বিটিআরসি-গ্রামীণফোন দ্বন্দ্বে পুঁজিবাজারে দরপতন

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
সাংবাদিকদের সংগঠন ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান

সাংবাদিকদের সংগঠন ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান

  • Font increase
  • Font Decrease

মানহীন আইপিওর কারণে পুঁজিবাজারে দরপতন হচ্ছে না মন্তব্য করে বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডক্টর এম খায়রুল হোসেন বলেছেন বিটিআরসির সঙ্গে গ্রামীণফোনের দ্বন্দ্বে পুঁজিবাজারে দরপতন হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (১৯ ডিসেম্বর) পুঁজিবাজার নিয়ে কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠন ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরামের (সিএমজেএফ) অফিস ও ওয়েবসাইট উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের জন্য কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এমন খবর প্রকাশের পর থেকে দরপতন শুরু হয়।

তারপর কয়েকদিন পর শুরু হয় বিটিআরসির সঙ্গে গ্রামীণফোনের দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা গ্রামীণফোন, স্কয়ার ফার্মা, ইউনাইটেড পাওয়ার এবং বেটবিসি কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছে।

বিদেশিরা শেয়ার বিক্রি করায় দেশি বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি করছে। অতিরিক্ত শেয়ার বিক্রির ফলে দরপতন হচ্ছে। কয়েকদিনের মধ্যে সূচক কমেছে ৩৬৪ পয়েন্ট। তার মধ্যে ৫ কোম্পানির কারণে সূচক কমেছে ২৮০ পয়েন্ট বলে মনে করেন তিনি।

উল্লেখ্য চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারির পর থেকে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত দরপতনের ফলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের বিনিয়োগকারীদের পুঁজি উধাও হয়েছে ৮৩ হাজার কোটি টাকা।

এরপর তিনি রাজধানীর দিলকুশায় জীবন বিমা টাওয়ারের (১৫ তালা) সিএম‌জেএফ’র অফিস ও ওয়েবসাইট উদ্বোধন করেন। সিএমজেএফে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিএসইসি’র কমিশনাররা, উভয় স্টক এক্সচেঞ্জের নেতারাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সিএমজেএফ এর সভাপতি হাসান ইমাম রুবেলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিএসইসি কমিশনার হেলাল উদ্দিন নিজামী, মো. কামারুজ্জামান, স্বপন কুমার বালা, ডিএসইর পরিচালক রকিবুর রহমান, ডিবিএ’র সভাপতি শাকিল রিজভী, ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন, সিএসই’র পরিচালক সাইদুর রহমান। এছাড়া সিএমজেএফ’র সাবেক সভাপতি জিয়াউর রহমান, তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু ও ডিআরইউ’র সাবেক সেক্রেটারি রাজু আহমেদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন।

খায়রুল হোসেন বলেন, প্রায়ই বলা হয় মানহীন আইপিওর কারণে বাজার ধ্বংস হয়ে গেল। বিগত নয় মাস কোনো আইপিও নেই, তারপরেও বাজার কেন পড়ে গেল, কেন পড়ে যাচ্ছে।

মানহীন আইপিও কি এই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, জেএমআই সিরিঞ্জকে ১০ টাকায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, সেই শেয়ার এখন ৪০০ টাকা। ১০ টাকায় অনুমোদন দেওয়া বিবিএস ক্যাবলস ১৫৭ টাকায় উঠেছিল, আজ ৮০ টাকায় তা বিক্রি হচ্ছে । আবার কোনো কোম্পানির ৩ টাকার শেয়ার ১ টাকায় নেমে গেছে।

