‘রাতের ভোট’: আত্মসমালোচনা ইসির



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানা আলোচনা আছে। ওই ভোট দিনের বেলার পাশাপাশি রাতেও হয়েছে বলে সরকারবিরোধী অংশের জোর প্রচার। বর্তমান সরকারকে ‘রাতের ভোটের অবৈধ সরকার’ বলে অভিযুক্ত করে আসছে বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলো। আওয়ামী লীগ বরাবরের মতো সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। জনগণ তাদের সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে ফের ক্ষমতায় এনেছে এমনই দাবি তাদের। আওয়ামী লীগের দাবি বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে দেশবাসী প্রত্যাখ্যান করে তাদেরকে বিপুল বিজয় উপহার দিয়েছে।

ভোট নিয়ে নানা অভিযোগ মাথায় নিয়েই বিদায় নিয়েছে সাবেক ইসি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নুরুল হুদা বারবার রাতের বেলায় ভোটের অভিযোগ অস্বীকার করলেও আবার আকারে ইঙ্গিতে সেটা কবুলও করেছেন একাধিকবার। তবে এনিয়ে তার মধ্যে অনুশোচনা লক্ষ্য করা যায়নি, বরং নিজেকে সফল দাবিও করে গেছেন শেষ পর্যন্ত। যদিও তার নেতৃত্বাধীন কমিশনের অন্য কমিশনার মাহবুব তালুকদার তার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন একাধিকবার এবং সিইসির সঙ্গে তার বিরোধ ছিল প্রকাশ্য। সিইসির সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধের কারণে হোক আবার অনুশোচনার কারণেই হোক ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে তিনি তার খেদের কথা বারবার বলেছেন। নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটির ব্যর্থতার কথা বললেও ব্যর্থতা স্বীকার করে পদত্যাগ করার সাহস দেখাতে পারেননি। তিনিও অন্যদের মতো সাংবিধানিক সকল সুযোগসুবিধা গ্রহণ করে মেয়াদ পূরণ করেই বিদায় নিয়েছেন।

আগের নির্বাচন কমিশন (ইসি) ‘রাতের ভোট’ নিয়ে নানা কথা বলেছে, বর্তমান ইসিও। মঙ্গলবার (২৪ মে) রাজধানীর নির্বাচন ভবনে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, নির্বাচনকে প্রহসনে রূপান্তর করার কোনো ইচ্ছে আমাদের নেই। এটা আমরা অন্তর থেকে বলছি। সুন্দর নির্বাচন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সুস্থ ধারা অব্যাহত থাকুক। ভোট নিয়মানুযায়ী হবে, দিনের ভোট দিনেই হবে। ভোট রাতে হবে না—এটা স্পষ্ট করে বলতে চাই। সিইসির এই বক্তব্য চলমান নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের নানা আলোচনার বিপরীতে আস্থা ফেরানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখতে চাই।

আগের ভোট রাতে হয়েছে কি-না এনিয়ে প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি, কোন আদালতও এটা বলেনি। বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলোসহ দেশের অনেকের ধারণা এমনই। এই ধারণার বাইরে যেতে পারেনি সাবেক ও বর্তমান নির্বাচন কমিশন। ভোট রাতে কি দিনে হয়েছে এটা এখন পর্যন্ত অমীমাংসিত বিষয়, এনিয়ে নির্বাচন কমিশন যখন কথা বলে তখন মানুষের মধ্যে প্রশ্ন জাগে। তবে সন্দেহ ও অনাস্থা থেকে আস্থা ফেরানোর যে পদক্ষেপ সেটা বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিচ্ছে বলে ধারণা করা যায় ইঙ্গিতবহ স্বীকারোক্তি কিংবা আত্মসমালোচনা থেকে। এটাকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখতে বরং আগ্রহী।

বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যর্থতা একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে তাদের অভিযোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারেনি। গত নির্বাচনে বিপুল পরাজয়ের পর তারা সেই নির্বাচন নিয়ে কোন কাজ করেছে বলে দৃশ্যমান হয়নি। নির্বাচনের ফলাফলের বিপর্যয় কী কারণে ঘটল তা নিয়ে কিছু মেঠো-বক্তৃতা দেওয়া ছাড়া আর কোন কাজ করেনি তারা। নির্বাচনের পর আসনভিত্তিক ফলাফল নিয়ে আগের নির্বাচনগুলোর সঙ্গে সবশেষ নির্বাচনের ভোটের সংখ্যা নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে সেগুলো দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করলে ওখান থেকে তারা অনেক কিছু পেতে পারত। এর মাধ্যমে তারা নির্বাচনকে বাতিল ঘোষণা করাতে পারত না ঠিক তবে মানুষের কাছাকাছি যেতে পারত। লড়াইটা হতে পারত বুদ্ধিবৃত্তিক, কিন্তু মাঠের রাজনীতিতে শক্তিহীন বিএনপি যে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রেও শক্তিহীন একটা দল সেটাই প্রমাণ করেছে তারা।

বিএনপির এই ব্যর্থতা রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক। এর সুযোগ নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তারপরেও ‘রাতের ভোট’ নিয়ে আলোচনা আছে। সরকার দল আওয়ামী লীগ যতই এটা অস্বীকার করুক না কেন মানুষের মনে বিভ্রান্তি আছে, নানা মত আছে ইসিতেও। নির্বাচন কমিশন এনিয়ে কথা বলার মধ্যে আত্মসমালোচনার যে পথ দেখাচ্ছে এটাকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখতে চাই। আগের ‘ভুল’ শুধরে নিয়মানুযায়ী ভোটগ্রহণের যে প্রত্যয় বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মধ্যে দেখা যাচ্ছে এটা দেখে আশাবাদী হতে পারে দেশের মানুষ, আশাবাদী হতে পারে রাজনৈতিক দলগুলো; নির্বাচন হতে পারে অংশগ্রহণমূলক। বিতর্ককে পাশ কাটিয়ে অস্বীকার তত্ত্ব এই নির্বাচন কমিশনের মধ্যে এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না বলেই মনে হচ্ছে আমাদের।

দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে কি-না এনিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে, কারণ বর্তমান সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা আছে বিএনপির। আবার বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনবে না আওয়ামী লীগ সরকার। আন্দোলনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক কিংবা জাতীয় সরকারের দাবি আদায়ের মাঠের শক্তিও নেই বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলোর। ফলে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের চ্যালেঞ্জ আছে নির্বাচন কমিশনের। তারা পারবে কি-না এটা সময়ই বলে দেবে। তবে এখন পর্যন্ত তাদের যে অবস্থান তাতে অন্তত আশাবাদী হওয়ার চেষ্টা করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে।

নিয়মানুযায়ী দিনের ভোট, অনিয়মের রাতের ভোট—এ আলোচনা চলতেই থাকবে। তবু মানুষকে আস্থা রাখতে হবে নির্বাচন কমিশনের ওপর। বর্তমান নির্বাচন কমিশন কতটুকু কী করতে পারবে এনিয়ে এখনই সিদ্ধান্তে পৌঁছার সময় হয়নি দেশবাসীর। তারা মানুষের আস্থা ফেরাতে কাজ করছে, আপাতত এটাই স্বস্তির। কাজের আগে কাজ নিয়ে সিদ্ধান্ত নয়, তাদেরকে সমর্থনের পাশাপাশি দিতে হবে প্রয়োজনীয় সময়। দেশবাসীর সমর্থন পেলে তারা তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতার ব্যবহার করতে পারবে বলে বিশ্বাস রাখতে চাই।

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

শিক্ষকদের বাঁচান



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পাঠ্যবইয়ে কবি কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতা আমরা পড়েছিলাম। পড়েছিলামই কেবল নয়, মনে ধরেছিলাম এর গূঢ়ার্থ। কবিতাটি এখনও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক, শ্রদ্ধা ও মর্যাদার বিবেচনাবোধের স্মারক মনে হয়। শিক্ষাজীবনের দীর্ঘকাল অতিবাহিত হয়ে গেছে, তবু শিক্ষকদের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধ কমেনি। শিক্ষকদের দেখে এখনও মন আর্দ্র হয়, শ্রদ্ধায় নুয়ে আসে শির। এ অবস্থা যদিও ব্যক্তিপর্যায়ের তবে শিক্ষা সম্ভবত পরিবার এবং ওই শিক্ষকদের কাছ থেকে পাওয়া।

