আশুরার ইতিহাস ও করণীয়



ইসলাম ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ইসলামের ইতিহাসে মহররম অত্যন্ত ফজিলতময় মাস, ছবি: সংগৃহীত

ইসলামের ইতিহাসে মহররম অত্যন্ত ফজিলতময় মাস, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

মহররম চান্দ্রবছরের প্রথম মাস, সম্মানিত চার মাসের তৃতীয়। ইসলামের ইতিহাসে মহররম অত্যন্ত ফজিলতময় মাস। এ মাসের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। মহররমের দশ তারিখে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার কথা বলা হলেও বিশুদ্ধ বর্ণনায় মাত্র দু’টি ঘটনার কথা জানা যায়।

এক. হজরত মূসা আলাইহিস সালাম এবং তার সাথীদের ফেরাউন ও তার সৈন্যদের কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার ঘটনা। যেখানে দরিয়ায় রাস্তা বানিয়ে আল্লাহতায়ালা তাদেরকে নিরাপদে পৌঁছে দিয়েছেন।

দুই. এই রাস্তা দিয়ে অতিক্রম করার সময় ফেরাউন ও তার সৈন্যদের দরিয়ায় ডুবিয়ে ধ্বংস করার ঘটনা।

এই দুই ঘটনা বিভিন্ন সহিহ হাদিসের মাধ্যমে প্রমাণিত। সহিহ বোখারি ও সহিহ মুসলিমসহ হাদিসের অনেক কিতাবে বর্ণিত হয়েছে।

ইতিহাসে পাওয়া যায়, আশুরার দশ তারিখে অত্যাচারী শাসক ফেরাউনের হাত থেকে আল্লাহতায়ালা বনী ইসরাঈলকে রক্ষা করেন। ফেরাউনের ওপর বিজয় দান করেন। এ জন্য দিনটিকে মুসলিম মিল্লাতের বিজয়ের দিন বলা হয়। এ ব্যাপারে আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘আর বনী ইসরাঈলকে আমি পার করে দিয়েছি নদী। তারপর তাদের পশ্চাদ্ধাবন করেছে ফেরাউন ও সেনাবাহিনী, দুরাচার ও বাড়াবাড়ির উদ্দেশ্যে। এমনকি যখন তারা ডুবতে আরম্ভ করল, তখন বলল, এবার বিশ্বাস করে নিচ্ছি যে, কোনো মাবুদ নেই তাকে ছাড়া যার ওপর ঈমান এনেছে বনী ইসরাঈলরা। বস্তুত আমি তারই অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত। এখন একথা বলছ। অথচ তুমি ইতোপূর্বে নাফরমানি করেছিলে এবং পথভ্রষ্টদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলে। অতএব আজকের দিনে বাঁচিয়ে দিচ্ছি আমি তোমার দেহকে যাতে তোমার পশ্চাদবর্তীদের জন্য নিদর্শন হতে পারে। আর নিঃসন্দেহে বহু লোক আমার মহাশক্তির প্রতি লক্ষ্য করে না।’ -সূরা ইউনুস: ৯০-৯২

এ বিজয়ের শোকরিয়াস্বরূপ হজরত মুসা (আ.) ও তার অনুসারীরা আশুরার দিনে রোজা রাখতেন। হজরত আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত যে, নবী করিম (সা.) যখন মদিনায় আগমন করলেন, দেখলেন এদিনে ইহুদিরা রোজা রাখে। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, এটা কোন দিন যে, তোমরা রোজা রাখছ? তারা বলল, এটা এমন এক মহান দিন, যেদিন আল্লাহ হজরত মুসা (আ.) ও তার সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছিলেন ও ফেরাউনকে তার দলবলসহ ডুবিয়ে মেরেছিলেন। -সহিহ বোখারি ও মুসলিম

অনেক কিতাবে লেখা আছে, আশুরার দিনে কিয়ামত সংগঠিত হবে। কিন্তু এ কথার কোনো ভিত্তি নেই, নির্ভরযোগ্য কোনো বর্ণনায় এ কথার কোনো আলোচনা আসেনি। আবার কোনো কোনো রেওয়ায়েতে বলা হয়, আশুরার দিনে হজরত আদম আলাইহিস সালামের তওবা কবুল হয়েছে। এমনকি একথা আবুল কাসেম ইস্পাহানি (রহ.) কর্তৃক সংকলিত আত তারগিব ওয়াত তারহিবের ১৮৬৮ নম্বর রেওয়ায়েতে এসেছে। কিন্তু এই রেওয়ায়েতের সনদ খুবই দুর্বল। এ ছাড়া আরও কিছু রেওয়ায়েতে এই কথা এসেছে, সেগুলো মওযু তথা দুর্বল।

