কিসিঞ্জার পাঠ ও মূল্যায়ন যথার্থ হচ্ছে কি?



কাজল রশীদ শাহীন
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

 

হেনরি কিসিঞ্জার, শতায়ু পেরিয়ে ইহলোককে বিদায় জানিয়ে পাড়ি জমালেন অনন্তলোকে। একশ বছরের পার্থিব জীবনের পঞ্চাশ বছরই তিনি আলোচিত-সমালোচিত ও বিতর্কিত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের দু’জন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও জেরাল্ড ফোর্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কাজ করার বিরল সৌভাগ্যের অধিকারী তিনি। অধ্যাপক, গবেষকের অভিজ্ঞতা থাকলেও একজন কূটনীতিক হিসেবে তিনি কেবল মার্কিন মূলুকে নয়, বিশ্বব্যাপী রেখেছেন নানামুখী অবদান। যা ক্ষেত্রবিশেষে ভয়ংকর রকমের প্রাণহানি, ক্ষয়ক্ষতি ও সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়য়েছে।

বাংলাদেশের মানুষেরা এই ব্যক্তিটিকে অন্যরকমভাবে চেনেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে উনার ভূমিকার প্রশ্নে এবং ‘বটমলেস বাস্কেট’ উক্তির কারণে। সেই থেকে মৃত্যুাবধি-এমনকি মৃ্ত্যুর পরও উনার প্রতি প্রচ্ছন্ন নয় প্রকাশ্য বিরাগও প্রদর্শিত করেন বহু মানুষ। ব্যাপারটা দুই-দশজনের মধ্যে কিংবা বিশেষ কোন বর্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে-ছাপান্নো হাজার বর্গমাইলের ব্যতিক্রম বাদে সকলেই বিষয়টা সম্পর্কে অবগত।  কারণ সেটা মিথ, কিংবদন্তি বা বাগধারার পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখানে কেউ যদি বেশি চালাকি করে। বুদ্ধি খাটিয়ে কাউকে ধোঁকা দেয়। কৌশলে কোন মুস্কিলের আসান করে তাহলে এদেরকে একবাক্যে ‘কিসিঞ্জার’ বলে। এই এই ধরনের বুদ্ধিকে, ‘কিসিঞ্জারি বুদ্ধি’ বা ‘কিসিঞ্জারি প্যাঁচ’ জ্ঞান করা হয়। ব্যাপারটার মধ্যে ঠাট্টা, বিদ্রুপ বা রসিকতা হয়তো রয়েছে। কিন্তু বিষয়টাকে হালকাভাবে নেয়ার কোন সুযোগ নেই। নেয়াটা যৌক্তিকও নয়।

এদেশের মানুষেরা কিসিঞ্জারি বুদ্ধিকে দু’রকমভাবে দেখে- এক. বুদ্ধি খাটিয়েও সফল না হওয়া বা, বেশি চালাকি করতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়া। দুই. অনেক চেষ্টা তদবির করে সফল না হওয়ায় হেয় করা বা বাজে ও অযৌক্তিক মন্তব্য করা। এখন আসা যাক, প্রথম প্রসঙ্গ। কেনো কিসিঞ্জারি বুদ্ধিকে এভাবে দেখা হয়। এর কারণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কিসিঞ্জারের হিংসাত্মক মনোভাব ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে যেন জয়ী হতে না পারে তার জন্য কিসিঞ্জার এমন কোন চেষ্টা বা পদক্ষেপ নেই তিনি করেননি।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সর্বাত্মক সহযোগিতা করে। এই সহযোগিতায় ভারতকে বিরত রাখতে কিসিঞ্জার আগ্রাসী কূটনীতির আশ্রয় নেয়। উনার কারণেই মার্কিন জনগণ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে থাকলেও ক্ষমতাসীন প্রশাসন বিপরীত মেরুতে অবস্থান নেয় এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বকেও তাদের পক্ষে নেয়ার কূটনীতি শুরু করে। এই কূটনীতির স্রষ্টা হল হেনরি কিসিঞ্জার। যার অংশ হিসেবে তিনি চীনকেও তাদের পক্ষে নেয়। চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ককে আর বেশি গাঢ় করে তোলেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে নানাভাবে নিজেদের মতে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনভাবেই যখন উনাকে পক্ষে নিয়ে আসা সম্ভব না হওয়ায় কিসিঞ্জার অভ্যাসবশত ইন্দিরাকে নিয়ে বাজে মন্তব্যও করেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন প্রশাসন যে সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল, যা বঙ্গোপসাগর অবধি এসেও ছিল। কিসিঞ্জারের কূটনীতির কারণেই এসব হয়েছিল।

যতভাবে ও যতপ্রকারে সম্ভব বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের দাবিকে পরাভূত ও পরাজিত করতে যা যা করণীয়, তার সবটাই করেছিল মার্কিন প্রশাসন-যার কূটনৈতিক মন্ত্রদাতা ছিলেন কিসিঞ্জার। কিন্তু কোন চেষ্টায় সফল হয় বাঙালির লড়াকু মনোভাব ও ভারত-রাশিয়ার মতো শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো আমাদের পাশে থাকার জন্য। এতে এটাও প্রমাণিত হয়েছিল যে, যতই ষড়যন্ত্র করা হোক না কেন এবং ষড়যন্ত্রকারী যতই শক্তিধর হোক না কেন, ন্যায়সঙ্গত ও ন্যায্যতাভিত্তিক কোন দাবিকেই ‘দাবায়ে’ রাখা যায় না। এ কারণেই বাংলাদেশের মানুষ আজও কেউ যখন অন্যায়ভাবে কিছু করে, তাকে কিসিঞ্জার বলে এবং এধরণের বুদ্ধিধরদের কিসিঞ্জারি বুদ্ধি বলে চিহ্নিত করে।

