করোনার কিটে রাজনীতির কীট

প্রভাষ আমিন
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের মতো এমন রাজনীতিপ্রবণ মানুষ বোধহয় বিশ্বে আর কোনো দেশে নেই। আমরা সারাক্ষণ রাজনীতি নিয়ে কথা বলি, তর্ক করি, বিবাদ করি; সবকিছুতে রাজনীতি খুঁজি, রাজনীতি মেশাই, রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত করি। এমনকি যে করোনার থাবায় গোটা বিশ্ব তটস্থ, সেই করোনাও বাংলাদেশের রাজনীতির থাবা থেকে মুক্ত নয়।

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের অন্যতম প্রধান কারণ টেস্টের স্বল্পতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার টেস্ট করা এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছিল। দক্ষিণ কোরিয়া বেশি বেশি টেস্ট করে নিজেদের নিরাপদ রাখতে পেরেছে। কিন্তু বাংলাদেশে টেস্ট করার গুরুত্ব ছিল সবচেয়ে কম। বিশ্বে করোনা সংক্রমণ শুরুর তৃতীয় মাসেও বাংলাদেশে করোনা টেস্টের কিট ছিল মাত্র দুই হাজার। আমরা বড় বড় কথা বলেছি বটে, কিন্তু করোনা মোকাবিলায় কোনো প্রস্তুতিই নেইনি। যদি পর্যাপ্ত কিট থাকতো, যদি বিদেশ থেকে আসা সবাইকে আমরা টেস্ট করাতে পারতাম, তাহলে আজ আমরা অনেক নিশ্চিন্ত থাকতে পারতাম। সবকিছু ঠিক আছে, নিয়ন্ত্রণে আছে; এটা প্রমাণে ব্যস্ত থাকি আমরা। বেশি টেস্ট করালে বেশি রোগী ধরা পড়বে, তাতে আতঙ্ক ছড়াবে। তাই করোনা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলেও টেস্ট নিয়ন্ত্রণ করেছি আমরা সফলভাবে।

টেস্টের বিষয়টি আইইডিসিআর এমনভাবে কুক্ষিগত করে রেখেছিল, যেন টেস্ট সুবিধা ছড়িয়ে দিলেই করোনা ছড়িয়ে পড়বে। সংক্রমণের ৫১ দিনে বাংলাদেশে শনাক্ত হয়েছেন ৫ হাজার ৯১৩ জন। ঠিকমত টেস্ট হলে সেটা কয়েকগুণ বেশিও হতে পারত। টেস্টের সুবিধা এখন অনেক ছড়িয়েছে। তাও দিনে টেস্ট হয় ৫ হাজারের মতো। আইইডিসিআরের হটলাইনে সংযোগ পাওয়া সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। আর সংযোগ পেলেও টেস্টের জন্য বিশাল ইন্টারভিউ দিয়ে তাদের সন্তুষ্ট করতে হয়। সন্তুষ্ট হলে তারা সিরিয়াল দেয় তিন দিন পরের। সিরিয়াল পাওয়ার আগেই রোগীর মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক উপদেষ্টা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম ২৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় মারা গেছেন। মৃত্যুর আগে টানা তিনদিন আইইডিসিআর'এ ধরনা দিয়েও টেস্ট করাতে পারেনি। বেচারা মৃত্যুর আগে তার মৃত্যুর কারণটি জেনে যেতে পারলেন না। আমি খালি ভাবছি, মিল্লাতুল ইসলামের মতো সিনিয়র কর্মকর্তার যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের কী হবে? সিটি ব্যাংকের এক কর্মকর্তার পরপর দুইবার টেস্টে নেগেটিভ আসলেও মারা গেছেন করোনায়। তাহলে ভরসা রাখবো কোথায়?

করোনা টেস্ট নিয়ে যখন এই ছেলে খেলা চলছে, তখনই আশার আলো নিয়ে এসেছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। ড. বিজন কুমার শীলের নেতৃত্বে একদল গবেষক দ্রুত ও স্বল্প খরচে করোনা টেস্ট করার এক কিট আবিষ্কার করেছেন। এই র‍্যাপিড টেস্টিং কিটের সাফল্য এখনও প্রশ্নাতীত নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই এই কিট নেয়নি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও র‍্যাপিড টেস্টিং কিটকে অনুমোদন দেয়নি। বলা হয়, র‍্যাপিড টেস্টিং কিট পিসিআর কিটের মতো অত অ্যাকুরেট নয়। তারপরও বাংলাদেশের মতো ঘনবসতি দেশে তৃণমূল পর্যায়ে টেস্ট সুবিধা ছড়িয়ে দিতে র‍্যাপিড টেস্টিং কিটের বিকল্প নেই। শতভাগ অ্যাকুরেট না হলেও দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া করোনা রোগীদের একটা বড় অংশকে চিহ্নিত করা যাবে।

