পচনশীল কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে করণীয়

ড. মো. মাহবুবুল আলম ও আবু জাফর আহমেদ মুকুল
ড. মো. মাহবুবুল আলম (বাঁয়ে) ও আবু জাফর আহমেদ মুকুল

ড. মো. মাহবুবুল আলম (বাঁয়ে) ও আবু জাফর আহমেদ মুকুল

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনা সংকটকালে কৃষিপণ্যের সরবরাহ আর নায্য দাম এই দু’টো নিয়ে প্রবল আলোচনা চলছে। কীভাবে সচল রাখা যাবে সরবরাহ আর কীভাবেই বা নির্ধারিত হবে দাম-এই দু’টোই প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

করোনাকালীন এই দু’টো নিয়ে আলোচনাই এটি প্রমাণ করে, আমাদের নিজস্ব সুশৃঙ্খল ও সুসমন্বিত কোনো সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। আর তাই কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও প্রধান দানাদার শস্য যেমন ধান, গম, ডাল, স্বল্প পরিসরে ভুট্টা আর খাদ্য অভ্যাস বিবেচনায় পেঁয়াজ আর আলুতেই আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ। এই ফাঁকে পচনশীল সবজির সরবরাহ আর মূল্য-দু’টোই উপেক্ষিত।

মনে রাখা দরকার, বিগত ৪৮ বছরে দেশে সবজি উৎপাদন পাঁচগুণ বেড়েছে। আর বার্ষিক উৎপাদন বৃদ্ধির হার বিবেচনায় বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয়। যতটুকু জানা যায়, দেশে ৬০ ধরনের ও ২০০টি জাতের সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। এসব সবজির ৯০ শতাংশ বীজ দেশে উৎপাদিত হচ্ছে। এই উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি জড়িত ১ কোটি ৬২ লাখ কৃষক পরিবার। গ্রামীণ নারীদের সবচেয়ে বড় উপার্জন মাধ্যম হলো শাকসবজি চাষ। তাই সবজি সরবরাহ আর মূল্য সার্বিক কৃষি ব্যবস্থাপনা ও নারীর ক্ষমতায়ন উভয়ের সাথেই জড়িত।

ভোক্তা আর উৎপাদক- দুই পক্ষের জন্য শাকসবজি উৎপাদন আর সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর সাথে পারিবারিক পুষ্টির বিষয়টি অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। গবেষণা বলছে, সুস্বাস্থ্যের জন্য একজন মানুষের প্রতিদিন ২২০ গ্রাম সবজি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

আজ থেকে ২০ বছর আগে দেশে মাথাপিছু দৈনিক সবজি গ্রহণের পরিমাণ ছিল ৪২ গ্রাম। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৬ গ্রামে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৮ লাখ ৬১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমি থেকে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৫৪ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন সবজি উৎপাদন হয়। উৎপাদিত মোট সবজির মধ্যে শীতকালে উৎপাদিত হয় ১ কোটি ৮ লাখ ৫ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন এবং গ্রীষ্মকালে উৎপাদিত হয় ৫১ লাখ ৪৮ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন। অর্থাৎ মোট সবজির শতকরা ৬৭ ভাগ উৎপাদিত হয় শীতকালে এবং বাকি ৩৩ ভাগ উৎপাদিত হয় গ্রীষ্মকালে।

লকডাউনের সময়ে আমরা দেখেছি, কৃষক উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পেরে রাস্তায় ফেলে দিচ্ছেন অথবা আড়তে পচে নষ্ট হচ্ছে। বাম্পার ফলনে কৃষকের মুখের ক্ষণিক হাসি নায্যমূল্যের অভাবে সহসাই মিলিয়ে যেতে দেখার অভিজ্ঞতা আমাদের নতুন নয়। সুতরাং করোনার মতো শুধু বিশেষ পরিস্থিতি নয় বরং সবসময়ের জন্যই একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এখন বিশেষ প্রয়োজন।

কৃষিপণ্য সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণের সমন্বিত ব্যবস্থা থাকলে হয়ত করোনাকালীন লকডাউন প্রক্রিয়াটিকে আরো দীর্ঘায়িত করে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা আরো সহজ হতো, আক্রান্ত আর মৃত্যু- দু’টোর সংখ্যাই হয়ত কমত।

আসুন দেখে নিই প্রধানত কি কি কারণে কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য পান না এবং এর থেকে পরিত্রাণের সম্ভাব্য উপায়।

