যাত্রীবান্ধব এয়ারলাইন্স: ইউএস-বাংলা



মো. কামরুল ইসলাম
ছবি; বার্তা২৪.কম

ছবি; বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

যাত্রা শুরুর পর দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থেকে একটি এয়ারলাইন্স যাত্রীদের চলার পথে যাত্রীবান্ধব হয়ে উঠে। যাত্রীবান্ধব হয়ে উঠতে অন-টাইম পারফর্মেন্স জরুরী হয়ে উঠে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ২০১৪ সালের ১৭ জুলাই যাত্রা শুরুর পর থেকে ৯০ শতাংশের উপর ফ্লাইট অন-টাইম বজায় রেখে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করে আসছে।

এয়ারক্রাফটের পর্যাপ্ততা একটি এয়ারলাইন্স এর এগিয়ে চলার পথে বড় নিয়ামক। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স দু’টি ড্যাশ ৮-কিউ৪০০ এয়ারক্রাফট দিয়ে যাত্রা শুরু করে এখন বহরে যুক্ত করেছে ১৯টি এয়ারক্রাফট। যার মধ্যে ৮টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০, ৮টি এটিআর ৭২-৬০০ ও ৩টি ড্যাশ৮-কিউ৪০০ এয়ারক্রাফট রয়েছে। চলতি বছরের মে-জুন মাসে ৪৩৯ আসনের দু’টি এয়ারবাস ৩৩০ ওয়াইড বডি এয়ারক্রাফট যোগ করার পরিকল্পনা নিয়েছে ইউএস-বাংলা।

অন-টাইম পারফর্মেন্স বজায় রেখে অভ্যন্তরীণ সকল রুটে ফ্লাইট পরিচালনার পর আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রীদের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। ২০১৬ সালের ১৫ মে ঢাকা থেকে কাঠমুন্ডু রুটে ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে যাত্রা শুরু করে। একের পর এক নতুন নতুন আন্তর্জাতিক গন্তব্য শুরু করতে থাকে ইউএস-বাংলা।

যাত্রীদের চাহিদাকে পূর্ণতা দিয়ে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ফ্লাইট সিডিউল ঘোষণা করছে। নূন্যতম ভাড়ায় ভ্রমণ করার সুযোগ করে দিচ্ছে। পর্যটকদের ভ্রমণকে আরো বেশী আকর্ষণীয় করতে নানা ধরনের ভ্রমণ প্যাকেজ ঘোষণা করছে। দেশে কিংবা বিদেশে টিকেট কিনলে হোটেল ফ্রি অফার রাখছে। ইএমআই সুবিধা দিয়ে প্যাকেজ ঘোষণা পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনাকে সহজতর করে দিচ্ছে। কলকাতা কিংবা চেন্নাইয়ে চিকিৎসার জন্য ভ্রমণ করলে এ্যাপোলো হাসপাতালে ডিসকাউন্ট অফার দিচ্ছে ইউএস-বাংলা। 

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গন্তব্য মালদ্বীপের রাজধানী মালের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছে। যার ফলে ভারত মহাসাগরের নীলাভ সৌন্দর্য দর্শনে পর্যটকরা ঢাকা থেকে মালে ভ্রমণ করছে। বিভিন্ন ধরণের প্যাকেজ সুবিধা নিয়ে মালদ্বীপের আকর্ষণীয় দ্বীপগুলোতে ভ্রমণ করছে।

মধ্যপ্রাচ্যে পর্যটকদের আকর্ষণীয় গন্তব্য দুবাই ভ্রমণে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স প্রতিদিন ঢাকা থেকে দু’টি করে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এবং শারজাহ-তেও প্রতিদিন একটি ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশী অধ্যুষিত মাস্কাট ও দোহাতে ফ্লাইট পরিচালনা করছে ইউএস-বাংলা।

সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক কিংবা গুয়াংজু রুটে বাংলাদেশী যাত্রীদের পছন্দক্রমে ইউএস-বাংলা অগ্রগণ্য। যাত্রী বিবেচনায় প্রবাসী শ্রমিকবান্ধব এয়ারলাইন্স হওয়ায় ইউএস-বাংলা যাত্রীদের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে।

অভ্যন্তরীণ রুটে ঢাকা থেকে সিলেটে ৬টি, সৈয়দপুর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ৮টি করে ফ্লাইট, যশোরে ৩টি, রাজশাহীতে ২টি, বরিশালে ১টি ফ্লাইট পরিচালনা করছে ইউএস-বাংলা। যা দেশের অভ্যন্তরে যাত্রীদেরকে সেবা দেয়ার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

দেশের অভ্যন্তরে ব্র্যান্ডনিউ এটিআর ৭২-৬০০ এয়ারক্রাফট দিয়ে সর্বপ্রথম ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ফ্লাইট পরিচালনা করেছে। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় দেশে সর্বপ্রথম সেলফ চেক-ইন করার ব্যবস্থা রেখেছে ইউএস-বাংলা। 

অনলাইন ও অফলাইন ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে টিকেট ক্রয়ের সুবিধা থাকার পরও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স দেশে এবং দেশের বাহিরে ৪১টি নিজস্ব আউটলেটের মাধ্যমে সরাসরি টিকেট ক্রয়ের সুবিধা রেখেছে যাত্রীদের জন্য।

