গণজাগরণের ১০ বছর: ‘ফিকে’ হতে যাওয়া স্বপ্ন আমার!



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

৫ ফেব্রুয়ারি; বাংলাদেশের তারুণ্যের অগ্নিঝরা দিন। ২০১৩ সালের এই তারিখে জেগেছিল দেশ, যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে। মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের দুঃখজনক গণহত্যা অধ্যায়ের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশীদার মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বিক্ষুব্ধ জনতার প্রকাশ ঘটেছিল, গণজাগরণে।

এই গণজাগরণ সফল হয়েছিল, যার পথ ধরে আইনের সংশোধনী আনা হয় সংসদে। মানবতাবিরোধী অপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন রায় উচ্চ আদালতে গিয়ে ফাঁসির দণ্ডে পরিণত হয়। এরপর আইনি পথ ধরে একে একে সর্বোচ্চ দণ্ড ঘোষিত হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের। অনেকের দণ্ড কার্যকর হয়েছে, অনেকের বিচার উচ্চ আদালতে আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। কেবল বিচারই নয়, দেশের মানুষ বিশেষ করে তরুণ সমাজ একাত্তরকে কতটা ধারণ করে তার প্রকাশ ঘটেছে। যুদ্ধাপরাধে সরাসরি জড়িত জামায়াতে ইসলামি ও এর ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্রশিবিরের প্রতি মানুষের ঘৃণার প্রকাশ ঘটেছে। দাবি ওঠেছে নিষিদ্ধের, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই দাবি পূরণ হয়নি।

দীর্ঘ মুক্তির সংগ্রাম শেষে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত দেশ, এই যুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহিদের আত্মত্যাগ, দুই লাখ নারীর প্রতি সহিংসতা- বিশ্বের ইতিহাসে এত বেশি আত্মত্যাগ ও সহিংসতার নজির না থাকলেও এই দেশ মুক্তিযুদ্ধের পথ ধরে এগোয়নি। মুক্তিযুদ্ধকে ভুল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধে শহিদের সংখ্যা নিয়ে অযাচিত বিতর্ক তোলা হয়েছে, একাত্তরকে ভুলে যাওয়ার নসিহত দেওয়া হয়েছে; যা স্পষ্টত একাত্তরকে অস্বীকার করা, তবু জাগেনি দেশ এতদিন। নব্বই দশকে শহিদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলন হয়েছে, সেই আন্দোলন দমাতে অসম সাহসী এই বীরমাতার বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাও। শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম নির্বিঘ্নে রাজনীতি করে গেছে, তার দলের একাধিক নেতা পেয়েছে মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব। মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদ নামের এ দুজনও ছিল শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী, বাংলাদেশের সরাসরি শত্রু; তাদের গাড়িতেও তুলে দেওয়া হয়েছে লাল-সবুজের পতাকা। অপমানিত পতাকার বাতাসের দুলুনিতে নড়তে দেখেছি আমরা অথচ চাপা কান্নার আওয়াজ শুনিনি। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-সরকার এ দুজনকে মন্ত্রী করেছে। কেবল মন্ত্রিত্ব দানই নয়, আদর্শিক মোহনায় মিলিত হয়েছিলে তারা; একই সঙ্গে অযাচিত ও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে দেশকে ঠেলে দিয়েছিলেন পাকিস্তানি ভাবধারার দিকে। একাত্তরের পরাজিতদের স্বাধীন দেশে এমনতর বিজয়ে সংক্ষুব্ধ হয়েছিল ঠিক একাত্তরধারী প্রজন্ম, তবে এর প্রকাশ আগে সেভাবে হয়নি; হয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর অনুকম্পার রায়ে। ইতিহাস তো এমনই, এক ঘটনা ধরে টান দিতে জানে পুরো শেকড়। তেরোর গণজাগরণ তেমনই এক!

একাত্তরকে ভুলে যাওয়ার সেই সে নসিহত, একাত্তরের গণহত্যাকারীদের রাজনৈতিক পুনর্বাসন সত্ত্বেও এই দেশের মানুষের মধ্যকার দেশপ্রেম, একাত্তর-সংযোগের যে ধারাবাহিকতা সেটাকে সফল করতে ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অঙ্গীকার করে। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ তারুণ্য আওয়ামী লীগের সেই অঙ্গীকারে আস্থা স্থাপন করে তাদেরকে এনে দেয় ভূমিধ্বস বিজয়। ক্ষমতায় যাওয়ার পর শেখ হাসিনা অঙ্গীকারকে ভুলে না গিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচারের পথ রচনা করেন। তারপর ২০১৩ সালে আসে প্রথম রায়, যে রায়ে যুদ্ধাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন দণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সে রায়কে মানেনি তারুণ্য। সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানায়, নেমে আসে রাজপথে। যাবজ্জীবন দণ্ড পেয়ে ভি-সাইন দেখানো কাদের মোল্লার ঔদ্ধত্য তাদেরকে বিক্ষুব্ধ করে। তারুণ্যের সেই গণজাগরণে সরকার অপরাধের ব্যাপকতা বুঝতে পেরে মানবতাবিরোধী অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তিকে প্রচলিত আইনের সর্বোচ্চ শাস্তির সমান করে, যাতে খুলে যায় দণ্ডের সর্বোচ্চ ব্যবহারের সুযোগ। গণজাগরণ সফল হয়।

গণজাগরণ কেবল মানবতাবিরোধী অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তির নিশ্চয়তার পথ খুলেনি, এটা একাত্তরবিরোধীদের রাজনীতির সুযোগের বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে যা অসাম্প্রদায়িক একটা দেশের কথা বলছিল। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের বিরুদ্ধে বলেছে, জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি করার অধিকারের জায়গায় প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকেছে। এতে বিক্ষুব্ধ হয়েছে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি, পাকিস্তানি ভাবধারায় পরিচালিত রাজনৈতিক দলগুলো। জামায়াত-শিবির, বিএনপি, হেফাজতে ইসলামের আদর্শে টান দেওয়ায় তারা এই গণজাগরণের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নামে। এরপর ব্যাপক শো-ডাউনে দেশকে অচল করে দেওয়ার স্পর্ধা দেখায়। রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতের শো-ডাউন, সহিংসতায় প্রকাশ্যে-গোপনে সহায়তা করে বিএনপি-জামায়াত ও আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে থাকা সুযোগসন্ধানীর দল। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবির গণজাগরণের বিরুদ্ধে নামতে তারা আশ্রয় নেয় ধর্মের। গণজাগরণের সঙ্গে জড়িতদের ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে তারা প্রচার চালায়, হামলে পড়ে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জায়গার শহিদ মিনারে। গণজাগরণ রুখতে ধর্মের এই অপব্যবহারে বিভ্রান্ত হয় একাত্তর নিয়ে দোদুল্যমান জনগোষ্ঠী, তাদের অনেকেই গলা মেলায়।

তেরোর সেই সে গণজাগরণে একাত্তরের পর দেশ ফের জেগেছিল একাত্তরের চেতনায়, হয়েছিল ঐক্যবদ্ধও। সরকারও শুরুতে বাধা দেয়নি। তবে যে-ই না ধর্মের ব্যবহার হয়েছে তখন থেকেই সরকারের ভেতরে থাকা আদর্শিক চেতনার দোদুল্যমান গোষ্ঠীও বিভ্রান্ত হয়েছে। গণজাগরণ ইসলামবিরোধী, গণজাগরণে অংশ নেওয়া তরুণ-তরুণীরা ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত- এমন প্রচারণা জোরদার হওয়ায় শুরু আদর্শিক স্খলনের। এটা রুখে দেওয়া সম্ভব ছিল সরকার-দলের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ জনগোষ্ঠীর আধিক্য থাকলে। হতাশার কথা এই সংখ্যা খুব বেশি অবশিষ্ট নেই। ফলে গণজাগরণের রাজনৈতিক সুফল ভোগ করলেও গণজাগরণের আদর্শিক ফল ঘরে তুলতে আগ্রহ দেখায়নি সরকার। তারুণ্যের কাঁধে চড়ে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অংশগ্রহণহীন পরের নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েছে। তারুণ্য এখানে নির্বাচনী গণতন্ত্রকে মুখ্য না ভেবে একাত্তরের চেতনাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার বাসনায় হয়ে পড়েছিল নীরব দর্শক।