কিসিঞ্জারের মৃত্যুর পর যত লেখা প্রকাশিত হয়েছে দেশে এবং বিদেশে। তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পড়ার সুযোগ হয়েছে। এর মধ্যে আমাদের দেশের গুণীজনরা যেমন রয়েছেন, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্নরাও উপস্থিত আছেন। গার্ডিয়ান, ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের মতো আন্তর্জাতিক প্রভাবশারী দৈনিকের লেখাও এই বিবেচনার মধ্যে পড়ে। সবগুলো লেখারই মৌল স্বর এক ও অভিন্ন। প্রশ্ন হল, কিসিঞ্জারের সমালোচনা করতে গিয়ে আমরা কি উনার বুদ্ধিমত্তা ও কূটনীতিক ক্ষমতার কথা ভুলে গেছি? কূটনীতি দিয়ে তিনি ক্ষেত্র বিশেষে কিছু জায়গায় কিংবা বেশীরভাগ জায়গায় শঠতার পরিচিয় দিয়েছেন । যা অনেক মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে দেশে বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে উনার বিচারের দাবি উঠেছে। কিন্তু কিসিঞ্জারের কুটনীতির পাল্টা পাঠ মেলেনি। কূটনৈতিক কিসিঞ্জারকে কূটনীতি দিয়ে মোকাবেলা করার চেষ্টা দেখা যায়নি।

এ লেখায় আগেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশে কিসিঞ্জার নামটা শুনলেই বা উচ্চারিত হওয়া মাত্র বহুল উচ্চারিত সেই বাক্যটাই সামনেই আসে, ‘বটমলেস বাস্কেট’। কোন প্রেক্ষাপটে কী বিবেচনায় তিনি এ কথা বলেছিলেন তা নিশ্চয় আমাদের মনে আছে। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেলের বাস্তবতাকে ঘিরে তিনি ওকথা বলেছিলেন। হ্যাঁ, ওই কথার মধ্যে-বিদ্রুপ, শ্লেষ, অবমাননা সবই ছিল। যা মেনে নেয়া বা সহ্য করা কোন দেশপ্রেমিকের পক্ষেই সম্ভব নয়।

কিসিঞ্জার যা সেদিন বলেছিল, আজ তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশ প্রমাণ করে দেখিয়েছে সে বটমলেস বাস্কেট নয়। এখন এই প্রসঙ্গ আমরা যদি একটু উদারভাবে দেখার চেষ্টা করি, তাহলে কোন্ সত্যে আমরা হাজির হব। সত্যিই কি সেদিনের বাংলাদেশ বটমলেস বাস্কেট ছিল না? যদি তাই-ই না হবে তাহলে আজকের অবস্থানে আসতে আমাদের এত সময় কেন লাগলো? আবার এই প্রশ্ন ওঠা কি সঙ্গত নয়, পঞ্চাশ বছরে একটা স্বাধীন দেশের যে অবস্থায় যাওয়ার কথা ছিল সেখানে কি পৌঁছানো সম্ভব হল? গণতান্ত্রিক পরিবেশের নিশ্চয়তায়, বাক্ স্বাধীনতার চর্চায়, সমতাভিত্তিক সমাজ নির্মাণের প্রশ্নে, নীতি ও ন্যায্যতাসম্পন্ন রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকারে আমরা কি আদৌ কাঙ্ক্ষিত জায়গায় যেতে পারলাম?

আমরা সকলেই জানি, আমেরিকা-চীনের সম্পর্ক মোটেই বন্ধুত্বপূর্ণ নয়, বৈরিতায় ভরা। তারপরও কিসিঞ্জার নিজস্ব কূটনীতি দিয়ে সেই সম্পর্ক এমন একটা জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছেন যা, দুইদেশের কাছে প্রশংসনীয়। চীনের কাছে সবচেয়ে প্রিয় যে আমেরিকান তিনি হলেন কিসিঞ্জার। উনার শতবর্ষের জয়ন্তী যখন আমেরিকায় উদযাপিত হয়, তখন চীনেও তার ছোঁয়া লাগে। চীনারাও নিজেদের মধ্যে আয়োজন করেন একজন আমেরিকানের জন্মদিন। যখন ‍দুটো দেশ একে অপরের প্রতি উষ্মা প্রকাশে সিদ্ধ ও রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তখন এ ধরনের আয়োজন বিস্ময়ের শুধু নয়, একজন কূটনীতিকের সুদূরপ্রসারী সাফল্যেরও অংশ।

নোবেল কমিটি কিসিঞ্জারকে শান্তিতে নোবেল দিয়েছেন। বলা হয়, নোবেলের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত পুরস্কার ছিল এটি। কমিটির দু’জন সদস্য প্রতিবাদে পদত্যাগও করেন। ভিয়েতনাম-মার্কিন যুদ্ধ অবসানে পদক্ষেপ নেয়ায় তিনি নোবেল পান ১৯৭৩ সালে। এরপর আরও দু’বছর লেগে যায় যুদ্ধ নিরসনে। প্রশ্ন হল, কিসিঞ্জারের ওই উদ্যোগ কি ভুল ছিল। মনে রাখতে হবে, সেই সময়ের কোন মার্কিন রাষ্টপতিকে নোবেল না দিয়ে কেন উনাকে দেয়া হল? উনি কি সত্যিই কোন পদক্ষেপ রাখেননি যুদ্ধ বন্ধে? এসব পশ্নের যৌক্তিক উত্তর খোঁজা প্রয়োজন।

বলা হয়, কিসিঞ্জারের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ বেধেছে। আবার একথাও সত্য যে, তিনি কোনো কোনো যুদ্ধ বন্ধেও সাহসী ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। কিসিঞ্জারের যত দোষ-ত্রুটি ধরা হয়, একজন আমেরিকানের কাছে কিন্তু তিনি এসবের ঊর্ধ্বে। সকল মার্কিনীদের কাছে তিনি বন্দিত। উনার কূটনীতির তারিফ করেন সবাই, তা তিনি ডেমোক্রেট হোক অথব রিপাবলিক। এখানেই কিসিঞ্জারকে বিবেচনায় নিয়ে সমালোচনা করা উচিৎ। তিনি হয়তো আন্তর্জাতিকতাবাদী হয়ে উঠতে পারেননি, কিন্তু দেশপ্রেমিক হিসেবে, একজন আমেরিকান হিসেবে কি অনন্য নন?

