গণহত্যার বিচার থেকে পাকিস্তান রক্ষা পাবে না

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার (অব.)
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশের মাটিতে নিষ্ঠুরতম ভয়ংকর গণহত্যা শুরু করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। তারপর ৮ মাস ২২ দিন- একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা বাংলাদেশের ৩০ লাখ নিরাপদ বেসামরিক মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে। পৃথিবীর ইতিহাসে এত স্বল্প সময়ের মধ্যে এত বড় গণহত্যা আর কোথাও সংঘটিত হয়নি।

বিশ্বের রেকর্ডকৃত ইতিহাসের তথ্য মতে, সংখ্যার দিক থেকে বড় গণহত্যা চালায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের গেস্টাপো বাহিনী। পাঁচ বছরে তারা প্রায় ৬০ লাখ ইহুদিকে হত্যা করে। তাতে বছরে গড়ে প্রায় ১২ লাখ মানুষ গেস্টাপো বাহিনীর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। আর বাংলাদেশ মাত্র ৮ মাস ২২ দিনে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী হত্যা করে ৩০ লাখ মানুষ। সুতরাং সব বিচারে পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশের গণহত্যা বিশ্বের ইতিহাসে সর্ব বৃহৎ গণহত্যা।

ইহুদি হত্যার বিচার হয়েছে। শুধু বিচার নয়, বিনিময়ে ইহুদিরা স্বতন্ত্র একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছে। ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে তারা স্বীকৃতি পেয়েছে। ইহুদিদেরকে একটা স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রদানের জন্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হাজার বছরের প্রতিষ্ঠিত একটা জাতিকে তাদের মাতৃভূমি থেকে উৎখাত করেছে।

আর আমরা বিশ্বের সর্ব বৃহৎ গণহত্যার শিকার হয়েও ৫০ বছরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিটুকু পর্যন্ত পেলাম না। এর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের লজ্জিত হওয়া উচিত। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সময় বর্তমানের তুরস্ক কর্তৃক আরমেনিয়ায় গণহত্যা চালিয়ে ৮ লাখ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা হয়। তার বিচার হয়নি বটে, তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। গত শতকের সত্তর দশকের মাঝামাঝিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়ায় কমিউনিস্ট নেতা পলপটের হুকুমে ক্ষমতা দখলকারী কমিউনিস্ট পার্টির ক্যাডার বাহিনী চার বছরে প্রায় ১৮ লাখ নিরীহ মানুষ হত্যা করে। সেই গণহত্যারও বিচার হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলেছে।

আবার আমাদের গণহত্যার অনেক পরে গত শতকের নব্বই দশকের মাঝামাঝিতে সংঘটিত রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচার হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পাওয়া গেছে। তখন রুয়ান্ডায় জাতিগত দাঙ্গায় ৮ লাখ মানুষ গণহত্যার শিকার হয়। সুতরাং দু:খ এবং বেদনাক্লিষ্ট মনে বলতে হচ্ছে, আজ প্রায় ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণহত্যার স্বীকৃতিটুকু পর্যন্ত আমরা পেলাম না, যেকথা শুরুতেই উল্লেখ করেছি।

কেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলাম না, কেন বিচার পেলাম না, তার প্রেক্ষাপট ও কারণ এখন প্রায় সকলেই কিছু কিছু জানেন। এ বিষয়ে আমার উপলব্ধির কথা বলতে গেলে আজকের প্রসঙ্গের বিচ্যুতি ঘটতে পারে। তাই আজকের সুনির্দিষ্ট প্রসঙ্গে ফিরে আসি।

একাত্তরের গণহত্যার বিচার পেতে হলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এই গণহত্যা প্রমাণ করার জন্য খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না। ওই গণহত্যায় অংশ গ্রহণকারীদের নিজস্ব লিখিত স্বীকারোক্তি এবং রেকর্ডকৃত দলিলপত্রই যথেষ্ট হবে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিক লিখিত মিলিটারি অপারেশন আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণহত্যা চালায়। ওই লিখিত আদেশটি পাকিস্তানের সামরিক অফিসার সিদ্দিক মালিকের রচনায় উইটনেস টু সারেন্ডার গ্রন্থের অংশ হিসেবে সংযুক্ত আছে। সিদ্দিক মালিক একাত্তরের পুরো ৯ মাসই বাংলাদেশে ছিলেন। ওই লিখিত আদেশ নামাটাই গণহত্যার অকাট্য দলিল।

