মামুনুল হকের মিথ্যাচার!



প্রভাষ আমিন
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক একজন নারীকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের রয়েল রিসোর্টে বেড়াতে গেছেন, আমার দৃষ্টিতে এটা কোনো অপরাধ নয়। সঙ্গের নারী তার বিয়ে করা স্ত্রী, নাকি বন্ধুর স্ত্রী; সেটা নিয়েও আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। বাংলাদেশের দুজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ পারস্পরিক ভালো লাগা ও সম্মতির ভিত্তিতে যে কোনো জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার এবং রিসোর্টে থাকার অধিকার রাখেন। আমি মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা, চলাফেরার স্বাধীনতা, সঙ্গী বেছে নেয়ার স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। যেভাবে তাকে আটক ও হয়রানি করা হয়েছে, আমি সারাজীবন এ ধরনের সোশ্যাল পুলিশিংএর বিরুদ্ধে। তবে মামুনুল হকরা যে বাংলাদেশ কায়েম করতে চান; সেখানে কিন্তু 'আমগোর শহীদুলের বউ' মানে বন্ধুর স্ত্রীকে নিয়ে রিসোর্টে যাওয়া মারাত্মক অপরাধ, জেনা, ব্যভিচার। মামুনুল হকের ভাগ্য ভালো, সেই দেশ এখনও কায়েম হয়নি, হলে এতক্ষণে মামুনুল হককে পাথর ছুঁড়ে মারা হতো।

রয়েল রিসোর্ট কেলেঙ্কারির মূল বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে কয়েকটি ছোট পয়েন্ট বলে নেই। প্রথম কথা হলো, মামুনুল হক একজন নারী নিয়ে রিসোর্টে গেছেন। এটা একটা বড় স্বস্তির খবর। তার মানে তিনি স্বাভাবিক যৌন জীবনে বিশ্বাসী। এটা বাংলাদেশের মাদ্রাসা ছাত্রদের জন্য একটা বড় স্বস্তির খবর। আশা করি মামুনুল হকের অনুসারীরা তাকে অনুসরণ করবেন এবং মাদ্রাসার ছেলেগুলো রেহাই পাবেন।

মামুনুল হককে আটক করেছে স্থানীয় জনগণ, সাংবাদিক এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগ। তারা তাকে প্রায় দুই ঘণ্টা আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। শুরুর দিকে একটু ধাক্কাধাক্কি করা হলেও তাকে বা তার নারী সঙ্গীকে কিন্তু কেউ অসম্মান করেনি, গায়ে হাত তোলেনি। কিন্তু হেফাজতের কর্মীরা তাকে উদ্ধারের জন্য গিয়ে ২০ মিনিটের মধ্যে ধ্বংসস্তুপ বানিয়ে ফেলে রয়েল রিসোর্টকে। এমনকি মামুনুল হক ঢাকায় চলে আসার পরও তার অনুসারীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে। তার মানে হেফাজতীরা সহিংসতা ছাড়া আর কোনো ভাষা বোঝে না।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশের সফরকে কেন্দ্র করে মামুনুল হক দেশজুড়ে ঘৃণা আর উগ্রতা ছড়িয়েছিলেন। তার এই উগ্রতা স্বাধীনতা দিবসকে রক্তাক্ত করেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কয়েকদিনের সংঘর্ষে অন্তত ১৭ জন মারা গেছে। তাদের রক্তের দাগ শুকায়নি, আহত অনেকে এখনও হাসপাতালে কাতড়াচ্ছেন। সেই সংঘর্ষের সপ্তাহ পেরোনোর আগেই মামুনুল হক নিজের বউ বা বন্ধুর বউ নিয়ে রিসোর্টে চলে যান ফূর্তি করতে; এ বড় বেদনার কথা। আর করোনার এই সময়ে যখন একে একে দেশের সব পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, সরকার লকডাউন ঘোষণা করছে; তখন মামুনুল হকের এই অভিসার ভুল বার্তা দেবে।

