লোডশেডিংয়ে লাভ না ক্ষতি?



সজীব ওয়াফি
সজীব ওয়াফি

সজীব ওয়াফি

  • Font increase
  • Font Decrease

সারাদেশে নিয়ম করে লোডশেডিং হচ্ছে। রাজধানীর ভেতরেই কোথাও কোথাও তিন ঘণ্টা, অভিজাত এলাকাগুলোতে এক ঘণ্টা। আশেপাশের এলাকাগুলো এবং দূরের শহরের অবস্থা আরও খারাপ। উপজেলার দিকে, গ্রাম গঞ্জে বিদ্যুৎ আসে না বললেই চলে। সরকারের তরফ থেকে বোঝানো হয়েছে ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য অর্থনৈতিক শঙ্কার সতর্কতায় এই আগাম সিদ্ধান্ত। মুদ্রাস্ফীতি, ডলারের রিজার্ভ এবং জ্বালানি সংকটের কারণ হিসেবে দেখানো হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এই বিতর্কতে পরে আসি, তার আগে বোঝা উচিত বর্তমান লোডশেডিংয়ে আমাদের লাভ না ক্ষতি? ক্ষতির পাল্লা যদি ভারী হয়, তবে যে মহাবিপদ আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে এটা নিঃসন্দেহে।

কিছুদিন আগে পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে শতভাগ বিদ্যুতায়িত ঘোষণা করা হলো। তারও আগে সংসদ সদস্যসহ দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ জানালেন বাংলাদেশ এখন বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং উদ্বৃত্তের দেশ। এটা খুবই আশা-আকাঙ্ক্ষার সংবাদ। কেননা যারা গত বিএনপি-জামায়াতের শাসনামল দেখেছে, লোডশেডিং কি সেটা হাড়ে হাড়ে জানে। কিন্তু ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ফূর্তি করা উদ্বৃত্তের দেশে হঠাৎ সরকারের উপরস্থ মহল থেকে লোডশেডিংয়ের নির্দেশ আসলো কেন! এ কেমন মিথ্যামিথ্যি ফূর্তি করা তাহলে! বিদ্যুতের উদ্বৃত্ত বিষয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে একজন সংসদ সদস্য বলেছিলেন বিদ্যুৎ কারো লাগবে না, উদ্বৃত্ত জিনিস ফেরিওয়ালারা খদ্দেরের কাছে বিক্রির জন্য ঘুরে বেড়াবেন, ডাক হাঁকবেন বিদ্যুৎ লাগবে নাকি বিদ্যুৎ? হঠাৎ করে এতো এতো বিদ্যুৎ তাহলে গেল কই? মিনিটে মিনিটে জনগণের টাকা খরচ হওয়া সংসদে দাঁড়িয়ে দেওয়া এমপিদের তথ্যের এই হলো অবস্থা! বাস্তবতার নিরিখে মোসাহেবি করার রঙ্গশালা বললেও অত্যুক্তি হয় না।

বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২২ হাজার ৩৪৮ মেগাওয়াট। তবে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ উৎপাদন ছিলো ১৪ হাজার ৭৮৪ মেগাওয়াট। বাকি প্রায় সাড়ে সাত হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা অব্যবহৃত। এদের থেকে বিদ্যুৎ না নিলেও গুনতে হয় ক্যাপাসিটি চার্জ। এভাবে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে গত তিন বছরে ৫৪ হাজার কোটি টাকা গচ্চা দিয়েছে সরকারপক্ষ। যার প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা গেছে মালিকদের পকেটে। বিদ্যুৎ বিভাগে পিডিবির পাঠানো এই হলো প্রতিবেদন। প্রশ্ন দাঁড়ালো যে সকল মালিকদের ক্যাপাসিটি চার্জের নামে জনগণের ট্যাক্সের পয়সা লুট করে দেওয়া হলো এই মালিকেরা কারা? এরা সরকার বা রাষ্ট্রের কি হয়? যতদূর জানা আছে যুদ্ধবিধ্বস্ত বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটলে জরুরি অবস্থা সামাল দেওয়ার জন্য তাৎক্ষণিক কুইক রেন্টালে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রয়োজন পরে। বাংলাদেশ তো যুদ্ধবিধ্বস্ত নয়; কিন্তু অকারণে দীর্ঘদিন ধরে রেন্টাল বা কুইক রেন্টালেই সরকারের আগ্রহ বেশি কেন? নতুন করে যাকে আবার বৈধতা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এর অর্থ কি?

দেশের জ্বালানি পণ্যের বিরাট অংশই আমদানি নির্ভর। জ্বালানি তেল, তরল প্রকৃতিক গ্যাস, পেট্রোলিয়াম পুরোটাই অন্য দেশ থেকে কিনতে হয়। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যার ধ্বস নেমেছে। অন্যদিকে ডলার সংকটে জ্বালানি তেল আমদানিতে ঋণপত্র খুলতেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর গড়িমসি। সহজে এই দূরবস্থা যে কাটছে না সেটা স্বীকার করেছে দায়িত্বে থাকা স্বয়ং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বিদ্যুৎ উৎপাদন জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বিপর্যয়ে মুখোমুখি হয়েছে বিদ্যুৎ খাত। জ্বালানি খাতের সংকটের জন্য সরকার থেকে ঘোষণা দিয়ে সতর্কতার সঙ্গে নেওয়া হয়েছে বেশকিছু পদক্ষেপ। দেওয়া হয়েছে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং, আছে সরকারি-বেসরকারি বৈঠক ভার্চুয়ালি করার সিদ্ধান্ত, পেট্রোল পাম্প বন্ধ থাকবে সপ্তাহে একদিন। রাত ৮টার পর দোকানপাট-শপিংমল বন্ধ রাখার নির্দেশ। চিন্তা করা হচ্ছে সরকারি-বেসরকারি অফিস এক থেকে দুই ঘণ্টা কমিয়ে আনার। যদিও এখন পর্যন্ত এ সকল পদক্ষেপ কাগুজে তলবনামা। কেননা বিদ্যুৎ অধিকাংশ সময়েই থাকে না। তবে আপাতত এই লোডশেডিং কাগজে-কলমে এক ঘণ্টা হলেও ভবিষ্যতে যে বাড়বে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে সেই শঙ্কা এখনই আঁচ করা যায়। এর সরাসরি প্রভাব যে উৎপাদন খাতে পড়ছে, অর্থনীতিতে পড়ছে এটা বাস্তব।

জ্বালানি সংকটের পরিণতিতে প্রবেশের আগে আমাদের পায়ের নিচের গ্যাস সম্পর্কে একটু ঘুরে আসা যাক। গ্যাস এবং ডিজেল দিয়ে দেশের অধিকাংশ প্লান্টে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। আমাদের আছে বেশকিছু সংখ্যক গ্যাসক্ষেত্র। নতুন গ্যাস সন্ধানের সম্ভাবনাও আছে, আছে সামুদ্রিক ব্লকের নানা সম্ভাবনা। কিন্তু আমরা সেগুলোকে কখনোই কাজে লাগানোর পথে যাইনি। দেশীয় মালিকানায় স্থলভাগ এবং সমুদ্রভাগের গ্যাস উত্তোলন করা আমাদের চিন্তার বাইরে। উত্তোলন করার মতো দক্ষ জনশক্তি প্রস্তকরণেও যাচ্ছেতাই অবহেলা। বরং ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সেগুলো অন্য রাষ্ট্রের কাছে প্রতিনিয়ত বিক্রি হয়, গলা টিপে ধরা হয় নতুন নতুন সম্ভাবনার। আবার মাথার উপর বছরের অধিকাংশ সময় সূর্যের প্রচন্ড তাপ। সারা পৃথিবী যেখানে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ছুটেছে, সেখানে আমরাই কেবল বিদেশ নির্ভর হয়েছি। আমরা এমনভাবে আমাদের সমস্ত সম্ভাবনাময় খাত বিকিয়ে দিয়েছি যে পঙ্গু হওয়ার দশা। আমরা দ্রুত ধনী রাষ্ট্র হওয়ার প্রতিযোগিতা করছি অন্যের ওপর নির্ভর করে! যে দেশে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ চালনা করার মতো জ্বালানি অথবা কাঁচামাল নিশ্চিত না করে, নির্ভর করতে অন্যদের ওপর; সে দেশে ব্যক্তিগত গাড়ির রমরমা বাণিজ্য। আমাদের হুঁশ নেই ভবিষ্যতে জ্বালানির টান লাগতে পারে। এই গাড়িগুলো চলবে কিভাবে সেই পরিকল্পনা অনুপস্থিত। পরিবেশ উপযোগী বাড়িঘর তৈরিতে উৎসাহিত না করে সুবিধা দেওয়া হলো এয়ার কন্ডিশনার আমদানিতে। আমদানি সুবিধা বন্ধ না করে জনগণকে এয়ার কন্ডিশন বন্ধ করতে বলা তামাশার সামিল।

