আমি মধুমালতী, মাধবীলতা নই

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
শরতেও ফুটে আছে মাধবীলতা, ছবি: বার্তা২৪.কম

শরতেও ফুটে আছে মাধবীলতা, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আমাকে অনেকেই ভুল নামে চিনেন! আবার কেউ কেউ খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে আমাকে ভুল নামেও ডাকেন। আসলেই আমার খুব কষ্ট হয় তখন! এই ভুলটি শুনতে শুনতে হৃদয় ব্যথায় ছেয়ে যায়। আসলে আমার নাম মধুমালতী। কখনোই মাধবীলতা বা মাধবী নয়।

পুষ্প প্রেমীরা ভুল করে আমাকে মাধবী নামে ডাকতে থাকেন। আসলে মাধবী একেবারেই আলাদা ধরণের ফুল। আমি সুলভ অর্থাৎ আমাকে খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু মাধবী দুষ্প্রাপ্য। সহজে তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। এটাই হলো আমাদের প্রতিবেশগত পার্থক্য।

তবে রবীন্দ্রনাথ আমাকে একটি বিশেষ নামে আমার নামকরণ করেছেন, তা হলো- মধুমঞ্জরি লতা। শিল্প-সাহিত্যপ্রেমী বিদগ্ধ ব্যক্তিদের কেউ কেউ আমাকে এই নামেই ডাকেন। এ নামটি আমারও পছন্দ হয়েছে বেশ।

বলা যেতে পারে পিতা-মাতার দেয়া নাম আর প্রকৃতি প্রেমী বিশ্বকবি’র নাম এই দুটোকে জোড়া লাগলে সুন্দর একটি নামের অর্থবহ মর্যাদা দাঁড়িয়ে যায়- মাধবীলতা মধুমঞ্জরি। আমি নিজেই অবাক হই! প্রকৃতিতে জন্ম নিয়ে রাতের আঁধারে মৃদু গন্ধ বিলিয়ে আমার এই জন্মটা বৃথা যায়নি তবে। কিছুটা হলেও সার্থক হয়েছে।

অসংখ্য মাধবীলতার সমাহার

আমি কিন্তু অনেকটা সহজলভ্য। শৌখিন বৃক্ষ প্রেমীরা আমাকে তাদের বাড়ির ছাদে, বেলকানীতে বা ছোট বাগানে যত্ন করে লাগিয়ে থাকে। রঙের বৈচিত্র্য, স্নিগ্ধময় সুবাস আর প্রস্ফুটন প্রাচুর্যের জন্য আমাকে অনেক পুষ্প প্রেমীরা তাদের প্রিয় ফুলের তালিকায় ঠাঁয় দিয়েছেন। বিশেষ কৃতজ্ঞ আমি তাদের প্রতি।

আমার ইংরেজি নাম রেঙ্গুনক্রিপার এবং বৈজ্ঞানিক নাম Quisqualis indica. কাষ্ঠলতার পত্রমোচী গাছ আমি। গ্রীষ্ম, বর্ষা এবং শরতে আমার শরীর কয়েক রঙের ফুলের শোভায় ভরে উঠে। প্রতিটি ডালের মাথায় বড় বড় থোকায় সন্ধ্যের পরে আমি ফুটি। মৃদু সুগন্ধিতে মাতিয়ে রাখি চারপাশ। রাত গভীর ও নীরব হলে বারান্দা বা বেলকানি থেকে আমার সৌরভ পুষ্পপ্রেমীদের দারুণভাবে মাতিয়ে তোলে। তারা আরো বেশি করে ঘ্রাণ নেবার জন্য আমার কাছে ঘেঁসে।

ঝুলে থাকা সৌন্দর্যের বাহার

একই গাছের মাঝে সাদা, লাল, গোলাপি ও মিশ্র রঙের ফুল আমি ফুটিয়ে থাকি। আমার ক্ষুদ্রাকৃতির পাপড়ি সংখ্যা পাঁচটি, মাঝে পরাগ অবস্থিত, দলনল বেশ লম্বা। ওই সব প্রস্ফুটিত বর্ণিল ফুলগুলো থেকে মিষ্টি গন্ধ বের হয়। শুধু কি তা-ই? অজস্র ফুটন্ত ফুলের সৌন্দর্য তখন খুবই নজরকাড়া ও মনোরম।

উপমহাদেশের প্রখ্যাত কিংবদন্তীতুল্য শিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় আমার নাম ধরে গান গেয়েছেন। পুরাতন বাংলা গান প্রেমী এবং ফুল প্রেমীদের নিশ্চয়ই এটা জানা থাকার কথা। গানটি জনপ্রিয় হওয়ার সাথে সাথেই স্বাভাবিকভাবেই চিরদিনের জন্য বোধ করি অমর হয়ে গিয়েছি আমি। অসম্ভব সুন্দর এই গানটি লিখেছেন প্রণব রায় আর গানটির শব্দবলীর ভেতর সুরের জাদু ছড়িয়ে দিয়েছেন রবীন চট্টোপাধ্যায়।

আশা করি, এবার আপনাদের ভুল ভাঙলো। এখন থেকে চলতি পথে হঠাৎ আমার সাথে দেখা হলে গেলে বা চোখাচোখি হয়ে গেলে আমাকে আর ভুল নামে ডাকবেন না। আমি কিন্তু আপনাদের আশেপাশেই ফুটে থাকা প্রকৃতিকন্যা মধুমালতী।