একটা ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ যেভাবে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে ঠেকিয়ে দিল

খালেদ দিয়াব
ছবি: রয়টার্স / গ্রাফিক: বার্তা২৪

ছবি: রয়টার্স / গ্রাফিক: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

“অনেকদিন ধরেই বেলজিয়াম একটা অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। তা সত্ত্বেও দেশটি করোনা-মোকাবেলায় ছিল অদ্ভুত রকমের সক্রিয়।”

সরকার গঠনে দেশটির ধারাবাহিক চূড়ান্তরকমের অক্ষমতা, এবং সরকারের অভ্যন্তরীণ ভগ্ন অবস্থার কারণে, বেলজিয়াম দীর্ঘদিন যাবত একটি ‘ফেইলিওর রাষ্ট্র’ হিসেবেই পরিচিত ছিল। যদিও বিদেশি পত্রপত্রিকাগুলোতে এই দেশটি নিয়মিতভাবে ‘একটি পরবাস্তব দেশ’ কিংবা ‘পৃথিবীর সবচাইতে সেরা অনুত্তীর্ণ রাষ্ট্র’ হিসেবে বিবৃত হয়ে আসছিল, দেশটির জনগণ ক্রমাগতভাবে হাল ছেড়ে দিয়ে আরো গভীর অচলাবস্থায় পর্যবসিত হচ্ছিল। অভিজাত রাজনৈতিক শ্রেণীর বাইজেন্টাইন ষড়যন্ত্রকারীরা প্রায়ই ঠাট্টা করে বলে থাকে যে, দেশটি কোনো প্রকার সরকার ছাড়া বরং আরো ভালো চলবে।

যখন ইটালিতে কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ল, এবং সমস্ত ইউরোপেই তা ছড়িয়ে পড়বার ভয় দেখা দিল, তখন বেলজিয়াম নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হলো, যে, এই দেশের সমবর্তিত পার্লামেন্ট, ভঙ্গুর এবং নিতান্ত অল্প সংখ্যক তত্ত্বাবধায়ক দ্বারা সম্বলিত এর কেন্দ্রীয় সরকার, সঙ্কটের কালে কিভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে—যখন এই সঙ্কট দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে।

রাজনৈতিক নানা সঙ্কট দেশটিকে অচল করে রাখা সত্ত্বেও এখন দেখা গেল, এই করোনার সময়ে, দেশটির নিয়মিত চিল্লাচিল্লি করে যাওয়া পার্টিগুলোই জনস্বার্থে নিজেদেরকে দ্বিধা-বিভক্তির ঊর্ধ্বে নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিল, এবং তারা বাস্তবেও তা প্রয়োগ করল। বেলজিয়াম যেই কারণে একসময় বিখ্যাত ছিল। দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী সোফি উইলমস এবং জাতীয় সুরক্ষা কাউন্সিলকে, পার্লামেন্ট—আবির্ভূত এই সংকট মোকাবেলায় পর্যাপ্ত জরুরি ক্ষমতা প্রদান করল।

উইলমস, যিনি ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্বে ছিলেন, তিনি প্রজন্মের এই বৃহৎ সংকটের মুহূর্তে সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলেন। উইলমসের ঠান্ডা নেতৃত্ব, কম কথা, শান্ত এবং বিপুল কার্যক্ষমতা—যা কিনা তার প্রতিপক্ষ, অস্থির এবং বোম্বাস্টিক স্টাইলের বরিস জনসনের সম্পূর্ণ বিপরীত—আদায় করে নিল বিপুল প্রশংসা। এমনকি ‘ফাইনানশিয়াল টাইমসে’রও প্রশংসা পেল, যারা কিনা সাধারণত খুব পরিমিত এবং রক্ষণশীল আচরণ করে।

বেলজিয়ামের সকল কার্যক্রমই ছিল নিষ্পত্তিমূলক, এবং এখন পর্যন্ত, অনেক বেশি কার্যকর। ফলেই এইসব কার্যক্রম শুধু বেলজিয়ামের নাগরিকদেরই না, চমকে দিয়েছে আরো অনেককেই। তো, মহামারি-নিয়ন্ত্রণে বেলজিয়ামের এই সফলতার পেছনে আসলে কী রয়েছে?

একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত এবং সঠিক সময়ে রেসপন্স করতে পারা। একদম শুরুতেই কোনো প্রকার ইতস্তত না করে বেলজিয়াম সঠিক সময়ে লকডাউনে চলে গিয়েছিল। ঠিক সেই সময়ে যখন ইতালির উদ্ভূত পরিস্থিতি নিবদ্ধ ছিল মনোজাগিকতার ওপরে—সিদ্ধান্ত-অসিদ্ধান্তের চক্করে।

অন্যদিকে, আরেকটি সম্ভাব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকতে পারে, বেলজিয়াম যথাযথভাবে তার হেলথকেয়ার অবকাঠামোকে ডেভেলপ করেছিল। এটি একটি সামষ্টিক ইমিউন সিস্টেমের মতো করে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধ যুদ্ধে মানুষকে মদদ দিয়েছে।

