লবণ নয়, আয়োডিন ঘাটতি!

তুষার আবদুল্লাহ
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পেঁয়াজের দাম কমতে শুরু করেছে। এতোদিন পেঁয়াজ ছাড়া সালাদ যুৎসই হচ্ছিল না। যখন দুপুরের খাবারের সঙ্গে সালাদ নেয়ার কথা ভাবলাম, টমেটো, গাজর, শসা কাটা শেষ, লবণ ছিটিয়ে দেবার পালা এলো যখন, তখনই খবর ছড়াতে শুরু করল-বাজারে লবণের দাম বাড়ন্ত। হেমন্তকালে লবণ জল হবার কারণ নেই। কোরবানির পশুর চামড়া রক্ষা করতে লবণের গুণগান গাওয়ার সময়ও ফুরিয়েছে সেই কবে। এখন তবে লবণে টান পড়বে কেন?

পেঁয়াজের দাম চড়া থাকায় লোকের হেঁসেলে কি আগুন জ্বলেনি? আমি যেমন সালাদ পাতে নেবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম তেমনি বাড়িতে বাড়িতে উনুন জ্বলতে শুরু হয়েছে হয়তো। তাই বাজারে পেঁয়াজের পাশাপাশি লবণের ক্রেতা বেড়ে গেছে। ক্রেতার লম্বা লাইন দেখে দোকানিদের ঈদ লেগে গেল। সুযোগ মতো লবণের বাজারকেও বানিয়ে ফেলল ফাটকা বাজার।

‘ভাইরাল’ সমাজের নাগরিকেরা তো সুযোগ সন্ধানী স্ট্রাইকারের ভূমিকায় সর্বক্ষণ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লবণ ‘দুর্ভিক্ষ’ লেগে গেল। মোবাইল ফোন কোম্পানির আয় বাড়তে শুরু করল-আপনার পাশের দোকানে লবণ কতো? বাজারে লবণ নাই। চার-পাঁচ প্যাকেট কিনে রাখো।

মঙ্গলবার (১৯ নভেম্বর) সকাল থেকে নুন নিয়ে হা পিত্যেস শুরু হয়। ভাবা হচ্ছিল, পেঁয়াজের মতোই লবণ পারফরমেন্স দেখাবে। দ্বিশতক না হোক এক শতক তো মামুলি বিষয়। কারণ দুপুরের মধ্যেই তার হাফ সেঞ্চুরি করা সারা। তবে যুৎ করতে দেয়া হয়নি লবণ বেপারিদের। তারা ভেবেছিলেন, লবণের বস্তায় উপচে পড়বে টাকা। কিন্তু তার আগেই সরকার পেঁয়াজ থেকে শিক্ষা নিয়ে লবণ ‘জমাট’ বাঁধতে দেয়নি। মাঠে নেমে পড়ে সরকারের বিভিন্ন তদারকি প্রতিষ্ঠান। লবণের বাড়তি দাম হাঁকা ও অতিরিক্ত লবণ কেনা মাত্র আটক অভিযানে, লবণ গুজব পাখা মেলতে পারেনি। অবশ্য সঙ্গে ছিল ক্রেতাদের সচেতনতামূলক প্রতিবাদ। সরকারের পক্ষ থেকেও তড়িৎ জানান হয়– যে পরিমাণ লবণ মজুদ আছে, তা দিয়ে আরো ১৮ মাস চলবে। ততোদিনে তো লবণের নতুন মওসুম এসেই যাবে। সুতরাং লবণ বেচে টাকায় উড়োজাহাজ ভরার স্বপ্ন ভূপাতিত হলো।

কিন্তু লবণ সামাল দেয়া গেলেও, চালের বাজার কিন্তু এখনো কিছুটা অস্বস্তিকর। দাম বাড়ছে। খাদ্যমন্ত্রী সতর্ক করলেও চালের দামে ভাটা লাগেনি। চালের বাজার চড়া হওয়ায় ধানের দাম বাড়ছে। তবে এতে কৃষক লাভবান হবে, এ খুশিতে বাড়তি দামে কেনা চাল ফুটিয়ে মুখে লোকমা তোলা বৃথা। কারণ মজুদদার ও চালকল মালিকরা মূল কৃষকের কাছ থেকে আগেই সস্তায় ধান কিনে নিয়ে গেছে। কৃষকের গোলা এখন খালি। অগ্রাহয়ণে যে ধান উঠবে, সে ধানেরও একটা বড় অংশ মাঠ থেকেই চাতাল বা কল মালিকদের কেনা শেষ। কৃষকদের হয়তো চাষের খরচই উঠে আসবে না। বা আয়-ব্যয় হবে সমান সমান। অবশ্য ধান ওঠা শুরু হলেই আমরা দেখতে পাব, বাজার পড়তির দিকে। ছোট ছোট কৃষকরা ঋণের কিস্তি ও পরিবারের চাহিদার কথা ভেবে গোলা খালি করবেন। সেই সুযোগ নিতেই ফড়িয়া ও চাতাল মালিকরা ওঁৎ পেতে আছে।

পেঁয়াজ-লবণ-চাল নিয়ে যখন দেশময় হৈ হৈ রৈ রৈ কাণ্ড। হৈ হুল্লোরের মধ্যে ওষুধের দাম উড়োজাহাজ ডিঙিয়ে সাত আসমানমুখী! এদিকে আমাদের নজর পড়েনি। লবণ, পেঁয়াজ, চাল না খেয়েও মানুষ বেঁচে থাকবে। কিন্তু যারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত, মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন, তাদের কি ওষুধ না হলে চলবে? এমন বাস্তবতার মুখোমুখি তো কয়েক কোটি মানুষ।

ওষুধের দাম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিরব। এ নিয়ে কোনো ভাইরাল নেই। গণমাধ্যমও বেখেয়াল। সরকারও হয়তো এজন্য চাপবোধ করছে না। সয়ে যাচ্ছে। এ আচরণদেখে মনে হয়, দেশে লবণের ঘাটতি নেই সত্য। কিন্তু সেই লবণে হয়তো আয়োডিন মিশ্রণে ঘাপলা আছে। যদি পরিমাণ মতো আয়োডিন থাকত, তাহলে হুজুগে পেঁয়াজের দাম বাড়ত না। লবণ নেই নেই বলে বাজারে কারবালা ঘটিয়ে দিত না। ওষুধের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ার পরেও মুখে সেলাই নিয়ে বসে থাকত না বুদ্ধিমান নাগরিকেরা। আপাতত নাগরিকদের আয়োডিন ঘাটতি নিয়ে চিন্তায় আছি।

তুষার আবদুল্লাহ: বার্তা প্রধান, সময় টেলিভিশন

আপনার মতামত লিখুন :

এ সম্পর্কিত আরও খবর