প্রয়োজনীয় বই: ইসলামী ব্যাংকিং ও বাণিজ্যিক পরিভাষা



মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস হুসাইন, অতিথি লেখক, ইসলাম
প্রয়োজনীয় বই: ইসলামী ব্যাংকিং ও বাণিজ্যিক পরিভাষা, ছবি: সংগৃহীত

প্রয়োজনীয় বই: ইসলামী ব্যাংকিং ও বাণিজ্যিক পরিভাষা, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৮৩ সালের ১২ আগস্ট দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্বপ্রথম ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে। সূচনা হয় নতুন ইতিহাস। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়।

গত তিন দশকে বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা অভাবনীয় উন্নতি লাভ করেছে। বর্তমান ব্যাংক ব্যবস্থার ২৫ শতাংশের অধিক এখন ইসলামী ব্যাংকসমূহের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়।

আর্থিক সমৃদ্ধি, গ্রাহকদের আস্থা ও শরিয়া পরিপালনে বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকসমূহ পুরো বিশ্বের জন্যই এখন রোল মডেল।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অগ্রযাত্রার তুলনায় এ বিষয়ে মানসম্মত গবেষণা ও প্রকাশনার এখনও ঘাটতি রয়েছে। দেশের বেশ কিছু স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ও গবেষক এ ব্যাপারে নিরন্তর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। কিন্তু তবুও এখনও বাংলা ভাষায় ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ে বই-পুস্তকের সংখ্যা অপ্রতুল। বলাবাহুল্য, ইসলামী ব্যাংকিং আন্দোলনকে সফল করার জন্য এ বিষয়ে নিরন্তর গবেষণা ও সাধারণ মানুষের উপযোগী বই পুস্তক রচনার কোনো বিকল্প নেই।

এ প্রয়োজনীয়তাকে উপলব্ধি করে এগিয়ে এসেছেন বিশিষ্ট গবেষক মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ খন্দকার। তিনি রচনা করেছেন ‘ইসলামী ব্যাংকিং ও বাণিজ্যিক পরিভাষা।’ তিনি একটি ইসলামী ব্যাংকের প্রশিক্ষণ ও গবেষণা অ্যাকাডেমিতে ফেকাল্টি হিসেবে কর্মরত। গ্রন্থটি মূলত ইসলামী ব্যাংকিং পরিভাষাকোষ। তিনি এই বইয়ে ইসলামী ব্যাংকিং সংশ্লিষ্ট শরয়ী পরিভাষাগুলো সাবলীলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

গ্রন্থটিতে ঊনচল্লিশটি শিরোনামভিত্তিক অনুচ্ছেদে আরবি আদ্যক্ষর অনুযায়ী ভুক্তিগুলোকে বিন্যস্ত করা হয়েছে। আরবি পরিভাষার সঙ্গে ইংরেজি ও বাংলা পরিভাষা দেওয়া হয়েছে। শরয়ী ও ফিককি ভুক্তিগুলোর ক্ষেত্রে কোরআন ও সুন্নাহ থেকে সংশ্লিষ্ট দলিল উপস্থাপন করা হয়েছে। অন্য ভুক্তিগুলোর ক্ষেত্রে যথাযথ রেফারেন্স দেওয়া হয়েছে। ছয়শ’রও বেশি ভুক্তি রয়েছে এই গ্রন্থে।

এ বিষয়ে বাজারে আরও বই থাকলেও বেশকিছু বৈশিষ্ট্য এই বইটিকে অনন্য করে তুলেছে। যেমন-

১. তিনি আরবি পরিভাষাগুলোর বাংলা প্রতিবর্ণায়ন এর ক্ষেত্রে কঠোরভাবে আরবি উচ্চারণের অনুসরণ করেছেন। ফলে যারা আরবি পড়তে জানেন না তারাও বাংলা দেখে সঠিক শব্দটি শিখতে পারবেন।

২. গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষাসমূহের অধীনে তিনি এর বিধান এবং এ সংক্রান্ত ইমামগণের মতভেদ উল্লেখ করেছেন যা পাঠকের জ্ঞানের দিগন্তকে প্রসারিত করবে।

