা শুরু করলে যে সমস্ত আক্রমণ পুরো গ্রাস করে নেয় সেখানে নতজানু হতে হয়, আসলে সচেতন মানুষের মানবিক স্তর অতিক্রম করেই সে আক্রান্ত হয়, সচেতন পরাবর্তের ওপরে যখন সে চলে যায় তার আর ব্যবচ্ছেদ হয় না। ব্যক্তিসাপেক্ষ অনুভূতিকে ধরেই ভীষণভাবে ভালোলাগার কবি রণজিৎ দাশের কবিতা প্রসঙ্গে আসব। কবি রণজিৎ দাশ প্রসঙ্গে শ্রদ্ধাবনত বা বিনীত হওয়ার প্রাকমুহূর্তে যেটা সত্য তা হলো, তিনি আমার কাছে এমন একজন কবি, যার কবিতা বিছানায় শুয়ে শুয়ে পড়তে পড়তে উঠে বসতে হয়! কবিতা এসে বলে আমার ভেতরে ঢোকো, আমি তোমাদের সংলগ্ন যাপনের শিকড় বুনে দিচ্ছি, আরো ভেতরে ঢোকো, পাখির একনেত্র দৃষ্টির মতো কবিতার ভেতর দিয়ে নিজেকে ভক্ষণ করিয়ে নিতে পারি, তাঁর কবিতা আমার কাছে এভাবেই প্রতিভাত হয়।

কবিতা তার আকাঙ্ক্ষায় সেই মনোযোগকে ভেতরে নিয়ে নেয়। সবচেয়ে বেশি তাঁর কবিতার যে অভিব্যক্তি শরীরে, মনে জার্ক দেয় তা হলো দৃঢ়তা, যে চয়ন বিহ্বল করে তোলে সেই যেন বিহ্বলতাকে থাপ্পড় মেরে সোজা তাকাতে সাহায্য করে। অভয়ারণ্যের ঠিক কোর এরিয়া যেখানে নিষেধ ও আকর্ষণ একমাত্রিক সেখানেই যেন সমস্ত ভ্রমণ বিলাসিতা সত্যের মুখে এসে চেতন থেকে অবচেতন সমস্ত অন্ধকারকে নাড়িয়ে দেয়।

কবি বলছেন, “মানুষ দুর্বোধ্য প্রাণী। কখনো সাপের মুখে/ কখনো ব্যাঙের মুখে চুমু খায়; বেহালা বাজায়।/ —কবিতা দুর্বোধ্য হলে তবু সে কেন যে ক্ষেপে যায়!” (মানুষ দুর্বোধ্য প্রাণী, কাব্যগ্রন্থঃ সমুদ্র সংলাপ)

হ্যাঁ এটি সেই সত্যিকারে জার্ক বা ঝাঁকুনি। ঝাঁকুনির আগে ও পরে মনে হতে পারে দর্শন, দ্রষ্টার ভাব ও গতি, অনুকূলে-প্রতিকূলে ক্রিয়াশীলভাবে বদলায় কিন্তু দৃঢ়তার যদি নিজস্ব নাবিক ভঙ্গিমা থাকে তার দিক তার কাঠামোকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তাৎক্ষণিকের দর্শন সর্বজনীনের মতো সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। একটি জীবন একটি জোর প্রত্যাশা করে—দর্শনও বদলায় কিন্তু জোর প্রান্তিকতাকেও যুগপোযোগীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

“আমাদের শরীরে প্রতিটি ফুটোয়/ জেগে আছে ঈশ্বরের চোখ/ ভিতরে চক্রান্ত, চাঁদ, নিহত বন্ধুর রক্ত, ক্রিমি, কীট, উলঙ্গ রাক্ষস/ ভিতরে মুখোশ, জুয়া, নাচ, মদ, বেশ্যাদের হাসি/ তিনি দেখছেন, ঠিক যেভাবে বালক তার/ পিতৃঘাতকের সঙ্গে নিজের মায়ের/ অবৈধ সঙ্গমদৃশ্য দেখে” (ঈশ্বরের চোখ, কাব্যগ্রন্থঃ ঈশ্বরের চোখ)

