ব্রাজিলের বিস্ময়



ভূ-পর্যটক আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল
ব্রাজিলের বিস্ময়

ব্রাজিলের বিস্ময়

  • Font increase
  • Font Decrease

ব্রাজিলের নাম শোনেনি এমন লোক পৃথিবীতে খুব কমই পাওয়া যাবে। সেই কবে কোন ছেলেবেলায় পাঠ্যপুস্তকের কল্যাণে পেলের নাম শুনে বড় হয়েছি। পৃথিবীতে ব্রাজিলই একমাত্র দেশ যার সঙ্গে সবচেয়ে বেশী দেশের স্থল যোগাযোগ রয়েছে। চিলি ও ইকুয়েডর ছাড়া দক্ষিণ আমেরিকার সব দেশের সঙ্গে ব্রাজিলের বর্ডার রয়েছে। দেশগুলো হলো- আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া, পেরু, কলম্বয়িা, ভেনিজুয়েলা, গায়ানা, সুরিনাম, ফ্রেঞ্চ গায়ানা। ব্রাজিলের আয়তন ৮৪৫৬৫১০ বর্গ কি.মি., যা বাংলাদেশের চেয়ে ১৫২ গুণ বড়। পৃথিবীতে ৫ম বৃহত্তম। শুধু দেশ হিসাবে তারা বড়ই নয়, আরোও অনেক কিছু রয়েছে যার কৃতিত্ব শুধু ব্রাজিলের।

UNWTO এর আমন্ত্রণে সর্বপ্রথম দক্ষিণ আমেরিকার আজেন্টিনা, ব্রাজিল ও প্যারাগুয়েতে একটি কনফারেন্সে যোগদান করি ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে। কনফারেন্স শেষে তিন মাসে ল্যাটিন আমেরিকার পাঁচটি দেশ আজেন্টিনা, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া ও চিলি ঘুরে আসি। পরবর্তীতে আরো বেশ কয়েকবার দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে। ভবিষৎতে আবারো সুযোগ পেলে ব্রাজিলসহ দক্ষিণ আমেরিকার বাকী দেশগুলো ঘুরে আসার পরিকল্পনা রয়েছে।


বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত রয়েছে ব্রাজিলে। নাম ক্যাসিনো বিচ যা ব্রাজিলের Rio Grand do Sul- এ অবস্থিত। এটি ২১২ কি.মি থেকে ২৫৪ কি.মি বিস্তৃত Longest Uninterrupted sandy seashore in the world এবং এটি গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখেছে ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে। এটি দেখতে বছরে ১৫ লক্ষাধিক পর্যটক আসেন।

ক্যাসিনো বিচের পরেই দীর্ঘতম বিচ হিসেবে রয়েছে Padre Island, Texas, USA, যা ১৮২ কি.মি. এটাকে বলা হয়ে থাকে বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা Drivable Beach। নাইনটি মইল বিচ ১৫১ কি.মি. (৯৪ মাইল) লম্বা। তারপরেই রয়েছে আমাদের কক্সবাজার বিচ যা ১৫০ কি.মি. (৯৩ মাইল)। বিশ্বের দীর্ঘতম নদের নাম নীল নদ (মিশর) এবং তারপরই রয়েছে আমাজন। তবে নীল নদের চেয়ে আমাজনের পানির ধারণ ক্ষমতা বেশী। সারা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশী প্রজাতির গাছ ও প্রাণির দেখা পাওয়া যায় ব্রাজিলে। ব্রাজিল সম্পর্কে ছোট করে লিখা অসম্ভব কারন সৃষ্টিকর্তা ব্রাজিলকে দিয়েছেন দু’হাত ভরে অকৃপনভাবে। আর তাই হয়তো ব্রাজিলিয়ানরা বলে থাকেন, সৃষ্টি কর্তা হচ্ছে ব্রাজিলিয়ান (Deus e brasileiro)।


