ক্রমেই বাড়ছে ওমিক্রন, জরিমানা জরুরি



প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

দৈনিক তেত্রিশ লাখের অধিক করোনা সংক্রমণে ভাবনার অন্ত নেই মানুষের। ওমিক্রন সংক্রমণে বিধিনিষেধের বেড়াজালে বন্দী হয়ে যাচ্ছে গোটা বিশ্ব। ডেল্টা ও ওমিক্রন একসঙ্গে ডেলমিক্রন নামক জমজ করোনা ভ্যারিয়েন্টের থাবায় নতুন করে ভীতি ছড়াচ্ছে মৃত্যুর। যদিও করোনার ডেল্টা আক্রান্ত বিশ্বের আতঙ্কগ্রস্থ দুর্বল মানষেগুলোর ক্ষত এখনও শুকায়নি, স্বজন হারানো পরিবারগুলোর শোক এখন কাটেনি। এরই মাঝে অতি শক্তিশালী বেশি স্পাইক সমৃদ্ধ ওমিক্রনের প্রাদুর্ভাব সবাইকে অজানা উদ্বিগ্নতায় আড়ষ্ট করে তুলেছে।

জানুয়ারি ১৪ পর্যন্ত বিশ্বের ১০০-র বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে ওমিক্রন । দক্ষিণ আফ্রিকায় উৎপত্তি হওয়া ওমিক্রন ইউরোপ হয়ে সাত সমুদ্র তের নদী পেরিয়ে প্রতিবেশি ভারতে ঢুকে পড়েছে। ইতিমধ্যে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রে লাখ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। পশ্চিমবঙ্গে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশে শীতের শুরুতে আবারও বাড়তে থাকে সংক্রমণ। ১৪ জানুয়ারি আক্রান্ত হয় ৪ হাজার ২৪২ জন। শনাক্তের হার বেড়ে হয়েছে ১৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ ।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, ডেলমিক্রন করোনাভাইরাসের আলফা, বিটা কিংবা অন্য ধরনগুলোর মতো একেবারে নতুন কোনো ধরন নয়। মূলত করোনাভাইরাসের বিদ্যমান দুটি ধরন ডেল্টা ও ওমিক্রনেরই সমন্বিত রূপ এটি।

ইউরোপের বহু দেশে গত এক সপ্তাহ যাবত ওমিক্রন সংক্রমণের খবর ফলাও করে বের হতে থাকলেও আমরা তাতে কোন উদ্বিগ্ন হইনি। কারণ, এর আগে ডেল্টার ক্ষতি আমাদের দেশে বেশি ভয়ংকর হলেও মৃত্যু সংখ্যার দিক দিয়ে সরকারি পরিসংখ্যান ছিল সীমিত। করোনাভীতি, অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের ভয়ে গ্রাম-গঞ্জের অনেক তথ্য অজানা থেকে গেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এছাড়া করোনায় মৃত্যুর বেসরকারি পরিসংখ্যানের ব্যাপ্তি নিয়ে নানা গুঞ্জণ শোনা গেলেও সেটা ডকুমেন্ট আকারে প্রকাশ করতে কেউ এগিয়ে আসেনি।

ওমিক্রন গত ২৪ নভেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে প্রথম শনাক্ত হবার খবর জানা যায়। তবে কেউ কেউ বলেন ইউরোপে অনেক আগেই ওমিক্রনের অস্তিত্ব ধরা পড়লেও তা গোপন রাখা হয়েছিল। এসব সত্য-মিথ্যার খবর যাই হোক না কেন, আসল বিষয় হলো ওমিক্রন উচ্চ মৃত্যুঝুঁকি সম্পন্ন ভ্যারিয়্যান্ট। এর সংক্রমণে বিশ্বজুড়ে মারাত্মক পরিণতির সৃষ্টি হতে পারে। এটা দ্রুতগতিতে বার বার প্রোটিন পরিবর্তন করে। ডেল্টা যে সময়ে ২ বার স্পাইক পরিবর্তন করে ওমিক্রন সে সময়ে ৫০ বার পরিবর্তন করতে পারে বলে জানা গেছে। এর অভূতপূর্ব স্পাইক মিউটেশন বিজ্ঞানীদের কপালে নতুন চিন্তার বলিরেখা তৈরি করে দিয়েছে। ওমিক্রন সংক্রমণ প্রচলিত টিকার মাধ্যমে শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরির প্রক্রিয়ায় সুরক্ষার কাজ নাও করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। তাই ডব্লিউএইচও ওমিক্রনের নাম দিয়েছে- ‘ভ্যারিয়্যান্ট অব কনসার্ন’।

অক্সফোর্ডের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ পিটার হার্বিও বলেন, ওমিক্রনের অনেকগুলো বিপদচিহ্ন রয়েছে। যতটা ভাবতে পারি কিংবা আমরা যতটা পরিকল্পনা করতে পারি সেটা তার চেয়েও বদলে যাচ্ছে।

ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন (ইসিডিসি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যে গতিতে ওমিক্রন ছড়িয়ে পড়ছে, শিগগিরই ডেল্টাকে সরিয়ে এটিই বিশ্বে মূল সংক্রামক ভ্যারিয়্যান্ট হয়ে উঠবে। এই ধরন আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বিস্তার করতে পারে।