পণ্যের নায্যমূল্য না পাবার প্রধানতম কারণ কৃষকের বাজারে সরাসরি অংশগ্রহণে অনীহা। অবশ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনার আলোকে এটি অত্যাবশ্যক কোনো শর্ত নয়। কারণ পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যসত্ত্বভোগীর একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। কিন্তু জরুরি হলো কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের দাম নির্ধারণে ক্ষমতা থাকা, যেটিকে আমরা একাডেমিক্যালি বলি, 'bargaining power'।

'কৃষক পর্যায়ে পণ্যের বিক্রয়মূল্য কম কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে বেশি'- এই রকম যে কোনো আলোচনায় আমরা সরাসরি মধ্যসত্ত্বভোগীদের দায়ী করে থাকি। কিন্তু মধ্যসত্ত্বভোগী ছাড়া বাজার ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা অনেকটা অসম্ভব। এমনকি এই ইন্টারনেটের যুগেও যখন ভোক্তা উৎপাদকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য কেনার সুবিধা পায় ই-কমার্স ব্যবহার করে।

সরাসরি পণ্য বিক্রয়ে উৎপাদক দাম নায্য পেলেও, ছোট উৎপাদকের জন্য সঠিক বাজার বা ক্রেতা খু্ঁজে পাওয়া কঠিন। আর যে কারণে ই-কমার্স আজ যতটা না 'ভোক্তা-উৎপাদক' সম্পর্ক, তার চেয়ে বেশি intermediary বা মধ্যসত্ত্বভোগী আর ভোক্তার সম্পর্ক। ইন্টারনেটের এই যুগে চলছে মধ্যসত্ত্বভোগীদের রাজত্ব, যেমন আমাজন, ই-বে বা গুগল সবাই কিন্তু অনলাইন বেইজড্ মধ্যসত্ত্বভোগীদের পথিকৃৎ।

মধ্যসত্ত্বভোগীদের তাই অযথা দোষারোপ না করে আমাদের উচিত হবে তাদের কীভাবে অতি মুনাফা থেকে বিরত রাখতে পারি এবং তাদের বাজারে অনুপ্রবেশে বাধাগুলো যেমন অতিরিক্ত পরিবহন খরচ, পরিবহনের সাথে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকের প্রাপ্যতা এবং বিশেষ করে পণ্য পরিবহনে অনায্য চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

মধ্যসত্ত্বভোগীদের অতি মুনাফা বা বাজার নিয়ন্ত্রণে ভারসাম্য রক্ষায় কৃষকের সরাসরি বাজারে অংশগ্রহণে উৎসাহ প্রদান করতে হবে। এতে বাজারে একটা সাম্য অবস্থা নিশ্চিত করা যেতে পারে। এজন্য আমাদের অতি পরিচিত সমবায় ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।

সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা সারা বিশ্বেই একটি জনপ্রিয় ধারা। নেদারল্যান্ডসের সবজির বাজার ১০০ শতাংশ, ফলের বাজার ৭০ শতাংশ, জাপানে ৭০ শতাংশ, আমেরিকায় ২৩ শতাংশ সমবায় বিপণনের মাধ্যমে বিক্রি হয়ে থাকে।

আমাদের দেশে সমবায় আন্দোলন অনেক আগে শুরু হলেও এর সুফল আমরা এখনও নিশ্চিত করতে পারিনি। কিছু আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে, সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করলেও মোটা দাগে আমরা এ দেশে এটি জনপ্রিয় করতে পারিনি। সময় এসেছে এই ব্যবস্থাটির উপযোগিতা পুনরায় পরীক্ষা করা।

আমাদের উচিত এদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, সংস্কৃতি, পারস্পরিক মূল্যবোধ বিবেচনায় কাস্টোমাইজড সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। আর এই কাজে সরকারের কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, কৃষি বিভাগ ও সমবায় বিভাগ সম্মিলিতভাবে কাজ করা নিশ্চিত করতে পারে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমবায় গঠনে উৎসাহ, আর্থিক প্রণোদনা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালনের কথা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের। আশঙ্কার কথা হলো জনশক্তি ঘাটতি, দক্ষ প্রশাসকের অভাব, আধুনিক বিপণন পদ্ধতি গ্রহণে অসমর্থতা, সর্বোপরি বছরের পর বছর সঠিক মূল্যায়ন না পাওয়া কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সীমিত ভূমিকা পালনের কারণ। এদেশের কৃষি জীবিকা (subsistence) নির্ভর থেকে বাজারমুখী কৃষিতে রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে পরিণত কৃষি বিপণন ব্যবস্থার অভাব বড় বেশি অনুভূত হয়। সুতরাং কৃষি বিপণন অধিদপ্তরে অধিকপদ সৃজন সাপেক্ষে কৃষি মার্কেটিং-এ স্নাতকধারীদের চাকরির সুযোগ দিতে হবে।

