স্মৃতিধর মানুষ



অনুবাদ: মিলু হাসান
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি একজনকে জানতাম যার সব ট্রেনের সময়সূচি মুখস্থ ছিল, তাকে একটিমাত্র জিনিস চরম আনন্দ দিত তা হচ্ছে ট্রেন। তার সময়টুকু সে রেলস্টেশনে কাটাত আর ট্রেন আসতে ও ছেড়ে যেতে দেখত। বগিগুলোর দিকে, ইঞ্জিনের শক্তির দিকে, বড়-বড় চাকাগুলোর দিকে অবাক হয়ে একনজরে তাকিয়ে থাকত আর টিকেট চেকারদের দিকে, স্টেশনের কর্মচারীদের দিকে—যারা চলতি ট্রেনে হুট করে লাফ দিয়ে উঠে যেতে পারে তাদের দিকেও বিস্ময় চোখে তাকিয়ে থাকত।

প্রত্যেকটা ট্রেন তার চিরচেনা, জানত ট্রেনটি কোথা থেকে আসছে, কোথায় যাবে আর কখন কোথায় গিয়ে পৌঁছবে, সেখান থেকে ট্রেনটি আবার কখন ছাড়বে আর সেই ট্রেন কখন এসে পৌঁছবে।

সে বগিগুলোর নাম্বার জানত, জানত কবে কোন ট্রেন চলে, তাতে খাবার বগি আছে কিনা, ট্রেন অন্য যাত্রীদের তুলতে কোন কোন স্টেশনে থামবে আর কোন কোন স্টেশনে থামবে না। সে জানত কোন কোন ট্রেনে ডাক বিভাগের বগিগুলো থাকে, মিডলটন, এ্যাবারগাভেনি, ওটন-আন্ডার-এজ্ কিংবা ওরকম কোথাও যেতে চাইলে আপনার কত টাকা দামের টিকেট লাগবে।

সে কখনো সুরাখানায় যেত না, যেত না সিনেমা দেখতে। কোথাও বেড়াতে যেত না, তার ছিল না কোনো বাইসাইকেল, রেডিও, টেলিভিশন। দৈনিক পত্রিকা বা কোনো বইও কখনো পড়ত না, আর যদি কখনো তার কাছে চিঠি আসত সে হয়তো তাও পড়ে দেখত না।

এসবের জন্য তার সময় কোথায়—যেহেতু সারাদিনই সে স্টেশনে কাটাত, আর যখন ট্রেনের সময়সূচি বদলাত, মে আর অক্টোবরে, তখন হয়তো তাকে কয়েক সপ্তাহের জন্য স্টেশনে দেখা যেত না৷

ওই সময়টাতে সে বাসায় টেবিলে বসে বসে নতুন সময়সূচির আগাপাছতলা মুখস্থ করে নিত, অদল-বদলগুলোর নোট নিত আর সব জেনেশুনে তার মন খুশিতে ভরে উঠত।

এরকমও হতো—কেউ তাকে ট্রেন ছাড়ার সময় জিজ্ঞেস করল, তখনই তার সমস্ত চেহারা নুরানি আলোর মতো ঝলমল করে উঠত, আর সে সওয়াল করত লোকটি কোথায় যেতে চায়। তবে যে তাকে ওরকম প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবে, তার ট্রেন মিস হবে নিশ্চিত, কারণ সওয়ালকারীকে সে সহজে যেতে দিত না। শুধু যে সে ট্রেনের সময়সূচি বলে ক্ষান্ত হবে ব্যাপার এরকমও না। সবিস্তারে জানাত, কটা কামরা আছে, কোন কোন স্টেশনে গিয়ে এ ট্রেন থেকে নেমে অন্য আরো ট্রেন ধরা যাবে, সমস্ত ট্রেনের সময়সূচি; সুন্দর করে বুঝিয়ে বলত। এ ট্রেনে করে কিভাবে প্যারিস অব্দি যাওয়া যায়, কোথায় ট্রেন বদলাতে হবে আর কখন গিয়ে পৌঁছবে আর সে একটুও বুঝতে চাইত না যে এসব জানতে লোকজন আগ্রহী কিনা। কিন্তু কেউ যখন তার সব জ্ঞান জাহির করার আগেই তার থেকে মুখ ঘুরিয়ে হাঁটা দিত তখন সে তাদের চরম গালিগালাজ করত আর চেঁচিয়ে বলত—ট্রেন সম্পর্কে তুমি কতটা জানো।

