সাম্প্রদায়িক সহিংসার পূর্বাপর: দেশপ্রেম ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণেই সমাধান



আশরাফুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

গত ১৪ অক্টোবর (২০২১) বাংলাদেশের কুমিল্লায় নতুন মোড়কে পুরনো বিষের বিস্তার ফের দেখতে পেলাম আমরা। অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতোই এই বিষবাষ্প যেন ছড়িয়ে পড়ছে দেশময়। শারদীয় দূর্গোৎসবের চূড়ান্ত লগ্নে একটি পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন অবমাননার পরিকল্পিত ঘটনা সংঘটনের বার্তাটি যেন বিদ্যুতচমকে ছড়িয়ে পড়ে। কুমিল্লার বহু এলাকায় তথাকথিত প্রতিবাদী জনতার মোড়কে দুষ্কৃতিকারীদের তাণ্ডব চাঁদপুর, মৌলভীবাজার, গাজীপুরসহ অন্তত ২০টি জেলায় ছড়িয়ে পড়তে একদিনও সময় নেয়নি, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তা দেশের বহু জনপদের হিন্দু জনগোষ্ঠীর বছরের অন্যতম উৎসব আনন্দকে বিষাদ ও আতঙ্কের কালো ছায়ায় আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। সরকার ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, আটক হয়েছেন এই বিষবাষ্প ছড়ানোর এক ‘কারিগর’সহ কয়েকজন। যদিও বরাবারের মতোই এখনো পর্দার অন্তরালেই রয়ে গেছে এর পরিকল্পনাকারী বা মদদদাতারা। ঘটনার পর দিন বৃহস্পতিবার শাসকদল আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধি দলকেও আমরা আক্রান্ত কিছু জনপদে যেতে দেখছি। মাঠ প্রশাসনের অনুরোধে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে ও সম্ভাব্য হুমকি মোকাবেলায় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি মোতায়েনেরও সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তবে স্বাধীনতার পূর্বাপর যুগের সঙ্গে এ ঘটনার যে গভীর সাযুজ্য অবলীলায় আমরা দেখতে পাবো তা হচ্ছে-খুব সহজেই বিপুল মানুষের সমর্থন এই ধর্মান্ধ গোষ্ঠী পেয়ে যায়। ফলে কর্তাব্যক্তিগণ যতো কথাই বলুন কেন-বাস্তবে এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি বার বার ঘটে। আক্রান্ত মানুষেরা প্রাণ ভয়ে অন্যত্র পাড়ি জমায়, সংখ্যালঘুত্বের পরিসংখ্যান আরও দীর্ঘ হয়। ঔপনিবেশিক শাসকদের নিষ্পেষণের ইতি যখন ঘটতে চলছিল স্বদেশের দামাল ছেলেদের রক্তাক্ত প্রতিরোধের মুখে, তখন ক্ষমতার নেশায় মত্ত ব্রিটিশের স্তাবকরা নিজেদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে বেছে নেয় এই সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পকে। হাজার হাজার বছর ধরে সম্প্রীতির যে ঐতিহ্যিক ধারা বহন করে চলছিল এখানকার অধিবাসীরা, প্রথম তাদের ঐক্যে চিড় ধরাতে সফল হয় এই স্তাবকরা। ঔপনিবেশিক শক্তির প্রত্যক্ষ মদদে সাম্প্রদায়িকতার যে বীজ বপিত হয়েছিল গতকালকের কুমিল্লার ঘটনা তারই নির্ভুল পরম্পরা। পূর্বে যা ছড়াতে সময় লাগতো কয়েক দিন, তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারে তা এখন কয়েক মিনিট বা ঘণ্টার ব্যবধানে পৌছেছে-পার্থক্য কেবল এইটুকুই। তাহলে প্রশ্ন জাগবেই-এখনকার রাজনীতিক বা শাসকরা কী তবে সেই পরম্পরাকেই বহন করছেন? এর উত্তর বহুলাংশেই ‘হ্যা’। ক্ষমতায় আরোহন কিংবা তা প্রলম্বিত করতেই গত সাত দশক কেটে গেল এই অঞ্চলের শাসকদের! তাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো চেষ্টা করেছেন, কিন্তু খোদ নিজের দলের বা মতের মানুষদেরকেই তা মানতে প্রস্তুত করতে পারেননি তারা। সে কারণে ঔপনিবেশিক শক্তির বিদায়ের পরবর্তী যুগে উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদ ঐতিহাসিক ভারতবর্ষের আজকের খণ্ডিত পৃথক রাষ্ট্রসমূহে ক্রমাগত বিস্তার লাভ করেছে। বহু ভাষা, ধর্ম-বর্ণ ও মূল্যবোধের অপূর্ব মেলবন্ধন রচনা করে যে ভারতবর্ষ বিশ্বে অনন্য এক ভূখণ্ডের মর্যাদা লাভ করেছিল তা আজ শুধুই অতীত। সংবাদপত্রে কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিম-লে অনেক আশার কথা শোনা গেলেও বাস্তবতা এতোই কঠিন যে, একথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই-উগ্র সাম্প্রদায়িকতা এই অঞ্চলে অনেক গভীরে প্রোথিত হয়ে গেছে। ১৯৪৬ সালে কলকাতার বিভৎস দাঙ্গা, নোয়াখালীর চরম বর্বরতার পর দেশভাগকে অনিবার্য করে বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কাঠামোকেই কেবল কুঠারাঘাত করা হয়নি বহু যুগ ধরে এই হানাহানি যেন চলতে থাকে তারও সুবন্দোবস্ত করা হয়। এবং এর ফলেই সাম্প্রতিককালের নাসিরনগর, রামু কিংবা কুমিল্লার সহিংসা আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হয়। এখানে মূখ্যত মুসলমান, হিন্দু কিংবা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের বড় অংশকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে মুষ্ঠিমেয় কিছু অমানুষ এসবের নেতৃত্ব দেয়, আর তাদের পেছনে থাকে রাজনীতির ধ্বজাধারী শয়তানেরা। সমূলে উৎপাটন করা গেলেও এই এই দাঙ্গার উপাদানকে রাজনীতির চতুর বেনিয়ারা সযতনে পুষে রাখেন প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে কিভাবে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠান হওয়া যায়।

অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গেই একথা আজ উল্লেখ করতে চাই, নোয়াখালীর দাঙ্গায় অগণিত মানুষের মৃত্যু ও বাস্তুচ্যুতির পর একজন এম কে গান্ধীর সেখানে এসে তথাকথিত শান্তির ললিতবাণী প্রচারের মেকি অভিনয় আজ গত সাত দশক ধরে চলা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিপরীতে এক হাস্যকর প্রহসন ছাড়া কিছুই নয়। সেই বর্বরতার সত্যিকারের তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি বিধানই ছিল প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, তারা যে ধর্মেরই হোন না কেন।

আমরা এবার আমাদের ভাবনাকে শাণিত করবো, সাম্প্রদায়িক এই আগ্রাসন থেকে বৈচিত্র্যময় সম্প্রীতির ঐতিহাসিক বাংলা তথা ভারতবর্ষের হৃতগৌরব ফেরাতে কী করণীয় আছে? এই ভাবনার প্রারম্ভে জোর দিয়ে উল্লেখ করতে চাই দুটি প্রসঙ্গের-তা হচ্ছে বিশ্বে আমাদের জাতিসত্ত্বার গৌরব করবার কোন দুটি দিক সর্বাগ্রে বিবেচিত হতে পারে? আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলব-আমাদের নিখাদ দেশপ্রেম ও বৈচিত্র্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। এবং উচ্চকণ্ঠে এই উচ্চারণ করতে চাই যে- উগ্র সাম্প্রদায়িকতার এ কদর্য বিষবাষ্পকে সমূলে উৎপাটন করতে এই দুই ‘অব্যর্থ মারণাস্ত্র’ আমাদের সহায় হতে পারে।