ইতিমধ্যে যে ৬৪ দেশে ওমিক্রন ছড়িয়েছে তার মধ্যে বেলজিয়াম, বতসোয়ানা, ঘানা, নাইজেরিয়া, ইসরাইল, ভারত, মালয়েশিয়া, হংকং, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যন্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাপান, দাক্ষিণ কোরিয়া, নরওয়ে, স্পেন, ডেনমার্ক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, স্কটল্যান্ড, পর্তুগাল প্রভৃতি দেশে সংক্রমণ ছড়িয়েছে। গত ২৯ নভেম্বর স্কটল্যান্ডে ৬ জন ও পর্তুগালে ১১ জন সংক্রমিত হয়েছে। ডিসেম্বর ০১ তারিখে পর্তুগালে চিকিৎসক আক্রান্ত হওয়ায় সেখানকার এক শিশু হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ভারতে ডিসেম্বরের ৩০ তারিখে ওমিক্রনের প্রভাবে রাজধানী দিল্লি ও মুম্বাইসহ বিভিন্ন স্থানে ১৪৪ ধারা ও কারফিউ জারি করা হয়েছে। এর মধ্যেই মুম্বাইয়ে গত একদিনেই নতুন করে দুই লক্ষাধিক মানুষের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের মাঝে এই ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে ওমিক্রনে আক্রান্ত অনেক রোগী ভর্তি হচ্ছে। যাদের মধ্যে অধিকাংশই টিকা নেননি এবং ১৮ বছরের কম বয়সী। ডেল্টা ও ওমিক্রন ধরন সম্মিলিতভাবে করোনার সংক্রমণের একটি বিপদজনক সুনামি চালাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে নতুন করে রেকর্ডসংখ্যক মানুষের করোনা শনাক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে গতকাল বুধবার ডব্লিউএইচওর মহাসচিব তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস বলেন, ফ্রান্সে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে এযাবৎকালে এক দিনে সর্বোচ্চ দুই লাখ আট হাজার করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে দৈনিক গড়ে রেকর্ড ২ লাখ ৬৫ হাজার মানুষের করোনা শনাক্ত হয়েছে। জানুয়ারির প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্রে দৈনিক গড়ে সংক্রমণ রেকর্ড ১০ লাখ পেরিয়ে গেছে।

দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বাংলাদেশে চলে আসা ২০০ জন ব্যক্তির ঠিকানা খোঁজা হচ্ছে। কোয়ারেন্টাইনের ভয়ে তারা লাপাত্তা। তারা এয়ারপোর্ট থেকে নিজেদের বাড়ির ঠিকানায় যাননি। মোবাইল ফোন বন্ধ করে কোথাও লুকিয়ে আছেন। এটা আমাদের দেশের জন্য ভয়ংকর খবর। ব্রাম্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর ও বিভিন্ন উপজেলার গ্রামাঞ্চলে তাদের অনেকের বাড়ি। সে সকল বাড়ি চিহ্নিত করে লাল পতাকা টাঙানোর মাধ্যমে জনগণকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।

গতবছর সিলেটের হোটেল থেকে কোয়ারেন্টাইন ভেঙে কিছু বৃটেন ফেরত অবিবেচক মানুষ কানাইঘাটে বিয়ে করতে গিয়েছিল। তাদেরকে হোটেলের সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে চিহ্নিত করে ধরা হয়েছিল। তাদের কাছে ঘুষ নিয়ে হোটেলের বাইরে যেতে দেওয়া হয়েছিল বলে সংবাদ হয়েছিল।

এরকম অবহেলা, দুর্নীতি ও অনৈতিকতা ওমিক্রনের বেলায় করা হলে তা কাউকে ক্ষমা করবে না। কারণ এটা ডেল্টার চেয়ে অধিক শক্তিশালী। করোনার এই ঢেউ বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়লে তা প্রতিরোধ বা প্রতিকার করার মত সক্ষমতা আমাদের নেই। গত দু’বছরে দু’শর বেশি চিকিৎসক করোনায় প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের সবাইকে এখনও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। তাই তারা হয়তো ওমিক্রনের সংক্রমণ ঘটলে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস করবেন না।

ওমিক্রনের ভয়ে ভীত হয়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করেছে অনেক দেশ। আমরা এখনও উদাসীন। আমাদের দেশের মানুষ কোন কিছুকে আগে থেকে পাত্তা দেন না। বিপদে পড়লে হাউমাউ করে কাঁদতে জানেন শুধু।

ওমিক্রন কতটা মারাত্মক তা বিদেশ ফেরত যাত্রীদের পৃথক রেখে আমাদের পরিবেশে ঝুঁকি নির্ণয়ের জন্য র‌্যাপিড অ্যাপ্রাইজাল গবেষণা করা উচিত। এজন্য আমরা কতটা প্রস্তুত? আমাদের মনোভাব হলো দেখি কি হয়? তারপর যা করার তা করা হবে। এই মানসিকতা পরিহার করে অতি দ্রুত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জারি সকল বিমান ও সমুদ্র বন্দর থেকে চলাচলকারী গণপরিবহন বন্ধ করে দেওয়া উচিত।

দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফেরত দুইশত মানুষ দেশের কোথায় লুকিয়ে আছে তা খুঁজে বের করতে হবে। শুধু তাই নয়- ইউরোপ থেকে আগতদের আলাদা করতে হবে খুব দ্রুত। ডেলমিক্রন ডেল্টার চেয়ে বনেদী ঘরানার। একে দাওয়াত দিয়ে আনতে হয়। একা একা আসে না, কারো সঙ্গী হয়ে এসে প্রথমে তার শরীরে এবং তারপর পরিবারে ও গোটা সমাজে অজান্তেই ঢুকে পড়ে। এই অতিথি এবার কোনপ্রকারে ঢুকে পড়লে আমরা তাকে সামলাতে পারবো তো?