সে নিজে কিন্তু কখনো ট্রেনে চড়েনি। ট্রেনে চড়ার কোনো মানেই হয় না, সে বলত, ট্রেন কখন পৌঁছবে আর ছাড়বে তা তো সে আগেভাগেই জানে।

সে বলত, শুধু তারাই ট্রেনে চড়ে যাদের স্মৃতিশক্তি দুর্বল। যদি তাদের প্রখর স্মৃতিশক্তি থাকত তারা আমার মতো ট্রেন কখন কোথায় পৌঁছবে তার সময়সূচি মনে রাখত। তাহলেই এ সময়টা জানার জন্য অযথা ট্রেনে চড়ার কোনো দরকারই হতো না। আমি তাকে একবার বোঝাতে চেষ্টা করেছিলাম এই বলে যে, কিন্তু এমন লোকও আছে যারা ভ্রমণ উপভোগ করে, ট্রেনে ঘুরতে তাদের ভালো লাগে, জানালা দিয়ে আশেপাশের দৃশ্য দেখতে, অন্য কোনো ট্রেন যাওয়ার দৃশ্য—এসব দেখতে পছন্দ করে।

এ কথা শুনে সে রাগান্বিত হলো, সে ভেবেছিল আমি বুঝি তার সাথে মশকরা করেছি। সে বলল, এ কথা তো তুমি মিয়া ট্রেনের সময়সূচিতেই পড়তে পারো, তুমি জানো যে তুমি মার্লো, মিডেনহেড হয়ে যাবে, টয়ফর্ড, টাইলহার্স্ট, প্যাঙবর্জ তোমার পথে পড়বে। আমি বলেছিলাম, হয়তো লোকেদের ট্রেনে চড়তে হয় এ দরকারে যে, তাদের কোথাও যেতে হয়। সে বলেছিল, এ কথা মোটেও সত্য না। প্রায় প্রত্যেকেই তাড়াতাড়ি বা দেরিতে হলেও ফিরে আসে যেখান থেকে তারা রওনা করেছিল। এরকমও লোক আছে যারা রোজ সকালে ট্রেনে বের হয় আর সন্ধ্যাবেলা আগের জায়গায় ফিরে আসে—এটাই প্রমাণ করে তাদের স্মৃতিশক্তি কত বাজে। আর এ কথা বলে সে স্টেশনের লোকদের উদ্দেশ্যে যা মুখে আসে তা-ই বলতে শুরু করল। সবাইকে উদ্দেশ্য করে সে চেঁচিয়ে বলেছিল, আপনারা সব বোকা, আপনাদের একটা কিচ্ছুও মনে থাকে না। চেঁচিয়ে সে আরো বলছিল, আপনারা প্যাঙবর্জ পেরিয়ে যাবেন আর সে ভেবেছিল এতেই বুঝি সকলের ট্রেনে চড়ার স্বাদ মিটে যাবে। চেঁচিয়ে বলছিল, আপনারা দুনিয়ার সেরা বোকা, আপনারা গতকালও ট্রেনে চড়ছিলেন। আর যখন লোকে তার কথা শুনে হাসাহাসি করছিল, সে লোকদের টানাটানি করে ট্রেনের কামরা থেকে নামানোর চেষ্টা করছিল, কাকুতি-মিনতি করে বলছিল, তারা যেন আর ট্রেনে না চড়ে।

সে জোরে জোরে চেঁচিয়ে বলছিল, আমি সব বুঝিয়ে বলছি। আপনারা দুইটা সাতাইশে প্যাঙবর্জ পার হবেন, আমি জানি আপনারা পার হবেন, আপনারা দেইখেন। আপনারা হুদাই টাকা-পয়সা অপচয় করছেন, রাস্তায় ঢালছেন, অথচ সময়সূচিই যেখানে আপনাদের সব জানান দিচ্ছে।

