বাঙালি ছাড়াও বাংলা ভাষায় কথা বলে যারা



প্রমা কোয়েল, ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
সিয়েরা লিওয়নের শিশুদের কণ্ঠে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’

সিয়েরা লিওয়নের শিশুদের কণ্ঠে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসের সুবর্ণক্ষণ আজ। ২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালির 'জাতীয় শহীদ দিবস 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বিশ্বে। একদিকে, যেমন এই দিন আমাদের জয়ের প্রতীক, অপরদিকে স্মরণ করিয়ে দেয়, ভাই হারানোর বেদনা! তবে স্বস্তি এই যে, বাঙালি সন্তানদের বুকের রক্ত বৃথা যায়নি। তাদের সম্মান আজ বিশ্বব্যাপী!

২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠেছে বাংলার ইতিহাস। কথা বলার ভাষা যে, ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার মর্মার্থ অনুধাবন করে আজকের দিনে বিশ্বের সব মানুষ তাদের মাতৃভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। দিন দিন বাংলা ভাষার প্রচার বেড়েই চলেছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে অন্যান্য বিদেশি ভাষার সঙ্গে বাংলা নিয়েও পড়াশোনা করছেন শিক্ষার্থীরা।   

ছোটবেলায় মায়ের কাছে শেখা প্রথম বুলি হিসেবে মুখে ফুটে ওঠে মাতৃভাষা। প্রথম সেই স্মৃতির সঙ্গে জড়িত কত আবেগ, কত ভালোবাসা! আধো আধো ভাষায় প্রথম কথা বলার যে স্মৃতি, তা বড়ই আবেগের! মানুষ মনের ভাব প্রকাশ করে কথোপকথনের মাধ্যমে। বিভিন্ন দেশের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলেন। নিজের মায়ের থেকে আয়ত্ত করা ভাষার মতো স্বাচ্ছন্দ্য অন্য কোনো ভাষায় পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষই বাংলা ভাষায় কথা বলেন। এছাড়া দেশে রয়েছে ৪৫টি নৃ-ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ। তারা নিজেদের মাতৃভাষা ছাড়াও বাংলা ভাষায় কথা বলেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ সংলগ্ন ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও বাংলা বা একই গোত্রীয় ভাষায় কথা বলেন অনেকেই। শুধু তাই নয়, ত্রিপুরা, আসাম, আন্দামান-নিকোবর  দ্বীপপুঞ্জ, ঝাড়খণ্ড, বিহার, মেঘালয়, মিজোরাম, উড়িষ্যার মতো রাজ্যগুলোতেও অনেকেই বাংলা ভাষায় কথা বলেন।

 

যেমন, আসাম রাজ্যের দক্ষিণাংশেও বাংলায় কথা বলার প্রবণতা দেখা যায়। ভারতীয় কয়েকটি দ্বীপে, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের অধিকাংশ অধিবাসী বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকেন। এর মধ্যে অন্যতম আন্দামান এবং নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ।

উড়য়া এবং অসমিয়া ভাষা সরাসরি বাংলা ভাষা না হলেও এসব ভাষাকে ভগিনী বা বোন বিবেচনা করা হয়। কারণ, এই সব ভাষা একই উৎস, ইন্দো-ইউরোপ থেকে এসেছে। সময়ের বিবর্তনে প্রথমে উড়িয়া এবং পরে অসমিয়া বাংলা থেকে আলাদা হয়ে যায়। তবে এখনো এদের মধ্যে পর্যাপ্ত সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়।

এই সব ভাষাভাষীর লোক অনায়াসে বাঙালিদের সাথে কথোপকথন করতে পারেন। কোনো পক্ষেরই অন্য পক্ষের মন্তব্য বুঝতে বিশেষ অসুবিধা হয় না। এই জন্যই মানুষ বিশ্বাস করেন, বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে পুরনো নিদর্শন ‘চর্যাপদ’-এর ভাষা থেকে অন্যান্য ভাষার সূত্রপাত হয়েছে। অসমিয়া এবং উড়িয়া ভাষা সাহিত্যের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয় 'চর্যাপদ'কে। 