জ্বালানি খাতে বিশেষ করে গ্যাস বিদ্যুতের টান তৈরি হলে তার বিরূপ প্রভাব গিয়ে পরে উৎপাদনে। জটিলতা তৈরি হবে কৃষকের সেচ কাজে। পরিবহন খাতের ৯০ শতাংশ যানবাহন জ্বালানি নির্ভর হওয়ায় তৈরি হবে নৈরাজ্য। গ্যাসের অভাবে ইতিমধ্যে সারকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। একটার পর একটা দুঃসংবাদ আসছে। একেইভাবে উৎপাদনে যে নিশ্চিত প্রভাব পরতে যাচ্ছে তা তো সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তেই স্পষ্ট। উৎপাদন কমলে সেই দ্রব্যের চাহিদা বাড়বে, চাহিদা তৈরি হলে বাড়বে দ্রব্যমূল্য। উৎপাদন ব্যহত হলে রফতানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন তলানিতে ঠেকা অর্থনীতির হিসাব। লোডশেডিং এর কারণে ঢাকার আশেপাশে, জেলা শহর বা গঞ্জে ব্যক্তি উদ্যোগে যে সকল শিল্প আছে, ছোট পরিসরে কারখানা আছে সেগুলোর উৎপাদন এতোটাই ব্যহত হবে জাতীয় পর্যায়ে যার নেতিবাচক ধকল অবশ্যাম্ভাবী। সুতরাং পরিস্থিতি এমন দাঁড়াবে যে সাশ্রয়ের চেয়ে উৎপাদনের অর্থনৈতিক হিসাবে লোকসান বেশি হবে। অর্থাৎ একদিকে সাশ্রয় করতে গিয়ে অর্থনীতির নাজেহাল চিত্র। টাকার মান পরে গিয়ে মুদ্রাস্ফীতির সমস্যা তো আমরা বর্তমানেই টের পাচ্ছি, এটা আরো বাড়বে। দ্রব্যমূল্যের এই নাভিশ্বাস আরো কি পর্যায়ে উঠবে সেটা অকল্পনীয়। উৎপাদন সংকট মোকাবিলায় সকল পণ্যের আমদানি চাহিদা বাড়বে; ডলার সংকটে তৈরি হবে রাষ্ট্রীয় দুর্গতি! ক্রমে ক্রমেই অগ্রসরমান হবে নিম্নবিত্ত গরিব খেটে খাওয়া মানুষের মৃত্যুর উপত্যকায়!

দেশে বড় বড় বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র যার অন্যতম। রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র এখনো চালু হয়নি। পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলো এ বছরের প্রথমভাগে। যার উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। পাশাপাশি এ বছরের শেষ নাগাদ চালু হতে পারে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র। অপেক্ষমাণ আছে মাতারবাড়ীসহ আরও কয়েকটি। রূপপুর বাদে এই সকল বিদ্যুৎ কেন্দ্র কয়লা নির্ভর হলেও কয়লা তুলতে আমাদের পর্যাপ্ত প্রযুক্তি জ্ঞান নেই। ফলতঃ ভারত থেকেই আমাদের কয়লা আমদানি করতে হবে। সারা পৃথিবী যখন পরিবেশ বিধ্বংসী কয়লা এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সরে আসছে, খোদ ভারত নিজেদের কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দিচ্ছে তখন আমারা একটার পর একটা কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র করে যাচ্ছি, পারমাণবিক শক্তিতে জোর দিয়েছি। পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে পারমাণবিক ও কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিরোধী আন্দোলন দেশজুড়ে সারা ফেলেছিলো। সেদিক থেকে ঐ সকল বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করতে বর্তমান লোডশেডিং জনসমর্থন পাওয়ারও কার্যকরী কৌশল। নিজের কোমর ভেঙে আমরা কেবল পর নির্ভরতাই শিখলাম!

যাহোক জ্বালানি পণ্যের এই জটিলতা কাটানোর তবে উপায় কী? সাময়িক সময়ের জন্য বিপর্যয় ঠেকাতে আমরা কি করতে পারি? এক কথায় ব্যক্তিকে অপ্রয়োজনে বিদ্যুৎ বা জ্বালানি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। মোটাদাগে বললে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্য করতে হবে। কেননা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা জনসাধারণ বিদ্যুৎ বিল নিজের পকেট থেকে পরিশোধ করে। ফলে তাদের বিদ্যুৎ অপচয়ের প্রবণতা কম, অপচয় যা হওয়ার তা কেবল সরকারি নানান কিসিমের প্রতিষ্ঠানে হয়। অফিস এবং আবাসিকতায় সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ করতে হবে এয়ার কন্ডিশনার। যে সকল গ্রাহক এই বাধ্যবাধকতা মানবেন না, কঠোর হস্তক্ষেপ করার জন্য শুধুমাত্র তাদের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করতে কার্যকরী ব্যবস্থা জরুরি। বাঙালির দেশে ইংরেজি কায়দার স্যুট-টাইটা খুলে ফেলুন, দেখবেন অফিসিয়াল এয়ার কন্ডিশনের প্রয়োজনীয়তার অর্ধেক সমস্যা সমাধান। উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বা শিল্প ও বাণিজ্যিক অঞ্চলে নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ চালু রাখতে গ্রাম এবং আবাসিক এলাকায় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রাখা যেতে পারে, কিন্তু এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং দেওয়া সমীচীন হবে না। এতে বরঞ্চ সবকিছু বুমেরাং হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। গুরুত্বপূর্ণ ল্যাম্পপোস্ট ব্যতিত সারাদেশের সকল আলোকসজ্জা বন্ধকরণ, বিশ্ববিদ্যালয় হলগুলোতে রান্না করার বৈদ্যুতিক হিটার তুলে নেওয়া; এমনকি ব্যক্তিগত গাড়িতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে পাবলিক পরিবহন ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা সংকটকালীন সময়ের যথোপযুক্ত পদক্ষেপ। গণপরিবহনে জোড় বিজোড় নম্বর অনুযায়ী গাড়ির ব্যবহার জনগণের জন্য অতিরিক্ত ভোগান্তি তৈরি করবে। তাতে জনরোষ বাড়বে বৈ কমবে না। সুতরাং এই সকল আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে দূরে থাকাই বাঞ্ছনীয়। বিদ্যুতের মাধ্যমে ব্যাটারিচালিত ভ্যান-রিকশা কিছুদিনের জন্য নিয়ন্ত্রণ করার উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা রাখতে হবে। কুইক রেন্টাল বন্ধ করে সৌরশক্তি প্রযুক্তির প্রাধান্য দিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করতে প্লান্ট নির্মানের দায়িত্ব রাষ্ট্রীয়।

ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ না হলেও রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি-ভুলনীতিতে বর্তমান সংকটের মুখোমুখি আমরা হতাম, তবে সেটা একটু দেরিতে। ইউরোপের যুদ্ধ সংকটের মাত্রা তরান্বিত করেছে মাত্র। বিগত দিনে রাষ্ট্রীয় এবং ব্যক্তি পর্যায়ে ক্রমেই গাছপালা-বনের বিনাশ ঘটছে। জলবায়ুর পরিবর্তন, উৎপাদন এবং সংরক্ষণে নানা আধুনিক যন্ত্রপাতি চলানায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাবে। অথচ আমাদের কোন স্থায়ী পরিকল্পনা না থাকা দুঃখজনক! করোনা মহামারি আমাদের শিখিয়েছে কিভাবে সামষ্টিক লড়াই করে টিকে থাকতে হয়। জ্বালানির মাধ্যমে অর্থনীতির সম্ভাব্য বিপর্যয়ে প্রবেশ মোকাবিলার এই ক্ষেত্রেও সে পথেই হাঁটা বাঞ্ছনীয়। যে উন্নয়ন পরিকল্পনা দূরদর্শিতার অভাবে হাওয়া হয়ে যায়, জনগণ সেই উন্নয়ন কখনোই চায়নি। রাজনৈতিক চালবাজি না করে দূরদর্শী পরিকল্পনার কার্যক্রম বাস্তবায়ন সময়ের আকাঙ্ক্ষা। নতুবা গণতন্ত্রহীন সিদ্ধান্তে আমরা সমূহ বিপদের সম্মুখীন। ভুলনীতির খেসারত হিসেবে জনগণের হাতে সরকার হয়তো হ্যারিকেন ধরিয়ে দিলো। হ্যারিকেন হাতের এ পথ বন্ধুর, লোকসানের। মাস দু’এক অতিক্রম করলেই যা স্পষ্ট হবে। এবার দেখা যাক হ্যারিকেন হাতে জনগণ কতটুকু সামনে আগাতে পারে।

