এ কেমন বন বিভাগ, কাঠ চেনে গাছ চেনে না!

নাহিদ হাসান
নাহিদ হাসান, ছবি: বার্তা২৪.কম

নাহিদ হাসান, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ক্ষুধার্ত নয়নে খোলা জায়গা, এক টুকরো বাঁশঝাড়, এক চিলতে ধান ক্ষেত, আঁকাবাঁকা নদী, কোথাও পাখির ডাক-মধুর স্বপ্নময় হয়ে ওঠে। ঢাকার একটি কলেজে চাকরিরত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাইয়ুম ভাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমরা তিনজন। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ডিপো ইনচার্জ আবু সাঈদ, গণকমিটির জামিউল ইসলাম ও আমি।

ব্রহ্মপুত্রের ভরা রূপ সারা বছরের। তবুও শ্রাবণে সে কূলহারা। বিরাট বিস্তৃতিতে সাগর বলে ভ্রম হয়। বিশাল ঢেউগুলো যখন কিনারে আছড়ায় যেন সমুদ্দুর। দরকার কেবল স্বপ্ন বোনার অবকাশ। সেখানে আশ্বিনে তা ভাঙাপাড় আর কাঁশবনময়।

সকালের সূর্যের নরম রোদ মেখে যাত্রা শুরু হল। খেয়া নৌকা ইঞ্জিন হাঁকল রৌমারীর উদ্দেশে। জেলেরা মাছ ধরছেন, নানান রঙের পাখির উড়াউড়ি। লোকাল ট্রেনের মত নৌকার যাত্রীরাও ডেইলি প্যাসেঞ্জার। আমরা চারজনই কেবল মুক্তির পথিক।

ওপাড়ে রৌমারী। মিশর যেমন গোটাটাই জাদুঘর, মুক্তাঞ্চল রৌমারীও তাই। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এখানে জীবন্ত হয়ে আছে। সেই পুকুর, সেই হাট, সেই সিজি জামান হাই স্কুল। শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের চাঁদমারির দেয়ালকে পেছনে রেখে বিশাল একটি শহিদ মিনার দাঁড়িয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন মুক্তাঞ্চল রৌমারীর ভিডিও যারা দেখেছেন, রৌমারীতে প্রবেশ মাত্রই শরীরে এক শিহরণ খেলে যাবে। এই রৌমারীর পূর্ব প্রান্ত ধরে ভারত সীমান্ত। সীমান্তের ওপাড়েই হিমালয় পর্বত শ্রেণির পূর্ব-দক্ষিণ শাখা। এখান থেকেই নেমে এসেছে জিঞ্জিরামসহ কয়েকটি নদী। এই সীমান্তে গিয়ে যখন ঘন মেঘের মত উঁচু সবুজ পাহাড়ে গিয়ে চোখ আটকে যাবে, ঠিক তখনই মনে হবে -দেশটাকে ভাগ করেছে কারা!

নদী সাগরে মেলে। আর পাহাড়ের দিকে উজানযাত্রা করে নদীর সন্তানেরা। পূর্ববাংলার কৃষকরাও একদিন উজানযাত্রায় আসামে চলে গেছে। পার্বত্য ঝর্ণার কুলুকুলু ধ্বনি, বন-ঝোপের ছায়া আর জ্যোতির্লোকের গ্রহতারা দেখে কিংবা জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রূপে ভাসতে ভাসতে কত তরুণ পাহাড়ের পত্রপল্লবের মর্মরধ্বনি শুনতে কামরূপ-কামাক্ষার দিকে গেছে, তার সুর ছড়িয়ে আছে ভাওয়াইয়ার পরতে পরতে।

১১-১২ কি:মি: ছড়ানো ব্রহ্মপুত্র অতিক্রম করে নামলাম ফলুয়ার চরে। শরতের আকাশ আলোময়। দুপাশে বাদাম ক্ষেত বিদ্যুৎ চালিত ভ্যানে পাশে রেখে এগিয়ে চলছি আনন্দযাত্রায়। চলার পথে সোনাভরি, জিঞ্জিরামসহ ২/১ টি নদী অতিক্রম করলাম। সকল নদীর অশ্রু অবশেষে ব্রহ্মপুত্রে মেশে -এই কয়টি নদীও ব্রহ্মপুত্রে মিশেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের চাঁদমারিও এইরকম একটি নদীর ঘাটেই ছিল বছর ১৫-২০ আগে। এখান থেকে ১০০ গজ সামনে উপজেলা পরিষদ ও হাসপাতালের গেটে রাজীবপুর-গজনী যাওয়ার টেম্পো।