তবে বাংলায় কথা বলা মানুষ শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়, বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সূত্রে বাঙালি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষারও বিস্তার বেড়েছে। বিশ্ববাসী জেনেছে বাংলা ভাষা এবং এর ইতিহাস। অনেকেই এ ভাষার প্রতি মুগ্ধ হয়ে আকৃষ্ট হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হরহামেশাই দেখা যায়, অবাঙালিদের বাংলা দক্ষতা।

বিশ্বের প্রতিটি দেশেই নিজের ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করে আজকের দিনে। তবে এশিয়ার বাইরেও একটি দেশে বিশেষ করে বাংলা ভাষার প্রতি অশেষ শ্রদ্ধার নিদর্শন মেলে। অনেকেই হয়ত জানেন না, সূদূর পশ্চিম আফ্রিকার এক দেশের মানুষও বাংলাকে ভালোবাসেন।

সিয়েরা লিওনে অনেক মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। দূরত্ব মাপতে গেলে অঙ্কের হিসাবে বাংলাদেশ থেকে ১৫ হাজার কিলোমিটার দূরে তাদের বসবাস। তবে সম্মানের সীমানা পরিমাপ করতে গেলে দেখা যায়, কোনো দূরত্বই দূরত্ব নয়! আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওন ভাষার দিক থেকে বাঙালিদের অনেক কাছের। একই ভাষায় কথা বলায় একে অপরের প্রতি ভাতৃত্ববোধ জাগ্রত হয়।

এর ইতিহাস বাঙালি হিসেবে আমাদের জন্য গর্বের! ১৯৯১ সাল থেকে ২০০২ অবধি দরিদ্র এই দেশে গৃহযুদ্ধ চলছিল। তাদের সেই করুণ সময়ে জাতিসংঘ থেকে শান্তিবাহিনী পাঠানো হয়। তাদের মধ্যে সিংহভাগই ছিলেন বাঙালি। নিজেদের জীবন বাজি রেখে বাঙালি সৈন্যদের প্রাণপণ চেষ্টায় সামলে ওঠে সিয়েরা লিওন। একই সঙ্গে বাংলা ভাষার ইতিহাস সম্পর্কে অবগত হয় সে দেশের সাধারণ জনগণ। সেই থেকেই তাদের মুখেও ফুটে ওঠে বাংলা বুলি।

ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ভাষার হওয়া সত্ত্বেও বাংলাকে আপন করে নিয়েছে, এই দেশের জনগণ। ভাষা তাদের কণ্ঠে ফুটে ওঠে মধুর ধ্বনির, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো, একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি?’     

   

বৈশাখের প্রথম বৃষ্টিতে সিক্ত রাজধানী



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

রুদ্র বৈশাখ তার নিয়ম অনুযায়ী প্রথম দিন থেকেই সূর্যের পূর্ণ তাপে জ্বলছিল। ভরদুপুরে ঘরের বাইর হওয়াই দায়! মাথার উপর প্রচণ্ড উত্তাপ যেন ঘামের জলপ্রপাত সৃষ্টি করে।

‘দুপুরের ভেপসা গরম, ঘেমে শরীর তীর-ঘাম/তবু ধানকাটায় ব্যস্ত কৃষক, নেই কারো বিশ্রাম/এমন ক্ষণে ঈশান কোণে মেঘ-বিজলীর গর্জন/অতঃপর স্বস্তির নিঃশ্বাস নামলো প্রতিক্ষার বর্ষণ।’ অবশেষে মঙ্গলবার দিনভর তীব্র তাপদাহের পর কবিতার এই লাইনগুলোর মতোই দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই রাজধানীর বুকে নামল ঝুম বৃষ্টি। শান্তির বৃষ্টিফোঁটায় সিক্ত হলো রাজধানীর মাটি।     


আর সেই সঙ্গে ৩রা বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দের প্রথম বৃষ্টিতে উল্লাসে মেতে উঠল নগরবাসী। 