লেখক ও কলামিস্ট

স্মরণেরই নয় কেবল, মুজিব চর্চারও



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' ও 'কারাগারের রোজনামচা' বইগুলোর পাঠকমাত্রই জানে তার জবানিতে জীবনের কিয়দংশ। বঙ্গবন্ধু লিখেছিলেন বলে কিছুটা গ্রন্থিত, যেখানে ছিল এক সৎ লেখকের প্রকাশ। বাকিদের যারা লিখেছেন তাদের কেউ কেউ সত্য বয়ানের চেষ্টা করেছেন, অনেকেই অন্য কিছু। এই অন্যকিছুর চেষ্টা অথবা অপচেষ্টায় ছিলেন তারা নিজেদের সৎ ইতিহাসকথক অথবা লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি, অন্তত এই ক্ষেত্রে। সততাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়াদের যথারীতি আক্রোশ বিদ্যমান, যা মূলত 'পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ কেন' শীর্ষক প্রশ্ন থেকেই উদ্ভূত।

১৯২০ থেকে ১৯৭৫; বঙ্গবন্ধু বেঁচেছিলেন ৫৪ বছর ৫ মাস। মাত্র সাড়ে ৫৪ বছরের জীবনে কেবল জেলখানাতেই কেটেছে তার ৪ হাজার ৬৮২ দিন। ৫৪ বছর দীর্ঘজীবন নয়, কিন্তু এরমধ্যে পৌনে তেরো বছরের বেশি সময় কারাগারে কাটিয়ে দেওয়া ব্যক্তি ছিলেন তিনি। এ সময়ের মধ্যে ছিল ব্রিটিশ শাসনে সাত দিন, বাকিটা পাকিস্তানের শোষণের সময়। কারাগারে যাওয়ার কারণ বাঙালির স্বাধিকার, স্বাধীনতা আর মুক্তি। পরাধীনতার নাগপাশ থেকে দেশকে মুক্ত করে দেওয়ার অদম্য বাসনা ছিল তার, তাই জীবনের সোনালী সময়ের সবটুকুই বিসর্জন দিয়েছিলেন তিনি দেশের জন্যে।

শেখ মুজিব জন্মেছিলেন ব্রিটিশ শোষণের কালে। তার কারাজীবনের প্রথম বছরটা ছিল ১৯৩৮, যখন তিনি স্কুলছাত্র। 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' গ্রন্থে উল্লিখিত আছে কারাগমনের সে ইতিহাস। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সে ঘটনার বয়ান আছে সে বইয়ে। কারাগমনের আগ মুহূর্তে যখন তার বাড়িতে পুলিশ যায় তখন পুলিশের উপস্থিতি তথ্য জেনেও পালিয়ে যাননি। গ্রেফতারি পরোয়ানা নিজে দেখে পুলিশের সঙ্গে গিয়েছিলেন তিনি। গ্রেফতার মুজিব পুলিশ কর্মকর্তার ধমকানো সত্ত্বেও ভড়কে না গিয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন।

'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' গ্রন্থে বিষয়টি এসেছে এভাবে--"...কোর্ট দারোগার রুমের পাশেই কোর্ট হাজত। আমাকে দেখে বলেন, 'মজিবর খুব ভয়ানক ছেলে। ছোরা মেরেছিল রমাপদকে। কিছুতেই জামিন দেওয়া যেতে পারে না'। আমি বললাম, 'বাজে কথা বলবেন না, ভালো হবে না'। যারা দারোগা সাহেবের সামনে বসেছিলেন, তাদের বললেন, 'দেখ ছেলের সাহস'। আমাকে অন্য সকলে কথা বলতে নিষেধ করল। পরে শুনলাম, আমার নামে এজাহার দিয়েছে এই কথা বলে যে, আমি ছোরা দিয়ে হত্যা করার জন্য আঘাত করেছি। তার অবস্থা ভয়ানক খারাপ, হাসপাতালে ভর্তি হয়ে আছে। প্রকৃতপক্ষে রমাপদের সাথে আমার মারামারি হয় একটা লাঠি দিয়ে, ও আমাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করতে চেষ্টা করলে আমিও লাঠি দিয়ে প্রত্যাঘাত করি। যার জন্য ওর মাথা ফেটে যায়। [অসমাপ্ত আত্মজীবনী] এই ঘটনা বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ও শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর গোপালগঞ্জ সফরকে কেন্দ্র করে যেখানে কংগ্রেস লোকজন বাধা দেওয়ার চেষ্টায় ছিল, এবং শেখ মুজিব ছিলেন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের স্বেচ্ছাসেবকদের সংগঠক। মুজিবের নেতৃত্বগুণের প্রকাশ সেই স্কুলজীবন থেকেই, এবং সে নেতৃত্বগুণের কারণে অন্যায় না করা স্বত্ত্বেও তাকে জেলেও যেতে হয়েছিল। গ্রেফতারের পর তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগকে সরাসরি 'না' করেছেন ব্রিটিশদের পোশাকি বাহিনীকে ভয় না করেই।

পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের জন্ম দেওয়ার প্রক্রিয়ায় তিনি জেলে গেছেন ১৮ বার। তার মধ্যে দুই-দুইবার হাজারের বেশি দিন টানা জেলখানায় কাটিয়েছেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল’ জারির পর বঙ্গবন্ধুকে একটানা ১১৫৩ দিন কারাগারে আটকে রাখা হয়, বছরের হিসাবে যা তিন বছরেরও বেশি। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ টানা ১০২১ দিন কারাগারে কাটান তিনি। এছাড়াও আছে টানা একবছর, দুইবছরসহ নানা মেয়াদের কারাবাস।

মাত্র ৫৪ বছরের জীবনের এক-চতুর্থাংশ সময় যদি কারো কারাগারে কাটে তবে বাকি থাকে কী? এই প্রায় সংক্ষিপ্ত জীবনের মাঝেও আছে আবার শৈশব-কৈশোরকাল; পরিণত বয়সের যেটুকু বাকি থাকে সেখানে কি স্মরণীয়-বরণীয় হওয়ার সুযোগ থাকে? স্বাভাবিক কিছু হলে উত্তর হয়তো কঠিন, কিন্তু শেখ মুজিব বলেই সম্ভব হয়েছে তা! হিমালয়সম ব্যক্তিত্ব, অদম্য নেতৃত্বগুণে প্রতিষ্ঠা করেছেন একটা জাতিরাষ্ট্র। পেয়েছেন অমরত্ব।

মানুষের জন্যে জীবন-যৌবন উৎসর্গ করে দিয়ে আত্মদানের অমর ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তিনি। বারবার কারাগারে গেছেন, নির্যাতন সয়েছেন, পরিবারের সদস্যদের ঝুঁকিতে রেখে দেশের মানুষের স্বাধিকার, স্বাধীনতা আর মুক্তির কথা বলে গেছেন। মৃত্যুর মুখে পড়েছেন দুইবার, তবু লক্ষ্যচ্যুত হননি। 'দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ' ছিল তার আজন্ম পণ, আর সেই পণ পূরণ করতে পেরেছিলেন তিনি।

আত্মোৎসর্গের ইতিহাস রচনা করলেও তিনি বিশ্বাসঘাতকেরা গুলি চালিয়েছে তার বুকে। মুজিবের ত্যাগে-ঘামে জন্ম দেওয়া বাংলাদেশ থেকে তাকে ও তার পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছে তারা। পঁচাত্তরের পনেরো আগস্ট কিছু বিপথগামী সেনা অফিসার শেখ মুজিব নামের বাঙালির মহানায়ককে গুলিতে হত্যা করে। হত্যা করে ঢাকায় থাকা তার পরিবারের সকল সদস্যকে।

সাড়ে চার হাজারেরও বেশিদিন কারাগারে রেখে, দুই-দুইবার হত্যার প্রস্তুতি নিয়েও যাকে হত্যা করতে পারেনি পাকিস্তানিরা সেই মুজিবকে, সেই বঙ্গবন্ধুকে, বাঙালি জাতির পিতাকে তারই গড়া বাংলাদেশে হত্যা করেছে বাংলাদেশবিরোধী শ্বাপদেরা; এরচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা, এরচেয়ে বড় কলঙ্ক আর কী হতে পারে! বাঙালির জীবনে পঁচাত্তরের পনেরো আগস্ট কলঙ্কের দিন, শোকের দিন, লজ্জায় অবনত-মস্তকের দিন।