ব্রাজিলে যাবার শ্রেষ্ঠ সময় হচ্ছে কার্নিভালের সময়। আবহাওয়া বিবেচনায় এপ্রিল-জুন আর আগষ্ট-অক্টোবরও সেরা সময়। তবে মনে রাখবেন, করোনার টিকার পাশাপাশি Yellow Fever টিকা আবশ্যক। যারা আমাজনে যাবার পরিকল্পনা করবেন তাদের জন্য হেপটাইসিস, টিটেনাসের টিকা ও ম্যালেরিয়ার ওষুধ নিয়ে যাওয়া উচিত।

২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে ব্রাজিলের (Foz do lguagu) ফজ দ ইগুয়াজুতে যাই যা ইগুয়াজু ফলস নামে পরিচিত। ফলসটি ২.৭ কি.মি এবং সেখানে ২৫টি একক ঝরনা রয়েছে যা এটিকে New Natural Seven Wonders of the World এ খেতাব এনে দিয়েছে। ল্যাটিন বা দক্ষিণ আমেরিকা বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে এবং আমাদের বাংলাদেশি লোকজন ও খুব বেশী নেই। যদিও গত ১০ বছরে বেশ লোকজন ছিল। কিন্তু করোনা মহামারির বিপর্যয়ে ও অর্থনৈতিক ধসে বেশীর ভাগ লোকজন অবৈধভাবে মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছে। বর্তমানে আনুমানিক ১০০০-১৫০০ বাংলাদেশি রয়েছে ব্রাজিলে।


সাও পাওলো টু রিও

একটা শহর যে এত বড় হতে পারে সাও পাওলো না এলে বিশ্বাসই হতো না। ৪১ মিলিয়ন লোকের বসবাস। সারা বিশ্বের লোক সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের প্রথম ১০টি শহরের একটি। সাও পাওলোতে কামরুলের বাসায় অবস্থান করছি। কামরুলের সাথে ঢাকায় পরিচয় হয়েছিল। কামরুলের বড় ভাই কামাল দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিলে রয়েছে। বিয়ে করেছেন এক ব্রাজিলিয়ানকে। যে অল্প কয়েক জন বাংলাদেশি ব্রাজিলের পাসপোর্ট পেয়েছেন কামাল তার অন্যতম। ব্রাজিলের পাসপোর্টে পৃথিবীর ১৬৯টি দেশে ভিসার ঝামেলা ছাড়াই যাওয়া যায়। বিশ্বের বিশতম শক্তিশালী পাসপোর্ট।

২০১৫ এর দিকে সাও পাওলোতে এক হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি ছিলেন। যদিও সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। কারণ কিছু লোক যেমন প্রতিদিন ব্রাজিলে আসছেন, ঠিক তেমনি কিছু লোক ব্রাজিল ত্যাগ করছেন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে। সাও পাওলো বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম শহর। এয়ারপোর্টের নাম Guarulhos যা শহর থেকে ৩০ কি.মি. পূর্বে অবস্থিত। এতবড়  শহর আরও বড় মনে হতো ভাষাগত সমস্যার কারণে। ব্রাজিলের ভাষা পুর্তগীজ। ল্যাটিন আমেরিকার সব দেশেই স্প্যানিশ ভাষা চলে, শুধু ব্রাজিলে পর্তুগীজ।


এ দেশ আয়তনে যেমন বড়, তেমনি এর খাবার, পোশাক, আবহাওয়া, জীববৈচিত্যও অনন্য। টাইম জোন রয়েছে ৪টি। মজা করে অনেকে বলেন, যখন একজন ব্যক্তি চারটি ঘড়ি পড়ে কোথাও যান তখন বুঝতে হবে তিনি ব্রাজিলে যাচ্ছেন। এ যেনো একের ভেতরে অনেক দেশের মিলিত রূপ।

সাও পাওলোকে অনেকে ডাকেন সাম্পা। ব্রাজিলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইমিগ্র্যান্টদের বসবাস এই সাও পাওলো শহরে। সাও পাওলোর আয়তন ৭৯৪৩ বর্গ কি.মি.।

