আইনের সংশোধন ধর্ষকদের প্রতি সরকারের কঠোর বার্তা

মুফতি এনায়েতুল্লাহ
মুফতি এনায়েতুল্লাহ, ছবি: বার্তাগ্রাফিক্স

মুফতি এনায়েতুল্লাহ, ছবি: বার্তাগ্রাফিক্স

  • Font increase
  • Font Decrease

‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২০’ অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। অধ্যাদেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি করা হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। মামলা শুরু থেকে বিচার শেষ করতে হবে ছয় মাস বা ১৮০ দিনের মধ্যে। বিচারক বদলি হলেও মামলার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর সচিবালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম মন্ত্রিসভার এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এ সংশোধনী শুধু আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে নয়, বিভিন্ন দেশের সার্বিক পরিস্থিতি আমরা দেখেছি, আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিসহ সবকিছু মিলিয়েই এ সিদ্ধান্ত এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকেও এটি আলোচনায় এসেছে। মানুষের সচেতনতাটাই গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, আগামীকাল (১৩ অক্টোবর) এটি অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হবে। অর্থাৎ আইনে পরিণত হবে। এই মুহূর্তে জাতীয় সংসদের অধিবেশন না থাকায় রাষ্ট্রপতি এটিকে অধ্যাদেশ আকারে জারি করবেন।

সম্প্রতি দেশে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। এ জন্য আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার দাবি ওঠে। আগের আইনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন ছিলো, সেটিকে এখন মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন করা হয়েছে।

জনদাবি ও সময়ের চাহিদার প্রেক্ষিতে আইনের সংশোধনী অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার দাবি রাখে। অনেকে মনে করেন, এর ফলে ধর্ষণের মতো অসভ্য ও বর্বর কাজ বন্ধ হবে। ধর্ষণ হলো- বর্বরতার চূড়ান্ত কুৎসিত রূপ। কোনো সভ্য সমাজে ধর্ষণের মতো কুৎসিত কাজ চলতে পারে না। সমাজের সবাই এখন ধর্ষণের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, এই সময়ে আইনের সংশোধন অপরাধীদের প্রতি চূড়ান্ত বার্তা দেবে বলে আমরা মনে করি। কঠোর আইনের কারণে অপরাধী অপরাধ করার আগে ভাববে, ফলে সমাজে কমে আসবে অপরাধ প্রবণতা।

নারীর প্রতি সহিংসতা ও ধর্ষণ সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো সমাজ ব্যবস্থায় গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। অতীতে দেখা গেছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশ্রয়ের সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে গেছে। যা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে। আইনের সংশোধন তাদের জন্যও একটি বার্তা। আইন সংশোধনের ফলে সামাজিকভাবে এর প্রভাব সৃষ্টি হবে। সবাই বুঝবে, এ ধরনের হীন ও জঘণ্য কাজ করলে কঠিন শাস্তি রয়েছে, তা আর এড়ানো যাবে না।

সম্প্রতি ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সারাদেশে ব্যাপক গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। এটি প্রথমে শুরু হয় সিলেট এমসি কলেজে বেড়াতে আসা এক নববধূকে গণধর্ষণ ঘটনার প্রতিবাদে। এক তরুণ দম্পতি বিকেলবেলা সিলেট মুরারীচাঁদ কলেজ ঘুরে দেখছিলেন। তখন কলেজ হোটেলে অবস্থানরত ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা ওই দম্পতিকে আটক করে। স্বামীকে একটি কক্ষে আটকে রেখে তরুণীকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। খবরটি বাইরে প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সাধারণ ছাত্র এবং জনতা প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন।

