আমার চোখে কি ধুলো পড়েছে?

তুষার আবদুল্লাহ
তুষার আবদুল্লাহ, ছবি: বার্তা২৪.কম

তুষার আবদুল্লাহ, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ছোট বেলা থেকে এই বেলায় আসতে গিয়ে পরিচিত অনেক কিছুই অপরিচিত ঠেকছে। যাকে যেমন দেখে আসছি, সে তেমন নেই। অতীত ভুলে যাওয়া মানুষ দেখে অবাক হই। দু:খবোধ হয়। মানুষের সমষ্টিতে তৈরি হয় দল বা সংগঠন। সেই সংগঠনের নিজস্ব একটা চরিত্র থাকে। ঐ চরিত্র দেখে সমমনা মানুষেরা গিয়ে সেখানে ভিড় করে। এই ভিড় যে শুধু প্রাপ্তিযোগের ভিড় তা নয়। মানুষ তার চিন্তার আশ্রয়ও খোঁজে। স্বপ্নের সহযাত্রী চায়। বিশেষ করে রাজনৈতিক সংগঠনকে ঘিরে মানুষের এই স্বপ্ন ও চিন্তা আবর্তিত থাকে। মানুষ মাত্রেরই রাজনৈতিক দর্শন আছে। দর্শন আছে বলেই যে তাকে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নাম লেখাতে হবে এমন নয়। স্লোগান ধরতে হবে কোনো নেতার নামে সেই বাধ্য বাধকতাও নেই। পৃথিবী, দেশ, সমাজ যেমন চলছে তিনি নিজেও কি সেভাবেই দেখতে চান, দেখছেন সবকিছু? মানুষ এমনভাবেই নিজের চিন্তাকে মিলিয়ে নিতে চায়। যখন মেলে না, তখন এমন কোনো সমবেত গোষ্ঠী, সংগঠনের খোঁজ করে, যাদের ভেতরকার তাড়না একই। বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগে রূপ নেওয়া সংগঠনের মাঝে জনমানুষ সেই তাড়নাই বোধ হয় দেখেছিল। তাই নৌকার মাঝি, জেলে, কৃষক, মজুর থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সেনা শাসকদের হাতে তৈরি দলের সঙ্গে বুর্জুয়া শ্রেণি থেকে আসা মানুষেরা যোগ দেয়। আওয়ামী লীগ থেকে তৈরি বুর্জুয়ারাও ঐ দল গুলোতে সরে পড়ে। তার মানে এই নয় যে আওয়ামী লীগে বুর্জুয়াদের প্রতিনিধিত্ব ছিলো না। ছিলতো বটেই। তবে সেখানে কৃষক শ্রমিকের চাওয়া পাওয়া উচ্চারিত হতো এবং সংগঠনটির পরিচ্ছদ ছিল সেই শ্রেণিরই।

স্বাধীনতা পূর্বকালতো দেখা হয়নি। বাংলাদেশের প্রারম্ভকালও স্মৃতিতে নেই। আছে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং নব্বই পরবর্তী সময়। সেই দিনগুলোতে কিশোরের চোখে, সাংবাদিকের চোখে দেখেছি আওয়ামী লীগের ডাকা কর্মসূচিতে রাজপথে কারা ছিল মিছিলে সর্বাগ্রে। হরতালের পিকেটিং-এ কারা নিজেদের বুক পেতে দিয়েছে। পুলিশ, বিডিআরের কাঁদানে গ্যাস, গুলি উপেক্ষা করে হরতাল-কারফিউর দুপুর-রাতে কারা ছিল দুর্বার। শুধু রাজধানী নয়, প্রত্যন্ত গ্রামেও কৃষক –শ্রমিক শ্রেণিই ছিল আওয়ামী লীগের মাঠের শক্তি। যাকে বুর্জুয়া ‘এনজিও’ থেকে ধার করে আমরা বলছি তৃণমূল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই দেখতে শুরু করি কী করে, সংগঠনের পোশাকি বদল ঘটতে থাকে। ধীরে ধীরে কৃষক, শ্রমিকেরা দূরে সরতে থাকে। সামনের সারির দখল নিতে থাকে উঁচু তলার মানুষ। শ্রমিক, কৃষকের মালিকেরা। অন্যান্য দলের ‘মধু’ পান করা মুখ।

২০০৮ এর পর আওয়ামী লীগে এদের ভিড় উপচে পড়তে শুরু করে। আওয়ামী লীগের পদ, জাতীয় সংসদে তাদের প্রতিনিধিরা আসলেন কালো ভ্রমর হয়ে। কেবল মধুপান করতেই। দলের ত্যাগী কর্মী, নেতারা ঝরে পড়তে থাকলেন অবহেলায়। গণমাধ্যম এক্ষেত্রে মধুপানকারীদের লালন পালনের দায়িত্ব নিলো। জন্ম দিতে শুরু করলো উচ্চ-ফলনশীল জাতের নেতা। টকশো হচ্ছে এমন নেতার প্রজনন কেন্দ্র। ২০১৩ থেকে বর্তমান সময়ে এমন অনেক মুখ এসে আওয়ামী লীগে ভেসে বেড়াতে থাকে পদ ও পদবী নিয়ে। জাতীয় সংসদেও তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হবার পথে। এই গোষ্ঠীর সঙ্গে প্রাকৃতিক বা অর্গানিক আওয়ামী লীগের যোগাযোগ নেই। তৃণমূল তাদের বীজতলায় এমন মুখের দেখা পায়নি।

উচ্চ-ফলনশীল জাতের ফসল বা খাদ্য যেমন শুধু ক্ষুধাই মেটায়, প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায় না। কীটনাশক, রাসায়নিকের ব্যবহারে শরীরেরও ক্ষতি করে, তেমনি এই উচ্চ-ফলনশীল নেতারাও সংগঠনের মধ্যে নানা রোগ তৈরি করেছে।সংগঠনের সুষম স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরা যে শুধু আওয়ামী লীগের জন্য ক্ষতিকর, তা নয়, রাজনীতির কর্কট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবারের আওয়ামী লীগের কাউন্সিলকে ঘিরে অর্গানিক আওয়ামী সমর্থকদের দাবি ছিল, ‘হাইব্রিড’ মুক্ত সংগঠন। কাউন্সিলের আগে শোনা যাচ্ছিল কোনো কোনো হাইব্রিডের নাম, যারা মূল দলে জায়গা করে নেবেন। ঘোষিত কমিটিতে এখনো তেমন নাম চোখে পড়েনি। এটা শুধু আওয়ামী লীগ নয়, দেশের রাজনীতির স্বাস্থ্যের জন্যই মঙ্গলজনক। তবে হাইব্রিডমুক্ত সুষম সংগঠন গড়তে দলের ত্যাগী ও প্রতিভাবান ছাত্র ও যুব নেতাদের তুলে আনা দরকার। অর্গানিক সংগঠনের জন্য এই দাওয়াইর বিকল্প নেই।

 

তুষার আবদুল্লাহ: বার্তা প্রধান, সময় টেলিভিশন

আপনার মতামত লিখুন :

এ সম্পর্কিত আরও খবর