২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে অনিকের সাথে প্যারাগুয়েতে পরিচয় হয়েছিল এবং বর্তমানে সে ব্রাজিলের সাও পাওলোতে রয়েছে (২০১৫)। অনিকের সঙ্গে দেখা করতে যাই। সে স্প্যানিশ, পর্তুগীজ ভাষায় পারদর্শী। তার ওখানে খায়রুলের সঙ্গে পরিচিত হই। সেও ভালো পর্তুগীজ বলতে পারে। একসময় বাংলাদেশে ভালো ক্রিকেট খেলতো। খায়রুল আমাকে বেশ সময় নিয়ে সাও পাওলোর দর্শনীয় স্থানগুলি ঘুরিয়ে দেখালো।

সাও পাওলোর Liberdade এলাকাটি মূলত জাপানীজ, চাইনীজ ও কোরিয়ানদের দখলে। তবে শহরটির ভিতর ইতালীয়ন প্রভাব অনেক। ৬ মিলিয়ন লোকের রয়েছে ইতালীয়ান ব্যাকগ্রাউন্ড। তবে সংখ্যায় অল্প কিন্তু প্রভাবশালী কমিউনিটির মধ্যে আরব ও ইহুদীদের প্রভাব রয়েছে। যদিও শহরের ৪০ শতাংশ লোক এসেছে ব্রাজিলের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের। তাদের বলা হয় Paulistanos।


পরিশ্রমী হিসেবে সাও পাওলোর লোকদের সুনাম রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, যখন সাও পাওলোর লোকেরা কাজ করে তখন বাকী ব্রাজিলিয়ানরা আরাম করে। আরও বলা হয়ে থাকে, দেশটির ৪৫ শতাংশ উৎপাদনের আয় আসে এই সাও পাওলো প্রদেশ থেকে। সাও পাওলোর অবশ্যই দর্শনীয় স্থান হচ্ছে Avenida Paulista সেখান থেকে হেটেই Ibirapuera এবং Park Centro যাওয়া যায়। Sao Paulo Stock Exchange হচ্ছে বিশ্বের ২য় বৃহত্তম স্টক একচেঞ্জ। পিৎজার জন্যও সাও পাওলো বিখ্যাত। Sao Paulo is the second largest consumer of pizza in the world। ৩০৫ বিলিয়ন ডলারের স্টক একচেঞ্জ হয় প্রতিদিন সাও পাওলোতে। খাইরুলের সাথে পাউলিস্তার রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছি। বিশাল বড় রাস্তা পথচারীদের হাঁটার জন্য। দুপাশে নয়ন জুড়ানো সুউচ্চ অট্রালিকা আকাশ পানে চেয়ে আছে। কিছু জায়গায় দেখলাম সুভ্যেনির নিয়ে রাস্তায় বিক্রি করছেন কিছু লোক, পর্যটক সমাগম রয়েছে এই এলাকটিতে। ব্রাজিলিয়ান বিখ্যাত আর্কিটেক্ট অস্কার নেইমার একটি স্থাপত্য দেখলাম। অস্কার নেইমা একজন পৃথিবী বিখ্যাত আর্কিটেক্ট। সারা ব্রাজিল জুড়েই যার স্থাপত্য নির্মাণ শিল্পীর নিপুন কাজ রয়েছে। সাও পাওলোতেই তার ৮/১০টি কাজ রয়েছে এবং সম্প্রতি আরেকজন বিখ্যাত আর্টিস্ট Eduardo kobra যিনি Street Art এর জন্য বিখ্যাত, সাও পাওলোর সন্তান এবং ব্রাজিল ছাড়াও ৫টি মহাদেশে ৩০০০ মুরাল তৈরি করেছেন। পাউলিস্তার রাস্তায়ও কোবরার তৈরি করেছেন ওস্কার নেইমারের ম্যুরাল। খুবই আকর্ষণীয়। সারা ব্রাজিলের রাস্তায় প্রচুর Street Printing এবং গ্রাফিতি আর্ট।  Banksy নামের একজন ব্রিটিশ আর্টিস্ট এই গ্রাফিতি আর্টকে জনপ্রিয় করেন।


১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দে ব্রাজিল স্বাধীনতা লাভ করে পর্তুগাল থেকে। বর্তমানে রাজধানী ব্রাসিলিয়া, এর আগে রাজধানী ছিল রিও ডি জেনেরিও এবং সালভাদর। ব্রাজিলে যত আন্তজাতিক কোম্পানির অফিস রয়েছে তার ৬৩ শতাংশ সাও পাওলোতে। সাও পাওলো বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল শহরগুলির একটি। অভিজাত শপিং বা উইনডো শপিংয়ের জন্য যেতে পারেন Jardins, JK শপিং মল ও Iguatemi তে।