ছাত্র জনতার এই ক্ষোভের আগুন শুধুমাত্র সিলেট নয়, দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। সিলেটে ছাত্রলীগের গণধর্ষণের বিরুদ্ধে ছাত্র জনতার প্রতিবাদের আগুন প্রজ্জ্বলিত থাকা অবস্থাতেই অগ্নিতে ঘৃতাহুতির মতো আরেকটি পাশবিক নারী নির্যাতনের খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। সেটি হলো, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে গৃহবধূকে দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ার ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা বিবস্ত্র করে নির্যাতন করে এবং নির্যাতনের এই নারকীয় দৃশ্য ফেসবুকে ভাইরাল হয়। একে তো সিলেট এমসি কলেজে গৃহবধূকে ছাত্রলীগের গণধর্ষণে জনতার ক্ষোভের আগুন ধিকি ধিকি জ্বলছিল, তার ওপরে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের পৈশাচিক ঘটনা ধিকি ধিকি আগুনকে দাউ দাউ করে জ্বালিয়ে তোলে। ফলশ্রুতিতে আইনের সংশোধনপূর্বক সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে এই বার্তা দেওয়া হলো- বাংলাদেশে বল্গাহীন গতিতে ধর্ষণের মতো অসভ্যতা চলতে পারে না। জাতি হিসেবে আমরা নারী নির্যাতনের কলঙ্ক তিলক কপালে এঁটে বাঁচতে চাই না।

সিলেট এবং নোয়াখালীর বর্বর ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাও প্রশংসার দাবি রাখে। বেশ দ্রুততার সঙ্গে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়েছে। ধর্ষকদের রাজনৈতিক পরিচয় ছাপিয়ে তাদের গ্রেফতার করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণও অপরাধীদের প্রতি একটা ম্যাসেজ। অপরাধী অপরাধীই, তাদের ভিন্ন কোনো পরিচয় নেই।

ধর্ষণের প্রতিবাদ হচ্ছে, আইনেরও সংশোধন হয়েছে। এমতাবস্থায় আমরা অন্য একটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। শুক্রবার ঢাকার একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের খবরে প্রকাশ, ঢাকার ৯টিসহ দেশের ১০১টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দুই লক্ষাধিক। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন মামলা ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে দেড় বছর আগে উচ্চ আদালত নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশ অধস্তন আদালতে পালিত হয়নি। শুধু তাই নয়, উচ্চ আদালতেও এই ধরণের মামলা ঝুলছে বছরের পর বছর। ফলে আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছে অনেক আসামী। বিচারের গতি আনতে এবং ঝুলে থাকা মামলার বোঝা কমাতে দেড় বছর আগে উচ্চ আদালত ৭ দফা নির্দেশনা দিয়েছিল। এই ৭ দফার মধ্যে ছিল ৬ মাসের মধ্যে দ্রুত বিচার আদালত কর্তৃক মামলা নিষ্পত্তি। এখন আমাদের প্রত্যাশা, মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার ব্যবস্থা করা।

ধর্ষণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সারাদেশব্যাপী আওয়াজ উঠেছে। এটা অত্যন্ত ভালো লক্ষণ। সরকার ধর্ষণের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করেছে, সেটিও ইতিবাচক দিক। ধর্ষণের মতো অপরাধে কারও ছাড় নেই, সমর্থন নেই; এটা এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে। কারণ, ধর্ষণ একটি সামাজিক অপরাধ। পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশেই এ অপরাধের কঠোর শাস্তির বিধান আছে। অনেক দেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। তার পরও ওইসব দেশে ধর্ষণ বন্ধ হয়নি। শাস্তির কথা জেনেও মানুষ রিপুর তাড়নায় অন্যায়-অপকর্ম করে বসে। এ বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।

তাই সামাজিক অবক্ষয়রোধে মানুষের মধ্যে নৈতিকতাবোধ জাগ্রত করার বিষয়টি মনে রাখতে হবে। মানুষের নৈতিকতাবোধ জাগ্রত হয় ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি স্কুল-কলেজে ধর্মীয় মূল্যবোধকে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ধর্ষকের মধ্যে এই বোধ আনতে হবে, তারও তো মা, বোন ও কন্যা রয়েছে। যদি তারা ধর্ষিত হয়, তখন তার কেমন লাগবে? এক কথায়, সাজার পাশাপাশি ধর্ষকদের মনোজগতে ধর্ষণের কারণে সৃষ্ট ক্ষতগুলোর কথা ডুকিয়ে দিতে হবে। তাহলে দ্রুত এর ফলাফল মিলবে।

মুফতি এনায়েতুল্লাহ: বিভাগীয় প্রধান, ইসলাম, বার্তা২৪.কম