অপারেশন সার্চ লাইট-১ অর্থাৎ ২৫ মার্চ রাতে পরিচালিত সামরিক অভিযানের জন্য ঢাকা শহর ব্যতীত সমগ্র বাংলাদেশের দায়িত্বে ছিলেন ১৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা। ঢাকা শহরে অপারেশন পরিচালনায় সরাসরি দায়িত্বে ছিলেন ঢাকায় অবস্থিত ৫৭ পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাব এবং সার্বিক তদারকির দায়িত্বে ছিলেন গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল হামিদ খান ১৭ মার্চ খাদিম হোসেন রাজাকে অপারেশন সার্চ লাইটের আদেশনামা চূড়ান্ত করার হুকুম দেন। খাদিম হোসেন রাজা ও রাও ফরমান আলী ১৮ মার্চ একত্রে ঢাকা সেনানিবাসে বসে অপারেশনের আদেশনামা চূড়ান্ত করেন। এখানে উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয়ার্ধে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে পরামর্শের পর পূর্ব পাকিস্তানে সেনা অভিযানের জন্য সেনাপ্রধান হামিদ খানকে প্রস্তুত হতে বলেন। জেনারেল খাদিম ও পূর্ব পাকিস্তানে নতুন গভর্নর ও সামরিক প্রধান টিক্কা খান একত্রে অপারেশন সার্চলাইটের অনুমোদন প্রদান করেন ২০ মার্চ। এর মধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চীফ অব জেনারেল স্টাফ গুল হাসান কয়েকবার রাওয়ালপিন্ডি থেকে ঢাকায় আসা যাওয়া করেন।

জুলফিকার আলী ভুট্টোর প্ররোচনায় গুল হাসান ও টিক্কা খান দুজনে মিলে ইয়াহিয়া খানকে পরামর্শ দেন সাড়ে সাত কোটির মধ্যে ২৫-৩০ লাখ বাঙালি হত্যা করলে কিছু যাবে আসবে না। বরং তাতে সব ঠিক হয়ে যাবে এবং পাকিস্তান রক্ষা পাবে। আগামী ৩০ বছর নিশ্চিন্তে বাঙালিদের শাসন করা যাবে। এই যে কথাগুলো উপরে উল্লেখ করলাম এগুলো আমার নিজের কথা নয়, অনুমানও নয়, গণহত্যার দুই প্রধান কালপ্রিট নিয়াজি ও খাদিম হোসেন রাজা কর্তৃক লিখিত গ্রন্থেই এগুলো সবিস্তারে বর্ণনা আছে। যেগুলো স্বীকারোক্তিমূলক এভিডেন্স। নিয়াজির লেখা বইয়ে নাম The Betrayal of East Pakistan আর খাদিম হোসেনের বইয়ের নাম A Stranger in my Own Country।

সার্চলাইটের আদেশ নামায় সুনির্দিষ্টভাবে টার্গেট উল্লেখপূর্বক আদেশ প্রদান করা হয়। টার্গেট হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষভাবে ইকবাল হল, ঢাকা হল ও এবং শিক্ষকদের আবাসিক এলাকা। ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ ১৮ পাঞ্জাব বাহিনীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়। একইভাবে ৫৭ পদাতিক ব্রিগেডের ২২ বালুচ, ৩২ পাঞ্জাব, ৩১ গোলন্দাজ ও ১৩ ফ্রন্টায়ার বাহিনীকে পুরান ঢাকা, শাখারি বাজার, পিলখানা ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আক্রমণের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ ও লক্ষণীয় বিষয় হলো, লিখিতভাবে সামরিক অপারেশন আদেশনামায় বেসামরিক এলাকা ও বেসামরিক মানুষকে টার্গেট করা করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেবসহ এক ডজনের ওপর শিক্ষক এবং কয়েক শ' ছাত্রকে হত্যা করা হয় এ রাতেই শুধু শাখারি বাজারে নিহত হয় প্রায় আট হাজার মানুষ। চকবাজারসহ ঢাকা শহরের অন্যান্য এলাকায়ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। পুরান ঢাকায় প্রধানত টার্গেট করা হয় হিন্দু সম্প্রদায়কে। ঘুমন্ত নারী শিশুসহ ঘরবাড়িতে গান পাউডারের মাধ্যমে আগুন দেওয়া হয়।