কীর্ণধর্ম থেকে প্রেক্ষকের দৃষ্টি, সমস্ত সমাজ বৈষম্যতে একক ধ্রুবকে বসে আছেন ঈশ্বর অপারগ হয়ে, তেমনি সে নিরুপায় বালক তার মায়ের সঙ্গে পিতৃঘাতকের সঙ্গম দৃশ্য দেখছে—এ এক সহ্যাতীত সহ্যের ইতিহাস, সম্মোহনের বাস্তবতাকে চেপে ধরে ছিবড়ে করা। কবির অনুভব বিন্দুর আতিথেয়তা ধরে সম্মোহনকে অতিক্রম করে, কবি জীবনগ্রাহী হয়ে পাঠকের একান্ত হয়ে ওঠেন। একদিকে জল ফুঁসে ওঠে বলে, সে ভাসিয়ে দিতে চাইলে তাকে রহিত করি, অন্যদিকে জল খরা দিলে তাকে আদর আলিঙ্গনে ডাকি। অতএব জলের কোনো ধর্ম থাকলেও, ব্যবহারকারীর আতিশয্যে তার ধর্ম নিরূপিত হতে থাকে, এখানেও সেই দৃঢ়তার অভিমুখ ধরে ধরে সিঁড়ি বেয়ে উঠি।

পিয়ানো কবিতার প্রথম লাইনে কবি বলছেন—
“তোমার শরীর, আমি জানি,এক গভীর পিয়ানো”
শেষ লাইনে কবি বলছেন
“তোমার শরীর, আমি জানি, এক বিলুপ্ত পিয়ানো”

যেখানে নশ্বরকে বিলীন হতে দেখলেন, জানলেন নশ্বর তবু হাতড়ালেন অত্যাশ্চর্যের জন্য, চমকের জন্য, অথচ নশ্বর—এর স্থিতিস্থাপকতায় দাঁড়িয়ে কবি বললেন, “অন্ধঘড়িনির্মাতার ভাই আমি, তুমি কি তা জানো?” কবি/ দ্রষ্টা/ প্রেক্ষক দেখলেন ভঙ্গুর বাস্তব, ফুটিয়ে তুললেন চিত্রবিচিত্রতার দৃঢ়তায়। কবি আবার ‘ইচ্ছা’ কবিতায় বলছেন রাত্রিদিন চুমু খাব, বুকে জাপটে, মুখ থেকে মুখে/ ভরে দেবো অক্সিজেন, মধু, মদ, সিংহীর কামনা/ আমার কঙ্কালটিকে দুহাতে জড়িয়ে রেখে,/ তুমি থাকবে অনন্ত যৌবনা!

প্রেম এইখানে সর্বকালীন মুহূর্তজয়ী হতে চাইছে অর্থাৎ জীবন তার ইচ্ছা ও মুহূর্তমাফিক এক তাৎক্ষণিকের অভিঘাত সহ্য করে বড় হতে থাকে।

‘সামুদ্রিক পরামর্শ’ কবিতায় কবি বলছেন, “সমুদ্রে যেও না তুমি, যদি না সঙ্গে থাকে/ কোনো শক্ত সমর্থ যুবতী”। উপরিউক্ত একই কবিতায় কবি আবার বলছেন, “সমুদ্রে যেও না তুমি, সঙ্গে নিয়ে/ কোনো শক্ত-সমর্থ যুবতী”। আবার শেষে, “তবুও সমুদ্রে যেও, সঙ্গে নিয়ে একটি শক্ত-সমর্থ যুবতী/ সন্ধ্যাবেলা চাঁদ উঠলে বিনীত প্রস্তাব দিও, পেয়ে যাবে/ চুম্বন, সম্মতি!”

কাউন্টার স্ট্রেনের মতো ক্রিসক্রস খেলছে সময় তাঁর কবিতায় অথচ জীবনের গঠন তাই দাবি করছে এইভাবে ক্রমশ কবিতা এত দৃঢ় হচ্ছে যে সে পাঠকের স্থিতিহীন সময় আয়নার সামনে প্রগাঢ় হয়ে উঠছে, তাকিয়ে দেখছে এই তো আমি, আমিই আমার অর্ন্তযামী! এখানে প্রতি সময়, যাপনের নিয়মাবলী, উপাদান, সারবত্তা, প্রেম ও যা কিছু মুখর ও অনুভূতিশীল তারা সূত্র প্রতিষ্ঠা করে, সমস্ত সূত্রের মতোই সূত্র সূত্রকে ভাঙ্গে—কবি এই সময়ের মূর্ছনাকে দক্ষভাবে তুলে ধরেছেন, আমার কাছে কবি রণজিৎ দাশের কবিতা চূড়ান্ত ব্যাপ্তিময় অথচ তাঁর কবিতার কাঠামো একটি যারপরনাই সংসক্তি ও আসঞ্জনের পূর্ণ গঠনে গঠিত।