অবশ্য কোনো কোনো তাবেয়ি থেকে এ কথা বর্ণিত হয়েছে যে, তারা হজরত আদম আলাইহিস সালামের তওবা কবুল হওয়া সম্পর্কে আশুরার দিনের কথাই বলতেন।

হজরত নূহ আলাইহিস সালামের কিশতি যেদিন জুদি পাহাড়ে থেমেছিল সেই দিনটি ছিল আশুরার দিন। এই রেওয়ায়েতও দুর্বল। তবে এটা ঠিক যে, একথা মুসনাদে আহমাদের একটি রেওয়ায়েতে এসেছে। কিন্তু তার সনদ দুর্বল।

আর হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের জন্ম আশুরার দিন হয়নি। একথা প্রমাণিত নয়। আবুল কাসেম ইস্পাহানি (রহ.)-এর কিতাব আত তারগিব ওয়াত তারহিবের পূর্বোক্ত রেওয়ায়েতেই একথা এসেছে। আগেই বলা হয়েছে, এর সনদ খুবই দুর্বল।

আরেকটি বিষয়। আমাদের দেশের সংবাদপত্র থেকে শুরু করে আশুরাকেন্দ্রিক যাবতীয় আলোচনায় শুধু কারবালার ঘটনা উল্লেখ করা হয়। মনে হয়, আশুরায় শুধু কারবালার ঘটনাই ঘটেছে। আশুরা তাৎপর্যময় হয়েছে কারবালার কারণে। বিষয়টি কিন্তু তা নয়।

হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের প্রায় ৫০ বছর পর ৬১ হিজরির ১০ মহররমে কারবালায় হজরত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনা আশুরার দিনের সঙ্গে মিলে যাওয়া একটি ঘটনাবিশেষ। আশুরার আমলের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো বিষয় নয়।

কারণ হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের আগেই আমাদের শরিয়ত পূর্ণ হয়ে গেছে। কিয়ামত পর্যন্ত এই শরিয়ত পূর্ণাঙ্গরূপে সংরক্ষিত থাকবে। আল্লাহতায়ালা নিজে এই শরিয়ত, শরিয়তের দলিল ও দলিলের উৎসসমূহ হেফাজত করার ঘোষণা দিয়েছেন। এই শরিয়ত যেভাবে আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে আজ পর্যন্ত সেভাবেই সংরক্ষিত আছে। সে অনুযায়ী সবার আমল করা জরুরি। তাতে কোনো ধরনের সংযোজন-বিয়োজনের সুযোগ নেই।

অতএব হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পরে সংঘটিত কোনো বিপদ বা আনন্দের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো দিন বা কোনো মাসের নতুন কোনো ফজিলত বা নতুন কোনো বিধান আবিষ্কার করা যাবে না। এগুলো ইসলাম সমর্থন করে না।

দুঃখ ও আনন্দ উভয়টির বিধান শরিয়তে আছে এবং তা নির্ধারিত। উম্মতের ওপর ওয়াজিব হলো সেই হুকুম অনুযায়ী আমল করা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- বিপদ-আপদের সময় একজন বান্দার কী করণীয়, কী বর্জনীয় তার বর্ণনা আছে কোরআন-হাদিসে।

কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে মৃত বলো না। প্রকৃতপক্ষে তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা (তাদের জীবিত থাকার বিষয়টা) উপলব্ধি করতে পারো না। আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব (কখনও) কিছুটা ভয়-ভীতি দ্বারা, (কখনও) জানমাল ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতির দ্বারা। সুসংবাদ শোনাও তাদেরকে, যারা (এরূপ অবস্থায়) সবরের পরিচয় দেয়। যারা কোনো মসিবত দেখা দিলে বলে ওঠে, আমরা সকলে আল্লাহরই এবং আমাদেরকে তার কাছেই ফিরে যেতে হবে। এরাই তারা, যাদের প্রতি তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে বিশেষ করুণা ও দয়া রয়েছে এবং এরাই আছে হেদায়েতের ওপর। -সূরা বাকারা: ১৫৪-১৫৭