ব্রাজিলিয়ানরা ফুটবল পাগল জাতি আর তাইতো সাও পাওলো শহরে রয়েছে ফুটবলের জাদুঘর। ফুটবল প্রেমীদের জন্য আবশ্যই দর্শনীয় স্থান। ১৯৫০ ও ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হয় এই শহরে। ফর্মুলা ওয়ান ব্রাজিলের অন্যতম জনপ্রিয় স্পোর্টস। তারা তিনবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান হয়েছে রেসে।

এত বড় যে, আনায়াসে হারিয়ে যাওয়া যায় Sao Paulo Tiete Bus টার্মিনালে। বিশ্বের ২য় বৃহত্তম বাস টার্মিনাল। খায়রুল আমাকে নিয়ে সেই বাস টার্মিনালে। সেখান থেকে রিওর কাছাকাছি পারিবা দ্যা সল যাব। দুরত্ব ৪২৩ কি.মি. যেতে ৬/৭ ঘণ্টা লাগবে। পারিবা দ্যা সেল এ রাখাল বাবু নামে এক বাংলাদেশি থাকেন। তার কাছে যাব। রাখাল মালয়েশিয়া থেকে ব্রাজিলে এসেছে। একটি গ্লোভস তৈরির কারখানাতে চাকুরি করে। বেশ ভাল অবস্থানে রয়েছে। রাখাল বলে দিয়েছিলো। রাতে কামরুল ও তার রুমমেট রুমান আমাকে মসজিদ পার্কের সামনে থেকে ট্যাক্সিতে উঠিয়ে দিলো।

   

রূপময় বর্ষায় খুলনা নগরীর সৌন্দর্য



ডিস্ট্রিক করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, খুলনা
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

চলছে বর্ষাকাল। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ঋতু বর্ষা। খুলনায় তীব্র তাপদাহের পর টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিতে নগরী যেন এক নতুন রূপে সেজে উঠেছে। প্রতিটি গাছ, পাতা আর ফুল যেন ফিরে পেয়েছে নতুন প্রাণ। রাস্তাঘাট, পার্ক আর বাগানগুলো সবুজে ভরে উঠেছে।

প্রকৃতি সেজেছে নতুন রূপে। রাস্তা দিয়ে হাঁটলেই আপনার চোখ আটকে যাবে সেই সব রঙ বেরঙের ফুলে। বৃষ্টির জলে ধুয়ে-মুছে ঝকঝকে হয়ে উঠেছে সবকিছু, যা মানুষের মনকে প্রফুল্ল করে তুলছে।


গাছের পাতায় জমে থাকা জলবিন্দুগুলো রোদ্দুরে রঙধনুর মতো ঝিলমিল করছে। ফুটপাতের ধারে ধারে ফুটে ওঠা রঙ বেরঙের ফুলগুলি যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক একটি ছবিতে পরিণত হয়েছে। লাল, নীল, হলুদ, বেগুনিসহ সব রঙ মিলিয়ে যেন এক স্বপ্নীল দৃশ্য। গাছের নিচে জমে থাকা জলকাদায় শিশুদের কাদামাখা খেলাও নতুন রঙ যোগ করেছে নগরীর এই নবরূপে।

মানুষের মনে এই পরিবর্তন যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। কাজের ব্যস্ততার ফাঁকে একটু সময় বের করে মানুষজন বিকেলে পার্কে ঘুরতে বেরিয়েছে। শিশুদের হাসি-খুশি মুখ আর তরুণ-তরুণীদের আড্ডায় মুখরিত চারপাশ। প্রিয়জনের সঙ্গে হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করছে তারা।


নগরীর এই নবরূপ শুধু মানুষকে নয়, পশু-পাখিকেও নতুন উদ্যমে ভরিয়ে তুলেছে। গাছের ডালে ডালে পাখির কলরব আর ভেজা ভেজা গন্ধ মিশে পরিবেশকে আরও মধুর করে তুলেছে। পাখিরা যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে, তাদের ডাকে প্রাণের সুর বাজছে।