ক্রোমোজোম থেকে প্রাণবিন্দু, রস থেকে রসাতল সব কিছুর মধ্যে লুকিয়ে আছে ক্রিসক্রস, এই ক্রিসক্রস না থাকলে জীবনের অতৃপ্তি হারিয়ে যায়, আর জীবন শেষ হতে থাকে, পাওয়া আর না পাওয়া, বোঝা আর না বোঝা, ত্বরণ ও মন্দন মিলনকে, সম্পর্ককে, প্রাপ্তিকে ত্বরান্বিত করে—এই অনুভবের দৃঢ়তা থেকে কবি রণজিৎ দাশ।

“দেখেছি শিল্পের ভিক্ষা, ফুটপাতে, গুমোট সন্ধ্যায়/ রঙিন খড়িতে আঁকা কালীর বিশাল স্তনে ছড়ানো মুদ্রায়।/ দেখেছি সে শিল্পীকেও, উদাসী, ভ্রূক্ষেপহীন,হাতে নীল চক/ পথের কুকুর আর আকাশের সন্ধ্যাতারা—এই তার নীরব দর্শক।” (ভিক্ষা,কাব্যগ্রন্থঃ ঈশ্বরের চোখ)

কবি রণজিৎ দাশ

প্রতিটি ভিক্ষার মধ্যে লুকিয়ে থাকে চরম ব্যর্থতার হাসাহাসি। একটা দীর্ঘ না পাওয়া ক্ষুদ্র পাওয়ার দিকে যেন সর্বস্ব দিয়ে ডাকতে চায়, শ্রোতারা বেশিরভাগ বধির, যারা প্রকৃত শ্রোতা তারা অপারগ, দু-একটা ব্যতিক্রমের আশায় ভিক্ষা/ শিল্প চলতেই থাকে—উপরিউক্ত কবিতাটির প্রতিটা সংশ্লেষ যেন গলায় আটকে থাকা যন্ত্রণার দৃঢ়তাকে বোঝায়, একটি মুহূর্তজয়ী মুহূর্ত থেকে অনন্তের দিকে ধাবিত হচ্ছে কবির বার্তা। কবি লিখছেন, ‘মেট্রো রেল’ কবিতায়—

“স্নানরত যুবতীর/ অবচেতনের মতো/ সুন্দর এই সুড়ঙ্গ”
“সূর্য ও সংযমহীন/ বাসস্টপের বিষণ্ন প্রতীক্ষা হীন/ এই পাতালপথ, তেত্রিশ মিনিটে/ লজ্জা থেকে লিবিডো-অব্দি যাবে।”—লজ্জা থেকে লিবিডো, তেত্রিশ মিনিট, বাসস্টপের প্রতীক্ষাহীন, অবচেতনের মতো সুড়ঙ্গ কী তীব্র ব্যঞ্জনায় মাধ্যমহীন মাধ্যমের পথ, সংহারের পূর্ব পথ—লজ্জা থেকে লিবিডো অবধি, শুরু থেকে গন্তব্য অবধি কী দ্রুত অপেক্ষাহীন পর্যায়বৃত্তি। গমন আর অবগাহনের মধ্যসময়—যান্ত্রিক রূপকময় শরীরী প্রেম, যেখানে সময়ের দূরত্ব এত গরীব যে কিছুই সম্পূর্ণ হয় না! এ কি কেবলই দর্শন! এটি একটি ঘর্ষণ, একটি ঝাঁকুনি, সিদ্ধান্তে পৌঁছোনোর গেঁড়ি-গুঁগলি আবেদন নয়, এখানে দৃঢ়তা স্থায়িত্ব একপ্রকারেই আদর ও অপমান করে কম্পিত করে দিয়ে, চমকিয়ে অস্তিত্বসচেতন করে। শিল্পী, কবি এঁদের দৃঢ়তার কাছে হেঁট হয়ে যাওয়া মানে আত্মসমর্পণ এবং সেটাই জাগরণের সত্যি।