মার্কিনিরা অবহেলা করে ডেল্টায় সাত লাখ মানুষকে হারিয়ে এখনও প্রথম স্থান অধিকার করে আছে। তারা দুই ডোজ টিকা দিয়েছে প্রায় সবাই। খাবার বড়ি মলনুপিরাভি আবিষ্কার করে মজুত করছে। এখন বুস্টার ডোজ দিচ্ছে। কিন্তু এরপরেও তারা ভয়ে দিন গুণছে-যদি টিকা বা মলনুপিরাভি বড়ি ওমিক্রনের ক্ষমতার কাছে মলিন হয়ে যায়! তাহলে তাদের মলনুপিরাভি বড়ি কেনার ৩২০ কোটি ডলার পানিতে মিশে যাবে।

শুধু মলনুপিরাভি বড়ি ও টিকা মজুত নয়- ওমিক্রনের ওপর গবেষণা জোরদার করতে হবে সব দেশকে। কোভিডের প্রাথমিক পর্যায়ের মত তথ্য নিয়ে লুকোচুরি না করে সঠিক পরিস্থিতি গণমাধ্যমে দ্রুত প্রকাশ করে সঠিক তথ্য বিনিময় করতে হবে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে। তা করা না হলে এর পরিবর্তিত স্পাইকের কাছে মজুত ওষুধ বিফল প্রমাণিত হলে মানবতার বিপর্যয় ঘটে গিয়ে মরণ অবশ্যম্ভাবী। এছাড়া গবেষণার সাথে মানুষের চলাচল ও ওমিক্রন আক্রান্ত দেশ থেকে মানুষের বাংলাদেশে প্রবেশের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও মানুষ এখনো উদাসীন। তাই ওমিক্রন সম্পর্কিত নির্দেশনা না মানলে আর্থিক জরিমানা করা অতি জরুরি। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের মত আমাদের দেশেও সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা উচিত। এছাড়া জীবন রক্ষায় সকলের একান্ত সতর্কতার প্রয়োজন তো আছেই। অতি দ্রুত সংক্রমণশীল ওমিক্রন ও ডেল্টার জমজ ডেলমিক্রন ঠেকানোর আর কোন ভাল গত্যন্তর আছে বলে আপাতত জানা নেই।

লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দিগন্তে দুর্যোগের কালো মেঘ!



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
২০২২ সালের শুরু থেকেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দিগন্তে দুর্যোগের কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে

২০২২ সালের শুরু থেকেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দিগন্তে দুর্যোগের কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে

  • Font increase
  • Font Decrease

২০২২ সালের শুরু থেকেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দিগন্তে দুর্যোগের কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে, যার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক, সামরিক ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বহুমুখী কার্যকারণ।

প্রথম থেকেই চলমান বৈশ্বিক মহামারি করোনার থাবা অনেককিছুর মতোই অর্থনীতিতেও হানা দিয়ে চলেছে। বেড়েছে বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি এবং কমেছে উৎপাদন। করোনার মধ্যেই রাশিয়া কর্তৃক ইউক্রেনে আক্রমণ বিশ্বব্যাপীই খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহকে ভঙ্গুর করেছে। পাশাপাশি, জলবায়ুর পরিবর্তনে কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে অর্থনীতির মেরুদণ্ডে পৌনঃপুনিক আঘাতের নানা ক্ষতিকর প্রতিফল ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। যার প্রভাবে পৃথিবীর দেশে দেশে বাজার ব্যবস্থা ও ভোক্তাদের জীবনে তীব্র ও সঙ্কটজনক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে স্বল্পমেয়াদি উন্নতির সম্ভাবনা কমে এসেছে, জ্বালানি ও অন্যান্য শক্তির দাম বেড়েছে, বাণিজ্য-সাম্য নেতিবাচকতার দিকে ঢলেছে, ফিসক্যাল ব্যালান্স (রাজস্বের সঙ্গে সরকারি ব্যয়ের তুলনামূলক হিসাব) উচ্ছন্নে গিয়েছে, প্রায় প্রতিটি দেশেই টাকার মূল্যমান কমেছে। সর্বপরি বাজারে এক রকমের শঙ্কিত অবস্থায় বিরাজ করছে এবং ভোক্তারা মূল্যবৃদ্ধির আঁচ খুব ভাল করেই অনুভব করছেন।

আন্তর্জাতিক পরিসরে যুদ্ধাক্রান্ত শরণার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধিজনিত চাপ ছাড়াও বিশ্বের ধনী দেশগুলোতে (যেখানে পৃথিবীর এক-ষষ্ঠাংশ মানুষ বাস করেন) দরিদ্রতর দেশগুলো থেকে বিপুল সংখ্যক অভিবাসীর বলপূর্বক বা জীবনবাজি রেখে অনুপ্রবেশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে, চীনের উত্থানের ফলে ক্ষমতাবিন্দুর স্থানাঙ্ক পরিবর্তনেও অর্থনীতির গতি ঘুরে গিয়েছে। ইউরোপ নয়, বিশ্বের ক্ষমতা ও আর্থিক ভরকেন্দ্র এখন ইন্দো-এশিয়া অঞ্চল। পৃথিবী পূর্বতন শক্তিসাম্যকে ঝেড়ে ফেলে নতুন কোনও ব্যবস্থার জন্ম দেওয়ার প্রাক্কালে 'প্রসববেদনা কাল' অতিক্রম করছে।

এইসব রাজনৈতিক, ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত পালাবদলকে আরও উতপ্ত করছে জৈব-সঙ্কটের ক্রমপ্রবাহ— ম্যাড কাউ ডিজিজ, সার্স, বার্ড ফ্লু, কোভিড-১৯ এবং নবাগত মাঙ্কি পক্সের মতো অতিমারি বা মহামারি।  ফলে স্বাভাবিকভাবেই পণ্য  উৎপাদন ও পরিবহণ এবং গণগতিশীলতা ও গণপর্যটন বিপর্যস্ত হয়েছে। এহেন স্থবিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতির চাকাকে শ্লথ কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে স্থবির করে দিচ্ছে।