এ আয়াতের আলোকে বুঝা গেল, কারবালায় হজরত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের ঘটনা আমাদের জন্য বিপদ ও মসিবতের বিসয়। এক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়তের হুকুম হলো, বিপদগ্রস্ত লোকেরা সবর করবে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পড়বে এবং আল্লাহতায়ালার কাছে সওয়াবের আশা করবে।

কারও ইন্তেকালে শরিয়তের হুকুম হলো সবর করা অর্থাৎ ধৈর্যধারণ করা। অধৈর্য হয়ে অভিযোগপূর্ণ কোনো কথা বলা, বিলাপ করা, হাত পা ও বুক চাপড়ানো, চেহারা খামচানো, শোকের পোশাক পরা ইত্যাদি হারাম। ইসলামি শরিয়তে খুব কঠোরভাবে তা থেকে বারণ করা হয়েছে।

হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, যে ব্যক্তি মুখে আঘাত করে, জামার বুক ছিঁড়ে, জাহিলি যুগের (মতো) বিলাপ করে; সে আমাদের দলভুক্ত নয়। -সহিহ বোখারি: ১/১৭২

অন্য এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমি ওই ব্যক্তি থেকে মুক্ত, যে শোকে মাথা মুণ্ডায়, বুক চাপড়ায় ও কাপড় ছিঁড়ে। -সহিহ মুসলিম: ১৬৭

হজরত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের পর থেকে তিন শ’ বছর পর্যন্ত ১০ মহররমে কান্নাকাটি, আহাজারি, চিৎকার ও বুক চাপড়ানো প্রথার কোনো অস্তিত্ব ছিলো না। সর্বপ্রথম ৩৫২ হিজরিতে মুঈযযুদ দাওলা দাইলামি (একজন শিয়া) দশ মহররমে শুধু বাগদাদে হজরত হুসাইন (রা.)-এর জন্য মাতম করার হুকুম জারি করে। এরপর ৩৬৩ হিজরিতে মিসরেও এই হুকুম জারি করা হয়। সেই থেকে এই প্রথা চলে আসছে কোনো কোনো সম্প্রদায়ের মাঝে।

কারবালার আত্মত্যাগের শিক্ষা সত্য ন্যায়ের পথ দেখাবে



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কারাবালার আত্মত্যাগের শিক্ষা সত্য ন্যায়ের পথ দেখাবে

কারাবালার আত্মত্যাগের শিক্ষা সত্য ন্যায়ের পথ দেখাবে

  • Font increase
  • Font Decrease

কুতুববাগ দরবার শরিফের পীর ও মোরশেদ হযরত খাজাবাবা কুতুববাগী  কেবলাজান বলেছেন, কারবালার প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে নিমমভাবে শহীদ হওয়ার আগেই ইমাম হোসেন (রা.) এলমে লাদুন্নার (অলৌকিক জ্ঞান) শক্তিতেই বুঝতে পেরেছিলেন তাঁকে সঙ্গী-সাথীসহ শাহাদাত বরণ করতে হবে। তাই নিজ পুত্র হজরত জয়নাল আবেদীনকে ঘুম বা তন্দ্রা থেকে ডেকে তুলে নিজের সিনার সঙ্গে সিনায় সজোরে চাপ দিয়ে কিছু সময় ধরে রাখেন।

হজরত ইমাম হোসেন (রা.) তাঁর নানাজান হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সা.) এর কাছ থেকে প্রাপ্ত জাহের বাতেন এলেম এভাবেই হজরত জয়নাল আবেদীনের কাছে গচ্ছিত রাখেন, যা আউলিয়া কেরামগণের সিনা হয়ে কিয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে। রাসুল (সা.) এর আহলে বয়াতকে ভালোবাসা এবং সত্য-ন্যায়ের প্রতি অবিচল থাকার শিক্ষাই পবিত্র আশুরার মধ্যে দিয়ে আমরা গ্রহণ করতে পারি।

মঙ্গলবার (৯ আগস্ট) রাজধানীর ফার্মগেটস্থ (৩৪ ইন্দিরা রোড) কুতুববাগ দরবার শরিফের সদর দপ্তরে পবিত্র আশুরা উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশাল ধর্মীয় জলসায় সারাদেশ থেকে আগত হাজার হাজার জাকের মুরিদ-আশেকানদের উদ্দেশে তিনি এ সব কথা বলেন।

