বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে পরিবর্তন: একটি পর্যবেক্ষণ



মো: বজলুর রশিদ
মো: বজলুর রশিদ, ছবি: বার্তা২৪.কম

মো: বজলুর রশিদ, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ একটি ক্রমাগত পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে অবস্থিত। গত কয়েক দশকে, গ্রামীণ অঞ্চলে বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক, এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ঘটেছে যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই পরিবর্তনগুলো একদিকে যেমন গ্রামীণ জীবনের মানোন্নয়ন করেছে, অন্যদিকে নতুন চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করেছে।

প্রথমত, অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করা জরুরি। কৃষি বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষি উৎপাদনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। উন্নত প্রযুক্তি এবং কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে, ফসল উৎপাদন বেড়েছে এবং কৃষকদের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ধান, গম, আলু, এবং অন্যান্য খাদ্যশস্যের উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এছাড়া, কৃষি খাতে বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতা ও প্রণোদনা কৃষকদের অবস্থার উন্নয়নে সহায়ক হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শিক্ষার হার বেড়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় সরকারি বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন এনজিওর প্রচেষ্টা শিক্ষার মানোন্নয়নে সহায়ক হয়েছে। এছাড়া, নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা নারীদের ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে শিক্ষার মান ও শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা এখনও রয়ে গেছে।

তৃতীয়ত, স্বাস্থ্য খাতেও পরিবর্তন দেখা গেছে। গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। টিকা কার্যক্রম এবং মায়েদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে শিশু মৃত্যুহার এবং মাতৃমৃত্যুহার হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া, পুষ্টি বিষয়ক বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রামীণ জনগণের স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। তবে, স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

চতুর্থত, যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। গ্রামীণ এলাকায় সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটেছে, যা গ্রামের মানুষদের শহরের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে সহায়ক হয়েছে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের প্রসার ঘটেছে, যা তথ্যপ্রবাহ সহজতর করেছে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে। ই-কমার্স এবং অনলাইন ব্যাংকিং সেবাও গ্রামীণ অর্থনীতিকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে।

বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়নে ক্ষুদ্রঋণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি, যা মূলত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নে লক্ষ্য করে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় নারীর ক্ষমতায়ন, স্বনির্ভরতা, এবং উদ্যোক্তা তৈরি করতে ক্ষুদ্রঋণ অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হয়েছে। অনেক দরিদ্র পরিবার ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করেছে এবং তাদের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসা, যেমন গবাদি পশু পালন, কৃষি, ক্ষুদ্র হস্তশিল্প, এবং পোলট্রি খামার ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে বিকাশ লাভ করেছে। এই ঋণ সুবিধা পেয়ে গ্রামীণ জনগণ আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছে এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে।

ক্ষুদ্রঋণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল নারীর ক্ষমতায়ন। গ্রামীণ নারীরা প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণ সুবিধা পেত না এবং আর্থিক স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত ছিল। ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে নারীরা ঋণ নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করেছে এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছে। এর ফলে, নারীরা পরিবারের আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করছে এবং সামাজিকভাবে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় হয়েছে।

ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ছোট ও মাঝারি ব্যবসা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা বেকারত্ব হ্রাসে সহায়ক হয়েছে। এছাড়া, ক্ষুদ্রঋণ সুবিধার মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে।

তবে, ক্ষুদ্রঋণের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। উচ্চ সুদের হার অনেক সময় ঋণগ্রহীতাদের জন্য চাপ সৃষ্টি করে এবং ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে সমস্যা হয়। এছাড়া, কিছু ক্ষেত্রে ঋণের টাকা সঠিকভাবে ব্যবহার না হওয়ায় ঋণগ্রহীতারা আর্থিক সংকটে পড়ে। এজন্য, ঋণ প্রদানের পাশাপাশি ঋণগ্রহীতাদের প্রশিক্ষণ এবং পরামর্শ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

ক্ষুদ্রঋণ বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এটি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করেছে, নারীর ক্ষমতায়ন করেছে, এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। যদিও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব। ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষত গ্রামীণ অঞ্চলে রেমিট্যান্স অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক পরিবর্তনের এক প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে।

প্রথমত, অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে রেমিট্যান্সের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। অনেক গ্রামীণ পরিবারই প্রবাসে কর্মরত সদস্যদের পাঠানো অর্থের উপর নির্ভরশীল। এই অর্থের মাধ্যমে তারা নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করে, সন্তানের শিক্ষা নিশ্চিত করে, এবং স্বাস্থ্যসেবা পায়। প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে গ্রামের মানুষজন তাদের বাসস্থান উন্নত করতে পেরেছে, কৃষিতে বিনিয়োগ করতে পেরেছে, এবং ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করতে পেরেছে। ফলে, গ্রামের অর্থনৈতিক কাঠামো দৃঢ় হয়েছে এবং দারিদ্র্যের হার কমেছে।

দ্বিতীয়ত, রেমিট্যান্সের মাধ্যমে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নত হয়েছে। প্রবাসী আয় থেকে গ্রামের মানুষজন রাস্তা, ব্রিজ, এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণে অবদান রেখেছে। এছাড়া, রেমিট্যান্সের মাধ্যমে গ্রামের স্কুল, মসজিদ, এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্র উন্নত করা সম্ভব হয়েছে। ফলে, গ্রামীণ জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে এবং সামাজিক সেবাগুলোর প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

তৃতীয়ত, রেমিট্যান্সের মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তনও ঘটেছে। প্রবাসী আয়ের ফলে গ্রামের মানুষের মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। অনেক পরিবারই প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে তাদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছে। এছাড়া, রেমিট্যান্সের ফলে নারীর ক্ষমতায়নও বেড়েছে। অনেক প্রবাসী পুরুষ তাদের স্ত্রীদের জন্য ব্যাংক একাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করেছে এবং তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে, নারীরা আরও স্বাধীন এবং আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠছে।

তবে, রেমিট্যান্সের কারণে কিছু নেতিবাচক প্রভাবও দেখা গেছে। প্রথমত, অনেক ক্ষেত্রে প্রবাসী আয়ের উপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা গ্রামীণ অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা হ্রাস করে। প্রবাসী আয়ে কোনো সমস্যা হলে গ্রামীণ পরিবারগুলো আর্থিক সমস্যায় পড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, প্রবাসে কর্মরত সদস্যদের দীর্ঘ অনুপস্থিতি পরিবারে মানসিক চাপ এবং সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় প্রিয়জনদের অনুপস্থিতিতে একাকিত্ব এবং হতাশায় ভোগে।

এছাড়া, রেমিট্যান্সের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় প্রবাসী আয় সঠিকভাবে বিনিয়োগ না হওয়ায় এর সম্ভাব্য সুফল পাওয়া যায় না। গ্রামীণ জনগণের অর্থনৈতিক শিক্ষা এবং বিনিয়োগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রভাব আরও বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, প্রবাসী আয়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগের জন্য গ্রামীণ জনগণকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা উচিত। দ্বিতীয়ত, রেমিট্যান্সের মাধ্যমে গ্রামীণ অবকাঠামো এবং সামাজিক সেবাগুলোর উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষা এবং তাদের পরিবারের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