বঙ্গবন্ধুর শারীরিক প্রস্থানের সাতচল্লিশ পেরিয়েছে। তবে তিনি আছেন এখনও বাঙালির হৃদয়ে, বাংলাদেশের মানচিত্রে। তার দৈহিক মৃত্যুতে আদর্শের মৃত্যু হয়নি। পনেরো আগস্ট দিনটি কেবল স্মরণের নয়, দিনটি মুজিব-চর্চার শপথের দিনও।

সাংবাদিক, কলাম লেখক

;

টাকা জালকারী চক্রকে ঠেকান



প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

কিছুদিন আগে একজন আইনজীবীর সহকারী জাল টাকা সরবরাহের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি জালটাকা তৈরির কাজেও নেমে পড়েছিলেন। জানা গেছে, তিনি একজন জাল টাকার আসামির জামিনের জন্য কাজ করছিলেন। পরে সেই আসামির নিকট থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেই জাল টাকা তৈরির কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন।

সম্প্রতি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও ব্যাংকার সমন্বয়ে একদল জাল টাকা তৈরিকারী চক্র গোয়েন্দা পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা স্বীকারোক্তি দিয়েছেন -তিনি প্রতিমাসে ৬০ লাখ জাল টাকা বিক্রি করার জন্য পরিকল্পনা করেছিলেন। তাদের জাল টাকা তৈরি ও সরবরাহ কাজে এক বড় নেটওয়ার্ক রয়েছে। এ কাজে সমাজের হোমরা-চোমড়া, মাদক ব্যবসায়ী, দামি মানুষ হিসেবে পরিচিত অথচ ভয়ংকর অপরাধী জড়িত রয়েছেন। কিছু মহিলা খুব সন্তর্পণে তাদের সঙ্গে জাল টাকা ছড়িয়ে দেবার কাজ করে থাকে। এ কাজে পুলিশ সদস্য, ব্যাংক কর্মকর্তা (প্রথম আলো ২৮.০৭.২০২২) ও সম্ভ্রান্ত ঘরের মহিলারা জড়িত থাকায় সন্দেহ করার অবকাশ খুব কম থাকে। আর এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে জাল টাকা তৈরি সরবরাহের কাজগুলো খুব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে।

একসময় সাদা কাগজে জাল টাকা ছাপানো হতো। এখন ‘ওয়াশ নোট’ বেশি প্রচলিত। কারণ ওয়াশ নোটে সাইজ নিয়ে সমস্যা হয় না এবং সুতা, জলছাপ ইত্যাদি নতুন করে দিতে হয় না। এছাড়া ওয়াশ নোটের মূল কাগজ শুকানো হলে শক্তই থেকে যায়। সাধারণত: একশত টাকার নোটকে ঘষে ধুয়ে তার ওপর কালার প্রিন্টে পাঁচশত টাকার ছাপ দিয়ে এই নকল ওয়াস নোট তৈরি করা হয়।

কোন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবকে সামনে রেখে জাল টাকা তৈরি ও বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার মহোৎসব শুরু হয়। ঈদের মার্কেট, পশুর হাট, স্টেডিয়ামে খেলা, পাইকারি বাজার ইত্যাদিতে নকল টাকা ছড়িয়ে দেওয়া হয। ভীড়ের সময় তৎপরতা অবলম্বন করা এই চক্রের লক্ষ্য। এসময় তারা একজোট হয়ে ভীড় ঠেলে ব্যস্ত মানুষের মধ্যে আরও বেশি তাড়াহুড়ো করে সমস্যা তৈরি করে ফেলে। এভাবে সময়ের কৌশলকে কাজে লাগিয়ে জাল টাকা প্রদান করে দ্রুত সটকে পড়ে। তারা একটি আসল টাকার বান্ডিলের মধ্যে অনেকগুলো নকল টাকা ঢুকিয়ে মক্কেলকে বিভ্রান্ত করে ফেলে। কেউ প্রতিবাদ করলে চক্রের সদস্যরা উপযাচক হয়ে সেটা মিটমাট করার উদ্যোগ নেয় এবং অবস্থা বেগতিক হলে দ্রুত সটকে পড়ে।

টাকা ছাড়াও রুপি, ডলার ও নানা বিদেশি নোট জাল করা হয়ে থাকে। সীমান্ত জেলা ও সীমান্ত হাটে এগুলোর ডিলার থাকে। সেখানে জাল টাকার চলাচল বেশি। জাল টাকা তৈরির উপাদানগুলো খুবই সহজলভ্য। একটি ল্যপটপ বা সাধারণ কম্পিউটার, রঙিন প্রিন্টার, লেমিনেটেড মেশিন, টাকা তৈরির ডাইস, ফয়েল পেপার, কোটিং গাম, সিল্কি কাগজ, স্ক্যানার, সুতা ইত্যাদি জাল নোট তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

জাল টাকা যত অভিজ্ঞ কারিগর দ্বারা তৈরি করা হোন না কেন সেগুলোতে নানা ধরনের খুঁত থাকে। তাই একটু চেষ্টা করলেই আসল ও নকল টাকার মধ্যে পার্থক্য সূচিত করা যায়। জাল নোট চেনার বড় উপায় হলো- এগুলা অসমতল ও এর রং দ্রুত পরিবর্তন হয়। নিরাপত্তা সুতা মোটা। কয়েকবার হাত বদল করলে নিরাপত্তা সুতা বেশি স্পষ্ট দেখা যায়। ওয়াশ নোট ছাড়া অন্যান্য নকল টাকায় এর জলছাপ, অন্ধদের জন্য বিন্দু ও সুইপ ইত্যাদি থাকে না। বাজারের কেনা কাগজের তৈরি জাল টাকা নরম হয়। এসব টাকায় ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে দেখলে ক্ষুদ্র লুকানো লেখা, নিরাপত্তা সুতা, ছাপানো সীমানায় হেরফের দেখা যায়। জাল টাকা কেন তৈরি হয়? এটা একটা জটিল প্রশ্ন। সমাজে নানা অবক্ষয়ের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তরুণদের বেকারত্ব, অভাব, হতাশা ইত্যাদিকে কাজে লাগিয়ে তাদেরকে দিয়ে অনৈতিক কাজ করিয়ে থাকে এক শ্রেণির অবৈধভাবে বিত্তশালী হওয়া মানুষ। যারা মাদক ব্যবসার পাশাপাশি সব ধরনের অনৈতিক কাজকে বিকশিত করে তোলে। আমাদের দেশে এই শ্রেণির মানুষের সংখ্য কম নয়।

তারা অবৈধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দিনরাত অপতৎপরতার মাধ্যমে নিত্যনতুন ঘৃণ্য মেকানিজম নিয়ে ওৎ পেতে থাকে। এরা পর্নোগ্রাফি, দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি, কৃত্রিম পণ্যসংকট তৈরি করে ও মাদক ব্যবসাকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। তাদের অবৈধ মাদক ব্যবসায় আঘাত আসলেই সমাজে অন্যান্য অস্থিরতা সৃষ্টি হয়ে যায়। এগুলোর পাশাপাশি তাদের সীমাহীন লোভ-লালসার ব্যপ্তি সকল অপরাধকে নির্দিষ্ট চক্রের মাধ্যমে উসকে দেয়। এই উসকানির মধ্যে ধরা পড়ে যান বিভিন্ন পেশার সরকারি সেবাদানকারী কর্মচারী ও কর্মকর্তাবৃন্দ। যার কয়েকটি উদাহরণ এই প্রবন্ধের প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে।

এর প্রধান কারণ হলো- আমাদের সমাজে একটি অবৈধ সুবিধাভোগী শ্রেণির দ্রুত বিকাশ ঘটানো। যাদের কাজ হচ্ছে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ব্যবহার করে আরও বেশি দুর্নীতি করা। তারা ব্যাপকহারে চুরি, ঘুষ, জালিয়াতি ইত্যাদিতে অভ্যস্ত। এদের ছদ্মাবরণে জাতি বিভ্রান্ত। তাদের নৈতিক বোধ ও পারস্পরিক সহানুভূতি নেই। এবং তাদের কোন ধর্মীয় শিল্ড নেই। সবকিছুকে নিয়ে মাখামাখি করে চলতে গিয়ে তারা সমাজের সাধারণ মানুষের নূন্যতম অধিকারগুলো হরণ করে নিজেরে উদর পূর্তি করতে সিদ্ধহস্ত।