আরেকটা পয়েন্ট। সিংহপুরুষ মামুনুল হককে আটকের পর উগ্র অনুসারীরা গিয়ে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। সেখানে তিনি স্থানীয় ঈদগাহ ময়দানে বক্তৃতাও দিয়েছেন। এরপর তিনি নিরাপদে ঢাকায় ফিরেছেন। কিন্তু এই সিংহপুরুষ কিন্তু তার কথিত 'সেকেন্ড ওয়াইফ'কে বিপদের মধ্যে ফেলেই চলে আসেন। স্পষ্টতই তার এই আচরণ কাপুরুষোচিত। ইসলামের বিধান অনুযায়ী তার আরো দুটি বিয়ে করার সুযোগ আছে। তবে মামুনুল হকের সম্ভাব্য 'থার্ড ওয়াইফ', 'ফোর্থ ওয়াইফ'দের বলছি; এই কাপুরুষকে বিয়ে করার আগে দুবার ভাববেন। আর 'ফার্স্ট ওয়াইফ' ও 'সেকেন্ড ওয়াইফ'এর প্রতি অনুরোধ- আপনারা এই কাপুরুষের সাথে কোথাও যাবেন না। সঙ্গীদের বিপদের মুখে ঢেলে দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ইতিহাস তাদের পুরোনো। মতিঝিলের শাপলা চত্বরেও দেখেছি, সোনারগাঁয়ের রয়েল রিসোর্টেও দেখলাম।

এবার আসি মূল পয়েন্টে। রয়েল রিসোর্ট কেলেঙ্কারিতে মামুনুল হক স্পষ্টতই মিথ্যাচার করেছেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের সময় মামুনুল হকের চেহারায় অপরাধীর ছাপ ছিল। তিনি দাবি করেছেন, সাথে থিকা নারী তার 'সেকেন্ড ওয়াইফ', দুই বছর আগে তাকে শরিয়ত সম্মতভাবেই বিয়ে করেছেন। এটা কিন্তু হতেই পারে। ইসলামে চার বিয়ে বৈধ। তাই তিনি শরিয়ত সম্মতভাবে বিয়ে করা 'সেকেন্ড ওয়াইফ' নিয়ে রিসোর্টে যেতেই পারেন। তবে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে তার এই বিয়ে নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। অবরুদ্ধ হওয়ার পর মামুনুল হক দাবি করেছিলেন,  সঙ্গে থাকা নারী তার সেকেন্ড ওয়াইফ, তার নাম আমিনা তাইয়্যেবা, বাবার নাম জাহিদুল ইসলাম, বাড়ি খুলনায়। তবে সঙ্গে থাকা নারী দাবি করেছেন, তার নাম জান্নাত আরা। বাবার নাম অলিয়র রহমান। বাড়ি কোথায় জানতে চাওয়া হলে প্রথমে বলেন ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানায়, পরে বলেন আলফাডাঙ্গায়।

তবে সেকেন্ড ওয়াইফকে বিপদের মধ্যে ফেলে পালানোর সময় ফার্স্ট ওয়াইফকে ফোন করেন মামুনুল হক। ফোনে তিনি দাবি করেন, 'ঐ মহিলা যে ছিল সাথে সে হইল আমগোর শহীদুল ভাইয়ের ওয়াইফ, বুচ্ছো? ঐটা নিয়ে একটা মানে ওখানে অবস্থা এরকম তৈরি হয়ে গেছে যে এই কথা বলা ছাড়া... ওখানে মানে ওরা ই করে ফেলছিল আমাকে...বুচ্ছো?' তিনি তাকে এটাও শিখিয়ে দেন, কেউ জিজ্ঞাসা করলে যেন তিনি সব জানেন বলে স্বীকার করেন। ফার্স্ট ওয়াইফের সাথে মামুনুল হকের আলাপচারিতায় একটা বিষয় পরিস্কার তিনি মিথ্যা কথা বলছেন। টেলিফোনের কথা সত্যি হলে সাথের নারী তার 'সেকেন্ড ওয়াইফ' নয়, শহীদুল ভাইয়ের ওয়াইফ। তার মানে বিয়ের দাবিটি মিথ্যা। আর যদি বিয়ের দাবি সত্য হয়, তাহলে তিনি তার প্রথম স্ত্রীকে মিথ্যা বলেছেন এবং তাকে না জানিয়েই দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। আরেকটা টেলিফোন সংলাপে শোনা যায়, মামুনুল হকের বোন মামুনুল হকের স্ত্রীকে বলছেন, কেউ জিজ্ঞাসা করলে যেন তিনি বলেন, তিনি এই বিয়ের খবর আগেই জানেন। কিন্তু তিনি বিষয়টি পছন্দ করেননি বলে, ঘরে তুলতে বলেননি।