২৫ মার্চের ভয়াবহ নৃশংস গণহত্যার বর্ণনা বিভিন্ন মিডিয়ায় ছাপা হয়। একমাত্র বিদেশি সাংবাদিক সাইমন ড্রিং ওই রাতে ঢাকায় ছিলেন। পরে লন্ডনে পালিয়ে গিয়ে ৩১ মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় তিনি তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ সব ধরনের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহার করে। ইকবাল হল ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। শুধু ইকবাল হলেই প্রথম ধাক্কায় ২০০ জন ছাত্র নিহত হয়। দুই দিন পর্যন্ত পোড়া ঘরগুলোর জানালায় মৃতদেহ ঝুলে থাকতে দেখা যায়।

বেসামরিক মানুষের ওপর এমন সমন্বিত অস্ত্রের ব্যবহার বিশ্বে আর কোথাও হয়নি। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি মর্নিং হেরাল্ড পত্রিকায় রিপোর্ট বের হয় ২৫ মার্চ রাতে সারা বাংলাদেশে এক লাখ মানুকে হত্যা করা হয়। যুদ্ধ সম্পর্কে জেনেভা কনভেনশনের প্রারম্ভে বলা হয়েছে Even wars have limit, civilians should never be targeted। তারপর জেনেভা কনভেনশনের যুদ্ধরত বাহিনীকে ১০টি রুলস বা বিধি মান্য করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। যেখানে তিনটি বিধির মাধ্যমে বিশেষভাবে বেসামরিক মানুষের জন্য রক্ষাকবচ তৈরি করা হয়েছে। তার মধ্যে এক নম্বর Prohibit targeting civilians, doing so is a war crime। পাকিস্তান সেনাবাহিনী বেসামরিক মানুষকে টার্গেট করেছে, তার প্রমাণ তাদের লিখিত দলিলেই উল্লেখ আছে। সুতরাং আন্তর্জাতিক আদালতে গেলে পাকিস্তান কিছুতেই রক্ষা পাবে না।

সিদ্দিক মালিক Witness to Surrender গ্রন্থের ৭৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ভোর বেলায় শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত নিজের কমান্ড পোস্ট থেক বাইরে এসে শহরের দিকে তাকিয়ে টিক্কা খান বিদ্রূপের হাসিতে বলেছিলেন, ঢাকা শহরে কয়েকটি নেড়ি কুকুর ছাড়া মানুষজন কিছু অবশিষ্ট আছে বলে তো মনে হয় না। জেনারেল নিয়াজি তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন, জেনারেল টিক্কা খান তাকে বলেছিলেন, আমি পূর্ব পাকিস্তানের মাটি চাই, মানুষ চাই না।

নিয়াজি তার বইয়ে আরও উল্লেখ করেছেন, টিক্কা খান পোড়া মাটির নীতি গ্রহণ করেন এবং সে অনুসারে জেনারেল রাও ফরমান আলী ও ঢাকার ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাবকে হুকম দেন। রাও ফরমান আলী তার টেবিল ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ ভূমি বাঙালির রক্তে লাল করা হবে।

যুদ্ধের পর পাকিস্তানে প্রধান বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত তদন্তে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অনেক চেষ্টা করেও গণহত্যার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ধামাচাপা দিত পারেনি সে কথা স্বীকার করা হয়েছে। জেনারেল নিয়াজি, রাও ফরমান আলী এবং ব্রিগ্রেট ও ব্যাটালিয়ন কমান্ডারগণ যেসব বিবৃতি উক্ত তদন্ত কমিটির কাছে দাখিল করেছেন করেছেন সেটাই গণহত্যা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।

অন্যদিকে অপারেশন সার্চলাইট শুরু হওয়ার পরেই কেবল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্পষ্টতই এক্ষেত্রে পাকিস্তান আগ্রাসী পক্ষ এবং প্রথম আক্রমণকারী। তাই জাতিসংঘের কনভেনশন অনুযায়ী এই যুদ্ধের সব দায়দায়িত্ব বর্তায় পাকিস্তানের ওপর। সুতরাং শুধু গণহত্যার বিচার নয়, পাকিস্তানকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণও বাংলাদেশকে দিতে হবে।

৫০ বছর পার হয়ে গেলও আমরা কিছুই ভুলিনি। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। বাংলাদেশ আজ অর্থনীতি, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠিতে পাকিস্তানে চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। তাই আন্তর্জাতিক আইনের কাছে তাদের মাথা নত করতে হবে, যেমনটি তারা করেছিল একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর। সুতরাং আন্তর্জাতিক আদালতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা দায়ের করার এখনই উপযুক্ত সময়।

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার (অব.), কলামিস্ট এবং ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

আপনার মতামত লিখুন :