কিসিঞ্জারের সমালোচনা যতটা করা হয়, বিদ্রুপবাণে বিদ্ধ করা হয়, সেভাবে উনার কূটনীতির প্রতিযোগী বা প্রতিদ্বন্দ্বি কিন্তু সেভাবে দেখা যায় না, নেই বললেই চলে। সমালোচনা করা সহজ। প্রতিযোগী বা প্রতিদ্বন্দ্বি হওয়া কঠিন। কিসিঞ্জার প্রশ্নে আমরা কি সহজ পথটাই বেছে নেয়নি? আমেরিকার মোকাবেলা যেমন আমেরিকার মতো হয়েই করতে হবে, তার জন্য নিরন্তর চেষ্টা জারি রাখতে হবে। তেমনি কিসিঞ্জারের যা কিছু অপছন্দ, যা কিছু ঘৃণা ও বিবমিষার তার মোকাবেলা করতে হবে প্রতিযোগী বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা দিয়ে-তাকে ছাড়িয়ে দেয়ার মধ্য দিয়ে। কেবল বিদ্রুপ, সমালোচনা আর কটুকথা দিয়ে কোন অর্জন হয় না, বরং আরও শক্তিধর করে তোলা হয়। কিসিঞ্জারের মূল্যায়নে-কিসিঞ্জারে পাঠে আমরা কোনটা করছি, সেটা কি একবার ভেবে দেখছি?

লেখক: সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও গবেষক

[email protected]

   

অধঃপতিত শিক্ষা ব্যবস্থায় মূল্যবোধের দুরাশা



আশরাফুল ইসলাম, পরিকল্পনা সম্পাদক বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয় দিনকে দিন বেড়েই চলেছে, এ মোটামুটি জানা কথা। কিন্তু এই ক্রমাবনতি যখন শিক্ষা ক্ষেত্রে আরও প্রকট হয়ে ধরা দেয় তখন উদ্বেগের মাত্রাটা সবাইকে ভাবিয়ে তুলে। বার্তা২৪.কম-এ গেল ২৫ ফেব্রুয়ারি (২০২৪) প্রকাশিত ‘মেয়রপুত্র ও ভাতিজিকে পরীক্ষাকেন্দ্রে ‘অতিরিক্ত সময়’: বিতর্কে সচিবকে অব্যাহতি’ শীর্ষক খবরটি দেখে বর্তমানে দেশে শিক্ষা ব্যবস্থার একটি চিত্র ভেসে উঠে।

খবরটির গভীরে গিয়ে জানা গেল, যেই বিদ্যালয়ে এই কুকর্মটি সংঘটিত হয়েছে স্থানীয় মেয়র (কেন্দুয়া পৌরসভা) আসাদুল হক ভুঁইয়া ওই প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতিও। এবং এই মেয়রের পুত্র ও ভাতিজিকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় ‘অতিরিক্ত সময়’ দিতে গিয়েই সংশ্লিষ্ট শিক্ষকগণ রীতিমতো ফেঁসে গেছেন। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, কেন্দুয়ার সায়মা শাহজাহান একাডেমিতে সংঘটিত ওই ঘটনার জেরে স্থানীয় শিক্ষা অফিস চার শিক্ষককে এখন পর্যন্ত ‘অব্যাহতি’ প্রদান করেই বিষয়টির আপত দায় সেরেছেন! অধিকতর তদন্তে একটি কমিটি গঠনের কথাও জানা গেছে খবরে।

প্রসঙ্গ হচ্ছে, যে দুই শিক্ষার্থীকে অনৈতিক সুবিধা প্রদান করতে গিয়ে শিক্ষকরা কাঠগড়ায় উঠেছেন, সাময়িক অব্যাহতি পেয়েছেন- কিন্তু সেই শিক্ষার্থী কিংবা তাদের ‘ক্ষমতাধর’ অভিভাবকদের কি কিছুই হবে না? আমরা সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় কাছাকাছি এমন অপরাধে দায়ী শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারের খবর পত্রিকান্তরে জেনেছি। বোধহয়, কেন্দুয়ার ঘটনায় দায়ী শিক্ষার্থীরা তাদের ক্ষমতাধর অভিবাবকদের দৌলতে পার পেয়ে গেলেন!

আমরা যদ্দূর জেনেছি, মেয়র আসাদুল হক ভূঁইয়া স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী ব্যক্তি, যিনি উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক। এবং পরীক্ষাকেন্দ্রে ‘অতিরিক্ত সময়’ সুবিধা পাওয়া তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রীর বাবা এনামুল হক ভূঁইয়াও একজন রাজনীতিক, যিনি কেন্দুয়া পৌর আওয়ামীলীগের সভাপতি। বোঝা গেল, স্থানীয় রাজনীতিতে হক পরিবার অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় শিক্ষা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো হয়ত ওই দুই শিক্ষার্থীর ‘দায়’ দেখেননি! কিন্তু যে প্রশ্নটি ঘুরে ফিরে দংশন করছে তা হচ্ছে, ‘প্রভাবশালী ওই অভিভাবকগণ’ বা যদি বলি ‘দায়িত্বশীল অভিবাবকগণ’ কি নিজেদের কোন দায় দেখেন না?

জনপ্রতিনিধি কিংবা রাজনৈতিক নেতা হিসেবে উনারা তো প্রতিনিয়ত জনগণের মুখোমুখি হন। জনগণের কাছে তাদের যে ‘ম্যান্ডেট’; তাতে নিজেদের পরিশুদ্ধ রাখা কিংবা অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিনিয়ত জাহির করবার যে প্রচেষ্টা তাঁরা করেন, সেখানে তাদের সন্তানদের এমন অপকর্মের দায় কি অভিভাবকরা এড়াতে পারেন? আমরা আন্তর্জাতিক খবরে মাঝে মধ্যেই দেখতে পাই, খুবই সামান্য বিচ্যুতিতে প্রধানমন্ত্রীর মতো পদ থেকেও ইস্তফা দিয়ে নিজের আত্মমর্যাদাকে বাঁচিয়ে তুলেন অনেক রাজনীতিক। আমরা এখানে এতটা মূল্যবোধের চর্চা আশা না করলেও একটি বিদ্যাপীঠের পরিচালনা পর্ষদকে নেতৃত্ব দেওয়া সর্বোচ্চ ব্যক্তিটির কাছ থেকে কি তাঁরই পুত্র-কন্যার এহেন অপকর্মে লজ্জিত হয়ে অন্ততঃ নিজের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর মত ‘প্রবৃত্তি’ আশা করতে পারি না?