বাংলাদেশে প্রাইভেট এয়ারলাইন্সগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দশ বছর অতিক্রমকালীন সময়টা এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য অনেকটাই নাজুক অবস্থা বিরাজমান সেখানে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স বাংলাদেশকে ব্র্যান্ড হিসেবে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত এয়ারলাইন্স এর বিমান বহরে নতুন নতুন এয়ারক্রাফট যুক্ত করে নতুন নতুন গন্তব্যে নিজেদের পেখম মেলে ধরছে। বর্তমানে ২৫০০ এর অধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে ইউএস-বাংলায়। যা দেশের বেকার সমস্যা দূরীকরণে কাজ করছে।

দেশের ট্রাভেল এজেন্সি, ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি ও হোটেল ইন্ডাস্ট্রিকে গতিশীল রাখতে ইউএস-বাংলা যাত্রার শুরু থেকেই কাজ করছে। যাত্রীদের আস্থাই ইউএস-বাংলার এগিয়ে চলার পথে পাথেয়।   

লেখক: মোঃ কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

   

জানুয়ারিতে অযোগ্য, ফেব্রুয়ারিতে যোগ্য কীভাবে?



কবির য়াহমদ, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন দলটির আন্তর্জাতিক সম্পাদক শাম্মী আহম্মেদ। দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে তার মনোনয়ন বাতিল হয়। রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বরিশালের জেলা প্রশাসক শহিদুল ইসলাম কর্তৃক মনোনয়ন বাতিলের সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেন তিনি। এরপর আইনি লড়াই শেষেও নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি আওয়ামী লীগের এই নেত্রী। নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য হতে না পারলেও সংরক্ষিত আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। নিয়েছেন শপথও।

জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে অংশ নেওয়ার যোগ্য না হলেও সংরক্ষিত নারী আসনে বরিশাল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন শাম্মী আহম্মেদ। বুধবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদের শপথকক্ষে সংরক্ষিত ৫০টি আসনের সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। প্রথমে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত ৪৮ জনের শপথ পড়ানো হয়। এরপর শপথ পড়েন জাতীয় পার্টির দুইজন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য হওয়াদের মধ্যে ছিলেন আলোচিত প্রার্থী শাম্মী আহম্মেদও।

এখানে সংগত প্রশ্ন—কীভাবে সম্ভব? কারণ নির্বাচন পদ্ধতি ভিন্ন হলেও সাধারণ আসন আর সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা/অযোগ্যতা অভিন্ন। ‘জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪’ এর ‘সংরক্ষিত মহিলা আসনের নির্বাচনে প্রার্থীর যোগ্যতা ও অযোগ্যতা’ অংশ বলছে—‘৮। (১) সংসদ সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ-সদস্য থাকিবার জন্য সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে উল্লিখিত যোগ্যতাসম্পন্ন যে কোন মহিলা সংরক্ষিত মহিলা আসনে প্রার্থী হইবার যোগ্য হইবেন। (২) সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ বা অন্য কোন আইনের অধীন সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ-সদস্য থাকিবার অযোগ্য কোন ব্যক্তি সংরক্ষিত মহিলা আসনে প্রার্থী হইবার যোগ্য হইবেন না।’

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ব্যাপক আইনি লড়াই করেছিলেন এই আওয়ামী লীগ নেত্রী। রিটার্নিং কর্মকর্তার দেওয়া মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করেন। ইসিতে করা এই আপিলে ব্যর্থ হন। ব্যর্থ হন হাইকোর্টে। এরপর হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত চেয়ে শাম্মী আহম্মেদের করা আবেদনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ‘নো অর্ডার’ আদেশ দেন। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেওয়া হয়নি তার। ওই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত পংকজ দেবনাথ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে বিজয়ী হন। দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েই কেবল আলোচিত ছিলেন না শাম্মী আহমেদ। তার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী পংকজ দেবনাথ এনেছিলেন আরও অভিযোগ। তন্মধ্যে ছিল স্মার্টকার্ডের তথ্য গোপন করে পাসপোর্ট করা, অস্ট্রেলিয়ার ভোটার হওয়াও।

সাধারণ ও সংরক্ষিত আসনের যোগ্যতা/অযোগ্যতায় যখন ভিন্নতা নাই, তখন সত্যি কি আইনের ব্যত্যয় হয়েছে এখানে? এ প্রসঙ্গে অবশ্য ফিরে দেখা যেতে পারে আপিলে কী হয়েছিল তার। শাম্মী আহম্মেদের আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিকুল ইসলাম আপিল শুনানির সময়ে জানিয়েছিলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য ইতোমধ্যে শাম্মী আহম্মেদ চিঠি দিয়েছেন।’ তার সে বক্তব্য সেই সময় আমলে নেননি। সত্যি সত্যি তিনি যদি দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগ করে থাকেন তবে তার মনোনয়ন বৈধ হয়ে যেত। কারণ এখানে সংবিধানের ৬৬ নং অনুচ্ছেদ বলছে, ‘(২ক) এই অনুচ্ছেদের (২) দফার (গ) উপ-দফা তে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোন ব্যক্তি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হইয়া কোন বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করিলে এবং পরবর্তীতে উক্ত ব্যক্তি- (ক) দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে, বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করিলে; কিংবা (খ) অন্য ক্ষেত্রে, পুনরায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করিলে- এই অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তিনি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন না।’

বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগকে রাষ্ট্র ইতিবাচকভাবে যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে দেখছে। নির্বাচনের আগে শাম্মী আহম্মেদ কেবলই বাংলাদেশের নাগরিক এটা প্রমাণ করতে পারেননি। এখন কি পেরেছেন? ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে তার স্বপক্ষে উচ্চ আদালত পর্যন্ত অনেক যুক্তি উপস্থাপিত হয়েছিল, কিন্তু সেগুলো গ্রাহ্য করেনি উপর্যুক্ত কর্তৃপক্ষ। এবার সেটাকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হলো? নাগরিকত্ব বিষয়ক হালনাগাদ কোন তথ্য না থাকলে, যে অভিযোগ ইসি মনোনয়ন বাতিল করেছিল সেই একই অভিযোগে এবারও কি তার মনোনয়ন বাতিল হয়ে যায় না? এবার মনোনয়ন দাখিলের সময় শাম্মী আহম্মেদ বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রমাণপত্র যদি উপস্থাপন করে থাকেন, তবু এনিয়ে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য থাকা উচিত। কারণ তার মনোনয়ন নিয়ে যখন এত আলোচনা হয়েছে আগে, তখন বিনা বাক্য ব্যয়ে অথবা চুপিসারে এবার মনোনয়নপত্র বৈধ হয়ে যাওয়ায় নাগরিক-প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। কান পেতে সেই প্রশ্নই আমরা শুনছি, এবং অথবা সেই প্রশ্ন আমরা তুলছি। 

শাম্মী আহম্মেদ জাতীয় সংসদের সদস্য হলে আমাদের কারো আপত্তি থাকার কথা না। বরং খুশিই আমরা, কারণ তার মতো উচ্চশিক্ষিতরা সংসদ সদস্য হলে দেশের লাভ, তার এলাকার লাভ, নারীদের লাভ। তার পরিবার উচ্চশিক্ষিত। তার প্রয়াত বাবা মহিউদ্দিন আহমেদ বড় নেতা হলেও আওয়ামী লীগের মতো বিশাল রাজনৈতিক দলের আন্তর্জাতিক সম্পাদকের পদে আসা তার কেবল বাবার পরিচয়ের কারণে হয়নি, হয়েছে নিজের যোগ্যতায় অনেকটাই। চাকরি জীবনে তিনি ইন্টারন্যাশনাল রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন। বলা যায় বর্তমান অবস্থানে আসা তার নিজের যোগ্যতায়। এবার সংরক্ষিত নারী আসনের যে ৫০ জন এসেছেন সংসদে তাদের অনেকের চাইতে শিক্ষায়-যোগ্যতায় এগিয়ে শাম্মী আহম্মেদ। কিন্তু তার সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে যখন একবার প্রশ্ন উঠেছে, তখন এটা পরিষ্কার হওয়া জরুরি। 

শাম্মী আহম্মেদের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে প্রশ্নের অবতারণা মূলত প্রথা-প্রতিষ্ঠান এবং বিদ্যমান আইন বিষয়ক আলোচনা। যেখানে প্রশ্ন সেখানে উত্তর থাকা বাঞ্ছনীয়। এই প্রশ্নের সুরাহা না হলে সংসদই বিতর্কিত হবে। বিতর্ক এড়ানোর স্বার্থে বিষয়টির সঠিক ব্যাখ্যা আমরা আশা করি।

;

মিয়ানমার কেন গৃহযুদ্ধের দেশ হয়ে উঠেছে! 



সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

মিয়ানমার বহু ভাষাভাষী ও জাতিগোষ্ঠীর একটি দেশ। আবার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেও রয়েছে ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্ম, ভাষা ও অন্যান্য দিকগুলির ভিন্নতা। এই ভিন্নতার কারণে দেশটিতে প্রায়শ জাতিগত দ্বন্দ্ব এবং সংঘাতের দিকে নিয়ে যায়। বিশেষ করে মিয়ানমার সরকারের জাতিভিত্তিক নীতিই গৃহযুদ্ধের অন্যতম কারণ।

মিয়ানমারের আয়তন আনুমানিক ৬ লাখ ৭৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা ৫৪ দশমিক ৫৮ মিলিয়ন (প্রায়)। দেশটিতে মোট ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠীর বসবাস এবং যারা ১০০টিরও বেশি ভাষায় কথা বলেন। আয়তনে বড় হলেও এটি একটি কেন্দ্রশাসিত দেশ। এখানে বার্মিজ জাতীয়তাবাদ জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়।

উত্তর মিয়ানমারে মূলত কাচিন, কারেন এবং রাখাইনের মতো জাতিগত সংখ্যালঘুদের বসবাস। এই নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলো ইতিহাসে দীর্ঘকাল ধরে বিভক্ত ছিল এবং তাদের নিজস্ব অনন্য সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে।

রাষ্ট্র জাতিগত গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে সমান আচরণ করতে ব্যর্থ। দেশটির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সামরিক সরকারের হাতে, যা সামরিক সরকার এবং স্থানীয় জাতিগত সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে অসংখ্য দ্বন্দ্বের কারণগুলোর একটি। মিয়ানমারে এক ডজনের মতো সশস্ত্র শক্তিশালী গোষ্ঠী রয়েছে। দেশটির সরকার প্রকৃতপক্ষে ৭টি প্রদেশ এবং ২টি শহর নিয়ন্ত্রণ করে। বাকি ৭টি রাজ্য, যেখানে জাতিগত সংখ্যালঘুরা রয়েছে, সেখানে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ঠিক এই কারণেই মিয়ানমার বিভক্ত হওয়ার পরিস্থিতির দিকে ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে মিয়ানমারের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে বিভিন্ন প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছিল। এগুলোর প্রতিটির নিজস্ব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিন্তু সামরিক জান্তার 'বার্মিজ জাতীয়তাবাদ' নীতি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলির মধ্যে বিচ্ছিন্নতা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