নগরীর প্রতিটি কোনে এখন নতুন কাহিনী। পুরনো দেয়ালেও যেন নতুন রঙের ছোঁয়া লেগেছে। বৃষ্টির পরে সেই মাটি ভেজা গন্ধে মনে হয় যেন এক টুকরো গ্রাম উঠে এসেছে শহরের বুকে।

বৃষ্টি যে খুলনা মহনগরীর এমন পরিবর্তন এনে দিতে পারে, তা হয়তো অনেকেই ভাবেনি। এই নবরূপ শুধু নগরবাসীর নয়, পুরো প্রকৃতির এক মিলিত উৎসব। এ যেন এক নতুন সকাল, এক নতুন শুরু। প্রতিদিনের ব্যস্ততায়, ধুলো-ময়লার মাঝে হারিয়ে যাওয়া সৌন্দর্য এখন আবার ফিরে এসেছে, যা দেখে মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।


প্রকৃতির এই অপরূপ রূপের প্রশংসা করতে করতে সময় কেটে যায় নিমিষেই। নগরী যেন নতুন করে বাঁচতে শিখেছে। ফের শুরু হয়েছে তাপদাহ। তারপরও দুদিনের এই বৃষ্টি শেষে নগরী যেন রূপে রঙে আরও বেশি সুন্দর, আরও বেশি প্রিয় হয়ে উঠেছে সবার কাছে।

;

শুভ জন্মতিথি মহীয়সী কবি সুফিয়া কামাল



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
কবি সুফিয়া কামাল

কবি সুফিয়া কামাল

  • Font increase
  • Font Decrease

সুফিয়া কামাল কেবল একটি নাম নয়, এ যেন পরিবর্তনের জোয়ার। বাঙালি নারীর অন্ধকার জীবনে অধিকারের একটি মশাল আলোকিত ব্যক্তি ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। এখনকার নারীবাদী দেখলে অধিকাংশ মানুষ কেমন আতঙ্ক প্রকাশ করে নাক সিটকায়! তবে প্রকৃত নারীবাদী, যারা হাজার হাজার নিপীড়িত নারীকে শোষণ ও অত্যাচার থেকে বাঁচিয়ে স্বাধিকারে সোচ্চার করতে সাহায্য় করেছেন তেমন নারীবাদীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কবি সুফিয়া। নারী প্রগতি আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তি গড়ে এবং একাধারে আন্দোলনের অংশ ছিলেন তিনি। অনন্য ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এই মহীয়সী নারীর জন্মতিথি আজ।

১৯১১ সালের ২০ জুন (১০ আষাঢ় ১৩১৮ বঙ্গাব্দ) বরিশালের শায়েস্তাবাদে জন্মগ্রহণ করেছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। আজ (বৃহস্পতিবার) আমাদের দেশের ই ‘নারী জাগরণের অগ্রদূত’ মহীয়সী এই নারীর ১১৩ তম জন্মবার্ষিকী। ‘জননী সাহসিকা’ হিসেবে খ্যাত কবি সুফিয়ার ছোটবেলা কেটেছিল তার মাতুতালয়ে। করি জন্মের পরপরই তার বাবা সাধক অনুসারী হয়ে সংসার ত্যাগ করেন। তারপর থেকে মা সাবেরা খাতুনের সঙ্গে তার নানাবাড়ি শায়েস্তাবাদের নবাব পরিবারে থাকার সময়ই তার হাতেখড়ি হয়। নারীশিক্ষার প্রথা প্রচলিত না থাকায় অন্দরেই অন্য শিশুদের সাথে তিনি উর্দু, আরবি, ফারসি ভাষা শিখতেন। পরবর্তীতে একটু বড় মায়ের কাছেই তিনি বাংলা শিখতে শুরু করেন। কে জানতো,পরবর্তীতে এই বাংলার সাহিত্য তারই হাত ধরে বিশাল এক যাত্রা সম্পন্ন করবে!