খবরে প্রকাশ, স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি ও অভিভাবক প্রথমে এই অভিযোগটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরে জানান। তারপরই দায়ী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার ঘোষণা আসে এবং চার শিক্ষক অব্যাহতি পান। কিন্তু ঘটনার ৯ দিন অতিবাহিত হতে থাকলেও বিদ্যালয়টির পরিচালনা পর্ষদ কি কোন ‘দায়’ অনুভব করছে না? নাকি শিক্ষকদের বলির পাঠা করে প্রকৃত দায়ীরা অধরাই থেকে যাবেন?

তবে আমরা দেশের প্রত্যন্ত জনপদে ঘটে যাওয়া বিষয়াবলীর ওপর নজর রেখে যা বুঝতে পারি, সায়মা শাহজাহান একাডেমির মতো অসংখ্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে পরিচালনা পর্ষদের এই ধরণের অন্যায় আধিপত্যে শিক্ষার প্রকৃত মূল্যবোধ মুখ থুবড়ে পড়ছে। সরকারের যত কড়া পদক্ষেপই থাকুক না কেন, সংশ্লিষ্টদের মূল্যবোধের উন্নতি না হলে এ ধরণের প্রবণতা কতদূর ঠেকানো সম্ভব সেই উত্তর আমাদের জানা নেই। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অনৈতিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে জাতির মেরুদণ্ডকে যেভাবে নড়বড়ে করে তোলার ধৃষ্ঠতা দেখাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা তার প্রতিকারে প্রথমতঃ জনসাধারণ ও অভিভাবকদেরকেই জেগে উঠতে হবে। আমরা আশাকরব, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ওই বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ অবিলম্বে ভেঙে দিয়ে বিদ্যালয়ে শিক্ষা সূষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনবে এবং দেশের অপরাপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন ‘অঘটন’র পুনরাবৃত্তি বন্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেবে।

;

৩ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় দিবস: শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এগিয়ে চলা



এনামুল হক
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

শিক্ষা- একটা জাতির উন্নতির চাবিকাঠি। দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য পূরণে শিক্ষাই হচ্ছে প্রধান অবলম্বন। মেধা ও মননে আধুনিক এবং চিন্তা-চেতনায় প্রাগ্রসর একটি সুশিক্ষিত জাতিই একটি দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। তাই, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড! ন্যায়ভিত্তিক আধুনিক সমাজ বিনির্মাণের প্রতিজ্ঞায় ৪৮ থেকে ৭০ সাল পর্যন্ত যে জাতীয় মুক্তি আন্দোলন, তারই ফলে আজকের এই বাংলাদেশ। বাঙালি ছাত্রসহ আপামর জনসাধারণ রাজপথে যে সংগ্রাম করেছে সেই আন্দোলন-সংগ্রামেই বোনা হয়ে গিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের ভিত, যা একটি আধুনিক রাষ্ট্রগঠনের দার্শনিক মন্ত্র।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি সুখী, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার আগামী প্রজন্মকে নৈতিক মূল্যবোধ, জাতীয় ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে। শিক্ষাকে উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও। গঠন করেন ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন। এই কমিশন মুক্তিযুদ্ধের শিক্ষাদর্শনই প্রতিফলিত।

নেত্রকোনায় প্রতিষ্ঠিত শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়

উচ্চশিক্ষাকে সবার দ্বারে সহজলভ্য করার লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। জোর দেওয়া হচ্ছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর। এরই আলোকে ২০১৮ সালে অবহেলিত বাংলাদেশের ‘ভাটি অঞ্চল’ বলে খ্যাত নেত্রকোনায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়’। এর আগে ২০১৭ সালের ৩০ জানুয়ারি মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ‘শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় আইনে’র নীতিগত অনুমোদন হয়। ২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গেজেট আকারে আইনটি (২০১৮ সালের ৯নং আইন) পাস হয়।

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক ড. রফিকুল্লাহ খানকে প্রথম ভিসি হিসেবে নিয়োগদানের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। ২০১৯ সালের ৩ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পাঠদান তথা শিক্ষা-কার্যক্রম শুরু হয়। তাই প্রতিবছর ৩ মার্চকে ‘শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ হিসেবে উদযাপন করে আসছে কর্তৃপক্ষ।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার একজন দূরদর্শী নেতৃত্ব। তাঁর নেতৃত্বেই বিশ্বমঞ্চে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে লাল-সবুজের বাংলাদেশ। মানবতার নেত্রীর নামে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর স্বপ্নের সমান উচ্চতায় পৌঁছাতে চায়। আর সে লক্ষ্যেই নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শিক্ষাপ্রশাসনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতালব্ধ দক্ষতায় দেশের প্রখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানী উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম কবির বিশ্ববিদ্যালয়টিকে উচ্চশিক্ষার ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ে তোলার ব্রত নিয়ে এগিয়ে চলেছেন।

তিনি স্বপ্ন দেখেন, শিক্ষা ও গবেষণায় শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় নতুন উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে নতুন ধারণা ও উদ্ভাবনে এক অনন্য মাইলফলক অর্জন করবে। সেই সঙ্গে প্রাগ্রসরমান বিশ্বে নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম, আলোকিত ও দক্ষ পেশাদার জনশক্তি তৈরি করবে; যারা দেশ ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের কল্যাণে সর্বদা নিয়োজিত থাকবে।

তাই তো অনেক সম্ভাবনা, অনেক প্রতিশ্রুতি আর আশ্বাসের ডালি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবকাঠামো নির্মাণের কাজও এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে দুয়েকটি ভবনের কার্যক্রম দৃশ্যমানও হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, শিক্ষার অভিজাত বলয়ে প্রবেশের সর্বজনীন যে আকাঙ্ক্ষা, তা অতি অল্প সময়ে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা কিংবা ব্যবস্থাপনায় শুধু দেশে নয়, উন্নত বিশ্বেরও নজর কাড়বে ‘শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়’।

বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্যাম্পাস স্থাপনে ইতোমধ্যে সমতল প্রায় ৫০০ একর ভূমির উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে ১০ তলাবিশিষ্ট একাডেমিক ভবন-৩ এবং ৪ তলাবিশিষ্ট প্রশাসনিক ভবনের কাজ চলমান। নির্মাণের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে- টিএসসি, ক্যাফেটেরিয়া, ছাত্রহল, ছাত্রীহল, লাইব্রেরি, মেডিকেল সেন্টার, ডে-কেয়ার ও ইয়োগা সেন্টার।

পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হলে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষ, আন্তর্জাতিকমানের ল্যাবরেটরি, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, খেলার মাঠ, সুস্থ বিনোদনকেন্দ্র, সুচিকিৎসার জন্য উন্নত যন্ত্রপাতিসম্পন্ন মেডিকেল সেন্টার, ক্যাফেটেরিয়া, শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্র, মেডিটেশন হলসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সুপেয় পানির সুব্যবস্থা থাকবে অর্থাৎ একটি বৈশ্বিকমানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যা থাকা প্রয়োজন, সবই থাকবে এই ক্যাম্পাসে।

শুরুতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্থাপনের উদ্যোগ থাকলেও সাধারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অনুমোদন লাভ করে। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় হলেও শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটি তার গন্তব্য ঠিক করে নিয়েছে।

পাঠ্যক্রমে অর্থনীতি, ইতিহাস, সভ্যতা, ভাষা, সাহিত্য যেমন রয়েছে, তেমনই আসন্ন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকিবেলায় বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তিবিদ্যার বিষয়গুলোকেও প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩টি অনুষদের অধীনে ৪টি বিভাগ আছে। এগুলো হচ্ছে- কলা অনুষদে বাংলা বিভাগ ও ইংরেজি বিভাগ, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে অর্থনীতি বিভাগ, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ।

শিক্ষার্থী সংখ্যা ৫৫১ জন, শিক্ষক ১৫ জন এবং কর্মকর্তা রয়েছেন ২৩ জন। কর্মচারী নিয়োজিত আছেন ৫৬ জন। গুণগত শিক্ষা কার্যক্রম বজায় রাখার লক্ষ্যে মেধাবী ও জ্ঞান অনুসন্ধিৎসু শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনকে গতিশীল রাখতে দক্ষ ও মেধাবী কর্মকতা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে; যারা বিশ্ববিদ্যালয়টিকে সুচারুভাবে এগিয়ে নিতে সর্বদা সচেষ্ট।



মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনস্টিটিউট অব বঙ্গবন্ধু অ্যান্ড লিবারেশন ওয়ার, ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ, ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান এসই স্টাডি, ইনস্টিটিউট অব স্ট্যাটিসটিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং, ইনস্টিটিউট অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্স, ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ইনস্টিটিউট অব ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ, ইনস্টিটিউট অব মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজ, ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকস, ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি, ইনস্টিটিউট অব এনার্জি, ইনস্টিটিউট অব ডিজেস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারাবেল স্টাডিজ, ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হবে।

নেত্রকোনার জীব-বৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা কর্ম পরিচালনার জন্য রিভার অ্যান্ড শিক্ষা নিয়ে গবেষণার জন্য থাকবে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট। বিদেশি ছাত্রদের উচ্চশিক্ষায় শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। তাদের জন্য নির্মাণ করা হবে আন্তর্জাতিক হোস্টেল।

অভীষ্ট ও ভাবনার বৈচিত্র্যে এ বিশ্ববিদ্যালয় হবে অনন্য। সুন্দরবন ও উপকূল নিয়ে বিশ্বে প্রথম এখানেই স্থাপিত হয় ইনস্টিটিউট ফর ইন্টিগ্রেটেড স্টাডিজ অন দ্য সুন্দরবনস।

অ্যাকাডেমিক এক্সেলেন্সের জন্য ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল স্থাপন করা হবে। প্রতিটি বিভাগেই আউটকাম বেইজড কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য প্রথাবদ্ধ ছক থেকে বেরিয়ে প্রয়োজনমুখী শিক্ষাদান। বিশ্বজনীন শিখন প্রক্রিয়ার সঙ্গে অভিযোজন। গবেষণাগারে আধুনিক মানের গবেষণা সহায়ক নানা যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে। বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে থাকবে স্মার্ট ক্লাসরুম। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ওয়াইফাই কর্নার, পর্যাপ্ত ই-বুক আর লাইব্রেরিকে অটোমেশন করে আরো সমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয় করে তোলা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দর্শনেই নিহিত ছিল পিছিয়েপড়া মানুষকে এগিয়ে নেওয়ার সংকল্প আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই সামাজিক সমতার এই আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করেছিল। সেই মহান ঐতিহ্য থেকে শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় এতটুকু বিচ্যুত হয়নি। ভবিষ্যতেও হবে না। পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাসে জাতির পিতার সৌম্যদর্শন মুখচ্ছবি, শহিদ মিনার, স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ করা হবে।

নেত্রকোনার বারহাট্টার কাশবনে জন্ম নেওয়া দেশের অন্যতম আধুনিক কবি নির্মলেন্দু গুণ প্রতিষ্ঠিত ‘কবিতাকুঞ্জ’কে বিশ্ববিদ্যালয়ে আত্তীকরণ করা হয়েছে। আমরা মনে করি, মূল্যবোধের গভীরে থাকা এসব অভিজাত অনুভবই শিক্ষার্থীদের দেশের প্রতি সম্মানবোধ বাড়িয়ে দেবে।

শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়। অবকাঠামোসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই এগিয়ে চলছে। শহরের রাজুর বাজারে অবস্থিত টিটিসি-এর একটি ভবনে অস্থায়ী ক্যাম্পাস স্থাপন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলছে। ফলে, শিক্ষার্থীদের আবাসিক সংকটসহ নানান সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। নানান সমস্যার মুখেও শিক্ষার্থীরা যে ‘নতুনের সৃষ্টি’র জন্য পাহাড়সম বিসর্জন কিংবা ত্যাগ স্বীকার করছেন, এটা সত্যিই আমাদের মুগ্ধ করে।

