অল্প সময়ে অনেক ধর্মঘটের ধকলটা কার?



প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বহুদিন দেশে হরতাল-ধর্মঘট ছিল না। আবার শুরু হয়ে গেছে এসবের ধকল। মজার ব্যাপার হলো এবারের ধর্মঘট অভিনব। একজনের দায় আরেকজনের ঘাড়ে চাপিয়ে ঘন ঘন ধর্মঘট ডেকে দেয়া হচ্ছে নির্দ্বিধায়। পরিবহন ধর্মঘটের নামে স্থল, জল, হাঁটাপথ সবকিছুতেই বাধা দেয়া হচ্ছে হঠাৎ করেই। আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে- যেদিন বিরোধী দল বা বিএনপি বিভাগীয় সমাবেশের ডাক দিচ্ছে সেই দিনকে উপলক্ষ্য করে শাসক দল সেই বিভাগে তিনদিন আগে থেকেই সব পরিবহন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে দিচ্ছে। পরিবহন সমিতির উপর দায় চাপিয়ে শুধু সেই বিভাগের জেলা-উপজেলা, গ্রাম-গঞ্জ থেকে নয়- ভিন্ জেলা বা দেশের ভিন্ন কোন এলাকা থেকে সমাবেশমুখী যানবাহন চলাচল করতে বাধা দেয়া হচ্ছে।

যে উদ্দেশ্যে এসব ধর্মঘট ডেকে আড়ালে থেকে কৌতুক করা হচ্ছে ধর্মঘটীদের সে উদ্দেশ্য কি আসলে সফল হচ্ছে? এ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের উদ্রেক শুরু হয়েছে। সাধারণ জনগণ এর জন্য খুবই বিব্রত ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে চলেছে। অথচ এ ব্যাপারে সরকার বা প্রশাসনের কোন বিকার নেই।

ঘন ঘন ধর্মঘটের ফলে বিরোধী প্রতিবাদের ভাষার সাথে আরো বেশি তেজ ও জেদ লক্ষ্য করা গেছে। দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে ছয়টিতে ইতোমধ্যে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ শেষ হয়েছে। ছয়টি সমাবেশে ধর্মঘটের কোন সুফল না থাকা সত্ত্বেও সিলেটের বিভাগীয় সমাবেশ ১৯ নভেম্বরের দুদিন আগে হবিগঞ্জসহ সব জেলা থেকে পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়েছে। পথের সকল বাঁধা বিপত্তি ডিঙ্গিয়ে বিএনপি সমর্থকরা সেসব সমাবেশে বহু আগে থেকে হাজির হয়ে সমাবেশগুলোকে উচ্ছল প্রাণসঞ্চালণা দিয়েছে। কুমিল্লা বিভাগীয সম্মেলনে একই ঘটনা দেখা গেছে। এমনকি ৪ ডিসেম্বর রাজশাহী বিভাগীয সম্মেলনের দুদিন আগেই সমর্থকরা এসে হাজির। এখানে একসঙ্গে দুই-তিন হাজার মোটর সাইকেলের র‌্যালি নিয়ে নওগাঁ, চাপাই নবাবগঞ্জ ও নাটোর থেকে হুইসেল বাজিয়ে সমর্থকরা আগের দিন এসে উপস্থিত হয়েছে। আগের রাতে জড়ো হওয়া সমর্থকরা সময় কাটানোর জন্য যাতে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখতে যাতে না পারে সেজন্য বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে বাধা দেয়া হয়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক ধীরগতি করে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ধর্মঘটের ফলে তারা আগেই সমাবেশস্থলে আসায় তাদের উপস্থিতি ও গণমাধ্যমে ভরপুর প্রচারণা দেখে যারা শুধু নির্দিষ্ট দিনে আসতো বা আসতে চাইতা না তারাও যে কোন প্রকারে সমাবেশে হাজির হয়েছে।

অর্থাৎ, সমাবেশের একদিনের প্রচারণা এবার তিনদিন আগে থেকেই প্রচারিত হয়ে বিরোধী শক্তিকে আরো বেশি উজ্জীবিত করে তুলেছে। অর্থাৎ, শাসক দলের ধর্মঘট ডাকার প্রয়াস একটি ছলনা হিসেবে প্রতীয়মান হয়ে যাওয়ায় সাধারণ ও ভুক্তভোগী মানুষ আরো বেশি উৎসাহী ও কৌতুহলী হয়েছে বিভাগীয় সমাবেশগুলির প্রতি। তারা বলছেন, যেমন ঠাকুর, তেমন মুগুর। পথে পথে তল্লাশি, হোটেলে অভিযান ইত্যাদির জন্য সমর্থকগণ সমাবেশস্থলের মাঠে তাঁবু গেড়ে একসঙ্গে অবস্থান করছেন। নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাইতো তারা তিন-চারদিন আগে থেকেই পুটলিতে চিড়া-মুড়ি, নাড়ু বেঁধে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মাধ্যমে সমাবেশস্থলে হাজির হয়ে পিকনিক করে গান গাইতে সুযোগ পেয়েছে। সেখানে তারা সারি সারি চুলা জ্বালিয়ে রান্নাবান্না করে খাওয়ারও সুযোগ পেয়েছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে- এটা ঘটতো না যদি শাসক দলের অহেতুক ভুল নীতি ব্যবহারের বাস্তব প্রতিচ্ছবির জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার কথা জানা থাকতো।

এভাবে বার বার জনসভাকে কেন্দ্র করে এধরণের হঠকারীতামূলক পরিবহন ধর্মঘট ডাকা শাসক দলে উন্নয়ন কাজ করার জনপ্রিয়তা যতটুকু ছিল সেটুকুও ম্লান করে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। জনসভার বিরুদ্ধে ডাকা এসব ধর্মঘট তাদের জনভীতিকে আরো প্রামাণ্য করে তুলছে এবং এটা তাদের জন্য আরো বুমেরাং হচ্ছে বৈ কিছু নয়।

আর সরকারের ভয়ে পরিবহন সমিতিগুলো উপায়ন্তর না দেখে নিজেদেরকে বাঁচানোর জন্য ধর্মঘট ডেকে আড়ালে থেকে মজা করছে। প্রশাসনযন্ত্র তাদের চাকুরী বাঁচানোর জন্য ধর্মঘটে দায়সারা দায়িত্ব পালন করছে। সবাই এসব উদ্ভট সিদ্ধান্তের কাজকে ছলনা ও এক ধরণের প্রতারণা মনে করে মনক্ষুন্ন হয়ে যেনতেন কাজ মনে করছে। ফরিদপুর বিভাগের মহাসমাবেশকে ঘিরে গণপরিবহন ধর্মঘটের পাশাপাশি মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয়ার অভিযোগ শোনা গেছে। এতে একদিক এসব ধর্মঘট বুমেরাং হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে জনসমাগমকে আরো বেশি বেগবান করে সফল সমাবেশ করে চলেছে। বিশ্লেষকগণ মনে করেন, দেশের সব মানুষ তো আর রাজনীতি করে না। জনভোগান্তি সৃষ্টিকারী এসব ধর্মঘট না ডাকলে বিভাগীয় সমাবেশগুলো এত প্রাণ পেত না।