করোনার মতো বিশেষ সময়ে অস্থায়ী ভিত্তিতে জনবল নিয়োগের বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ের কৃষি বিপণন কর্মকর্তাদের মধ্যসত্ত্বভোগীদের ওপর বেশি নির্ভরশীল না হয়ে কৃষকের সাথে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন এবং তাদের পণ্যের বাজারমূল্য সময়মতো অবহিত করার ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে কৃষক পর্যাপ্ত সময় পান তার বাজার সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে।

প্রতিটি বাজারে এলে পণ্যের দাম সংশ্লিষ্ট একটি বোর্ড বা তালিকা থাকে। সঠিক তথ্য উপস্থাপনের অভাবে বাংলাদেশে এটির উপযোগিতা হারিয়েছে। কিন্তু এটাকে আবার সাফল্যের সাথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এজন্য এই বোর্ডগুলোকে ডিজিটাল বোর্ডে রূপান্তর করতে হবে। এতে একটি জেলার বা উপজেলার কন্ট্রোল পয়েন্ট থেকে সরাসরি বাজার সংশ্লিষ্ট তথ্য উপস্থাপনা ও ব্যবস্থাপনা সহজ হবে। আগ্রহী কৃষক ও স্থানীয় বাজার ব্যবস্থায় জড়িত স্টেকহোল্ডারের কাছে সে তথ্য বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মোবাইল এসএমএস বা ইন্টারঅ্যাকটিভ ভয়েস রেসপন্স (IVR) প্রটোকলের মাধ্যমে পাঠানো যেতে পারে।

কৃষিপণ্যের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিতকরণ হলো আরেকটি প্রক্রিয়া, যেটি শুধু পণ্যের অধিকমূল্যই নিশ্চিত করবে না বরং নতুন কর্মক্ষেত্রও সৃষ্টি করবে। বিআইডিএসের গবেষণায় দেখা যায়, আমাদের দেশে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ সংগৃহীত খাদ্য নষ্ট হয়। যার মধ্যে ৩ শতাংশ নষ্ট হয় প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যায়ে। কৃষক ও কৃষক পরিবারকে এজন্য সহজ ও স্বল্প খরচে পণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

মাঠ পর্যায়ে অনেক উন্নয়ন সংস্থা এই কাজটি বিচ্ছিন্নভাবে করে আসছে। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে বড় পরিসরে একটি সমন্বিত উদ্যোগ অতি জরুরি। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পণ্য সংরক্ষণাগার বা কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

সমবায়ভিত্তিক বাজার ব্যবস্থাপনার আরেকটি সুফল এখানে উল্লেখ্য করতে চাই, তা হলো ব্যক্তি উদ্যোগে স্বল্প খরচের পণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পাশাপাশি এটি মাঝারি খরচে অধিকতর উপযোগী কমিউনিটি বেইজড্ পণ্য সংরক্ষণাগার তৈরি ও ব্যবস্থাপনা সহজতর করতে পারে।

জীবন ও জীবিকার টানাপোড়েনে সরকার প্রায় দুই মাস পর সাধারণ ছুটি বাতিল করে পরিবহন, অফিস-আদালত ও ব্যবসা-বাণিজ্য খুলে দিয়েছে। অর্থনীতির সাথে আবশ্যক নয় বিধায় ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা চিন্তা করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রেখেছে। কিন্তু করোনাকে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি আমাদের এই আভাস দেয় যে লকডাউন পদ্ধতি পুনরায় বহাল রাখার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। আর সেজন্য আমাদের এখন থেকেই পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রয়োজন রয়েছে, যাতে বিগত দিনের মতো একটি হযবরল অবস্থার মধ্যে পড়তে না হয়।

সাধারণ ছুটিকালীন একটু দেরিতে হলেও সরকার কৃষিপণ্য পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিয়েছিল। তবুও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন ছিল না। তাই লকডাউনের পুনরাবৃত্তিতে কৃষিপণ্য পরিবহন অবশ্যই ওষুধ শিল্পের মতো জরুরি ঘোষণা করতে হবে এবং পরিবহন ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন করতে হবে। প্রয়োজনে পণ্য পরিবহনে 'বিশেষ পাস', যেটি ডিজিটাল হলে ভালো হয়, প্রচলন করতে হবে। এতে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারিতে থাকবে। পণ্যবাহী পরিবহনে মানব ভ্রমণ বন্ধ করা যাবে।