তবে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের আবিষ্কৃত এই কিট পরীক্ষিত হওয়ার হুজুগে বাঙালির মধ্যে এমন প্রবল জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, যেন কিটটি বাজারে এলেই বাংলাদেশ করোনামুক্ত হয়ে যাবে। যেহেতু ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিএনপিপন্থি, তাই তার প্রতিষ্ঠানের আবিষ্কৃত কিট সরকার নেবে না— এমন একটা পারসেপশন তৈরি হয়েছে প্রবলভাবে। আর সুকৌশলে এই পারসেপশন তৈরি করেছেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী নিজেই। প্রথম দিকে আমিও এই পারসেপশনে আচ্ছন্ন ছিলাম। সরকারের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী লেখার প্রস্তুতি নিয়ে খোঁজখবর নিতে গিয়ে কোথাও কোনো গাফিলতি খুঁজে পাইনি। অথচ মানুষের দাবিটা হলো, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কেন সাভারে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে কিট এনে নিজ দায়িত্বে নিজ খরচে পরীক্ষা করে এক ঘণ্টার মধ্যে তাদের বাজারজাত করার অনুমতি দিলো না। কেউ কেউ বলছেন, এত পরীক্ষা করার কী দরকার। গণস্বাস্থ্য যেহেতু বানিয়েছে, তাই এই জরুরি সময়ে বাজারজাত করতে পরীক্ষা করতে হবে কেন? সরাসরি অনুমতি দিচ্ছে না কেন?

সরকারকেই গালি দেয়ার মোক্ষম সুযোগটা হাতছাড়া করা ঠিক হবে না, এটাই যদি আপনার লক্ষ্য হয়, ভুল পারসেপশনে যদি আপনার বিবেক আচ্ছন্ন থাকে, তাহলে কিছু করার নেই। আর যদি সত্যটা জানতে চান, তাহলে চলুন সামনে আগাই।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র তাদের করোনা কিট আবিষ্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে ২৫ এপ্রিল শনিবার। সে অনুষ্ঠানে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু তারা আসেননি। কেন আসবেন না, সেটাও পরিষ্কার করে লিখিতভাবে জানানো হয়েছিল। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কিটটি যেহেতু এখনও পরীক্ষিত নয়, তাই এই অনুষ্ঠানে যাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তারা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে এখনই এ ধরনের আয়োজন না করে পরীক্ষার পর করার পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু সেটা তারা কানে তোলেননি। শনিবারই তারা অনুষ্ঠান করে মার্কিন সিভিসি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধির কাছে কিট হস্তান্তর করে। সেদিনই সুকৌশলে ছড়ানো হলো, দেশের বিজ্ঞানীদের এত বড় আবিষ্কারে সরকার কোনো আগ্রহই দেখালো না, কেউ এলো না। কেউ কেন আসেননি, সেটা আরেকবার মনে করিয়ে দেবো? আসেননি কারণ গণস্বাস্থ্যের কিটটি এখনও পরীক্ষিত নয়। একটি অপ্রমাণিত কিট গ্রহণ করতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কারো যাওয়া উচিত নয়। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র বরং শনিবার তাদের অফিসে অনুষ্ঠান না করে অধিদপ্তরে যেতে পারতো। তাতে একদিন সময় বাঁচতো।

শনিবারের অনুষ্ঠানে ডা. জাফরুল্লাহ পররাষ্ট্রমন্ত্রী, এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান তাদের সহায়তার জন্য। আচ্ছা আরেকটা কথা বলুন তো, করোনার কারণে এক মাসেরও বেশি সময় দেশে সাধারণ ছুটি চলছে। এই সময়ে কোনো পাবলিক গ্যাদারিংয়ের অনুমতি নেই। প্রধানমন্ত্রী কথা বলেন ভিডিও কনফারেন্সে, আইইডিসিআর'এর ব্রিফিং হয় অনলাইনে, সিপিডির বড় বড় সেমিনার হয় অনলাইনে, এমনকি প্রতিদিন কথা না বললে যার ঘুম হয় না, সেই ওবায়দুল কাদেরও বক্তৃতা পাঠান অনলাইনে। সেখানে একটি হাসপাতালে ক্যামেরা ডেকে আয়োজন করে অপরীক্ষিত কিট হস্তান্তর করা হলো। ছবিতে দেখবেন, হস্তান্তরের সময় অতিথিদের মধ্যে নিরাপদ শারীরিক দূরত্বও ছিল না।