খাজাবাবা হজরত সৈয়দ জাকির শাহ নকশবন্দি কুতুববাগী কেবলাজান আরো বলেন, কারবালায় আহলে বয়াতের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ইসলামের সত্য ও ন্যায়ের পথ চিহ্নিত হয়েছে। ইসলাম শান্তির ধর্ম কিন্তু দুরাচার ইয়াজিদ মুসলমান হয়েও ছিলেন অনৈতিকতা আর অশান্তির ধারক বাহক। তাই নির্মমভাবে আহলে বয়াতদের হত্যা করেছিলেন। পরে বাংলাদেশ ও সারাবিশ্বেও শান্তি কামনায় খাজাবাবা কুতুববাগী মোনাজাত পরিচালনা করেন।

;

রাজশাহীতে পবিত্র আশুরা পালন



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, রাজশাহী
রাজশাহীতে পবিত্র আশুরা পালন

রাজশাহীতে পবিত্র আশুরা পালন

  • Font increase
  • Font Decrease

যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্যে দিয়ে রাজশাহীতে পবিত্র আশুরা পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষে মঙ্গলবার সকালে নগরীর শিরইল কলোনী থেকে একটি শোক র‌্যালি কের করা হয়।

পবিত্র মহররম আশুরা উদযাপন কমিটি এই র‌্যালি বের করে। র‌্যালিটি নগরীর রেলগেট শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান চত্ত্বর হয়ে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে।

কয়েকটি সংগঠন নগরীতে অটোরিকশা নিয়ে র‌্যালি বের করে। এছাড়াও বিশ্ববাংলা ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ আহলে বাইত ফাউন্ডেশনের ব্যানারে শোক মিছিল, পথসভা ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে দুপুরের পর খাবার বিতরণ করা হয়। এরপর মুসলিম উম্মাহর সুখ-সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।

;

‘ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না’



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
‘ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না’

‘ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না’

  • Font increase
  • Font Decrease

পবিত্র আশুরা আজ। মহররম মাসের ১০ তারিখ। বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহ কাছে ঐতিহাসিক তাৎপর্যমণ্ডিত এক গভীর শোকাবহ দিন। এই দিনে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) অন্যায় ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়ে চক্রান্তকারী স্বৈরতন্ত্রী ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে কারবালা প্রান্তরে মর্মান্তিকভাবে শাহাদতবরণ করেন। দিনটি একদিকে শোকের ও বেদনার, অন্যদিকে হত্যা ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান গ্রহণের চেতনায় সমুজ্জ্বল।

ইসলামের ইতিহাসে মহররমের ১০ তারিখে কারবালা প্রান্তরে পরিবার-পরিজন, সঙ্গী-সাথিসহ হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদতবরণের মর্মান্তিক ঘটনার আগেও এই তারিখে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে বিশ্ব ইতিহাসে। আদি মানব হজরত আদম (আ.) এই দিনে পৃথিবীতে আগমন করেন, তাঁর তওবা কবুল হয় এই দিনেই। এই দিনে হজরত নূহ (আ.)-এর নৌকা মহাপ্লাবন থেকে রক্ষা পায়।

এসব ঐতিহাসিক ঘটনার তালিকায় মর্মান্তিক বেদনার আবহ সঞ্চারিত করে কারবালার নৃশংসতা। আমির মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে ইয়াজিদ অবৈধভাবে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেন এবং এ জন্য ষড়যন্ত্র ও বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেন। খেলাফত বা শাসনের আরেক বৈধ উত্তরাধিকারী, মহানবী (সা.)-এর আরেক দৌহিত্র হজরত ইমাম হাসান (রা.)-কে আগেই বিষপানে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে অবরুদ্ধ হয়ে পরিবার-পরিজন ও ৭২ জন সঙ্গীসহ শাহাদতবরণ করেন হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)। এই হত্যাকাণ্ড ছিল অত্যন্ত নির্মম। অসহায় নারী ও শিশুদের পানি পর্যন্ত পান করতে দেয়নি পাষণ্ড ইয়াজিদ বাহিনী।