তবু কি গণজাগরণের দাবিগুলো পূরণ হলো? না, হয়নি। এখানে রাজনৈতিক যে প্রতারণার অধ্যায় সূচিত হলো তাতে অনুঘটক হয়েছে ‘বিকল্প কোথায়’ শীর্ষক সস্তা স্লোগান! এই ‘বিকল্প কোথায়’ সস্তা স্লোগান হলেও সত্যি কথা বলতে কী এটাও ছিল তখনকার বাস্তবতার একটা অংশও। কারণ সরকারবিরোধী প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি দলীয়ভাবে এই গণজাগরণের বিরোধিতা করেছিল। বিএনপি চেয়ারপারসন নিজেই গণজাগরণের আন্দোলনকারীদের ‘নষ্ট ছেলে-মেয়ে’ বলে কটূক্তি করেছিলেন। বিএনপির এই বিরোধিতা মূলত তাদের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলামির প্রতি অন্ধ পক্ষাবলম্বনের পাশাপাশি তাদের নিজেদের দলের একাধিক মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বাঁচাতে।

আওয়ামী লীগ তারুণ্যের এই আন্দোলনের চেতনাকে ধরে রাখতে চায়নি মূলত দলটির আদর্শিক রূপান্তরের কারণে। শহিদ জননী জাহানারা ইমামের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার অংশগ্রহণ ছিল, ছিল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতার অংশগ্রহণও। সে অংশগ্রহণ যতটা না ছিল রাজনৈতিক অভিলাষ পূরণের নিমিত্তে তারচেয়ে বেশি ছিল আদর্শিক। তেরোর গণজাগরণে আওয়ামী লীগের সমর্থনকে অস্বীকার করার উপায় নাই, কিন্তু এই সমর্থনের পাশাপাশি তারা এটাকে রাজনৈতিকভাবেই ক্যাশ করতে চেয়েছে, করেছেও। মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেও দলটি আদর্শিকভাবে কতটা ধারণ করে সেটা এখন প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ রাষ্ট্রধর্মের ধারণার নির্বাসন এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দলটি ওই পথে হাঁটছে না, এড়িয়ে যাচ্ছে। একাত্তরের গণহত্যার অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামির রাজনীতিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি। বরং এর জন্যে তারা আদালতের দোহাই দিচ্ছে। অথচ জামায়াতে ইসলামিকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নতুন কিছু নয়, এর আগেও বাংলাদেশে এমনকি পাকিস্তানেও নিষিদ্ধ হয়েছিল গণধিকৃত বিতর্কিত এই দল।

তেরোর গণজাগরণ সফল হয়েছিল, তবে সাফল্যের এই ধারাবাহিকতা আমরা ধরে রাখতে পারিনি; সরকারও ধরে রাখতে চায়নি। ফলে শীর্ষ কজন যুদ্ধাপরাধীর দণ্ড কার্যকরের পর গতি-মন্থরতায় ভুগছে এই বিচার প্রক্রিয়া। এখনও বেশ ক’জন যুদ্ধাপরাধীর আপিল উচ্চ আদালতে শুনানির অপেক্ষায়। গত পাঁচ-ছয় বছরে একজন যুদ্ধাপরাধীরও শাস্তি কার্যকর হয়নি। বিচারের অপেক্ষায় থাকা মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত অনেকের স্বাভাবিক মৃত্যুও হচ্ছে। গণজাগরণের সকল দাবির যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণ অনেক, তবে মূল কারণ নিজেদের স্বার্থে একটা সময়ে ব্যবহারের পর দাবির প্রতি ক্ষমতাসীনদের অনীহা। এছাড়া আছে আদর্শিক স্খলনের পথে অনেকের অনেক দূর হেঁটে যাওয়া হয়ে গেছে যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন। ধর্মকার্ড এখানে শক্তিমান হয়েছে যেখানে গণজাগরণকে সমর্থন দেওয়া মানে ধর্মবিরোধী হয়ে যাওয়ার অপপ্রচারে বিশ্বাস অনেকের। এছাড়া আছে সেই তারুণ্য যারা নিজেদের দাবি আদায় করেই ঘরে ফিরে গেছে, পুনর্বার মাঠে নামার তাগিদ অনুভব করছে না। তবে মাঠে নামার তাগাদা না থাকুক তবে সচেতনতা থাকার দরকার ছিল সেই সে তারুণ্যের। এখানে দলীয় বিভাজনের সংকীর্ণতা আছে, আছে হতাশাও। এর সুযোগ যারা নেওয়ার নিয়েছে, নিয়ে চলেছে।

তেরোর গণজাগরণের তারুণ্যের বড় অংশ এখনও স্বপ্ন দেখে একাত্তরের সেই চেতনার সফল বাস্তবায়নের। স্বপ্ন দেখে সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির, স্বপ্ন দেখে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দল জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের। তাদের নিজেদের গড়া ইতিহাস নিয়ে তারা গর্বিত। তাদের এই গর্ব ব্যক্তিগত অর্জনই থেকে যাচ্ছে সকল দাবির বাস্তবায়ন না হওয়ায়।

তেরোর গণজাগরণের এক দশক পূর্ণ হয়েছে আজ। এই দশ বছরে যুদ্ধাপরাধীমুক্ত ধর্মনিরপেক্ষ দেশ আর বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার আমাদের স্বপ্ন ‘ফিকে’ হতে যাওয়ার বাস্তবতা টের পাচ্ছি!

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

   

মধ্যবিত্তের কোরবানি ঈদ কতটুকু সুখকর?



সায়েম খান, লেখক ও কলামিষ্ট
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এ বছর গোটা দেশব্যাপী নানা উৎসাহ উদ্দীপনার মাঝে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল-আজহা পালিত হলো। অন্যান্য মুসলিম দেশের মতো বাংলাদেশের লাখ লাখ মুসলমানরাও ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে ইসলাম ধর্মের রীতি অনুযায়ী পশু কোরবানি দিয়েছেন। কিন্তু মধ্যবিত্তের এই ঈদ উদযাপন কতটুকু সুখকর ছিল তার একটি সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এ বছর কোরবানিকৃত পশুর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৪ লাখ ৮ হাজার ৯১৮টি। যেখানে গত বছর অর্থ্যাৎ ২০২৩ সালে কোরবানিকৃত গবাদিপশুর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৪১ হাজার ৮১২টি। গত বছরের তুলনায় ৩ লাখ ৬৬ হাজার ১শ ৮৮টি পশু বেশি কোরবানি দেওয়া হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে এ বছর ৩.৭ শতাংশ পশু গত বছরের তুলনায় বেশি কোরবানি দেওয়া হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক অনুযায়ী এই সংখ্যা করোনার পর থেকে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু কোরবানির পশু বিক্রির পরিমাণ প্রতি বছর বৃদ্ধি পেলেও তার কতটুকু সুষম বন্টন হচ্ছে?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাধ, সাধ্য ও সামর্থ্যের মধ্যে কোরবানি পশু কেনার সামর্থ্য রাখে সমাজের উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণি। আর এই কোরবানির পর বন্টনকৃত মাংসের সিংহভাগ বিতরণ দরিদ্র শ্রেণির মানুষের মাঝে। উচ্চবিত্তরা চাইতে পারে আর দরিদ্র শ্রেণিরা নিতে পারে নির্দ্বিধায়। উচ্চবিত্তদের ফ্রিজ বন্দী মাংসের পাহাড় জমাটবদ্ধ হওয়ার পরে অতিরিক্ত মাংস দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করেই তারা ত্যাগের মহিমায় ভাসতে থাকে। শুধু এই কোরবানির মাংস বন্টনের পর প্রাপ্তিতে উপেক্ষিত হয় মধ্যবিত্ত শ্রেণি। তারা না পারে কোরবানি দিতে, না পারে চাইতে। চড়া দামে গরু কিনতে অপারগ মধ্যবিত্ত ক্রেতা বাজার ঘুরে খালি হাতে বাড়ি ফেরারও অনেক উদাহরণ তৈরি হয়েছে এই বছর।

আমাদের দেশে কোরবানি পশু কেনার সামর্থ্য না থাকলে বা না কিনতে পারলে এর একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে আশেপাশের মানুষজন বা আত্মীয়-স্বজনের কাছেও হেয় প্রতিপন্ন হতে হয় কোরবানি না দিতে পারা মানুষটির। অনেকে মধ্যবিত্ত পরিবার আবার লোক লজ্জার ভয়ে ধার করেও কোরবানির পশু কিনে কোরবানি দিয়ে থাকেন। যার দেনা তার শোধ করতে হয় সারা বছর জুড়ে। অথচ ইসলামে স্পষ্ট বলা হয়েছে, সামর্থ্য না থাকলে কোরবানি দেয়া বাধ্যতামূলক নয়। এক দল কোরবানির পশুর উচ্চমূল্যের কারণে কেনার সামর্থ্য হারাচ্ছে, আরেক দল কোরবানির জন্য পশু কিনে তার কেনা পশুর পাশে দাঁড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুই আঙুলে (V) চিহ্ন প্রদর্শন করে নিজেকে বিজয়ী জাহির করছে। আদতে এটাই কি কোরবানির ধর্মীয় মূল্যবোধ? এটাই কি ত্যাগের মহিমা? যুগের পর যুগ ধরে আমাদের দেশে চলছে ধর্মের নামে এই সামাজিক অবক্ষয়। কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এটি দ্বারা উঁচু-নীচু আর ধনী-দরিদ্রের একটি নেতিবাচক পার্থক্য নিরূপিত হয়।