আমাদের সময়ে স্কুলে বেতের বাড়ির চল ছিল। পড়া না পারলে বেশিরভাগ শিক্ষকের কাছে থেকে শাস্তি হিসেবে ওটা জুটত। সে সময়ে সম্ভবত প্রাসঙ্গিক ছিল বলে প্রতিষ্ঠান-প্রতিষ্ঠানে সে চর্চা ছিল। এখন এটা নাই, আইনি বাধ্যবাধকতায় ওঠে গেছে। বেতের বাড়ি শাস্তি ওঠে যাওয়ার পক্ষে আমরা যদিও তবু বলি শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এখন অস্বাভাবিক হয়ে ওঠেছে। আমাদের সময়ে যে সকল শিক্ষক ‘খুব কড়া’ ছিলেন, পড়া শিখে না গেলে মারধর করতেন তাদেরকে আমরা ‘বাঘের মতো’ ভয় পেতাম। পড়া শিখে যেতাম। নামটাই ছিল যদিও ভয়ের, তবু অশ্রদ্ধা করার সাহস করতাম না কখনও। হ্যাঁ, আড়ালে-আবডালে অনেক কথাই হয়তো আমরা বলতাম কিন্তু অশ্রদ্ধা করার চিন্তাও করিনি কখনও।

আমাদের সে সময় গত হয়েছে। আমাদের সন্তানেরা এখন পড়ছে। তাদের ভয় নেই বেতের বাড়ির। শিক্ষার পরিবেশ উন্নত হয়েছে, বদলেছে শিক্ষারধরনও। তবে মাঝেমাঝে এবং বলা যায় নিয়মিত বিরতিতে এখন শিক্ষক নিগ্রহের তথ্য আসছে। শিক্ষার্থীর হাতে শিক্ষক নিগৃহীত হচ্ছেন, শিক্ষার্থীরা দলবদ্ধ হয়ে শিক্ষকদের ওপর হামলে পড়ছে, অপবাদ দিচ্ছে, লাঞ্ছিত করছে; সবশেষ লাঠির (ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্পের) আঘাতে হত্যাও করছে। সাভারের ঘটনা তার সবশেষ প্রমাণ যেখানে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর স্ট্যাম্পের আঘাতে মারা যান একজন শিক্ষক; উৎপল কুমার সরকার।

শিক্ষকের মৃত্যুর এই ঘটনার আগের সপ্তাহেই নড়াইল সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেওয়া হয়। শিক্ষকের গলায় যখন জুতার মালা দেওয়া হচ্ছিল তখন পুলিশের উপস্থিতি ছিল, সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল ভিডিও’র সূত্রে জানাচ্ছে গণমাধ্যম। ওই প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থী ধর্ম অবমাননা করেছেন এমন অভিযোগ ওঠার পর শিক্ষক স্বপন কুমার শিক্ষার্থীর পক্ষ নিয়েছেন এমনই অভিযোগ বিশৃঙ্খলাকারীদের। এই ঘটনার কয়েক মাস আগে মুন্সিগঞ্জের মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলে তারই শিক্ষার্থীরা। তাকে জেলে যেতে হয়। একই সময়ে আরেক শিক্ষক আমোদিনী পালের বিরুদ্ধে একইভাবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ আনা হয়।

ঘটনাগুলো সাম্প্রতিক, করুণ-বীভৎস-ন্যক্কারজনক। একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে সারাদেশে। শিক্ষক নিগ্রহের বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করতে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলা হচ্ছে। তারা কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছেন কি করেননি সেদিকেও নজর দেওয়ার চেষ্টা করেনি কেউ। পুলিশ প্রশাসন তাদের রক্ষায় কোন ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো বিশৃঙ্খলাকারীদের সহায়তা করেছে। হৃদয় মণ্ডল কিংবা স্বপন কুমার বিশ্বাস--প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই পুলিশের ভূমিকা বিতর্কিত, হতাশাজনক।

অদ্য যে শিক্ষকের গলায় জুতার মালা ওঠল, যে শিক্ষক শিক্ষার্থীর স্ট্যাম্পের আঘাতে মারা গেলেন তাদের পরিবার বিচার পাবে কি-না জানি না, তবে এটা জানি বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা এই ধরনের বিশৃঙ্খলার সমূল উৎপাটনে পথ রোধ করে দাঁড়াবে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা শিক্ষকেরা যেখানে কথিত ধর্ম অবমাননার শিকার হচ্ছেন সেখানে অজনপ্রিয় হয়ে যাওয়ার ভয়ে সরকার-প্রশাসন কঠোর হতে যাবে না বলেও শঙ্কা!

ছয় বছর আগে নারায়ণগঞ্জের স্কুলশিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে কান ধরে ওঠ-বস করতে বাধ্য করেছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান। তার প্রতিবাদে সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারকারীরা কান ধরার ছবি দিয়েছিলেন, দেশের নানাপ্রান্তে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছিল। ওই ঘটনায় রাষ্ট্র লজ্জিত হয়নি, শাস্তি হয়নি ‘শাস্তিদাতা’ সংসদ সদস্যের। উল্টো পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল শিক্ষকের। ওই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে শিক্ষক নিগ্রহের এমন ধারাবাহিকতা থাকত না বলে এখনও বিশ্বাস আমাদের।

শিক্ষকরা লাঞ্ছিত হচ্ছেন বারবার। কখনও নিজেদের শিক্ষার্থীদের হাতে, কখনও দলবদ্ধ কথিত অনুভূতিশীল গোষ্ঠীগুলোর হাতে। রাষ্ট্র বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দায়সারা গোছের বক্তব্য দিয়েই দায়িত্ব সেরে যাচ্ছে। লাঞ্ছনাকারীদের একটা বড় অংশ বয়সে কিশোর। এই কিশোরদের অপরাধ প্রবণতা নিয়ে মাঝেমাঝে কথা বলেন দায়িত্বশীলরা, কিন্তু দায়িত্ব নিয়ে অপরাধ-রোধের ব্যবস্থা নিতে আগ্রহ দেখান না। ফলে কিশোর-অপরাধ বাড়ছে দ্রুততার সঙ্গে। এটা রোধ করতে হবে। উদ্যোগী হতে হবে সরকারকে। এখানে বক্তৃতা-বিবৃতি আর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসের মধ্যে সীমিত থাকা উচিত হবে না।

বলছিলাম কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতা নিয়ে। ব্যথাতুর বাদশাহ আলমগীর, পুত্র কেন শিক্ষকের পা নিজ হাতে ধুয়ে দিলো না এ কারণে। কবিতার দৃশ্যকল্প-ঘটনা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে যদিও তবু এমন সময় আসুক যখন শিক্ষার্থী নিজ হাতে শিক্ষকের পা না ছুঁয়ে দিক অন্তত শিক্ষার্থীর হাতে শিক্ষক যেন লাঞ্ছিত না হন। এটা বাড়াবাড়ি রকমের চাওয়া নয় আমাদের। এজন্যে যার যার অবস্থান থেকে আমাদের দায়িত্বশীল হতে হবে, উদ্যোগী হতে হবে। জাগতে হবে শিক্ষকসমাজকে, জাগতে হবে দেশকে; তা না হলে সরকার-প্রশাসন ‘উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে’ এটাও গুরুত্বহীন ভেবে দিন পার করবে!

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক

;

পদ্মা সেতুসহ প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন অভিযোগের জবাব দিলেন ড. ইউনূস



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
পদ্মা সেতুসহ প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন অভিযোগের জবাব দিলেন ড. ইউনূস

পদ্মা সেতুসহ প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন অভিযোগের জবাব দিলেন ড. ইউনূস

  • Font increase
  • Font Decrease

পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধে ভূমিকা ও গ্রামীণ ব্যাংকসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী মুহাম্মাদ ইউনূসের বিরুদ্ধে নানা সময়ে অভিযোগ করে আসছেন। বুধবার (২৯ জুন) গণমাধ্যমে এই সব অভিযোগের জবাব পাঠিয়েছেন প্রফেসর ইউনূস।

যা হুবহু তুলে ধরা হলো- সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নোবেল লরিয়েট প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে কিছু গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন।

এই অভিযোগগুলির অনেকগুলিই কয়েক বছর আগেও করা হয়েছিল এবং আমরা তখন এগুলির জবাবও দিয়েছিলাম।

যেহেতু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একই অভিযোগ আবারও করছেন এবং এর সঙ্গে নতুন আরো অভিযোগ যুক্ত করেছেন, সাংবাদিকবৃন্দ এবং অন্যরাও এ বিষয়ে আমাদের বক্তব্য জানতে চাচ্ছেন, তাই এগুলির জবাবও আবার দেবার প্রয়োজন হয়েছে  বলে আমাদের নিকট মনে হচ্ছে যাতে এর মাধ্যমে জনগণ প্রকৃত তথ্য জানতে পারেন। আমরা আমাদের বক্তব্য নিচে তুলে ধরলাম।

