লাই পেয়ে মাথায় ওঠা রাঙ্গা বান্দর

প্রভাষ আমিন
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এই কলামে আগের লেখায় গত ১১ নভেম্বর আমি লিখেছিলাম, ‌'আমি বিস্মিত, ব্যথিত, ক্ষুব্ধ, লজ্জিত।' কারণ ১০ নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন, সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অনন্ত অনুপ্রেরণা শহীদ নূর হোসেনকে ‘ইয়াবাখোর’ বললেও তেমন কেউ প্রতিবাদ করেননি। ফেসবুকে আমার মত কিছু বোকা লোক চিৎকার চেঁচামেচি করলেও স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের নেতাদের কেউই মুখ খোলেননি। এমনকি ১১ নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকরা রাঙ্গার বক্তব্যের ব্যাপারে তার প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়ে স্লিপ পাঠায়। কিন্তু রাঙ্গার বক্তব্যের ২৪ ঘণ্টা পরও ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক এ ব্যাপারে ‘স্পিক টি নট’।

সবাই যখন চুপ, তখন রাঙ্গার বিচার চেয়ে রাস্তায় নামতে হয় নূর হোসেনের মা, ভাই, বোন ও পরিবারের সদস্যদের। আর উদ্ধত রাঙ্গা ক্ষমা চাওয়া তো দূরের কথা, সাথে যুক্ত করে, মাদকাসক্ত না হলেও নূর হোসেন মানসিক ভারসাম্যহীন।

কিন্তু আমার সেই ক্ষোভ, লজ্জা কিছুটা হলেও প্রশমিত হয়েছে। আমি আশা করেছিলাম আওয়ামী লীগ, বিএনপি, বামসহ সবাই রাঙ্গার বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানাবে। বিশেষ করে ছাত্রসমাজ ফুঁসে উঠবে বলেই ভেবেছিলাম। কিন্তু তেমন কিছুই ঘটেনি। ছাত্রসমাজের এই নির্বিকারত্ব মাঝে মধ্যে ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। শহীদ নূর হোসেনকে মাদকাসক্ত বলার পরও যদি প্রতিবাদ করতে না পারে, তা হলে আর ছাত্রলীগ বা ছাত্রদল বা ছাত্র ইউনিয়ন থেকে লাভ কী?

আমার ক্ষোভ, লজ্জা কিছুটা প্রশমিত করেছে আওয়ামী লীগই। ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পর মানে ১২ নভেম্বর হঠাৎ সংসদের ভেতরে-বাইরে তোলপাড়। সবাই তুলোধুনো করছেন রাঙ্গাকে। আমি আনন্দে চমকে গেলাম। সবার কণ্ঠে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের উত্তাপ। হঠাৎ করে রাঙ্গার বিপ্লবও শেষ হয়ে যায়। তিনি তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে ক্ষমা চান। আগের দিন সাংবাদিকরা স্লিপ পাঠিয়েও যার মুখ খোলানো যায়নি, সেই ওবায়দুল কাদেরের কণ্ঠ এখন জ্বালাময়ী। তিনি বলে দিয়েছেন, ক্ষমা চাইলেও জনগণ তাকে ক্ষমা করবে না। এছাড়া সচিবালয়ে তথ্যমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রীও রাঙ্গার বিরুদ্ধে সোচ্চার।

সন্ধ্যায় সংসদে সর্বদলীয় তোপের মুখে পড়েন রাঙ্গা। আওয়ামী লীগ তো বটেই, এমনকি তাদের চির প্রতিদ্বন্দ্বী ঐক্যফ্রন্টের নেতারাও রাঙ্গার ওপর চড়াও হন। রাঙ্গা রক্ষা পাননি নিজের দলের নেতাদের হুল থেকেও। বরং সবচেয়ে বেশি বিষ ছিল জাতীয় পার্টির নেতাদের বক্তব্যে।

দিনভর রাঙ্গার বিরুদ্ধে এই সোচ্চার প্রতিবাদে আমাকে দারুণ স্বস্তি দিয়েছে, যাক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের চেতনাটা এখনও হারিয়ে যায়নি। তবে প্রতিক্রিয়া জানাতে আওয়ামী লীগ নেতারা ৪৮ ঘণ্টা সময় নিলেন কেন, এটা একটু কৌতূহলের বটে।

আওয়ামী লীগের বাঘা বাঘা নেতারা আসলে নিজেরা প্রতিবাদ করার সক্ষমতাও হারিয়েছেন। সবাই তাকিয়ে থাকেন শেখ হাসিনার দিকে। কোনো ইস্যুতে শেখ হাসিনা কী মনোভাব পোষণ করেন, সেটা জানার পরই তারা প্রতিক্রিয়ার মাত্রা ঠিক করেন। নইলে যে ওবায়দুল কাদের ১১ নভেম্বর সাংবাদিকদের লিখিত অনুরোধেও রাঙ্গা ইস্যুতে মুখ খোলেননি, সেই তিনি পরদিন এমন বিপ্লবী হয়ে যাবেন কেন। আমার ধারণা, ১১ নভেম্বর শেখ হাসিনা এই ব্যাপারে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি বা নেতারা জানতে পারেননি। হতে পারে, শেখ হাসিনা ১২ নভেম্বরেই তার বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। এরপর দ্রুতই রাঙ্গা নিজেই ক্ষমা চেয়ে বক্তব্য প্রত্যাহার করেন। তারপরই আওয়ামী লীগের নেতারা রাঙ্গাকে তুলোধুনো করেছেন। আওয়ামী লীগ নেতাদের এই বিলম্বিত প্রতিক্রিয়ার আরেকটি কারণ থাকতে পারে। আমার ধারণা, আওয়ামী লীগ নেতারা প্রথমে রাঙ্গার বক্তব্যটা ভালো করে শোনেননি, ভেবেছেন, নূর হোসেনকে ইয়াবাখোর বলেছে তো কী হয়েছে। কিন্তু যখন জানা গেল, রাঙ্গা একই অনুষ্ঠানে এরশাদকে গণতন্ত্রের ধারক-বাহক বলেছেন, বঙ্গবন্ধুকে গণতন্ত্রের হত্যাকারী বলেছেন, শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচার বলেছেন; তখনই সবার হুশ হয় এবং ঝাঁপিয়ে পড়েন।