মধ্যবিত্তের কোরবানি ঈদ কোনো সময়ই সুখকর কিংবা আনন্দদায়ক ছিলনা। আজ থেকে দেড় দুইশ বছর আগে ঈদুল আজহাকে বলা হত বকরী ঈদ। সেই সময় বকরী ঈদ এখনকার মত এত আড়ম্বরপূর্ণ ছিলনা। শহরের মোড়ে মোড়ে এত পশুর হাটও বসত না। অবস্থাসম্পন্ন লোকেরা কোরবানি করত আর তা পাড়া-প্রতিবেশি, আত্মীয়-স্বজন ও দরিদ্রদের মাঝে তা বিলিয়ে দেয়া হত। ব্রিটিশ আমলে বকরী ঈদে সরকারি ছুটির দিন একদিন ছিল। প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, "মহররম পর্বে আমাদের বাড়িতে এত ধুমধাড়াক্কা হইলেও দুই ঈদে কিন্তু অমন কিছু হইত না। বকরী ঈদে প্রথম প্রথম দুই-তিনটা ও পরে মাত্র একটা গরু কোরবানি হইত।" বর্তমান সময়ের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের মতই তখনকার সময়ের মধ্যবিত্তদের কাছেও বকরী ঈদে কোরবানির পশু কেনা ছিল আকাংখার। যাদের কোরবানির পশু কেনার সামর্থ্য নাই সেই মানুষগুলোর ঈদের আনন্দ ফিকে হয়ে যায়।

কোরবানি ঈদ একটি মাত্র বিশেষ উৎসব যেখানে আমরা দেখতে পাই মুসলমানদের ঘরে ঘরে একসঙ্গে "গরুর মাংস" খাওয়া হয়। সারা বছর নিয়মিত মাংস না খেলেও বছরের এই বিশেষ দিনটিতে আমরা মাংস খেয়ে পরিতৃপ্ত থাকি। গরুর মাংসের ভোক্তা হিসাবে পৃথিবীতে বাংলাদেশের অবস্থান সর্বনিম্নে। ষ্ট্যাটিসটিকা.কমের তথ্যমতে ওয়ার্ল্ড বীফ কনজাম্পসনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানুষ প্রতি বছর জনপ্রতি ০.৮৩ কিলোগ্রাম গরুর মাংস খায়। এই তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে সবচেয়ে কম মাংস খায় বাংলাদেশের মানুষ। আর  বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মাংস ভক্ষণকারীদের দেশ হলো আমেরিকা। ওয়ার্ল্ড বীফ কনজাম্পসনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি বছর আমেরিকানরা জনপ্রতি ৫০ কিলোগ্রাম মাংস খেয়ে থাকে। একই সূত্রমতে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে ভারত বীফ কনজাম্পশনের দিক থেকে বিশ্বে চতুর্থ।

ইসলাম শান্তি, সাম্য ও ত্যাগের ধর্ম, ভোগের নয়। কোরবানির পশু কিনে তা নিজের উদরপূর্তির জন্য মহান আল্লাহ তা'আলা কোরবানির নির্দেশ দেননি। কোরবানির বিষয়ে আমরা যদি আল্লাহর নির্দেশিত পথ অনুসরণ করি তাহলে আমাদের অভাবী প্রতিবেশীর উনুনেও ঈদের দিনের মজাদার রান্না হত। এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে ঢাকা শহরের মধ্যবিত্ত মানুষের গড় আয় ৪০ হাজার টাকার কাছাকাছি। এই আয় টাকায় কোন ভাবেই লাখ টাকার গরু কেনার সামর্থ্যবান ক্রেতা পাওয়া খুব দুরূহ। তাই কোরবানি দেয়ার মতো সামর্থ্যবান মানুষদের উচিৎ নিজ উদ্যোগে সামর্থ্যহীন মানুষদের খোঁজে বের করে তাদের মাঝে মাংস বিলিয়ে দিয়ে তথা ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে সাম্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। এতে করে উঁচু-নিচু আর জাত-পাটের পার্থক্য ঘুচবে।

;

কালো টাকায় সাদা পশু কোরবানি



প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

সংসার খরচের জন্য বাজারে যাওয়ার কথা শুনলে ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা আমার মধ্যে কাজ করে। প্রতিবছর ঈদুল আজহা সমাগত হলে পশুর হাটে যাওয়া চাই। নিজে পছন্দ করে কোরবানির গরু-ছাগল কেনার কোনো বিকল্প নেই। করোনাকালে ডাবল মাস্ক মুখে দিয়ে পশুর হাটে গিয়েছিলাম। এবার করোনার ভয় নেই তবে ‘হিট অ্যালার্ট’-এর মতো অবস্থা আমাদের এলাকায়।

তার ওপর জুন মাসেও একটানা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বৃষ্টির দেখা নেই। প্রচণ্ড গরম! রোদে পুড়ে সাগরেদদের সঙ্গে নিয়ে যথারীতি কোরবানরি পশু কেনার জন্য হাটে রওয়ানা দিয়েছি। সঙ্গে বিশ্বস্ত লালমিয়া, আলী ও ভুট্টোকে (ছদ্মনাম) সংযুক্ত করেছি।

হাটে পৌঁছালে সেই এলাকার পরিচিত মাজদার আলীও সঙ্গ দেবে বলেছে। গরুর হাটে গাড়ি নিয়ে যাওয়া গেলেও হাটের কাছে গাড়ি রাখার জায়গা পাওয়া খুব কঠিন। সে কারণে অটোভ্যানে করে সবাই একসংগে বসে চারদিকে পা ঝুলিয়ে পথ চলেছি। গল্পও চলছে মজার মজার। ভুট্টো হঠাৎ জোরে বলে উঠলো- ‘এবার মজা বোঝো! আলী বললো, কী রে! কীসের মজা কাকে বোঝাচ্ছিস’!

ভুট্টো শুরু করলো, সকালে টিভি নিউজের একটি সূত্র ধরে নানান কথা। তা হলো, বড় গরুর একদম কদর নেই ঢাকার পশুর হাটে। খুলনার ফুলতলা থেকে গাবতলীর হাটে একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এসেছেন তার চারবছর বয়েসি ‘নান্টু’ নামক এক বিশালদেহী ষাঁড় নিয়ে।

তার আশা ছিল, এবার ৩৪ মণ ওজনের গরুটি বিক্রি করে অনেক লাভ হবে। গরুর লালন-পালনের খরচ মিটিয়ে লাভের টাকায় ঋণের বোঝা শোধ হবে। কিন্তু তার আক্ষেপ হলো, গত তিনদিন ধরে গাবতলীর হাটে তার বিশালদেহী নান্টুকে অনেকে দেখে বলেছে- ইস! কত বড় গরু! কিন্তু কেউ কেনার জন্য দরদাম করেনি। ২০ লাখ টাকা দাম হাঁকালেও কেউ ২০ টাকাও দাম বলেনি!

তখন ঈদের একদিন মাত্র বাকি। এরইমধ্যে বিক্রি করা না গেলে নান্টুকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খেতে দেওয়ার সামর্থ্যও নেই তার। সেজন্য গরুর মালিক খুব ভেঙে পড়েছেন। তার চোখে শুধু পানি বের হচ্ছে।

এবার আলী বললো, এটা তো কষ্টের কথা! এতে মজার কী দেখলে!

ভুট্টো উত্তর দিলো, মজাটা কালো টাকার! এবার কালো টাকার মালিকরা ভয় পেয়ে কেউ বড় গরু কিনতে এগিয়ে আসছেন না। সে কারণে এবারের ঈদের হাটে বড় গরু কেনার খরিদ্দার নেই। যারা দেশের রিমোট এলাকা থেকে ট্রাক ভাড়া করে ঢাকায় গরু বিক্রি করতে এসেছেন দুই পয়সা লাভের আশায়, তারা বিক্রি না হওয়ায় হতাশ হয়ে কান্নাকাটি করছেন।

কালো টাকা অনেকের কাছেই আছে। কালো টাকা সাদা করার জন্য সরকারি ঘোষণা শুধু ফ্ল্যাট, বাড়ি বা জমি কেনার জন্য ঘোষণা দেওয়া হয়েছে কিন্তু কোরবানির গরু কেনার জন্য ঘোষণা দিলে আজ এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে হাটে বসে কান্নাকাটি করতে হতো না!