খুলনা সমাবেশের আগে সেখানকার বিরোধী নেতারা বলেছেন, যানবাহন বন্ধ করে কোন লাভ নেই। ‘মনে চাইলে মানুষ পায়ে হেঁটেও মক্কা যেতে পারে।’ ফরিদপুরের জনসভায় বক্তারা বলেন, পরিবহন ধর্মঘট সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের দুর্গে লক্ষ মানুষ জমায়েত হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা জানাচ্ছে। তবুও সরকার খেলার নামে অরাজনৈতিক কথাবার্তা বলে অবজ্ঞা করছে। এবার নির্বাচন নিয়ে যেনতেন খেলা খেলতে দেয়া হবে না। মানুষ গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর। তাই সব বিভাগীয় সমাবেশের বহু আগেই ধর্মঘট ডাকা হলেও জনসমাগম ঠেকানো যায়নি। গত কয়েকদিন ধরে নেতাদের মধ্যে বাকযুদ্ধ ও পাল্টা বাকযুদ্ধ চলছেই। জনভোগান্তির কথা ভাবনায় নেই কারো।

দেশের বাকী জনগণতো ‘ওয়াচডগ’। তারা গণমাধ্যমে ধর্মঘটের নামে নিরীহ ভুক্তভোগী মানুষের দুর্দশা দেখে সহানুভূতি প্রকাশের ভাষাও হারিয়ে ফেলেছে। কারণ, এসব ধর্মঘট তো আর একটি-দুটি নয়। অনেক হবে। হয়তো সামনে আরো অনেক হতে থাকবে। তবে এসব পরিবহণ ধর্মঘট কি কোন জনসমাবেশ ঠেকাতে সক্ষম? নাকি শুধু জনভোগান্তি সৃষ্টির কারণ?

আরেকটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঢাকায় একটি রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনের সূবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠানের মহাসমাবেশকে ঘিরে লক্ষ্যণীয় ছিল। সেটা হলো- বিআরটিসি বাসে দলীয় ব্যানার টাঙ্গিয়ে আসা। উন্মুক্ত মাঠে ফটক বানিয়ে পুলিশি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দলীয় সমাবেশ করাকে অনেক গণমাধ্যম আওয়ামী লীগের ভয় পাবার বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে। এছাড়া ডলারের রিজার্ভ সংকট ঠেকাতে আইএমএফ-এর ঋণ গ্রহণকে অথর্নীতিবিদগণ প্রথম কিস্তি পাবার পর কঠিন প্রেসক্রিপশণ হাতে ধরিয়ে দেবার আশঙ্কা করছেন। যার মূল মিটিং আইএমএফ এখনও করেনি এবং বিদেশী সাংবাদিকরা দেশের অর্থনীতিকে আইসিইউ-এ থাকার সংগে তুলনা করেছেন। তা-না হলে এই সময়ে আইএমএফ-এর ঋণ গ্রহণ এত প্রয়েজনীয় মনে হলো কেন?

একটি দলীয় অনুষ্ঠান বা কর্মসূচির জন্য সরকারি পরিবহন ব্যবহার করা যায় না। এমনকি সেজন্য সরকারী পরিবহন বা যানবাহন ভাড়া করারও বিধান নেই। এটা দেশবাসীর দৃষ্টিকটু লাগায় সমালোচনার উদ্রেক করেছে।

একদিকে বিরাধী দলের সমাবেশকে পন্ড করার মানসে পরিবহণ ধর্মঘট চালু থাকা এবং সরকারের নির্লিপ্ত থাকার ভূমিকা অন্যদিকে সরকারী যানবাহনে দলীয় ব্যানার লাগিয়ে ঢাকায় সমাবেশস্থলে সমর্থক নিয়ে আসাটা বড় ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত। নিজেরটা সরকারী নিরাপত্তার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ও অনেকটা যান্ত্রিক কিন্তু বিরোধীদেরটা হচ্ছে স্বত:স্ফুর্ত ও প্রাকৃতিক। আজকাল গণমাধ্যমের কল্যাণে এসবের কোনটাই সাধারণ মানুষের চোখ এড়ায় না। প্রবাদে আছে- ‘নিজের বেলা আটিসাঁটি, পরের বেলা চিমটি কাটি’- অহেতুক নিষ্ফল পরিবহন ধর্মঘট ডেকে এমন ভাব প্রদর্শণ করছি কেন?

আর এগুলোই কোন শাসনকালের ইতিহাসের প্রতিপাদ্য হিসেবে লেখা হয়ে থাকে। নাগরিকদের কল্যাণের জন্য গৃহীত যে কোনকিছুই একদিন মহান হয়ে ভেসে আসে। হযরত ওমর রাতের বেলা দু:খী প্রজাসাধারণের প্রকৃত অবস্থা যাচাই করতে একা একা চুপি চুপি দেখতে যেতেন। দরিদ্র মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরে এক রাতে তিনি শুধু পানির পাত্র উনুনে জ্বাল দিতে দিতে অভুক্ত সন্তানদেরকে সান্তনা দিতে দেখা এক অসহায় মায়ের সন্ধান পেয়েছিলেন। তাদের জন্য নিজেই গাধার পিঠে করে খাবার বহন করে এনে দিয়ে মানব কল্যাণে ইতিহাসের এক উজ্জল অংশ হয়ে আজও বেঁচে আছেন। আমরা গণতন্ত্রের জন্য নূর হোসেনের বুকের লেখা শ্লোগানকে বুলি করছি, নিজের অবস্থান খেয়াল না করে অপরের কথা বলা নিয়ে বার বার উপহাস করছি। কিন্তু নিজেরা ভাল হতে চেয়েও ভাল হতে পারছি কই?

ঢাকায় লক্ষ কর্মী-সমর্থকের সমাবেশের দিনেও নিজের ভিটা ও দুর্গে যখন আরো ভিন্ন লক্ষ লক্ষ প্রতিবাদী মানুষ গণতন্ত্র, ভোটাধিকার প্রয়োগ, জ্বালানি সংকট, উচ্চদ্রব্যমূল্য নিয়স্ত্রণের দাবি জানাতে জড়ো হয় তখন সেটাকেও গুরুত্ত্ব দিয়ে ভাবার বিষয়। এগুলোকে নিছক খেলার সংগে তুলনা করাটাও ঠিক নয়। ‘পুকুরে বাচ্চারা ঢিল ছুঁড়ে খেলায় মত্ত হলে অগভীর জলে বাস করা ব্যাঙদের অকালমৃত্যু ঘটতে পারে’-একথা ভুলে গেলে চলবে কি করে? এজন্য দায়িত্বরত থাকা সবাইকে আরো দায়িত্বজ্ঞানহীন মনে হয়। কারণ দ্রব্যমূল্য সন্ত্রাসের এই সময়ে নিম্ন আয়ের মানুষেরা সেই অসহায় ব্যাঙের মতো অতি অগভীর পুকুরে বাস করছে।

বার বার সরকারি ইঙ্গিতের সমর্থনে পরিবহন ধমর্ঘটের ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ঝান্ডা যখন লোভী ব্যবসায়ীরা আরো অগ্নিমূল্যের দিকে তাড়া করে নিয়ে যায় এবং ছা-পোষা, দরিদ্র মানুষকে পরিবারসহ পেটের ক্ষুধায় কাতর করে নির্ঘুম রাখতে বাধ্য করে তখন বড় বড় সমাবেশের নামে প্রতিযোগিতা করে অর্থ ব্যয় করা ও জৌলুষ দেখানোর নামে মানুষের কষ্ট বাড়ানো কি সমীচিন মনে হয়? এত অল্প সময়ে এসব অনেক বেশি ধর্মঘটের ধকলটা আসলে কার?