৩. প্রতিটি বিষয় নিয়ে আলোচনার সময় তিনি ফিকহের মূল উৎস গ্রন্থসমূহ থেকে যথেষ্ট রেফারেন্স এনেছেন যা গবেষক ও পাঠকবৃন্দকে পরিতৃপ্ত করবে।

৪. আধুনিক বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফিকহি বোর্ডের সিদ্ধান্তগুলো সমাধান হিসেবে পেশ করেছেন যা বইয়ের মানকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।

৫. পরিভাষাসমূহের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইসলামিক প্রতিষ্ঠানের পরিচিতিও উল্লেখ করেছেন।

৭. গ্রন্থের শুরুতে ফিকহের ফান্ডামেন্টাল বিষয়গুলোর পরিচিতি তুলে ধরেছেন। সেই সঙ্গে আল মাকাসিদুশ শারীআহ, আল কাওয়াইদুল ফিকহিয়্যার ওপর সংক্ষেপে আলোচনা করেছেন। যা বইয়ের সৌন্দর্যকে আরও বৃদ্ধি করেছে।

৭. বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের পথিকৃত এম. আযীযুল হকের মুখবন্ধ বইটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

তবে মনে রাখতে হবে, কোরআন ছাড়া পৃথিবীতে কোনো বই নির্ভুল বা ত্রুটিমুক্ত নয়। তাই এই বইয়েও পাঠকের চোখে কিছু ত্রুটি ধরা পড়তে পারে। যেমন,

১. তিনি পরিভাষার বিন্যাসের ক্ষেত্রে আরবি শব্দের শুরুর আলিফ লাম (ال) কে বিবেচনায় এনেছেন। এটি শব্দকোষের প্রতিষ্ঠিত ধারার ব্যতিক্রম ফলে পাঠককে অনেক পরিচিত শব্দ এই বইয়ে একটু মনোযোগ দিয়ে খুঁজে নিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, ফতোয়া শব্দটি এই বইয়ের ‘ফ’ অক্ষরের অধীনে খুঁজে পাওয়া যাবে না বরং আল ফতোয়া হিসেবে ‘আ’-এর অধীনে পাওয়া যাবে। যদ্দরুন পাঠককে কিছুটা বাড়তি সময় ব্যয় করতে হবে।

২. কয়েকটি স্থানে তিনি অধিকাংশের মত পরিহার করে গৗণ মত গ্রহণ করেছেন। অবশ্য এ ধরনের স্থান হাতেগোনা। অধিকাংশ স্থানে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ মতকেই গ্রহণ করেছেন।

৩. পরিভাষাসমূহের শাব্দিক পরিচিতি উল্লেখ করার ক্ষেত্রে মূল আরবি উৎস গ্রন্থসমূহ থেকে রেফারেন্স উল্লেখ করলে রচনাটি আরও সমৃদ্ধ হতো।

আশা করি, লেখক পরবর্তী সংস্করণে বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্বারোপ করবেন।

এই ক্ষুদ্র বিষয়গুলো বাদ দিলে এই গ্রন্থটিকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একটি অতুলনীয় গবেষণাকর্ম বলা যায়। গ্রন্থকার এজন্য অবশ্যই মোকারকবাদ পাওয়ার যোগ্য। ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ে জানতে আগ্রহী সকল পাঠকের জন্য এই বইটি খুবই উপকারী গ্রন্থ। আশা করি, বইটি বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এবং পরবর্তী গবেষকদের জন্য আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে। এমন একটি গুরুত্বর্পূণ গ্রন্থ প্রকাশ বাংলাদেশ ইসলামিক ল’ রিসার্চ অ্যান্ড লিগ্যাল এইড সেন্টার এর নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় বহণ করে। আমরা এই বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।

বই: ইসলামী ব্যাংকিং ও বাণিজ্যিক পরিভাষা
লেখক: মুহাম্মদ রহমতুল্লাহ খন্দকার
পৃষ্ঠা: ৩২০, মূল্য: ৪০০ টাকা
প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২০
প্রকাশক: বাংলাদেশ ইসলামিক ল’ রিসার্চ অ্যান্ড লিগ্যাল এইড সেন্টার

মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস হুসাইন: ট্রেইনার ও কোর্স কো-অর্ডিনেটর, আইএফএ কনসালটেন্সি লিমিটেড।