এটা বেশ মজার বিষয় সৃষ্টি করতো না! তাই বলছি, কালো টাকা সাদা করার ঘোষণার ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব করা হয়েছে। গরিবদের কথা ভাবা উচিত ছিল, তাই না! তা না-হলে কালো টাকা দিয়ে হাট থেকে সাদা রঙের গরু কিনে কোরবানি দেওয়া যাবে, এমন ঘোষণা দেওয়া উচিত ছিল!

কিন্তু তার যুক্তি শুনে লালমিয়া কিছুটা রাগ করে পাল্টা বক্তব্য শুরু করলো। তার কথা হলো, কালো টাকা দিয়ে সাদা কেন কালো বা বাদামি গরু কিনলেও কোরবানি দেওয়া যাবে না।

ভুট্টো সাথে সাথে লালমিয়ার পক্ষে যোগ দিলো। ভ্যানচালক পিছনে ফিরে আলোচনায় যোগ দিতে উদ্যত হলে আমি জোর গলায় পিছনে না তাকিয়ে ভালোভাবে ভ্যান চালাতে নির্দেশ দিলাম।

আলী বললো, ভুট্টো, তুই একটা বলদ রে! ওই ওনার মতো, যিনি কালো টাকা বানিয়ে সাদা করার আগেই ধরা পড়ে বিদেশে পালিয়ে গেছেন। আহা! এতগুলো বাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি যদি এবারের বাজেট ঘোষণার পরে কেনার সুযোগ পেতেন, তাহলে তাকে আর দেশ ছেড়ে পালাতে হতো না!

ওদের আালোচনা শুনতে বেশ ভালোই লাগছিল। ইতোমধ্যে, কখন যে হাটের সন্নিকটে এসে পড়েছি, তা টেরই পাইনি। হাজার হাজার গরু, ছাগলের ভ্যান, ট্রাক, মানুষের কোলাহলে সম্বিত ফিরে পেতেই আমাদের অটোভ্যানটি থেমে গেল। আমরা সবাই নেমে হাটের দিকে রওয়ানা দিলাম।

হাটে ঢুকতে ঢুকতে মনের ভেতর দাগ কেটে থাকলো ভুট্টোর সেই বিখ্যাত উক্তি- ‘কালো টাকা দিয়ে সাদা গরু কিনে কোরবানি দিলে হয় না’!

কালো টাকা সাদা করে বাড়ি কিনে যদি থাকা যায়, হোটেলে বসে যদি দামি খাবার খাওয়া যায়, তাহলে সেই টাকায় হজ্জ করতে গেলে কেমন হয়! কোরবানি দিলে কেন অন্যায় হয়! আমার মাথা ঘুরপাক খেতে লাগলো। দেখতে দেখতে আমার বাহারি নানা রঙের গরু, ছাগলের সারি পেরিয়ে হাটের মাঝে উপনীত হলাম।

আমিও অজান্তেই সাদা রঙের পশু দেখলে তার দিকে ‘ফ্যাল ফ্যাল’ করে চেয়ে দেখতে লাগলাম। আর মনে হতে লাগলো, ‘কালো আর ধলো বাহিরে কেবল ভেতরে সবারই সমান রাঙ্গা।’
তবে কেন এই বৈষম্য! কেন এত জালিয়াতি ও বৈপরীত্য! এত ভেদাভেদ! কেন এত চুরি, ডাকাতি, দুর্নীতি, রাহাজানি! এত মিথ্যা মামলা মোকদ্দমা, হামলা খুন-খারাবি!

সাদা পশু আমার কেনা হলো না! ভাবলাম, আমাদের টাকা তো আর সাদা-কালো নয়। এটা হালাল উপার্জনের, কষ্টার্জিত টাকা! এ টাকা দিয়ে পৃথিবীর যে কোনো রঙের, ঢংয়ের পশু, দ্রব্য কিনতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। যে কোনো খাদ্যদ্রব্য কিনে খেতে বা ভোগ করতেও বাধা নেই, দোষও নেই! অর্থনীতির ভাষায় বর্ণিত কালো টাকা দিয়ে কিনে খেতেও দোষ নেই। তবে দোষটা অন্যখানে- যেটা মনে ভেতর, আত্মার সঙ্গে আতরামি করার ভেতর।

মহান সৃষ্টিকর্তার নির্দেশনার ওপর যেটা নির্ভর করে থাকে। নির্দেশিত যে বাণী সৃষ্টিকর্তার প্রেরিত মহান মহাপুরুষ নবী (সা.) প্রদর্শিত পথের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে পৃথিবীর অন্ধকার সরিয়ে আলোর ওপর আলো ছড়িয়ে জড়িয়ে রেখেছে পরস্পরকে।

সূরা নূরে (২৪:২৯) বলা হয়েছে, ‘নূরুন আ’লা নূর’ অথবা সুরা মায়েদা (২৭:৩১) বর্ণিত নিজ শিশুপুত্রকে কোরবানি দানের মাধ্যমে মহান আত্মৎসর্গের কথা, তাক্কওয়া সৃষ্টির কথা।

যে জ্ঞান ও আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে মনের পশুত্বকে জবাই করে আমরা কোরবানির হাটে একটি বা দুটি সাদা পশুকে কিনতে এসেছি; যাদের শুধু বাহ্যিক দেহাবরণের রং দিয়ে মুমিন মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবকে বিচার করা যায় না।

এবারের জাতীয় বাজেটে কালো টাকা সাদা করার ঘোষণায় নানা বিতর্কের মন্তব্য এসছে- ‘কালো টাকা সাদা করা অসাংবিধানিক’, ‘বৈষম্যমূলক’, ‘দুর্নীতিবান্ধব’ এবং প্রধানমন্ত্রীর ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ ঘোষণার পরিপন্থি।

দেশে একশ্রেণির মানুষ অবৈধভাবে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে। এদের প্ররোচনায় বাধাগ্রস্ত হয় সততা। জিইয়ে থাকে, মাদক ব্যবসা, অনৈতিক লেনদেনের সিস্টেমগুলো।

কালো টাকার জন্ম অন্ধকারের ঘুপচি গলিতে। সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, জালিয়াতি, মিথ্যা, প্রতারণা, কর ফাঁকি, চুরি-ডাকাতি, প্রতারণা, চোরাচালানি, অবৈধ মাদক ব্যবসা, ব্যাংক লুণ্ঠন, মানি লন্ডারিং, জমি জবরদখল, নদীদখল, ভেজালদ্রব্য তৈরি ও বিক্রি, সর্বোপরি মাজার ব্যবসা, জাকাত ফাঁকি- ইত্যাকার নানান বাজে পন্থা হলো কালো টাকার আঁতুড় ঘর।

এসব হোমড়া-চোমড়া দেশের কর প্রদান করতে গেলে ধরা পড়তে পারে, তাই এরা একদিকে সঠিক পরিমাণ কর দেয় না, জাকাত দেওয়া থেকে বিরত থাকে। সে কারণে এদের দিয়ে রাষ্ট্রের আর্থিক কোনো মর্যাদা বাড়ে না, দরিদ্র মানুষের কল্যাণও সাধিত হয় না।

কালো টাকা সাদা করার সংবাদ দুর্নীতিকে বহুগুণে উস্কে দেয়। বাজেটে কালো টাকা সাদা করার অবদান যতই থাকুক না কেন, তা অবৈধ, না-পাক!

অর্থনীতির ভাষায় যিনি যতই জোর গলায় কালো টাকা সাদা করার সাফাই গেয়ে যুক্তি দিন না কেন, গোয়ালা গাভীর দুধ দোহনের সময় এক বালতি দুধে এক ফোঁটা প্রস্রাব যদি অনবধানবশত ছিটকে পড়ে, তাহলে একজন পবিত্র মানুষ কি জেনেশুনে সেটা পান করতে চাইবেন! যেমন, কোরবানি দেওয়ার জন্য সাদা পবিত্র টাকার প্রয়োজনও ঠিক তেমনি।

প্রতিবছর কালো টাকা সাদা করার ঘোষণা দেওয়াটা আমাদের দেশের মানুষের ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটা দেশে হোয়াইট কালার ক্রিমিনালদেরকে আরো বেশি উৎসাহ দিচ্ছে এবং দুর্বৃত্তপরায়ণতাকে শক্তিশালী করে তুলছে।

কালো টাকার ব্যবহার ও উপার্জন অসততা ও নৈতিকতার অভাবের পরিচায়ক। কালো টাকার ব্যবহারে কোনো জীবনেই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বৈধ উপায় নেই। তাই, সাদামনের নিষ্পাপ মানুষদের উচিত, কালো টাকা থেকে দূরে থাকা এবং এই টাকার ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। কারণ, ধর্মীয় দৃষ্টিতে এটাকা দিয়ে দান ও জাকাত যেমন কার্যকর হয় না, তেমনি সাদা রঙের পশু কিনে কোরবানি দিলেও তা শুদ্ধ হওয়ার কথা নয়!