তাই এদের প্রভাবে আমাদের সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক সমস্যাগুলোর ব্যপ্তি না কমে দিন দিন আরও বেড়ে যাচ্ছে। শুধু গুটিকয়েক পুলিশ দিয়ে সাধারণ মামলা ঠুকে যেগুলো ঠেকানো যায় না। কারণ, এসব জাল টাকার হোতারা জানে আসল টাকা দিয়ে জাল টাকার মামলা কিভাবে মিটমাট করা যায। সেসব মিটমাটকারী চক্র সম্পর্কে তারা বেশ জানে। এজন্যও তাদের নির্দিষ্ট বাজেট রয়েছে। এনিয়ে তারা চক্রের সদস্যদেরকে আগাম আশ্বস্ত করে থাকে। তাই পুলিশি তৎপরতায় তাদের হৃৎকম্প হয় না, ভয়ও পায় না।

জালটাকা আমাদের অর্থনীতির জন্য অভিশাপ। এটা দেশ ধ্বংসকারী তৎপরতা। এই ঘৃণ্য তৎপরতাকে দ্রুত বন্ধ করতে কর্তৃপক্ষকে বেশি তৎপর হতে হবে। এর জন্য দরকার কঠিন কমিটমেন্ট বা আত্ম প্রতিশ্রুতি।

মাদকব্যবসা ও জালটাকা পরস্পরের অন্তরঙ্গ বন্ধু। যারা মাদকব্যবসা, মুদ্রাপাচার, চোরাচালান ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত তারা জাল টাকার চক্রের সাথেও জড়িত। জাল টাকার নির্মাতা ও মালিকদের ঠেকাতে হলে মাদকের আগমন ও বিপণন ঠেকাতে হবে কঠোরভাবে। কৌশলে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন দিয়ে মাদকের ব্যবহার বিস্তৃতকারীদেরকে ঠেকাতে না পারলে জাল টাকা তৈরির মতো অপরাধ বাড়তেই থাকবে। জাল টাকার হোতারা বেশ ক্ষমতাধর হওয়ায় বহাল তবিয়তে সবার চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায়। তারা দারিদ্রকে উপহাস করে, অট্টহাসি দেয় কারো কোন বড় সমস্যা দেখলে।

এই দুর্বৃত্তায়নের চক্র সাধু সেজে জাল টাকা তৈরি, সরবরাহ ও বাজারে ছড়িয়ে দেবার কাজ করে যাচ্ছে। চক্রকে উৎখাত করতে না পারলে উন্নয়নের গতিকে আর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। আমাদের দেশে জাল টাকার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ খুবই দুর্বল। সরকারিভাবে জাল টাকা নির্ণয়ের জন্য গোয়েন্দা ব্যবস্থা ও বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি যথেষ্ট আধুনিক ও পর্যাপ্ত নয়।

আমাদের খাদ্যে ভেজাল, পণ্যে ভেজাল এবং টাকাও ভেজাল। এ অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে পারে না। টাকা জালকারীরা নতুন কোন অনুষঙ্গ নয। এরা অতি পুরাতন চক্র। এদের গডফাদাররা অতি শক্তিশালী। তাই একবার নয়- বার বার ধরা পড়েও বার বার বের হয়ে এসে এরা আবারও পুরাতন অপরাধ করতে উদ্বুদ্ধ হয়। সেটা শক্তিশালী চক্রের কারণে। তাই দেরি না করে দেশের সার্বিক কল্যাণে গতি ফেরাতে টাকা জালকারী চক্রকে জোর প্রচেষ্টায় ঠেকাতে হবে।

লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন

;

বঙ্গবন্ধু হত্যা: ১৫ আগস্ট ১৯৭৫, ইতিহাসের চরম জঘন্যতম ঘটনা, কি ভূমিকা ছিল বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত স্টাফদের



ব্রিগে. জেনা. শরীফ আজিজ পিএসসি (অব.)
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শরীফ আজিজ

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শরীফ আজিজ

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকালে বঙ্গভবন থেকে আমরা তিন জন ছুঁটে গিয়েছিলাম ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের দিকে। আমরা ছিলাম ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাশহুরুল হক, ক্যাপ্টেন শরীফ আজিজ ও লেফটেন্যান্ট রাব্বানী। প্রথম জন বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব আর অপর দু’জন বঙ্গবন্ধুর এডিসি। আমাদের লক্ষ্যস্থল বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়ি হলেও সেখানে আমরা পৌঁছাতে পারিনি। যেমন গণভবন থেকে আসা বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিলও পারেন নি। ১৫ আগস্টের খুব সকালে কর্নেল জামিলকে হত্যা করে। তবে বঙ্গভবন থেকে আসা আমাদের তিনজনকে অভ্যুত্থানকারীরা প্রাণে মেরে না ফেললেও গাড়ি থেকে টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে চোখ বেঁধে ফেলে এবং আটকে রাখে। আমাদের সেই তিন জন সামরিক কর্মকর্তার মধ্যে আমি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শরীফ আজিজই এখনও বেঁচে আছি।

১৫ আগস্ট যে এরকম একটি হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটবে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালিকে এরকম নৃশংসভাবে হত্যা করা হবে। যখন এটা ভাবি, তখন খুবই অনুশোচনায় পড়ি, বিচলিত হই, আত্মগ্লানিতে ভুগি এবং খুবই লজ্জা লাগে। আমরা যারা বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলাম, কেউই বুঝতে পারলাম না, কী ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকে বলা হয়েছিল, ৩২ নম্বর রোডের বাসায় থাকবেন না, গণভবনে থাকুন। তিনি বললেন, ৩২নং রোডের বাসাতেই তিনি থাকবেন। এর পর আর কেউ তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেন নি। মনে আছে, তার মৃত্যুর তিন-চার দিন আগে হত্যাকারীদের একজন কর্নেল ফারুক কোনো এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে অভিবাদন জানিয়ে ছিলেন। এসব লোকই কিনা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করল? আমরা কিছুই বুঝতে পারলাম না। ডিজিএফআই, এনএসআই কেউই জানল না, এটি কীভাবে সম্ভব হলো? এটা ছিল আমাদের চরম ব্যর্থতার জল জ্যান্ত একটি ইতিহাস।

তাহলে সেই ব্যর্থতার দায়ভার কার? এর উত্তরে বলব, অবশ্যই আমাদের ব্যর্থতা ছিল। বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে পারিনি, এ ব্যর্থতা গোটা জাতির বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তায় পিজিআরের বাইরে বেসামরিক নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও ছিলেন। আজ এত বছর পর এসে মনে হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তায় বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। কর্নেল ফারুক ও রশিদ চক্র এই পরিকল্পনা করেছে, তার কিছুই আমরা টের পাই নাই কেন ? এসকল প্রশ্ন আমাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাড়া করে বেড়াবে। বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা বঙ্গবন্ধুকে হয়ত সতর্ক করে থাকতে পারে। কিন্তু আমার অনুযোগ দেশের ভেতরে এত গোয়েন্দা সংস্থা, এত বাহিনী, কেউই বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্র টের পেল না? এখন মনে হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই ঢিলেঢালা ছিল। ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট পিজিআর প্রতিষ্ঠিত হলেও, উক্ত রেজিমেন্ট বঙ্গবন্ধুর বাড়ির নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল না। নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে আসা একটি সেনা গোলন্দাজ ইউনিট। মোটকথা রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সকলকেই দায়ী করা যায়। এটি ছিল সংশ্লিষ্টদের অবহেলা, যা হয়ত ইচ্ছাকৃত নয়। তবে এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, আমরা যারা পারসনাল স্টাফ ছিলাম – তাদের ‘নিরাপত্তা’ বিষয়ে কোন দায় দায়িত্ব ছিল না। নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব বর্তায় প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তার ওপর এবং তখনকার গার্ড রেজিমেন্টের উপর।