কবির ‘কবন্ধ মিথুন’ কবিতাটি পড়ে কবিতার চোরাবালিতে ঢুকে যাচ্ছিলাম—
“যে স্ত্রী-পতঙ্গ তার সঙ্গী পুং-পতঙ্গের/ মুণ্ডচ্ছেদ করে নেয়, অতর্কিতে, সঙ্গমের আগে—/ এবং মিলিত হয় মগজের রাশমুক্ত শুদ্ধ দেহটির সঙ্গে,/ কবন্ধের উন্মুক্ত আগুনে;/ উদ্গীর্ণ মৃত্যুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সম্ভোগের, বীজনিক্ষেপের/ চূড়ান্ত কম্পনগুলি উপভোগ করে,/ ছিন্নমস্তা উল্লাসের প্রত্যক্ষ বিস্ময় সেই/ পতঙ্গের তৃপ্তি, তার গর্ভ, অবসাদ/ জীবনের ক্ষুদ্র সত্য; কল্পনার অন্তিম প্রবাদ।” (কবন্ধ মিথুন, কাব্যগ্রন্থ- সময়,সবুজ ডাইনি)

একটি তীব্র সত্য ও দৃঢ় শিখনের কবিতা এটি, অশ্রুতপূর্ব এক লেখনী। এক প্রজাতির পতঙ্গের আক্ষরিকই এপ্রকার সঙ্গমরীতি আছে কিন্তু বিষয় হলো এই যে রীতি যাই হোক না কেন এটিই শাশ্বত সত্যি নারী-পুরুষ সৃষ্টি-সঙ্গমে, এক বিন্দুতে সমাহিত দুটি বিপরীত অনুভবের সীমান্ত। প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি দুটি ভিন্ন বিন্দু ধরে উঠতে উঠতে যেন গ্রাফের একটি বিন্দুতে মিলিত হলো সেখানেই সৃষ্টি ও বিনাশ যুগপৎ হলো, তৃপ্তি, গর্ভ, অবসাদ—
“গৌতম বুদ্ধকে আমি আর্শীবাদ করি—, জোড়া রাজহাঁস—এই কোমল শিল্পের চাপে যেন তাঁর নির্বাণের মোহ ভেঙে যায়।”(জোড়া রাজহাঁস, কাব্যগ্রন্থ-আমাদের লাজুক কবিতা)

শিল্প, কামনা, লিপ্সা, উৎপাদন ও জন্মরং, সবুজ এগুলো সৃষ্টিপথের মূল কারক, যে সৃষ্টিকে রক্ষার জন্যই কোনো পুরুষ সৃষ্টিপন্থা ত্যাগ করেছেন, কবি তাকে এই বার্তা দিয়ে সমস্ত মহাত্মা কে জুড়ে দিয়েছেন সৃষ্টির কাজে—নারী, মোহ, স্তন সকলের দ্বারা নির্বাণ পরাজিত হোক, সবুজের আরো উৎকৃষ্ট, কচি জন্ম, সৃষ্টিকে স্বপ্নসান্নিধ্যে ভরে দিয়েছেন কবি তাঁর আর্শীবাদের নেপথ্যে। এটি কোনো ভাঙন নয়, সার্বিককে সার্বিক সারবত্তার দিকে মুখ ঘুরিয়ে দেওয়া যেন সৃষ্টির আগমনী ধ্বনিকে জন্মের প্রকৃত সত্য দেখিয়ে দৃঢ় করছেন অধিক ও অনধিকের ফাঁকে গড়ে ওঠা সাযুজ্যকে।