সামগ্রিকভাবে, রেমিট্যান্স গ্রামীণ পরিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এটি গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন, সামাজিক পরিবর্তন, এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়ক হয়েছে। তবে, রেমিট্যান্সের নেতিবাচক প্রভাবগুলো মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি, যাতে এই আয়ের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করে গ্রামীণ উন্নয়নকে আরও গতিশীল করা যায়।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো গার্মেন্টস শিল্প। যদিও মূলত শহরাঞ্চলে গার্মেন্টস শিল্পের অধিকাংশ কারখানা অবস্থিত, তবু এ শিল্প গ্রামীণ সমাজে বিভিন্ন ধরনের প্রভাব ফেলেছে। গ্রামীণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক পরিবর্তনে গার্মেন্টস শিল্পের ভূমিকা বিশ্লেষণ করতে গেলে আমরা দেখতে পাই, এই শিল্প কীভাবে জীবিকা, উন্নয়ন, এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সহায়ক হয়েছে।

প্রথমত, গ্রামীণ অর্থনীতিতে গার্মেন্টস শিল্পের একটি বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে। এই শিল্প গ্রামীণ মানুষদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে কাজ করার জন্য প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, এবং গ্রামীণ এলাকার অনেক নারী ও পুরুষ শহরে এসে এই শিল্পে কর্মসংস্থান পেয়েছে। এদের মধ্যে বিশেষ করে নারীদের জন্য গার্মেন্টস শিল্প একটি বড় ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ এনে দিয়েছে। ফলে, গ্রামীণ মানুষের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তাদের আর্থিক স্থিতিশীলতা এসেছে।

দ্বিতীয়ত, গার্মেন্টস শিল্প নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে নারীরা সাধারণত গৃহস্থালির কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তবে, গার্মেন্টস শিল্পে কাজ করার সুযোগ পেয়ে তারা নিজেদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে পেরেছে। ফলে, নারীরা পরিবারে এবং সমাজে আরও বেশি সম্মান ও মর্যাদা পাচ্ছে। তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারা পরিবারের খরচে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে।

তৃতীয়ত, গার্মেন্টস শিল্পের মাধ্যমে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন ঘটেছে। গার্মেন্টস শিল্পে কাজ করে উপার্জিত অর্থ অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য ব্যয় করতে পারে। ফলে, গ্রামীণ শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নেও গার্মেন্টস শ্রমিকদের আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। গার্মেন্টস শিল্পে কাজ করে উপার্জিত অর্থ দিয়ে পরিবারগুলো উন্নতমানের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারে।

তবে, গার্মেন্টস শিল্পের প্রভাব শুধু ইতিবাচক নয়, এর কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। প্রথমত, গ্রামীণ শ্রমিকরা প্রায়ই শহরে কাজ করতে এসে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়। নিম্নমানের কর্মপরিবেশ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, এবং কম বেতন তাদের জীবনে কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। অনেক সময় তারা শহরের উচ্চ ব্যয়বহুল জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না, ফলে আর্থিক সংকটে পড়ে। দ্বিতীয়ত, পরিবার থেকে দীর্ঘদিন দূরে থাকার কারণে মানসিক চাপ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা দেখা দেয়, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এছাড়া, গ্রামীণ এলাকায় গার্মেন্টস শিল্পের প্রসারের ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত দুর্বলতা একটি বড় সমস্যা। অনেক গ্রামীণ এলাকায় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, পানি, এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব রয়েছে, যা শিল্পের উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করে। এছাড়া, স্থানীয় জনগণের প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতার অভাবও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

গার্মেন্টস শিল্পের ইতিবাচক প্রভাব আরও বাড়ানোর জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রথমত, গ্রামীণ এলাকায় গার্মেন্টস কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা উচিত। দ্বিতীয়ত, শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও বেতন কাঠামো উন্নয়নের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, স্থানীয় জনগণের প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা উচিত। এছাড়া, গ্রামীণ এলাকায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

সামগ্রিকভাবে, গার্মেন্টস শিল্প গ্রামীণ পরিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, এবং সামাজিক পরিবর্তনে সহায়ক হয়েছে। তবে, এই শিল্পের নেতিবাচক দিকগুলো মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি, যাতে গার্মেন্টস শিল্পের সুফল আরও ব্যাপকভাবে গ্রামীণ উন্নয়নে প্রয়োগ করা যায়।

তবে, এই পরিবর্তনগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জও রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, এবং নদীভাঙন কৃষি ও বসতবাড়ির ক্ষতি করে এবং মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে ফেলে। এছাড়া, ভূমির দখল এবং জমির ব্যবহার নিয়ে বিরোধ গ্রামীণ এলাকায় সামাজিক উত্তেজনা বৃদ্ধি করছে।

সামাজিক পরিবর্তনের দিক থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। গ্রামীণ সমাজে নারীর ভূমিকা ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। নারীরা এখন শুধু ঘরের কাজেই সীমাবদ্ধ নয়, তারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে এবং পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। নারীদের স্বনির্ভরতা এবং ক্ষমতায়ন গ্রামীণ সমাজের সামাজিক কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে।

অন্যদিকে, গ্রামীণ এলাকায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমস্যাগুলো এখনও রয়ে গেছে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী এখনও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল স্রোতে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত হতে পারেনি। এই জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষভাবে নীতিমালা ও কর্মসূচি প্রণয়ন জরুরি।

গ্রামীণ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি। কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার হ্রাস এবং জৈব কৃষির প্রসার ঘটেছে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও পদ্ধতির ব্যবহার কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, যা পরিবেশ সংরক্ষণে সহায়ক হচ্ছে।

সামগ্রিকভাবে, গ্রামীণ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলো একটি প্রগতিশীল ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, এবং সামাজিক পরিবর্তনের মাধ্যমে গ্রামীণ জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে। তবে, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলার জন্য যথাযথ নীতিমালা ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এভাবে, গ্রামীণ বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

মো: বজলুর রশিদ: সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা।

মিয়ানমারে ‘অপারেশন ১০২৭’ দ্বিতীয় পর্যায়: সংঘাতে নতুন মাত্রা



ব্রিঃ জেঃ হাসান মোঃ শামসুদ্দীন (অবঃ)
ব্রিঃ জেঃ হাসান মোঃ শামসুদ্দীন (অবঃ)

ব্রিঃ জেঃ হাসান মোঃ শামসুদ্দীন (অবঃ)