তখন সে লোকজনদের মারধর করতে শুরু করে দিল, আর বলছিল, যদি আপনারা আমার কথা না শোনেন আপনাদের পিটায়ে শিখাইতে হবে।

স্টেশন মাস্টারের করার কিছুই ছিল না, তাকে বলেছিল, যদি সে ভদ্র-নম্র ব্যবহার না করে তাহলে তাকে আর স্টেশনে ঢুকতে দেওয়া হবে না। এ কথা শোনার পর সে আঁতকে উঠল, কারণ স্টেশন ছাড়া সে বাঁচবে কী করে, তাই সে একটা টুঁ শব্দও করল না। সারাদিন চুপচাপ বেঞ্চিতে বসে রইল, ট্রেন আসতে আর ছেড়ে যেতে দেখল। কেবল মাঝে-মাঝে নিজেকে নিজে ফিসফিস করে শোনাল কয়েকটা নাম্বার, লোকজনের দিকে একনজরে তাকিয়ে থাকল, যাদেরকে সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না।

সত্যি বলতে এখানেই গল্পটা শেষ হওয়ার কথা।

বহু বছর পর স্টেশনে একটা তথ্য কেন্দ্র খোলা হলো। ইউনিফর্ম পরা এক কর্মচারী বসে থাকে কাউন্টারের পেছনে আর সে ট্রেনসংক্রান্ত সমস্ত সওয়ালের জবাব জিজ্ঞেস করা মাত্র দিয়ে দেয়। ব্যাপারটা ট্রেনসংক্রান্ত স্মৃতিধর লোকটার কিছুতেই বিশ্বাস হলো না, সে রোজ নতুন তথ্যকেন্দ্রে যেত আর জিজ্ঞেস করত খুব জটিল জটিল প্রশ্ন—কর্মচারীর এলেম পরীক্ষা করার জন্য। সে সওয়াল করত, গ্রীষ্মের রবিবারে গ্লাসো থেকে চারটা চব্বিশে যে ট্রেন আসে সেটির ইঞ্জিনের মডেল কী? কর্মচারী একটা বই খুলে দেখে তাকে তা বলে দিত। সে সওয়াল করত, ধরেন আমি ৬টা ৫৯ মিনিটে ট্রেনে উঠলে কখন মস্কো পৌঁছব? আর কর্মচারী তাও বলে দিত। তারপর স্মৃতিধর লোকটি বাসায় ফিরে এলো, তার সময়সূচির চার্টগুলি পুড়িয়ে ফেলল আর যা-কিছু সে জানত সব ভুলে গেল। পরের দিন সে কর্মচারীকে সওয়াল করল, স্টেশনের সিঁড়ির ধাপ কয়টা? কর্মচারী বলল, এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। তারপর সে স্টেশনের সিঁড়ির ধাপগুলো গুনতে গেল, বারবার গুনে সংখ্যাটা সে স্মৃতিতে গেঁথে রাখল, এখন আর তার স্মৃতিতে ট্রেনের সময়সূচির কোনো হদিশ নেই।

এরপর আর কোনোদিন তাকে স্টেশনে দেখা যায়নি। সে এখন শহরের বাড়ি বাড়ি যায়, সিঁড়ির ধাপগুলো গুনে রাখে আর মুখস্থ করে নেয়। এখন সে এমন সব সংখ্যা জানে যা তামাম দুনিয়ার কোনো বই-পুস্তক-কিতাবে লেখা নেই।

কিন্তু যখন সে শহরের সব সিঁড়িধাপগুলোর সংখ্যা জেনে গেল তখন সে স্টেশনে এলো, একটা টিকেট খরিদ করল। তারপর জীবনে প্রথমবারের মতো সে ট্রেনে চড়ল যাতে সে অন্য শহরে গিয়ে সিঁড়ির ধাপগুলো গুনতে পারে। তারপর আবার অন্য একটা শহরে—এরকম করে সে তামাম দুনিয়ার সমস্ত সিঁড়ির ধাপগুলোর সংখ্যা জেনে নিতে পারে, এটা এরকম কিছু যা কেউই জানে না, কোনো কর্মচারীর হেডম নেই কোনো বই খুলে তা বলে দেয়।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;