‘আমাদের প্রেম’ কবিতার শেষ দুই পঙক্তি এক ভুক্ত সত্যের সামনে এসে দাঁড় করায়, তবে কি এই খেলুড়ে গাঠনিক মহিমা ধরে ধরে এত গম্ভীর যাপন করছি নাকি করছি না! একটি জাতীয় ঘোরে গিয়ে মিশে যাচ্ছি না তো সেই ‘পারফিউম’ ছবির শেষদৃশ্যের মতো—
“কখনো ভেবেছো, কেন প্রকৃতির সত্যগুলি
দৃশ্যত ভৌতিক, কিন্তু আসলে স্বয়ংসিদ্ধ, আবেগবর্জিত?”
‘বন্দরে কথ্যভাষা’ কাব্যগ্রন্থের ‘রজনীগন্ধা’ কবিতাটি একটি মাধ্যমের উচ্চ বিকিরণ যেন—
“মৃত্যুর পর একটা অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে যায়। শরীর পচতে শুরু করে, বেরুতে
থাকে দুর্গন্ধ। ....
তাহলে প্রাণ মূলত এক গোপন সুগন্ধ, যা আজীবন শরীরের ভিতর বাসা বেঁধে
থাকে, এবং মৃত্যুর পর মুহূর্তে শরীরকে ছেড়ে চলে যায়?”

কবিতা কি একটি সূত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাইল! হ্যাঁ চাইল, একে দর্শন তো বলতেই পারি, তার চেয়েও যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো সমস্ত জীবন কোন এককের সামনে এসে বসছে বা কবি তাঁকে এনে বসিয়েছেন! এককের সঙ্গে লেগে থাকে রাশি, এখানে গন্ধ রাশি আর একক যেন শরীর, কবি উন্মুক্ত বাস্তবকে আরো খুলে দিচ্ছেন, খুলে দিচ্ছেন নশ্বরতাকে—যেখানে চূড়ান্তরা পরিবর্তনের সামনে এসে হোঁচট খাচ্ছে না কারণ রূপান্তরই সর্বজনীন ও গ্রাহ্য।

‘ছেলেকে বলা রূপকথা’ কবিতায় অতিপ্রাকৃত ভঙ্গিমায় বাস্তবকে রচনা করায় ,কবি ছেলেকে রূপকথা বলার ভঙ্গিমাতে নিজেই আস্ত রূপকথা হয়ে যান যার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে সম্মোহনী নিরুপায় বাস্তবতার ছায়া...
“নার্সকে পছন্দ হলে অর্ধেক অসুখ সেরে যায়
শূন্যতা, ডেটলগন্ধ , ভাতে মাছি—সব ভালো লাগে

পুরোপুরি সেরে উঠলে ডিসচার্জড—
সেই ভয়ে ভয়ে
বাকিটা জীবন তাই
অর্ধেক অসুখ নিয়ে হাসপাতালে থেকে যেতে হয়” (নার্স, কাব্যগ্রন্থঃ জিপসীদের তাঁবু)

একটা গোটা জীবন অনুভূতির দ্বৈত রূপ নিয়ে ভেতরে ক্ষয়ে যায় কেবল আকাঙ্ক্ষার আহ্লাদে। ‘অর্ধেক অসুখ’ এখন দৃঢ়তা, যা সেরে যেতে পারে অর্ধেক মাত্রায় যার জন্য, তারই জন্য অর্ধেক অসুখ নিরাময়হীনভাবে থেকে যায়, উৎস থেকে সমাপ্তি অবধি কবিতাটি মূল সিদ্ধান্তে অটুট, কেবল মাধ্যমে ধাক্কা খেয়ে নিল পাঠকের অস্থিরতায়, জীবনের জৈব বাহুল্যে ও বাস্তবে। এইখানে কবি চূড়ান্তের হয়ে ওঠেন।

কবি জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যে গোপন আকাঙ্ক্ষাগুলি যেন সত্যিই নিঃশব্দে বহন করছেন, তার গঠন এত মজবুত যে তার আওয়াজ হয় না, গতির দৃঢ়তায় বাস্তবের বশবর্তী হতে থাকে, কবি রণজিৎ দাশ আমার কাছে দৃঢ়তার কবি, যার মূর্ছনা থমকাতে সাহায্য করে, ভুক্ত মুহূর্তকে জার্ক দেয়, কারণ এটি পূর্বে ঘটেছে বা ক্রমে ঘটছে অথচ প্রকাশভঙ্গি জানে না সেই অবয়বকে ব্যপ্তি দেন কবি, গতিকে গতির মধ্যে বড় হতে দেন সেখানে ঘটে যায় পর্যায়বৃত্তি , আমার স্বল্প মুহূর্তের কবিতা যাপন যা কেবল ব্যাক্তিগত উপলব্ধি দিয়ে তাই তুলে ধরার চেষ্টা মাত্র... তাঁকে নিয়ে এ আলোচনা অবশ্যই সম্পূর্ণ নয়! কবিকে আমার শ্রদ্ধা, প্রণাম ও শুভেচ্ছা। তাঁর এই প্রগাঢ় সৃষ্টির ত্বরার প্রতি আরো তাকিয়ে থাকলাম, তাকিয়ে থাকতে বাধ্য, কেবল সে কারণেই...