মামুনুল হকের এই দ্বিতীয় বিয়ের দাবি আরো বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে সব বিভ্রান্তি দূর করতে রাত ১১টায় তার ফেসবুক লাইভে। তিনি দাবি করেন, রয়েল রিসোর্টে সঙ্গে থাকা নারী তারই এক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহকর্মীর সাবেক স্ত্রী। ওই নারীকে তিনি একান্ত পারিবারিকভাবে কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধবের উপস্থিতিতে বিয়ে করেছেন। চতুর মামুনুল সেই লাইভে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর নাম বা তার স্ত্রীর নাম বলেননি। 'একান্ত পারিবারিকভাবে' বিয়ের দাবি করলেও পরিবারের প্রথম স্ত্রী তার কিছুই জানতেন না, অনুমতি দেয়া তো পরের কথা। একান্ত পারিবারিকভাবে বিয়ের কথা বলে, মামুনুল হক বুঝিয়ে দিলেন, এই বিয়ের রেজিস্ট্রেশন হয়নি। ধরা পড়লে সবাই বিয়ের দাবি করেন। মামুনুল হক যেমন একের পর এক মিথ্যা বলছেন, তাতে এই 'পারিবারিক' বিয়ের কয়েকশ মিথ্যা সাক্ষী জোগার করাও তার জন্য সমস্যা হবে না।

সবসময় বলা হয়, একটা মিথ্যা আরেকটা মিথ্যা ডেকে আনে। তিনি 'শহীদুল ভাইয়ের ওয়াইফ'কে নিয়ে রিসোর্টে গেলেও সেটা স্বীকার করার মত সৎসাহস তার ছিল না। তাই তাকে সেকেন্ড ওয়াইফ দাবি করেছেন। এরপর তিনি একের পর মিথ্যার জালে জড়িয়ে যাচ্ছেন। হয় তিনি সাংবাদিকদের মিথ্যা বলছেন, নয় তিনি তার প্রথম স্ত্রীকে মিথ্যা বলছেন। দুয়ে দুয়ে চার মেলালে ঘটনাটা দাড়াতে পারে- মামুনুল হক তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহকর্মী শহীদুলের সংসার ভেঙ্গেছেন। তারপর হয় প্রথম স্ত্রীকে না জানিয়ে গোপনে তাকে বিয়ে করেছেন অথবা বিয়ে না করেই তাকে রক্ষিতা হিসেবে রেখেছেন। বিয়ে করুন বা না করুন মামুনুল তার 'সেকেন্ড ওয়াইফ' আমেনা বা জান্নাতকে তিনি দুই বছরেও কোনো সংসার দেননি। ফার্স্ট ওয়াইফের ভয়ে তিনি সেকেন্ড ওয়াইফকে নিয়ে রিসোর্টে রিসোর্টে ঘুরে বেড়াতেন।

মামুনুল হক যে রয়েল রিসোর্ট কেলেঙ্কারিতে আল্লাহর কসম দিয়ে একের পর এক মিথ্যা বলেছেন, এটা কিন্তু সত্যি।

লেখকপ্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