এসব চ্যালেঞ্জ স্বত্ত্বেও উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম কবিরের সার্বিক তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিকমানের দুটি কম্পিউটার ল্যাব, একটি হার্ডওয়্যার ল্যাব, ভার্চুয়াল ক্লাসরুম পরিচালিত হচ্ছে। আছে স্মার্টবোর্ড ব্যবহারের সুবিধাও। শিক্ষার্থীদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত করার লক্ষ্যে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধ কর্নার’ স্থাপন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের যোগযোগব্যবস্থা সহজীকরণের জন্য দুটি মিনিবাস ও তিনটি মাইক্রোবাস রয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিতকরণে নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স-সুবিধা রয়েছে।

শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন। প্রতিটি বিভাগের নিজস্ব ক্লাব বিশ্ববিদ্যালয়কে করেছে আরো সমৃদ্ধ। ক্লাবগুলোতে শিক্ষার্থীরা বিষয়ভিত্তিক বিতর্ক, আলোচনা, সেমিনার ও গ্রুপ স্টাডিতে ব্যস্ত থাকেন।

শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে নেত্রকোনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব সাজ্জাদুল হাসান, নেত্রকোনা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আশরাফ আলী খান খসরুসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের অবদান অনস্বীকার্য। স্থানীয় জনসাধারণও সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে চলেছেন।

৩ মার্চ শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস। এদিন ক্যাম্পাসে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই ক্ষণে প্রত্যাশা জাগে, বিশ্ববিদ্যালয়টি যেন জ্ঞান সৃজন ও মুক্তবুদ্ধির চারণভূমিতে পরিণত হয়। যে শিক্ষা মানুষকে ক্ষুদ্র হতে বৃহৎ করে, মনকে মুক্ত করে, সে শিক্ষার পরিচর্যা কেন্দ্র হোক আমাদের প্রিয় শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়। দক্ষতা ও জ্ঞান সৃষ্টির কারিগর হয়ে উঠুক মগড়া তীরের এ বিদ্যাপীঠ। শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভাশিস!

লেখক: পিএস টু ভিসি, শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়, নেত্রকোনা

;

ইউরোপে বাংলাদেশি সমকামীদের আশ্রয় আবেদন, বাস্তবতা কি?



অ্যাডভোকেট শাহানূর ইসলাম সৈকত
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সমকামী সম্প্রদায়ের সদস্য হওয়ায় পরিবার, প্রতিবেশী, সমাজের মাতব্বরসহ রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, নিপীড়ন ও নির্যাতন থেকে বাঁচতে দেশ থেকে পালিয়ে ফ্রান্স সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা উদ্বেগজনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিভিন্ন অসমর্থিত সূত্রে জানা যাচ্ছে।

সমকামী দাবি করা আশ্রয় আবেদনকারী বাংলাদেশিদের মধ্যে অনেকে তাদের যৌন অভিমুখিতার কারণে বাংলাদেশে নিপীড়নের শিকার হয়ে থাকলেও আবেদনকারীদের মধ্যে বস্তুত সমকামী নয় কিন্তু সমকামী দাবি করে আশ্রয় আবেদন করেছে এমন প্রতারণামূলক আবেদনের সংখ্যাও নেহাত কম নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আশ্রয় প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য নিজেদের প্রতারণামূলকভাবে সমকামী বলে দাবি করে যদিও অনেকেই আশ্রয় পেয়ে থাকে, কিন্তু উক্ত প্রতারণামূলক ঘটনাগুলি আশ্রয় ব্যবস্থায় প্রকৃত সমকামী আশ্রয় প্রার্থীদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করেছে। ফলে অনেক সময় প্রকৃত নিপীড়নের শিকার সমকামী ব্যক্তিরাও আশ্রয় প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হোন। 

তবে একথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশে সমকামী ব্যক্তিদের শুধুমাত্র যৌন অভিমুখীতা বা লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে প্রতিকূল পরিবেশে ব্যাপক বৈষম্য, সহিংসতা, নিপীড়ন, সামাজিক বর্জন, হয়রানি, এমনকি কারাবাস বা মৃত্যুর হুমকির সম্মুখীন হতে হয় এবং আশ্রয় পাওয়া তাদের জন্য নব জীবন পাওয়ার তুল্য।

সাম্প্রতিক সময়ে সুনির্দিষ্ট ভয় এবং ঝুঁকির সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও ফ্রান্স সহ ইউরোপিয় ইউনিয়নভূক্ত দেশ সমূহে অনেক বাংলাদেশি সমকামী আশ্রয় প্রার্থীদের আবেদন যথাযথ গুরুত্ব সহকারে যাচাই না করে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। যা বাংলাদেশি সমকামী সম্প্রদারের সমস্যাগুলির যথাযথ উপলব্ধির অভাব এবং তাদের দাবির যথাযথ মূল্যায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় ও গুরুত্ব প্রদান না করার মত আশ্রয় প্রক্রিয়ার পদ্ধতিগত ত্রুটির জন্য হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যদিও সমকামী দাবি করা প্রতারণামূলক আশ্রয় আবেদনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু উক্ত ব্যবস্থা নিপীড়নের শিকার প্রকৃত সমকামী আশ্রয় প্রার্থীদের আশ্রয় প্রাপ্তিতে যেন কোনভাবে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে সে বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। তাই ফ্রান্স সহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভূক্ত দেশ সমূহকে অবশ্যই আশ্রয় ব্যবস্থার যথার্থতা রক্ষা এবং প্রকৃত নিপীড়িতদের সুরক্ষার জন্য মানবিক দায়বদ্ধতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