আরেকটি বিপদ পুরো জগতকেই অলক্ষ্যে গ্রাস করতে চলেছে, তা হলো বিশ্ব উষ্ণায়নের মতো বিষয়। ক্রনিক রোগের মতো তা সামগ্রিক শক্তি উৎপাদন, পরিবহণ ও ব্যবস্থাপনাকে  আকস্মিক বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে আর মানবজীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে প্রচণ্ড ধ্বস সৃষ্টি করতে পারে।

বিশ্বের বা কোনও কোনও দেশের আর্থিক মন্দা বৈশ্বিক প্রবাহের বাইরের বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনামাত্র নয়। নয় কোনও সস্তা রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরের বিষয়। হয়তো কোনও কোনও দেশের সুশাসনের ক্ষয়, ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা ও দুর্নীতির বাড়বাড়ন্ত আর্থিক মন্দাকে ত্বরান্বিত ও প্রকটিত করছে। তথাপি বিপদের কেন্দ্রবিন্দু একাধিক ও বৈশ্বিক, এটাই বাস্তবতা।

ফলে বৈশ্বিক পদক্ষেপের সম্মিলিত উদ্যোগ আর্থিক সঙ্কট মোকাবিলার প্রধান অবলম্বন। তাছাড়া, বিভিন্ন দেশ বিপদের আঁচ আগাম টের পেয়ে ব্যয় সঙ্কোচন, দুর্নীতি ও সিস্টেম লস কমানো, বাজার মনিটরিং-এর মাধ্যমে মজুদদারি ও সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে ক্রমবর্ধমান সঙ্কটের প্রকোপ কমাতে সচেষ্ট হচ্ছে।

ব্যক্তিগত পর্যায়েও ভোগ্যপণ্যের ব্যবহার সীমিতকরণ ও বিকল্প দ্রব্যসামগ্রীর সন্ধান চলছে বিশ্বের দেশে দেশে।  কঠিন এক আর্থিক দুর্গতির করাল গ্রাস থেকে বাঁচতে রাষ্ট্র ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতন পদক্ষেপের নানা মাত্রাও উন্মোচিত হচ্ছে।

অতএব, বৈশ্বিক ও জাতীয় পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতির প্রতি তীক্ষ্ণ নজরদারি, নিজস্ব বাজারব্যবস্থার জন্য টেকসই নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়ন, বিকল্পের সন্ধান করা সকল রাষ্ট্রের জন্যেই বর্তমানে এক জরুরি কর্তব্য রূপে বিবেচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিতর্ক ও পারস্পরিক দোষারোপের মাধ্যমে কোনও দেশের পক্ষেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দিগন্তে ঘনায়মান দুর্যোগের কালো মেঘের প্রবল বিপদ থেকে নিষ্কৃতি সম্ভব হবে না।

ড.মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম।

;

মহামারী ও যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ঝূঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের করণীয়



ড. মতিউর রহমান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

 

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম সম্প্রতি 'দ্য গ্লোবাল রিস্কস রিপোর্ট ২০২২' প্রকাশ করেছে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে এই প্রতিবেদনটি সারা বিশ্বের ব্যবসায়িক নেতা, রাজনীতিবিদ, সরকার প্রধান, ঝুঁকি বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্বের সুশীল সমাজের নেতাদের মতামতের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। এ বছর সংস্থাটি অর্থনৈতিক, পরিবেশগত, ভূ-রাজনৈতিক, সামাজিক এবং প্রযুক্তিগত পাঁচটি বিভাগে ঝুঁকি পরীক্ষা করে। প্রতিবেদনের মূল অনুসন্ধানগুলি দেখায় যে কোভিড-১৯ মহামারী শুরু হওয়ার পর থেকে সামাজিক এবং পরিবেশগত ঝুঁকিগুলি সবচেয়ে  বেড়েছে। “জলবায়ুর চ্যালেজ্ঞ মোকাবিলায় ব্যর্থতা”, "সামাজিক সংহতি ক্ষয়" এবং "জীবিকার সংকট" ঝুঁকি তালিকার শীর্ষে রয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হিসাবে চিহ্নিত অন্যান্য ঝুঁকিগুলি হল "ঋণ সংকট", "সাইবার নিরাপত্তা ব্যর্থতা", "ডিজিটাল অসমতা" এবং "বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া"।

চরম আবহাওয়া, জীবিকা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ব্যর্থতা, সংক্রামক রোগ, সামাজিক সংহতির অবনতি, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, সাইবার নিরাপত্তায় ব্যর্থতা, ঋণ সংকট, ডিজিটাল অসমতা, মুদ্রার অবমূল্যায়নসহ অনিচ্ছাকৃত মাইগ্রেশনকেও স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সমীক্ষার উত্তরদাতাদের মধ্যে, মাত্র ১১ শতাংশ উল্লেখ করেছেন যে ২০২৪ সালের দিকে বিশ্ব একটি দ্রুত পুনরুদ্ধারের পথে চালিত হবে।  কিন্তু উত্তরদাতাদের একটি বৃহৎ অংশই (৮৯ শতাংশ)  মনে করেন যে সামনের দিনগুলো ক্রমশ অস্থির, ভঙ্গুর বা ক্রমবর্ধমান বিপর্যয়মূলক বলে তাদের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে । অন্যদকে  ৮৪ শতাংশ উত্তরদাতা  দীর্ঘমেয়াদে  ভবিষ্যত সম্পর্কে নেতিবাচক অনুভূতি প্রকাশ করেছেন যার অর্থ বিশ্বের ভবিষ্যত নিয়ে তারা "উদ্বিগ্ন" বা "চিন্তিত" । তারা মনে করেন এই পরিস্থিতি ব্যাপক হতাশা ও মোহভঙ্গের একটি চক্র তৈরি করতে পারে যা কোভিড-১৯ এর ক্ষত পুনরুদ্ধার আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং করে তুলতে পারে।

