মারায়ন তং চূড়ায় জোছনাস্নান (১ম পর্ব)



শুভ্রনীল সাগর, স্পেশালিস্ট রাইটার, বার্তা২৪.কম
মারায়ন তং চূড়ায় জোছনাস্নান (১ম পর্ব)

মারায়ন তং চূড়ায় জোছনাস্নান (১ম পর্ব)

  • Font increase
  • Font Decrease

মারায়ন তং চূড়া থেকে ফিরে: ঝট করে এক ঝলক রোদ এসে লাগলো মুখে। ছোটবেলার সেই আয়নায় রোদ প্রতিফলিত করে বন্ধুদের মুখে ফেলার কথা মনে পড়ে গেলো। কেউ হয়তো আনমনে কিছু একটা করছিল বা দু-চারজন মিলে খুনসুঁটি – আচমকা মুখে রোদের আঁচ লাগলে যেমন চমকে উঠতো এক্ষেত্রেও তেমন দশা!

সবে ভোর জাগছে। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বাস চকরিয়া ছাড়িয়ে ততক্ষণে আলিকদম ঢুকে গেছে। আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলছে গাছেরাও। শিশির ভেজা পাতায় গা মুছে এদিক-ওদিক উড়ে যাচ্ছে চড়ুই-শালিক। শীতের আড়ষ্ঠতায় আমরাও ঝিমোচ্ছিলাম। এই এক ব্যাপার হয়, ঢাকায় শীত যেমন আসে দেরিতে তেমনি যায়ও সবার আগে। গ্রাম-মফস্বলে যেখানে লেপ গায়ে দিয়েও ঠকঠক অবস্থা, ঢাকায় সেখানে দিব্যি টি-শার্ট গায়ে বুক ফুলিয়ে চলা যায়। সেইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকোপে প্রকৃতির এখন মাথা পাগল দশা। এই মধ্য অগ্রহায়ণেই শীতে কনকন। বাসের চাকা যত শহর ঢাকাকে পেছনে ছেড়ে এসেছে শীতের আলিঙ্গন ততই শক্ত হয়েছে।

 ‘ঘুমাবো কেতকী সুবাস শয়নে, চাঁদের কিরণে করিবো স্নান..’

আধো আধো ঘুম চোখে কেউ হয়তো সবে চোখ মেলেছে, কেউবা ডানে-বায়ে ঢুলছে। এরই মধ্যে সুয্যিমামার দেখা। মামার আদরের মতো মুখে রোদের চাপড়। প্রথমে আচমকা প্রতিক্রিয়ায় চোখ-মুখ কুঁচকে এলেও পরে হইহই করে উঠলো সবাই। হুল্লোড় শুনে বাকিরাও জেগে ওঠে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাড়ির দস্যি ছোটমামার মতো এই এলো আবার ছুটে পালালো কোনো দূর পাহাড়ের পেছনে। আলিকদমের চড়াই-উৎরাই পথ। এই উপরে উঠছে, পরক্ষণে রোলার কোস্টারের মতো নিচে। বাস চলছে সাপের মতো শরীর-মাথা এঁকে-বেঁকে। আবার দস্যি মামা এসে হাজির কিন্তু লুকোচুরি থামলো না! ফিক করে এসে উঠে আবার কোথায় মুখ লুকিয়ে ফেলে। একবার ডানে হারায় তো একবার বামে। খানিক বাদে সুয্যিমামাও বোধহয় একটু হাঁপিয়ে উঠলো। ‘দেখলি তো, আমায় ধরতে পারলি না’র মতো দিগ্বিজয়ী হাসিমুখ করে একরাশ রোদ নিয়ে হাজির। আমাদের মুক্তি এই আলোয় আলোয়..

আলোরেখা ধরে আমরা এগিয়ে চলেছি। দুপাশে পাহাড়ের কোলঘেঁষে পেজা তুলোর মতো মেঘের ওড়াউড়ি। জানলা খুলে দিলে মুখে এসে লাগে শীতল পরশ। ইচ্ছে হয়, বাস থামিয়ে এখানেই নেমে পড়ি। কিন্তু মন আমাদের মেঘের সঙ্গী, দিক-দিগন্ত পেরিয়ে উড়ে চলে মারায়ন তং চূড়ার পানে, নিঃসীম শূন্যে জোছনাবর্ষণসঙ্গীতে.. 