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

 

   

সৌদি বিমানের মুম্বাই ‘অবতরণ’ বিতর্কের নেপথ্যে আসলে কি?



আশরাফুল ইসলাম, পরিকল্পনা সম্পাদক, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

গেল মঙ্গলবার (২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪) সৌদি এয়ারলাইন্সের একটি বিমানকে বিশ্বের ব্যস্ততম মুম্বাই বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণের অনুমতি দেওয়া না দেওয়া নিয়ে গত ৩ দিন নানা খবর প্রকাশিত হচ্ছে দেশে ও বিদেশে। প্রকাশিত এসব খবর নিয়ে বাংলাদেশের স্যোশাল মিডিয়ায় তুমুল চর্চা ও চরমভাবে ‘ভারত বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার চেষ্টা’ খবরটি সম্পর্কে আরও জানতে আগ্রহী করে তুললো। বিশেষ করে বাংলাদেশের তথাকথিত এক শ্রেণির অ্যাক্টিভিস্ট (যাদের বিভিন্ন সময়ে নানা অপতথ্য ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা করতে দেখা যায়) যখন এই বিতর্কে অংশ নিয়ে অবতরণের ‘অনুমতি দেওয়া’পাকিস্তানকে ‘অতি মানবিক’হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টায় সক্রিয় হয় তখন সন্দেহ বাড়ে।

‘দ্য নিউজ’-সহ পাকিস্তানভিত্তিক বিভিন্ন সংবাদপত্রের বরাত দিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে যে খবর বেরিয়েছে তাতে দাবি করা হয়, ওই সৌদি বিমানের পাইলট প্রথমে ভারতের মুম্বাইয়ের বিমানবন্দরে মানবিক অবতরণ চেয়ে এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলারের কাছ থেকে অনুমতি চায়। কিন্তু যাত্রীর জাতীয়তা ও অন্য তথ্য জানার পর প্লেনটিকে তাৎক্ষণিকভাবে মুম্বাইয়ে অবতরণের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

খবরে আরও উল্লেখ, আবু তাহির নামে ৪৪ বছর বয়সী ওই বাংলাদেশি যাত্রীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায় মুম্বাইয়ে অবতরণের অনুমতি না পেয়ে পাকিস্তানের করাচির এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলারের কাছে অনুমতি চান। ঢাকা থেকে উড্ডয়ন করা রিয়াদগামী সৌদি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটিকে করাচিতে জরুরি অবতরণের সুযোগ দেওয়া হয়। অনুমতি পাওয়ার পর বুধবার সকাল ৭টা ২৮ মিনিটে বিমানটি করাচির জিন্নাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে ও পাকিস্তানের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের মেডিকেল টিম ওই যাত্রীর চিকিৎসা দেন এবং পরে প্লেনটি আবার করাচি থেকে রিয়াদের উদ্দেশে যাত্রা করে।

পাকিস্তানের গণম্যাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা খবরটিতে কোন তথ্যসূত্র কিংবা সংশ্লিষ্টদের কোন বক্তব্য নেওয়া হয়নি। তথ্যসূত্রহীন একটি খবরকে প্রভূত গুরুত্ব দিয়ে যেভাবে দ্রুততার সঙ্গে বাংলাদেশের কিছু গণমাধ্যম এবং স্যোশাল মিডিয়া মরিয়া হয়ে প্রচার করলো তাতে কয়েকটি দিক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমতঃ বাংলাদেশের জনসাধারণের মাঝে ভারতবিদ্বেষ উসকে দেওয়া। অন্যদিকে পাকিস্তানকে ‘মানবিক’দেশ হিসেবে প্রচার করা এবং বাংলাদেশ ও ভারতের বিদ্যমান সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করা।

বিষয়টি সত্যাসত্য জানতে ভারতের কুটনৈতিক সূত্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে যা জানা যাচ্ছে তা হচ্ছে, সৌদি এয়ারলাইন্সের ওই উড়োজাহাজটিকে অবতরণের অনুমতি দিয়েছিল মুম্বাই বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। ওজন কমাতে বিমানটি জ্বালানি ডাম্পিংও শুরু করে। কিন্তু পরে সেটি আবার ঘুরে যায় এবং ঘোষণা করে যে কোম্পানির নিজস্ব নীতির কারণেই বিমানটি মুম্বাইয়ে অবতরণ করবে না। কুটনৈতিক সূত্র এও জানায় যে, ফ্লাইটটিতে বাংলাদেশি অসুস্থ যাত্রী আবু তাহিরের জন্য মেডিকেল টিম সহ সমস্ত সম্ভাব্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের জন্য প্রস্তুত ছিল মুম্বাইয়ের ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

ফিরে তাকাব সাম্প্রতিকতম কিছু ঘটনাবলির উপর। আমরা লক্ষ্য করেছি, ক্রিকেট খেলা নিয়ে গেল কয়েক মাস আগে কি ভয়ঙ্কর রকমের উন্মাদনা! স্যোশাল মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে ‘ভারতের পরাজয়ে বাংলাদেশি তরুণদের উন্মাদনা’ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়েছে। এবং এমন ভাবে তা করা হয়েছে যা রীতিমতো ‘ধর্মীয় ও পবিত্র নাগরিক দায়িত্ব’ হিসেবে বলার চেষ্টা করেছে কেউ কেউ। এতে করে ভারতেও বাংলাদেশ বিদ্বেষী প্রচারণায় সরব হয়ে উঠে একটা শ্রেণি। এবং বোঝা যায়-বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রবক্তারা সফল হয়েছেন! যদিও কয়েক দিন উন্মাদনা চালিয়ে এক পর্যায়ে শান্ত হয় তারা। কিন্তু আসলেই কি ওরা থামে? ওরা থামে না। বিরোধিতার ইস্যু সৃষ্টির অপেক্ষায় থাকে তারা। এবং বেশ সংঘবদ্ধভাবেই বিদ্যুৎ গতিতে এই সব অপতথ্য ছড়ানোর কাজটি করে যায় তারা।

এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ভারতের সার্বিক সহযোগিতা এবং দেশটির অগণিত সেনাদের প্রাণদান ও তাদের জনগণের সীমাহীন দুঃখভোগের ইতিহাস রয়েছে। অভিন্ন নদী, সীমান্তে হত্যাসহ কিছু ইস্যুতে দেশটির সঙ্গে আমাদের সমস্যা আছে। কাঙ্খিত না হলেও বিশ্বজুড়েই তা প্রতিবেশি দেশের সঙ্গে এটি থাকে এবং এর সঙ্গে সুনির্দিষ্ট অনেক পরিপ্রেক্ষিতও জড়িত রয়েছে। কিন্তু বন্ধুপ্রতীম প্রতিবেশি হওয়ার কারণে নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশই যে ভাবে উপকৃত হয়েছে এবং হচ্ছে, তা বিশ্বে কমই দেখা যাবে। প্রতিবেশীর সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক দীর্ঘ মেয়াদে কতোটা খারাপ ফল বয়ে আনতে পারে তা মিয়ানমার, পাকিস্তান, আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোর দৃষ্টান্ত টানা যেতে পারে।

‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব-কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’- জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রণীত আমাদের বৈদেশিক নীতির এই মূলমন্ত্রে পাকিস্তানের সঙ্গেও আমাদের কুটনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান। সেখানে আমাদের দূতাবাসও রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান যে মূল্যবোধকে ধারণ করে তার সঙ্গে বাংলাদেশের ফাঁরাক বিস্তর। পাকিস্তান বাংলাদেশের বিষয়ে ‘মানবিক’ চরিত্র নিয়ে আবির্ভূত হবে তার কোন লক্ষণ নিকট অতীতে কিংবা ভবিষ্যতেও প্রত্যাশা করা কতটা দুরাশা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেখানে বিমান অবতরণে বাংলাদেশি যাত্রীর পরিচয়ে ভারতের কোন বিমানবন্দর ফিরিয়ে দেওয়ার মতো প্রচারণা শেষ পর্যন্ত ধোঁপে টিকে না। কেননা বাংলাদেশের যে পরিমাণ নাগিরক প্রতিদিন ভারতে যান, অনেক দেশে পুরো মাসে; এমনকি সারাবছরেও সেই পরিমাণ নাগিরিক যান না। নাগরিক যোগাযোগে বন্ধুপ্রতীম এই দুই দেশে আগামীতে জনগণের প্রত্যাশাকে সম্মান জানিয়ে ‘ভিসা’উঠিয়ে দেওয়ার আলাপ আলোচনাও আমরা বিভিন্ন সময়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে হতে দেখছি। সেখানে একজন মুমূর্ষ যাত্রীর জাতীয়তা ‘বাংলাদেশি’জানার পর তাকে বহন করা ফ্লাইট অবতরণের অনুমতি না দেওয়ার মতো হাস্যকর দাবি আর কি হতে পারে?

তবে সুনির্দিষ্ট কোন ঘটনা বা প্রেক্ষিত যদি থাকে নিশ্চয়ই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তা তদন্ত করবে। আর যৌক্তিক কোন কারণ থাকলে বাংলাদেশের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষও কোন ফ্লাইটকে অবতরণের অনুমতি নাও দিতে পারেন। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোন ঘটনার পুরোটা না জেনে এভাবে বিতর্ক উসকে দেওয়া যে বন্ধুত্বপূর্ণ কুটনৈতিক সম্পর্কে ফাটল ধরানোর এক অপচেষ্টা তা বেশ ভালোই অনুমেয়।

;

স্বীকৃতির উদযাপনে যেন আড়ালে না পড়ে রক্ত



কবির য়াহমদ, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্বীকৃতির উদযাপনে যেন আড়ালে না পড়ে রক্ত

স্বীকৃতির উদযাপনে যেন আড়ালে না পড়ে রক্ত

  • Font increase
  • Font Decrease

আমাদের শহিদ দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি। আমাদের জন্যে দিবসটি আনন্দের নয়। আমাদের জন্যে দিবসটি উৎসব আর হৈচৈ-এর নয়। আমাদের জন্যে এ তারিখ শহিদদের স্মরণের মাধ্যমে অর্জনের পথনির্দেশকের। ২১ ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবসের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসও। আমরা যা রক্তের বিনিময়ে অর্জন করেছিলাম, বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের বাংলা ভাষার প্রতি, তাদের নিজেদের ভাষার প্রতি ভালোবাসার এক নিদর্শন। আমরা এ তারিখকে ঘিরে উৎসব করতে পারি না, কিন্তু বাংলাদেশের বাংলাভাষী ছাড়া অন্যেরা সেটা হয়ত পারে, কারণ এর মাধ্যমে মায়ের ভাষার স্বীকৃতি বিশ্বজনীন হয়েছে। তারা স্মরণের মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানাতে পারলেও আমাদের এ প্রকাশে সীমাবদ্ধতা আছে।

একুশে ফেব্রুয়ারি এখন জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার (ইউনেস্কো) স্বীকৃতিতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রূপে সারাবিশ্বে উদযাপনের প্রপঞ্চ, কিন্তু আমাদের কাছে এটা পরিপূর্ণভাবে উদযাপনের নয়। ধারাবাহিক সংগ্রাম, আত্মত্যাগ আর রক্তের সিঁড়ি বেয়ে ভাষার অধিকার আদায়ের দিন এটা। বৈশ্বিক স্বীকৃতি পেয়ে আমরা কি তবে ভুলে যাব রক্তের কথা? রক্ত ভুলে স্রেফ বৈশ্বিক স্বীকৃতিতে চোখ কেন থাকবে আমাদের? সালাম, বরকতের রক্ত শুকিয়ে কি তবে মিলিয়ে গেল হাওয়ায়? না, এটা হওয়ার কথা নয়!

এদিকে, বৈশ্বিক স্বীকৃতির প্রসঙ্গও পাশ কাটিয়ে যাওয়া উচিত হবে না আমাদের। রক্তে অর্জিত বিশ্ববাসীর মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের স্বীকৃতি-স্মারক এই একুশে ফেব্রুয়ারি—এই ভেবে আমরা গৌরবের অংশীদার হতে পারি কিন্তু ভুলে যেতে পারি না রক্তের কথা, আত্মত্যাগের ইতিহাস। অন্য ভাষাভাষীদের কাছে উদযাপনের হলেও, একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের কাছে উৎসবের নয়। অন্যেরা উৎসব করতে পারে এখানে, কারণ তাদের মায়ের ভাষার অধিকারের স্বীকৃতি মিলেছে; তবে আমাদের কাছে স্মরণের, বিনত শ্রদ্ধার। আমরা রক্তের মাধ্যমে নিজেদের জন্যে অর্জন করেছি ভাষার অধিকার, মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার; নিজের জন্যে, অন্য সকল ভাষাভাষীর জন্যে।

আমাদের বাংলা ভাষা পৃথিবীর অন্তত পাঁচ হাজারের বেশি মাতৃভাষার স্মারকমূল্য পেয়েছে। ভাষা ও অধিকার এই দুয়ের সম্মিলনে বাংলা হয়েছে নেতৃত্বস্থানীয়। প্রচলন আর অনুশীলনে বাংলা ভাষা পৃথিবীর নেতৃত্বস্থানীয় ভাষা না হলেও মাতৃভাষার অধিকারের প্রশ্নে বাংলা ভাষা হয়েছে অগ্রগণ্য, এটা অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে। বাংলা ভাষার সম্মানের এই স্বীকৃতি কেবলই বাংলাকেন্দ্রিক হয়ে থাকেনি, এর বিস্তৃতি ঘটেছে সকল ভাষাভাষী মানুষদের মাঝেও।

বৈশ্বিক উপযোগিতা কিংবা ব্যবহারের প্রসঙ্গ এখানে না থাকলেও অনাগত দিনে পৃথিবীর একজন মানুষও কোনো একটা ভাষায় কথা বলতে চাইলে বাংলার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও বৈশ্বিক স্বীকৃতি তার জন্যে বর্ম হয়ে আছে। দুনিয়ার সকল দেশের সকল শাসক অন্তত একজন মানুষের হলেও স্বতন্ত্র সে মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চাইলে একুশের এই রক্ত, মাতৃভাষা দিবসের এই স্বীকৃতি জোরপূর্বক ভাষা-হরণের যেকোনো অপচেষ্টাকে রুখে দেবে।

