করোনায় এইচ.এস.সি পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের করণীয়

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষাও স্থগিত হয়ে গেছে। অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে আছে ২০২০ সালের এইচএসসি, আলিম বা সমমানের পরীক্ষা।

‘হোম কোয়ারেন্টিন’ বা ‘লকডাউন’-এর এই বর্তমান পরিস্থিতি পরীক্ষার্থীদের জন্য জ্ঞান অর্জনের অবারিত এক সুযোগ করে দিয়েছে। বিশেষ করে যাদের বিভিন্ন বিষয়ে দুর্বলতা রয়ে গেছে তাদের জন্য এই সময়টাকে কাজে লাগানো অত্যন্ত জরুরি। কেননা যে কোন সময় সংক্রমণ কমে এলে ‘হোম কোয়ারেন্টিন’ বা ‘লকডাউন’ শিথিল করার মাধ্যমে পরীক্ষা শুরু হতে পারে। সবাইকে মনে রাখতে হবে আমাদের শিক্ষার্থীদের মতই অনেক শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য প্রতীক্ষা করছে এবং সেই কারণে অনেকেই এই সময়টিকে জীবনে সফল হওয়ার জন্য শ্রেষ্ঠ সময় হিসেবে বেছে নিয়ে অব্যাহত ও নিয়মিত পঠন এবং কঠোর অনুশীলনের মধ্যে নিজেদেরকে নিয়োজিত রেখেছে। অব্যাহত এই প্রচেষ্টা অনেক শিক্ষার্থীকে তাদের জীবনের স্বপ্ন পূরণে নি:সন্দেহে সহায়ক হবে।