সেজন্য আশ্রয় আবেদন পররালোচন্যাকারী কর্মকর্তা ও বিচারকদের সমকমামিতা, সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা, যৌন অভিমুখিতা ও অভিযোজন এবং লিঙ্গ পরিচয়ের সূক্ষ্মতা সম্পর্কে ব্যপক প্রশিক্ষণের  ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি, সমকামী আশ্রয় প্রার্থীরা যাতে সহজে  আইনি প্রতিনিধিত্ব, ভাষাগত সহায়তা, মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শ সহ সমকামি ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করে এমন সংস্থার সাথে সহজে যোগাযোগ ও সেবা পেতে পারে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

উপরন্তু, সমকামী আশ্রয় আবেদন সংক্রান্ত মামলাগুলির বিষয়ে প্রদত্ত সিদ্ধান্তগুলি যেন সঠিক এবং আপ-টু-ডেট তথ্যের ভিত্তিতে হয় সেজন্য সমকামী অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক, জাতীয় ও স্থানীয় সংস্থা ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলির সাথে সমন্বয় এবং তথ্য-আদান-প্রদান উন্নয়নে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

পরিশেষে, আশ্রয় ব্যবস্থার অপব্যবহার এবং জালিয়াতির ঘটনাগুলিকে মোকাবিলা করা একদিকে যেমন অপরিহার্য, ঠিক তেমনি নিপীড়নের শিকার প্রকৃত সমকামী আশ্রয় প্রার্থীদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

যৌন অভিমুখিতা ও যৌণ অভিযোজন এবং লিঙ্গ পরিচয়ের উপর ভিত্তি করে আশ্রয়ের আবেদনগুলি অত্যন্ত যত্ন ও সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করার মাধ্যমে ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভূক্ত দেশ সমূহকে অবশ্যই ন্যায্যতা, অখণ্ডতা এবং মানবাধিকারের প্রতি তাদের অঙ্গীকার বজায় রাখতে হবে।

শুধুমাত্র অঙ্গীকারের ভিত্তিতে ফ্রান্স সহ ইউরোপিয় ইউনিয়নভূক্ত দেশ সমূহ নৈতিক ও আইনগত বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে নিপীড়ণের হাত থেকে পালিয়ে আসা বাংলাদেশি সমকামী নাগরিকদের আশ্রয় প্রদান করে মানবাধিকার চ্যাম্পিয়ন হিসাবে তাদের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে পারে।

লেখক: প্যারিস, ফ্রান্স বসবাসরত বাংলাদেশি আইনজীবী; আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনে উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত; প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ); মোবাইল: +৩৩০৭৮৩৯৫২৩১৫; ইমেইল: [email protected]; ব্লগ: www.shahanur.blogspot.com

;

আগুনের কী দোষ!



কবির য়াহমদ, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, বার্তা২৪.কম
আগুনের কী দোষ!

আগুনের কী দোষ!

  • Font increase
  • Font Decrease

রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৬ জন। সারাদেশে ওঠেছিল শোকের মাতম। শোক হয়েছিল সর্বজনীন। কিন্তু সেই শোক স্তিমিত হয়ে এটা এখন সর্বজনীন থেকে হয়ে পড়েছে ব্যক্তিগত। প্রাণ হারানো স্বজনদের স্বজনেরাও এখন কেবল শোকাহত। বাকি সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন স্বাভাবিক জীবনযাপনে। এটাই বোধহয় স্বাভাবিক!

গ্রিন কোজি কটেজের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে। ঘটনার পরের দিনই পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। আসামি অজ্ঞাতপরিচয়। এরইমধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কয়েকজনকে আটক করেছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তারা সিদ্ধান্ত নেবে, এদের মামলার আসামি করা হবে কি না! ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা জোনের সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ সালমান ফার্সি মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, 'বেইলি রোডের আগুনের ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে আগুনের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হবে।' পুলিশ এরই মধ্যে যাদের আটক করেছে, তাদের মধ্যে আছেন ওই ভবনে ‘চুমুক’ নামের একটি খাবার দোকানের দুই অংশীদার আনোয়ারুল হক ও শফিকুর রহমান এবং ‘কাচ্চি ভাই’ নামে খাবারের দোকানের ম্যানেজার জয়নুদ্দিন জিসান।

আটকদের মধ্যে এখন পর্যন্ত যারা, তাদের পরিচিতি দেখে তাৎক্ষণিক মনে হচ্ছে, প্রথম দুজন ছোট একটা খাবারের দোকানের দুই অংশীদার। অন্যজন ‘কাচ্চি ভাই’ নামের বড় একটা খাবারের চেইনশপের মোটে ম্যানেজার। এখন পর্যন্ত বড় দোকানের মালিকপক্ষ এবং বহুতল ভবনের মালিকপক্ষ পর্যন্ত পৌঁছার চেষ্টা করেনি পুলিশ।

প্রাপ্ত খবরে জানা যাচ্ছে, বহুতল এই বাণিজ্যিক ভবনে অনুমোদিত নকশা মেনে চলা হয়নি। ভবনের স্থপতি মুস্তাফা খালিদ পলাশ সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, 'মূলত অফিস হবে জেনে সেই কাঠামোতে ওই ভবনটি তৈরি করা হয়েছিল। অথচ ভবনটি ব্যবহার করা হয়েছে, রেস্তোরাঁ হিসেবে। রাজউক থেকে এ বিষয়ে কোনো অনুমোদন ছিল না। সে কারণে রেস্তোরাঁ হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ-সুবিধা ছিল না ভবনটিতে।' তিনি নিজের দায় এড়াতে এখন কথাগুলো বলছেন কি না জানি না, তবে নির্মিত ভবনে যে ত্রুটি ছিল সেটা তার বক্তব্যে পরিস্কার।

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন বলেছেন, 'ভবনটিতে কোনো অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। ঝুঁকিপূর্ণ জানিয়ে ভবন কর্তৃপক্ষকে তিনবার চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।' রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, 'বেইলি রোডের যে ভবনে আগুন লেগেছে, ওই ভবনের কেবল আটতলায় আবাসিকের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। বাকি এক থেকে সাততলা পর্যন্ত বাণিজ্যিক অনুমোদন নেওয়া হলেও সেখানে কেবল অফিস কক্ষ ব্যবহারের জন্য অনুমোদন ছিল। কিন্তু রেস্টুরেন্ট শোরুম বা অন্য কিছু করার জন্য অনুমোদন নেওয়া হয়নি।'

বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজ নামের ভবনে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনার পর গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আরও বেশি সজাগ হওয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেইলি রোডের ভবনে অগ্নিনির্গমন পথ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘আমরা অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের ব্যবস্থা করেছি। তবুও মানুষ এতটা সচেতন নয়। একটি বহুতল ভবনে আগুন দেখেছেন, যার কোনো অগ্নিনির্গমন পথ ব্যবস্থা নেই।’

৪৬ প্রাণহানি আর আরো অনেকের প্রাণ সংকটে থাকার এই সময়ে এসে এখন শোনা যাচ্ছে, ‘নাই-নাই’ ধ্বনি, ‘নিয়ম না মানার’ অভিযোগ! এই অভিযোগগুলো কোথায় ছিল আগে! কেন সময়মতো ব্যবস্থা নেয়নি কোনো কর্তৃপক্ষ! এখন তাদের অভিযোগগুলো স্রেফ দায় এড়ানোর অজুহাত নয় কি! ফায়ার সার্ভিস, রাজউক, সিটি করপোরেশন, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়সহ যত বিভাগ/দপ্তর/ মন্ত্রণালয়/ প্রতিষ্ঠান বিবিধ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকে, তারা কীভাবে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে!

ফায়ার সার্ভিসের তথ্যের বরাত দিয়ে গণমাধ্যম জানাচ্ছে, গ্রিন কোজি কটেজের নিচতলায় স্যামসাং ও গেজেট অ্যান্ড গিয়ার নামে দুটি মুঠোফোন ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম বিক্রির দোকান এবং শেখলিক নামের একটি ফলের রস বিক্রির দোকান ও চুমুক নামের একটি চা-কফি বিক্রির দোকান; দ্বিতীয়তলায় 'কাচ্চি ভাই' নামের রেস্তোরাঁ; তৃতীয়তলায় ইলিয়ন নামের পোশাকের ব্র্যান্ডের দোকান; চতুর্থতলায় খানাস ও ফুকো নামের দুটি রেস্তোরাঁ; পঞ্চমতলায় পিৎজা ইন নামের রেস্তোরাঁ; ষষ্ঠতলায় জেসটি ও স্ট্রিট ওভেন নামের দুটি রেস্তোরাঁ; ছাদের একাংশে অ্যামব্রোসিয়া নামের রেস্তোরাঁ এবং সপ্তমতলায় হাক্কাঢাকা নামের একটি রেস্তোরাঁ ছিল। ভবনে লাইনের গ্যাস সংযোগ ছিল না, বলে সবাই গ্যাসের সিলিন্ডার ব্যবহার করতো এবং সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কেবল দোতলা বাদে প্রতি তলার সিঁড়িসহ সবখানে গ্যাসের সিলিন্ডার রাখা ছিল।

চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, আগুনে নয়, বেশির ভাগেরই মৃত্যু হয়েছে ধোঁয়ায় শ্বাসনালী পুড়ে গিয়ে। তাদের বক্তব্যে জানা যাচ্ছে, আগুনের ধোঁয়া বেরোনোর পথ ছিল না কাচঘেরা এই ভবনে। ফলে যারা ছাদে উঠতে পারেননি তাদের বেশির ভাগই মারা গেছেন অক্সিজেনের অভাবে। রাজধানীসহ বড় বড় শহরের বহুতল ভবনগুলোর বর্তমান যে অবস্থা, তার বেশির ভাগই কাচঘেরা। গ্রিন কোজি কটেজ ট্র্যাজেডি বলছে, অন্য কোথাও এমন অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটলে একই পরিণতি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।

বৃহস্পতিবার রাতের আগুনের এই ঘটনা নজিরবিহীন নয়। আগেও রাজধানীসহ দেশের নানা জায়গায় বারবার আগুন লেগেছে, অগণন লোকের প্রাণ গেছে। বারবার লাশ ঠেলেছে দেশ! বারবার শোকে কাতর হয়েছে মানুষ! নিমতলীর রাসায়নিক বোঝাই গুদামঘর, তাজরীন গার্মেন্টস, সেজান জুস কারখানা, বিএম ডিপো থেকে সীমা অক্সিজেন কিংবা বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ; এর আগে-পরে-মধ্যে আরো অনেক ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মানুষ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বেপরোয়া অবহেলায় অনেকের প্রাণ গেছে। তাদের কিছুই হয়নি। প্রতি ঘটনা শেষে তদন্ত কমিটি হয়েছে। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রতিবেদনে কিছু সুপারিশ দিয়েছে। কিন্তু কোনো সুপারিশ প্রতিপালন হয়েছে বলে জানা নেই। লক্ষণীয় বিষয় হলো, যারা সুপারিশ দিয়ে থাকে, তারা আবার কোনো না কোনোভাবে কোনো কর্তৃপক্ষের। তারাও দায়িত্বশীল। প্রতিবেদনের পর আর কোথাও সেই সুপারিশ নিয়ে তাদের কথা বলতে দেখিনি আমরা।

আগুনের ধর্ম পোড়ানো। আগুনে মানুষ মরেছে, মরছে অগণন। কিন্তু এসব ঘটনাকে কেবল 'আগুনে মৃত্যু' বলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ সামান্যই। পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল, নয়া ঢাকায় গ্যাস সিলিন্ডার আর বায়ুরোধী কাচঘেরা ভবনগুলো প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। এই অবস্থা সৃষ্টি করেছে মানুষ। এই অবস্থার পথ দেখাচ্ছে, মানুষের নেতৃত্বে থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান/ বিভাগ/ দপ্তর। বেইলি রোডের আগুনে-ধোঁয়ায় মানুষ মারা গেছে, বলছে সবাই। কিন্তু সত্যি কি তাই! এমন মৃত্যুর জন্য দায়ী মূলত আগুন আর ধোঁয়া নয়, মানুষই! মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে মানুষকে! আর মানুষ-হত্যার অবাধ সুযোগ দিয়ে গেছে অপরাপর মানুষই!

;