বৃষ্টির ঝুম ঝুম ফোঁটায় যেন এক অনন্য নূপুরধ্বনির তরঙ্গ তুলেছে প্রকৃতি। ঘাম, গরম, অস্বস্তি যে খরায় পুড়ছিল মানুষের মন, তাতে শান্তির অমৃতধারা নেমেছে সূদুর আকাশ থেকে। তবে শুধু বৃষ্টি নয়, সঙ্গে জোড় বেঁধেছে দমকা হাওয়া। বৈশাখের এক অনস্বীকার্য অংশ হলো কাল বৈশাখী ঝড়। বৈশাখে আসন্ন সেই ঝড়ের ইঙ্গিতই বয়ে আনলো পাগলাটে বাতাস।


এর আগে, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর দিয়ে ৮০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। মঙ্গলবার (১৬ এপ্রিল) দুপুর ২টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দর সমূহের জন্য এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

পূর্বাভাসে বলা হয়, রাজশাহী, ঢাকা, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া এবং কুমিল্লা অঞ্চলের ওপর দিয়ে পশ্চিম অথবা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে বৃষ্টি অথবা বজ্রবৃষ্টিসহ অস্থায়ীভাবে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।

এসব এলাকার নদীবন্দর সমূহকে ২ নম্বর নৌ হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

;

কুরচি ফুল, দেশি হয়েও আজ ভিনদেশি



মবিনুল ইসলাম, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট বার্তা২৪.কম ঢাকা
ছবি: বার্তা ২৪.কম

ছবি: বার্তা ২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

সন্ধ্যার আবছা আলোয় ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তীব্র একটা সুগন্ধে মনটা ভাল হয়ে গেল। বুঝতে পারলাম এটি একটি ফুলের গন্ধ, যারা রাত্রে সুগন্ধ ছড়ায়। অন্যান্য ফুলের গন্ধের চেয়ে এর গন্ধটা একটু যেন বেশি তীব্র। খুঁজতে লাগলাম গাছটিকে। অবশেষে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সামনে কোর্টস গার্ডেনে গাছটিকে খুঁজে পেলাম। গাছটিকে চিনে রাখলাম।

পরদিন দিনের আলোয় গাছটিকে ভাল করে লক্ষ্য করলাম। একটু অপরিচিত ঠেকলো। ভাবলাম বিদেশি কোনো ফুল গাছ হবে হয়তো। গাছটি সনাক্ত করতে গাছ, ফুল আর পাতার ছবি তুলে পাঠালাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিনকে। তিনি দেখে সাথে সাথেই জানালেন গাছটির নাম কুরচি। আমাদের দেশীয় উদ্ভিদ।

ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সামনে কোর্টস গার্ডেনে কুরচি গাছ

উইকিপিডিয়াতে গাছটির আদি বাসস্থান মধ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারতীয় উপমহাদেশ, ইন্দোচীন এবং চীনের কিছু অংশের নাম লেখা রয়েছে।

ড. জসীম বলেন, কুরচি আমাদের দেশীয় উদ্ভিদ। আমরা এটি রিপোর্ট করার আগেই হয়তো আফ্রিকা কিংবা অন্য কোনো স্থান হতে রিপোর্টিং হয়ে গেলে সেটি ওই স্থানের আদি উদ্ভিদ হয়ে যায়। শুধু কুরচি নয় এমনিভাবে আমাদের অনেক দেশীয় উদ্ভিদ বিদেশি হয়ে গেছে। অথচ আমাদের প্রাচীন আয়ুর্ব্বেদ শাস্ত্রে ও সাহিত্যে কুরচির উল্লেখ আছে।

তিনি আরও বলেন, কুরচি গাছের স্বাভাবিক উচ্চতা ১০ থেকে ২০ ফুট। ফুল অনেকটা রঙ্গন ফুলের মতো, নিচের অংশ নলাকৃতি এবং উপরের অংশ মুক্ত পাপড়িতে ছড়ানো। পাঁচটি পাপড়ির মুক্ত অংশ ঈষৎ বাঁকানো, বর্ণ দুধসাদা এবং তীব্র সুগন্ধি কিন্তু মধুর।