  • Font increase
  • Font Decrease

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে ২০২৩ সালের অক্টোবরে থ্রি ব্রাদারহুড এলায়েন্সের অপারেশন ১০২৭ শুরু হওয়ার পর থেকে উভয় পক্ষের মধ্যেকার সংঘর্ষের তীব্রতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই সংঘর্ষের ফলে হতাহতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে এবং মিয়ানমারের পুরো সীমান্ত অঞ্চল জুড়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। মিয়ানমারের সীমান্ত বাণিজ্য রুটগুলো বিভিন্ন সময় হাতবদল হওয়ার কারনে মিয়ানমারের সঙ্গে প্রতিবেশি দেশগুলোর বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী সংঘর্ষের ফলে অনেক জায়গায় পিছু হটলেও তারা বিমান বাহিনী ও ড্রোনের সাহায্যে বিদ্রোহীদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে সাধারণ মানুষের জীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে। অনেকে উদ্বাস্তু হিসেবে পালিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে। ২০২১ সালে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০০০ মানুষ নিহত হয়েছে এবং ৬ মিলিয়ন মানুষ উদ্বাস্তু হিসেবে জীবনযাপন করছে। মিয়ানমারের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে।

‘অপারেশন ১০২৭’ শুরু হওয়ার পর চীনের মধ্যস্থতায় সহিংসতা বন্ধে জানুয়ারিতে শান রাজ্যে ব্রাদারহুড এবং মিয়ানমার সরকারের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর ১০ জানুয়ারি থেকে উত্তর-পূর্ব শান রাজ্যে সাময়িকভাবে সংঘর্ষ বন্ধ থাকে। মিয়ানমার জান্তা এই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে বোমা বর্ষণ করার পর ব্রাদারহুড জোটের সদস্য তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ) ২৫ জুন থেকে পুনরায় অভিযান শুরু করে। যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর প্রতিরোধ বাহিনী বড় শহরগুলো দখল করে নেওয়ায় মিয়ানমারের সামরিক সরকার উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিম উপকূলের অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলো হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। আরকান আর্মি (এ এ) বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী বন্দর ও পর্যটন শহর থান্ডওয়ে দখল অভিযানে প্রায় চার শ’র বেশি জান্তা সেনাকে হত্যা করেছে বলে জানায়। এর পাশাপাশি রাখাইনে এ এ একটি বিমানবন্দর দখল করেছে। চলমান এই সংঘর্ষের পর তারা দখলকৃত সেনাক্যাম্পের অস্ত্র ও গোলাবারুদ হস্তগত করেছে।

৫ জুন টিএনএলএ অভিযান শুরু করার পরে এমএনডিএএ লাশিওর বিরুদ্ধে পুনরায় আক্রমণ শুরু করে। জান্তা তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে বারবার বোমাবর্ষণ করে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করার কারণে তারা এই আক্রমণ শুরু করেছে বলে জানায়। টিএনএলএ এই আক্রমণকে ‘অপারেশন ১০২৭: ফেজ ২’ বলে অভিহিত করেছে এবং বেসামরিক জাতীয় ঐক্য সরকারের পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের (পি ডি এফ) সঙ্গে উত্তরাঞ্চলীয় শান রাজ্যের চারটি টাউনশিপ এবং মান্দালয় অঞ্চলের মোগোক টাউনশিপে জান্তা সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। অপারেশন ১০২৭ এর দ্বিতীয় অংশ চলাকালীন দখল করা প্রথম শহর নওংকিও, শহরটি মান্দালয় অঞ্চলের পাইন ও লুইনের উত্তরের একটি জান্তা গ্যারিসন শহর। টিএনএলএ ও তাদের মিত্ররা উত্তরাঞ্চলীয় শান রাজ্যের তিনটি শহর কিয়াউকমে, মংমিত ও নাওংকিও এবং মান্দালয় অঞ্চলের মোগোকে শহরের বিশাল অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় চলমান সংঘর্ষে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে স্বাভাবিক বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের অর্থনৈতিক ভাগ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ২০২২ সালে থাইল্যান্ড মিয়ানমারে ৪৪০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে এবং মিয়ানমার থাইল্যান্ডে প্রায় ৪৪৩ কোটি ডলারের রফতানি করেছে। ২০২৪ সালে, থাই-মিয়ানমার সীমান্তের মায়াওয়াদি শহরের সংক্ষিপ্ত দখল মায়ে সোট-মায়াওয়াদ্দিতে থাই-মিয়ানমার সীমান্ত বাণিজ্যকে হুমকির মুখে ফেলেছিল। এই এলাকা দিয়ে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য চলে। ২০২৩ সালে থাইল্যান্ড ছিল মিয়ানমারে তৃতীয় বৃহত্তম বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশ। ২০২৪ সালে থাইল্যান্ডের পিটিটি মিয়ানমারের ইয়াদানা প্রাকৃতিক গ্যাস প্রকল্পের বৃহত্তম শেয়ারহোল্ডার হয়ে ওঠে।

মিয়ানমারে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আরও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানের বিষয়ে মিয়ানমারের অর্থ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সহযোগিতা, ভারতের ঋণ ও কারিগরি সহায়তা এবং মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের আরও প্রশিক্ষণ নিয়ে আলোচনা করতে রাষ্ট্রদূত ১৫ জুলাই মিয়ানমারের পরিকল্পনা ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। ডলার সংকট গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারত সীমান্ত বাণিজ্যের জন্য কিয়াত এবং রুপিতে সরাসরি অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা করেছে। ভারতীয় রাষ্ট্রদূত মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে রুপি - কিয়াত সরাসরি অর্থ প্রদান এবং কার্ড ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত অর্থ প্রদানের বিষয়ে আলোচনা করেছে। ভারত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে একটি পরিবহন ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের সঙ্গে অব্যাহত সহযোগিতা পুনর্ব্যক্ত করেছে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর সঙ্গে এএ সংঘর্ষের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে আমদানি-রফতানি বন্ধ হয়ে গেছে। ৪ জুনের পর থেকে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে কোনো পণ্যবোঝাই কার্গো ট্রলার বা জাহাজ আসছে না। ২০২৪ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলাদেশ থেকে কোনো রফতানি পণ্য মিয়ানমারে যাচ্ছে না। এতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা দুশ্চিন্তায় রয়েছে। পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকার দিনে তিন-চার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারাচ্ছে। সীমান্তে চোরাচালান নিরুৎসাহিত করতে ১৯৯৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের টেকনাফ ও মিয়ানমারের মংডুর মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্য চালু করা হয়েছিল।

টিএনএলএ যোদ্ধারা আঞ্চলিক সামরিক কমান্ডের সদর লাশিও শহর ঘিরে ফেলেছে। মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয় থেকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রধান মহাসড়কের পাশে লাশিও’র অবস্থান। মিয়ানমার চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চীনের ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পে মিয়ানমার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। শান রাজ্যটি চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ এখানে পাইপলাইন বসাচ্ছে চীন। সীমান্ত বাণিজ্য গেট বন্ধ করে দিয়ে এবং টিএনএলএ ও এমএনডিএএ'র নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে চীন ব্রাদারহুড জোটকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধ করার জন্য চাপ দিচ্ছে। টিএনএলএ শান রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে ১৪ জুলাই থেকে ১৮ জুলাই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়ে চীনকে সহযোগিতা করেছে। তবে এই চুক্তিতে মান্দালয় অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, সেখানে জোটের সদস্যরা জান্তা সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