লেখক- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন।
E-mail: [email protected]

;

বাংলাদেশ কী একটি অনুদার সমাজে রূপান্তরিত হচ্ছে?



মো. বজলুর রশিদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

অনুদার সমাজ বলতে এমন একটি সমাজকে বোঝানো হয় যেখানে ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সমাজের মধ্যে সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার অভাব থাকে। এই ধরনের সমাজে মানুষ সাধারণত ভিন্নমত, ভিন্নধর্ম, ভিন্নজাতি এবং ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে থাকে।

অনুদার সমাজের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

প্রথমত, অনুদার সমাজে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত থাকে। ব্যক্তিরা তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারে না বা করলে তাকে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হয়। এর ফলে মানুষ তাদের চিন্তাভাবনা বা ধারণাগুলি মুক্তভাবে প্রকাশ করতে ভয় পায়।

দ্বিতীয়ত, এ ধরনের সমাজে ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা দেখা যায়। ভিন্নধর্মী, ভিন্নজাতি, ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়। সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই অসহিষ্ণুতা প্রায়ই বিভেদ এবং সংঘাতের সৃষ্টি করে।

তৃতীয়ত, অনুদার সমাজে সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য ও বিভাজন তীব্র থাকে। ক্ষমতার কেন্দ্রিকরণ এবং সমাজের কিছু গোষ্ঠীর প্রতি অতিরিক্ত সুবিধা প্রদানের কারণে অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। এতে সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় অসমতা ইত্যাদি সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে।

চতুর্থত, অনুদার সমাজে চরমপন্থী মতাদর্শ এবং সহিংসতা বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন চরমপন্থী গোষ্ঠী তাদের মতাদর্শ প্রচার করতে এবং ভিন্নমতের মানুষদের উপর আক্রমণ করতে তৎপর থাকে। এই ধরনের সহিংসতা এবং সন্ত্রাসবাদ সামাজিক স্থিতিশীলতা ও শান্তিকে ব্যাহত করে।

পঞ্চমত, অনুদার সমাজে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং শত্রুতা দেখা যায়। এক গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীকে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রু হিসেবে দেখে এবং এই শত্রুতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

অতএব, অনুদার সমাজে সামগ্রিকভাবে ব্যক্তির স্বাধীনতা, সম্মান, এবং নিরাপত্তা হ্রাস পায়। সমাজে শান্তি, স্থিতিশীলতা, এবং সামাজিক সুস্থতার অভাব থাকে, যা একটি সমাজের উন্নতি এবং অগ্রগতির পথে বড় বাধা সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে বলা যায় যে, কিছু ক্ষেত্রে দেশটি একটি অনুদার সমাজের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তবে এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো জটিল, কারণ বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো ও রাজনৈতিক পরিবেশের বিভিন্ন দিক আছে যা দেশটিকে এখনও উদারতার দিকেও ধাবিত করছে। বাংলাদেশের একটি অনুদার সমাজের দিকে ধাবিত হওয়ার কিছু লক্ষণ এবং কারণ নিচে তুলে ধরা হলো।

প্রথমত, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত ও সংঘাতময় হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে তীব্র বিরোধ ও সংঘাত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সমাজের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক সহিষ্ণুতার অভাব সাধারণ জনগণের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটাচ্ছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হ্রাস পাওয়ায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আশঙ্কা বৃদ্ধি পেয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় চরমপন্থা ও উগ্রবাদীর উত্থান বাংলাদেশের সমাজে অসহিষ্ণুতা বাড়াচ্ছে। কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠী ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে সহিংসতা ও বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় ও অবিশ্বাসের সৃষ্টি হচ্ছে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি স্বরূপ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে, যা দেশের উদার সমাজব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব, অপপ্রচার এবং বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের প্রচার সমাজে বিভাজন ও ঘৃণা সৃষ্টি করছে। মানুষ সহজেই ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে এবং সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই ধরনের অপপ্রচার ব্যক্তির স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকারকে সীমিত করছে এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতার অভাব সৃষ্টি করছে।

চতুর্থত, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সামাজিক অসাম্য সমাজে অসন্তোষের জন্ম দিচ্ছে। ধনী-দরিদ্রের মধ্যে পার্থক্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সামাজিক বিভেদকে তীব্র করছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন সত্ত্বেও, জনগণের একটি বড় অংশ এখনও দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে এবং তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই বৈষম্য সমাজে অসন্তোষ ও উত্তেজনা সৃষ্টি করছে, যা উদার সমাজের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

তবে, এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, বাংলাদেশের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উদারতার পক্ষে কিছু ইতিবাচক দিকও নির্দেশ করে। বাংলাদেশে বহু জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির সহাবস্থান রয়েছে এবং এ দেশের মানুষ সাধারণত সহনশীল ও সহমর্মী। সরকারের এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রচেষ্টায় সামাজিক স্থিতিশীলতা ও উদারতার উন্নয়নের চেষ্টা করা হচ্ছে।

সার্বিকভাবে, বাংলাদেশের কিছু সংকটপূর্ণ দিক অনুদার সমাজের দিকে ধাবিত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। তবে, এর সঙ্গে দেশের উদারতা ও সহিষ্ণুতার ঐতিহ্যও বিবেচনায় রাখতে হবে। বাংলাদেশের জনগণ এবং নেতাদের উদারতা, সহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মূল্যবোধকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

সেইসাথে, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক বিভাজন হ্রাসে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শুধুমাত্র এভাবেই বাংলাদেশ একটি আরও উদার এবং সহনশীল সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

মো: বজলুর রশিদ: সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা।

;

ঈদের বদলে যাওয়া



মযহারুল ইসলাম বাবলা
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

কালের বিবর্তনে কেবল ঈদই বদলে যায় নি। বদলেছে সমাজ, পরিবার, ব্যক্তি, পরিবেশ-প্রকৃতি, সামষ্টিক জীবনাচার হতে সমস্তই। একমাত্র ব্যতিক্রম রাষ্ট্র, শাসন ব্যবস্থা, শাসক চরিত্র। সেটি উপনিবেশিক আমলের ধারাবাহিকতায় আজও অনড় অবস্থানে। আমাদের সমাজজীবনে ঈদের এই বদলে যাওয়ার পেছনে সঙ্গত কারণ অবশ্যই রয়েছে। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার চরম প্রভাবে সামষ্টিক চেতনা-দৃষ্টিভঙ্গি বিলুপ্তির পথ ধরেই ঈদের এই বদলে যাওয়া। আমাদের সমাজ-জীবনে ধর্মীয় এবং জাতিগত উৎসব-পার্বণসমূহও আর পূর্বের ন্যায় নেই। কালের পরিক্রমায় সেগুলোর আচার-আনুষ্ঠানিকতাও বদলে গেছে। অতীতে দেখা ঈদের সঙ্গে এখনকার ঈদের বিস্তর ব্যবধান। একশত আশি ডিগ্রি বৈপরীত্য বললেও ভুল হবে না। ঈদের সামাজিকতার যে চিরচেনা ছবিটি আমাদের মনোজগতে স্থায়ীরূপে ছিল, বর্তমানের ঈদের সঙ্গে তা মেলানো যায় না। অতীতের ঈদের স্মৃতিকাতরতায় সংক্ষিপ্তভাবে তার চিত্র তুলে ধরবো। অনেকের কাছে এখনকার বাস্তবতায় সেটা রূপকথার ন্যায় মনে হতে পারে।