কারবালার ঘটনার পর থেকে নানা আনুষ্ঠানিকতায় বিশ্বব্যাপী আশুরা পালিত হয় মহররমের ১০ তারিখ। ধর্মীয় ভাবাবেগ ও গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে স্মরণ করা হয় নবীবংশের সম্মানিত সদস্যগণে আত্মত্যাগের গৌরবময় ঘটনাক্রম, যার মূল বক্তব্য সত্যের পথ অনুসরণ করার ও ন্যায়ের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ করার অনুপ্রেরণায় দীপ্ত।

ফলে আশুরার মূল চেতনা হলো, অসত্য, স্বৈরতন্ত্র, অবৈধ কর্তৃপক্ষের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রাম। সেই সংগ্রামে সাময়িক আঘাত এলেও চূড়ান্ত বিজয় অবধারিত। এজন্যই দার্শনিক কবি বলেছেন, "কাতলে হোসাইন আসল মে মারগে ইয়াজিদ হ্যায়,/ইসলাম জিন্দা হোতা হায় হার কারবালা কে বাদ।’" অর্থাৎ, হোসাইনের নিহত হওয়ার ঘটনা আসলে ইয়াজিদেরই মৃত্যু, ইসলাম প্রতিটি কারবালার পর পুনরুজ্জীবিত হয়।

ইমাম জাফর সাদেক (আ.) বলেছেন, “মুসলমানের জন্য প্রতিটি ভূমিই কারবালা আর প্রতিটি দিন হচ্ছে আশুরা।”

ইসলামী ধর্মতত্ত্ব ও সাহিত্যে আশুরা ও কারবালার ঘটনা বিরাট জায়গা জুড়ে উপস্থিত। বাংলা ভাষায় কাজী নজরুলের কবিতা এবং মীর মোশাররফ হোসেনের কালজয়ী 'বিষাদ সিন্ধু' যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

অন্যান্য ধ্রুপদী ভাষা, যেমন আরবি, ফারসি, উর্দু, ইংরেজিতে কারবালার আখ্যান বার বার লিপিবদ্ধ করেছেন বরেণ্য কবি ও সাহিত্যিকগণ। যাদের মধ্যে আধুনিককালের
মাওলানা মোহাম্মাদ আলী জাওহার এবং আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল ছাড়াও রয়েছেন ইতিহাসখ্যাত কবি জালালুদ্দিন বলখি রুমি, ফরিদ উদ্দিন আত্তার, আবদুর রহমান জামি প্রমুখ। বিশেষত, ইকবালের কবিতাগুলো পড়ে মনে হয়, নবীবংশ তথা আহলে বাইতের প্রতি, ইমাম হোসেইনের আত্মত্যাগের প্রতি তাঁর প্রেম, ভালোবাসা ও ভক্তি অম্লান।

মহররমের শিক্ষা নিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের উচ্চারণ ঐতিহাসিক মর্যাদা লাভ করেছে। তাঁর ভাষায়, ‘ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না’। অর্থাৎ, মহররম মাসে আশুরার চেতনায় অন্যায়-অবিচার ও ষড়যন্ত্র থেকে পৃথিবীকে মুক্ত রাখতে কান্নাকাটি বা বিলাপ নয়, ত্যাগের মহিমা উজ্জীবিত হওয়াই কর্তব্য, কবির এই বক্তব্য এক শাশ্বত সত্যের প্রতিধ্বনি স্বরূপ। আশুরা মূলত ন্যায়, সত্য, কল্যাণের পক্ষে এবং অন্যায়, অসত্য ও স্বৈরতার বিপক্ষে সুদৃঢ় চিত্তে অবস্থান গ্রহণের অনিঃশেষ প্রেরণা প্রতিটি মুসলমানের মধ্যে জাগ্রত করে।

;

মহররম মাসে বরকতময় আশুরার রোজা



আবুল খায়ের মোহাম্মদ, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
মুহররম মাসের বরকতময় আশুরা। সংগৃহীত

মুহররম মাসের বরকতময় আশুরা। সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

 

শুরু হয়ে গেছে মহিমান্বিত মহররম মাস। যে মাসে ১০ তারিখ আশুরা দিবসের রোজা অত্যন্ত বরকতময়।

সকল মুসলমানই জানেন যে, হিজরি সনের প্রথম মাসের নাম মহররম। ইসলামের দৃষ্টিতে মহররম একটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ মাস। অনেক ইতিহাস-ঐতিহ্য ও রহস্যময় তাৎপর্য নিহিত আছে এ মাস ঘিরে।