সামরিক বাহিনী ও জাতিগত সংখ্যালঘু একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে চলমান সংঘর্ষের মধ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান সোয়ে উইনের নেতৃত্বে ৭ জুলাই একটি প্রতিনিধি দল চীন সফর করে। তারা সীমান্তের স্থিতিশীলতা, মিয়ানমারে চীনা বিনিয়োগের নিরাপত্তা, অনলাইন স্ক্যাম অপারেশন নির্মূল, বাণিজ্য প্রচার এবং প্রস্তাবিত নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করে। জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং আগামী বছর নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং চীন এই প্রক্রিয়ায় সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। মিয়ানমারের সাবেক প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন জুন মাসে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচটি মূলনীতি গ্রহণ উপলক্ষে বেইজিং সফর করে। সে সময় থেইন সেইন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই'র সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন যে, সোয়ে উইন উত্তরাঞ্চলীয় শান রাজ্যে চলমান লড়াই নিয়ে আলোচনা করেছে, যা জান্তার জরুরি অবস্থার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে প্রাধান্য পাবে।

মিয়ানমারের চলমান পরিস্থিতিতে লক্ষণীয় যে বিদ্রোহী গুষ্ঠিগুলো সমন্বিতভাবে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে একজোট হয়ে নিজ নিজ এলাকায় আক্রমণ পরিচালনা করছে। দশকের পর দশক ধরে তারা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত থেকেও এবারের মত অর্জন কখনো পায়নি। এর আগে মিয়ানমার সেনাবাহিনী কিছু কিছু দলের সঙ্গে শান্তি ও সমঝোতা করে বাকীদের ওপর আক্রমত চালাত। এবার তাদের সেই কৌশল ব্যর্থ করে দিয়ে বিদ্রোহী গুষ্ঠিগুলো একতাবদ্ধ হয়ে আক্রমণ পরিচালনা করায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী সব ফ্রন্টে পরাজয়ের সম্মুখীন হচ্ছে।

এবারের সংঘর্ষে লক্ষণীয় যে বিদ্রোহীরা মিয়ানমারে সঙ্গে প্রতিবেশি দেশগুলোর বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং মিয়ানমার সরকারের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ অর্থ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মিয়ানমারের এই সংঘাত বন্ধ করা জরুরি কারণ এর ফলে মিয়ানমারের সাধারন জনগণের পাশাপাশি বাণিজ্য ও অর্থনীতির ওপরও চাপ পড়ছে। এর ফলে সাধারন মানুষের জীবন যাত্রা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বিদ্রোহী ও মিয়ানমার সরকার উভয় পক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে এবং একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে মিয়ানমারে শান্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। জান্তা সরকার নির্বাচনের কথা ভাবছে এবং চীন নির্বাচনে সহায়তা করবে বলে জানিয়েছে যা উৎসাহব্যঞ্জক।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী আপাত দৃষ্টিতে কিছুটা কোণঠাসা হলে ও তাদের সামর্থ্য নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নাই। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অনেক শক্তিধর দেশ তাদের সমর্থন করে। বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন নিয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনী আক্রমনের তীব্রতা বাড়াতে পারে, তবে সে ক্ষেত্রে মিয়ানমারের নিজস্ব অবকাঠামো ধ্বংস হবে ও হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যাবে যা কখনো কাম্য নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিদ্রোহীরা এবং সাধারন মানুষ বুঝতে পেরেছে যে একতাবদ্ধ হলে তারা অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারে ও তাদের অধিকার আদায়ে এগিয়ে যেতে পারে। এর বাস্তবতায় মিয়ানমারে একটা রাজনৈতিক সমাধান জরুরি। মিয়ানমারে শান্তি ফিরে আসলে মিয়ানমারের আপামর জনগণের পাশাপাশি প্রতিবেশি দেশগুলো এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে এবং এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।

ব্রিঃ জেঃ হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এন ডি সি, এ এফ ডব্লিউ সি, পি এস সি, এম ফিল (অবঃ)
মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক

;

কোমলমতিদের পালস বুঝেও এত শক্তি প্রয়োগ কেন!



প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন

ছবি: বার্তা২৪, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন

  • Font increase
  • Font Decrease

৮০-র দশকের শেষের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে আমরা ঘুমাতে পারতাম না। কয়েকদিন পর পর পুলিশি রেইড হতো। ভোররাতে হাজার হাজার পুলিশ, বিডিআর হলপাড়া ঘিরে দম্ভ করে হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা দিতো- নিচে নেমে আসুন! দ্রুত হল ত্যাগ করে চলে যান। ছাত্ররা হৈ চৈ করে ছাদে উঠে সামরিক সরকারের পুলিশের দিকে ঢিল ছুড়তো। নামতে না চাইলে টিয়ার শেল ছুড়ে চারদিক ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করে, গুলি করে আতঙ্ক তৈরি করে একসময় কয়েকজনকে ধরে নিয়ে যেতো।

হল খালি করে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হতো। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিলে তাদের ক্ষমতায় থাকা নিরাপদ হয়ে উঠতো।

শিক্ষার্থীরা সেসময় সামরিক সরকারকে মোটেও পছন্দ করতো না। জনগণ তো আরো পছন্দ করতো না। সেটা সেই সরকার জানতো। কিন্তু জেনেও বার বার হামলে পড়তো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এবং বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে শুরু হওয়া আন্দোলন দিয়েই দ্রুত সামরিক সরকারের পতন হয়েছিল।

চলতি বছরের (২০২৪) ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া যৌক্তিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ১৮ দিন পার হয়ে গেল। এর মধ্যে কতকিছু ঘটে গেল এবং যাচ্ছে সেটা প্রযুক্তির কল্যাণে দেশ-বিদেশের সব সচেতন মানুষ অবগত আছেন।

ক্ষুদ্র একটি আন্দোলন কীভাবে তিলে তিলে ‘তাল’ হয়ে গেল, তা জনগণ অপলক নয়নে দেখছেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কথার মাধ্যমে বীজ থেকে বটগাছে পরিণত করার জন্য দায়ী যিনি বা যারা, তাদের আড়াল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো দায়িত্বশীল একটি দম্ভকারী গ্রুপ।

তারা অবহেলা, অতিকথন, বালখিল্যতা দিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকে ক্ষেপিয়ে তুললো। সেটা বুঝেও না বোঝার ভান করে শিক্ষার্থীসহ দেশের আপামর নিরীহ জনগণকে কেন আরো বেশী ক্ষ্যাপানো হচ্ছে- সেটাও অনেকের কাছে গভীর প্রশ্নের উদ্রেক করছে। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিলে পড়াশোনা, গবেষণা বন্ধ হয়ে যায়। নৈতিক চেতনা ঝিমিয়ে পড়ে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার মগজগুলোকে দমিয়ে রেখে রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা ও দুর্নীতিতে আড়াল করা সহজ হয়। দুর্বলদের পক্ষে হক কথা বলাটা সহ্য করে না স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর দুষ্টু মানুষেরা।

যুগে যুগে বিভিন্ন সমাজে এটাই ঘটে। তাইতো ডিজিটাল সভ্যতার যুগে এসেও ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছাত্র আন্দোলন দমন করা হচ্ছে। কিন্তু সেটা পেরিয়ে আমাদের সবুজ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে। তবে আমাদের ঢেউয়ের আছাড়টা ওদের চেয়ে একটু বেশি হয়ে সুনামি হয়ে গেছে। আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে হঠাৎ করে স্কুল-কলেজ পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে! এটা খুবই মারাত্মক!