অভিযোগ:

গ্রামীণ ব্যাংক একটা ব্যাংক, তার যিনি এমডি তিনি হচ্ছেন ডক্টর ইউনূস। আইনমত তার ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত এমডি থাকা যায়। বেআইনিভাবে সে ৭০-৭১ বছর বয়স পর্যন্ত তার যখন বয়স তখন সে এমডি ছিল। স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে নোটিশ দেয়। কিন্তু তাকে কিন্তু কোন অপমান করা হয়নি। আমাদের সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব এবং উপদেষ্টা গওহর রিজভী সাহেব তাকে প্রস্তাব দেয় যে, আপনি গ্রামীণ ব্যাংকের উপদেষ্টা হয়ে যান। উপদেষ্টা ইমিরেটাস হিসেবে আপনাকে আমরা মর্যাদা দিব। কিন্তু উনি ওই এমডিই উনাকে থাকতে হবে। এখন একজন এমডি ব্যাংকের, তার তো বাইরে গেলে জিও নিতে হয়, সে তো জিও নেয়নি কোনদিন। বরং আমরাও তাকে অনেক বেশী সুযোগ দিয়েছি ।

আমাদের জবাব:

শুরুতেই পরিষ্কার করা প্রয়োজন যে, গ্রামীণ ব্যাংক এমন একটি ব্যাংক যার ৭৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক এর ঋণগ্রহীতারা। একটি আলাদা আইনের মাধ্যমে কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য সন্নিবেশ করে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো, ফলে অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক এর সাথে এর পার্থক্য আছে।

গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয় এর পরিচালনা পরিষদ কর্তৃক নির্ধারিত শর্তে একটি চুক্তির অধীনে। এই নিয়োগের জন্য কোনো বয়সসীমা আইনে বা পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তে উল্লেখ ছিলো না।

প্রফেসর ইউনূস ৬০ বছর বয়সে পদার্পণ করলে তিনি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পরিচালনা পরিষদকে জানান যে, যেহেতু তাঁর বয়স ৬০ বছর হয়েছে তাঁরা একজন নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন। পরিচালনা পরিষদ অন্য কোনোরূপ সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকেই দায়িত্ব পালন করে যেতে বলেন। পরিচালনা পরিষদ তাঁর বর্তমান নিয়োগের মেয়াদ শেষ হবার পর তাঁকেই ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে পুনঃনিয়োগ প্রদান করেন। সে সময় তাঁর বয়স ছিল ৬১ বছর ৬ মাস। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের নিয়মিত পরিদর্শন প্রতিবেদনগুলির একটিতে এ বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিলে গ্রামীণ ব্যাংক বিষয়টি ব্যাখা করে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরবর্তি প্রতিবেদনে এ বিষয়ে আর কোন পর্যবেক্ষণ করা হয়নি।

জিও বিষয়ে বলতে হয়, বিদেশ ভ্রমণের জন্য তাঁকে কখনো জিও নিতে হয়নি কারণ তিনি সরকারী কর্মচারী ছিলেন না। এ ব্যাপারে সরকার কোনো সময় আপত্তি তোলেনি।

যখন ২০১১ সালে এ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলো এবং প্রফেসর ইউনূসকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করতে বলা হলো তখন ব্যাংকটির মৌলিক আইনী মর্যাদা হুমকির মুখে পড়ে গেল যা প্রফেসর ইউনূস ক্রমাগতভাবে সকল সরকারের সমর্থন নিয়েই গড়ে তুলেছিলেন। এখন অপসারণের নির্দেশের কারণে সম্পূর্ণ নতুন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো।

তিনি চেয়েছিলেন মহামান্য হাইকোর্ট ব্যাংকটির আইনী মর্যাদা সমুন্নত রাখুন। বিষয়টির আইনগত দিকগুলি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তিনি হাইকোর্টে রিট পিটিশন করেন। প্রফেসর ইউনূস তাঁর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের চাকরি রক্ষার জন্য মরিয়া হয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শত্রুভাবাপন্ন আচরণ করেছেন, যেমনটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বার বার অভিযোগ করছেন - বিষয়টি মোটেই তা নয়। প্রফেসর ইউনূস যা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন তা ছিল ব্যাংকটির আইনী মর্যাদা রক্ষা। কেননা তিনি সবসময় বিশ্বাস করতেন যে, যে আইনী কাঠামোয় তিনি বিগত সকল সরকারের সহায়তায় গ্রামীণ ব্যাংক গড়ে তুলেছিলেন তা দারিদ্র নিরসনে একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যাংকটিকে সফল করে তুলতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

তাঁর চাকরি বিষয়ে বলতে হয়, প্রফেসর ইউনূস ৬০ বছর বয়সে পদার্পণের পর তিনি কয়েকবারই পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পরিচালনা পরিষদ প্রতিবারই তাঁকে দায়িত্ব পালন করে যেতে বলেছিলেন।

২০১০ সালে প্রফেসর ইউনূস তাঁর একজন উত্তরসূরি খোঁজার প্রক্রিয়া শুরু করতে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী জনাব এ এম এ মুহিত সাহেবকে অনুরোধ করেছিলেন। যেহেতু তিনি নিজেই একজন যোগ্য উত্তরসূরির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ ছেড়ে দিতে চাইছিলেন।

অর্থমন্ত্রী জনাব মুহিতকে লেখা প্রফেসর ইউনূসের এই চিঠি সে সময়ে দেশের সকল সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল, যেহেতু  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ আঁকড়ে রাখার জন্য প্রফেসর ইউনূসের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, প্রফেসর ইউনূসের বয়স ৬০ বছর অতিক্রম করে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদে ২০০১ সালে। কিন্তু সে সময়ে সরকার কখনোই তাঁর বয়স নিয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করেনি। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকও এ-নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেনি।

প্রফেসর ইউনূস ব্যাংকের আইনী মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হাইকোর্টে যান। তিনি মহামান্য হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে তাঁর চাকরি ধরে রাখার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

মহামান্য হাইকোর্ট এই কারণ দেখিয়ে প্রফেসর ইউনূসের পিটিশন শুনানির জন্য গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান যে, এ বিষয়ে তাঁর কোনো  “Locus Standi”  নেই অর্থাৎ এ বিষয়ে পিটিশন দাখিল করার কোনো এক্তিয়ার তাঁর নেই। এরপর তিনি আপিল বিভাগে যান এবং আপিল বিভাগও একই যুক্তিতে তাঁর আবেদন গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।

এরপর প্রফেসর ইউনূস মে ১২, ২০১১ তারিখে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন।

অভিযোগ:

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ যখন আসলো, ইউনূস তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে এবং আমাদের সরকারের বিরদ্ধে মামলা করলো। কিন্তু প্রত্যেকটা মামলাই সে হেরে গেল কারণ আইন তো তাকে কভার দিতে পারে …  আইন তো তার বয়স কমাতে পারে না। কোর্ট তো আর তার বয়স কমাতে পারে না। হেরে যেয়ে আরও ক্ষেপে গেল। হিলারি ক্লিনটনকে দিয়ে আমাকে ফোন করিয়েছে, টনি  ব্লেয়ারের স্ত্রী  শেরি ব্লেয়ার, তাকে দিয়ে ফোন করিয়েছে, তারপরে একজন  ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের প্রতিনিধি আসছে ... সবাই কি ... ইউনূসকে  ব্যাংকের এমডি রাখতে হবে।

মাননীয় স্পীকার, আমি জাতির কাছেই প্রশ্ন করি, ব্যাংকের এমডিতে কি এত মধু ছিল যে ওইটুকু উনার না হলে চলত না? সে তো নোবেল প্রাইজ পেয়েছে। তো আমি জিজ্ঞেস করলাম নোবেল প্রাইজ যে পায় সে তো এমডি পদের জন্য এত লালায়িত কেন? সেটা আমার মনে হয় সকলের একটু চিন্তা করে দেখা উচিৎ।

এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক যাতে টাকাটা বন্ধ করে, তার জন্য বারবার ইমেইল পাঠানো,  হিলারীর সঙ্গে দেখা করা, এর ফাঁকে দিয়ে ইমেইল পাঠানো এবং তার সাথে আমাদের একজন সম্পাদকও খুব ভালভাবে জড়িত ছিল। কাজেই একটা কথা হচ্ছে যে এদের মধ্যে কি কোন দেশপ্রেম আছে?