এবার চলুন ২৬ এপ্রিল রোববারের ঘটনাক্রমে দেখে আসি। করোনা কিট আবিষ্কার দলের দলনেতা ড. বিজন কুমার শীলের নেতৃত্বে গবেষণা দলের সদস্য ডা. মুহিব উল্লাহ খোন্দকার ও ড. ফিরোজ আহমেদ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে যান। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার স্বার্থে তাদের দুজনকে মহাপরিচালকের রুমে ডাকা হয়। ড. ফিরোজ আহমেদ অপেক্ষা করেন পাশের কক্ষে। ড. বিজন ও ডা. মুহিবের সাথে মহাপরিচালকের খুবই আন্তরিক পরিবেশে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। সেখানে কোনো কালক্ষেপণ না করে তাৎক্ষণিকভাবে পরে আইসিডিডিআরবি, কিন্তু আইসিডিডিআরবি লকডাউন থাকায় পরে বিএসএমএমএমইউতে কিটের কার্যকারিতা পরীক্ষার সিদ্ধান্ত হয়। পরীক্ষার খরচ নির্ধারণ করবে বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ, নিয়ম অনুযায়ী বহন করার কথা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রেরই। কিন্তু খবর দেখলাম সুচিন্তা ফাউন্ডেশন এই খরচ বহন করবে। এই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এ আরাফাত সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। খরচের ব্যাপারে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সাথে তার কথাও হয়েছে।

ড. বিজন ফলপ্রসূ আলোচনা শেষে সন্তুষ্টচিত্তে বেলা সাড়ে ৩টায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ত্যাগ করেন। সময়টা মনে রাখুন পরে কাজে লাগবে। এবার দেখুন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কিন্তু একটুও সময় নষ্ট করেনি। এখন দায়িত্ব গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষের হাতে। তারা যত তাড়াতাড়ি কার্যকারিতার রিপোর্ট দেবে, ততই জাতির জন্য মঙ্গল। তাদের রিপোর্ট পাওয়ার পর সেটা দেখে ইতিবাচক হলে কিটটি বাজারজাত করার অনুমোদন দেবে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। এই রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত কিন্তু সরকার বা অধিদপ্তরের আর কিছু করার নেই। বল এখন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কোর্টে। আমরা সবাই মিলে তাদের অনুরোধ করতে পারি, প্লিজ আপনারা বিএসএমএমইউর সাথে মিলে তাড়াতাড়ি পরীক্ষাটা করে দিন। রিপোর্ট পাওয়ার পর যদি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সিদ্ধান্ত নিতে এক মিনিটও দেরি করে, প্রতিবাদ করে ফাটিয়ে ফেলবো। এখনও যেহেতু তাদের কালক্ষেপণের কোনো প্রমাণ মেলেনি।

কালক্ষেপণ না করলে কী হবে, কেউ যদি আগে থেকেই অভিযোগের ফিরিস্তি তৈরি রাখে তাহলে কিছু করার নাই। বাঘ হরিণটিকে খাবে, সে পানি ঘোলা না করলে তার বাপ করেছে। মনে আছে তো ড. বিজন কুমার শীল রোববার বিকাল সাড়ে ৩টায় সন্তুষ্টচিত্তে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ত্যাগ করেন। আর বিকাল ৪টায় জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ আনেন। তিনি অভিযোগ করেন, ব্যবসায়িক কারণে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর তাদের কিট গ্রহণ করেনি। তিনি তাদের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগও আনেন। প্রথমে একটু ব্যবসায়িক স্বার্থের কথা বলে নেই। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কিট গ্রহণ বা বর্জনের সাথে কার ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত? এখানে তো কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই যে গণস্বাস্থ্যকে না দিলে অন্য কেউ পাবে। স্বার্থ যদি কারো থাকে, সেটা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীরই। কিটটি বাজারজাত করতে পারলে মুড়ি-মুড়কির মতো বিকোবে। লাভের হার যত কমই হোক, অঙ্কটা হবে মোটা।