[তৎকালীন 'বার্মা' ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৬২ সাল থেকে দেশটিতে সামরিক শাসন শুরু হয়। ১৯৮৯ সালে জান্তা সরকার দেশটির নাম 'বার্মা' থেকে মিয়ানমার করে। এখানে বলে রাখা ভালো, এখানে সত্যিকারের নাম পরিবর্তন করা হয়নি। কেবল নামের বানানটিকে স্থানীয় ভাষার আধুনিক উচ্চারণ ও বানারীতির মতো করে নেওয়া হয়েছে। 'বার্মা' এবং 'মিয়ানমার' দুটি শব্দর উৎস মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী– “ম্রন-মা” (မြန်မာ) থেকে। বর্তমানে অধিকাংশ বর্মির উচ্চারণে 'র' 'ইয়-তে পরিণত হয়েছে। সে কারণে 'ম্রন-মা' উচ্চারিত হয়, 'মিয়ান-মা'। ইংরেজি (মূলত রোমান) বানানে Myanmar. 'রেঙ্গুন' থেকে 'ইয়াঙ্গন'ও সেই একইভাবে এসেছে। পরবর্তীতে ২০১০ সালে এর নাম আবার পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘The Republic of the Union of Myanmar]

১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর মিয়ানমার সরকার জাতিগত কিছু নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলি সমাধান করার চেষ্টা করে। কিন্তু সেই নীতিগুলি কখনোই সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে, জাতিগত সংঘাত তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। জাতিগত এই নীতিগুলির মধ্যে একটি হলো- ‘বৃহত্তর বার্মা নীতি’। এই নীতির মূল ধারণাটি হলো, মিয়ানমারের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে ধীরে ধীরে বৃহত্তর বার্মার সাংস্কৃতিক বৃত্তে একীভূত করা। আর এইভাবে দেশের ঐক্য ও স্থিতিশীলতা অর্জন করা। কিন্তু এই নীতি জোর করে আত্তীকরণ (Assimilation) এবং সাংস্কৃতিক গণহত্যার মতো উপায়ে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দমন ও বৈষম্যের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করা হয়। ফলে এই নীতি অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ ও প্রতিরোধের স্পৃহা জাগিয়ে তোলে। এতে করে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত হয়।

এছাড়াও মিয়ানমার সরকার আরো কিছু জাতিগত নীতি বাস্তবায়ন করে, যেমন ‘ফেডারেলিজম’ এবং ‘বহুদলীয় ব্যবস্থা’। এই নীতিগুলির মূল উদ্দেশ্য হলো- প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীকে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার অনুমতি দেওয়া৷ তবে বাস্তবে এই নীতির বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় সরকারের যথেষ্ট আন্তরিকতার অভাব থেকেছে। এর কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে গুণগত পার্থক্য অনেক বেশি। এই কারণে প্রকৃত সাম্য ও স্বাধীনতা অর্জন করা কঠিন হয়ে যায়। এ সব কারণে জাতিগত দ্বন্দ্ব ও সংঘাতকে তীব্রতর করেছে।

মিয়ানমার সরকারের সবচেয়ে বড় ভুল হলো, 'কারেন' জনগোষ্ঠীকে জোর করে আত্তীকরণ নীতি। কারেন জনগোষ্ঠীর প্রতি সরকারের এই আত্তীকরণ নীতি অনেক দিক থেকেই প্রকাশ পায়।

প্রথমত, সরকার কারেন জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজস্ব ভাষা এবং হরফ ব্যবহার করার ওপর বাধানিষেধ আরোপ করে বার্মায় আত্মীকরণ করার চেষ্টা করে।

দ্বিতীয়ত, কারেনদের ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা। একইসঙ্গে কারেন জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। এছাড়া তাদের ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী হতে বঞ্চিত বাধ্য করা হয়। অথচ কারেন মিয়ানমারের বৃহত্তম জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্যে একটি। এদের জনসংখ্যা ১ মিলিয়নেরও বেশি। এই জনগোষ্ঠীর ভাষা, ধর্ম এবং সংস্কৃতির ওপর সরকারের বিধিনিষেধের ফলে কারেনদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয় এবং তাদের মধ্যে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।

কারেন জনগোষ্ঠী ছাড়াও মিয়ানমারের শান, কাচিন, আরাকান, রোহিঙ্গা এবং অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘুরাও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি। তারা তাদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার প্রয়াসে অনেক প্রতিবাদ ও সশস্ত্র প্রতিরোধের চেষ্টা করে যাচ্ছে।

মিয়ানমারে জাতিগত ইস্যু শুধু রাজনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সমস্যা। সরকারের উচিত প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সম্মান করা এবং তাদের সমান অধিকার ও সুযোগ দেওয়া। তাহলেই মিয়ানমারে শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জন করা সম্ভব!

সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী- লেখক ও গবেষক, পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম 

;

যৌক্তিক দাবির কর্মসূচিতে বাধা কেন?



কবির য়াহমদ, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, বার্তা২৪.কম
যৌক্তিক দাবির কর্মসূচিতে বাধা কেন?

যৌক্তিক দাবির কর্মসূচিতে বাধা কেন?