কমিউনিটি বেইজড্ 'পাইকারি-বাজার' হতে পারে আরো একটি বিকল্প সমাধান। যদিও অনেকে এই ধরনের বাজারে স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়ে যায় বলে আশঙ্কা করেন। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় গ্রামের খোলা মাঠে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করে সপ্তাহে অন্তত দুই দিন অস্থায়ী ভিত্তিতে এই বাজারগুলো পরিচালনা করা যেতে পারে। এক একটি গ্রাম থেকে ৫-৭ কিলোমিটারের মধ্যে এই ধরনের বাজার পরিচালনা করা যেতে পারে। কৃষকের বাজারে যাতায়াত নির্বিঘ্ন করার পাশাপাশি পাইকারদের যাতায়াত সহজ করার জন্য স্থানীয় পর্যায় থেকে বিশেষ পাসের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

একসেস টু ইনফরমেশন (a2i) এর প্রত্যক্ষ সহায়তায় কৃষি মন্ত্রণালয় ২৫ মে দেশের প্রথম উন্মুক্ত অনলাইন কৃষি মার্কেটপ্লেস 'ফুড ফর নেশন' (foodfornation.gov.bd) উদ্বোধন করেছে। দেখার বিষয় ভোক্তা, উৎপাদক ও বাজার সংশ্লিষ্টদের মাঝে এটি কতটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারে। এটির সফলতার জন্য প্রথম থেকেই গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা, ইউজার (ব্যবহারকারী) ট্রেনিং, ব্যবহারকারীর সমস্যা নিরূপণ ও দ্রুত সমাধান হতে পারে ব্যবহারকারীর সন্তুষ্টির প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। নতুবা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কৃষিপণ্যের মূল্যতালিকার ওয়েবসাইটের মতো এটিও অব্যবহৃত হয়ে পড়বে বা টার্গেট ব্যবহারকারীদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হবে।

হতাশার কথা হলো সেরকম কোনো উদ্যোগ এখনও পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয়নি।

কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার যুগান্তকারী সফলতার স্বাক্ষর স্বরূপ বাংলাদেশ বেশ কিছু শস্যের উৎপাদন সূচকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পর্যায়ে যতই উঠে এসেছে, ততই বেড়েছে পরিকল্পিত কৃষির ধারণা। কৃষকের সঠিক দাম পাওয়া অনেকাংশে নির্ভর করবে এই পরিকল্পিত কৃষির ওপর। আমাদের এখন জানতে হবে একটি কৃষি পণ্যের প্রকৃত দেশীয় চাহিদা কত আর কত শতাংশ উদ্বৃত্ত থাকে এবং তা রপ্তানি করার সম্ভাব্য প্রক্রিয়া। আর এজন্য একটি তথ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেম গড়ে তোলা জরুরি। যাতে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায় থেকেও সহজে তথ্য লিপিবদ্ধ ও ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হবে। বাজার গবেষণার মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য নিরূপণ করে এলাকাভিত্তিক কৃষকদের মধ্যে তা জানানোর মাধ্যমে যোগান ও চাহিদার ভারসাম্য আনা সম্ভব। উন্নত বিশ্বের মতো পরিকল্পিত কৃষির দিকে না এগিয়ে কৃষি পণ্যের নায্যমূল্য নিশ্চিত করা ভবিষ্যতে আরো কঠিন হয়ে পড়বে।

মধ্যমেয়াদী ব্যবস্থাপনা হিসেবে সবজি চাষিদের সহজ শর্তে ঋণ এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত সংস্থা থেকে বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন ব্যয়ের সাথে সম্পৃক্ত করে একটি কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য কমিশন গঠন করা যেতে পারে।

২০২০-২০২১ সালের বাজেট অতি সন্নিকটে। এটি ধারণা করা যায় যে এইবারের বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ হবে বেশি এবং করোনাকে কেন্দ্র করেই হবে এবারের বাজেট।

আসলে করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে একটি দেশের কত বছর লাগবে, তা বলা কঠিন। এটি ৫-৬ বছর বা তার অধিকও লাগতে পারে। সুতরাং ধারণা করা যায়, এইবারের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতেও নজর দিতে হবে। কারণ প্রচুর রেমিট্যান্স যোদ্ধা দেশে ফিরে এসেছেন। রপ্তানি বাণিজ্য স্থিতিশীল রাখার সাথে সাথে সরকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে স্বাস্থ্যখাত আর কৃষিখাতে।

দেশের মানুষের জীবনের নিরাপত্তা, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা পূরণ না হলে সরকারকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।

ড. মো. মাহবুবুল আলম: অধ্যাপক, কৃষি সম্প্রসারণ ও ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

আবু জাফর আহমেদ মুকুল: সহকারী অধ্যাপক, ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মতামত লিখুন :