তবে আমার সবচেয়ে মজা লেগেছে, জাতীয় পার্টির সাংসদদের বক্তব্য। মসিউর রহমান রাঙ্গা জাতীয় পার্টির মহাসচিব, জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ, সাবেক স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী। কিন্তু দলের সমর্থনও পাননি তিনি। দলের দুই সাংসদ মজিবুর রহমান চুন্নু এবং কাজী ফিরোজ রশীদ সংসদে বলেছেন, রাঙ্গার বক্তব্যের দায় দল নেবে না। রাঙ্গার বক্তব্যের জন্য তারা লজ্জিত বলেও জানান তারা। জাতীয় পার্টিকে যে আমি মাঝে মাঝে যাত্রা পার্টি বলি, এটাই প্রমাণিত হলো আরেকবার। মহাসচিব এবং চিফ হুইপের বক্তব্যকে দুই সাংসদ অস্বীকার করেন কীভাবে? কার বক্তব্য ঠিক রাঙ্গা নাকি চুন্নু এবং ফিরোজ।

দলীয় অবস্থান ধরলে তো মহাসচিবের বক্তব্যই প্রাধান্য পাওয়ার কথা। জাতীয় পার্টির সাংসদ কাজী ফিরোজ রশীদ রাঙ্গাকে যা বলেছেন, তারপর আর কারো কিছু না বললেও চলবে। দলের মহাসচিব ও বিরোধী দলের চিফ হুইপ সম্পর্কে কাজী ফিরোজ রশিদ বলেছেন, 'আমি যতদিন ধরে রাজনীতি করি, তার বয়সও ততদিন হবে না। তিনি কোথায় আন্দোলন করেছেন? কোথায় সংগ্রাম করেছেন? তিনি যুব দলের নেতা ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কথা বলার ধৃষ্টতা তিনি কোথায় পেলেন? প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে কথা বলেছেন। গণতন্ত্রের ছবক দেন। লেখাপড়া জানেন না, আবার কাগজের মালা গলায় দিয়ে পরিবহন শ্রমিক হয়ে হঠাৎ বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়ে গেছেন। ধৃষ্টতা দেখান তিনি। আর তার জবাব দিতে হয় আমাদের।'

বক্তৃতার স্রোতের তোড়ে কাজী ফিরোজ রশিদ অনেকগুলো সত্যি কথাও বলে দিয়েছেন। জাতীয় পার্টি হলো চাঁদের মত। নিজেদের শক্তি নেই। আওয়ামী লীগের শক্তিতে চলে, এটা তিনি পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন, 'লজ্জা করে না এসব কথা বলতে?' আমরা তো আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে নির্বাচন করেছি। আজকের প্রধানমন্ত্রী সেদিন যদি আমার পরিচয় করিয়ে না দিতেন, আমাকে যদি ভোট না দিতেন, নির্বাচিত হয়ে এই সংসদে আসতে পারতাম না। রাঙ্গা সাহেব! মানুষ এত অকৃতজ্ঞ হয় কীভাবে? পেছনে যদি আওয়ামী লীগ না থাকতো, ওই রংপুর নামতেও পারতেন না। কার কয়টা ভোট আছে তা আমাদের জানা আছে।'

তবে রাঙ্গার এই ঔদ্ধত্যের জন্য তিনি সরকারি দলকেই দায়ী করেছেন, 'একটা কথা আছে, বান্দরকে লাই দিলে গাছের মাথায় ওঠে। এই লাই আমরা দেইনি। এই সংসদ তাকে লাই দিয়েছে। কী ধরনের ব্যক্তিত্ব; যার অতীত নেই-বর্তমান নেই। কিছুই ছিল না। হঠাৎ তাকে মন্ত্রী বানানো হলো। আমরা তো তাজ্জব হয়ে গেলাম।'

এক রাঙ্গা ইস্যুতে জাতীয় পার্টির অন্তর্দ্বন্দ্ব সামনে চলে এলো। আমার ধারণা শিগগিরই তিনি দলের পদ হারাবেন। তার বক্তব্য ক্ষমার অযোগ্য, তাই নিছক ক্ষমা চেয়ে এখন আর পার পাবেন না। তার অপরাধ শাস্তিযোগ্য। শাস্তি চাই আমরা। চাই রাজনীতি যেন এইসব দুর্বৃত্তমুক্ত থাকে।


প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

আপনার মতামত লিখুন :