এরইমধ্যে হঠাৎ যাত্রাবিরতি। জাতীয় পরিচয়পত্রসহ নামতে হলো ইয়াংছা চেকপোস্টে। প্রয়োজনীয় ‘সওয়াল-জবাব’ শেষে বাসযাত্রার ইতি হলো আলিকদমের আবাসিক রাস্তার মাথায়। স্থানীয় একটি হোটেলে প্রাকৃতিক কর্ম ও প্রাতঃরাশ সেরে যে যার মতো ট্রেকিংয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি সেরে নিলো। একটু পরই শুরু হবে পাহাড় যাত্রা। আহা, পাহাড়..

সবে ভোর জাগছে, আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলছে গাছেরাও

পাহাড় ডাকছিল চলতি বছরের জানুয়ারি থেকেই। মার্চে তাজিংডংয়ে যাওয়ার সব প্রস্তুতি সারা, কেবল যাত্রা শুরুর অপেক্ষা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাপী নামলো করোনা মহামারী, সেই ধারাবাহিকতায় চার দেয়ালে বন্দিত্ব। এরপর ‘নিউ নরমাল’ জীবনে সেপ্টেম্বরে গিয়ে আবার ট্রেকিংয়ের তোড়জোড়। আগের সব হতাশা পুষিয়ে নিতে ‘এক্সক্লুসিভ ট্রেকিং’ হবে এটি। মন আবার মেঘ-পাহাড়ে ভাসলো। সে যাত্রায়ও পিছিয়ে তারিখ পড়লো অক্টোবরে। শেষমেশ আশার গুড়ে বালি দিয়ে সহ-ট্রেকার বন্ধুদের ছুটিছাটাজনিত সমস্যায় ট্রেকিংই আর হলো না। এক বুক দুঃখ নিয়ে নিত্যদিনের কাজকর্ম করে দিন কাটে। মধ্য নভেম্বরে এসে খোঁজ পেলাম, ‘হিট দ্য ট্রেইল’ নামে একটি ট্রাভেল গ্রুপ জনা বিশেকের একটি দল নিয়ে ২৭ নভেম্বর মারায়ন তং চূড়ায় ক্যাম্পিং এবং ২৮ নভেম্বর আলীর গুহায় ট্রেকিংয়ে যাচ্ছে। আগপিছ না ভেবে ভিড়ে গেলাম তাদের দলে। সেই পাহাড়ে আসা হলো বহু অপেক্ষার পর। এছাড়াও, দীর্ঘ পাঁচ-ছয়মাস লকডাউনে বন্দিজীবন কাটিয়ে মনও ভীষণভাবে খোলা হাওয়ায় শ্বাস নিতে চাইছিলো। সেই বহু বাসনার পাহাড় সামনেই! তার বিস্তৃত বিশালত্বে প্রাণ-মন মেলানোর অপেক্ষা কেবল..

বান্দরবান জেলার মারায়ন তং অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। অনেকে এই পাহাড়কে মারায়ন ডং নামেও ডাকে। প্রায় ১৬৪০ ফুট উচ্চতার এই পাহাড় মেরাই থং জাদি, মারায়ং তং প্রভৃতি নামেও পরিচিত। মিরিঞ্জা রেঞ্জের এই পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে ত্রিপুরা, মারমা, মুরংসহ বেশ কয়েকটি আদিবাসীদের বসবাস।

জানা গেলো, চূড়ায় উঠতে মোট ৫টি ট্রেইল। এর মধ্যে সবচেয়ে খাড়া ট্রেইলটি ৭২ ডিগ্রি কোণে ভূমি থেকে চূড়ার দিকে গেছে। শুনেই শরীর বেয়ে রোমঞ্চকর শিহরণ খেলে গেলো। এ জন্যই তো আসা..