ড. জসীম আক্ষেপ করে বলেন, দেখতে সুন্দর ও তীব্র সুগন্ধিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও বাগানীদের কাছে শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদ হিসেবে তেমন কদর পায়নি। ফলে একসময় এ গাছ যত্রতত্র চোখে পড়লেও এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও মধুপুরের শালবনে প্রচুর কুরচি গাছের দেখা মেলে। ঢাকায় রমনা উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানেও কুরচি গাছ আছে।

সুগন্ধে ভরা কুরচি ফুল গাছ

কুরচির ঔষধিগুণ সমন্ধে তিনি বলেন, পুরো কুরচি গাছটিই ঔষধি গুণে ভরা। কুরচি গাছের বাকল ডায়রিয়া ও পাতলা পায়খানার মহৌষধ। হাঁপানি রোগে শিকড়ের রস দারুণ উপকারী। কোষ্ঠকাঠিন্য, প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া, কৃমি রোগ ও মুখের ঘায়ে এর শিকড়, পাতা ও বাকল খুব কার্যকর। তবে এটি ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়ার উপদেশ দেন তিনি।

কুরচি অ্যাপোসাইনেসি পরিবারের একটি ক্ষুদ্র পত্রমোচী মাঝারী বৃক্ষ। পাহাড়-পর্বতে এই গাছ হরহামেশাই দেখা যায় বলে হয়তো এর অন্য নাম গিরিমল্লিকা। এ ছাড়া কুরচি গাছটি কুটজ, ইন্দ্রযব, ইন্দ্রজৌ, বৎসক, কলিঙ্গ, প্রাবৃষ্য, শত্রুপাদপ, সংগ্রাহী, মহাগন্ধ, কোটিশ্বর নামেও পরিচিত। এর নরম কাঠ থেকে পুতুল ও খেলনা তৈরি হয়।

;

শহুরে হস্তশিল্প প্রেমীদের সৌখিনতার রাজ্য দোয়েল চত্বর

  ‘এসো হে বৈশাখ’



গুলশান জাহান সারিকা, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট বার্তা২৪.কম
শহুরে হস্তশিল্প প্রেমীদের সৌখিনতার রাজ্য দোয়েল চত্বর

শহুরে হস্তশিল্প প্রেমীদের সৌখিনতার রাজ্য দোয়েল চত্বর

  • Font increase
  • Font Decrease

শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যের অংশ হয়ে বাঙালির জীবনের সাথে মিশে আছে নানান হস্তশিল্প। আবহমান বাংলা ও বাঙালির জীবন বৈচিত্র্যের সাথে জড়িয়ে আছে কারুশিল্প, মৃৎশিল্প। এসব কুটির শিল্প শুধু সৌখিন হাতের কারুকাজই নয়, এগুলো যেন বাঙালির জীবনের গল্প বলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের বিপরীতে শিশু একাডেমির পাশে দোয়েল চত্বরে সারা বছরই চলে হস্তশিল্প মেলা। সারি সারি বাহারি কারুকাজের নানান হস্তশিল্পের পসরা সাজিয়ে বসেছে দোকানিরা। ছোট- বড় মাটির ফুলদানি, টব, ওয়ালমেট, কলমদানি, মাটির তৈরি হাতি, ঘোড়া, ব্যাংক, প্লেট, বাটি, গ্লাস, চামচ, সহ দেওয়াল ও ঘর সজ্জার জিনিস মেলে এখানে। সামনে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে মাটির হাড়ি কলসিতে চড়ছে নতুন রঙ। 

দোকানগুলোতে দেখা যায় পুরোদস্তুর বাঙ্গালিয়ানার ছাপ। মাটির তৈরি হরেক রকম জিনিস, পোড়ামাটির টেরাকোটার কাজ, কাঠের খোঁদায় করা বিভিন্ন কারুকার্য। শহুরে হস্তশিল্প প্রেমীদের জন্য সৌখিনতার রাজ্য যেন রাজধানীর দোয়েল চত্বর এলাকা। মৃৎশিল্প, কারুশিল্প, বেত শিল্পের মেলবন্ধনে হস্তশিল্প প্রেমীরা তাই হারিয়ে যায় সৌখিনতার এ রাজ্যে।


