প্রয়োজনে সবার আগে টিকা নেবো আমি



প্রভাষ আমিন
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

অবশেষে সকল প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে করোনা ভ্যাকসিন যুগে প্রবেশ করলো বাংলাদেশ। নিজের টাকায় কেনা ভ্যাকসিনের আগেই এলো ভারতের উপহার। ‘প্রতিবেশী আগে’ এই নীতিতে ভারত নিজেদের দেশে টিকা প্রয়োগ শুরুর সাথে সাথেই প্রতিবেশীদের টিকা উপহার পাঠাচ্ছে। জনসংখ্যা বিবেচনায় উপহারের সবচেয়ে বড় উপহারের চালান মানে ২০ লাখ ডোজ টিকা পেয়েছে বাংলাদেশ। এ সপ্তাহের মধ্যেই পয়সায় কেনা ৩ কোটি ডোজের মধ্যে প্রথম চালান হিসেবে ৫০ লাখ ডোজ টিকা চলে আসবে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেই টিকার প্রয়োগ শুরু হবে। এখন পর্যন্ত যা পরিকল্পনা তাতে সরকারের করা অগ্রাধিকার তালিকা অনুযায়ী শুধু সরকারি হাসপাতালেই টিকা দেয়া হবে। পরে হয়তো টিকা ব্যবস্থাপনা বেসরকারি পর্যায়েও যাবে।

ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র করোনা ভাইরাস যেভাবে গোটা বিশ্বকে জিম্মি করে ফেলেছিল, তা থেকে মুক্তির আর কোনো উপায় নেই। তাই বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা আদাজল খেয়ে নামেন করোনার টিকা আবিষ্কার করতে। সাধারণত একটি টিকার আবিষ্কার থেকে প্রয়োগ পর্যন্ত ৭/৮ বছর সময় লাগে। কিন্তু জরুরি বিবেচনায় করোনার টিকা ৭/৮ মাসেই প্রয়োগের পর্যায়ে চলে এসেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টিকা আবিষ্কার হয়েছে। বাংলাদেশেও বঙ্গভ্যাক্স নামে একটি টিকার ট্রায়াল চলছে। তবে আপাতত আমরা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা কিনছি। পরে হয়তো অন্য টিকাও আসবে বাংলাদেশে। অক্সফোর্ডের টিকাটিই বাংলাদেশের জন্য উপযোগী। কারণ দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির বিদ্যমান অবকাঠামাতেই এই টিকা সংরক্ষণ এবং বিতরণ সম্ভব। আর ফাইজারের টিকা আনতে হলে বিশেষ তাপমাত্রার সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তাছাড়া এখন পর্যন্ত পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া বিবেচনায়ও সবচেয়ে নিরাপদ অক্সফোর্ডের টিকা কোভিশিল্ড।

করোনার টিকা যখন গবেষণা পর্যায়ে ছিল তখন মানুষের কৌতুহলের শেষ নেই, কবে আসবে টিকা। যখন আবিষ্কার হয়ে গেল, তখনও অভিযোগ, এখনও বাংলাদেশে আসছে না কেন, দেরি হচ্ছে কেন, সরকার ব্যর্থ; ইত্যাদি নানা অভিযোগ। যখন কেনাকাটা শেষ, তখন কে আগে টিকা পাবে, তা নিয়ে হুড়োহুড়ি। পরিকল্পনার পর্যায়ে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের এক নেতা ফোন করে বললেন, ভাই কোনো তালিকাতেই তো আমাদের নাম নেই। আমরা কি দেশের কোনো কাজেই আসি না। কিন্তু যখন সব শেষ করে টিকা বাংলাদেশে পৌঁছে গেছে, তখন দেখি কারো মধ্যেই আর আগ্রহ নেই। সবাই দেখি এখন ঠেলাঠেলি করছে। আওয়ামী লীগ বলছে, বিএনপি আগে নিক; বিএনপি বলছে, আওয়ামী লীগ আগে নিক। ভিআইপিরা বলছে, সাধারণ মানুষ আগে নিক। সাধারণ মানুষ বলছে, ভিআইপিরা আগে নিক। ডাঃ জাফরুল্লার চৌধুরীর মত প্রবীণ মানুষ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী যেন সবার আগে নেন। জনাব জাফরুল্লাহ যদি ঝুঁকি বিবেচনায় এটা বলে থাকেন, তাহলে তার এই বক্তব্য খুবই অসংবেদনশীল। ন্যুনতম ঝুঁকি থাকলেও প্রধানমন্ত্রী আগে নেবেন না, এটা নিশ্চয়ই জাফরুল্লাহ চৌধুরী বুঝবেন।