"সামাজিক সংহতির ক্ষতি", "জীবিকার সংকট" এবং "মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি" আগামী দুই বছরে বিশ্বের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক হুমকি হিসেবে দেখা দিবে বলে তারা মনে করেন। এই সামাজিক ক্ষতগুলো জাতীয় নীতি-নির্ধারণকে চ্যালেঞ্জ করে, রাজনৈতিক পুঁজিকে সীমিত করে, বৈশ্বিক নেতাদের উপর চাপ তৈরি করতে পারে বলে তারা উল্লেখ করেছেন। এক্ষেত্রে তারা মনে করেন বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জগুলোতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার জন্য জনসাধারণের সমর্থন প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু ঝুঁকি একটি বড় বৈশ্বিক উদ্বেগ। স্বল্পমেয়াদী উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে সামাজিক বিভাজন, জীবিকার সংকট এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি। করোনার কারণে এসব ঝুঁকি বেড়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধার স্থিতিশীল হবে না এবং এই ধরনের অসম পুনরুদ্ধার আগামী তিন বছর অব্যাহত থাকতে পারে। দশ জনের মধ্যে একজন উত্তরদাতা মনে করেন অর্থনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। তবে, বেশিরভাগ উত্তরদাতা মনে করেন যে আগামী পাঁচ বছরের জন্য সামাজিক ও পরিবেশগত ঝুঁকিই প্রধান।

প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২০ সালে বিশ্ব অর্থনীতি ৩.১ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে৷। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম অনুমান করেছে যে ২০২১ সালে, বিশ্বব্যাপী প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫.১ শতাংশ যা ২০২২ সালে ৪.৯ শতাংশে  নেমে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহামারী না ঘটলে বিশ্ব অর্থনীতি যেখানে থাকত তার তুলনায় ২০২৪ সালে বিশ্ব অর্থনীতি ২.৩ শতাংশ সংকুচিত হয়ে যাবে।

কোভিড-১৯ মহামারীর শুরু থেকেই সরবরাহ সংকট একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছিল। ২০২০ সালের তুলনায়, পণ্যের দাম ৩০ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানি সংকট নিয়ে ইউরোপ, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে দ্বন্দ্ব পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাতে পারে। তবে সারা বিশ্বে এখন যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা যাচ্ছে তার প্রধান কারণ সরবরাহ সংকট। অর্থাৎ মুদ্রাস্ফীতি চাহিদা-চালিত নয়, সরবরাহ-চালিত। অনেক দেশই পণ্য মজুদ শুরু করেছে এবং বৈশ্বিক রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালেও সরবরাহ সংকট অব্যাহত থাকবে। মহামারীর কারণে বেশিরভাগ দেশই রাজস্ব হারিয়েছে। উন্নত দেশগুলো অনেক প্রণোদনা দিয়েছে। ২০২২ সালে, বিভিন্ন দেশে সরকারি ঋণ ১৩ শতাংশ বেড়ে জিডিপির ৯৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ডলারের বিপরীতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মুদ্রার অবমূল্যায়ন হতে পারে। এবং এইসব দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংকট ও মূল্য বৃদ্ধি পেতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রধান ঝুঁকি হল জীবিকা ও কর্মসংস্থান। প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক ঝুঁকির পাশাপাশি সামাজিক-রাজনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। কর্মসংস্থান ও জীবিকা ছাড়াও বাংলাদেশকে কৌশলগত ভূ-রাজনৈতিক দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে চিহ্নিত অন্যান্য ঝুঁকিগুলি হল পরিবেশ, সাইবার দুর্বলতা, ডিজিটাল অসমতা ইত্যাদি।

অন্যদিকে, বিশ্বব্যাপী ঝুঁকি ও কৌশলগত উপদেষ্টা সংস্থা ভেরিস্ক ম্যাপলেক্রফট ১৩২টি দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আগামী ছয় মাসের জন্য নাগরিক অস্থিরতা সূচক প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। মধ্যম আয়ের দেশগুলো বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের সূচকে, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের দুই-তৃতীয়াংশকে নিম্ন-মধ্যম বা উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বিশ্বব্যাংক তালিকাভুক্ত করেছে।

অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে জনরোষের মুখে প্রধানমন্ত্রীসহ শ্রীলঙ্কার মন্ত্রিসভার বেশিরভাগ সদস্য পদত্যাগ করেছেন। পাকিস্তানে সরকার পরিবর্তন হয়েছে। কাজাখস্তানে কয়েক মাস ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। এ বছর এমন অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশসহ ১০টি উদীয়মান অর্থনীতির  দেশ তালিকায় রয়েছে।  যে ১০টি দেশকে আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে সেগুলো হলো আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, মিশর, তিউনিসিয়া, লেবানন, সেনেগাল, কেনিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং ফিলিপাইন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহামারী চলাকালীন এই দেশগুলো তাদের জনগণকে সামাজিক নিরাপত্তা দিয়েছে। কিন্তু তারা চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। খাদ্য ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এশিয়ার দেশগুলোর জন্য অস্থিতিশীলতার কারণ হতে পারে।

রাশিয়া ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর থেকে বিশ্ব খাদ্যের দাম দ্রুত বেড়েছে। জ্বালানির দামও বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমদানিনির্ভর দেশগুলো। ম্যাপেলক্রফ্ট উল্লেখ করেছে যে ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সংকট ২০২৩ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, কারণ এই মুহূর্তে কোনও সমাধান নেই।

সংস্থাটির মতে, নাগরিক অস্থিরতা দেশগুলোর অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এ ছাড়া বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতে এসব দেশে বিনিয়োগ করবে কিনা তাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।