আমাদের জবাব:

গ্রামীণ ব্যাংক থেকে প্রফেসর ইউনূসের অপসারণের সংবাদটি বিশ্বব্যাপী সংবাদে পরিণত হয়েছিল। তবে তা এ কারণে নয় যে তিনি এ পদে থাকতে চেয়েছিলেন। বরং এ কারণে যে বিশ্বব্যাপী গ্রামীণ দর্শন ও এর কর্মপদ্ধতির অনুরাগী ও অনুসরণকারীদের বিশাল কমিউনিটির কাছে এটি ছিল অত্যন্ত অবিশ্বাস্য ও হতবুদ্ধিকর একটি ঘটনা। তাঁরা বিভিন্নভাবে তাঁদের উদ্বেগ প্রকাশ করছিলেন। তাঁরা প্রফেসর ইউনূসকে তাঁর পদে ফিরিয়ে আনার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছিলেন না, তাঁরা এটা দেখতে চাইছিলেন যে, গ্রামীণ কর্মসূচিগুলির অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক। দরিদ্রদের আশার স্থল হিসেবে বিশ্বজুড়ে গ্রামীণকে কী দৃষ্টিতে দেখা হয় এটি ছিল তারই একটি বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

প্রফেসর ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে অপসারণের ঘটনায় বিশ্বব্যাপী যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় তা একটি  সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র  কাহিনী।  দূর্নীতির কারণে পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধে বিশ্ব ব্যাংকের সতর্কসংকেতের ঘটনা একই সময়ে ঘটেছিল।

একই সময়ে চলমান দুটি আলোচনার বিষয়কে মিশিয়ে ফেলে একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন কাহিনী সৃষ্টি করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী  বলছেন যে, প্রফেসর ইউনূস হিলারী ক্লিনটনের সাথে চক্রান্ত করে বিশ্ব ব্যাংকের উপর চাপ সৃষ্টি করায় পদ্মা সেতুতে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

পদ্মা সেতুতে বিশ্ব বাংকের অর্থায়ন বন্ধে প্রফেসর ইউনূস চাপ প্রয়োগ করেছেন এ বিষয়টি প্রথমবার যখন উল্লেখ করা হয় তখনই প্রফেসর ইউনূস এ বিষয়ে একটি সুষ্পষ্ট বক্তব্য দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সকল মানুষের দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন-- এবং তিনিও এস্বপ্নে  বিশ্বাসী। । এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টির কোনো প্রশ্নই আসে না। প্রফেসর ইউনূস বলেন "আজ পদ্মা সেতুর নির্মাণ সমাপ্ত হওয়ায়  দেশের মানুষ আনন্দে উদ্বেলিত । দেশের সকল মানুষের সঙ্গে আমিও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে এই ঐতিহাসিক সাফল্যের জন্য অভিনন্দন জানাচ্ছি।

এই কাহিনীতে  বলা হয়েছে যে  প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ হয়ে প্রফেসর ইউনূস পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধে তাঁর “বিশাল প্রভাব” কাজে লাগিয়েছেন। প্রফেসর ইউনূস বিশ্ব ব্যাংকের উপর সরাসরি চাপ প্রয়োগ না করলেও তিনি তাঁর বন্ধু হিলারী ক্লিনটনের মাধ্যমে তা করিয়েছেন। অন্য কথায়, বিশ্ব ব্যাংক কর্তৃক চুক্তি বাতিলের ঘটনায় তাঁর কোনো না কোনো সংযোগ নিশ্চয়ই আছে। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন যে, একটি নামকরা সংবাদপত্রের এক সম্পাদক অর্থায়ন বন্ধে বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্টকে প্ররোচিত করতে বিশ্ব ব্যাংক কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতও করেছেন। আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত-গ্রহণের কঠিন জগৎ দুই বন্ধুর খেয়াল-খুশী বা একজন পত্রিকা সম্পাদকের সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার উপর নির্ভর করে না। প্রফেসর ইউনূস যত “গুরুত্বপূর্ণ” ব্যক্তিই হোন না কেন, তাঁর যত “প্রভাবশালী বন্ধুই” থাকুক না কেন, একটি ৩০০ কোটি ডলারের প্রকল্প শুধু এ-কারণে বন্ধ হয়ে যেতে পারে না যে, তিনি চাইছিলেন এটা বাতিল হয়ে যাক । অভিযোগের জবাবে আবারো বলতে হচ্ছে যে, প্রফেসর ইউনূস পদ্মা সেতু বিষয়ে বিশ্বব্যাংক বা অন্য কোনো সংস্থা বা ব্যক্তির কাছে কখনও কোনো অভিযোগ বা অনু্যোগ জানাননি। সুতরাং বিষয়টি নিতান্তই কল্পনা প্রসূত।

অভিযোগ:

কিন্তু গরিবের কাছ থেকে প্রায় ৪৭ ভাগ সে ইন্টারেস্ট নিত । এটি হচ্ছে সব থেকে দুর্ভাগ্যের বিষয় ।

আমাদের জবাব:

এ বক্তব্য  মোটেই সঠিক নয়। ব্যবসা ঋণের উপর গ্রামীণ ব্যাংকের  সুদ বরাবরই ২০% যা একটি ক্রমহ্রাসমান সরল সুদ। এটা কখনো কোন উপলক্ষ্যে বাড়ানো হয়নি। বলা বাহুল্য মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটি মাইক্রো ক্রেডিটের সর্বোচ্চ সুদের অনুমতি দিয়েছে ২৭%। গ্রামীণ ব্যাংক বরাবরই সরকার নির্ধারিত সুদের হার থেকে অনেক কম সুদে ঋণ দিয়ে গেছে। এছাড়া অন্যান্য সুদের হার আরো অনেক কম।

গৃহঋণের উপর ৮%, সদস্যদের ছেলে মেয়ের শিক্ষা ঋণের উপর শিক্ষাকালে ০% এবং শিক্ষা সমাপান্তে ৫%, হত- দরিদ্রের জন্য ০%। গ্রামীণ ব্যাংকে ৪৭% সুদ কখনো ছিল না এখনো নেই।

তাছাড়া যেকোন ব্যাংকের সুদ আয়ের উপর যে লাভ হয় তার ভাগিদার হন মালিকগণ। গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক ২৫% সরকার আর ৭৫% গরিব সদস্যগণ। তাই সরকার ও সদস্যরা নিয়মিত লাভ পেয়ে আসছেন। প্রফেসর ইউনূসের এতে একটা শেয়ারও নেই। তাই ৪৭% সুদ নিয়ে কাউকে ঠকানোর কোন সুযোগই তার নেই!

প্রফেসর ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে অপসারণের পরও এই ঋণ-নীতির কোন পরিবর্তন হয়নি।

অভিযোগ:

বরং গ্রামীণ ব্যাংকের যত টাকা, সব কিন্তু সে নিজে খেয়ে গেছে। নইলে একজন ব্যাংকের এমডি এত টাকার মালিক হয় কিভাবে? দেশে-বিদেশে এত বিনিয়োগ করে কিভাবে?

আমাদের জবাব:

প্রফেসর ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের কোনো টাকা “খেয়ে” ফেলেননি। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে তাঁর কর্মকালীন সময়ে তাঁর বেতনের বাইরে তিনি আর কোনো অর্থ ব্যাংক থেকে গ্রহণ করেননি। আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জন্যও কোন সময়  তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের কোনো টাকা খরচ করেননি। দেশে ও দেশের বাইরে বিনিয়োগ করতে তিনি ব্যাংকের টাকা নিয়েছেন বলে যে দাবী করা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ অসত্য।

বর্তমান সরকার দেশের সমস্ত ব্যাংকের সকল শাখা থেকে তাঁর ব্যাংক হিসাবগুলি তদন্ত করে দেখতে আদেশ দিয়েছিল। মিডিয়াতে এই আদেশ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল। তাঁর ট্যাক্স রিটার্ণসমূহ বহুবার পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে এবং এই সংবাদও দেশব্যাপী প্রচার করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ এসব তদন্তে কোনরূপ অনিয়ম কোন কর্তৃপক্ষ খুঁজে পেয়েছে এরকম কোনো সংবাদ আমরা কখনো পাইনি। গ্রামীণ ব্যাংকের অনিয়ম খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে সরকার গঠিত একটি রিভিউ কমিটি ও একটি কমিশন বহু চেষ্টা করেও এধরণের অর্থ অপসারণের কোনো তথ্য বের করতে পারেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিতভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের সকল হিসাব ও আর্থিক বিষয়াদি নিরীক্ষা করে দেখে। এর কোনো রিপোর্টে প্রফেসর ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক থেকে কোনো টাকা সরিয়েছেন এমন কোনো কথা বলা হয়নি। মিডিয়াতেও এ ধরনের কোনো রিপোর্ট কখনো আসেনি।