এই দুই অব্যর্থ মারণাস্ত্রের এতো উপাদান আমাদের মাঝে রয়েছে যা আকড়ে ধরলে প্রিয় মাতৃভূমি তার আদি ও অকৃত্রিম গন্তব্যে নিশ্চিতভাবেই ফিরে যাবে। এ কোন নিছক আবেগময় উচ্চারণ নয়। আমাদের সত্যিকারের ইতিহাসের পাঠ আজ গ্রহণ করতেই হবে। সম্পদে প্রাচুর্যে টইটম্বুর বাংলা তথা ভারতবর্ষে পরধনলোভী শাসকদের লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে বার বার, আমরা পরাধীনতার শেকলে বাধা পড়েছি। কিন্তু আমাদের চেতনায় মুক্তির যে দুর্দমনীয় নেশা প্রোথিত ছিল সেই নেশাই বিভিন্ন যুগে, সবশেষ ঔপনিবেশিক ও নব্য ঔপনিবেশিক শক্তির বন্ধন থেকে মুক্ত করতে দিশা যুগিয়েছে। প্রায় দু’শো বছরের ব্রিটিশ শোষণের শেকড় চূড়ান্ত ভাবে ছিন্ন করতে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজ যে মরণপণ ভারত অভিযান চালিয়েছিল তা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। আমরা একথা দ্বিধাহীন ভাবেই বলতে পারি যে, ঐতিহাসিক ভারতবর্ষ যুগ যুগ ধরে অসংখ্য ধর্ম-বর্ণের মানুষদের যে মেলবন্ধন রচনা করে অনন্য হয়ে উঠেছিল বিশ্বে, ঠিক তারই অপূর্ব এক সংস্করণ ছিল নেতাজীর আজাদ হিন্দ ফৌজ। সকল ধর্মের মানুষের সত্যিকারের সৌহার্দ্য যেখানে এক মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছিল তার তুলনা সত্যি বিরল। সাম্প্রদায়িক বীজ বপণ করে ভারতবর্ষকে খণ্ডিত করে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দুই দশক পেরিয়েও নেতাজীর সম্প্রীতির এই অনন্য মডেল আমরা দেখতে পাই পাকিস্তানের জান্তাদের বিতাড়ন করে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে অভূতপূর্ব মুক্তিরসংগ্রামে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে বড় স্বাতন্ত্র্য হচ্ছে-সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষ একসঙ্গে লড়েছিল এক নব্য ঔপনিবেশিক শাসকদের চরম শোষণ রুখে দিতে। রক্তক্ষয়ী সেই সংগ্রামের যে আকাঙ্খা সবকিছুকে ছাপিয়ে মূর্ত হয়ে উঠেছিল তা হচ্ছে, ‘আমরা এক অসাম্প্রদায়িক বিভেদহীন স্বদেশের জন্য লড়ছি’। পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত স্বদেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু শাসনভার গ্রহণ করেও উচ্চকণ্ঠে বলেছিলেন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়বার কথা। যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাবো, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রণীত সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম বলে কিছু রাখা হয়নি। রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা/আমি তোমায় ভালোবাসি’ যেমন বঙ্গবন্ধু মুক্তস্বদেশে পা দেওয়ার পূর্বেই জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন, তেমনি বাঙালির চেতনার প্রতীক কবি কাজী নজরুল ইসলামকে স্বাধীন বাংলাদেশে এনে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়ে প্রকৃতঅর্থে তিনি দেশপ্রেম ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরম্পরাকেই আকড়ে ধরেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সেই চেতনার বিকাশ ঘটবার পূর্বেই তা মুখ থুবড়ে পড়েছিল। পরবর্তী সময়ে আমরা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বিকাশ প্রত্যক্ষ করেছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করে স্বৈরশাসক এরশাদ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংবিধানে সন্নিবেশিত করার মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক চেতনা বিকশিত হওয়ার নতুন যুগে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। এরপর আমরা আরও বহু উলম্ফন দেখেছি উগ্র সাম্প্রদায়িকতার। ক্রমে মুক্তিযুদ্ধের দাবিদার শক্তিকেও আপোষ করতে দেখছি আমরা। ভোটের মাঠে টিকে থাকতে চরম সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলোর সঙ্গে প্রকাশ্য আঁতাতের দৌঁড়ে কমবেশি দেশের সব রাজনৈতিক শক্তিগুলোই প্রতিযোগিতায় নেমেছে গত কয়েক দশকে। রাজনৈতিক আশ্রয়ে এই উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলো শক্তি ও সমর্থক বৃদ্ধি করেছে। ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতাই প্রকাশ্যে তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিজেদের ধন্য করে চলছেন। এমন বাস্তবতায় কুমিল্লার ঘটনা যখন ঘটলো তখন রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের নানা মুখরোচক পুরনো কাসুন্দি বেশ অরুচিকরই লাগছে। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের প্রতিযোগিতা বন্ধ করে দলগুলির উচিত প্রথমে নিজেদের সাম্প্রদায়িক শক্তির বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেওয়া এবং পূর্বের সংশ্লিষ্টতার জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। সেইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লাখ শহীদদের রক্তের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রণীত সংবিধানের ধর্ম নিরপেক্ষতার বিধান অবিলম্বে পুনর্বহাল করা। সাম্প্রদায়িক শক্তির বিকাশের সুযোগে প্রজন্মের একটি বিরাট অংশের মাঝে যে ভুল দর্শন প্রোথিত হয়েছে তা থেকে উদ্ধারে বাঙালির আদি ও অকৃত্রিম সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে বহুলচর্চার সুযোগ করে দেয়া। ‘ধর্ম সে তো বর্মসম সহনশীল/ তাকে কি ভাই ছুইতে পারে ছুয়াছুয়ির ছোট্ট ঢিল’-নজরুলের এই অমোঘ বাণী ধারণ করে সকল ধর্মের সহনশীলতা এবং মানবিকতার শিক্ষাকে উচ্চকিত করতে হবে। রাজনৈতিক কর্মীদের দুর্বৃত্তায়নের প্রতিযোগিতায় আত্মনিয়োগ না করে দেশের জন্য আত্মত্যাগ করা মহান আদর্শ ধারণ করা তাগিদ দিতে হবে এবং আগে নেতাদের তা প্রতিপালন করে দৃষ্টান্ত গড়তে হবে। আত্মোৎসর্গের যে পরম্পরা আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীরা জীবন দিয়ে রেখে গেছেন তা আগলে ধরাই আমরা মুক্তির দিশা হোক, সংখ্যালঘুদের নিশ্চিহ্ন করার প্রচেষ্টা না করে।

লেখক: সাংবাদিক গবেষক, ইমেল: [email protected]