দোয়েল চত্বরে মৃৎশিল্পের পাশাপাশি কাঠ, বেত, পাট, পিতল, ও কাঁসার তৈরি পণ্য গুলো ও আকর্ষণীয় করে ক্রেতাদের। কাঠের খোঁদায় করা গহনার বাক্স, টেবিল ল্যাম্প, ওয়ালম্যাট, পাটের তৈরি ব্যাগ, পুতুল শোপিস সহ কাঠের ও মাটির গহনা কিনতে দোয়েল চত্বর যান সৌখিন মানুষেরা। বাংলা নববর্ষে এসব পণ্যের চাহিদা বেশি হয়।

ঢাকা গেট থেকে শিশু একাডেমির পথে যেতে ফুটপাত জুড়ে ৪০ টির অধিক দোকান রয়েছে। প্রায় ৩০ বছর আগে কয়েকটি দোকানে মাটির তৈরি নানা জিনিস দিয়ে বিক্রি শুরু হয় পরে তার সাথে যুক্ত হয় নানা হস্তশিল্পের বাহারি পন্য, চাহিদাও সময়ের  সাথে বাড়ে দোকানের সংখ্যাও। সাভার, পটুয়াখালী সহ নানা স্থানের কুমোরটুলি থেকে তারা এসব জিনিস নিয়ে এসে বিক্রি করেন। কুমোরটুলিতে চলে কুমোরের মাটির সাথে হাতের আর মনের খেলা। মাটির তাল বানিয়ে, চাক ঘুরিয়ে, হাতের আদলে তৈরি করে নানা রকম সৌখিন জিনিস। সেসব জিনিস স্থান পায় শহুরে বৈঠক খানার সৌন্দর্য বর্ধনে। আর শহরের মানুষ এসব জিনিস খুব সহজে পায় ঢাবির দোয়েল চত্বর এলাকায়।


প্রায় ২৫ বছর ধরে দোয়েল চত্বরে ব্যবসা করছেন গোলাম মৃৎশিল্পের স্বত্বাধিকারী আরিফুল ইসলাম। তিনি বার্তা ২৪ কে বলেন, "অনেক বছর ধরেই এখানে ব্যাবসা করছি বছর পঁচিশেক হবে । দেশি-বিদেশি নানা পর্যটক সহ শহরের অনেক মানুষ আমাদের থেকে জিনিস নিয়ে যায়। শৌখিন মানুষ ঘর সাজাতে এদিক থেকে কিনে নিয়ে যায়। আমরা পটুয়াখালী থেকে মাটির জিনিস আনি। পহেলা বৈশাখের সময় এসব জিনিস বেশি বিক্রি হয়। তাছাড়া সারাবছরই চাহিদা থাকে। "

রেওয়ান হ্যান্ডি ক্রাফট থেকে শাহাদাত হোসেন জানান, " আমাদের এখানে বাঁশ, কাঠ বেত, পিতল, পাট ও মাটির সামগ্রী খুচরা, পাইকারি ভাবে বিক্রি হয়। ঘর সাজানোর জিনিসপত্র বেশি। মাটির ডিনারসেট, গহনা, পাটের ব্যাগও আছে। পহেলা বৈশাখ আসলে বিক্রি দিগুণ হয়। সাভার, পটুয়াখালী থেকে তৈরি জিনিস আসে এখানে আমরা আবার রংকরি, কাচ বসাই আরও সুন্দর করি, সারাবছর মাস প্রতি ৮০ থেকে ১ লাখ টাকা বিক্রি হয় প্রায় প্রত্যেক টা দোকানে। পহেলা বৈশাখের সময় মাটির পাত্রের চাহিদা বাড়ে। "

দোয়েল চত্বর থেকে ঘর সাজানোর জিনিস কিনতে আসা শাহনেওয়াজ খানম জানান, " আমার বাসার মাটির বেশিরভাগ জিনিস এখান থেকে নেওয়া। ৫০ টাকা থেকে ২৫০০ টাকা পর্যন্ত জিনিস পাওয়া যায়। মাটির গহনা, কাঠের গহনা, টেরাকোটা সবই কম দামে পাওয়া যায়। "