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন আহমদ রফিক ও মাসরুর আরেফিন



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

  • Font increase
  • Font Decrease

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিক।

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০১৯ পেয়েছেন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন। ‘ভাষা আন্দোলন: টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ প্রবন্ধের জন্য আহমদ রফিককে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসের জন্য মাসরুর আরেফিনের নামের পাশে যোগ হয়েছে পুরস্কারটি।

করোনা মহামারির কারণে এবার অনলাইনের মাধ্যমে নির্বাচিত দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিককে সম্মাননা জানানো হয়। গত ১৫ জানুয়ারি এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। এছাড়া ছিলেন আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী শাহ এ সারওয়ার।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সমসাময়িক লেখকদের স্বীকৃতি দিতে আইএফআইসি ব্যাংক ২০১১ সালে চালু করে ‘আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার’। প্রতিবছর পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয় সেরা দুটি বই। নির্বাচিত প্রত্যেক লেখককে পাঁচ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র পেয়ে থাকেন।

;

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;

কল্পনা ও ইতিহাসের ট্রাজিক নায়িকা আনারকলি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আনারকলির নাম উচ্চারিত হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহে এক করুণ-মায়াবী প্রেমকাহিনী সবার মনে নাড়া দেয়। ইতিহাস ও কল্পকথায় আবর্তিত এই রহস্যময়ী নতর্কীর পাশাপাশি শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাট আকবর, সম্রাজ্ঞী যোধা বাঈ চোখের সামনে উপস্থিত হন। ভেসে আসে পরামক্রশালী মুঘল আমলের অভিজাত রাজদরবার ও হেরেম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশ-পূর্ব উপমহাদেশের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক দ্যুতি, বহুত্ববাদী পরিচিতির রাজকীয় অতীত এসে শিহরিত করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিকদের। 

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত ৩৩১ বছরের বিশ্ববিশ্রুত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বহু সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদীর নাম বীরত্বে ও বেদনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আনারকলির নাম বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক বিবরণের কোথাও লেখা নেই, যদিও মুঘল হেরেমের এই রহস্যময়ী নারীর নাম আজ পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ও লোকশ্রুতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্রাজ্ঞী, শাহজাদী কিংবা কোনও পদাধিকারী না হয়েও মুঘল সংস্কৃতির পরতে পরতে মিশে থাকা কে এই নারী, আনারকলি, যিনি শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছেন, এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। ইতিহাসে না থাকলেও শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে চিত্রিত হচ্ছেন তিনি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তায়। ইতিহাস ও মিথের মিশেলে তাকে নিয়ে আখ্যান ও কল্পকথার কমতি নেই। তার নামে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে মাজার, সমাধি স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাজার, মহিলাদের পোষাকের নান্দনিক ডিজাইন। ইতিহাসের রহস্যঘেরা এই নারীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’। রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ ও গবেষণা।

যদিও বাংলা ভাষায় আনারকলিকে নিয়ে আদৌ কোনও গ্রন্থ রচিত হয়নি, তথাপি উর্দু সাহিত্যে তাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক নাটক ও উপন্যাস। ইংরেজিতে রয়েছে বহু গ্রন্থ। বিশেষত উর্দু ভাষার বলয় বলতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের যে বিশাল এলাকা পূর্বের বিহার থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত, সেখানে আনারকলি একটি অতি পরিচিত ও চর্চিত নাম। সাহিত্যে ও লোকশ্রুতিতে তিনি এখনও জীবন্ত। অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে রয়েছে আনারকলি মাকবারা। মাকবারা হলো কবরগাহ, সমাধিসৌধ। মুঘল স্মৃতিধন্য শহর দিল্লি, লাহোরে আছে আনারকলি বাজার। সাহিত্য ও লোককথার মতোই আনারকলিকে নিয়ে নির্মিত নানা লিখিত ও অলিখিত উপাখ্যান। 