স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় উদ্ভূত সামাজিক বিভাজন প্রকাশ পাচ্ছে। এটি উদ্বেগে বাড়াচ্ছে। কারণ করোনার প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য, বিশ্ব নেতাদের একসাথে কাজ করতে হবে এবং একটি বহুপাক্ষিক পদ্ধতির সন্ধান করতে হবে।

তবে প্রতিকূল ভবিষ্যদ্বাণী সত্ত্বেও কিছু ইতিবাচক ফলাফল আশা করার কারণ রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে কোভিড-১৯ মহামারী  মোকাবিলার শিক্ষা নিয়ে ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবিলা, সাইবার অপরাধ দমন, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নিরসনে বৃহত্তর সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলা। সেইসাথে সরকারি উদ্যোগে অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

কোভিড-১৯ ও রাশিয়া- ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্দ্ধগতি, তেলসহ অন্যান্য পণ্য সামগ্রীর অবৈধ মজুত, সড়ক দুর্ঘটনা, আমদানি ও রপ্তানিতে ঘাটতি, রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে আসা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, হাওড় অঞ্চলে ফসল হানি, অকাল বন্যা, ডেঙ্গুসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রার্দুভাব, বেকারত্ব, অবৈধ অভিবাসন সহ সামাজিক অস্থিরতাও অনেক বেড়ে গেছে। একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশকে বিঘ্নিত করতে এসব বিষয় মারাত্মক ঝুঁকি হিসেবে কাজ করতে পারে।

সুতরাং, একথা বলা যায়, এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সমাজে অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হবে। এমনকি রাজনৈতিক ব্যবস্থারও পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। যেমনটি আমরা আমাদের পাশ্ববর্তী দেশসহ বিভিন্ন দেশে দেখতে পাচ্ছি। সুতরাং, এখনই এসব বিষয়ে আরও বেশি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।

;

‘রাতের ভোট’: আত্মসমালোচনা ইসির



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানা আলোচনা আছে। ওই ভোট দিনের বেলার পাশাপাশি রাতেও হয়েছে বলে সরকারবিরোধী অংশের জোর প্রচার। বর্তমান সরকারকে ‘রাতের ভোটের অবৈধ সরকার’ বলে অভিযুক্ত করে আসছে বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলো। আওয়ামী লীগ বরাবরের মতো সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। জনগণ তাদের সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে ফের ক্ষমতায় এনেছে এমনই দাবি তাদের। আওয়ামী লীগের দাবি বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে দেশবাসী প্রত্যাখ্যান করে তাদেরকে বিপুল বিজয় উপহার দিয়েছে।

ভোট নিয়ে নানা অভিযোগ মাথায় নিয়েই বিদায় নিয়েছে সাবেক ইসি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নুরুল হুদা বারবার রাতের বেলায় ভোটের অভিযোগ অস্বীকার করলেও আবার আকারে ইঙ্গিতে সেটা কবুলও করেছেন একাধিকবার। তবে এনিয়ে তার মধ্যে অনুশোচনা লক্ষ্য করা যায়নি, বরং নিজেকে সফল দাবিও করে গেছেন শেষ পর্যন্ত। যদিও তার নেতৃত্বাধীন কমিশনের অন্য কমিশনার মাহবুব তালুকদার তার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন একাধিকবার এবং সিইসির সঙ্গে তার বিরোধ ছিল প্রকাশ্য। সিইসির সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধের কারণে হোক আবার অনুশোচনার কারণেই হোক ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে তিনি তার খেদের কথা বারবার বলেছেন। নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটির ব্যর্থতার কথা বললেও ব্যর্থতা স্বীকার করে পদত্যাগ করার সাহস দেখাতে পারেননি। তিনিও অন্যদের মতো সাংবিধানিক সকল সুযোগসুবিধা গ্রহণ করে মেয়াদ পূরণ করেই বিদায় নিয়েছেন।

আগের নির্বাচন কমিশন (ইসি) ‘রাতের ভোট’ নিয়ে নানা কথা বলেছে, বর্তমান ইসিও। মঙ্গলবার (২৪ মে) রাজধানীর নির্বাচন ভবনে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, নির্বাচনকে প্রহসনে রূপান্তর করার কোনো ইচ্ছে আমাদের নেই। এটা আমরা অন্তর থেকে বলছি। সুন্দর নির্বাচন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সুস্থ ধারা অব্যাহত থাকুক। ভোট নিয়মানুযায়ী হবে, দিনের ভোট দিনেই হবে। ভোট রাতে হবে না—এটা স্পষ্ট করে বলতে চাই। সিইসির এই বক্তব্য চলমান নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের নানা আলোচনার বিপরীতে আস্থা ফেরানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখতে চাই।

আগের ভোট রাতে হয়েছে কি-না এনিয়ে প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি, কোন আদালতও এটা বলেনি। বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলোসহ দেশের অনেকের ধারণা এমনই। এই ধারণার বাইরে যেতে পারেনি সাবেক ও বর্তমান নির্বাচন কমিশন। ভোট রাতে কি দিনে হয়েছে এটা এখন পর্যন্ত অমীমাংসিত বিষয়, এনিয়ে নির্বাচন কমিশন যখন কথা বলে তখন মানুষের মধ্যে প্রশ্ন জাগে। তবে সন্দেহ ও অনাস্থা থেকে আস্থা ফেরানোর যে পদক্ষেপ সেটা বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিচ্ছে বলে ধারণা করা যায় ইঙ্গিতবহ স্বীকারোক্তি কিংবা আত্মসমালোচনা থেকে। এটাকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখতে বরং আগ্রহী।

বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যর্থতা একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে তাদের অভিযোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারেনি। গত নির্বাচনে বিপুল পরাজয়ের পর তারা সেই নির্বাচন নিয়ে কোন কাজ করেছে বলে দৃশ্যমান হয়নি। নির্বাচনের ফলাফলের বিপর্যয় কী কারণে ঘটল তা নিয়ে কিছু মেঠো-বক্তৃতা দেওয়া ছাড়া আর কোন কাজ করেনি তারা। নির্বাচনের পর আসনভিত্তিক ফলাফল নিয়ে আগের নির্বাচনগুলোর সঙ্গে সবশেষ নির্বাচনের ভোটের সংখ্যা নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে সেগুলো দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করলে ওখান থেকে তারা অনেক কিছু পেতে পারত। এর মাধ্যমে তারা নির্বাচনকে বাতিল ঘোষণা করাতে পারত না ঠিক তবে মানুষের কাছাকাছি যেতে পারত। লড়াইটা হতে পারত বুদ্ধিবৃত্তিক, কিন্তু মাঠের রাজনীতিতে শক্তিহীন বিএনপি যে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রেও শক্তিহীন একটা দল সেটাই প্রমাণ করেছে তারা।

বিএনপির এই ব্যর্থতা রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক। এর সুযোগ নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তারপরেও ‘রাতের ভোট’ নিয়ে আলোচনা আছে। সরকার দল আওয়ামী লীগ যতই এটা অস্বীকার করুক না কেন মানুষের মনে বিভ্রান্তি আছে, নানা মত আছে ইসিতেও। নির্বাচন কমিশন এনিয়ে কথা বলার মধ্যে আত্মসমালোচনার যে পথ দেখাচ্ছে এটাকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখতে চাই। আগের ‘ভুল’ শুধরে নিয়মানুযায়ী ভোটগ্রহণের যে প্রত্যয় বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মধ্যে দেখা যাচ্ছে এটা দেখে আশাবাদী হতে পারে দেশের মানুষ, আশাবাদী হতে পারে রাজনৈতিক দলগুলো; নির্বাচন হতে পারে অংশগ্রহণমূলক। বিতর্ককে পাশ কাটিয়ে অস্বীকার তত্ত্ব এই নির্বাচন কমিশনের মধ্যে এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না বলেই মনে হচ্ছে আমাদের।

দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে কি-না এনিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে, কারণ বর্তমান সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা আছে বিএনপির। আবার বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনবে না আওয়ামী লীগ সরকার। আন্দোলনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক কিংবা জাতীয় সরকারের দাবি আদায়ের মাঠের শক্তিও নেই বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলোর। ফলে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের চ্যালেঞ্জ আছে নির্বাচন কমিশনের। তারা পারবে কি-না এটা সময়ই বলে দেবে। তবে এখন পর্যন্ত তাদের যে অবস্থান তাতে অন্তত আশাবাদী হওয়ার চেষ্টা করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে।

নিয়মানুযায়ী দিনের ভোট, অনিয়মের রাতের ভোট—এ আলোচনা চলতেই থাকবে। তবু মানুষকে আস্থা রাখতে হবে নির্বাচন কমিশনের ওপর। বর্তমান নির্বাচন কমিশন কতটুকু কী করতে পারবে এনিয়ে এখনই সিদ্ধান্তে পৌঁছার সময় হয়নি দেশবাসীর। তারা মানুষের আস্থা ফেরাতে কাজ করছে, আপাতত এটাই স্বস্তির। কাজের আগে কাজ নিয়ে সিদ্ধান্ত নয়, তাদেরকে সমর্থনের পাশাপাশি দিতে হবে প্রয়োজনীয় সময়। দেশবাসীর সমর্থন পেলে তারা তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতার ব্যবহার করতে পারবে বলে বিশ্বাস রাখতে চাই।

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

;

রবীন্দ্রনাথ কোনদিন আমাকে কল করেননি!



ডা. রাজীব দে সরকার
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঘুম ভাঙলো একা একাই।

একটু ঘেমে গিয়েছি।

চোখ খুলে একবার মনে হলো, নিজের ঘরটাকেও চিনতে পারছি না।

মোবাইলটা বাজছে। সম্ভবত: এ কারনেই ঘুম ভেঙেছে।

- হ্যালো, কে? (ঘুম এখনো কাটেনি আমার কন্ঠে)

- আমি শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জোড়াসাঁকোর। তুমি এক সময় আমার কবিতা পড়েছো।

- ও, কি চাই? আমি ভ্যাকসিন সংক্রান্ত কাজে জড়িত নই।

- আমার ভ্যাকসিন লাগবে না, বাবা।

("বাবা" বলায় একটু ঘুম কাটিয়ে কথা বলা চেষ্টা করলাম। কারন রোগীদেরকে 'বাবা' বলে সম্বোধন করতেন আমার সার্জারীর গুরু)

- ও, কেন ফোন দিয়েছেন, কেউ কি অসুস্থ?

- হ্যাঁ অসুস্থ। সেটা বলতেই ফোন দেওয়া।

- জ্বী, বলুন। আমি শুনছি।

- বৈদ্য রাজীব, তোমার সমাজের একদল পুরুষ খুব অসুস্থ।

- আচ্ছা কাল হসপিটালে পাঠিয়ে দেবেন, দেখে দেবো।

- পারবে তো দেখে দিতে? আচ্ছা, একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো। তোমরা কবিতা পড়া ছেড়ে দিলে কেন?

- কবিতা পড়া ছাড়িনি তো।

- মিথ্যা কথা। তোমরা এখন কবিতা পড়ো না। আগের পড়া কবিতাগুলো কোটেশন অভ্র দিয়ে লিখে ফেইসবুকে পোস্ট করো। শেয়ার করো। ব্লগে লেখো। কিন্তু কবিতা আর পড়ো না।

- ও, তাহলে বোধহয় ভালো লাগে না। আপনি লেখেন এখনো?

- না। লেখার প্রয়োজন পড়ে না। কবিতা-গল্প কিছুই লিখি না

- কেন?