একটি দেশের সব শিক্ষাঙ্গন একযোগে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মনে হয়, এই ধরনের সর্বাত্মক ছুটি এটাই প্রথম। কিন্তু কেন এটা করা হলো! ইসরায়েলের মতো কেউ কি এদেশে বোমা ফেলতে চেয়েছিল নাকি কোনো বৈদেশিক শক্তি আক্রমণের ভয় দেখিয়েছে! দেশে কি কোনো সেরকম যুদ্ধ বা অভ্যন্তরীণ অর্ন্তদ্বন্দ্ব লেগেছে! শেষেরটা যদি সত্যি মনে করা হয়, তাহলে কী বা কার কারণে সেটা শুরু হলো, সেটাও দ্রুত খতিয়ে দেখা দরকার।

এটা শুরু হওয়ার ১৮ দিন পর একটি সংহিস আন্দোলনে পৌঁছে গেল কার সুবাদে! সেটা এখন বড় চিন্তার বিষয়!

জনগণের কষ্টের কথা বলে এই আন্দোলনকে ভিন্নদিকে সরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু কষ্ট হলেও জনগণ সেই আনোদলনকে মেনে নিয়ে একাত্মতা প্রকাশ করছেন। জনগণ কিছু লোভীদের কপটতা, উন্নাসিকতা ইত্যাদি ধরে ফেলেছে। ফলে, নিজেদের অনুভূতি ও বিবেক থেকে এটাকে মেনে নিয়েছে। এমনকী কেউ কেউ স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে আন্দোলনে শরিক হয়েছেন।

‘বাংলা ব্লকেড’ এবং তারপর!
তারা ‘বাংলা ব্লকেড’ থেকে ‘কমপ্লিট ব্লকেড’ শুরু করে আর কী কী আন্দোলন করতে থাকবে, তা এই মুহূর্তে বলা মুষ্কিল। কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ব্যবহার করে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করার কথা বার বার বলা হচ্ছে। কিন্তু এই পরিস্থিতিটি কেন এত বড় করার সুযোগ দেওয়া হলো বা এখনো সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তা মোটেই বোধগম্য নয়।
এদিকে, ১৭-১৮ জুলাই বিভিন্ন বাহিনীর মাধ্যমে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর শক্তি প্রদর্শণের মাধ্যমে ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, বেগম রোকেয়াসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই আন্দোলন দমন করার প্রচেষ্টায় যে ক্ষতি হয়েছে, তা মেনে নেওয়া কষ্টকর!

কর্তৃপক্ষের উন্নাসিকতা
কর্তৃপক্ষকে উন্নাসিকতার সুরে বলতে শোনা গেছে- ‘আন্দোলন করে করে ওরা ক্লান্ত হোক, তখন দেখা যাবে।’ এভাবে সরকারের তরফ থেকে অনেকদিন এই আন্দোলনকে গুরুত্ব না দেওয়ায় যে বিভ্রান্তি ও ভুল বোঝাবুঝি, তা পারস্পরিক আলাপ-আলোচনায় না গিয়ে শুধু হম্বিতম্বি ও দৈহিক শক্তি প্রদর্শন করাটা সবার জন্যই চরম ক্ষতিকর। বিভিন্ন অপবাদ শুনে বাচ্চাদের অভিমান, বুকে ‘কষ্টের শিখা’ বেড়ে যাওয়ার আন্দোলনকে যদি কেউ ভিন্ন পন্থায় বা সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে দমন করার চেষ্টা চালাতে থাকে, তাহলে সেটা চরম ভুল হবে।

এই অসম লড়াই দেশের মধ্যে ভেদাভেদ আরো বৃদ্ধি করবে এবং সামাজিক ভাঙনকে গভীর করে তুলবে। তাই, আদালতের দোহাই দিয়ে কালক্ষেপণ করে আলোচনায় বসা যতই প্রলম্বিত হবে ততই দেশের জন্য অমঙ্গল বয়ে আনতে থাকবে এবং দুর্নীতিবাজ, মেগা-জালিয়াত, সুবিধাবাদীরা এর সুযোগ গ্রহণে চেষ্টা করবে। এমনকী পানি বেশি ঘোলা হয়ে গেলে এটা বৈদেশিক আগ্রাসনকে আমন্ত্রণ করতে থাবে।

দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনেক বেশি। বলা হয়, প্রায় ১০-১২ কোটি মানুষ এখন স্মার্ট মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারেন। এটা তাদের আর্থিক উন্নতির সঙ্গে নৈতিক উন্নতি ঘটাতে সহায়তা করছে। তারা মোবাইল ফোনের সুবাদে আত্মসচেতনতাবোধ থেকে নিজে এবং সমষ্টিগত প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্যায়কে অন্যায় বলতে শিখছে। ফলে, শুধু কয়েকটি পোষা টিভি চ্যানেলে বিবৃতি দিয়ে তাদের অবহেলা, বঞ্চনা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা কঠিন। নানা উদাহরণে ‘আরব বসন্ত’-র কথা বলা হয়। কিন্তু কোটা আন্দোলন নিয়ে আমাদের দেশে ‘বাংলা বসন্ত’ সূচিত হচ্ছে, সেটা কি কেউ মাথায় রেখেছেন!

অনেকদিন দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে রাখাটা আমাদের জন্য শাঁখের করাতস্বরূপ। কারণ, এভাবে শিক্ষাসঙ্কোচন করলে আমাদের স্বকীয়তা ও জাতীয় মর্যাদা গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হতেই থাকবে। সুযোগ ও সক্ষমতা আছে বলেই সাধারণ রঙ্গ-ব্যঙ্গ, অভিমান ইত্যাদিকে আমলে না নিয়ে কাউকে শূলে চড়ানোর তৎপরতা খুবই বোকামি।

শিক্ষার্থীদের একটি যৌক্তিক আন্দোলনকে গুরুত্ব না দিয়ে- ‘এটা ফেসবুকের দোষ’ বলে উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করাটাও চরম বোকামি।

সাধারণত, সামরিক সরকারকে জনগণের পালস বুঝতে দেয় না তার আশেপাশের চাটুকাররা। তারা পানি বেশি ঘোলা করে নিজেদের সুবিধা আদায় করতে বেশ তৎপর থাকে। কোনো অঘটন আঁচ করলে বিদেশে পালিয়ে আত্মগোপন করতেও বেশ পটু। কিন্তু একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক সরকারের দাবিদারকে সেই পরিস্থিতিতে পড়তে হবে কেন! জনগণের পালস্ বুঝেও সেটা বুঝেও না বোঝার চেষ্টা করা বা শক্তি দেখানো বিপজ্জনক, সেটা গত কয়েকদিনের ঘটনায় অতি নেতিবাচকভাবে দৃশ্যমান হয়েছে, যা দেশ ও জনগণ উভয়ের জন্যই অকল্যাণকর। সাধারণ মানুষ এই কোটা সংস্কার আন্দোলনের পক্ষে। অনেক মুক্তিযোদ্ধারাও এর পক্ষে! তবুও আলোচনায় এত দেরি কেন!