তিনি বলেন, যে আইন জনমত যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রণয়ন করা হয়েছিল, সেই আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে একটি আইপিও দেওয়া হয়েছে কিনা? আইপিও দেওয়ার পর কত বছর সাস্টেইন করেছে এবং প্রত্যেকটা বিনিয়োগকারী লাভবান হয়েছে। সেকেন্ডারি মার্কেটে যাওয়ার পর একটা পর্যায়ে নতুন শেয়ার এসেছে ওগুলোর উৎপাদন নেই, অথবা যে প্রোডাক্ট করেছে সেগুলো নেই অথবা ম্যানেজমেন্ট দুষ্ট আছে, অনেকে পালিয়ে গেছে। পৃথিবীর কোন দেশে রেগুলেটররা এই গ্যারান্টি দেবে না এই আইপিও সারা বছর ফেস ভ্যালুর ওপরে থাকবে। একমাত্র দেশ বাংলাদেশ যেখানে আইপিও আসার পরে ফেস ভ্যালুর ওপরে লেনদেন হয়েছে এবং দরখাস্ত কয়েকগুণ পড়েছে।

মার্কেট কেন ফল করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এনবিআর চেয়ারম্যান বললো ইনভেস্ট করতে হলে টিআইএন নম্বর লাগবে। এরপর যখন আমরা তার ভুল ভাঙালাম এবং তারপরে এটা সংশোধন করলো। দুই তিনদিন না যেতেই গ্রামীণফোনের সঙ্গে বিটিআরসির ঝামেলা শুরু হল। এটা শুধুমাত্র বিটিআরসি এবং গ্রামীণফোনের ক্ষতি করেনি। মার্কেটের স্ট্রাকচারটা ধ্বংস করেছে। কারণ বিদেশিরা যখন আসে তখন ফান্ডামেন্টাল শেয়ার দেখে। গ্রামীণফোনের পাশাপাশি বিদেশিরা অলিম্পিক, ইউনাইটেড পাওয়ার এবং স্কয়ার ফার্মার শেয়ার কিনেছে।

সম্প্রতি আরেকটা আওয়াজ মার্কেটে চলছে যে টাকার ডিভ্যালুয়েশন হবে। আজকে অর্থমন্ত্রী এটা ক্লিয়ার করে দিয়েছেন বাংলাদেশে ডিভ্যালুয়েশন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, টাকার ডিভ্যালুয়েশন করবেন না। ডিভ্যালুয়েশন করলে এক্সপোর্টাররা গেইনার হবে কিন্তু দেশে দ্রব্যমূল্যের দাম বেড়ে যাবে। ডিভ্যালুয়েশনের আতঙ্কে বিদেশিরা তাদের শেয়ার বিক্রি করছে। তারা গ্রামীণফোনের সঙ্গে স্কয়ার ফার্মা, ইউনাইটেড পাওয়ার, বিএটিবিসি বিক্রি করছে। শুধুমাত্র গ্রামীণফোন আর বিএটিবিসি বিক্রি করার ফলে বিগত দুই মাসে ১৭৪ পয়েন্ট পড়েছে। স্কয়ার ফার্মা, গ্রামীণফোন, ইউনাইটেড পাওয়ার, বিএটিবিসি এবং অলিম্পিক এই ৫টি কোম্পানি মার্কেট পতনের জন্য ৮০ শতাংশই দায়ী।

চেয়ারম্যান বলেন, বিদেশিরা শেয়ার বিক্রি করলে মার্কেট প্রেসার নিতে পারে না। বিদেশি যে হাউজ থেকে বিক্রি করে, বড় বড় ইনডেক্সের ওপর ইমপ্যাক্ট আসে, এরকম বিক্রি করে সেখানে যত শেয়ারহোল্ডার আছে, যত বিনিয়োগকারী আছে তারা প্রভাবিত হয়। একটা দেখে আরেকটা প্রভাবিত হয়। এটা সাইকেলের মতো একটা চেইন হিসেবে কাজ করে।

বিএসইসি চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন বলেন, নয মাস বাজারে কোনো আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) আসেনি, তারপরও বাজার পড়ে গেলো কেন? আইপিওর সঙ্গে বাজার পড়ে যাওয়ার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বাজারে যদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা কার্যকর ভূমিকা পালন না করেন তাহলে গতিশীল, দীর্ঘমেয়াদী ও শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, পৃথিবীর কোনো দেশেই রেগুলেটরির বিরুদ্ধে আন্দোলন হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :

এ সম্পর্কিত আরও খবর