প্রফেসর ইউনূস নিয়মিতভাবে তাঁর কর পরিশোধ করেন এবং ট্যাক্স রিটার্ণ জমা দেন।

তাঁর আয়ের উৎস:

প্রফেসর ইউনূসের আয়ের উৎস তিনটি: ১) বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সম্মেলনে বক্তা হিসেবে প্রদত্ত ভাষণের জন্য লেকচার ফি। তিনি পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী ফি প্রাপ্ত বক্তাদের অন্যতম। তাঁর আয়ের প্রধান উৎস এটি। ২) পৃথিবীর ২৫টি ভাষায় প্রকাশিত তাঁর বইগুলির রয়্যালটি। তাঁর বইগুলির মধ্যে কোন কোনটি নিউইয়র্ক টাইমস-এর বেষ্ট সেলার তালিকাভূক্ত। ৩) প্রথম ও দ্বিতীয় উৎস থেকে প্রাপ্ত অর্থ স্থায়ী আমানত হিসেবে রেখে তা থেকে আয়।

প্রথম ও দ্বিতীয় উৎস থেকে প্রতিটি প্রাপ্তির তথ্য কর কর্তৃপক্ষের নিকট নিয়মিত জমা দেয়া হয়। সুতরাং তাঁর আয়ের উৎস সম্বন্ধে কিছু না জানার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না।

তাঁর লেকচার ও বই থেকে প্রাপ্ত সমস্ত আয় তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে গ্রহণ করেন। ব্যাংকগুলি থেকে পাওয়া এ সংক্রান্ত ডকুমেন্ট কর কর্তৃপক্ষের নিকট জমা দেয়া হয়। ফলে তাঁর আয়ের উৎস সরকারের অজানা একথা একেবারেই সত্য নয়। প্রফেসর ইউনূস তাঁর টাকা ব্যাংকে স্থায়ী আমানত হিসাবে রাখেন। তিনি কখনোই স্টক বা শেয়ারে কোনো রকম বিনিয়োগ করেন না। পৃথিবীর কোথাও কোনো কোম্পানীতে তাঁর কোনো শেয়ার নেই।

পৃথিবীর অনেক দেশের সরকার, কর্পোরেশন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সমাজসেবী সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ প্রফেসর ইউনূসের দর্শন ও প্রায়োগিক কর্মসূচিতে অনুপ্রাণিত হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সামাজিক ব্যবসা সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছেন। এঁদের অনেকে প্রফেসর ইউনূসের দর্শন ও ব্যবসায়িক কাঠামোর প্রতি তাঁদের সার্বিক ঐকমত্য প্রকাশ করতে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে “ইউনূস” বা “গ্রামীণ” নাম যোগ করে পরিচিতি দেন। তাঁদের ব্যবসায়ে এই নামগুলির ব্যবহার শুধু ইউনূসের দর্শনের প্রতি উদ্যোক্তাদের একনিষ্ঠতার বহিঃপ্রকাশমাত্র। এগুলি কোনোভাবেই এই ব্যবসাগুলিতে ইউনূস বা গ্রামীণের মালিকানার পরিচয় বহন করে না। তাঁদের ব্যবসাগুলি তাঁদের স্ব-স্ব দেশের আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত। এদের অর্থায়নও হয় উদ্যোক্তাদের নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী। এসব ব্যবসার কোনোটিতেই প্রফেসর ইউনূসের কোনো বিনিয়োগ নেই। এই ব্যবসাগুলির কোনো কোনোটি পরবর্তীতে মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়ে পরিণত হয়েছে। তারা তাদের সফলতার কথা গর্বের সাথে বিশ্ববাসীর কাছে যখন তুলে ধরে তখন তাদের সামাজিক সমস্যাগুলি সমাধানের পথ বের করার উদ্যোগে বাংলাদেশ থেকে পাওয়া তাত্তিক কাঠামো এবং অভিজ্ঞতার জন্য সব সময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

প্রফেসর ইউনূস বিশ্বব্যাপী তাঁর দর্শন ছড়িয়ে দেন, টাকা নয়। তিনি অনেকবার বলেছেন যে, পৃথিবীর কোথাও কোনো কোম্পানীতে তাঁর কোনো শেয়ার নেই, পৃথিবীর কোথাও কোন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে তিনি কোনো বিনিয়োগ করেননি।

অভিযোগ:

এবং ক্লিনটন ফাউন্ডেশনে তিন লক্ষ ডলার সে কিভাবে অনুদান দেয়? কার টাকা দিল? কিভাবে দিল? সেটা তো কেউ খোঁজ করল না!

আমাদের জবাব:

প্রফেসর ইউনূস কখনোই ক্লিনটন ফাউন্ডেশনকে কোনো অংকের কোনো অনুদান দেননি। অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ভুল তথ্য দেয়া হয়েছে।

অভিযোগ:

এবং গ্রামীণফোন যখন নেন তখন বলেছিল যে গ্রামীণফোন থেকে যে লভ্যাংশ সেটা গ্রামীণ ব্যাংকে যাবে এবং ওইটা দিয়ে ব্যাংক চলবে। খোঁজ নিয়ে দেখবেন আজ পর্যন্ত কোনদিন গ্রামীণফোনের একটি  টাকাও সে গ্রামীণ ব্যাংকে দেয় নাই।

আমাদের জবাব:

গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে গ্রামীণ ব্যাংককে লভ্যাংশ প্রদান করার এ ধরনের কোনো কথা ছিলনা। গ্র্রামীণ ব্যাংক এই জয়েন্ট ভেঞ্চারের কোন পক্ষ ছিলনা।

এই জয়েন্ট ভেঞ্চার গ্রামীণফোনের প্রধান অংশীদার নরওয়ের কোম্পানী টেলিনর, যা নরওয়ে সরকারের মালিকানাধীন। গ্রামীণফোনের দ্বিতীয় বৃহত্তম অংশীদার গ্রামীণ টেলিকম যা কোম্পানী আইনের ২৮ ধারায় নিবন্ধনকৃত একটি অলাভজনক কোম্পানী যার কোনো ব্যক্তি মালিক নেই। গ্রামীণ ব্যাংক ও গ্রামীণ টেলিকম দুইটি পৃথক আইনগত সত্তা। গ্রামীণফোন একটি পাবলিকলি লিস্টেড (publicly listed) কোম্পানী।

গ্রামীণ টেলিকম সরোস ফাউন্ডেশনের নিকট থেকে ধারকৃত টাকায় গ্রামীণফোনে বিনিয়োগ করেছিল।

প্রফেসর ইউনূস কোনোকালেই গ্রামীণফোনের কোনো শেয়ারের মালিক ছিলেন না, এখনো তাঁর কোনো শেয়ার নেই। শেয়ার কেনার কোনো ইচ্ছাও তাঁর কখনো ছিলনা।

গ্রামীণ টেলিকম দরিদ্র নারী উদ্যোক্তাদের কাছে গ্রামাঞ্চলে ফোন সার্ভিস বিক্রি করতে “পল্লী ফোন কর্মসূচি” চালু করেছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে গ্রামীণ টেলিকমই প্রথম কোম্পানী যা দরিদ্র মানুষের কাছে, বিশেষ করে দরিদ্র মহিলাদের কাছে এবং গ্রামাঞ্চলে টেলিফোন সেবা পৌঁছে দিয়েছে। “পল্লী ফোন কর্মসূচি” থেকে লক্ষক্ষ লক্ষ মহিলা উল্লেখযোগ্য আয় করতে পেরেছেন। কর্মসূচিটির তাৎপর্যের কারণে এটি প্রযুক্তির ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। গ্রামীণ টেলিকমের “পল্লী ফোন কর্মসূচি” গ্লাসগো  প্রযুক্তি জাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে।  এই প্রযুক্তি জাদুঘরে স্থান পাওয়াটা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। গ্রামীণফোনের যুগান্তকারী কাজের ফলস্বরূপ দেশের সর্বত্র এমনটি দরিদ্রতম মানুষটির কাছেও টেলিফোন সেবা পৌঁছে গেছে।

অভিযোগ:

যখন আমরা ডিজিটাল সিস্টেম নিয়ে এলাম। টেলিকমিউনিকেশন, আগে সব এনালগ ছিল এবং মোবাইল ফোনের ব্যবসা দিয়ে দিলাম প্রাইভেট সেক্টরে, তাকেও একটা মোবাইল ফোনের ব্যবসা দেওয়া হলো। আরও যে দুটো আমরা দিয়েছিলাম তাদের আমরা বেশি সুযোগ দেইনি কিন্তু গ্রামীণ ফোনের জন্য রেলওয়ে অপটিক ফাইবার ক্যাবল ব্যবহার করার সুযোগ আমরা দিয়েছিলাম।