বেলজিয়ামের স্বাস্থ্য খাত এখন কেবল ইউরোপের সেরাদের মধ্যেই স্থান পাচ্ছে না, এটি ইতোমধ্যে এক বিরাট সংখ্যক হাসপাতালের বেড ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট তৈরি করে ফেলেছে। এবং যেই বৃহৎ সংখ্যক রোগীর ইনটেনসিভ কেয়ার প্রয়োজন ছিল, তাদের জন্য বেলজিয়াম এই ইউনিটগুলোকে সক্রিয় রেখেছে সার্বক্ষণিক সমন্বয়ের সাথে।

যেই দেশগুলোর স্বাস্থ্য খাত মহামারির প্রাদুর্ভাবের ফলে বিহ্বল হয়ে পড়েছিল, বেলজিয়ামের অবস্থা আদতেই তাদের মতো নয়। বেলজিয়ামে এখনো পর্যন্ত অতিরিক্ত পরিমাণে ক্রিটিকাল কেয়ারের ধারণক্ষমতা রয়েছে, এবং দেশটির অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে আসছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। বেলজিয়ামের দুর্বলতার প্রধান পয়েন্টটা হলো, বৃদ্ধদের নার্সিং হোমের ব্যর্থতা। অনুমান করা হচ্ছে, মূল মৃত্যুসংখ্যার মধ্যে ৪০ শতাংশই নার্সিং হোমের বাসিন্দাদের, যেটি তিন হাজার ছাড়িয়েছে।

সারা পৃথিবীজুড়েই, লকডাউন এবং সামাজিক দূরত্বে এই দুটি বিষয় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এসে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তদুপরি বেলজিয়াম, হালকা বা ‘লাইট লকডাউন’ নামে যেই বিষয়টি বাস্তবায়ন করেছে, সেটি কেবলমাত্র চূড়ান্তরকমের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাদে আর সব কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ ইতালির সংকটের প্রায় শেষ সময় পর্যন্ত সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

এই ‘লাইট লকডাউন’ মানুষকে অল্প সময় ঘরের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে থাকে। যেসব দেশ সম্পূর্ণ লকডাউন দিয়েছিল, তাদের তুলনায় এটি সফল বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। মানুষের বাইরে হাঁটাহাঁটি বা শারীরিক ব্যায়ামের ফলে তাদের যে স্বাস্থ্যগত উপকার হয়েছে, সফলতার পেছনে এটাই শুধু কারণ নয়। বরং, তাদের এই হালকা সতেজ হওয়া তাদেরকে অন্য সীমাবদ্ধতাগুলো আরো সহজে মেনে নিতে সহায়তা করেছে।

এবং এটা আসলে বিপুলভাবে কার্যকর হয়েছে। একদম শুরুর দিকে রিপোর্ট হওয়া কিছু অকেশনাল ‘লকডাউন পাটি’ আর নিয়ম ভঙ্গ করে কারো কারো পার্শ্ববর্তী দেশে চলে যাওয়া সত্ত্বেও, সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সামাজিক দূরত্বের আইন মেনে চলেছে। যদিও পুলিশি হস্তক্ষেপের ন্যূন্যতম প্রয়োজনীতা ছিল, ছুটির দিনে বা উইকেন্ডে আইন অমান্য করার হার বেড়েছে। আশঙ্কা আছে, এটি বৃদ্ধি পেয়ে নতুন কোনো চূড়া স্পর্শ করতে পারে। আবার এটা দেখা গেছে, জনগণ কখনো কখনো সরকারের চেয়েও এগিয়ে ছিল। অনেক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সরকারের নির্দেশ আসবার আগেই।

যদিও বেলজিয়ামে ইতোমধ্যে এমন একটা সমাজ-ব্যবস্থা, যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত জায়গাটা রয়েছে। তবুও এটা ছিল দেখার মতো বিষয়, যেভাবে তারা তাদের দৈনিক রুটিনে সামাজিক দূরত্বের প্রয়োজনীয়তা সংহত করে নিয়েছে। যেইসব দোকানপাট খোলা আছে, সেগুলো মানুষেরা ফ্লোরে দেওয়া দাগের ওপর ভিত্তি করে একে অপরের থেকে দূরত্ব রক্ষা করছে। আর খোলামেলা পাবলিক স্পেসে সাধারণভাবে একে অপরের থেকে দূরত্বে থেকেছে।

প্রতিটি বিষয়ই একটা সুন্দর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে—প্ররোচনা ও ঐক্য-গঠনের ভিত্তিতে, বলপ্রয়োগের মধ্য দিয়ে নয়। এই বিষয়টি জনগণের মধ্যে ব্যাপক সম্মতি তৈরি করেছে। এটা সেই সঙ্গে দল নির্বিশেষে সবার মধ্যে বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা মেনে চলবার প্রতিশ্রুতিও তৈরি করেছে।