- তোমাদের সমাজে নিরুপমা, কেটি, বিনোদিনী, গোড়া কিংবা হৈমন্তী এরা আজো কেউ ভালো নেই। অপু সেদিনও ওরা বাবার করা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে নি, আজো একজন মেয়ে লাঞ্ছিত হলে তোমরা প্রতিবাদ করো না। তোমাদের চোখের সামনে জলজ্যান্ত মেয়েদের সম্ভ্রমহানি হয়। তোমরা প্রতিবাদ করো না।

- নাহ। প্রতিবাদ তো করি।

- দৌড়ে গিয়ে ফেইসবুকে বসে টিপাটিপি শুরু করলে তাকে কি প্রতিবাদ বলে? প্রোফাইল পিকচার টা কালো রঙের করে দিলেই বুঝি প্রতিবাদ হয়? গান্ধী - মুজিবরা এই শিখিয়েছিলো তোমাদের?

- না, আমরা বীরের জাতি, আমরা অন্যায় সহ্য করি না।

- এজন্যই আমি গল্প-কবিতা লেখা ছেড়েছি।

- মানে?

- নিজেকে বীরের জাতি ভেবেই লেখালেখি করতাম। কিন্তু তোমাদের নির্বুদ্ধিতায় আমারই লেখা নারী চরিত্ররা আমাকে অপমান করে। আমারই লেখা ধর্মান্ধ চরিত্র গুলো আমাকে দেখে হাসে।

- পহেলা বৈশাখের কথা বলছেন? নাকি বাউলের চুল কেটে দেওয়া? নাকি মৌলবাদীদের ফতোয়া? আমি বুঝতে পারছি না।

- কুষ্টিয়ায় ছিলাম কিছুদিন। বাংলাদেশ গেছি বহুবার। এমন বাংলাদেশ আমরা রেখে আসিনি। হানাদার নেই যে দেশে, সে দেশে আমাদের কন্যাদের ধর্ষণ করে কারা? কেন আজো আমার দেশের বাতাস একজন অত্যাচারিত মেয়ের চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে, বলতে পারো?

- আপনি রাজনৈতিক কথা বলছেন।

- "মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে... পার হয়ে আসিলাম... আজি নব প্রভাতের শিখর চুড়ায়; রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়, আমার পুরানো নাম, ..ফিরিবার পথ নাহি"

- থামেন, মাঝরাতে কবিতা ভালো লাগছে না

- থামলাম, কিন্তু মানুষের চিকিৎসার পাশাপাশি সমাজের চিকিতসা শুরু করো বৈদ্য।

- সে দায় কি আমার একার নাকি?

- দায় আমাদের সবার। হৈমন্তীর গা থেকে কাপড় খুলে নেওয়া হলে, ওর আগে তোমার সমাজ ল্যাংটা হবে, তুমি ল্যাংটা হবে - সাদা পাঞ্জাবী পড়ে শরীরের কালো লুকানো যায়, মনের কালি না। তাই সমাজের চিকিৎসা করার দায় বৈদ্য-বণিক-শিক্ষক-ছাত্র-সাহিত্যিক-ব্লগার সবার!

- কি করবো?

- তোমার যতোটুকু করার আছে।

- যদি আমার ক্ষতি হয়?

- তোমার ঘরের সামনে তোমারই প্রেয়সীর কাপড় ধরে টানা হলো। এর থেকে আর কি ক্ষতিই বা হতে পারে। এটা তো ১৯৭১ না। নাকি তোমরা মনে করো, মরে যাওয়া পাকিস্তানি হানাদার গুলো, তোমাদের শরীরে আবার জন্ম নিয়েছে?

- ছিঃ ছিঃ এসব কি বলেন?

- আমার লেখা গানটাকে এবার ছেড়ে দাও। ওটা নিয়েও তোমাদের জাতের রশি ঢিলে হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া এক মালাউন কবির গান দিয়ে কেন তোমরা দেশের সব শুভ কাজ শুরু করবে?

- আমার ঘুম পাচ্ছে, কাল সকালে হসপিটালে যাবো

- বেশ, বাঙ্গালী। জাতি হিসেবে তুমি ঘুমিয়ে যাও। ঘুমিয়ে থাকো। ঠিক যেমন করে আমার নোবেলটি চুরি গেলো, তোমার-তোমাদের প্রতিবাদ করার শক্তিটুকুও নিঃশব্দে চুরি গেছে তা তোমরা জানো না।

- আচ্ছা আপনি আমাকে এসব বলছেন কেন, হ্যালো... ... শুনছেন...

- টু... টু... ... টুট...টু

আমি ঘুমিয়ে গেলাম, অনেক গভীর সে ঘুম...

আমার সামনে আমার সমাজের মেয়েরা আক্রান্ত হলেও ভাঙে না সেই ঘুম...

আমার সামনে রেল স্টেশনে কয়েকজন মিলে একজন নারীর কাপড় ধরে টানলেও ভাঙে না সেই ঘুম। যে দেশে হানাদার নেই, চরিত্রহীন জমিদার নেই, তারপরো মেয়েদের সম্ভ্রম হানি হলে ভাঙে না সেই ঘুম... সেই ঘুম পাচ্ছে আমার...

পুনশ্চ:

আজ নারী দিবস না। এটা নারী দিবসের লেখা না। যে দেশে বাঁধাহীন ভাবে পথে ঘাটে একজন নারী কিংবা একজন পুরুষের সম্মান ক্ষুন্ন হতে পারে, এটা সেই 'প্রতিবাদ করতে ভুলে যাওয়া' মানুষের দেশের জন্য লেখা। ভাগ্যিস আমরা সেই দেশে থাকি না!

লেখক: ডা. রাজীব দে সরকার, চিকিৎসক, সার্জারী বিভাগ (৩৩ বিসিএস), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

;