সেই সংবাদ সম্মেলনে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর চেয়েও বিপ্লবী ছিলেন ড. ফিরোজ আহমেদ। তিনি নিজেকে আওয়ামী পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে দেশ বাঁচাতে, মানুষ বাঁচাতে কিটটি গ্রহণ করার দাবি জানান। কিন্তু সমস্যাটা হলো, এখন পর্যন্ত তো সরকারের কেউ কিটটি প্রত্যাখ্যান করেনি, গ্রহণ করার দাবি জানাতে হবে কেন? সম্ভবত আবেগের বশবর্তী হয়ে তিনি বলেন, এক ঘণ্টার মধ্যে এই টেবিলেই সবার সামনে কিটটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা সম্ভব। আমি অনেকবার শুনেও বিশ্বাস করতে পারিনি, একজন গবেষক ডাক্তার কী করে এমন উদ্ভট আবদার করতে পারেন।

অবশ্য ড. ফিরোজ ছাড়া গবেষণা দলের আর কেউ এক ঘণ্টার মধ্যে কিটের কার্যকারিতা যাচাইয়ের সম্ভাব্যতার কথা বলেননি। পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম তিনি ‘ডাক্তার’ নন, ‘ডক্টর’; নোয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এই অতি বিপ্লবী ড. ফিরোজ আহমেদের কথা মনে আছে? ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে যাওয়া তিন সদস্যের প্রতিনিধিদলের একজন, যাকে মহাপরিচালকের পাশের রুমে অপেক্ষা করতে হয়েছিল। মহাপরিচালকের রুমে ঢুকতে না পারার অপমান সাংবাদিকদের সামনে আবেগী ভাষায় উগড়ে দিতে তার মাত্র আধঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে।

আসল সমস্যাটা হলেন ড. বিজন কুমার শীল। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অভিযোগের সাথে তার বক্তব্যের কোনো মিল নেই। আর এই কিট আবিষ্কারের পুরো কাজটা হয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক ড. বিজন শীলের নেতৃত্বেই, সরকারের সাথে সব পর্যায়ের যোগাযোগটাও করেছেন তিনি। সব শেষ হওয়ার পর ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী লকডাউনেও অনুষ্ঠান করে কৃতিত্ব নিতে চেয়েছেন। ঝামেলা পাকিয়েছেন ড. বিজন শীল। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ব্যবসায়িক কারণে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কিট গ্রহণ করেনি, জাফরুল্লাহ চৌধুরীর এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে ড. বিজন কুমার শীল বলেন, ‘ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর তো স্যাম্পল নেয় না। তারা বলে দেবে সেই স্যাম্পল কোথায় দিতে হবে।’ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে অসহযোগিতা করেছেন, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর এমন অভিযোগের সাথেও ড. বিজনের সুস্পষ্ট ভিন্নমত, ‘আমাদের কিন্তু সবাই সাহায্য করছে। প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয়, প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা সহযোগিতা পাচ্ছি। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরও আমাদের অনেক সহযোগিতা করেছে। তারা অনুমতি দিয়েছেন বলেই রিএজেন্ট আনতে পেরেছি। এজন্য আমরা কৃতজ্ঞ।’

ডা. জাফরুল্লাহ ‘ঘুষ’ নিয়ে যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, সে বিষয়ে ড. বিজন বলেন, ‘না না, অনেক সময় হয়তো বলে ফেলেন। এখানে তেমন কিছুই লাগবে না।’ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে নিজে কিছুই বলেননি দাবি করে ড. বিজন বলেন, ‘আমি তাদের বিরুদ্ধে কিছুই বলিনি। প্রেস কনফারেন্সে আমি ছিলাম। কিন্তু কিছু বলিনি। বিষয়গুলো আমার জানা আছে। আন্তর্জাতিকভাবে আমি অনেক প্রজেক্ট ডিল করেছি। তবে পরিস্থিতি যেহেতু এখন স্বাভাবিক হয়ে আসছে, তাই এগুলো নিয়ে বেশি কথাবার্তা না বলাই ভালো।’