  • Font increase
  • Font Decrease

গণতন্ত্র মঞ্চ নামের নামসর্বস্ব একটা রাজনৈতিক জোটের কর্মসূচিতে বাধা দিয়েছে পুলিশ। কেবল বাধাই নয়, দলটির নেতাকর্মীদের ওপর নির্বিচার লাঠিচার্জ করা হয়েছে। আটক করেছে কয়েকজনকে। হামলায় আহত হয়েছেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।

বুধবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে গণতন্ত্র মঞ্চের নেতাকর্মীরা সচিবালয় অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল করতে গেলে তারা পুলিশ কর্তৃক আক্রান্ত হয়। আক্রান্তের আগে মিছিলে বাধা দিতে পুলিশ ব্যারিকেড দিতে গেলে জোটটির নেতাকর্মীরা সেই ব্যারিকেড ভেঙে এগুতে চাইলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে।

পুলিশের দাবি, গণতন্ত্র মঞ্চ ব্যারিকেড ভেঙে সচিবালয়ে ঢুকতে চেয়েছিল। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা জোনের এডিসি শাহ্ আলম মোহাম্মদ আক্তারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেছেন, ওনারা (গণতন্ত্র মঞ্চ) অনুমতি ছাড়াই এখানে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে এসেছেন। আমরা তাদেরকে বারবার বলেছি যে তাদের এখানে অনুমতি নেই। কিন্তু ওনারা আমাদের কথা শুনেননি। ওনারা আমাদেরকে কথা দিয়েছিলেন যে সচিবালয়ের সামনে এসে শান্তিপূর্ণ মিছিল করে চলে যাবেন। কিন্তু আমাদের দেওয়া ব্যারিকেড অতিক্রম করে সচিবালয়ে ঢোকার চেষ্টা করেছেন। আমরা বারবার বোঝানোর চেষ্টা করলেও ওনারা ব্যারিকেড ভেঙে ভিতরে ঢুকতে চেয়েছেন। তিনি আরও বলেন, যারা ব্যারিকেডে ধাক্কাধাক্কি করছিল তাদের দেখেই মনে হচ্ছিল এরা ব্যারিকেড ভাঙার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। আমাদের মনে হয়েছে ওনারা এই ব্যারিকেড ভাঙার জন্য লোক ভাড়া করে নিয়ে এসেছে।

পুলিশের এই বক্তব্যে হাস্যরসের যথেষ্ট উপাদান রয়েছে। 'ব্যারিকেড ভাঙার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত' বলে যে শব্দবন্ধ উল্লেখ করেছেন এ পুলিশ কর্মকর্তা, এটা প্রথমবার শোনা আমাদের। দেশের কোন দলের কেউ এমন প্রশিক্ষণ কাউকে দিয়েছে বলে জানা নাই। ব্যারিকেড দিতে পুলিশ প্রশিক্ষণ নেয় জানা, কিন্তু শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো বাহিনীর কেউ ব্যারিকেড ভাঙতে প্রশিক্ষণ নেয় এমনটা নিশ্চয় পাঠকেরও প্রথম শোনা।

গণতন্ত্র মঞ্চের আজকের এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংক লোপাট ও অর্থ পাচারের প্রতিবাদ। তাদের সঙ্গে কারো রাজনৈতিক কিংবা আদর্শিক মতভিন্নতা থাকলেও এই দাবিগুলো আদতে গণদাবি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষ নাজুক অবস্থায়, ব্যাংকের অর্থ লোপাট আর অর্থ পাচারের বিষয়টিও অসত্য নয়, এমনকি এসব সরকার দলের নানা পর্যায়ের নেতাকর্মী কর্তৃক স্বীকৃতও। দেশের যে কেউ এই দাবিগুলোর সঙ্গে ঐক্যমত প্রকাশ করবে। এখানে রাজনৈতিক বিশ্বাসের দিক থেকে গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে অনেকের মতের অমিল থাকলেও সবাই দ্রব্যমূল্যকে সহনীয় পর্যায়ে দেখতে চান, অর্থ লোপাট ও অর্থ পাচার বন্ধ দেখতে চান।

এটা অস্বীকার করার উপায় নাই, গত দেড় দশকে বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকার সবচেয়ে বেশি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণকে সবচেয়ে গুরুত্বহীন পর্যায়ে রেখে সিন্ডিকেটকে সুযোগ দিয়েছে। পেশায় ব্যবসায়ীদের খাদ্যমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, এমনকি গত মেয়াদে অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে সরকার এই খাতকে সর্বনাশের পথে ঠেলে দিয়েছে। যার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে দেশকে। গত মেয়াদের বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি কেবল তার দায়িত্ব পালনের পর্যায়েই নয়, বিভিন্ন বক্তব্যে-মন্তব্যে সিন্ডিকেটকে আশকারা দিয়ে গেছেন। 'সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়' বলে অনাকাঙ্ক্ষিত বক্তব্য শুনেছি আমরা তার মুখ থেকে। মন্ত্রীর অদক্ষতায় সরকার হয়েছে বিতর্কিত, জনস্বার্থ হয়েছে উপেক্ষিত, সরকার হারিয়েছে জনসমর্থন।

আশার কথা সেই বাণিজ্যমন্ত্রী এখন দায়িত্বে নেই, দায়িত্বে নেই সাবেক অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামালও। বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন আবুল হাসান মাহমুদ আলী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আহসানুল ইসলাম টিটু‌। কাজে-বয়সে নবীন হলেও বর্তমান বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রীর মুখ থেকে বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা শোনা যাচ্ছে। সিন্ডিকেটকে আশকারা না দেওয়ার প্রত্যয় শোনা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের অন্য মন্ত্রীদের মুখ থেকেও দ্রব্যমূল্যের গুরুত্বের কথা শোনা যাচ্ছে।