আমাদের জবাব:

রেলওয়েকে তৎকালীণ সময়ে ফাইবার অপটিকস নরওয়ে অনুদান হিসেবে দিয়েছিল। রেলওয়ে তার পূর্ণাংগ ব্যবহার করতে পারছিল না। অথচ জনবল ও ক্যাবল রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতিনিয়ত বিপুল খরচ চালিয়ে যেতে হচ্ছিলো। রেলওয়ে খরচ সাশ্রয়ের জন্য তখন গ্রামীণফোনের সাথে একটা লীজ চুক্তি করে।এটা একটা বাণিজ্যিক চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে রেলওয়ের একাজে নিয়োজিত সকল লোকবলের দায়িত্ব গ্রামীণফোনের নিকট ন্যস্ত করে দেয়া হয়।

গ্রামীণফোন দেশের সবচেয়ে বৃহৎ মোবাইল  ফোন কোম্পানি। ২৫ বছর পরে সব দেখে এখন সবাই বলবে  গ্রামীণ ফোনকে লাইসেন্স দিয়ে সরকার সঠিক কাজ করেছে। লাইসেন্স ন্যায্যত তাদেরই  প্রাপ্য ছিল।

অভিযোগ:

ড. মুহাম্মদ ইউনূস কোনো একটি ফাউন্ডেশনে ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ দিয়েছিলেন- এক আওয়ামী লীগ নেতা ও সংসদ সদস্য সম্প্রতি এমন বক্তব্য দিয়েছেন। এ বিষয়ে তদন্ত হবে কি না- এমন প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা সাংবাদিক। আপনারাও তো তদন্ত করতে পারেন, কিন্তু করেন না। আপনারা তদন্ত করুন। একজন ব্যাংকের এমডি হয়ে কোনো ফাউন্ডেশনে এত অর্থ কীভাবে দেন? আপনারা অনুসন্ধান করুন। আমি (তদন্ত) করতে গেলে তো আবার বলবেন প্রতিহিংসাপরায়ণ। তাই আপনারা খুঁজে বের করলেই ভালো হয়। ড. ইউনূসের আর্থিক অনিয়ম নিয়ে আরও অভিযোগ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কোন ব্যাংকে কত টাকা আছে, কোন ব্যাংক থেকে কত টাকা সরিয়ে নিয়েছেন, সেগুলো খুঁজে বের করুন। কোনো ফাউন্ডেশন বা ট্রাস্ট করে তার টাকা কীভাবে ব্যক্তিগত হিসাবে চলে যায়? এক চেকে ৬ কোটি টাকা তুলে নিয়ে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে জমা করে, সেই টাকা উধাও (ভ্যানিশ) করে দেওয়া হলো! এসব বিষয় নিয়ে অনুসন্ধানের আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বেশিদিন আগের কথা তো নয়। ২০২০ সালের কথা। অ্যাকাউন্ট নম্বর তো আছেই। আপনারা অনুসন্ধান করুন, তথ্য বের করুন। তারপর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হলে আমরা নেব।

আমাদের জবাব:

কোনো ট্রাস্ট থেকে ৬ কোটি টাকা বা অন্য কোনো অংকের টাকা ২০২০ সালে বা অন্য কোনো সময়  প্রফেসর ইউনূসের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়নি। তিনি কোন ফাউন্ডেশনে ৬ মিলিয়ন ডলার অনুদানও দেননি। এটা সম্পূর্ণ একটা কল্পনাপ্রসূত এবং মানহানিকর অভিযোগ।

আগেই বলা হয়েছে, সরকার ইতোমধ্যে ব্যাংকগুলো থেকে প্রফেসর ইউনূসের ব্যাংকিং বিষয়ক তথ্য সংগ্রহ করেছে তাই সকল তথ্যই সরকারের কাছে আছে।

;

খরচের খাতগুলোই অযাচিতভাবে এভিয়েশন ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করছে



মো. কামরুল ইসলাম
খরচের খাতগুলোই অযাচিতভাবে এভিয়েশন ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করছে

খরচের খাতগুলোই অযাচিতভাবে এভিয়েশন ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করছে

  • Font increase
  • Font Decrease

এভিয়েশনে হিউম্যান রিসোর্সের ব্যয় মিটাতে পৃথিবীর অনেক এয়ারলাইন্সকেই হিমশিম থেতে হচ্ছে। কোনো এয়ারলাইন্স তার অপারেশন কস্ট কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ করলেই প্রথমেই স্টাফ কার্টেল করতে দেখা যায়, দেখা যায় বেতন কাঠামো পূনর্গঠন করতে, অর্গানোগ্রামকে পূনর্বিন্যাস করতে। বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা মহামারির সময় সর্বপ্রথম যে খাতটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা হচ্ছে এভিয়েশন, ট্যুরিজম এন্ড হোটেল ইন্ডাস্ট্রি। এই ইন্ডাস্ট্রিকে টিকিয়ে রাখার জন্য নানাবিধ উপায়ে কস্ট কার্টেল করে অক্সিজেন সরবরাহ করার চেষ্টা করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনো স্বাভাবিকতা আসেনি।

সকল শিল্পের গতিশীলতা তখনই বজায় থাকবে, যখন আকাশপথের গতিশীলতা বজায় থাকবে। এই আকাশ পথকে সচল রাখতে আকাশ পরিবহনকে বাঁচিয়ে রাখতে বিভিন্ন দেশ কোভিড কালীন সময়ে এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রিকে নানাভাবে প্রনোদণা দিয়ে, বিভিন্ন ধরনের চার্জ বিশেষ করে এ্যারোনোটিক্যাল ও নন-এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ মওকুফ করে ইন্ডাস্ট্রিকে সচল রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছে বিভিন্ন দেশের এভিয়েশনের রেগুলেটরি অথরিটিসহ বিভিন্ন সরকারী সংস্থা। কিন্তু বাংলাদেশের এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি বিশেষ করে প্রাইভেট এয়ারলাইন্সসমূহ আসলে কতটুকু সহায়তা পেয়েছিলো তা ভাবনার বিষয়।

প্রনোদণা বলতে যা বোঝায় তা ছিলো জাতীয় বিমান সংস্থার জন্য। কোনো ধরনের চার্জ মওকুফ তো দূরের কথা উল্টো যাত্রীদের উপর এয়ারপোর্ট ডেভেলোপমেন্ট ফি, এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি ফি নামে নতুন নতুন চার্জ আরোপ করা হয়েছে। যা দিন শেষে যাত্রীদের ভাড়ার উপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে।

উড়োজাহাজের জন্য জেট ফুয়েল সরবরাহকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন নিয়ন্ত্রিত পদ্মা অয়েল কোম্পানি। সরকারী প্রতিষ্ঠান কিন্তু সর্বদাই লাভ-লস বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ মূল লক্ষ্যই হওয়া উচিত একটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে। সেখানে বিপরীতচিত্রই ফুটে উঠছে প্রতিনিয়ত।

বাংলাদেশের ইতিহাসে জেট ফুয়েলের রেকর্ড মূল্য বর্তমানে বিরাজ করছে। অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য এয়ারলাইন্সকে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য প্রদান করতে হয় ১১১টাকা আর আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য জেট ফুয়েল বাবদ প্রতি লিটারে খরচে করতে হয় ১.০৯ ডলার। এখানেও চরম বৈষম্য বিরাজ করছে। দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে দেশীয় এয়ারলাইন্স এবং ৯৫% অধিক যাত্রীই হচ্ছে বাংলাদেশী নাগরিক। অথচ এই অভ্যন্তরীণ রুটেই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে দেশীয় এয়ারলাইন্স ও বাংলাদেশি নাগরিকদের।

একটি এয়ারলাইন্স এর যেকোনো রুটের অপারেশনাল কস্টের প্রায় ৪০%-৪৬% খরচই বহন করতে হয় জেট ফুয়েল খরচ বাবদ। অথচ এই করোনা মহামারির সময় থেকে এখন পরযন্ত গত ১৯ মাসে প্রায় ১৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে জেট ফুয়েলের মূল্য। ফ্লাইট পরিচালনার জন্য জেট ফুয়েলের জন্য প্রতি লিটারে প্রায় ১১ থেকে ১২ টাকা বেশী দিতে হচ্ছে অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী দেশীয় এয়ারলাইন্সকে।