রক্ষণশীল পরিবারে বড় হওয়ায় তার ব্যক্তিত্ব ছিল বিশেষ। মাত্র ৭ বছর বয়েসে তিনি বেগম রোকেয়ার সাক্ষাৎ পান কলকাতায়। তবে পারিবারিক কারণেই সুযোগ পেয়েও বেগম রোকেয়ার ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল’ স্কুলে ভর্তি হওয়া হয়নি। তবে স্কুলে কখনো যাওয়া না হলেও ছোটথেকেই তার মেধা সুপ্ত রাখার উপায় ছিল না। যদিও মাত্র ১২ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়ে যায় মামাতো ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সঙ্গে। তবে স্বামীর সহযোগিতায় বাংলা সাহিত্য চর্চার পথ সুগম হয় কবির। স্বামী নেহাল ছিলেন একজন নারীশিক্ষা সমর্থক এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তাচেতনাসম্পন্ন ব্যক্তি। পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়েও তিনি স্ত্রী সুফিয়াকে পত্রিকায় লেখা ছাপানোর সুযোগ করে দিয়ে সাহায্য করেন।      

কবি সুফিয়া কামাল

১৯২৬ সালে তার প্রথম কবিতা বাসন্তী ছাপা হয় সওগাত পত্রিকার চৈত্র সংখ্যায়। এরপর আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সাঁঝের মায়া, কেয়ার কাঁটা, মায়া কাজল, মন ও জীবন, প্রশস্তি ও প্রার্থনা, উদাত্ত পৃথিবী, ইতল-বিতল, দিওয়ান, সোভিয়েতে দিনগুলি, অভিযাত্রিক, মৃত্তিকার ঘ্রাণ, একাত্তরের ডায়েরী, নওল কিশোরের দরবারে, একালে আমাদের কাল- সহ আরও অসংখ্য সাহিত্যকর্মের সৃষ্টি করেছেন তিনি। কলকাতায় থাকার সময় তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র, বেগম রোকেয়া নানান কিংবদন্তী সাহিত্যিকের সান্নিধ্যে আসেন। তার চিন্তা-চেতনা এবং সাহিত্যের অনুপ্রেরণা হিসেবে সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগান তিনি।

জীবনের মাঝামাঝি স্বামী নেহাল হোসেনের হঠাৎ মৃত্যুতে (১৯৩২ সাল) বেসামাল হয়ে পড়েছিলেন কবি সুফিয়া। তখন তিনি কলকাতা কর্পোরেশন স্কুলে শিক্ষকতা এবং বেগম পত্রিকার সম্পাদনা করতে শুরু করেন একাধারে। এর কিছু বছর পর তিনি ১৯৩৯ সালে কামালউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে দ্বিতীয়বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন কবি এবং এখানে সাহিত্যচর্চা ও নারীস্বার্থে কাজ চালিয়ে যান। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এমনকি ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধকরণের প্রতিবাদে তিনি পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধেও যান।

কবি সুফিয়া কামাল

তার গঠিত নারী সংগঠন ১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলনে সমাবেশ ও মিছিরে অংশগ্রহণ করে, যার মূলহোতা ছিলেন কবি সুফিয়া নিজেই। মুক্তযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও পাকিস্তানী গোয়েন্দাদের নজর ফাঁকি দিয়ে তিনি সাহসিকতার সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করে গেছেন। সুযোগ পেয়েও দেশের বাইরে চলে যাওয়াকে প্রত্যাখ্যান করে, মৃত্যুর সম্ভাবনাকে একপাশে ঠেলে সরিয়ে অনবরত ষোলআনা দেশপ্রেমের প্রমাণ দিয়ে গেছেন।        

যুদ্ধের পরও তিনি আমৃত্যু বাংলা সাহিত্য এবং নারী অধিকার উন্নতির লক্ষ্যে সংগ্রাম ও সাহায্য করে গেছেন। বাঙালি আজীবন মহীয়সী এই নারীকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। যতদিন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য রয়েছে,  কবি সুফিয়া কামালের কৃতিত্ব অমলিন রয়ে যাবে।

;

চিড়িয়াখানায় বাঘদের খুনসুটি আর ভালোবাসার একান্ত মুহূর্ত



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
একে অপর আদর করে দিচ্ছেন দুই বাঘ/ছবি: নূর এ আলম