বাজার ব্যবস্থাপনা ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি যখন সরকারের কাছেও গুরুত্ব পাচ্ছে তখন গণতন্ত্র মঞ্চের এই কর্মসূচিতে শক্তি প্রদর্শনের কোন যুক্তি থাকতে পারে না। সরকার-সংশ্লিষ্ট, সরকার-ঘনিষ্ঠদের কেউ কেউ সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও থাকতে পারেন, কিন্তু এই মেয়াদের সরকারের প্রধান যে চ্যালেঞ্জ দ্রব্যমূল্য সেখানে জনস্বার্থকে প্রতিনিধিত্ব করে এমন দাবির আন্দোলন কিংবা কোন কর্মসূচিতে বাধা প্রদান শোভন হয় না। গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম সংগঠক জোনায়েদ সাকির ওপর হামলা তাই যেকোনো বিচারে অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অপ্রত্যাশিত।

দেশে আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি হলেও বিএনপির কোনো নেতাকেই সরকারের বিরুদ্ধে ততটা সরব থাকতে দেখা যায় না, যতটা দেখা যায় জোনায়েদ সাকিকে। তার বড় রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম নাও থাকতে পারে, কিন্তু তিনি মাঠ ও মাঠের বাইরে সরকারের সবচেয়ে বড় সমালোচক। এই সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি অনেক সময় অযৌক্তিক এবং একপেশে অনেক কিছুই বলেন, বলেন দেশে কথা বলার স্বাধীনতা নাই; কিন্তু তার রাজনৈতিক উপস্থিতি ও কথা বলার জায়গাগুলোও আবার কথা বলার স্বাধীনতা বিষয়ে সরকারকে কিছুটা হলেও মুখ দেখানোর পথ দেখায়।

জোনায়েদ সাকি কথা বললে সরকারের ক্ষতি হয় না, বরং লাভই হয়। তিনি রাজপথে কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হলে সরকার বিএনপিকে পাশ কাটিয়ে নানা জায়গায় দেখাতে পারে—দেখো রাজনীতি ও কথা বলার স্বাধীনতা কীভাবে আছে দেশে! জোনায়েদ সাকি যখন সরকারের জন্যে ক্ষতির নয়, লাভেরই প্রপঞ্চ, তখন তার ওপর পুলিশের চড়াও হওয়া সঠিক হয়নি। এছাড়া তাদের যে কর্মসূচি, যে দাবি সেগুলো সরকারকে উৎখাতের নয়, গণদাবিকেই প্রতিনিধিত্ব করছে।

দ্রব্যমূল্যে ঊর্ধ্বগতিতে মানুষ খুব খারাপ অবস্থায় আছে—এই সত্যকে অস্বীকার করলেও এটা মিথ্যা হয়ে যাবে না। বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের ব্যর্থতাকে অস্বীকার করা যাবে না। দ্রব্যমূল্য এবং বাজারের সঙ্গে যেখানে জনস্বার্থ জড়িত সেখানে লাঠিপেটা করে, আটক করে নিয়ে যাওয়ার যে আদি-কৌশল সেটা পরিহার করা উচিত পুলিশের।

;

মেলায় বই দেখা ও ই-ভার্সন খোঁজা



প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এক সময় বই দেখা বলতে সিনেমা হলে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখাকে বুঝানো হতো। সিনেমা ভাল লাগলে মানুষ বলতো- বইটা খুব ভাল, কাহিনীটা বড়ই চমৎকার। এরপর কাহিনীর ধারাবাহিকতা ছেড়ে সিনেমার পর্দায় নাচ-গান, মারপিট, যুদ্ধ, খুন-খারাবি সবকিছুই শুরু হয়ে যায়। কালের আবহে সিনেমার পর্দা থেকে মানুষের গোপনীয়তা ভঙ্গ করে টেলিভিশন, ভিসিআর, ভিসিপি ইত্যাদি এসে ঘরে ঘরে সিনেমার প্রদর্শন চালু করে দেয়। ইন্টারনেট যুগে প্রবেশের পর মোবাইল ডিভাইসের মাধ্যমে মানুষের হাতে হাতে মিনি সিনেমার পর্দা ঠাঁই নিয়ে ফেলে। সেখানে সব কিছুই সিনেমার আদলে চোখের মণিকোঠায় ভেসে উঠলেও বইয়ের কাহিনী হারিয়ে যায় কালের গহব্বরে।

বই পড়া ও কেনা কিন্তু তখনও থেমে থাকেনি। আধুনিক ডিজিটাল যুগের ব্যস্ততার মধ্যেও বই পড়া বন্ধ হয়নি। শুধু বদলে গেছে পড়ার মাধ্যম ও ধরণ। কমে গেছে পড়ার সময়। এখন দেখা যুগ শুরু হওয়ায় এবং দেখার সরঞ্জাম ও বিষয়াবলীর পরিমাণ অতি বেশি হওয়ায় দেখার মধ্যে গভীরতা কমে গেছে। একই সঙ্গে দেখবে, না পড়বে তা বুঝে উঠতে অনেক মানুষের ভিরমি খাবার যোগাড়।

কয়েক যুগ আগে বই পড়া ছিল বড় আকর্ষণের বিষয়। আমাদের স্কুলছাত্র জীবনে একটি গল্পের বই বহু হাত ঘুরে পড়তে পড়তে আসল মলাট ময়লা হয়ে ছিঁড়ে যেত। সোভিয়েত ইউনিয়নের তেল চকচকে বাংলা পত্রিকার পাতা দিয়ে মলাট বেঁধে বই ও লেখকের নাম হাতে লিখে দেওয়া হতো। তবুও বইটি বারোজনের হাত ঘুরে পড়া হতে থাকতো। পরিচিত সবার পড়া হয়ে গেলে সংরক্ষণের অভাবে বুট-বাদাম বা কটকটিওয়ালার কাছে সমাদরে বিক্রিও হয়ে যেত।

কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বই পড়ার পরিমাণ, ধরণ ও কদর আরও বেড়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে রেফারেন্স বইগুলো স্যারদের নামে তোলা থাকতো বিধায় সেগুলোর জন্য স্যারদের নিকট বার বার অনুরোধ করে লাইব্রেরিতে জমা দিতে বলা হতো। অনেক সময় দামি বইগুলোর সংখ্যা অনেক কম থাকায় তা বাজরে কোথাও খুঁজে পাওয়া যেত না। পাবলিক লাইব্রেরি, বাংলাদেশ ব্যাংক লাইব্রেরি, এশিয়াটিক সোসাইটি, ইউসিস লাইব্রেরি প্রভৃতি খুঁজেও রেফারেন্স বই পড়ার সুযোগ মিলতো না। তখনকার দিনে বাংলা একাডেমির একুশে বই মেলায় পাঠ্যবইয়ের চেয়ে গল্প-উপন্যাস বেশি বের হতো, বিক্রিও হতো প্রচুর। উপন্যাসের পাঠক ছিল অনেক বেশি। এছাড়া প্রেমিক-প্রেমিকারা পরস্পরকে উপহার দেবার জন্য নতুন গল্প-উপন্যাসের বই কেনার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকতেন।
আজকাল উপহার সামগ্রীর ধরণ বৈষয়িকতার আড়ালে দারুণভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেছে বিধায় কেউ বই উপহার দিতে চায় না। তবে উপহার হিসেবে বইয়ের মর্যাদা কখনও কমেনি এবং ভবিষ্যতে কখনও কমবেও না।

বছরে একবার বই মেলা নিয়ে হাজির হয় একুশের বই মেলা। আমাদের বাংলা একাডেমির বই মেলাকে বলা হয় ‘পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ দিনব্যাপী চলা বইমেলা।’ ফ্রাঙ্কফুট বইমেলার আকার আয়তন আমাদের চেয়ে ছাড়িয়ে গেলেও তার স্থায়ীত্ব হয় মাত্র পনের দিন। একুশে বই মেলার দীর্ঘ দিনব্যাপী বেচা-কেনা ও জনপ্রিয়তার কাছে পৃথিবীর আর অন্যকোন বই মেলা আজ পর্যন্ত দাঁড়াতে পারেনি।

আমাদের একুশে বই মেলা হলো লেখক, পাঠক, ক্রেতা-বিক্রেতা, শিশু-কিশোর, বয়োজ্যেষ্ঠ সবার কাছে সমান আকর্ষণের, সমান গর্বের বিষয়। প্রতিবছর সবাই এই বই মেলার জন্য সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন।

তবে দিনে দিনে মেলার বৈশিষ্ট্য বদলে গেছে। মেলায় এসে সবাই বইয়ের রাজ্যে হারিয়ে যায় না। মেলায় বসে কোথাও বই নেড়ে চেড়ে দেখার পর নিরলে বসে সেই বইটি পড়ার ফুরসৎ নেই। এখানকার বই পড়তে হলে আগে কিনতে হবে। বাড়িতে নিয়ে তারপর পড়তে হবে। অর্থাৎ, বই পড়তে চাইলে সেটাকে কিনে পড়তে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশের বই মেলায় বই দেখার, পড়ার স্থান বা কর্নার থাকে। সেখানে পড়ে ফেরত দিয়ে যাওয়া যায়। আমাদের সেই সুযোগ এখনও তৈরি হয়নি। কারণ, আমাদের একুশে বই মেলার মতো এত বেশি লোক সমাগম অন্যত্র কোথাও হতে দেখা যায় না। শুধু কলকাতা বই মেলাতে আমাদের মতো অনেক মানুষের সমাগম হয়ে থাকে।

আজকাল মেলায় বই ক্রেতার চেয়ে বই দর্শনার্থীদের সংখ্যা অনেক বেশি। বাচ্চারা হালুম, টুকটুকি দেখার জন্য জেদ করলে অবিভাবকগণ তাদেরকে সাথে নিয়ে আসেন। তবে এর সাথে বাচ্চাদের কিছু কার্টুন, ছড়া, গল্পের বই কেনা হয়ে যায়। আজকাল বাচ্চাদের জন্য প্রিয় বায়নার বিষয় ই-বুক। ই-বুকের ছড়া, কবিতার সাথে সাথে মিউজিক। বাড়িতে মোবাইল ফোন বা ট্যাবে এনিমেটেড কার্টুন দেখতে অভ্যস্ত বাচ্চারা ডিজিটাল বইয়ের মধ্যে অদ্ভুত আকর্ষণ খুঁজে পেতে চেষ্টা করে। সেজন্য ই-বুক নির্মাতারা বাচ্চাদেরকে আকর্ষণ করার জন্য নানা কৌশলের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। যেগুলো মেলার মধ্যে স্বাভাবিক বইয়ের ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। সেজন্য এবারের ‘মেলায় বাজে বই বেশি’বলে ইতোমধ্যে সংবাদ বের হয়েছে।