ইউনেস্কোর মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতির দিনটি এই সংস্থাভুক্ত সকল দেশ পালন করে থাকে। যে পাকিস্তানের কাছ থেকে রক্তের বিনিময়ে আমরা বাংলা ভাষার স্বীকৃতি আদায় করেছি সেই পাকিস্তানকেও বাঙালির একুশে ফেব্রুয়ারির অমর দিনটিকে পালন করতে হয়। পাকিস্তান তাদের মত করে দিনটি পালন করলেও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রেক্ষাপট, আন্দোলন, রক্ত আর আত্মদানের ইতিহাসকে অস্বীকারের উপায় নাই তাদেরও। এটা আমাদের অনন্য অর্জন।

ভাষাশহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস—এ দুইকে মুখোমুখি দাঁড় না করিয়েও আমরা শহিদদের রক্ত, তাদের আত্মত্যাগ আর ভাষাসংগ্রামীদের স্মরণ করতে পারি। একুশের অমর গানেও আছে সে বার্তা; ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি...’।

বাঙালির কাছে একুশ অধিকার আদায়ের রক্তস্নাত দিন, বিশ্ববাসীর কাছে একুশ নিজের ভাষায় কথা বলতে পারার স্বীকৃতির দিন। একুশে ফেব্রুয়ারি, ভাষার স্বীকৃতি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বৈশ্বিক স্বীকৃতি সে শিক্ষাই দেয় আমাদের।

একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের ভাষা শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। স্বীকৃতির উদযাপনে এখানে যেন রক্ত আড়ালে না পড়ে!

;

আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষার স্তম্ভ হিসেবে বহুভাষিক শিক্ষার গুরুত্ব



ড. মতিউর রহমান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ভাষা মানুষের পরিচয়ের একটি মৌলিক দিক, যা যোগাযোগ, অভিব্যক্তি এবং সংস্কৃতির সংরক্ষণের বাহন হিসেবে কাজ করে। ভাষাগত বৈচিত্র্যের গুরুত্ব এবং মাতৃভাষা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার স্বীকৃতি দিয়ে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের জন্য একত্রিত হয়।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সূচনা বাংলাদেশের দূরদর্শী উদ্যোগ থেকে উদ্ভূত, যা ভাষাগত বৈচিত্র্যের বৈশ্বিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো’র সাধারণ সম্মেলনে এই দিবসটি উদযাপনের অনুমোদন পায় এবং ২০০০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, প্রাথমিকভাবে ইউনেস্কো দ্বারা ঘোষিত এবং পরবর্তীতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত, অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধিতে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অগ্রসর করার ক্ষেত্রে ভাষার মুখ্য ভূমিকার ওপর জোর দেয়। জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত এ বছর (২০২৪) দিবসটির প্রতিপাদ্য বা থিম হলো, ‘বহুভাষিক শিক্ষা - শেখার এবং আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষার একটি স্তম্ভ’ ("Multilingual education – a pillar of learning and intergenerational learning"), যা অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা অনুশীলনের প্রচার এবং আদিবাসী ভাষা রক্ষায় বহুভাষিক শিক্ষা নীতির সমালোচনামূলক গুরুত্বের ওপর জোর দেয়।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের শিকড় নিহিত একটি মর্মান্তিক ঘটনার মধ্যে যা ঘটেছিল একুশে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সালে, বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান)। সেদিন ছাত্ররা উর্দুকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, বাংলাকে তাদের মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তোলে। বিক্ষোভ মারাত্মক রূপ নেয় যখন পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়, যার ফলে প্রাণহানি ঘটে। এই ঘটনাটি, যা এখন ভাষা আন্দোলনের শহীদ দিবস নামে পরিচিত, ভাষাগত অধিকার এবং সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য একটি তীব্র আন্দোলনের জন্ম দেয়।

এই মর্মান্তিক ঘটনার পর, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক অধিকারের সংগ্রাম বেগবান হয়, অবশেষে বাংলাকে পাকিস্তানের সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানে অবদান রাখে। ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে, ভাষাগত বৈচিত্র্যকে সম্মান করতে এবং বিশ্বব্যাপী মাতৃভাষার সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণা দেয়।

জাতিসংঘের মতে, বহুভাষিক এবং বহুসাংস্কৃতিক সমাজগুলো ঐতিহ্যগত জ্ঞান এবং সাংস্কৃতিক অনুশীলনগুলো প্রচার এবং সংরক্ষণে তাদের প্রাণবন্ততা এবং স্থিতিস্থাপকতার জন্য ভাষার মুখ্য ভূমিকার নিকট ঋণী। যাইহোক, ভাষাগত বৈচিত্র্যের জন্য অনেক ভাষায় এখন ক্রমবর্ধমান হুমকির সম্মুখীন। উদ্বেগজনক হারে অনেক ভাষায় এখন বিলুপ্তির পথে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৪ উদযাপনের থিমটি আজীবন শিক্ষা ও সাক্ষরতা বৃদ্ধিতে বহুভাষিক শিক্ষার মুখ্য ভূমিকার ওপর জোর দেয়। বহুভাষিক শিক্ষা, শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে একাধিক ভাষার ব্যবহারকে অন্তর্ভুক্ত করে। এই পদ্ধতিটি একটি সম্প্রদায় বা অঞ্চলের মধ্যে ভাষার সমৃদ্ধ বর্ণালী স্বীকার করে এবং প্রতিটি ভাষার অন্তর্নিহিত মূল্যকে স্বীকৃতি দেয়। একটি ক্রমবর্ধমান আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে, ভাষাগত বৈচিত্র্য উদযাপন করা, সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি বজায় রাখার এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।

বহুভাষিক শিক্ষা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ঐতিহ্য, গল্প এবং মূল্যবোধ এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে প্রেরণের একটি বাহক হিসেবে কাজ করে। শিশুরা যখন তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষিত হয়, তখন তারা কেবল একাডেমিক ধারণাগুলোকে আরও কার্যকরভাবে উপলব্ধি করে না বরং ভাষার মধ্যে অন্তর্নিহিত সাংস্কৃতিক সূক্ষ্মতাগুলিকেও আপ্ত করে। এটি নিশ্চিত করে যে জটিলভাবে ভাষাগত জালে বোনা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে অক্ষতভাবে প্রেরণ করা হয়।

গবেষণা পরামর্শ দেয় যে, বহুভাষিকতা জ্ঞানীয় বিকাশে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখে। বিশেষ করে সমস্যা সমাধান, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং সৃজনশীলতার মতো ক্ষেত্রে। যখন ব্যক্তিরা একাধিক ভাষার সঙ্গে জড়িত, তখন তারা তাদের মস্তিষ্ককে অনন্য উপায়ে অনুশীলন করে, যার ফলে জ্ঞানীয় নমনীয়তা উন্নত হয়। এই জ্ঞানীয় তৎপরতা শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সাধনায় উপকৃত করে না বরং তাদের এমন দক্ষতা দিয়ে সজ্জিত করে যা একটি চির-পরিবর্তনশীল বিশ্বের জটিলতাগুলি পরিচালনা করার জন্য অমূল্য।

বহুভাষিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী অনুঘটক, এটি নিশ্চিত করে যে বিভিন্ন ভাষাগত পটভূমির ব্যক্তিদের শেখার সুযোগের সমান প্রবেশাধিকার রয়েছে। অনেক অঞ্চলে, ভাষাগত বৈচিত্র্য আর্থ-সামাজিক কারণের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে আবদ্ধ এবং একাধিক ভাষায় শিক্ষা প্রদান করা শিক্ষাকে সবার জন্য প্রাপ্তিযোগ্য করে ব্যবধান পূরণ করতে সহায়তা করে। এই অন্তর্ভুক্তি আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষার জন্য একটি উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে, আত্মীয়তা এবং সমতার বোধকে উৎসাহিত করে।

বহুভাষিক শিক্ষার একটি প্রাথমিক সুবিধা হল সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রজন্মগত ব্যবধান পূরণ করার ক্ষমতা। যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি বয়স্ক এবং তরুণ উভয় প্রজন্মের দ্বারা কথ্য ভাষাগুলিকে আলিঙ্গন করে এবং অন্তর্ভুক্ত করে, তখন তারা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে যেখানে জ্ঞান নিরবিচ্ছিন্নভাবে বয়সের মধ্যে স্থানান্তর করা যেতে পারে। এই সেতুটি বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে যোগাযোগ, বোঝাপড়া এবং সহযোগিতার সুবিধা দেয়, এমন বাধাগুলি ভেঙে দেয় যা জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার বিনিময়ে বাধা হতে পারে।

বহুভাষিক শিক্ষা শ্রেণিকক্ষের বাইরে এর ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে, পরিবারের মধ্যে যোগাযোগকে প্রভাবিত করে। শিশুরা যখন তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষিত হয়, তখন তারা কেবল তাদের সমবয়সীদের সাথে নয়, পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের সাথেও কার্যকর যোগাযোগকারী হয়ে ওঠে। এই ভাষাগত সংযোগ পারিবারিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে, একটি আন্তঃপ্রজন্মীয় কথোপকথন তৈরি করে যেখানে গল্প, ঐতিহ্য এবং জীবনের পাঠগুলি জৈবিকভাবে ভাগ করা হয়।

বিশ্বায়ন এবং আন্তঃসংযোগ দ্বারা চিহ্নিত বিশ্বে, বহুভাষিক শিক্ষা ব্যক্তিদেরকে সাংস্কৃতিকভাবে অভিযোজিত এবং বিশ্ব নাগরিক হতে প্রস্তুত করে। একাধিক ভাষায় দক্ষতা শিক্ষার্থীদেরকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পটভূমি পরিচালনা করার ক্ষমতা দিয়ে সজ্জিত করে, অন্যদের প্রতি সহানুভূতি এবং বোঝার বোধ তৈরি করে। এই বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রজন্মের মধ্যে সেতু নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সাংস্কৃতিক এবং ভাষাগত সীমানা জুড়ে ধারণা এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়কে উৎসাহিত করে।

বহুভাষিক শিক্ষা নীতি বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষার্থীর মাতৃভাষায় শিক্ষামূলক নির্দেশনা শুরু করা এবং ধীরে ধীরে অতিরিক্ত ভাষা প্রবর্তন করা প্রয়োজন। এই পদ্ধতি অবলম্বন করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে ছাত্রদের বাড়ির পরিবেশ এবং স্কুলের পরিবেশের মধ্যে ব্যবধান পূরণ করে, যার ফলে আরও দক্ষ এবং অর্থপূর্ণ শেখার অভিজ্ঞতা সহজতর হয়।

অধিকন্তু, বহুভাষিক শিক্ষা অপ্রধান, সংখ্যালঘু এবং আদিবাসী ভাষা সংরক্ষণের জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এই ভাষাগুলিকে শিক্ষামূলক পাঠ্যক্রমের সঙ্গে একীভূত করার মাধ্যমে, সমাজগুলো ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষা করতে পারে এবং তাদের ভাষাগত পটভূমি নির্বিশেষে সকল ব্যক্তির জন্য শিক্ষার সুযোগের সমান প্রবেশ নিশ্চিত করতে পারে।

বহুভাষিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য লালন করার জন্য একটি ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভাষাগত সমৃদ্ধিকে স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন করার মাধ্যমে, শিক্ষাব্যবস্থা সামাজিক সংহতিকে উন্নীত করতে পারে, প্রান্তিক গোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন করতে পারে এবং সবার জন্য আরও ন্যায়সঙ্গত ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।

আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষার জন্য বহুভাষিক শিক্ষার সুবিধাগুলো স্পষ্ট হলেও, সম্পদের সীমাবদ্ধতা, মানসম্মত পরীক্ষার অভাব এবং পরিবর্তনের প্রতি সামাজিক প্রতিরোধসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। যাইহোক, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক এবং সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত সম্পদ বরাদ্দ, অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি এবং সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা এই বাধাগুলো অতিক্রম করতে এবং বহুভাষিক শিক্ষাকে আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষার একটি টেকসই স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মূল উপাদান।

বহুভাষিক শিক্ষা আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষাকে উৎসাহিত করার জন্য একটি শক্তিশালী এবং রূপান্তরকারী শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ভাষাগত বৈচিত্র্য উদযাপন করে, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে, জ্ঞানীয় বিকাশ বৃদ্ধি করে এবং প্রজন্মগত ব্যবধান পূরণ করে, এটি একটি সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করে যা ব্যক্তি এবং সম্প্রদায়ের জন্য সমানভাবে উপকৃত হয়। ক্রমবর্ধমান আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে বহুভাষিক শিক্ষা গ্রহণ ও প্রচারের মাধ্যমেই আমরা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই এবং আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষার ভিত্তি নিশ্চিত করতে পারি।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।

;

একুশে ফেব্রুয়ারি আত্মপরিচয়ের দিন



তোফায়েল আহমেদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীন বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ প্রতি বছর অমর একুশের শহীদ দিবসে মহান ভাষা আন্দোলনের সূর্যসন্তানদের শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করে। ১৯৫২-এর ভাষা শহীদদের পবিত্র রক্তস্রোতের সাথে মিশে আছে বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের গৌরবগাঁথা। ’৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাংলার ছাত্রসমাজ আত্মদান করে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল।

রক্তরাঙা অমর একুশে ফেব্রুয়ারি রক্তের প্লাবনের মধ্য দিয়ে আজ সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরবময় আসনে আসীন। শুধু বাঙালি নয়, বিশ্বের প্রতিটি জাতির মাতৃভাষার মর্যাদা, স্বাধিকার, স্বাধীনতা ও মানুষের মতো বাঁচার দাবীর সংগ্রামের দুর্জয় অনুপ্রেরণা সৃষ্টির চির অনির্বাণ শিখার দীপ্তিতে দিগন্ত উদ্ভাসিত করেছে একুশে ফেব্রুয়ারি। একুশে ফেব্রুয়ারি এদেশের মানুষকে শিখিয়েছে আত্মত্যাগের মন্ত্র, বাঙালিকে করেছে মহীয়ান। জাতি হিসেবে আমরা আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী ভাবধারার সমন্বয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করেছি। মহান ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে এসেছে মহত্তর স্বাধীনতার চেতনা। এবছর বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে সগৌরবে পালিত হচ্ছে মহান ভাষা আন্দোলনের ৭২তম বার্ষিকী।