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন। E-mail: [email protected]

;

যে দাবির কেউ বিরোধী নয়, তবু রক্তপাত



কবির য়াহমদ
যে দাবির কেউ বিরোধী নয়, তবু রক্তপাত

যে দাবির কেউ বিরোধী নয়, তবু রক্তপাত

  • Font increase
  • Font Decrease

২০১৮ সালের ছাত্রআন্দোলনের পর সরকার কোটা ব্যবস্থা বাতিল করেছিল। এটা ফিরে এসেছিল সাময়িক সময়ের জন্যে হাইকোর্টের এক রায়ের প্রেক্ষিতে। পুনর্বার আন্দোলন শুরুর আগে হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেছিল। আপিলের রায়ের আগে দানা বাঁধে আন্দোলন। এরপর আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়ে ছয় বছর আগের কোটা বাতিলে সরকারের পরিপত্র বহাল রাখে। সরকারের মন্ত্রীরা কোটা না রাখার পক্ষে কথা বলেন, নানা মহল থেকে একই কথা বলা হয়। খোদ প্রধান বিচারপতি বলেছেন, কোটা বাতিলের আন্দোলনকারীদের বক্তব্য শুনতে চান তিনি।

উপরের অনুচ্ছেদ বলছে, কোটার বাতিলের বিপক্ষে কেউ নন। ছাত্ররা যে আন্দোলন করছিল, সেখানে ছাত্রলীগের অংশগ্রহণ ছিল না যদিও, তবু তারা আন্দোলনকারীদের শুরুতে বাধা দেয়নি। বরং ছাত্রলীগের সভাপতি একাধিকবার বলেছেন, তারাও এর সমাধান চান। পুলিশসহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী কোন বাহিনীশুরুতে আন্দোলনকারীদের বাধা দেয়নি।

তবু ঘটে গেছে রক্তপাত। গত মঙ্গলবার একদিনেই ঝরেছে অন্তত ৬ প্রাণ, আহত অগণন। এখন মুখোমুখি আন্দোলনকারী ও ছাত্রলীগ। আছে পুলিশসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন বাহিনীর অংশগ্রহণ। আছে পুলিশের গুলিতে শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার খবর। আছে ছাত্রলীগ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যকার মুহুর্মুহু সংঘাতের খবর। পুলিশের অতি-উৎসাহী কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত শক্তি প্রয়োগের খবর। সরকারের একাধিক দায়িত্বশীলের হুঁশিয়ারির বার্তা, এর কিছুটা উসকানির পর্যায়েও। সঙ্গে আছে সরকার বিরোধী নানা মহলের অত্যধিক তৎপরতা, বিবৃতি, উসকানি, মাঠে নামার হুমকি, যা আদতে পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করছে।

কোটা আন্দোলন হঠাৎ করে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার মূলে কী—এনিয়ে আলোচনা জরুরি। বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তৃতায় আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ বলেছেন, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে সে প্রমাণ মেলে না। গত রোববার প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে এত ক্ষোভ কেন’ এমন প্রশ্ন রেখে বলেছিলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতি কোটা পাবে না তাহলে কী রাজাকারের নাতি-পুতিরা কোটা পাবে? সেটা আমার প্রশ্ন। দেশবাসীর কাছে প্রশ্ন।’ প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যে সাম্প্রতিক সময়ের এবং নানা সময়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি নানা মহলের ধারাবাহিক কটূক্তি, অশ্রদ্ধার জবাব হতে পারে। জাতির জনকের কন্যা হিসেবে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার যে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা এবং শ্রদ্ধা প্রকাশের যে ধারা সেটাই তার বক্তব্যে ওঠে এসেছে স্বাভাবিকভাবেই। এটা সরল উক্তি। একাত্তরকে শ্রদ্ধা করলে যে কারো বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অপমানে হৃদয় বিদীর্ণ হবেই।

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার যে বিষয়টি আওয়ামী লীগ সরকার করে যাচ্ছে, তার স্বপক্ষে যুক্তি দিতে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছিলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা খেয়ে না খেয়ে কাদামাটি মাখিয়ে তারা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল বলেই আজ দেশ স্বাধীন। আজ সবাই বড় বড় পদে আসীন। নইলে তো ওই পাকিস্তানিদের বুটের লাথি খেয়ে চলতে হতো।’ ইতিহাসের এই পাঠ পঞ্চাশের বেশি বছর সময়ের পুরনো হলেও এটা অসত্য নয়, এটা হারিয়ে যায় না। তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে যথার্থই প্রশ্ন রেখেছেন। একজন নাগরিক হিসেবে আমরাও মনে করি, রাজাকারদের সন্তানেরা নয়, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানেরাই চাকরি পাওয়ার অগ্রাধিকার রাখে।

এখানে ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ ছিল না, এখানে ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ নাই। কিন্তু তাই হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের একদিকে আন্দোলনকারীরা ভেবেছে এই বুঝি কোটা ফিরে এলো। অন্যদিকে তারা ভেবেছে তাদেরকে বলা হয়েছে ‘রাজাকারের সন্তান ও রাজাকারের নাতিপুতি’। এই ব্যাখ্যায় আছে দেশীয় সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, আছে সরকারের প্রতি কিছুটা হলেও ‘অনাস্থার প্রকাশ’। সরকার যা ইচ্ছা তাই করতে পারে, কাউকে পাত্তা দেয় না—এমন একটা পরিবেশ ও বিশ্বাস আগে থেকেই প্রবল। এছাড়া কোটা আন্দোলনকারীদের নেতৃত্বদানকারী বেশিরভাগ সংগঠকেরই রয়েছে রাজনৈতিক পরিচিতি। তারা পূর্ব-ধারণা এবং সরকারের প্রতি অনাস্থা থেকে এর ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। এরবাইরে ছিল তৃতীয় পক্ষের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা। শেষ পর্যন্ত তারা সফল হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরের রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ‘তুমি কে আমি কে— রাজাকার রাজাকার’ স্লোগান উচ্চারিত হয়। অত্যন্ত ন্যক্কারজনক এই স্লোগান, কারণ এই স্লোগানের মাধ্যমে একাত্তরের ঘৃণিত রাজাকার শব্দকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা হয়েছে। যদিও আন্দোলনকারীদের কয়েকজন পরেরদিন বলেছেন, তারা স্লোগান দিয়েছেন ‘তুমি নও আমি নই— রাজাকার রাজাকার’; আবার সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই দাবি করেছেন অন্য স্লোগানের। তাদের দাবি স্লোগানের পুরোটা ছিল ‘তুমি কে আমি কে— রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে— স্বৈরাচার স্বৈরাচার’। শেষের স্লোগানকে যদি সত্য বলে ধরে নেওয়া হয় তবে বলা যায়, সরকারপ্রধানকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দেওয়া তাদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য নয়, এটা রাজনৈতিক স্লোগান। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের জানাতে এসে সরকারকে রাজনৈতিক ভাষায় স্বৈরাচার আখ্যা এখানে দাবি আদায়ের ভাষা নয়, বরং তা পরিস্থিতি ঘোলাটে করার অপচেষ্টা।