মহররম মাসের ১০ তারিখ পৃথিবীর ইতিহাসে এবং মুসলিম সভ্যতায় বহু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। যার মধ্যে সর্বাপেক্ষা আলোড়িত ও আলোচিত বিষয় হলো কারবালার মর্মান্তিক ইতিহাস। এছাড়াও আশুরার ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ও স্মরণীয় ঘটনার শীর্ষে স্থান পায় মুসা (আ.)-এর একটি ঘটনা। এই দিনে তিনি অত্যাচারী শাসক ফিরাউনের কবল থেকে তাঁর জনগোষ্ঠীকে আল্লাহর অশেষ রহমতে রক্ষা করেছিলেন।

ইমাম বুখারি (রহ.) তাঁর প্রসিদ্ধ হাদিস গ্রন্থে সাহাবি হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, 'মহানবী (সা.) মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় পৌঁছে সেখানে ইহুদিদের আশুরার দিনে রোজা পালন করতে দেখেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের জিজ্ঞেস করেন, এই দিনে কী ঘটেছে যে তোমরা এতে রোজা পালন করো?

তারা বলে, এই দিনটি অনেক বড় দিন, এই দিনে আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের ফিরাউন থেকে মুক্ত করেছিলেন এবং ফিরাউন ও তার বাহিনীকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। এর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মুসা নবী রোজা রাখতেন, তাই আমরাও আশুরার রোজা পালন করে থাকি।

ইহুদিদের জবাব শুনে রাসুলে করিম (সা.) বলেন, মুসা (আ.)-এর কৃতজ্ঞতার অনুসরণে আমরা তাদের চেয়ে বেশি যত্নশীল হওয়ার অধিকারী। অতঃপর তিনি নিজেও আশুরার রোজা রাখেন এবং মুসলমানদের তা পালন করতে নির্দেশ প্রদান করেন।' (বুখারি, হাদিস : ৩৩৯৭, মুসলিম, হাদিস : ১১৩৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রোজা নিজে পালন করেছেন এবং উম্মতকে রাখার প্রতি নির্দেশ করেছেন, তাই তাঁর অনুসরণ করা আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া অসংখ্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজার ফজিলত বর্ণনা করেছেন। কয়েকটি হাদিস নিম্নে উপস্থান করা হলো:

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'রমজান মাসের রোজার পর সর্বোত্তম রোজা মহররম মাসে আশুরার রোজা।' (সুনানে কুবরা, হাদিস : ৮৪২১০)

আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এই রোজা বিগত বছরের গুনাহ মুছে দেয়। (মুসলিম, হাদিস : ১১৬২)

মুসলিম শরিফে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) যখন আশুরার দিনে রোজা রাখেন এবং অন্যদেরও রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করেন, তখন সাহাবিরা অবাক হয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, বিধর্মীরা তো এই দিনটিকে বড় দিন মনে করে। এই দিনে তারাও রোজা পালন করে। আমরা যদি এই দিনে রোজা রাখি তাহলে তো এদের সঙ্গে সামঞ্জস্য হবে। তাদের প্রশ্নের জবাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন (তারা যেহেতু এদিন একটি রোজা পালন করে), আগত বছর ১০ তারিখের সঙ্গে ৯ তারিখ মিলিয়ে দুই দিন রোজা পালন করব, ইনশাআল্লাহ। (মুসলিম, হাদিস : ১১৩৪)

অন্য বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, 'তোমরা আশুরার দিনে রোজা রাখো, তবে এ ক্ষেত্রে ইহুদিদের সঙ্গে মিল না হওয়ার জন্য ১০ তারিখের আগের দিন অথবা পরের দিন আরো একটি রোজা রেখে নিয়ো।' (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২১৫৪)

সহিহ হাদিসগুলোর আলোকে প্রমাণিত হয় যে আশুরার রোজা হবে দুটি—মহররমের ১০ তারিখ একটি, আর ৯ তারিখ অথবা ১১ তারিখ আরো একটি।

প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর কর্তব্য হলো মুহররম মাসে আশুরার দুটি রোজা পালন করা, আল্লাহতায়ার ইবাদত, বন্দেগি, জিকিরে সবিশেষ মনোযোগী ও মশগুল হওয়া এবং পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁর পরিবার-পরিজন, আহলে বাইত, সাহাবিদের প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ করা।

;