ড. বিজন কুমার শীল একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক। এর আগে সার্স ভাইরাসের টেস্টিং কিট আবিষ্কার করে অনেকের জীবন বাঁচিয়েছেন। পরে চীন সরকার তার নামে প্যাটেন্ট করা কিটটি কিনে নিয়েছিল। সার্স আর কোভিড একই পরিবারের হওয়ায় দ্রুতই তিনি কিট আবিষ্কারে নেমে পড়তে পেরেছিলেন। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি ও তার দল অমানুষিক পরিশ্রম করে সেই আবিষ্কারের ফলকে প্রায় পাকিয়ে এনেছেন, আমরা যেন তাড়াহুড়ো করে সেই প্রায় পাকা ফলকে পচিয়ে না ফেলি। রাজনীতির কীট যেন করোরার কিটকে ধ্বংস করতে না পারে।

ড. বিজন কুমার শীল শুরু থেকেই এ বিষয়ে সরকারের সাথে যোগাযোগ রাখছেন। তিনি অনেক আন্তর্জাতিক প্রজেক্ট ডিল করেছেন, তাই বাস্তবতাটা জানেন। তার কিন্তু পুরো প্রক্রিয়ায় কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, বরং কৃতজ্ঞতা আছে। এখন আমরা কার কথা বিশ্বাস করবো? ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী না ড. বিজন কুমার শীল।

কিট আবিষ্কারের পরের ঘটনাক্রম তো জানলেন। এবার একটু আগের কথা বলি। গত ১৮ মার্চ গণ স্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রথম ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে রিএজেন্ট আনার আবেদন করে। ১৯ মার্চই অনুমতি পায়। খবর পেয়ে প্রধানমন্ত্রী ২২ মার্চ ড. বিজন শীলকে ডেকেছিলেন। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে সরাসরি সাক্ষাৎ হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকেই এই গবেষণার ব্যাপারে ব্যক্তিগত আগ্রহে খোঁজ রেখেছেন। কোথাও সমস্যা হলে তা দূর করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর এনবিআরের সহায়তার কথা তো জাফরুল্লাহ চৌধুরী নিজেই বলেছেন। ১৮ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল- এই ৪০ দিনে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তিনটি চিঠি লিখেছে। এই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আগ্রহে, সরকারের সবার সহায়তায় করোনা কিটটি সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। আর ৪১তম দিনে এসে জাফরুল্লাহ চৌধুরী ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ আনলেন কেন? সরকারের যদি অসহযোগিতা করারই ইচ্ছা থাকতো, তাহলে তো প্রথম দিনে, দ্বিতীয় দিনে, চতুর্থ দিনে, ষষ্ঠ দিনেও করতে পারতেন। ৪১ দিন অপেক্ষা করার কী দরকার ছিল?

বিশ্বে করোনা সংক্রমণের ১২০ দিন হয়েছে, বাংলাদেশে ছড়িয়েছে ৫১ দিন আগে, ড. বিজন কুমার শীলের কিটটি তৈরি করতে ৪০ দিন লেগেছে। আর এখন আমরা একঘণ্টায় সেই কিট বাজারজাত করতে চাই। ড. ফিরোজ আহমেদ ঠিকই বলেছেন, মানুষের জীবন বাঁচাতে এই কিট দরকার। আমিও তাই মনে করি। আর যে কিটের সাথে মানুষের জীবন-মরণ জড়িত, সেটা বাজারে ছাড়ার আগে কোনো তাড়াহুড়ো করার পক্ষে আমি নই।

অনেকদিন অপেক্ষা করেছি, যৌক্তিক কারণে আরো কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতেও আমার আপত্তি নেই। তবে কোথাও যদি অহেতুক কালক্ষেপণ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হয়, কারো যদি অনীহা দেখি; সবার আগে প্রতিবাদ করবো আমি। দেখতে চাই প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আগ্রহের প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রিতা করার সাহস কার আছে?

দীর্ঘ সময় সঙ্গে থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা। আমাকে সরকারের দালাল বলার আগে কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিন, তবে তার আগে মাথা থেকে পারসেপশনের মেঘটা সরিয়ে নিন:

এই লেখায় কি কোনো অসত্য তথ্য আছে?

গণস্বাস্থ্যের কিটের ব্যাপারে কি সরকারের কেউ আপত্তি তুলেছে?

কেউ কি এই কিট প্রত্যাখ্যান করেছেন?

কোথাও কি একটুও সময় নষ্ট হয়েছে?

৪০ দিন সহায়তা করে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এখন কেন অসহযোগিতা করছে?


গাল দিতে চাইলে এ প্রশ্নের উত্তরগুলো আগে খুঁজুন।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

আপনার মতামত লিখুন :