চূড়ায় উঠতে মোট ৫টি ট্রেইল। এর মধ্যে সবচেয়ে খাড়া ট্রেইলটি ৭২ ডিগ্রি কোণে ভূমি থেকে চূড়ার দিকে গেছে। শুনেই শরীর বেয়ে রোমঞ্চকর শিহরণ খেলে গেলো

আবাসিক রাস্তার মাথা এলাকার দোকানপাট-লোকালয় ছেড়ে আমরা মারায়ন তং-মুখী। যে যার ব্যাগ-বোঁচকা নিয়ে হাঁটা শুরু। সূর্য এখন রাগী বড়মামা। একেবারে মধ্যগগন থেকে চোখ রাঙিয়ে চলেছে। কড়া রোদের শাসানি উপেক্ষা করেই আমাদের পৌঁছাতে হবে চূড়ায়। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার খাড়া পথ। একে তো হাঁটলে হাঁটু বুকে এসে ঠেকে, এর উপর আগুন গরম তাপ – খানিক হেঁটেই পিপাসায় বুক শুকিয়ে এলো। প্রথমবারের মতো যারা ট্রেকে এসেছে তাদের অনেকেই পথিমধ্যে শুয়ে পড়লো। পাশ দিয়ে যে হেঁটে যায় তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করে, আর কতদূর? উত্তরে, ‘এ তো কেবল শুরু’, শুনে চুপসে পড়ে। কেউ আশাবাদী উত্তর শোনায়, ‘আরেহ, এই তো এসে গেছি! ওই যে চূড়া দেখা যায়, ওইখানেই শেষ’। শুনে ছোটবেলায় বড়খালার শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার কথা মনে পড়ে যায়। নদী পার হয়ে অনেকটা হাঁটাপথ থাকতো। আমরা ছোটরা হাঁটতে হাঁটতে বেজায় ক্লান্ত। পা আর চলেই না। বারবার জিজ্ঞেস করতাম, আর কতদূর? বড়রা আশা দিত, ওই যে তালগাছ দেখা যায়, ওর ঠিক পাশেই যে টিনের বাড়িটা, ওইটাই। আমরা প্রবল উৎসাহে আবার হাঁটা লাগাতাম। আর একটু কষ্ট করে পৌঁছে গেলেই তো শেষ, এরপর শুধু আনন্দ আর মজা। কিন্তু কত তালগাছ আর টিনের গাছ পেরিয়ে যায়, খালাবাড়ি আর আসে না! সেই কথা ভেবে মনের অজান্তে হেসে উঠি..

আমরাও প্রবল উৎসাহে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করি। পথের দুধারে ঘন বন। সেগুনের প্রশস্ত পাতায় রোদ ঝলমল করে। আমরা সেসব পেরিয়ে চূড়ার হাতছানিতে এগিয়ে যাই। থ্রুং-ভর্তি (বাঁশ দিয়ে বানানো পিঠে ঝোলানো ঝুড়ি) আলু-কলা-শাক নিয়ে পাশ কাটিয়ে যায় আদিবাসী নারীরা। বাঁশের মাঁচার মতো বাড়ি থেকে অপার বিস্ময়ে টিপরা-মুরং শিশুরা তাকিয়ে থাকে। আমরা হাসিমুখে হাত নাড়াই। এরপরও পা-কোমর ধরে আসে। আমরা আরও উদ্দীপনায় খাড়া পাহাড় চড়তে থাকি। চূড়ায় পৌঁছে গেলেই তো অপার আনন্দ-উল্লাস। এরপর ‘আমরা মলয় বাতাসে ভেসে যাবো শুধু, কুসুমের মধু করিবো পান..’

হাওয়া আমাদের হাত ধরে নিয়ে গেলো। মারায়ন তংয়ের চূড়া ছুঁতে প্রায় বিকেল। চূড়ায় উঠেই প্রথমেই চোখে পড়ে বিশাল একটি জাদি আর বটবৃক্ষ। জাদি মানে বৌদ্ধদের পূজা-অর্চনার জন্য বানানো বুদ্ধবিগ্রহ। ধ্যানরতবুদ্ধ প্রকৃতির গূঢ় কোনো রহস্য নিয়ে ভাবছেন আর স্মিত হাসি ফুটে উঠেছে তার ঠোঁটে। চূড়ার মুখোমুখি চিম্বুক রেঞ্জের পাহাড়েরা। চিম্বুক আর মিরিঞ্জাকে মায়ের সমান আদর দিয়ে মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে মাতামুহুরি।