১৫ আগস্টের ঘটনা আমরা কীভাবে শুনলাম এবং কীভাবে আমরা বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার উদ্যোগ নিলাম এটা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে এর কিছুটা বর্ণনার প্রয়োজন আছে। ঘটনার দিনই আমরা তিন এডিসি’র দায়িত্ব নির্ধারিত ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে ১৫ আগস্ট সকালে বঙ্গবন্ধুর সমাবর্তনী অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা ছিল। তবে সকালবেলা ৬ টার দিকে গণভবনের ফখরুল ইসলাম নামের একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা গণভবন থেকে আমাকে টেলিফোন করে জানায় যে, ধানমন্ডি ও মিরপুর রোডের দিক থেকে গুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। আপনারা কিছু শোনেননি? আমি বললাম, না, শুনিনি। এর মধ্যে আরও কারো কারো কাছ থেকে দুঃসংবাদের খবর নেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে অন্য কোন চিন্তা বা কোন কিছুর ভ্রক্ষেপ না করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলাম বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাব। আমি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাশহুরুল হককে জানালাম, তিনি বললেন, তিনিও যাবেন। গাড়িতে উঠার আগে তিনি আমার হাতে একটি পিস্তল দিয়ে সাথে রাখতে বললেন, আমি অপর এডিসি যিনি আমার পাশের রুমে থাকতেন, লে. রাব্বানীকেও ঘটনা বললাম। তিনিও যাওয়ার কথা বললেন। আমরা তিনজনই ছিলাম সিভিল পোশাকে। এরপর আমরা বঙ্গভবন থেকে একটি গাড়ি নিলাম, পুরোনো ভক্সওয়াগন। রাজা মিয়া নামের একজন ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছিলেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, প্রধান রাস্তা এড়িয়ে আজিমপুর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, কিছুক্ষণ পর যে অনুষ্ঠান হবে তার প্রস্তুতি দেখে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি যাব। এরপর যখন নিউমার্কেট পার হয়ে ধানমন্ডির ২ নম্বর সড়কে এলাম, তখন কালো ইউনিফর্ম পরিহিত কোরের (ট্যাঙ্ক বাহিনী) লোকেরা জিজ্ঞেস করল, আমরা কোথায় যাচ্ছি? আমরা জানালাম, বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাব। ওরা বলল, তাকে তো হত্যা করা হয়েছে। আমরা বললাম, কী বলছ? তোমরা কি পাগল? কিন্তু আমরা তাদের বাধা পেরিয়ে সামনে এগোলাম। এরপর কলাবাগান স্টাফ কোয়ার্টারের কাছে ফের আরেকদল আমাদের আটকাল। অনেক বাক-বিতাণ্ডার পর নানা কৌশলে দ্বিতীয় বাধাও পার হলাম।

তখন রাস্তায় কোন সাধারণ লোকজন ছিল না। কেন না তখনতো কারফিউ চলছিল। বিদ্রোহী সেনাদের তৃতীয়দল আমাদের বাধা দিল বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কাছে, সাংহাই চীনা রেস্তোরাঁর নিকটে ওরা আমাদেরকে গাড়ি থেকে নামিয়ে টেনে হিঁচড়ে লেকের পাড়ে নিয়ে আটকে ফেলল। তারা ছিল খুবই আক্রমণাত্মক। অকথ্য ভাষায় আমাদেরকে গালাগাল করল। আমাকে পিঠে ও পেটে বিশাল জোরে কতগুলি ঘুষি দিল, কেননা আমার পকেটে ছিল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাশহুরুলের দেয়া ছোট পিস্তলটি। এরপর তারা আমাদের সবার চোখ বেঁধে ফেলল। পিছমোড়া করে হাত বাঁধল। চোখ বেঁধে ফেলায় ভাবলাম, এটা হয়তো হত্যার আগের প্রস্তুতি। আমাদের আর নিস্তার নাই। ওদের কথাবার্তায় টের পেলাম, কর্মকর্তা গোছের কেউ কেউ ওখান দিয়ে আসা-যাওয়া করছিল। তাদের প্রশ্নের উত্তরে সেনারা বলল, ‘তিন গাদ্দারকে ধরেছি।’ একবার কর্নেল ফারুকও ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেনারা তাকে আমাদের বিষয়ে জিজ্ঞেস করল, তারা আমাদেরকে কী করবে? তিনি আমাদের দুজনকে না চিনলেও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাশরুল হককে চিনলেন। কর্নেল ফারুক বললেন, এদেরকে ধরে রাখো।

এভাবে আমাদের চোখ বেঁধে সেখানে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা রাখা হলো। কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের বোন জামাই মরহুম মেজর শহীদুল্লাহ আমাদের অবস্থা দেখে আমাদেরকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার করলেন এবং গণভবনে নিয়ে গেলেন। সেখানে আমাদের চোখ খুলে দিয়ে একটি কক্ষে আটকিয়ে রাখা হলো। দিনটি ছিল শুক্রবার। নামাজের সময় হলে কর্তব্যরত প্রহরীদের বুঝিয়ে বন্দী অবস্থা থেকে বেরিয়ে গণভবনের মসজিদে নামাজ পড়লাম। সন্ধ্যায় গণভবনের নিয়ন্ত্রক, যিনি আমাদের পূর্ব পরিচিত ছিলেন, তিনি একটি গাড়ির ব্যবস্থা করে দিলে প্রহরারত সৈনিকদের ফাঁকি দিয়ে আমরা প্রথমে আর্মি হেড কোয়ার্টারে যাই, সেখানে সবাইকে দেখি হন্তদন্ত এবং হতবম্ভ এবং সবাই বিরাট বিভ্রান্তির মধ্যে আছে। এই অবস্থা দেখে আমরা সিদ্ধান্ত নেই আমাদের বাসস্থান বঙ্গভবনে ফিরে যাবার। সেখানে গিয়ে শুনি, কর্নেল আমীন আহম্মেদ চৌধুরী (পরবর্তিতে মেজর জেনারেল) নতুন সামরিক সচিব হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন এবং হাতে ব্যাজ পড়ে আছেন। এর মধ্যে তিন বাহিনী থেকে তিনজন নতুন এডিসি নিয়োগ পেয়েছে শুনলাম এবং তারা আমাদের জায়গায় ডিউটি করছে। আরও শুনলাম আমাদের অন্যত্রে পোস্টিং করা হয়েছে।

বঙ্গভবনে ফিরে এসে, আমরা সারাদিনের ক্লান্তি এবং দখলের পর ভীষণভাবে কাবু হয়ে এসেই বিছানায় শুয়ে পড়ি। কিন্তু হঠাৎ রাতে শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে আমাদের ডাক পড়ল। আসলে যারা নতুন যোগদান করেছিলেন, তাদের ওই ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের অভিজ্ঞতা ছিল না বলেই আমাদের ডাক পড়েছিল। বাস্তবে সারাদিনের হেনেস্তার পর আমরা ছিলাম ভীষণভাবে ক্লান্ত এবং পরিশ্রান্ত। সমনের পর ভয়ে ভয়ে আমরা নতুন সামরিক সচিবকে রিপোর্ট করলাম। উনি আমাদেরকে নির্দেশ দিলেন আমরা যেন শপথ অনুষ্ঠানটি সুচারুভাবে সমাপ্ত করি। ঐ দিনের শপথ অনুষ্ঠানের একটি ছবিতে আমাকে অতি বিষন্ন এবং হতবিহব্বল দেখা যাচ্ছিল। বোঝাই যাচ্ছিল কতটা বিড়ম্বনার মধ্যে ছিলাম সেদিন। এর মধ্যে আবার বেশ কিছু রাষ্ট্র বাংলাদেশকে একেবারে নতুনভাবে স্বীকৃতি দিতে শুরু করে। তখন আমরা পুরাতনদের শপথ অনুষ্ঠান পালন করতে গিয়ে আমাদের কার্যক্রম কিছুটা বেড়ে যায় এবং আমার ব্যাপারে সেনা সদর দপ্তর এমএস শাখা নতুন একটি আদেশ বের করে ( Posting Held in Abeyance )

এরপর বঙ্গভবনেই এক ধরনের বৈরী পরিবেশে আড়াইমাস কেটে গেল। আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া কোনো দায়িত্ব ছিল না আমাদের। বঙ্গবন্ধুর সাবেক এডিসি হিসেবে বঙ্গভবনে কর্মরত অন্যরা আমাদের এড়িয়ে চলত। কর্নেল ফারুক ও কর্নেল রশিদ বঙ্গভবনের তৃতীয় তলায় ভিআইপি রুমে থাকতেন। তাদের মধ্যে এক ধরনের অহংকার এসে গেল যে, ‘তারাই দেশ চালাচ্ছে।’ কিছু দিন যেতে না যেতেই পুরো সেনাবাহিনী তাদের বিরুদ্ধে চলে গেল। বিশেষ করে সেনা বাহিনীর জেষ্ঠ্য কর্মকর্তারা কোনোভাবেই তাদের কর্তৃত্ব মেনে নিতে পারছিলেন না।

যেহেতু সার্বিকভাবে সেনাবাহিনী এই সামরিক অভ্যুত্থানে জড়িত ছিল না, সেহেতু পুরো সেনাবাহিনী ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে পড়েছিল। বরং সেনাবাহিনী আড়াইমাস সময়ের মধ্যে অভ্যুত্থানকারীদের স্থান চ্যুতি করে দিয়েছিল। সুতরাং সেনাবাহিনীকে উক্ত সামরিক অভ্যুত্থানের জন্য দায়ী করা যাবে না। কিন্তু সেনাবাহিনীর সিনিয়র কমান্ডকর্তৃক ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড ঘটার পর, ঘটনাস্থলে যাওয়া সকলেরই আকাঙ্ক্ষিত ছিল। ঘটনার পর, স্থানীয় সেনা অধিনায়ক ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং সেনাবাহিনী পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছিল। যেকোনো বিবেচনায়ই এটা ছিল একটি চরম ব্যর্থতা।