প্রকৃতপক্ষে মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ’৪৮-এর ১১ মার্চ। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, “আমরা দেখলাম, বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে বাংলাকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং তমদ্দুন মজলিশ এর প্রতিবাদ করল এবং দাবি করল, বাংলা ও উর্দু দুই ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। আমরা সভা করে প্রতিবাদ শুরু করলাম। এই সময় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং তমদ্দুন মজলিশ যুক্তভাবে সর্বদলীয় সভা আহ্বান করে একটা ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করল।

সভায় ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চকে ‘বাংলা ভাষা দাবি’ দিবস ঘোষণা করা হল। জেলায় জেলায় আমরা বের হয়ে পড়লাম।” (পৃষ্ঠা-৯১, ৯২)। ’৪৮-এর ১১ মার্চ অন্যতম রাষ্ট্রভাষার দাবিতে বাংলার ছাত্রসমাজ প্রথম প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে। সেদিন যারা মাতৃভাষার দাবিতে রাজপথে সংগ্রাম করে কারাবরণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং জনাব শামসুল হক ছিলেন তাদের অন্যতম। মার্চের ১১ থেকে ১৫-এই পাঁচদিন কারারুদ্ধ ছিলেন নেতৃবৃন্দ। পাঁচদিনের কারাজীবনের স্মৃতিচারণ করে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “দেওয়ালের বাইরেই মুসলিম গার্লস স্কুল। যে পাঁচ দিন আমরা জেলে ছিলাম সকাল দশটায় মেয়েরা স্কুলের ছাদে উঠে স্লোগান দিতে শুরু করত, আর চারটায় শেষ করত। ছোট্ট ছোট্ট মেয়েরা একটু ক্লান্তও হত না। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই,’ ‘বন্দি ভাইদের মুক্তি চাই,’ ‘পুলিশি জুলুম চলবে না’-নানা ধরনের স্লোগান। এই সময় শামসুল হক সাহেবকে আমি বললাম, হক সাহেব ঐ দেখুন, আমাদের বোনেরা বেরিয়ে এসেছে। আর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করে পারবে না। হক সাহেব আমাকে বললেন, ‘তুমি ঠিকই বলেছ, মুজিব’।” (পৃষ্ঠা-৯৩, ৯৪)। বাংলার মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অবিশ্বাস্য আত্মপ্রত্যয় ছিল! তখন কে জানতো যে, ’৪৮-এর এই ১১ মার্চের পথ ধরেই ’৫২, ’৬৯ এবং ’৭১-এর একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনায় স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটবে! কিন্তু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জানতেন! কারণ তিনি দূরদর্শী নেতা ছিলেন, লক্ষ্য স্থির করে কর্মসূচি নির্ধারণ করতেন। যেদিন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হয়, সেদিনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয়নি; একদিন বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা বাঙালিদেরই হতে হবে। আর তাই ধাপে ধাপে সমগ্র জাতিকে প্রস্তুত করেছেন চূড়ান্ত সংগ্রামের জন্য।

’৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন সংলগ্ন আমতলায় ছাত্রসভা। নুরুল আমীন সরকার আরোপিত ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রস্তুতি। ছাত্রসভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১০ জন মিছিল করে ১৪৪ ধারা ভাঙবে। ছাত্রসমাজ প্রতিবাদ মিছিল করে ১৪৪ ধারা ভাঙলো। সরকারের পেটোয়া পুলিশ বাহিনী গুলি ছুঁড়লে সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন। আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়। বঙ্গবন্ধু তখন কারারুদ্ধ। কারাগারেই তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে একাত্মতা প্রকাশ করে অনশন করেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে তিনি আরো লিখেছেন, ‘মাতৃভাষার অপমান কোন জাতি সহ্য করতে পারে না। পাকিস্তানের জনগণের শতকরা ছাপ্পান্ন জন বাংলা ভাষাভাষী হয়েও শুধুমাত্র বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা বাঙালীরা করতে চায় নাই। তারা চেয়েছে বাংলার সাথে উর্দুকেও রাষ্ট্রভাষা করা হোক, তাতে আপত্তি নাই। কিন্তু বাঙালির এই উদারতাটাই অনেকে দুর্বলতা হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে।’ (পৃষ্ঠা-১৯৮)। ’৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন দেশের গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছিল। গ্রামে গ্রামে মিছিল হতো। সেই মিছিলে স্কুলের ছাত্রদের ব্যাপক ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। আমি তখন তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। মনে আছে তখনকার স্লোগান, ‘শহীদ স্মৃতি অমর হউক,’ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই,’ ‘আমার ভাষা তোমার ভাষা, বাংলা ভাষা বাংলা ভাষা’।

’৬৯-এর একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ’৬৯-এর গণআন্দোলনের সর্বব্যাপী গণবিস্ফোরণ ঘটে একুশে ফেব্রুয়ারিতে। সেদিনও খুলনায় পুলিশের গুলিতে ১০ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হয়। ’৬৯-এর ১৭ জানুয়ারি ১১ দফার দাবিতে যে আন্দোলন আমরা শুরু করেছিলাম একুশে ফেব্রুয়ারি তা পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে। ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হক এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি ড. শামসুজ্জোহার মৃত্যুতে বাংলার মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিক্ষুব্ধ মানুষকে দমাতে সরকার সান্ধ্য আইন জারি করে। আমরা সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে রাজপথে মিছিল করি। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের চেতনা ’৬৯-এর গণআন্দোলনের বাঁধভাঙা জোয়ারে পরিপূর্ণতা লাভ করে। আমাদের আহ্বানে বিগত ১৭ বছরের সমস্ত দৃষ্টান্ত ভঙ্গ করে ঢাকা নগরের অধিবাসীগণ অভূতপূর্ব প্রাণচাঞ্চল্যের মাধ্যমে মহান ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদদের পবিত্র স্মৃতির প্রতি প্রাণঢালা শ্রদ্ধাজ্ঞাপন এবং প্রশাসনের সর্বত্র বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার জোর দাবি উত্থাপন করে। একটি সুন্দর, নিষ্কলুষ, নির্যাতন-নিপীড়নহীন শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যে ১১ দফার ভিত্তিতে সমগ্র জাতিকে এক মোহনায় শামিল করতে সক্ষম হয়েছিলাম। সেদিনের একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলার ঘরে ঘরে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার এক নতুন বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল। দিনটি ছিল শুক্রবার।