ঈদ উৎসবের প্রধান উপাদানটি সামাজিকতা। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে পারস্পরিক সম্প্রীতি-সৌহার্দ্যরে নির্মল প্রতীক। ঈদকে কেন্দ্র করে নজরকাড়া বৈষম্য আমরা এখন প্রবলভাবে প্রত্যক্ষ করি। অতিমাত্রায় ভোগ-বিলাসে মত্ত হবার প্রবণতাও দেখে থাকি; অতীতেও ছিল, তবে এরূপ মাত্রাতিরিক্ত ছিল না। ঈদের আনন্দ সবাই মিলে ভাগ-বাঁটোয়ারায় পালনের সংস্কৃতি ছিল। সেটি কালের গর্ভে এখন বিলীন হয়েছে। একটি শ্রেণি বিভক্ত সমাজে শ্রেণিগত ব্যবধান-বৈষম্য অতীতেও ছিল। কিন্তু এত অধিক মাত্রায় প্রকটভাবে ছিল না। আমরা ক্রমেই যে ব্যবস্থার অধীন হয়ে পড়েছি, সেটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। এখানে পুঁজিই সমস্ত কিছুর নিয়ন্ত্রকের চালিকা শক্তিরূপে রাষ্ট্রে-সমাজে, এমন কি পরিবারের অভ্যন্তরে পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছে। মানুষে মানুষে যে সহজাত সম্প্রীতির বন্ধনগুলো ছিল সেগুলো ছিন্ন এবং লুপ্ত হবার পথ ধরেছে। অথচ ঈদ উৎসবের প্রধান উপাদানটি সম্প্রীতির নির্মল সামাজিকতা। অতীত আর বর্তমানের ঈদের প্রধান পার্থক্য এখানেই। অতীতে সমষ্টিগতভাবে উৎসব পালনের রীতি-রেওয়াজ ছিল।

পারিবারিক এবং সামাজিক বাধ্যবাধকতাও এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করতো। এখন সেসবের বালাই নেই। এখন প্রত্যেকে যার-যার, তার-তার। অর্থাৎ ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার অদৃশ্য জালে সামাজিক চেতনা আটকে পড়েছে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় সেই জাল ছিন্ন করে বেরিয়ে আসার উপায়-সম্ভাবনা নেই। এই জাল অর্থাৎ মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা পুঁজিবাদের মৌলিক দর্শনের অন্তর্গত। ব্যবস্থা না পাল্টানো অবধি ঐ জালে আমরা আরো বেশি জড়িয়ে পড়বো। পরষ্পর পরষ্পর থেকে আরো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বো। তাই সর্বাগ্রে জরুরি ব্যবস্থার পরিবর্তন। সেটা না হওয়া পর্যন্ত আমাদের জীবনে সমষ্টিগত বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটবে না। বরং উত্তরোত্তর সেটা বৃদ্ধি পাবে।

পূর্বেকার ঈদ কেমন ছিল? সেকালের ঈদের প্রধান উপাদানটিই ছিল সামষ্টিক সামাজিকতা। ঈদ মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। ঈদে ধর্মীয় আচার বলতে দুই রাকাত ওয়াজেব নামাজ আদায় ব্যতীত আর কোনো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নেই। ওয়াজেব নামাজ ফরজ নয়। ফরজ আদায়ের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা থাকে। ওয়াজেব-এর ক্ষেত্রে সেটি নেই। সকল সম্প্রদায়েরই ধর্মীয় উৎসব-পার্বণ রয়েছে। সে সকল উৎসবসমূহে ধর্মীয় আচারের তুলনায় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতাই সর্বাধিক। উৎসবসমূহকে সম্প্রদায়গত সীমা অনায়াসে অতিক্রম করার বিস্তর সুযোগ রয়েছে। আমাদের ভূখ-ে এক সময়ে ধর্মীয় উৎসবে অন্য সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণের অজস্র নজির ছিল। ঈদ, পূজা, বড়দিনে বন্ধু, প্রতিবেশী হতে সামাজিক সম্পর্ক-সম্প্রীতিতে একে-অন্যের ধর্মীয় উৎসবে আমন্ত্রিত হত। যাওয়া-আসা, শুভেচ্ছা বিনিময় করতো। সম্প্রদায়গত ভিন্নতার পরও পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সামাজিকতার সংস্কৃতি ছিল। রক্তাক্ত দেশভাগে সেই সম্পর্কের বিনাশ ঘটে। আজাদ পাকিস্তানে ধর্মীয় জাতীয়তার চরম মাশুলের মুখে আবার জাগরণ ঘটে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার। সেই সুবাধে জাতিগত ঐক্য-সংহতির দুয়ার উন্মুক্ত হয়।

পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙ্গে নতুন রাষ্ট্র গঠনের পর এই বাংলাদেশে আবার সাম্প্রদায়িকতা মাথা চাড়া দেবে; সেটা ছিল কল্পনার অতীত। সামরিক শাসকদের বদৌলতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দুয়ার উন্মোচনের পথ ধরে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাড়-বাড়ন্ত বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভবিতব্য এই যে, বেসামরিক তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকারের শাসনামলেও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অবসান ঘটেনি। ভোটের রাজনীতির নিয়ামক শক্তিরূপে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সুরক্ষা ও বিকাশে যুক্ত দেশের এযাবৎ কালের প্রতিটি ক্ষমতাসীন সরকার। তুলনা বিচারে কম-বেশি হতে পারে কিন্তু ঐ ঘৃণিত পথটি কেউ পরিহার করে নি। উন্মুক্ত রেখেছে স্বীয় স্বার্থে।

কৈশোরে দেখেছি মাসব্যাপী রোজার শেষে ঈদের চাঁদ দেখতে মানুষ বাড়ির ছাদে, বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ভীড় করতো। চাঁদ দেখামাত্র শুরু হয়ে যেত আনন্দের উল্লাস প্রকাশ। পটকা, বাজি ফুটিয়ে আগত ঈদের আনন্দ প্রকাশ করা ছিল গতানুগতিক। মসজিদে-মসজিদে সাইরেন বাজিয়ে আগামীকালের ঈদের সংবাদ প্রচার করত। মসজিদ সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি অলিতে-গলিতে ঢুকে ঈদের নামাজের সময়সূচী চিৎকার করে বলে যেত। রেডিও-তে বেজে উঠতো কাজী নজরুল ইসলামের গান-রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদসহ বিভিন্ন ঈদকেন্দ্রিক গান। আজকে যেটা পুরান ঢাকা নামে খ্যাত। ঢাকা বলতে তখন ছিল এই পুরান ঢাকা’ই। নতুন ঢাকার গোড়াপত্তন শুরু হয়েছে। তবে তেমন জনবহুল হয়ে ওঠেনি। এই পুরান ঢাকার ঈদের সামাজিকতা একমাত্র গ্রামের সামাজিকতার সঙ্গেই তুলনা চলে। প্রত্যেকে প্রত্যেকের দুঃখে-সুখে নিকট আত্মীয়ের ন্যায় সংলগ্ন হবার সামাজিক সংস্কৃতি ছিল। যেটি এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় নি। তবে স্বীকার করতে হবে কমেছে।

ঈদের আগের দিনকে চাঁনরাত বলার রেওয়াজ ছিল। চাঁনরাতে পুরান ঢাকার যুবকেরা মাসব্যাপী রোজার সংযমের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে মদ্যপানে মাতলামিতে মত্ত হত। তাদের মাতলামিতে রাস্তা-সড়কে, বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী সিঁড়ি ঘাটের পরিবেশ ভয়ঙ্কর হত। রাতে তারা এদিক-সেদিক পড়ে থাকতো। কাকভোরে বাড়ি ফিরে গা-গোসল করে নতুন জামা-কাপড় গায়ে চড়িয়ে ঈদের নামাজে শামিল হত। মেয়েরা মেহেদী লাগাতো গভীর রাত অবধি। কম-বেশি প্রায় সকলের বাড়িতে মেহেদী গাছ ছিল। বাজার থেকে মেহেদী কিনে পাটায় বেঁটে মেহেদী লাগানোর সংখ্যা ছিল খুবই স্বল্প। ঘরে ঘরে শুরু হয়ে যেতো ঈদের বিশেষ রান্নার আয়োজন। এখনকার ন্যায় তিন-চার দফায় ঈদের জামাতের নজির ছিল না। মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার আধিক্য তখন ঘটেনি। একবারই ঈদের নামাজ হত মসজিদে।

নামাজ শেষে গণকোলাকুলি-শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে বাড়ি ফিরতে দীর্ঘক্ষণ অতিবাহিত হত। সবার সঙ্গে সবার আত্যন্তিক যোগসূত্রতা ছিল। ঈদের দিনে সেটা রক্ষা না করা ছিল অপরাধতুল্য। আমরা যারা কিশোর বয়সী ছিলাম। আমরাও পাড়া-মহল্লার সহপাঠিদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ে অনেক সময় পরে বাড়ি ফিরতাম। গুরুজনদের সালাম করে সেলামি না পাওয়া পর্যন্ত নড়তাম না। বাড়ির আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ছুটতাম আত্মীয়-পরিজন, প্রতিবেশীদের বাড়ির অভিমুখে। সালাম করা এবং সেলামি আদায়ই ছিল মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি ছিল সামাজিকতার দায়ভার। কারো বাড়িতে ঈদের দিন না গেলে তীব্র কটু কথা শুনতে হত। সবার বাড়িতে সবার যাওয়ার সামাজিক রেওয়াজ পালন করা ছিল বাধ্যবাধকতার অন্তর্গত।