এরপর ৩ নভেম্বর, ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনা অভ্যুত্থান হলো। সেটা একটি অন্যরকম স্মৃতি। তবে আমরা চেয়েছিলাম ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ সফল হোন। খুনিরা পালিয়ে গেল। তার আগে একটি বৈঠকে তো একজন সেনা কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের মেরে ফেলার হুমকিও দিয়েছিলেন। তবে সে সময় উক্ত বৈঠকে আমরা পুরোনো এডিসিদের মধ্যে কেউ উপস্থিত ছিলাম না। চারদিকে থমথমে অবস্থা। বঙ্গভবনের বাইরে অরাজকতা চলছিল। নভেম্বর মাসের ৬-৭ তারিখে ‘সিপাহীসিপাহী’ ‘ভাইভাই’ বলে পাল্টা অভ্যুত্থান হলো। ইতিমধ্যে জেলখানায় জাতীয় চারনেতাকে হত্যা করা হল। কিন্তু জেলখানায় জাতীয় চার নেতার হত্যা সম্পর্কে আমরা পুরো অন্ধকারে ছিলাম। পরে যখন জেনেছি তখন খুনিরা দেশ ছেড়ে চলে গেছে। জেল হত্যার বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল। পরবর্তিতে বিচারপতি আবু সাদাত সায়েম রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হলে, আমাদের বদলির আদেশ চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হয় এবং সেনা সদরের আদেশক্রমে পূর্ববর্তী ( এডিসি ) কার্যক্রমে ফিরে যাই।

এই মহা বিষাদের ঘটনা শেষ করার আগে বঙ্গবন্ধু সম্বন্ধে কিছু বিশেষ কথা বলতে চাই। যেমন বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশাল হৃদয়ের একজন মানুষ। এডিসি হিসেবে আমরা বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যের মতো ছিলাম। সকালে বঙ্গভবন থেকে ৩২ নম্বরে আসতাম, রাতে ফিরে যেতাম। প্রতিদিন বাসায় গেলে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আমাদের খেতে বলতেন। তার মাতৃসূলভ ডাকে বেশিরভাগ সময়ই না খেয়ে আসতে পারতাম না। আর খেতে না চাইলেও বঙ্গবন্ধু খেয়ে যাওয়ার জন্য তাগাদা দিতেন, তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিল পিতা ও পুত্রের মত। তার সঙ্গে যারাই কাজ করেছেন, তিনি তাদের সবার পরিবারের খোঁজ খবর নিতেন। নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী থেকে বঙ্গবন্ধুর আরও দুজন এডিসি ছিলেন। আমাদের তিনজনকেই তিনি খুব ভালো বাসতেন।

বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সরল মনের একজন বড় মাপের মানুষ ছিলেন। তার জন্য আমরা জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিলাম। কর্তব্যের তাগিদেই সেদিন আমরা তিন জন সামরিক কর্মকর্তা বঙ্গভবন থেকে তার বাসার দিকে ছুটে গিয়েছিলাম। এই সাহসিকতার জন্য পরবর্তীতে কি এর কোন মূল্যায়ন হয়েছে এই প্রশ্ন আমাকে অনেকে করেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে এতদিন পরও এই ঘটনার প্রেক্ষিতে মূল্যায়নের জন্য কোন তদবির বা দেনদরবার করিনি। আমাদের কাজ ছিল, যেটাকে ইংরেজিতে বলে “Call of Duty” এখানে সাহসিকতা ছাড়াও ‘কর্তব্যের খাতিরে সাড়া’ কথাটিই মুখ্য ছিল। মোট কথা, বঙ্গবন্ধুকে আমরা বাঁচাতে পারি নাই, এই গ্লানি এবং মনোবেদনা সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে। তবে মূল্যায়ন, পদক, বড়কোন পদ ইত্যাদির ব্যাপারে কেন আমার অনিহা / অপারগতা – এধরনের কথা প্রতিবছরই ১৫ আগস্টের পর আমাকে কেউকেউ করে থাকে আমি তখন বলি যে, দেখেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তার ছোট বোনের সঙ্গে বছরে আমার দুই / তিনবার, যেমন স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস এবং সশস্ত্র বাহিনী দিবসে দেখা হয়, তখন – উনি কৌতুকের ছলে বলেন যে আপনার দাঁড়িত দেখছি খালি বড় হচ্ছে। অতি সংক্ষিপ্ত কুশলাদি বিনিময়ের পর আমি সহাস্যে একটি স্মার্ট সালাম দিয়ে উনার মঙ্গল কামনা করে প্রতিবারই বিদায় নিই।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যে মহান ব্যক্তিটি আমাদের স্বাধীনতার অগ্রদূত, জাতি হিসাবে তার প্রতি আমাদের দায়িত্ব কি? ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, যে মহান পিতার প্রতি আমাদের চির কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। সত্যিকার অর্থে বলতে হয়, বঙ্গবন্ধুর ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে আমি সেনাবাহিনীর একজন বড় অফিসার হতে পারতাম না, বা অবসর গ্রহণের পরবর্তী জীবনে ২০,০০০ +- জনবল বিশিষ্ট “এলিটফোর্স “নামক এত বড় প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানির মালিক হতে পারতাম না। যদিও বঙ্গবন্ধুর নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ডের পর স্টাফ অফিসার হিসেবে আমাদের স্থিতিকাল সংক্ষেপণ করা হয়েছিল, তথাপি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সূযোগ পেয়ে আমি অতি গর্বিত। জাতির পিতার প্রতি আমাদের ঋণ অপরিশোধনীয়, তথাপি উনার প্রতি আমাদের সর্বোচ্চ সম্মান, গভীর শ্রদ্ধা, অপরিসীম কৃতজ্ঞতা ও আন্তরিক ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ প্রতি বছর ১৫ আগস্ট আমরা এলিট ফোর্সে রক্তদান কর্মসূচি ও দোয়া মাহফিলের আয়োজনের মাধ্যমে উনার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

আমার স্মৃতিচারণে যে সকল তথ্য দিলাম এর সমর্থন পাওয়া যাবে অ্যান্থনি মাস্কারেনহাসের বই ‘লিগ্যাসি অব ব্লাড’ এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামি কর্নেল মহিউদ্দিনের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে।অ্যান্থনি মাস্কারেনহাস লিখেছেন, মিরপুর রোড ধরে শেখ মুজিবের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একদল ল্যান্সারের আহ্বানে কর্নেল ফারুকুর রহমান সেখানে নামেন এবং দেখতে পান যে, আমাদের তিন জনকে ধরে অত্যন্ত শক্তভাবে বেঁধে রেখেছে। উত্তেজিতভাবে তারা বলছে, মুজিবের বাড়ির দিকে যাওয়ার চেষ্টা করায় তারা আমাদেরকে পাকড়াও করেছে। তারা কর্নেল ফারুকের কাছে জানতে চায়, ‘আমাদের খতম করে দেবে না কি?’ কর্নেল ফারুক আমাদের মধ্যকার কমবয়সী দুজনকে চিনতে না পারলেও দেখা মাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাশহুরুল হককে চিনে ফেলে। কর্নেল ফারুক তার সেনাদের শান্ত করলেন এবং বললেন, আর কোনো খুনের প্রয়োজন নেই। অপর দিকে মহিউদ্দিন তার জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, হঠাৎ তিনি লেকের দিকে হৈ চৈ এর শব্দশুনে সেদিকে তাকিয়ে দেখেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাশহুরুল হক ও রাষ্ট্রপতির দুই এডিসিকে চোখ বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে। তাদের হাত পিছমোড়া করে বাঁধা। ল্যান্সার ইউনিটের সেনারা তাদের গুলি করতে উদ্যত হন।

আমাদের ওই দিনের আরও বিড়ম্বনার বিবরণ এন্থনি ম্যাসকারেন হাসের লিখিত English Version ‘‘Bangladesh : A Legacy of Blood’ নামক বইয়ের ৭৭ পৃষ্ঠার তৃতীয় অনুচ্ছেদে এবং বাংলা অনুবাদ ‘বাংলাদেশ:রক্তের ঋণ’ বইয়ের ৯৪, ৯৫ নং পাতায় বর্ণিত হয়েছে। এছাড়াও পরবর্তিতে ১৯৯৬-৯৭ সালে নতুনভাবে ৫০০০ হাজার পৃষ্ঠার অনুসন্ধানী রিপোর্টেও এই ঘটনাবলীর উল্লেখ্য আছে। প্রয়াত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের এক ভগ্নিপতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর শহীদউল্লাহ ওইদিন আমাদের এই করুণ অবস্থা স্বচক্ষে দেখে ছিলেন।