বাঙালির লোক সাংস্কৃতির ঐতিহ্য গ্রাম ছাড়িয়ে শোভা পায় শহুরে জীবনের সৌখিনতায়। কারুশিল্প, মৃৎশিল্প ছাড়া ও কাঠ, বাঁশ, বেতের তৈরি বিভিন্ন হস্ত শিল্পের ঐতিহ্য বাংলার মানুষ আষ্টে পিষ্টে লালন করে তাদের যাপিত জীবনধারায়, সৌখিনতায় যার খোঁজে মানুষ যায় দোয়েল চত্বর সংলগ্ন হস্তশিল্প মেলায়।

;

বাঙালির চৈত্র সংক্রান্তি



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
চৈত্র সংক্রান্তি / ছবি : সংগৃহীত

চৈত্র সংক্রান্তি / ছবি : সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

চৈত্র মাসের শেষ দিনে পালন করা হয় চৈত্র সংক্রান্তি। বাঙালি ঐতিহ্যের অন্যতম উৎসব সংক্রান্তি। পুরাতনকে বিদায় দিয়ে জীর্ণতা দূর করার আনন্দ উৎসব এই সংক্রান্তি। চৈত্র মাসের শেষ দিনে সংক্রান্তি পালন করার মাধ্যমে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত হয় বাঙালিরা।

ঘরবাড়ি, পথঘাট সেজে ওঠে রঙিন আলপনায়। ধানের ছড়া, কলসি, ফুল, লতা-পাতা নানারকম নকশা ফুটে ওঠে আলপনায়। তার সাথে বাঘ, পেঁচা, পাখি নানারকম রঙিন মুখোশ তৈরি করা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে মঙ্গল শোভাযাত্রা এবং র‌্যালিতে নামে মানুষ।     

এছাড়াও খাওয়া দাওয়া আছেই! মুড়ি, মুরকি, নিমকি, বাতাসা, নকুলদানা, গুড় সহ নানারকম খাবারের আয়োজন করা হয় সংক্রান্তিতে।ৎ

চৈত্র সংক্রান্তি

বাঙালির উৎসব হলেও হিন্দু ধর্মানুসারীদের জন্য একটি ধর্মীয় উৎসবও বটে। লোকাচার অনুযায়ী এই দিনকে পুণ্য লাভের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই সংক্রান্তিতে নানারকম হিন্দুধর্মীয় রীতিও পালন করা হয়। নতুন বছর যেন ভালোভাবে কাটে এই প্রার্থনায় ব্রত করা হয়। তাছাড়া দান সেবাও করে তারা। সংক্রান্তির আগের দিন তারা নীল পূজা করে, যা মূলত শিব নীলকণ্ঠের উপাসনা। এছাড়া, সংক্রান্তির দিন শিবের গাজন পূজা করা হয়। অনেক স্থানে একে চড়ক পূজাও বলা হয়।  

সময় যত যাচ্ছে মানুষ তত আধুনিক হচ্ছে। তবে কেমন যেন এক গোড়ামি ধারণা মানবমনে ধারন করা হয়েছে যে, পশ্চিমা সংস্কৃতি মানেই আধুনিক! নিজস্ব সংস্কৃতির লালন পালনের মাধ্যমেও যে আধুনিকতা বহন করা যায় যা যেন সকলে ইচে্ছ করেই ভুলে যেতে চায়। আগে, বঙ্গগ্রামে প্রতিটি বাংলা মাসেই সংক্রান্তি পালন করা হতো। তবে সময়ের সাথে সাথে সেই ঐতিহ্য বিলুপ্ত প্রায়। কোনো রকমে বেঁচে আছে বছরের দুই মাসের সংক্রান্তি। কনকনে শীতে পৌষ মাসের শেষ দিন পালন করা হয় পৌষ সংক্রান্তি। অন্যদিকে বছরের শেষ মাস, চৈত্রের শেষেও বাঙালিরা চৈত্র সংক্রান্তি উদযাপন করে।     

;