সড়কের পাশে হরেক খাবারের দোকানে নানা পদের আকর্ষণীয় খাবার কিনে খাওয়ার প্রবণতা কিশোরদের মধ্যে দেখা যেত। সেলামির কাঁচা পয়সা ঝনঝন করতো সবার পকেটে। চারআনা-আটআনায় তখন প্রচুর চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিল। সহপাঠি বন্ধুরা এমন কি হিন্দু সম্প্রদায়ের বন্ধুরা পর্যন্ত দল বেঁধে ঘোড়ার গাড়িতে চেপে চকবাজারের ঈদের মেলা দেখা, মেলার সামগ্রী কেনা, দূরে বসবাসরত আত্মীয়-পরিজনদের বাড়িতে যাওয়া-সেলামি সংগ্রহ এসব ছিল ঈদের দিনের গতানুগতিক বিষয়। দলভুক্তদের যে-কোন একজনের আত্মীয় বাড়িতে গেলে সবাই সমান সমাদর-সেলামি পেতাম। খাবারের জন্য জোর তাগিদ উপেক্ষা করতাম সময় ক্ষেপণের ভয়ে। দিনটি গত হলে তো সব সুযোগই হাতছাড়া হয়ে যাবে।

সব আত্মীয়দের বাড়িতে যাবার আনুষ্ঠানিকতায় বহুক্ষণ পেরিয়ে যাবে, সেই শঙ্কায় সালাম শেষে সেলামি নিয়েই এক প্রকার ছুটে অপেক্ষমান ঘোড়ার গাড়িতে উঠে পড়তাম। বিকেলের দিকে বর্তমানের সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে ঢাকার চিড়িয়াখানায় যেতাম। বর্তমানে যেখানে জাতীয় ঈদগা সেখানে ছিল ঢাকার চিড়িয়াখানা। সন্ধ্যে নাগাদ বাড়ি ফিরে আসতাম। পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্র চালু হবার পর স্থানীয় অনেকের বাড়িতে টিভি ছিল, তাদের বাড়িতে টিভি দেখতে যেত সবাই। উঠানে টেবিলে এনে টিভি বসিয়ে সবার জন্য টিভি দেখার ব্যবস্থা করত। ছোটরা মাদুরে এবং বড়রা চেয়ারে বসে অনেক রাত অবধি একত্রে টিভির অনুষ্ঠান দেখতো সবাই।

স্কুল-কলেজে পড়ুয়া মেয়েরা দল বেঁধে পাড়ার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত বাড়ি-বাড়ি গিয়ে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করত। বান্ধবীদের সবার বাড়িতে সবাই যাওয়া-আসা করতো। অতিথি আপ্যায়নের জন্য সেমাই-পায়েস ইত্যাদি মিষ্টি জাতীয় খাবার ঘরে-ঘরে তৈরি করা থাকতো। কেনা সেমাইর প্রচলন ছিল না। হাতে ঘুরানো কলে ঈদের আগে বাড়িতে-বাড়িতে সেমাই তৈরি করতো। রোদে শুকিয়ে হালকা আঁচে ভেজে তুলে রাখতো ঈদের অপেক্ষায়। সবার বাড়িতে অভিন্ন প্রচলন। মহিলারাও বিকেলে আত্মীয়-প্রতিবেশীদের বাড়িতে শুভেচ্ছা বিনিময়ে যাওয়া-আসা করত। প্রত্যেকে প্রত্যেকের বাড়িতে ঈদের দিন যাওয়া ছিল ঈদের অনিবার্য সামাজিকতা।

ঈদে কে কত দামি জামা কিনেছে সেসব নিয়ে তেমন কারো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল না। নতুন জামা-জুতা হলেই বর্তে যেতাম। বাহারি চটকদার পোশাকেরও তেমন প্রচলন ছিল না। ব্যতিক্রম যে ছিল না, তা নয়। তবে সংখ্যায় অতি নগণ্য। স্থানীয় যুবকদের ঈদের আনন্দ ছিল ভিন্নতর। সড়কে-বুড়িগঙ্গার পাকা সিঁড়ি ঘাটে মাইক বাজিয়ে আনন্দ করতো। সিঁড়ি ঘাটে যত্রতত্র তাস খেলতো। দল বেঁধে রূপমহল, তাজমহল, মুকুল (আজাদ), মানসী (নিশাত), শাবিস্তান, লায়ন, স্টার, মুন বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে ছুটতো ঈদে মুক্তি পাওয়া লাহোরে নির্মিত উর্দু ছবি দেখতে। স্থানীয় যুবকদের নিকট সাবিহা-সন্তোষ, মোহাম্মদ আলী-জেবা,ওয়াহিদ মুরাদ-রানী প্রমুখ পাকিস্তানি তারকারা ছিল জনপ্রিয়। এসবের বাইরেও তাদের পরস্পরের ঈদের সামাজিকতা ছিল। দূর-দূরান্তের বন্ধুরা ছুটে আসতো। আবার এখান থেকেও অনেকে দলবদ্ধভাবে যেত বন্ধুদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ে।

ঈদের দিন উৎসব মুখর আনন্দ সর্বত্র বিরাজ করতো। হরেক প্রকারের আনন্দে মেতে থাকতো সবাই। ছাদে কিংবা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ঘুড়ি উড়ানোও ছিল ঈদের আনন্দের অংশ। বিভিন্ন রঙের ঘুড়িতে আকাশ ছেয়ে যেত। সম্প্রদায়গত ভিন্নতা এদিনে ম্লান হয়ে যেত। অনেক হিন্দু বন্ধুরাও আমাদের দলভুক্ত হয়ে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতো। ঈদে ধর্মীয় আবেদনের চেয়ে সামাজিক আবেদন অধিক। পাকিস্তানি রাষ্ট্রে তখন বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ক্রমেই বিকশিত হচ্ছিল। সে কারণে ধর্মীয় জাতীয়তা বাঙালিরা প্রায় পরিত্যাগে দ্বিধাহীন হয়ে উঠেছিল। এসকল কারণে ঈদ উৎসবে অসাম্প্রদায়িকতা বিকাশ লাভ করছিল। স্থানীয় যুবকদের নিকট যেমন লাহোরের ছবি জনপ্রিয় ছিল। পাশাপাশি তরুণ ও মাঝ বয়সী নারী-পুরুষদের নিকট ঢাকায় নির্মিত বাংলা ছবি অধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে পরিবারসহ বাংলা ছবি দেখার প্রবণতায় বাংলা ছবির স্বর্ণযুগের সৃষ্টি সম্ভব হয়েছিল। প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে ছবি দেখার মধ্যেও এক ধরনের সামষ্টিক সামাজিকতা ছিল। যেটি এখন আর পাওয়া সম্ভব নয়।

একালের ঈদ মানেই বিলাস এবং ভোগবাদিতায় পূর্ণ। কে-কত মূল্যের কতটা এবং কোন বিখ্যাত শপিং মল থেকে ঈদের পোশাক কিনেছে, এনিয়ে গর্বে মশগুল থাকা। আর ঈদে সামষ্টিক সামাজিকতা বলে এখন আর অবশিষ্ট কিছু নেই। সময়টা এখন যার-যার, তার-তার বলেই সঙ্গত কারণে সবাই ঘরে ঘরে অনেকটা বন্দীদশায় ঈদ পালন করে। একের পর এক পোশাক বদল করে, নিজের পোশাক নিজেই দেখে। অন্য কেউ দেখে প্রশংসা করলে নিশ্চয় গর্বিত ও খুশির সুযোগ হত। কিন্তু কার পোশাক কে দেখে। যার যারটা নিয়ে সবাই ব্যস্ত। ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ে আত্মীয়-পরিজনদের বাড়িতে এখন আর কেউ যাওয়া-আসা করে না। বড় জোর মোবাইলে খুদে বার্তা পাঠিয়ে সেই দায় থেকে পরিত্রাণ নেয়। মোবাইল-ফেইসবুক নামক প্রযুক্তির আগমনে দৈহিক যোগাযোগ বন্ধ হয়েছে। অপর দিকে প্রযুক্তিগত বার্তা বিনিময়কে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম রূপে প্রচারণা করা হয়ে থাকে। বিষয়টি হাস্যকর রূপেই বিবেচনা করা যায়।