বান্দরবান জেলার মারায়ন তং অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়

বটবৃক্ষের ছায়ায় বসে দুপুরের ভোজনপর্ব সারা হলো। গত প্রায় তিন-চার ঘণ্টা রোদ-গরমে হাঁটার ক্লান্তি যেনো সবার মধ্য থেকে উবে গেছে। অবশেষে বহু আকাঙ্ক্ষাময় মারায়ন তং পাহাড়ের চূড়া, আহা কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে! যে যার তাঁবু খাটাতে ব্যস্ত। দ্রুতই সেরে ফেলতে হবে যেনো। সন্ধ্যা হতেই শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ উঠবে। ‘ঘুমাবো কেতকী সুবাস শয়নে, চাঁদের কিরণে করিবো স্নান..’

টুকটাক গোছগাছের ব্যস্ততায় কখন যে সুয্যিমামা ডুবতে বসলো খেয়ালই ছিলো না। পড়িমড়ি করে ক্যামেরা তাক করতেই দিগন্তজুড়ে নীল-কমলার আভা ছড়িয়ে ‘আজ তবে চললাম’ বলে বিদায়। হুট করে যেমন সকালে এসেছিল, হুট করেই তেমন সন্ধ্যার মেঘমালার মধ্যে মিলিয়ে গেলো।

হুহু ঠান্ডা বাতাস। কেউ তার থোড়াই কেয়ার করে। চারদিকে গল্প-আড্ডা-গানে মুখরিত। পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক ক্যাম্পফায়ার জ্বলে উঠলো। কিন্তু কাঠপোড়ানো আগুনের আলোকে ম্লান করে চাঁদ উঠলো আরও আরও রোশনাই রঙে। তাকে বরণ করে নিলো মণি-মাণিক্যখচিত তারাদল। আজ জোছনা রাতে সবাই এসেছি পাহাড়ে। আজ আমরা কোথাও যাবো না। প্রাণে প্রাণ মিলিয়ে ভিজবো জোছনাবর্ষণে..

পাহাড়ে এলে অন্তরের ভাবুক মনটি জেগে ওঠে। পাহাড় নিজেই একজন ধ্যানী। হাজার হাজার বছর ধরে বুদ্ধের জাতক হয়ে যেনো আমাদের মধ্যে রয়ে গেছে। এই ধ্যানী ভাবটি ব্যক্তির মধ্যেও এসে পড়ে। হোক সে তা অল্প সময়ের জন্য! পাহাড়ের বিস্তৃত বড়ত্বের মধ্যে নিজেদের ক্ষুদ্রতা অনুধাবিত হয়। সংকীর্ণতা-নীচুতা-অহং দূর করে আত্মসচেতনতা যেনো আরও বেশি প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। এজন্যই বারবার পাহাড়ের কাছে ছুটে আসা..

রাত গভীর হয়। হুটোপুটি করে কলাপাতা পেতে খিচুড়ি-মাংসবিলাসে মেতে উঠি সবাই। কারও একটু বেশি বা কম খাওয়া নিয়ে অন্যদের অবধারিত কৌতুক তো ছিলোই। আরও ছিল নানা গল্প। ভাবা যায়, আজ সকালের আগেও কেউ কাউকে সেভাবে চিনতো না, নাগরিক কায়ক্লেশ থেকে দূরে এই পাহাড় চূড়ায় সবাই যেনো সবার আত্মার আত্মীয়। খাওয়া শেষে আবার যে যার মতো। গিটারের টুংটাং, হ্যামোকের দুলুনি আর মন-প্রাণ ছড়িয়ে পড়লো আঁধারে-আকাশে। সবাই যেনো ঘুম ভুলে গেছে। গানের কোরাস যত দূর যায় তারও বেশি দূরে আমাদের দুঃখ-বিষাদ ছেড়ে আসি। গায়ে অন্ধকার জড়িয়ে আমরা বসে থাকি একে অপরের মুখোমুখি। আমাদের মাঝে কেবল জোছনার বন্ধন…

(২য় পর্বে সমাপ্ত)