যখন অন্যান্য দেশের রাজনীতিবিদরা, যেমন ডোনাল্ড ট্রাম্প—তিনি বিজ্ঞানীদের প্রতি উন্নাসিকতা দেখাচ্ছেন, অস্বীকার করছেন, মূলত পরিস্থিতিকে আরো বেশি রাজনৈতিক করে তুলছেন, সেখানে বেলজিয়ামের সরকার শুধু বিজ্ঞানের দ্বারা পরিচালিতই হচ্ছে না, বরং তাদের মিডিয়ায় বেশিরভাগ সময়ে রাজনীতিবিদদের তুলনায় সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অগ্রাধিকার পাচ্ছেন।

ভাইরাস বিশেষজ্ঞ ভ্যান গুট প্রতিদিন ন্যাশনাল ক্রাইসিস সেন্টার থেকে যে ব্রিফিং দিয়ে থাকেন, সেটা দেখা গেছে বেলজিয়ামের সাধারণ মানুষের জন্য অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার সহকর্মী মার্ক ভ্যান রানস্টের উপস্থিতি সন্ধ্যার কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স প্রোগ্রামে নিত্যদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে, যেখানে তিনি প্রতিটি নতুন অবস্থার বিশ্লেষণ করেন, এবং সামনের দিনের সম্ভাব্য কার্যক্রমের কথা বলেন।

তাদের সফলতার অন্য একটি কারণ হলো, বেলজিয়াম সামাজিক সুরক্ষা ও সংহতিসম্পন্ন একটি শালীন সমাজ, যদিও এটি দিনে দিনে খারাপের দিকে যাচ্ছে।

বেলজিয়াম তার বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে খুব তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মানবজীবন রক্ষা করবার এবং ভাইরাসের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার রোধ করবার, তা যতই বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধন করুক না কেন। যদিও এটি অনেক দুর্বল মানুষ এবং অনেক ছোট ব্যবসায়ের জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, এই ধাক্কাটি সামলানো হয়েছে জরুরি সহায়তা প্যাকেজের মাধ্যমে। ট্যাক্স, মটগেজ এবং ব্যাঙ্কের পেমেন্ট স্থগিত করা হয়েছে, পাশাপাশি অরক্ষিত অবস্থায় থাকা কর্মীদেরকে অস্থায়ী বেকারত্ব-ভাতা প্রদান করা রয়েছে।

এইসব প্রচেষ্টাগুলো এখন ধীরে ধীরে বন্ধ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। মহামারিবিদরা নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা এখন স্থিতিশীল হয়েছে, যদিও মূল কেসের সংখ্যা এখনো বাড়ছে। যাইহোক, জনগণ কতটা কঠিনভাবে নিয়ম মেনে যেতে পারে, তার ওপরেই সাফল্য নিহিত আছে, বিশেষজ্ঞরা এর ওপরে জোর দিয়ে যাচ্ছেন।

বেলজিয়ামের আজকের পরিস্থিতি কেবল জরুরি অবস্থাকেই নয়, বরং সাধারণ সময়েও স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতগুলোতে প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগের গুরুত্ব গুরুতরভাবে তুলে ধরে। আমি আশা করি যে, একদিন এই মহামারি শেষ হবে, এবং সমস্ত রাজনীতিবিদরা, বেলজিয়ামসহ আজকের এই পাঠটি পুনরায় তারা ভাববেন। প্রতিনিয়ত অবহেলিত এইসব খাতে তারা বিনিয়োগ বাড়াবেন, অনিবার্যভাবে আসন্ন অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও।

বেলজিয়াম এবং অন্যান্য ধনী ইউরোপীয় দেশগুলোর ক্ষেত্রে অন্য যে বিষয়টিও বুঝবার আছে তা হলো, এরা মহামারি ঠেকাতে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, তা অনেকাংশেই জাঁকজমকপূর্ণ। অন্যদিকে, দরিদ্র দেশগুলো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পরে এটা তারা সামলে উঠতে পারবে না। এই বিষয়টা বৈশ্বিক সংহতির অত্যাবশ্যকতাকে সামনে নিয়ে আসে। দরিদ্র দেশগুলো যাতে মহামারির কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে লড়াই করতে পারে, সেইজন্য একটি কোভিড-১৯ তহবিল গঠন করা অপরিহার্য। সেইসঙ্গে চিকিৎসা-পেশার লোকজন দ্বারা ভ্রাম্যমাণ একটি র্যাপিড রেসপন্স বাহিনী গঠন করা—যখন কোনো স্থানে করোনাভাইরাস দৃশ্যমান হবে, তখন তাদেরকে সেইসব হাসপাতালগুলোতে পাঠিয়ে দেওয়া যেতে পারে।


খালেদ দিয়াব
[পুরষ্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, লেখক এবং ব্লগার]

আল জাজিরা থেকে অনুবাদকৃত
অনুবাদ : যাকওয়ান সাঈদ

আপনার মতামত লিখুন :