একে অপর আদর করে দিচ্ছেন দুই বাঘ/ছবি: নূর এ আলম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঈদের ২য় দিন; মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। রাজধানীজুড়ে বিশ্রি রকমের ভ্যাপসা গরম। এর মধ্যেও ঢাকার চিড়িয়াখানা পশু-প্রাণী দেখতে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। মা-বাবার হাত ধরে উৎসুক শিশুরা পশু-প্রাণীর খাঁচায় খাঁচায় উঁকি দিচ্ছে।

চিড়িয়াখানাজুড়ে দর্শনার্থীদের পদচারণা দেখে খাঁচাবন্দি বাঘগুলোও যেন উচ্ছ্বসিত। খাঁচার ভেতরে সবুজ ঘাসে একে অন্যের সঙ্গে মেতে উঠেছে খুনসুটি ও খেলাধুলোতে। একের অন্যটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। একে অপরকে খেলাচ্ছলে কামড়ে ধরছে। কেউ আবার অদূরে চুপটি করে বসে অন্যদের খুনসুটি দেখছে।

চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের মতে, বাঘ-বাঘিনীদের এমন দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। তবে ঈদের পরের দিন সেই উচ্ছল বাঘদের খেলার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেছেন বার্তা২৪.কম এর ফটো এডিটর নূর এ আলম।

সঙ্গী ছাড়া হতে চাচ্ছে না বাঘটি, তাই তো আঁকড়ে দিচ্ছে পা টেনে ধরে/ছবি: নূর এ আলম


আদরে ভরিয়ে দিচ্ছে একে অপরকে, আর ভালোবাসার এই খুনসুটি চেয়ে দেখছে আরেকটি বাঘ/ছবি: নূর এ আলম


চিড়িয়াখানায় বাঘদের এমন খেলার দৃশ্য তেমন একটা দেখা যায় না/ছবি: নূর আলম


খুনসুটি আর মায়ার আলিঙ্গন/ছবি: নূর এ আলম


চিড়িয়াখানায় বাঘটি আয়েশি মুডে নিরিবিলি সময় কাটাচ্ছে/ছবি: নূর এ আলম


চিড়িয়াখানা পশুদের মধ্যে বাঘ অন্যতম আকর্ষণ, তাই তাদের উচ্ছল চলাফেরা বেশ উপভোগ্য ছিল/ছবি: নূর এ আলম


;

সরেজমিন কৌশল্যা: বদলে যাচ্ছে গ্রাম



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
সরেজমিন কৌশল্যা: বদলে যাচ্ছে গ্রাম

সরেজমিন কৌশল্যা: বদলে যাচ্ছে গ্রাম

  • Font increase
  • Font Decrease

কৌশল্যা, দাগনভূঁইয়া, ফেনী থেকে: "অবারিত মাঠ গগন ললাট, চুমে তব পদধূলি; ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়, ছোট ছোট গ্রামগুলি", রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার গ্রাম এখন বইয়ের পাতায় আছে, বাস্তবে নেই। ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় গ্রামগুলো এখন পরিবর্তমান। আধুনিক জীবনের ছোঁয়ায় বদলে গেছে চিরায়ত গ্রামের চিরচেনা দৃশ্যপট।

"গ্রামের ফসলের মাঠ কমছে। টিনের বাড়িঘর হারিয়ে যাচ্ছে। সর্বত্র পাকা সড়ক। যান্ত্রিক যান চলে আসে ঘরের দুয়ারে। বিদ্যুৎ সহজলভ্য। জোনাকির আলোজ্বলা নিঝুম গ্রাম খুঁজে পাই না আমরা", বললেন জামাল স্যার। তার সাথে কথা হচ্ছিল কৌশল্যা গ্রামের কাজী বাড়ির দহলিজে।

কৌশল্যা গ্রামটি বেশ চমৎকার। ভৌগোলিক দিক থেকেও কৌশলপূর্ণ। ফেনী জেলা সর্বউত্তরের গ্রাম এটি। তার পশ্চিমে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ও নাঙলকোট উপজেলার সীমান্ত। দক্ষিণে লাগোয়া নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ি ও সেনবাগ উপজেলা।