করোনা সংক্রমণের এই দিনগুলোতে উল্লিখিত বিষয়গুলো অনুসরণ ও অনুশীলন করলে নিশ্চয় আমাদের শিক্ষার্থীরা জীবনে সফল হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। যেমন: (১)‘পড়, পড় এবং পড়’-করোনার দিনগুলিতে এটিই হতে হবে মূলমন্ত্র, যা শিক্ষার্থীদের জীবনকে প্রত্যাশিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে। (২) যে সব পাঠ্য বিষয়ে প্রস্তুতি একটু কম ছিল কিংবা অনুশীলন করলে আরও ভালো করার সম্ভাবনা রয়েছে, সেই বিষয়গুলোকে পঠন, লিখন ও অনুশীলনের মাধ্যমে আত্মস্থ করে নিজেদের আয়ত্তে নিতে হবে। (৩) স্রোতের বিপরীতে একটি নৌকাকে তার লক্ষ্যে পৌছাতে চাইলে নৌকার মাঝিকে ক্রমাগত প্রচেষ্টা ও কঠোর পরিশ্রম করে যেমন গন্তব্যে নিতে হয়, ঠিক তেমনি পরীক্ষা স্থগিত আছে বলে পড়াশুনা কোনভাবেই বন্ধ না রেখে বরং পূর্বের তুলনায় আরও একটু বেশি সময় দিয়ে পঠন, লিখন ও নিয়মিত অনুশীলন করে যেতে পারলে শিক্ষার্থীর আগামী জীবন হবে অনেক বেশি গৌরবের ও সফলতার। (৪) যে কোন লোহা বা স্টিল যেমন দীর্ঘদিন ফেলে রাখলে মরিচা ধরে, তেমনি পড়াশুনা নিয়মিত না রাখলে আগে ‘খুব ভালো পড়া ও প্রস্তুতি আছে’-এমন বিষয়গুলোও ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। (৫)নিয়মিত ‘পঠন, লিখন ও অনুশীলন’ অব্যাহত না রাখলে সবকিছু নতুন করে পড়া, বোঝা ও আত্মস্থ করার ঝুঁকি থেকে যাবে। (৬) প্রতিদিন নিয়ম করে জীবনে সফলতার জন্য ‘করোনার দিনগুলোতে পড়াশুনার রুটিন’ করে নিয়ে সেইভাবে এগিয়ে যেতে হবে। (৭) সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে হবে। যে বিষয়টি বোধগম্য হচ্ছে না তা বুঝে নিতে হবে। (৮)প্রত্যেক অভিভাবককে করোনাকালে শিক্ষকের মত হতে হবে এবং নিজের সন্তানের পড়াশুনার খবর নিতে হবে, নিজেদেরকে নিয়ে বসতে হবে। দুর্বলতা পেলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকের সাথে আলোচনা করে সন্তানকে উপকার করতে হবে। এছাড়া বাড়ির বড় ধরণের কোন কাজ যাতে সময় বেশি নষ্ট হয়, তেমন কাজ সন্তানকে বর্তমান সময়ে না দেওয়া ভালো হবে। (৯) মনে রাখতে হবে অতিরিক্ত এক ঘণ্টা পড়াশুনা অবশ্যই সিজিপিএ বা পরীক্ষার ফলাফল পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি করবে। যতই ‘পঠন, লিখন ও অনুশীলন’-এর চর্চা অব্যাহত থাকবে, ততই সিজিপিএ বা পরীক্ষার ফলাফল ঘড়ির কাঁটার মত সামনের দিকে এগোতে থাকবে। (১০) বোর্ডের সেরা কলেজের টেস্ট পরীক্ষার প্রশ্ন সমাধান যত বেশি করা যাবে, তত বেশি পরীক্ষার প্রস্তুতি ভালো হওয়ার পাশাপাশি নিজের ভুলগুলোর সঠিক সমাধান হবে। (১১)মনে রাখতে হবে বর্তমান সময়ের সদ্ব্যবহারের উপর নির্ভর করছে শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল এবং উচ্চশিক্ষার জন্য ভালো কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির হাতছানি। (১২) মনে রাখতে হবে, বিল গেইটস, স্টিভ জবস, মার্ক জাকারবার্গ, টমাস আলভা এডিসন, আর্লবার্ট আইনস্টাইন কেউই ভালো শিক্ষার্থী ছিলেন না। কিন্তু তারা আজ নিজ প্রচেষ্টা, অধ্যবসায়, সময়ের সদ্ব্যবহার, উদ্যোগ ও উদ্ভাবনী গুণাবলীর মাধ্যমে পৃথিবীর সেরা ও বিখ্যাত মানুষে পরিণত হয়েছেন। (১৩) আরও মনে রাখা দরকার, খুব ভালো শিক্ষার্থী না হয়েও শুধু নিয়মিত ‘পঠন, লিখন ও অনুশীলন’- এর মাধ্যমে নিজের উদ্যোগ ও কর্মযোগ্যতায় জীবনে সফল হওয়া যায়। (১৪) করোনা পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন হলে সংক্ষিপ্ত নোটিশে নতুন পরীক্ষার রুটিন হতে পারে। ধারণা করে নিতে হবে পরীক্ষার মাঝে কোনো বন্ধ বা বিরতি নাও থাকতে পারে। এমনকি শুক্রবারেও যদি পরীক্ষা হয় তবে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার্থীদের এখন ধ্যান-জ্ঞান হওয়া উচিত হবে—এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে আগামী এইচএসসি বা যার যে একাডেমিক পরীক্ষা আছে তা সফল ও সুন্দরভাবে শেষ করার জন্য পড়াশোনার মাঝে মশগুল থাকা। (১৫) করোনাকালে পড়ার টেবিলই হতে হবে পরীক্ষার্থীর ঠিকানা। মনে রাখতে হবে, পরীক্ষার খাতা একজন শিক্ষার্থীর নিজেকেই লিখতে হয়। কাজেই কোনভাবে সময় নষ্ট করা যাবে না। (১৬) পরীক্ষার আগে নিয়মিত অধ্যয়নের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম ও খাওয়া-দাওয়া ঠিক রাখতে হবে। সুযোগ থাকলে অল্প-স্বল্প শরীরচর্চা করতে হবে। (১৭) এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের যে কোন একাডেমিক পরামর্শ, সমস্যা বা আলোচনার জন্য কলেজের সম্মানিত শিক্ষক কিংবা প্রাইভেট মেন্টর যারা আছেন তাদের সাথে অনলাইনে কিংবা মোবাইল ফোনে প্রয়োজনে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

সন্তান অভিভাবকদের এবং শিক্ষার্থী শিক্ষকদের যারা মা-বাবার মতোই সন্তান সমতুল্য শিক্ষার্থীর মঙ্গল কামনা করেন। শিক্ষকবৃন্দ এবং অভিভাবকসহ সকলের প্রচেষ্টার মাধ্যমে আজকের এই সন্তানেরা আগামী দিনের জন্য পরিপূর্ণভাবে প্রস্তুতি নিয়ে বড় হবে-সেই প্রত্যাশা ও নিরন্তর আন্তরিক দোয়া সকলের প্রতি।

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: প্রাথমিক ও কমিউনিটি স্বাস্থ্য বিষয়ক পিএইডি গবেষক, ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি, চীন এবং শিক্ষক ও সাবেক চেয়ারম্যান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বশেমুরবিপ্রবি, গোপালগঞ্জ।

আপনার মতামত লিখুন :