অথচ মুঘল রাজদরবার স্বীকৃত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর কোথাও উল্লেখিত হন নি আনারকলি। প্রায়-প্রত্যেক মুঘল রাজপুরুষ লিখিত আকারে অনেক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখলেও তার নাম আসে নি কোনও মুঘলের আত্মস্মৃতি বা ইতিহাস গ্রন্থে। তাহলে কেবলমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে তার নাম অর্ধ-সহস্র বছর ধরে লোকমুখে প্রচারিত হলো কেন এবং কেমন করে? সত্যিই আনারকলি বলে কেউ না থাকতেন কেমন করে সম্ভব হলো পাঁচ শতাধিক বছর ধরে নামটি টিকে থাকা? এসব খুবই বিস্ময়কর বিষয় এবং আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

ভারতবর্ষে মুঘল ইতিহাসের এক রহস্যময় নারী চরিত্র রূপে আনারকলিকে নিয়ে আগে বহু চর্চা হলেও সবচেয়ে সফল ও ব্যাপকভাবে তিনি চিত্রিত হয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রস্থল বলিউডের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেরা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’-এ। ছবির কাহিনী মুঘল-ই-আজম তথা শাহানশাহ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের দরবারে আবর্তিত। আকবরপুত্র শাহজাদা সেলিম, যিনি পরবর্তীতে হবেন সম্রাট জাহাঙ্গীর, মুঘল দরবারের এক নবাগত নর্তকী আনারকলির প্রেমে বিভোর। দীর্ঘ ছবিটি সেলিম-আনারকলির প্রণয়ের রোমান্টিকতায় ভরপুর। কিন্তু সম্রাট আকবর সেই ভালোবাসা মেনে নিতে নারাজ। প্রচণ্ড ক্রোধে আকবর আনারকলিকে শাহজাদার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, সম্রাটপুত্রকে ভালোবাসার অপরাধে তুচ্ছ নর্তকী আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করেন। 

প্রশ্ন হলো, সত্যিই যদি আনারকলি নামে কোনও চরিত্র না-ই থাকবে, তাহলে এতো কাহিনীর উৎপত্তি হলো কেমন করে? সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে আনারকলিকে কেন্দ্র করে যা বলা হয়েছে বা দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা কতটুকু? সত্যিই কি আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? নাকি আনারকলি বলে ইতিহাসে কোনও চরিত্রই ছিল না? নাকি সব কিছুই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কোনও মিথ, উপকথা বা গল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও মেলে নি।

আনারকলি যদি ‘কাল্পনিক’ হবেন, তাহলে, মুঘল আমলে ভারতে আগত ইংরেজ পরিব্রাজকের বর্ণনায়, লখনৌর লেখকের উপন্যাসে, লাহোরের নাট্যকারের নাটকে, বলিউডের একাধিক সিনেমায় আনারকলি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন কেন? কেন শত শত বছর কোটি কোটি মানুষ আনারকলির নাম ও করুণ ঘটনায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন? কেন আনারকলির নামে ভারতের প্রাচীন শহরগুলোতে থাকবে ঐতিহাসিক বাজার? লাহোরে পাওয়া যাবে তার কবরগাহ, যেখানে শেষ বয়সে শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর হাজির হয়ে নির্মাণ করবেন সমাধিসৌধ আর রচনা করবেন করুণ প্রেমের কবিতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্যে ‘কিছুটা ঐতিহাসিক, কিছুটা কাল্পনিক চরিত্র আনারকলি’ ও তাকে ঘিরে প্রবহমান প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ভিত্তিক এই রচনা। আমার রচিত ‘দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো’ (প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ) গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করায় মুঘল মূল-ইতিহাসের বাইরের এই রহস্যময়ী চরিত্র ও আখ্যানকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনে উৎসাহী হয়েছি। উর্দু ও ইংরেজিতে আনারকলির ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক ইতিহাস নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। যেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। আনারকলির প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে নির্মিত অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’ সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। চেষ্টা করেছি ইতিহাস ও মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুঘল হেরেমের রহস্যময়ী নতর্কী ও বিয়োগান্ত প্রেমের নায়িকা আনারকলিকে অনুসন্ধানের।

;