এবার তবে দেখি এই আন্দোলনের নেতৃত্বে কারা? সমন্বয়কদের মধ্য হাসনাত আব্দুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ, নাহিদ ইসলাম, আবদুল হান্নান মাসুদসহ বড় একটা অংশ সরকারবিরোধী ছাত্র সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে আগে থেকেই সম্পৃক্ত। এর মধ্য নাহিদ ইসলাম এবং আসিফ মাহমুদ ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি’ নামে একটি ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ডাকসুর সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন এই সংগঠনটির সভাপতি। সংগঠনে যুক্ত হওয়ার আগে তিনি শিবিরের রাজনীতি করতেন বলে অনেকেই বলে আসছেন। ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি’ নামের সংগঠনটি ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সামনে এক সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। ফলে একটা ন্যায্য দাবির আন্দোলন, এবং এ আন্দোলনে সারাদেশের ছাত্রসমাজের অংশগ্রহণ থাকলেও নেতৃত্বের কারণে যখন সুযোগসন্ধানীর রূপ লাভের যে অভিযোগ এটাকে তাই উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ কমে আসছে।

কোটা বাতিল চায় শিক্ষার্থীরা। দেশের আদালতও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল, সরকারও সহানুভূতিশীল। প্রধানমন্ত্রী বুধবার দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে আদালতের রায়ের জন্যে অপেক্ষা করতে বলেছেন। বলেছেন, আদালত থেকে নিশ্চয় শিক্ষার্থীরা হতাশ হবে না। এমন অবস্থায়ও চলছে আন্দোলন, এবং আন্দোলনকারীদের কর্মসূচি অনুযায়ী বৃহস্পতিবার সারাদেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’। এই শাটডাউন কর্মসূচিতে সমর্থন জানিয়েছে বিএনপি, ১২-দলীয় জোট, গণতন্ত্র মঞ্চসহ সরকারবিরোধী প্রায় সকল রাজনৈতিক দল ও জোট। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে উসকানি। কোনো অবস্থাতেই এখন এই আন্দোলনের শেষ দেখতে চাইছেন না উসকানিদের অনেকেই। কোটা বাতিলের আন্দোলন শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন হলেও এই পথ ধরে অনেকেই সরকার পতনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন, এবং সে পথেই আন্দোলনকে নিয়ে যেতে মরিয়া হয়ে ওঠেছেন।

কোটা বাতিলের আন্দোলনের যে রূপ, সরকারের যে অবস্থান তাতে মনে হচ্ছে দাবি আদায়ের বিষয়টি কেবল সময়ের অপেক্ষা। বিষয়টি বিচারাধীন বলে আদালতকে টপকে এই মুহূর্তে সরকারের ঘোষণা দেওয়ার সুযোগও কম। শেষ পর্যন্ত আদালত হয়তো সরকারকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেবে, সরকারও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে, কিন্তু যখন বিষয়টি বিচারাধীন তখন এই মধ্যবর্তী সময়ে অপেক্ষা করাই হবে যৌক্তিক। এই সময়টুকু নিয়েই এখন যত রাজনীতি, তৃতীয় পক্ষের চেষ্টা ফল নিজেদের পক্ষে নেওয়া। মাঝখানে এখানে কি বলির পাঁঠা হচ্ছে না শিক্ষার্থীদের আবেগ?

কোটা বাতিল হবে—ধারণা করছি এটাই ভবিতব্য। কিন্তু দাবি আদায়ের মাঝে যে বিপুল প্রাণ আর সম্পদের অপচয় এর দায় কাউকে না কাউকে নিতে হবে। সরকারপ্রধান তার ভাষণে বলেছেন, বিচার বিভাগীয় তদন্তের কথা। তদন্ত ব্যবস্থায় এটা সর্বোচ্চ ব্যবস্থা। এই বক্তব্যে অনাস্থা প্রকাশ করে উসকানি দেওয়া হবে অন্যায়। দাবি আদায়ের যে প্রক্রিয়া তন্মধ্যে আস্থাও অন্যতম। শেষ পর্যন্ত কারো না কারো ওপর আপনাকে আস্থা রাখতেই হবে। আর এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যখন প্রধানমন্ত্রী, তখন রাজনৈতিক বিশ্বাসের ক্ষেত্র থেকে তাকে আপনার পছন্দ-অপছন্দ যাই হোক, তার প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস রাখতেই হবে।

;

মৃত্যু মিছিলের ভার: বাংলাদেশের অব্যক্ত বেদনা



আবু মকসুদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এর কিছুরই দরকার ছিল না। ছয়টা লাশের ভার হয়তো বাংলাদেশ বইতে পারবে; আগেও অনেকবার অনেক লাশের ভার বয়েছে। কিন্তু আজকের এই লাশগুলো অত্যন্ত অকারণ। এই ভার বইবার কোনো দরকার ছিল না।

অনেক দিন আগে বদর আলী নামে এক বাসের ড্রাইভার মারা গেল। কিছু দিন পরে মারা গেল মনির নামের এক কিশোর। তখনও এই মৃত্যুগুলো ছিল অকারণ।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মৃত্যু অকারণেই ঘটে। মৃত্যুর যে মিছিল, সেটা আমরা থামাতে পারি না। থামাতে পারি না কথাটা সত্য নয়; আমরা থামাতে চাই না।

গাজায় যেভাবে বিনা পয়সায় মৃত্যু পাওয়া যায়, বাংলাদেশও গাজা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। এখানেও অহরহ পয়সাবিহীন মৃত্যু হচ্ছে।

আজ যে রাস্তার পিচগুলো রক্তাক্ত হলো, কোটা সংস্কার আন্দোলনের কারণে ছয় জন প্রাণবন্ত তরুণের জীবনের প্রদীপ নিভে গেল, এগুলোকে কি শুধুমাত্র নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া যাবে? এগুলো তো আসলে দুর্ঘটনা নয়; এই মৃত্যুগুলো নিষ্ঠুরতার প্রতিচ্ছবি।

এই যে ছয়টি প্রাণ, এরা নিশ্চয়ই কারো সন্তান, কারো পিতা, কারো স্বামী, কারো ভাই। এই মৃত্যুতে কি শুধুমাত্র সন্তান মারা গেল? একজন স্বামী মারা গেল, একজন পিতা মারা গেল, না একজন ভাই মারা গেল?