’৬৯-এর গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদদের স্মরণে প্রথম সরকারি ছুটি আদায় করেছিলাম। সেদিনের একুশে ফেব্রুয়ারিতে কালো পতাকা উত্তোলন, আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, প্রভাত ফেরি, শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণের মধ্য দিয়ে আমাদের কর্মসূচি শুরু হয়। শহীদ দিবস উপলক্ষে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে শহীদ মিনারের পাদদেশে শপথ অনুষ্ঠান পরিচালিত হয়। ’৬৯-এর একুশে ফেব্রুয়ারিকে মহান ভাষা আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য ধারা হিসেবে চিহ্নিত করে কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের সংগ্রাম আজ একনায়কত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার উচ্ছেদ ঘটিয়ে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সঙ্গে মিশে গেছে। ছাত্র-জনতা শ্রমিক কৃষকের জনপ্রিয় ১১ দফার সংগ্রাম আজ তাই মহান ভাষা আন্দোলনের ঐতিহ্য অনুসরণ করছে। ’৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির সংগ্রাম কেবলমাত্র বাংলা ভাষার সংগ্রাম ছিল না।

এ সংগ্রাম ছিল সারা দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ও বাংলা ভাষীদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার দিবস।’ শহীদ আসাদ, মতিউর, মকবুল, রুস্তম, আলমগীর, আনোয়ারা, সার্জেন্ট জহুরুল হক, ড. শামসুজ্জোহাসহ ১১ দফা আন্দোলনের ৩৯ জন বীর শহীদ ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের শহীদ সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারের সার্থক উত্তরসূরী। বিকাল ৩টায় পল্টন ময়দানে কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। জনসভা তো নয়, যেন জনসমুদ্র। জনসমাবেশের তুলনায় সেদিনের পল্টন ময়দানের আয়তন কম মনে হয়েছে। চতুর্দিক থেকে মানুষের ঢল নেমেছিল। ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ সমাবেশ থেকে সরকারের উদ্দেশে চরমপত্র ঘোষণা করে সমস্বরে বলেছিলেন, ‘আগামী ৩রা মার্চের পূর্বে দেশবাসীর সার্বিক অধিকার কায়েম, আইয়ুব সরকারের পদত্যাগ, রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব মামলা প্রত্যাহার, ১১ দফা দাবির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের প্রিয় নেতা শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দীর নিঃশর্ত মুক্তি, সংবাদপত্র ও বাক-স্বাধীনতার উপর হতে সর্বপ্রকার বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করতে হবে।’ সেদিনের একুশে ফেব্রুয়ারিতে পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের জনসভায় সভাপতির ভাষণে যা বলেছিলাম দৈনিক ইত্তেফাকের পাতা থেকে পাঠকদের জন্য তা হুবহু তুলে দিচ্ছি- ‘একুশে ফেব্রুয়ারি এই দিনটি আত্মপ্রত্যয়ের দিন, আত্মপরিচয় দেওয়া ও নেওয়ার দিন। ১৭ বৎসর পূর্বে এই দিনটি ছিল শুধু মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামের দিন।

আজ ১৯৬৯ সালে এই দিনটি জনগণের সার্বিক মুক্তি সংগ্রামের দিন হয়ে দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বাংলা ভাষা, রবীন্দ্র সঙ্গীত ইত্যাদি নিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল হতে নূতনতর যেসব বিতর্কের অবতারণা করা হয়েছে সেসব বিতর্ক ও এদের উত্থাপকদের সতর্ক করে বলছি, বাংলাদেশে জন্মজন্মান্তর বাস করেও যারা বাংলা ভাষায় কথা বলতে শিখে নাই, তাদের স্বরূপ আজ উদঘাটিত। এই শ্রেণির লোকেরা বেঈমান। বাংলায় বেঈমানের কোনো স্থান হবে না এবং স্বাধিকারের সর্বাত্মক সংগ্রাম নিয়ে যদি তারা চিরন্তন পদ্ধতিতে রাজনৈতিক ঘুঁটি চালানোর প্রয়াস পান তবে আত্মরক্ষার পুরাতন প্রথা পরিত্যাগ করে প্রতি আক্রমণের পথে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব মামলার অন্যতম বন্দী শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হকের মর্মান্তিক মৃত্যুতে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলছি, এই মামলায় বন্দী আর কারো গায়ে যদি একটি আঁচড়ও লাগে তবে দেশব্যাপী দাবানল জ্বলে উঠবে। আর নেতৃবৃন্দের উদ্দেশে বলছি, শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তাকে কেউ যেন নিজেদের রাজনৈতিক হাতিয়ার না করেন।’ স্বৈরশাসকের প্রতি চরমপত্র ঘোষণার পর সন্ধ্যায় দেশবাসীর উদ্দেশে এক বেতার ভাষণে আইয়ুব খান নতি স্বীকার করে ঘোষণা করেন, তিনি আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না এবং এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয়। ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দীকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় এবং ২৩ তারিখ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে ১০ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে কৃতজ্ঞ চিত্তে প্রিয় নেতাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

এরপর ’৫২ ও ’৬৯-এর রক্ত স্রোত পথ বেয়ে আসে ’৭১-এর একুশে ফেব্রুয়ারি। ’৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে আমরা বিজয়ী হয়েছি। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে জেনারেল ইয়াহিয়া খান তখন নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। সে-সব ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ছিন্ন করে ’৭১-এর একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শহীদ মিনারের পবিত্র বেদীতে পুষ্পমাল্য অর্পণের পর (আমার হাতে ছিল হ্যান্ডমাইক) বলেছিলেন, ‘শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দিব না। চূড়ান্ত ত্যাগ স্বীকারের জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। জননী জন্মভূমির বীর শহীদদের স্মরণে শপথ নিয়ে বলছি যে, রক্ত দিয়ে হলেও বাংলার স্বাধিকার আদায় করবো। যে ষড়যন্ত্রকারী দুশমনের দল ১৯৫২ সাল হতে শুরু করে বারবার বাংলার ছাত্র-যুবক-কৃষক-শ্রমিককে হত্যা করেছে। যারা ২৩ বছর ধরে বাঙালির রক্ত-মাংস শুষে খেয়েছে, বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন বানচালের জন্য, বাঙালিদের চিরতরে গোলাম করে রাখার জন্য তারা আজও ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। শহীদের আত্মা আজ বাংলার ঘরে ঘরে ফরিয়াদ করে ফিরছে, বলছে, বাঙালি তুমি কাপুরুষ হইও না। স্বাধিকার আদায় করো। আমিও আজ এই শহীদ বেদী হতে বাংলার জনগণকে আহ্বান জানাচ্ছি, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, প্রস্তুত হও, দরকার হয় রক্ত দিবো। কিন্তু স্বাধিকারের দাবির প্রশ্নে কোন আপোষ নাই।’ অমর একুশে পালনে শহীদ মিনারে ব্যক্ত করা জাতির জনকের এই অঙ্গীকার আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেছি।

একুশে ফেব্রুয়ারি যুগে যুগে আমাদের প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। বিশেষ করে ’৫২, ’৬৯ এবং ’৭১-এর একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে অনন্য উচ্চতায় আসীন।একুশের চেতনার পতাকা হাতে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সুন্দরভাবে সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে একের পর এক লক্ষ্যপূরণ করছে। সবধরণের প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সমগ্র বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জনহিতকর এসব সাফল্য বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। মহান একুশের চেতনায় জাগ্রত বাংলার মানুষ অতীতের মতো ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের আর্থসামাজিক বিকাশ আরও বেগবান করবে-এই হোক এবারের একুশের অঙ্গীকার।

লেখক: সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ; সংসদ সদস্য; বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ।

;