সোজা দক্ষিণে চললাম। চলার পথে বাম পাশে ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকল পাহাড়ের সারি। আর সেতুর তলা দিয়ে চলে যাওয়া পাহাড়ি নদী। কর্নেল তাহেরের বীরত্বের স্মৃতিধন্য কামালপুরে এসে টেম্পো বিদায় নিল। আহারপর্ব সাড়া হল। আড়চোখে কর্নেল তাহেরকে খোঁজার চেষ্টা করলাম। কোন পথ দিয়ে তার সহযোদ্ধারা পাকিস্তানী আর্মিকে আক্রমণ করেছেন মনে মনে বুঝবার চেষ্টা করলাম। চললাম গজনীর দিকে। যেই পাহাড়ি দোগড়া নদী পার হয়ে পাহাড়ি এলাকায় ঢুকলাম, দুপুরেই যেন সন্ধ্যা ঘিরে ধরল। আমরাও হঠাৎ চিৎকার দিয়ে উঠলাম উত্তেজনায়। কত ধরনের লতা বাঁশ ও গাছপালার সর্বাঙ্গ বেয়ে একেবারে মগডালে উঠে গেছে। সাদা সাদা ফুলে লতিয়ে পড়েছে পাহাড়ের লাল গায়ে। গাছপালা, পুষ্পলতা, দীর্ঘ পর্বতমালা ও ছড়া-সব মিলে মনোরম দৃশ্যপট। সবাই হঠাৎ করে গেয়ে উঠলাম -আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি।

বিকেল বেলাতেই পাহাড়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। নেড়া পাহাড় আর একাশিয়ার বাগান দেখে ক্ষুব্ধ মন কিছুক্ষণ পরে শাল বৃক্ষ দেখে শান্ত হল। অটো কিছুক্ষণ পরে গজনী উপত্যকায় নামিয়ে দিল। এখানে কিছুটা রোদ তখনও আছে। স্থানীয় লোকজন পরামর্শ দিলেন দ্রুত ফেরার। নইলে পরে গাড়ি পাবো না। আমরা রেস্ট হাউজে থেকে রাতের বনানী উপভোগ করতে চাইলাম। রৌমারীর সদ্য বিদায়ী ইউএনও দীপঙ্কর রায়কে ব্যবস্থা করার জন্য ফোন দিলাম। তিনিও শেষে ব্যর্থ হলেন। পাশের বাড়ির গারো পরিবারটির কাছে আতিথ্য প্রার্থনা করলাম। তারা প্রশাসনের নিষেধ জানালেন। নালিতাবাড়ি ইউএনওও জানালেন উপজেলা ডাকবাংলোতে স্থানাভাব। অগত্যা শেরপুর চললাম।

শহরটি পূজায় সেজেছে। শহরটিকে বুঝতে খাবারের দোকানগুলোতে ঢুঁ মারলাম। বুঝলাম এই শহরের মানুষজন সচ্ছল। কিন্তু বইয়ের দোকানগুলো দেখে বুঝলাম, গোটা দেশের মত তথৈবচ। সকালবেলা অতিথি সাইয়ুম ভাই ময়মনসিংহের পথে বিদায় নিলেন। আমরা গজনীর পথে। এবার গজনীকে নতুনভাবে চোখে পড়ল। মনে হল এ এক নতুন দেশ। চারিদিকে উঁচু-নিচু, কঠিন-ভাঙা, ছোট-বড় শালগাছে পরিপূর্ণ। সমতলে যেমন গাছে গাছে গলাগলিভাব, এখানে উল্টা। প্রত্যেকটি গাছ স্বতন্ত্র ও স্বাধীনভাবে বুকটান করে দাঁড়ানো।

পথের মধ্যে ৩টি শিশুসহ আমুস মারাকের সাথে পরিচয়। ডাকাতির মিথ্যা মামলায় কয়েকবার কুড়িগ্রাম কোর্টে হাজিরা দিয়েছেন। তিনি জানালেন, আগে প্রচুর হরিণ ছিল। বহেরা, হরিতকী, আমলকি, তেঁতুল, বট, ডুমুর, মহুয়াসহ নানান জাতের গাছ ছিল। হরিণ তো টক পাতা খায়। একাশিয়া গাছের পাতা এরা খায় না। এমনকি চিতাবাঘ, হাতি, বন্য শুকর, শেয়াল, সজারু, বানর, অজগর, কাঠবেড়ালীসহ কত জাতের পশু ছিল। এখনও মাঝে মাঝে হাতির পাল নেমে আসে ওপার থেকে। (তাঁদের আচিক ভাষায়, গ্রীমসিসি বুরুং মানে গভীর বন থেকে এসে ক্ষেত নষ্ট করে।) পাহাড়ে খাবার থাকলে কি ক্ষেত নষ্ট করত? আচ্ছা, এ কেমন বনবিভাগ, যা কাঠ চেনে গাছ চেনে না।