দেশের বেসরকারি এয়ারলাইন্স ও জাতীয় বিমান সংস্থার মধ্যে বেশ কিছু অসামঞ্জস্যতা দেখা যাচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। রাষ্ট্রীয় সংস্থা হিসেবে যেকোনো খারাপ সময়ে রাষ্ট্র পাশে এসে দাড়ায় অথচ বেসরকারী এয়ারলাইন্স হিসেবে সর্বদাই সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কয়েকবছর আগে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার প্রায় ১৭০০ কোটি টাকা দেনা থেকে দায়মুক্তি দিয়েছিলো অথচ সেই সময়ে ব্যবসায় টিকে থাকতে না পেরে বিভিন্ন বেসরকারী বিমান সংস্থা বন্ধ করে ব্যবসা গুটিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার কাছে পদ্মা অয়েল কোম্পানী প্রায় ২০০০ কোটি টাকা এবং সিভিল এভিয়েশন অথরিটি বিভিন্ন চার্জ বাবদ প্রায় ৪০০০ কোটি টাকার অধিক পাওনা। অথচ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে আবার রাষ্ট্রীয বিমান সংস্থার বিভিন্ন অর্থ বছরে লাভের হিসাব দেখা যায়। এই ধরনের হিসাবে কি লাভ হয় নাকি আয় হয় তা কোনোভাবেই স্পষ্ট হয়ে উঠে না।

উড়োজাহাজের বিভিন্ন রুটের ভাড়ার ব্যাপারে একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, ১৯৯৯ কিংবা ২০০০ সালে জেট ফুয়েলের মূল্য ছিলো প্রতি লিটার প্রায় ২৫ সেন্ট, কিংবা ১৪ টাকা তখন ডলারের এক্সচেঞ্জরেট ছিলো প্রায় ৫০ টাকা, তখন ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের মিনিমান ভাড়া ছিলো প্রায় ৩০০০ টাকা। তৎকালীন সময়ে এ্যারোনোটিক্যাল ও নন-এ্যারোনোটিক্যাল চার্জসহ অন্যান্য চার্জ বর্তমানের তুলনায় এক তৃতীয়াংশ ছিলো আবার বাংলাদেশের পার ক্যাপিটা ইনকাম ছিলো ১০০০ ডলারের কম। অথচ বর্তমানে জেট ফুয়েলের মূল্য প্রায় ১১১টাকা, পার ক্যাপিটা ইনকাম প্রায় ২৭০০ ডলার, এ্যরোনোটিক্যাল ও নন-এ্যরোনোটিক্যাল চার্জসহ অন্যান্য চার্জ পূর্বের তুলনায় প্রায় তিনগুন অথচ ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের মিনিমাম ভাড়া ৪৫০০টাকা। তারপরও একটি কমন বক্তব্য রয়েছে এয়ারলাইন্সগুলোর ভাড়া অনেক বেশী। এয়ারলাইন্সগুলোর আয়ের সাথে যদি খরচের খুব বেশী রকমের তারতম্য দেখা যায় তখন এয়ারলাইন্সগুলো ব্যবসা গুটিয়ে দিতে বাধ্য হয়্। গত ২৫ বছরে বাংলাদেশের এভিয়েশন সেক্টরে বিশেষ করে প্রাইভেট এয়ারলাইন্স এর ৮ থেকে ৯টি এয়ারলাইন্স বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।

নাইন ইলিভেন কিংবা করোনা মহামারির কারনে এভিয়েশন সেক্টরে নানাবিধ খরচের অবতারণা ঘটে। স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন করার কারনে আসন সংখ্যা সীমিতকরণ, রেগুরেটরি অথরিটির নির্দেশনা ইত্যাদি কারনে অপারেশন কস্টের আস্ফালন ঘটে অথচ আয়ের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। আয় আর ব্যয়ের মধ্যে চরম বৈষম্য দেখা দেয়।

এয়ারলাইন্সগুলো সাধারণত কোনো উৎসবকে সামনে রেখে ভাড়ার তারতম্য ঘটায় না। বাংলাদেশে ঈদ-উল ফিতর কিংবা ঈদ উল আযহা কিংবা বিভিন্ন জাতীয় দিবসকে সামনে রেখে যাত্রীদের আকাশ পথ ব্যবহারের আধিক্য দেখা যায়। অনেক যাত্রী সেই সব দিবসকে সামনে রেখে অনেক আগে থেকেই ট্রাভেল প্ল্যান সাজিয়ে টিকেট সংগ্রহ হরে নেয়, ফলে কম ভাড়ায় ট্রাভেল করে থাকে। একই সময়ে ট্রাভেল করার জন্য শেষ সময়ে এসে অনেকে ট্রাভেল করার পরিকল্পনা সাজিয়ে থাকে, ফলে ভাড়ার ক্ষেত্রে তারতম্য ঘটে থাকে। তখনই যাত্রীদের কাছে মনে হয় এয়ারলাইন্সগুলো অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছে। আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, সাধারণত ঈদের সময় একদিকে যাত্রীদের চাপ থাকে, যখন ভাড়া ক্যালকুলেশন করা হয়, তখন সেই বিষয়টিকেও মাথায় রেখে অপারেশন কস্ট বিবেচনায় ভাড়া নির্ধারণ করা হয়।

সারা বছর যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ যাত্রী নিয়ে এয়ারলাইন্সগুলো যাতায়াত করে সেখানে এয়ারলাইন্সগুলো ঈদের সময় বিভিন্ন গন্তব্যে গড় যাত্রী থাকে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ। কারন হিসেবে ওয়ান ওয়ে ট্রাফিক থাকার কারনে গড় যাত্রী কম হয়ে থাকে।  

এয়ারলাইন্স পরিচালনার ব্যয় আর আয়ের বৈষম্যই এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকাই দূরূহ করে তুলছে বাংলাদেশের বেসরকারী বিমান সংস্থাসমূহকে। খরচের খাতগুলো যাতে অযাচিতভাবে এভিয়েশন ব্যবসায় প্রভাব বিস্তার না করতে পারে সেইদিকে কঠোরভাবে দৃষ্টিপাত করা উচিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।     

লেখক: মোঃ কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

;

বিনষ্ট সম্বল ও সীমাহীন কষ্ট বানভাসীদের



প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
বিনষ্ট সম্বল ও সীমাহীন কষ্ট বানভাসীদের

বিনষ্ট সম্বল ও সীমাহীন কষ্ট বানভাসীদের

  • Font increase
  • Font Decrease

এ বছর বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে ইতোমধ্যে পর পর তিনবার বন্যা ও পাহাড়ি ঢল হয়ে গেল। অল্প সময়ের ব্যবধানে এত ঘন ঘন বন্যা মোকাবিলা করার জন্য সেখানকার মানুষ মোটেও প্রস্তুত ছিল না। বিশেষ করে তৃতীয়বারের বন্যার পানির প্রবল স্রোত ও আক্রোশ এত বেশী ছিল যে তা দেখে অনেকে ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে। জীবন বাঁচাতে ডুবে যাওয়া বসতবাড়ি ও সহায়-সম্বল ছেড়ে মানুষ আশ্রয় নিয়েছে ভেলা, নৌকা, ট্রলার, দূরের কোন উঁচু দালান, রাস্তার ধারে অথবা আশ্রয় শিবিরে।

অন্যান্যবার বন্যা হলে দু’তিনদিন পরে পানি নেমে যেত। তখন বন্যার্তরা নিজ নিজ বসতভিটায় ফিরে গিয়ে নতুনভাবে গুছিয়ে নিয়ে জীবন-জীবিকা শুরু করতো। কিন্তু এবারের বন্যার তান্ডব, বিস্তার ও স্থায়ীত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন থাকায় পানি নামতে থাকর গতি খুবই ধীর প্রকৃতির। বন্যা শুরু হবার সাত-দশদিন পরেও কোথাও কোথাও পানি সরে যাবার লক্ষণ দেখা যায়নি। গ্রামাঞ্চলে কারো কারো বসতবাড়ির ঘরের চালের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল প্রবল স্রোত। সবকিছু ভেঙে-চুরে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে অনেকের। পানি নামার পর নিজেদের বাড়িঘরের কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছেন না অনেকে।  প্রলয়ঙ্কারী বন্যার পর এলাকায় ফিরে বিধ্বস্ত ও শূণ্য ভিটা দেখে অনেকে ডুকরে কেঁদে উঠছেন। সামনের দিনগুলোতে কি করবেন, কি খাবেন, সন্তানদের নিয়ে কিভাবে দিনাতিপাত করবেন-সেই চিন্তায় অধীর হয়ে উঠছেন তারা।