এবারে দেখা যাচ্ছে, মেলার দর্শনার্থীরা এক স্টলে দীর্ঘক্ষণ বই নেড়েচেড়ে দেখে চলে যাচ্ছেন আরেকটি স্টলে। শেষমেষ খালি হাতে বাড়ি চলে যাচ্ছেন। জিজ্ঞাসা করা হলে এমন একজন জানালেন, বইয়ের দাম অতি বেশি। আমি বই কিনতে চাই কিন্তু দামটা আমার ক্রয় ক্ষমতার বাইরে।

আরেকজন জানালেন, মেলায় যে বইগুলো দেখলাম সেগুলোর ছাপানোর মান ভাল। তবে নেটওয়ার্ক সার্চ করে ওয়েব ভার্সন পেলে পড়ে নেব। কাগজের বই পড়তে সময় বেশি লাগে। তাই ওয়েব ভার্সন পেলে দ্রুত পড়ে নেব।

আরেকজন শিক্ষার্থী জানালেন, বইয়ের দাম বেশি। তাই পড়ার জন্য নেট সার্চ করি, কপি করি। নোট করি না। এআই দিয়ে প্রশ্নোত্তর তৈরি করে পরীক্ষা দিই। এআইয়ের যুগে কেন পাঠ্য বই কিনে পড়তে হবে?

একজন চাকরিজীবী জানান. আজ বই কিনতে আসিনি। আজ দেখতে এসেছি মেলায় কি কি নতুন বই এসেছে। এবারের মেলায় বইয়ের দাম বেশি চাচ্ছে। মেলা শেষের দিকে মূল্যহ্রাস ঘোষণা করলে তখন আবার এসে পছন্দনীয় অনেকগুলো বই কিনব ভাবছি।

লেখকগণ মানসম্পন্ন বই লিখলেও প্রকাশকগণ বলেন, আমাদের অর্থসংকট। এই বলে তারা সারা বছর দেরি করে শেষ সময়ে বই ছাপানোর কাজে হাত দেন। মেলার শেষ দিতে তাড়াহুড়ো করে বই বের করতে থাকলে ভুলভ্রান্তি বেশি হয়। এতে বইয়ের মান কমে যায়।

কোন দেশের মাতৃভাষা হলো সেই দেশের জাতিসত্তার ভিত্তিস্বরূপ। ভাষা যত বেশি শক্তিশালী হবে জাতির মধ্যে জ্ঞান পিপাসার ইচ্ছে তত বেশি বেড়ে যাবে। মাতৃভাষার মাধ্যমে গবেষণার বিস্তৃতি ঘটাতে পারলে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের দেশজকরণ সহজ হবে।

ইন্টারনেটের অতি ব্যবহারের এই যুগে শিশু-কিশোরদেরেকে নিজস্ব চিন্তাধারার স্বকীয়তায় বেড়ে উঠার জন্য একুশে বই মেলার মতো এত সুযোগ কই? বৃহৎ কলেবরে ঘরের ঘুপচি থেকে মুক্ত বাতাসে তাদেরকে বের করার জন্য বই মেলার মতো অন্য কোন উৎকৃষ্ট উপায় আছে বলে মনে হয় না। একুশে বই মেলায় এসে আমাদের সোনামণিরা আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির উপর লেখা বইয়ের রাজ্যে হারিয়ে যাবার সুযোগ পায়। তাই বিদেশি সংস্কৃতির ওপর ভর করে লেখা বাজে, নিকৃষ্টমানের ই-বুক যাতে মেলায় ঢুকতে না পারে, বিক্রি হতে না পারে সেজন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা জরুরি। তবে ই-বুকের খরচ বেশি। বেশিদিন সংরক্ষণ করা যায় না। ডিজিটাল ডিভাইস নিয়ত পরিবর্তনশীল হওয়ায় ই-বুক দ্রুত অচল হয়ে যেতে পারে। তাই ছাপানো বইয়ের দিকে আরও বেশি নজর দিতে হবে।

আমাদের শিশু, কিশোর, তরুণরা একা একা ঘরে বসে ডিভাইস কেন্দ্রিকতা থেকে বেড়িয়ে এসে একুশে বই মেলার বৃহৎ চত্বর থেকে দেশজ কৃষ্টি, সংস্কৃতির পসরা খুঁজুক, আর খুঁজুক আবহমান বাংলার জ্ঞান-বিজ্ঞান ঐতিহ্যের ধারাকে। তারা বইয়ের ওয়েব ভার্সন খোঁজার পাশাপাশি অনর্থক কাজে মোবাইল ডিভাইসের এমবি কেনার টাকা বাঁচিয়ে নেড়েচেড়ে দেখা কাগজে ছাপানো কয়েকটা নতুন বই কিনে বাড়ি ফিরুক। বই তাদেরকে মোবাইল ফোন, ফেসবুক, ই-গেম, অহেতুক চ্যাটিং, পর্নোগ্রাফি ইত্যাদির আসক্তি থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে। নিয়মিত ঘুম, মাঠে গিয়ে খেলাধুলা করা ও স্কুলের পড়া তৈরি করার জন্য সময় বাঁচাবে।

কারণ, চারদিকে মুহুর্মুহু যুদ্ধের ঘনঘটায় যখন প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ থাকবে না, অচল হয়ে পড়বে সকল ইলেকট্রনিক ডিভাইস তখন কাগজে ছাপানো বইটি হবে সময়ের সঙ্গী। আর সেই নিকষ অন্ধকারে সবকিছু বিলীন হয়ে গেলেও কাগজের লেখাগুলো জেগে উঠে আবার সবাইকে জ্ঞানের কথা বলার সুযোগ করে দেবে। জাগিয়ে তুলবে হারিয়ে যাওয়া বিশ্ব মানবতাকে।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন।

;