অন্য ভাবনা-

২০২২ সালে আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছরে উপনিত হয়েছি। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা, বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, স্বাধীনতার রূপকার, স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু যদি আজ বেঁচে থাকতেন- উনি দেশকে কিভাবে দেখতে চাইতেন। আমার মনে হয় উনি আমাদের এই চরম বিভক্তি কোন মতেই মেনে নিতে পারতেন না। গরিব দেশের অনেক উন্নতি হলেও ধনী-গরিবের বৈষম্য উনাকে বিচলিত করতো। দুর্নীতিরোধে যে আমরা ব্যর্থ তা উনাকে লজ্জিত করতো। আজ বঙ্গবন্ধুর ৪৭তম শাহাদত দিবসে তার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শরীফ আজিজ, পিএসসি (অব.), ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এলিট সিকিউরিটি সাভির্সেস লিমিটেড

;

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মৌলিক চাহিদা পূরণে জাতি আপনার পথপানে চেয়ে আছে



মো. কামরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

সাধারণ জনগণ মূল্যস্ফীতি বোঝে না, বোঝার দরকারও নেই। জনগণ শুধু নিজের উপার্জন দিয়ে নিত্যদিনের চাহিদা পূরণ করতে পারলেই যথেষ্ট মনে করে। কিন্তু জনগণ কি সেটা পারছে? এর উত্তর কি উত্তরদাতাদের কাছে আছে?

বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অনেকদিন ধরেই অস্থিতিশীল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারনে জ্বালানি তেলের বাজার ছিলো ঊর্ধ্বমূখী। গত কিছুদিন ধরে তা আবার নিম্নমূখীও। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে মনে হয় স্বপ্ন দেখছিলাম গত ৫ আগস্ট, শুক্রবার। রাত ১০ টায় গণমাধ্যমের কল্যাণে জানতে পারলাম নিত্যদিনের ব্যবহার্য দ্রব্য জ্বালানি তেল যেমন-কেরোসিন, ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন এর দাম প্রায় ৫০ শতাংশের মতো একলাফে বৃদ্ধি পেয়েছে। তখন ভেবেছিলাম স্বপ্ন ভাঙ্গলে সব কিছু আগের অবস্থায় দেখতে পাবো। কিন্তু সেটা তো স্বপ্ন ছিলো না, ছিলো বাস্তব। তারপর সহজেই অনুমেয় কি অপেক্ষা করছে আমাদের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির?

কিছুদিন আগেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণকে আশ্বস্ত করেছিলেন স্পষ্টভাবে জ্বালানি তেলের রিজার্ভ নিয়ে, চাহিদা নিয়ে। জাতি হিসেবে সব সমস্যার সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে আমাদের প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে বহু সমস্যার সমাধান করতে দেখেছি প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে। জ্বালানি তেল নিয়ে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, জাতি আজও প্রধানমন্ত্রীর সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের পথপানে চেয়ে আছে।

গণমাধ্যমের বদৌলতে দেখতে পাই, সব বিষয়ে সবাই কেমন জানি বিশেষজ্ঞ বনে যাচ্ছেন? সবাই অর্থনীতিবিদ হয়ে যাচ্ছেন, মাইক্রো থেকে ম্যাক্রো ইকনোমিকস নিয়ে কথা বলা শুরু করে দিয়েছেন। নিজের মতো করে ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করছেন, মূল্যস্ফীতি বুঝিয়ে দিচ্ছেন জনগণকে। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্য থেকেও আমরা ভালো আছি কারন আমাদের মূল্যস্ফীতি তাদের থেকে কম। কথায় কথায় বাংলাদেশকে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুরের সাথে তুলনা করে ফেলি। আমরা সেখানে কি আদৌ পৌঁছেছি?

দয়া করে নিজেদের মতো করে নয়, অর্থনীতির ভাষায় মূল্যস্ফীতি কি আমাদের মতো আম জনতাকে একটু বুঝিয়ে বলবেন? ডলার এর বিপরীতে টাকার মারাত্নক অবমূল্যায়ন, জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বি, চাল, ডাল, ভোজ্য তেল সহ নিত্যপন্যের দাম যখন ক্রয়সীমার বাহিরে তখনও মূল্যস্ফীতি নাকি আগের জায়গায় আছে। মূল্যস্ফীতির সংজ্ঞাই আজ পরিবর্তন হওয়ার পথে।

বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবসায়ীরা সবসময়ই সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। গত বছর যখন ডিজেলের দাম বাড়ানো হলো রাতারাতি সকল গ্যাস চালিত পরিবহন ডিজেল চালিত হয়ে গেলো। শুধু ভেবেছিলাম সিএনজি পাম্পগুলোর কি হবে?

জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলেই পরিবহন ব্যবসায়ীদের লাভের অংশ জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়। যাত্রীদের সাথে পরিবহন শ্রমিকদের অসৌজন্যমূলক আচরনের মাত্রা বেড়ে যায়। যা সত্যিই কষ্টদায়ক। সব অনিয়মই যেন নিয়মে পরিনত হয়ে যাচ্ছে। যাত্রী ভাড়ার ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্তকেও তোয়াক্কা করে না। ওয়েবিল নামের যন্ত্রণা থেকে বিআরটিএ কোনোভাবেই যাত্রীদের রক্ষা করতে পারছে না।

অনেক নীতিনির্ধারকদের ভাষ্যমতে, বিপিসিকে দেউলিয়া হতে বাঁচাতেই নাকি জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করতে হয়েছে। ভারতে তেলের পাচার রোধ ঠেকানোর জন্যও নাকি মূল্য বৃদ্ধি করতে হয়েছে। যখনই অবাধ পাচারের কথা বলা হয়ে থাকে তখন আবার বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর সদস্যদের দায়িত্বে অবহেলার কথা উঠে আসে। বক্তব্যগুলো হওয়া উচিত গঠনমূলক, যেন সাংঘর্ষিক না হয়। 

আবার সংবাদ মাধ্যমের বদৌলতে জানতে পারছি গত কয়েক বছরে বিপিসি ৪৮ হাজার কোটি লাভ করেছে। বিপিসির সর্বশেষ বক্তব্যেও উঠে আসছে প্রতি লিটার ডিজেলে ৬ টাকা ভর্তুকি দিবে আর অকটেন থেকে ২৫ টাকা লাভ করবে। দেশের বর্তমান অবস্থায়ও জনগনের টাকায় পরিচালিত বিপিসি লাভ-ক্ষতির হিসাব করে, অথচ যেখানে সেবাটাই মূখ্য হওয়ার কথা।

বিশ্বের সার্বিক প্রেক্ষাপটের উপর ভিত্তি করে বলা যায় বাংলাদেশে শুধুমাত্র জ্বালানি তেলের উপর ভর্তুকি দিলেই বাজার স্থিতিশীল থাকার সুযোগ পেতো নিদেনপক্ষে বর্তমানের অস্থিরতা বিরাজ করতো না। এখন বিপিসিকে দেউলিয়া থেকে রক্ষা করতে যেয়ে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিটি মৌলিক পণ্যের উপর ভর্তুকি দেয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। সেটা কি সরকারের পক্ষে সম্ভব?

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করার কারনে আজ সারাদেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে। বক্তব্য আর পাল্টা বক্তব্যের মধ্যে পরিবেশ কিছুটা ভিন্নতা পাচ্ছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের ভুল সিদ্ধান্ত সরকারকে বিব্রত করতে পারে। জনগনের জন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে ভবিষ্যতের কথা চিন্তায় রাখুন। মাথাপিছু আয় বেড়েই চলছে, কিন্তু জিনিসপত্রের ক্রয়মূল্য সীমা অতিক্রম করছে। বাস্তবে আয়ের সাথে ব্যয়ের সাংঘর্ষিক সম্পর্ক ঘনীভূত হচ্ছে, তা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

আমরা শ্রীলংকা, পাকিস্তান, আফগানিস্তান হতে চাই না। আমরা বাংলাদেশী হয়েই পৃথিবীর মানচিত্রে মাথা উঁচু করে ভবিষ্যতকে সুরক্ষিত রেখে অগ্রসর হতে চাই। আমরা নিজেদের আয় দিয়েই ব্যয় মেটাতে চাই।

লেখক: মোঃ কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক- জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

;