শান্তি প্রতিষ্ঠার সওগাত



মাওলানা আরিফুর রহমান, অতিথি লেখক
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

কোরআনে কারিমে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় ইসলাম আল্লাহতায়ালার নিকট মনোনীত ধর্ম।’ ইসলাম জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবার জন্য নিয়ে এসেছে মুক্তির পয়গাম। ইসলামে মানব জাতিকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছ্। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি এবং স্থলে ও সমুদ্রে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি, তাদেরকে উত্তম রিজিক দান করেছি এবং তাদের অনেকের উপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।’

অন্যত্র আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী হতে, পরে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হতে পার।’

ইসলাম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং অমুসলিমদের অধিকার রক্ষায় যে উদাহরণ ও বিধি-বিধান প্রদান করেছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে বেনজির। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যদি আল্লাহতায়ালা মানবজাতির একদলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন তাহলে বিধ্বস্ত হয়ে যেত মঠ, গির্জা, ইহুদিদের উপাসনালয় এবং মসজিদসমূহ যাতে অধিক স্মরণ করা হয় আল্লাহর নাম।’

কোরআনে কারিমের অন্য আয়াতে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তারা আল্লাহকে ছেড়ে যাদেরকে ডাকে তোমরা তাদেরকে গালি দিও না, অন্যথায় তারা সীমালঙ্ঘন করে অজ্ঞানতাবশত আল্লাহকে গালি দেবে।’

ইসলাম গ্রহণের বিষয়ে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘দ্বীন সম্পর্কে জোর-জবরদস্তি নেই।’ তাইতো নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়য়েমেনে নিযুক্ত শাসনকর্তা হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) কে চিঠি লিখে পাঠিয়েছিলেন ইহুদি বা খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী কাউকে তার ধর্ম ত্যাগ করতে বাধ্য করা যাবে না।

ইসলাম মানবজীবনকে একান্তই সম্মানজনক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং মানুষের জীবন সংহারকে সমগ্র মানবগোষ্ঠীর হত্যার সমতুল্য অপরাধ সাব্যস্ত করে জীবনের নিরাপত্তার গুরুত্ব প্রদান করেছে। মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘নরহত্যা অথবা পৃথিবীতে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কাউকে কেউ হত্যা করলে সে যেন পৃথিবীর সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল। আর কেউ কারও প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে প্রাণে রক্ষা করল।’

শান্তি ও সমৃদ্ধি নাগরিক জীবনের পরম প্রত্যাশিত বস্তু। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কাঠামো আবর্তিত হয় এই কাঙ্ক্ষিত বস্তুকে ঘিরেই। কিন্তু প্রতিদিনের সংবাদমাধ্যমে দেখা যায়, সমাজের সর্বত্রই অশান্তি আর উৎকণ্ঠার হতাশাজনক চিত্র। খুন-ধর্ষণ, মারামারি-হানাহানি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অসহায়দের ওপর অত্যাচার আর জুলুম-নির্যাতন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কিন্তু এর শেষ কোথায়? এর প্রতিকারই বা কী? সামাজিক এই অস্থিরতা থেকে বেরিয়ে আসতে প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ।

সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে স্থিতিশীলতা আনতে প্রথম পদক্ষেপ হলো- ব্যক্তিগত অথবা সম্মিলিত উদ্যোগে ঐক্য, শান্তি ও সমাজসেবামূলক কাজে এগিয়ে আসা। কারণ, ঐক্য ও সেবামূলক কাজ ছাড়া সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

আরেকটি কথা, তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে মানুষ অসংখ্য মিথ্যা সংবাদ দ্বারা বিভ্রান্ত হয়। এর দ্বারা সমাজে অশান্তি নেমে আসে। তাই মহান আল্লাহ তার প্রিয় নবীর মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে সংবাদ প্রচারের আগে তা যাচাই বাছাই করার তাগিদ দিয়েছেন। কোরআনে মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের কাছে যদি কোনো ফাসেক ব্যক্তি কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করো। অজ্ঞতাবশত কোনো গোষ্ঠীকে আক্রান্ত করার আগেই, অন্যথায় তোমরা কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।’ -সুরা হুজুরাত : ৬

বস্তুত পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ, ভালোবাসা ও একে অপরের ভালো কাজে সহযোগিতা করার মাধ্যমে সামাজিক শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় থাকে। ভ্রাতৃত্বসুলভ আচরণ মানুষকে প্রশান্তি দেয়। এটি থাকলে মানুষ একে অপরের কল্যাণকামী হয়ে ওঠে। এর সুফল পরকালেও মানুষ ভোগ করতে থাকবে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন, আমার জন্য যারা একে অন্যকে ভালোবেসেছিলে তারা কোথায়? আমি আজ তাদের আমার ছায়ায় আশ্রয় দেব। আজকের এই দিনে আমার ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া নেই।’ –সহিহ মুসলিম : ২৫৬৬

সুতরাং কোনো সংকীর্ণতা নয়, হিংসা-বিদ্বেষ নয়, উদারতা ও মহানুভবতা হচ্ছে- ইসলামের বৈশিষ্ট্য। এ কবথা সর্বাগ্রে মনে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, ইসলাম গোটা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার সওগাত নিয়ে এসেছে। আল্লাহ আমাদের ইসলামি অনুশাসন মানার ও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুপম আদর্শে আদর্শবান হওয়ার তওফিক দান করুন। আমিন।