বাংলাদেশে আসা টিকা নিয়ে সংশয়, বিভ্রান্তি আর বিদ্বেষের কোনো কমতি নেই। প্রথম বিভ্রান্তি হলো, ভারতের টিকা কেন আনা হলো, বিশ্বে আর কোনো টিকা ছিল না? এটা আসলে বিভ্রান্তিই। কারণ ‘কোভিশিল্ড’ ভারতের টিকা নয়। এটা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা। ভারতের পুনের সেরাম ইনস্টিটিউটটে বানানো হয়েছে মাত্র। তারপরও কারো রাগ যায় না, ভারত থেকেই টিকা আনতে হলো কেন? এটা স্পষ্টতই বিদ্বেষ। বাংলাদেশের কিছু কিছু মানুষ আছে, যাদের কাছে ভারতের সবকিছুই খারাপ। আবার কিছু মানুষ আছে, তাদের কাছে ভারতের সবকিছুই ভালো। কিন্তু এটা তো সম্ভব না। ভারত সীমান্তে আমাদের মানুষ হত্যা করে, তিস্তায় পানি দেয় না, সবকিছুতে দাদাগিরি করে; এটা যেমন সত্যি। আবার একাত্তরে ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে বড় সহায়তাকারী দেশ, এটাও মিথ্যা নয়। ভারত নিজেদের লোকদের দেয়া শুরুর সাথে সাথেই বাংলাদেশসহ প্রতিবেশীদের টিকা উপহার দিয়েছে, এই চমৎকার উদ্যোগের জন্য তাদের অবশ্যই অন্তর থেকে ধন্যবাদ দিতে হবে। একবার ভাবুন, বাংলাদেশ যদি নিজেদের চাহিদা না মিটিয়ে ভারতে টিকা পাঠাতো কী হতে পারতো দেশে। ভারত আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ। আপনি বন্ধু বদলাতে পারবেন, প্রতিবেশী বদলাতে পারবেন না। তাই প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক থাকা ভালো। সেটা বাংলাদেশের দিক থেকে যেমন, ভারতের দিক থেকেও হতে হবে। তাই ভারত খারাপ কিছু করলে তার সোচ্চার প্রতিবাদ যেমন জরুরি, তেমনি ভারত বন্ধুত্বের সৌহার্দ্য নিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলে তাকে ধন্যবাদ দেয়ার মম উদারতা থাকাটাও দরকার। কোনো অন্ধত্বই কাম্য নয়।