আসলে মারা গেল সবাই; সন্তানের সাথেই পিতা-মাতা কিংবা উত্তরাধিকারের স্বপ্ন। স্বামীর সাথে স্ত্রী এবং তাদের দাম্পত্য সুখ-দুঃখ। পিতার সাথে পুত্রেরও মৃত্যু হলো। ভাইয়ের সাথে মারা গেল বোন; মারা গেল দুঃসময়ের নির্ভরতা।

একজন পিতা যত দিন বেঁচে থাকবে, তার কি আর বেঁচে থাকা হবে? একজন মায়ের জীবনে কি আর কোনো রং অবশিষ্ট থাকবে? একজন স্ত্রী, স্বামীর ভরসায় যে নতুন জীবন শুরু করেছিল, তার জীবন কি কোনো পার পাবে? বোনের জীবনে কোনদিন উৎসব ফিরে আসবে।

এই তরুণদের চাওয়া ন্যায্য ছিল কিনা, এ নিয়ে আমরা হয়তো তর্ক করতে পারতাম। তাদের উচ্ছ্বাসে যদি কোনো ভুল থেকে থাকে, আমরা দেখিয়ে দিতে পারতাম, সংশোধনের পরামর্শ দিতে পারতাম।

এই বয়সটা একটু আবেগী হবে। তারা হয়তো ভবিষ্যতের চিন্তায় অতিমাত্রায় আবেগী হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এজন্য তাদের হত্যা করতে হবে—এটা যুক্তিবিদ্যার কোনো যুক্তিতে প্রয়োগ করা যাবে এমনটা মনে হয় না।

একটা স্লোগান! এই স্লোগানটা বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাথে হয়তো যায় না। আমাদের চেতনায় যে দেশ, চেতনায় যে যুদ্ধ, সেই যুদ্ধের সাথে হয়তো এই স্লোগানটা যাবে না। এই তরুণদের হয়তো হঠকারিতা ছিল। এই স্লোগানে বিবেচনাবোধের অভাব ছিল।

এই স্লোগানের কারণে তারা সবাই খারিজ হয়ে গেছে; তাদের বাঙালিত্ব মুছে গেছে—এমনটা ভাবনা বাড়াবাড়ি হবে। কখনো কখনো মানুষ খেদ থেকে কিংবা মনকষ্টে নিজেকে পতিতের জায়গায় ভেবে বসে।

আমরা যদি জাজমেন্টাল না হয়ে, অতি ক্রোধী না হয়ে একটু সময় নিয়ে এই তরুণদের বোঝার চেষ্টা করতাম। আমরা যদি জানতে চাইতাম, আসলেই এরা রাজাকার মানসিকতার কি না, তাহলে হয়তো এই অহেতুক প্রাণহরণ এড়াতে পারতাম। কিছু রাজাকার হয়তো ঝাঁকের কই হয়ে মিশে গেছে কিন্তু সবাইকে রাজাকার ভেবে নেওয়া ভাবনার শুদ্ধতাকে প্রমাণিত করে না।

বাংলাদেশে এমন মৃত্যু অস্বাভাবিক নয়। আগেই বলেছি লাশ বইবার অলৌকিক শক্তি বাংলাদেশের আছে। কিছু দিন পরেই এই ছয়টি মৃত্যু আমরা ভুলে যাব। নতুন কোনো আবেদ আলীর আবির্ভাব হবে অথবা আমরা পরীমনির ডিম ফুটাবার প্রক্রিয়ায় নান্দনিকতা কতটুকু এই বিষয়ে ব্যস্ত হয়ে যাব।

এই ছয়টি পরিবার অবশ্য বাকি জীবন আর স্বাভাবিক হবে না। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তারা হয়তো বেঁচে থাকবে, কিন্তু প্রতিটি দিন প্রতিটি মুহূর্ত হিসেব করবে যে তাদের সন্তানের, তাদের স্বামীর, তাদের পিতার মৃত্যুর কারণটা আসলে কি। এই অহেতুক মৃত্যুর গ্লানি সারা জীবন তাদের বয়ে বেড়াতে হবে।

আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সংবেদী মানুষ। তিনি যে শোকের সমুদ্র পাড়ি দিয়েছেন, পৃথিবীর খুব কম মানুষের পক্ষে এমন সমুদ্র সাঁতরানো সম্ভব।

আমরা আশা করেছিলাম আমাদের এই সংবেদী প্রধানমন্ত্রী তার মহৎ হৃদয় নিয়ে কোটা সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট হবেন। যে ছয় জন তরুণ মারা গেছে, তিনি তাদের মাতা হতে পারতেন। এগুলো তারই সন্তান হতে পারতো। তিনি চাইলে এই সন্তানগুলো হয়তো বেঁচে থাকতো।

হয়তো তিনি এখন অশ্রু ফেলছেন। হয়তো এই ছয়টি মৃত্যু তাকে সেই শোক মনে করিয়ে দিচ্ছে যে শোক তিনি মনে প্রাণে ভুলতে চাচ্ছেন।

যেকোনো কারণেই হোক, আমাদের সংবেদী প্রধানমন্ত্রী এই অহেতুক মৃত্যুগুলো রোধ করতে পারলেন না। এজন্য দুঃখবোধ থেকে যাবে।

রাজাকার শব্দটি বাংলা ভাষায় একটি ঘৃণিত শব্দ। এই শব্দটি নিয়ে কেউ খেলতে যাবেন না। কোনোভাবে এই শব্দের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করবেন না।

আমাদের শ্রদ্ধাভাজন একজন স্যার শুধুমাত্র এই শব্দ উচ্চারণের কারণে তার প্রাণপ্রিয় ছাত্রদের মুখ দর্শন করবেন না বলে ওয়াদা করেছেন। অনেক ছাত্র তাদের পিতা-মাতার চেয়ে এই স্যারকে বড় ভাবে। তাদের প্রতিটি স্বপ্ন এই স্যারকে ঘিরে আবর্তিত হয়। ঘৃণিত রাজাকার শব্দের কারণে স্যার তার প্রাণপ্রিয় ছাত্রদের ত্যাগ করেছেন।

রাজাকার শব্দটি অভিশপ্ত। আমি এখনো যেসব প্রাণ, অর্থাৎ এখনো যেসব তরুণ বেঁচে আছে তাদের কাছে করজোড়ে নিবেদন জানাচ্ছি, রাজাকার শব্দ থেকে দূরে থাকো। এই শব্দ প্রাণঘাতী। যতটুকু সম্ভব এই শব্দ থেকে দূরে থাকো। রাজাকার থেকে দূরে থাকো। রাজাকারী চিন্তা-চেতনা থেকে দূরে থাকো।

রক্ত এবং প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া এই দেশ, হে প্রিয় তরুণেরা, দেশকে নিয়ে কোনো রকম ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতে যেও না।

তোমরা যারা বেঁচে আছো, বেঁচে থাকার চেষ্টা করো। কারো কথায় প্রভাবিত হয়ে হঠকারী কিছু করে ফেলো না। রাজাকার সম্প্রদায় তোমাদের বিভ্রান্ত করতে চাইবে, তোমাদের আড়ালে তারা তাদের রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাইবে—তোমরা সতর্ক থেকো।

তোমরা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের চেষ্টা করো। কোনোভাবেই সশস্ত্র হওয়ার চেষ্টা করবে না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই সংবেদী। হয়তো কোনো মন খারাপের কারণে তিনি তোমাদের থেকে দূরে আছেন, কিন্তু বেশিক্ষণ দূরে থাকবেন না। সন্তানের মনে কষ্ট একজন মা-ই বুঝতে পারেন। তিনি একজন সংবেদী মা, খুব তাড়াতাড়ি তিনি তোমাদের পাশে এসে হাজির হবেন।

তোমরা যদি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন পরিচালনা করতে পারো, তাহলে অহেতুক মৃত্যু এড়াতে পারবে। বাংলাদেশকে অহেতুক লাশের ভার বইতে দিও না। তাকেও একটু শান্তিতে থাকতে দাও।

লেখক : যুক্তরাজ্য প্রবসী, লিটলম্যাগ ‌‘শব্দপাঠ’ সম্পাদক

;