বুঝলাম ইনি সত্যই মান্দি। মান্দি মানে মানুষ। খাদংআনি মান্দিরাং মানে আশাভরা মানুষের দল। এখনও বনকে মাটির মা মনে করে। সেই উজাড় হয়ে যাচ্ছে। তারা কি জানে, ব্রিটিশের বই আইন দিয়ে চলছে স্বাধীন বাংলাদেশ। এদের সাথে বিদায় নিয়ে গজনীর টাওয়ারে উঠলাম। পাহাড় আর পাহাড়। পাহাড় থেকে বন নেমে এসেছে। যেন সবুজের স্রোত। একটা অবিচ্ছিন্ন সবুজের প্রবাহের মত উচ্ছ্বসিত প্রাচুর্যের উল্লাসে নৃত্যরতা সাগরের ঢেউ। এই আনন্দ চিহ্নটুকু মোবাইলে রাখবার জন্য যেন দেখা মিলল তিন কিশোরের। তিন গারো পুত্রের। সক্রেটিস, কণ্ঠ আর কুঞ্জ। এরা ক্যাথলিক-প্রটেস্ট্যান্টে বিভক্ত। ওরা ওয়ানগালা জানে না, বড়দিন জানে। শুধু জানে দাদা ঠাকুর-পরদাদাঠাকুরদের ধর্মের নাম সাংসারেক। ওরা ওদের নামও হারিয়েছে। আমরাও যেমন হারিয়েছি রাজবংশী বাহে পরিচয়। ওরা গভীর জঙ্গলের দিকে কোচদের পাড়া দেখিয়ে দিল।

নেমে এলাম। নিচু উপত্যকার ধানি জমির দিকে ২টি পাহাড়ি ছড়ার সঙ্গমে এক বাঙালি মুরুব্বির সঙ্গে দেখা। পিঠে তার খড়ির বোঝা। তিনি ওদিকে যেতে বারণ করলেন। ডাকাতের ভয় আছে। কয়দিন পরপর ডাকাতি হয়। আমার মত পঙ্গু মানুষকে নিয়ে সহযাত্রী দুইজন সাহসী হলেন না। ফিরলাম গজনীর পাশের বাজারে। একটি ঝুপড়ি দোকান। দোকান চালাচ্ছেন গারো তরুণী, চা সরবরাহ করছেন যুবক স্বামী। তরুণীটি বিএ পাশ করেছেন এ বছর।

কয়েকজন বাঙালি-গারো মিলে অলস ভঙ্গিতে তাস খেলছেন। চা পানের ছলে খাতির জমালাম। কথা তুললাম। কেন তারা আতিথ্য করেন না। তারা প্রশাসনের নিষেধের কথা জানান। কেন, জানতে চাইলে উলফাদের কথা আসে। উলফাদের কথা জানতে চাইলে বলেন, তারা এখানে থাকতে মানুষের উপকার করেছেন। অভাবের দিনে পাশে দাঁড়াতেন। চাল-ডাল-অর্থ সাহায্য করতেন। তাদের ব্যবহার খুব ভাল ছিল। তাদের ব্যাপারে প্রশাসনের কড়া নজরদারী চলছে। তাই বাইরের লোক রাখা নিষেধ। আর ডাকাতিও সব বাইরের লোকেরাই করে।

পাহাড়ি ছড়াগুলোর লাল পানির ধারা তো অবিশ্বাসেরই রক্ত। পার্বত্য চট্টগ্রামেও একই ঘটনা দেখেছি। তাই এই বনচ্ছায়ে শুয়ে উপত্যকার সৌন্দর্য আর নিবিড় শান্তি অনুভব করার সুযোগ নেই। বিপুল ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে নিজেকে বিন্দুর মত আবিষ্কার করার বিস্ময় অর্জন হল না।


নাহিদ হাসান: রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সভাপতি।

আপনার মতামত লিখুন :