এরপর আসি টিকা নিয়ে সংশয় ও ভয় প্রসঙ্গে। ফাইজারের টিকা প্রয়োগের পর নরওয়েতে ২৯ জনের মৃত্যুর খবরই টিকা নিয়ে একধরনের আতঙ্ক ছড়িয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও করোনা টিকার নানা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়িার খবর এসেছে। তাতেই মানুষের মধ্যে শঙ্কা এবং সংশয়। শুধু করোনা টিকা নয়, বিশ্বের সকল টিকা এবং সকল ঔষধেরই পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া আছে। এখন যে শিশুদের বিভিন্ন টিকা দেয়া হয়, তাতেও কিন্তু তাদের জ্বরসহ নানা সমস্যা হয়। আমাদের ছেলেবেলায় যে টিকা দেয়া হয়েছে, তার দাগ এখনও শরীরে আছে। টিকাদান কর্মসূচিতে আমরা সফল বলেই অনেকগুলো রোগ থেকে বাংলাদেশমুক্ত। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির যে সাফল্য তা কাজে লাগিয়ে করোনা টিকা কর্মসূচিকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে। কারণ টিকা ছাড়া করোনা থেকে মুক্তির আপাতত আর কোনো উপায় নেই। কেউ যদি ভেবে থাকেন আমার হয়ে গেছে, আর হবে না বা আমার করোনা হবে না বা হলেও আমার কিছু হবে না। সব ভাবনাই কিন্তু ভুল। যে কারো একাধিকবার করোনা হতে পারে। যে কারো করোনা হতে পারে এবং তা বিপদজনক হতে পারে। যে কোনো বয়সের মানুষ মারাও যেতে পারেন। তাই করোনা থেকে নিরাপদ থাকতে আমাদের সবাইকে করোনার টিকা নিতে হবে। সরকার খুব অগ্রাধিকার তালিকা ঠিক করেছে। সে তালিকা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে দেশের ৮০ ভাগ মানুষ টিকা পাবে। করোনার টিকা নেয়া বাধ্যতামূলক না হলেও জরুরি। কারণ প্রয়োজনীয় সংখ্যক মানুষ টিকা না নিলে হার্ড ইমিউনিটি আসবে না। তাতে যারা টিকা নিচ্ছে, তারাও পুরোপুরি নিরাপদ থাকবে না। শিশুদের টিকার মত তালিকা মেনে সবারই সময়মত টিকা নিয়ে নেয়া উচিত। এখানে আমরা যেন তাড়াহুড়োও না করি আবার গাইগুইও না করি। তবে করোনা টিকার ব্যাপারে জনগণকে উৎসাহ দিতে সরকারের ব্যাপক প্রচারণা এবং ইতিবাচক মনোভাব দরকার। টিকা দেয়ার আগে সবাইকে এক ধরনের মুচলেকা দিতে হবে। তাতে লেখা থাকবে, যে কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার দায় টিকা গ্রহণকারীর। এই মুচলেকা মানুষকে আতঙ্কিত করবে, নিরুৎসাহিত করবে। সরকারের বরং উচিত এমন একটি ফরম বানানো, যাতে লেখা থাকবে, টিকা নেয়ার পর সব ধরনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার দায়-দায়িত্ব সরকারের। তেমন কিছু হলে সরকার সবার চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে। তাহলে মানুষ আশ্বস্ত হবে। আগেই ভয় দেখালে মানুষ টিকা দিতে যাবে কেন?

সরকার ১২ কোটি লোককে টিকা দেবে। আগের এক লেখায় বলেছিলাম, টিকা দেয়ার তালিকায় ১২ কোটিতম হতেও আমার আপত্তি নেই। সেটা বলেছিলাম, কারণ তখন সবার টিকার জন্য ব্যাপক আগ্রহ। আমি বোঝাতে চেয়েছি, টিকা নিয়ে আমার আগ্রহ থাকলেও তালিকা ভেঙ্গে প্রয়োজনীয় কাউকে পেছনে ফেলে দৌড়ে আমি আগে টিকা নিতে চাই না। আমার কারণে যেন কেউ বঞ্চিত না হয়। এ কারণে আমি জাতীয় প্রেসক্লাব বা ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি কোথাও নিজের নাম তালিকাভূক্ত করিনি। কিন্তু এখন কারো কারো অনাগ্রহ দেখে আমার মনে হচ্ছে, সবার আগে টিকা দিতেও আমার আপত্তি নেই। করোনা বিদায় করতে যে কোনো ঝুঁকি নিতে আমি তৈরি। তারচেয়ে বড় কথা হলো, আমি জানি, অক্সফোর্ডের টিকার তেমন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই। তাই আপনারা সবাই তালিকায় নাম আসার জন্য অপেক্ষা করুন, নির্ভয়ে টিকা নিন এবং দেশকে করোনামুক্ত করুন।

লেখক: প্রভাষ আমিন,হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