বুধবার (১৯ জুলাই) ভোরে চট্টগ্রাম থেকে গাড়ি অতিদ্রুতই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী-মহিপাল পয়েন্টে চলে এসেছে। মহিপাল থেকে ডানের রাস্তা গিয়েছে ফেনী শহরে। বামে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর। এ পথে কিছুদূর এগিয়ে দাগনভূঁইয়া। তারপর উপসড়ক ধরে কৌশল্যা গ্রাম। পথেঘাটে ঈদের আমেজ থাকায় যানজটের বালাই নেই। আমরা খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছেছি ছুটির ঢিলেঢালা ট্রাফিক পেরিয়ে।

গ্রামে এসেও অবাক হতে হলো। গ্রাম কোথায়? পাকা সড়ক, পাকা বাড়ি, মাঝেমাঝে কিছু সবুজ ধানখেত। কিছুক্ষণ পর পর দামী গাড়ি ছুটে যাচ্ছে গ্রামে ভেতর দিয়ে।

"এই গ্রামের প্রতিটি ঘরে প্রবাসী আছেন। চাকরিজীবীও কম নন। ঈদের ছুটিতে তারা সপরিবারে বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। সবারই নিজের কিংবা রেন্টাল কার আছে। সোজা হাজির হচ্ছেন বাড়ির উঠানে", বললেন 'ফেনী রিডার্স ফোরাম'-এর এক সদস্য।

Caption

'ফেনী রিডার্স ফোরাম' নিয়মিত স্টাডি সার্কেল করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী নিয়ে। সদস্যরা সকলেই স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর। চাকরি ও ব্যবসায় জড়িত। অবসরে পড়াশোনার অভ্যাস চালিয়ে রেখেছেন।

গ্রামে আরো কয়েকজন শিক্ষিত যুবকের সঙ্গে কথা হলো। অধিকাংশই চাকরিজীবী। ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ফেনীতে চাকরি করেন না। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাড়ি আসেন। তাীা জানালেন, "মানুষের আয়-রোজগার বেড়েছে। জমিজমার দামও বাড়ছে। অনেকেই পাকা বাড়ি করায় ফসলী জমি কমছে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না বাড়ায় শিক্ষার হার বাড়ছে না"।

কৌশল্যা গ্রামের উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো সবুজায়ন। নানা পরিবর্তনের পরেও পুরো গ্রাম সবুজে ছাওয়া। প্রায়-প্রতিটি বাড়ির আঙিনা ও খোলা জায়গা শাকসবজি চাষ করা হচ্ছে। হাঁস-মুরগী পালিত হচ্ছে প্রত্যেক বাড়িতে।


গ্রামের সাংস্কৃতিক জীবন পুরোপুরিভাবে গ্রাস করেছে টিভি চ্যানেলগুলো। পথে বের হলেও টিভির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। "খেলার মাঠ নেই গ্রামে। ফসল কাটা হলে ক্ষেতগুলোতে ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করে। বাকি সময় টিভি বা মোবাইলে ব্যস্ত থাকে তার", বললেন জামাল স্যার।

মেঘলা আকাশে টিপটিপ বৃষ্টিতে গ্রাম ঘুরে ফিরে আসার সময় একটি ট্রানজিশনাল পিকচার নিয়ে এলাম। গতানুগতিক গ্রাম ক্রমশ আধুনিকায়নের পথে পাড়ি দিচ্ছে এক তুমুল সন্ধিক্ষণ। সমাজ বদলের ধারায় হয়ত অচিরেই আদি গ্রামের জায়গা দখল করবে আধুনিক নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনা। যুক্ত হবে নতুন অনেক কিছু। আবার হারিয়েও যাবে ঐতিহ্যবাহী অনেক বিষয়ও। এই বদলের সবটাই ভালো হবে, এমন নয়। ভালোগুলোকে ধরে রাখার মাধ্যমে পালাবদলকে গ্রহণ করতে পারলেই হবে প্রকৃত উন্নয়ন। নইলে বদল হবে, উন্নয়ন হবে না।

;