ঈদের নামাজ এখন মসজিদে-ঈদগাগুলোতে তিন-চার দফায় আদায় হয়ে থাকে। সকল টিভি মিডিয়াতে দেশব্যাপী ঈদের কয়েক দফা নামাজের সময়সূচী ও স্থানসমূহের নাম ঘন ঘন সম্প্রচারিত হয়। ঈদের দিন বেশিরভাগ মানুষই ঘরে বসে-টিভি দেখে ঈদ পালন করে। নিকট আত্মীয়দের বাড়িতে পর্যন্ত অনেকের যাওয়া-আসা নেই। একান্ত পারিবারিক সীমায় প্রায় প্রত্যেকে সীমাবদ্ধ। একই ভবনের পাশাপাশি ফ্ল্যাটে বসবাস অথচ কারো সাথে কারো সম্পর্ক-যোগাযোগ কিছুই নেই। অপরিচিতমাত্রই অবাঞ্ছিত বলে জ্ঞান করে। সামাজিক বিচ্ছিন্নতার এই যুগে সামষ্টিক সামাজিকতার দৃশ্যমান কিছু নেই। ঈদকে কেন্দ্র করে সুপার মলগুলোতে যেরূপ রমরমা বেচা-বিক্রি, জনসমাগম ঘটে, ঈদের দিন তার প্রতিফলন আমরা দেখি না। বোকা বাক্স নামক টিভি মানুষকে গৃহে আটকে রাখতে সক্ষম হয়েছে; মানুষ স্বেচ্ছায় বিচ্ছিন্নতাকে বরণ করার কারণেই।

ঈদে গ্রামে যাওয়া মানুষের পরিমাণ কিন্তু কম নয়। বাস, ট্রেন, লঞ্চে চেপে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রচুর মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে ছুটে যায়। সেটা ঐ সামষ্টিক সামাজিকতার টানে। গ্রামে এখনও সামাজিকতা বিলীন হয়ে যায়নি। ঈদে গ্রামে যাওয়া মানুষের সিংহভাগই হচ্ছে স্বল্প আয়ের নিম্নবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি ক্ষুদ্র অংশও ঈদে গ্রামে যায়। আত্মীয়-পরিজনদের সঙ্গে ঈদ উদ্যাপনে। তবে সংখ্যায় স্বল্পই বলা যাবে। বিত্তবান শ্রেণি আত্মীয়-পরিজন ছেড়ে এমন কি দেশত্যাগে বিদেশে পর্যন্ত ঈদ উদ্যাপন করে। আমাদের বিত্তবান শ্রেণির মধ্যে এধরনের প্রবণতা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। অনেকে ঈদের কেনাকাটার জন্য ছুটে যায় বিদেশে।

লাগেজ বোঝাই করে ঈদের বাজার নিয়ে দেশে ফিরে আসে এবং গর্বে-গৌরবে সে কথা প্রচার করে আত্মতৃপ্তি লাভ করে। ঈদে বৈষম্য পূর্বেও ছিল। আজও আছে। তবে মাত্রাটা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একে অপরের বাড়িতে ঈদ উপলক্ষে যাওয়া আসায় প্রত্যেকে প্রত্যেকের বাড়ির খাবারের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ পেতো। এখন সেটা তিরোহিত। সবার বাড়ির রান্না করা ঈদের খাবারও এক নয়, ভিন্নতর। এটা নির্ভর করে ব্যক্তির শ্রেণিগত অবস্থানের ওপর। শ্রেণি পার্থক্যে বর্তমান সময়ে সমশ্রেণির বাইরে কেউ কারো নয়। শ্রেণি সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক টিকে থাকা-না থাকা নির্ভর করে। এখনকার ঈদে শহরে উৎসব-আনন্দ চোখে পড়ে না।

স্বল্প আয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাবার কারণে ঈদের পূর্ব হতে পরবর্তী চার-পাঁচ দিন শহর ফাঁকা হয়ে যায়। গ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ততা শহরের আশিভাগ মানুষের অথচ বিত্তবান শ্রেণি গ্রামচ্যুত। পরিজন-সমাজ এবং সামষ্টিক সামাজিকতা বিচ্যুত। তারা যে গ্রাম থেকে এসেছে সে কথাও তাদের বোধকরি স্মরণে নেই। শ্রেণি উত্তোরণে অতীতের আত্মীয়-পরিজন, সামাজিকতা কেবল ভুলেই যায় নি। সচেতনভাবে পরিত্যাগ করে সমশ্রেণির মধ্যে বিলীন হয়ে পড়েছে। এই সকল বিচ্ছিন্নতাকে অতিক্রম করার ক্ষেত্রে ঈদ একটি সম্ভাবনাময় উপলক্ষ। যেটা নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্ষেত্রে আমরা দেখে থাকি। মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তদের ক্ষেত্রে সেটা অবান্তররূপেই গণ্য করা যায়।

ঈদ নিশ্চয়ই আনন্দের উৎসব। কিন্তু বর্তমানে ঈদে আমরা কিন্তু সমাজ জীবনে সর্বাধিক বৈষম্য দেখে থাকি। সমাজের সুবিধাভোগী এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ সুবিধাবঞ্চিতদের ক্ষেত্রে তীব্র বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। এক কাতারে নামাজ আদায় করলেও সকলের পরিধেয় বস্ত্র এক তো নয়-ই, ভয়ানক মাত্রায় বৈষম্যপূর্ণ। কতিপয়ের বিত্ত-বৈভবে ভোগ-বিলাসিতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাদের পোশাকে-আচরণে, খাওয়া-খাদ্যে ইত্যাদিতে।

আমাদের সমাজে ধনী-দরিদ্রের অর্থনৈতিক বৈষম্য আকাশপাতাল ব্যবধানসম। রোজার মাসে ধর্মীয় অনুশাসনে যাকাত প্রদানের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। অবশ্য যাকাত প্রদানের বিষয়টি সমাজে বৈষম্যকেই স্থায়ী করেছে। ধনীরা যাকাত দেবে আর দরিদ্ররা হাত পেতে নেবে। যাকাত আদান-প্রদানের ব্যবস্থাটি সমাজের শ্রেণি বৈষম্যকেই সু-নিশ্চিত করেছে। বিভিন্ন বস্ত্রের দোকানে ব্যানার টাঙিয়ে যাকাতের কাপড় (শাড়ি-লুঙ্গি ইত্যাদি) বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখা যায়। যাকাতের কাপড় মাত্রই অত্যন্ত নিম্নমানের এবং স্বল্পমূল্যের। সকল দোকানি ঐ স্বল্প মূল্যের এবং অতি নিম্নমানের যাকাতের বস্ত্র বিক্রি করে না। যে সমস্ত দোকানে তা বিক্রি হয়, সে সকল দোকানে বিজ্ঞাপন প্রচারের আবশ্যিকতার প্রয়োজন হয়।

সমাজের বিত্তশালী অংশ যাকাতের বস্ত্র বিলি বণ্টনে নিজেদের দাতারূপে জাহির করতে যে পন্থাটি অবলম্বন করে থাকে; এতে অসহায় মানুষের পদদলিত হয়ে মৃত্যুর প্রচুর ঘটনাও ঘটে থাকে। ঈদ নিশ্চয় আনন্দ-উৎসব। তবে সবার জন্য নয়। ঈদে নজরকাড়া বৈষম্য অত্যন্ত তীব্ররূপে দেখা যায়। রোজা-ঈদ যেন বিত্তবানদের আহার-ভোজন এবং সীমাহীন ভোগ বিলাসিতা মেটাতেই আসে। খাদ্য-দ্রব্য পণ্যের বাজার অধিক মাত্রায় চড়া হবার কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠদের নাকাল হতে হয়। ঈদের আনন্দের বার্তা সকলের জন্য সমানভাবে আসে না। আসা সম্ভবও নয়। বিদ্যমান বৈষম্যপূর্ণ সমাজে সেটা আশা করাও মূর্খতা।

সকল উৎসব-পার্বণে দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক, উৎসবকে অসাম্প্রদায়িক রূপে গড়ে তোলা। দুই, সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসন করা। এই দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সমাধান সম্ভব হলেই ঈদসহ সকল উৎসব-পার্বণ সর্বজনীন হবে এবং পরিপূর্ণরূপে সকলের জন্য উৎসবের আনন্দ নিশ্চিত করতে পারবে। নয়তো ঈদ আসবে-যাবে, কেউ কেউ ভোগবাদিতায় ভাসবে আর সংখ্যাগরিষ্ঠরা চেয়ে চেয়ে কেবল দেখবে। উপভোগে বঞ্চিত হবে। সেক্ষেত্রে ঈদ-পার্বণের আবেদনও পূর্ণতা পাবে না।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

;