বন্যায় কি নষ্ট হয়নি তাদের? নষ্ট হয়ে যাওয়া বস্তভিটা ও সহায় সম্বলের মধ্যে চারদিকে শুধু কষ্ট খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে। সিলেটে ৮০ ভাগ এলাকা এবং সুনামগঞ্জে ৯০ ভাগ এলাকা সাত থেকে ১০ দিন যাবত পানির নিচে ডুবে ছিল। এর ফলে যে চরম ক্ষতি হয়েছে তার সেটা মানুষ আগে মোটেও কল্পনা করেনি। বন্যার পর চারদিকে শুধু হাহাকার শব্দ যেন সেখানকার গৃহহারাদের কানে প্রতিধ্বনিত হয়ে পরিহাস করছে।

বিধ্বস্ত ভিটায় ফিরে প্রথমেই দেখছেন, তাদের খাবার পানির উৎসটি অকেজো বা নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। সুপেয় পানির উৎস টিউবওয়েলটি কাদা, বালুতে ডুবে নষ্ট। যাদের বাড়িতে পাইপলাইনের পানি সরবরাহ ছিল সেগুলোতে বন্যার দূষিত পানি ঢুকে গেছে লিকেজ হয়েছে অথবা ভেঙ্গে গেছে। জলাবদ্ধতায় সেগুলো মেরামত বা নতুন করে সংযোজন করার অবস্থায় নেই অনেক দুর্গত পরিবার। দূরবর্তী স্থান থেকে অতিকষ্টে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে অনেককে। বন্যার আগে অনেকে পাহাড়ি ঝর্ণার পরিষ্কার পানি ব্যবহার করতেন। এখন জমে থাকা বন্যার ময়লা পানি নিত্যসংগী হয়ে পড়েছে। এসব নোংরা পানি দিয়ে দৈনন্দিন কাজকর্ম সারানোর ফলে পেটের অসুখ শুরু হয়েছে অনেক পরিবারে। এভাবে ডায়রীয়া, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, জ¦র, আমাশয় ও কলেরার প্রাদুর্ভাব শুরু হলে সেটা অনেক ভয়ংকর হতে পারে। রিমোট পাহাড়ি এলাকায় খাবার পানির উৎস ঠিকভাবে কাজ না করলে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

এর পরের বড় কষ্ট হলো দ্রুত যোগাযোগ করার উপায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। বিদ্যুৎ ও টেলিফোন সংযোগ চালু হলেও রাস্তাগুলো ভেঙে যাওয়ায় চলাচলের গতি থমকে গেছে উপদ্রুত এলাকায়। মূল রাস্তায় তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি সংস্কারের মাধ্যমে কিছু গর্ত মেরামত করে গাড়ি চলাচল করলেও পাড়া-মহল্লা ও বিশেষ করে গ্রামীণ রাস্তাগুলোর সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে এখনো। সুনামগঞ্জ জেলায় আড়াই হাজার কি.মি: সড়ক নষ্ট হয়ে গেছে। দুইশতাধিক ব্রিজ-কালভার্ট ভেঙে ফুটো হয়ে গেছে বলে সংবাদ হয়েছে।

কিছুদুর পর পর বড় বড় গর্ত, খানা-খন্দক সৃষ্টি হওয়ায় পায়ে চলতে গিয়ে বিড়ম্বনা সৃষ্টি হচ্ছে সুনামগঞ্জের ছাতক, গোয়াইনঘাট, দিরাই, শাল্লা, সিলেটের আখালিয়া, জকিগঞ্জ, নেত্রকোণার কেন্দুয়া, নিকলী এমনকি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি, চিলমারী, জোড়গাছবাজার, উলিপুরের থেতরাই প্রভৃতি এলাকার পল্লী জনপদগুলোতে। এসব এলাকার অটোরিকসাচালকরা পড়েছেন মহা বিপাকে। ভাঙ্গা-চোরা রাস্তার কারণে তাদের দৈনিক আয় কমে যাওয়ায় পরিবারের ভরণ-পোষণ নিয়ে চরম কষ্টে রয়েছেন তারা। জরুরি পণ্য পরিবহন ও ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষতি হচ্ছে।

সিলেট এলাকায় এমনিতেই শাক-সব্জির দাম বেশী। বন্যায় সব্জির আবাদ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এবং রাস্তা নষ্ট থাকায় কোন একান এলাকায় শাক-সব্জির চরম আকাল দেখা দিয়েছে। পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। এক হিসেব মতে, মতে শুধু সিলেট অঞ্চলে আট কোটি টাকার মাছের পোনা ভেসে গেছে। আমন ধানের বীজতলা ও চারা নষ্ট হওয়ায় এবার আমন ধানের ফলন হ্রাস পাবার ব্যাপক আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বন্যার পানি সরে যাবার সাথে সাথে দুর্গম পাহড়ি ও পল্লী অঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকরা কাজের উপায় হারিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছেন। তাদের অনেকের সামান্য জমি। সেখানে বন্যায় পলিমাটি পড়ার নামে জমেছে বালুর পাহাড়। যেসব প্রান্তিক কৃষক  ও বেকার যুবকরা ঋণের টাকায় অন্যের পুকুর লিজ নিয়েছেন অথবা জমিতে বর্গা আবাদ শুরু করেছেন তারা ঋণের কিস্তি শোধ দেয়ার সময় বিপদের আশঙ্কা করছেন। ব্যাংকের ঋণ তারা শোধ দিবেন কীভাবে? এ নিয়ে তাদের চরম মানসিক যাতনা শুরু হয়েছে।

বসতভিটার সাথে যাদের যাদের ঘর-বড়ি কিছু অবশিষ্ট আছে তাদের আসবাবপত্র, তৈজষপত্র ভিজে নষ্ট হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশী। উপদ্রুত এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এসব এলাকায় এবছর এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠান নিয়ে এখনো চরম বিপাকে রয়েছেন কর্তৃপক্ষ।

দেশের পাহাড়ের পাদদেশে পুন:পুন: বন্যায় মানুষের মন ভেঙ্গে গেছে। বিশেষ করে ভয়ংকর আগ্রাসী বন্যার রূপ তাদের কাছে একবারেই অনাকাঙ্খিত ছিল। তাই এটা মোকাবেলা করতে গিয়ে তারা চরম অসহায় ও ভীত হয়ে পড়েছে। এবারের বন্যায় আমাদের দেশে  জুন ২৬, ২০২২ পর্যন্ত ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ভারতের আসামে মৃত্যু হয়েছে ১৬৭ জনের। সেখানে রেড এলার্ট জারি করা হয়েছিল। আসামে বন্যার পরভয়াবহ জলাবদ্ধতা শুরু হয়েছে। আমাদের দেশে ভয়ের আরেকটি কারণ হলো- চেরাপুঞ্জিতে এবছর আরো বেশী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাষ রয়েছে। সামনে ঘোর বর্ষাকাল। সেসময় চেরাপুঞ্জিতে আবারো অতিবৃষ্টি হলে সিলেটে ভরা বর্ষা মৌসুমে আবারো পাহাড়ি ঢল ও প্রবল বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য আমাদের যথাযথ প্রস্তুতি কই?

দুর্নীতির পর দুর্যোগ আমাদের সব অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্থ করে তোলে। প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের আয় বৈষম্য সৃষ্টি করে এবং ধনী-দরিদ্রের মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান তৈরিতে প্রদান ভূমিকা রাখে। দুর্যোগের পর ত্রাণ চুরির মহোৎসব আমাদের সামাজিক ও আর্থিক বৈষম্য সৃষ্টির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। তাই এদিকটিতে সতর্ক হওয়া জরুরি।

ঘরহারা বন্যার্তদেরকে ত্রাণ নয়- সেনাবাহিনীর মাধ্যমে গৃহনির্মাণ সামগ্রী কিনে অথবা ঘর তুলে দিন। ফসলহারা প্রান্তিক কৃষকদেরকে বাঁচাতে ঋণ মওকুফ করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দান করুন। একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী বিনামূল্যে চিকিৎসা, বই-পুস্তক, পুষ্টিকর শিশুখাদ্য প্রদান করুন। উপদ্রুত এলাকায় বন্যার পানি না সরতেই দেশে করোনার চতুর্থ ধাপের সংক্রমণ শুরু হয়েছে। ডায়রীয়া, কলেরা ও অন্যান্য অসুখের জন্য জরুরি চিকিৎসা জোরদার করার পাশাপাশি করোনার ওমিক্রণ ধরণের সংক্রমণ ঠেকাতে আশু তৎপরতা জোরদার করুন। আমাদের আনন্দের মাঝে সম্প্রতি সম্বলহারা ও সীমাহীন কষ্টের মধ্যে থাকা বানভাসীরা কেমন আছে তা একটু স্মরণ করা উচিত। এই দুঃসময়ে তাদের জন্য প্রাণ খুলে সাহায্যের হাত প্রসারিত করা সবার নৈতিক দায়িত্ব বটে।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

 

;