আজান: শান্তি, মুক্তি ও কল্যাণের আহ্বান

মুফতি মানজুর হোসাইন, অতিথি লেখক, ইসলাম
মুসলমান মাত্রই আজান শুনে আবেগাপ্লুত হন, ছবি: সংগৃহীত

মুসলমান মাত্রই আজান শুনে আবেগাপ্লুত হন, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

মুসলমান মাত্রই আজান শুনে আবেগাপ্লুত হন। সাড়া দেন মনেপ্রাণে। আজান আল্লাহতায়ালার একত্ববাদ ও তাওহিদের মহান আওয়াজ। মুয়াজ্জিন দৈনিক পাঁচবার আজানের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার আহবান জানায়। উচ্চ আওয়াজে প্রচারিত আল্লাহর একত্ববাদের এই ঘোষণার মাধ্যমে মূলত বান্দা আল্লাহতায়ালার বশ্যতার ঘোষণা দেয়। অবনত চিত্তে স্বীকার করে আল্লাহর বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব। মনের গভীর থেকে নবী করিম (সা.)-এর নবুওয়ত ও রিসালাতের স্বাক্ষ্য দেয় পরম বিশ্বাসের সঙ্গে।

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নবুওয়তি মিশনের প্রথম কর্মসূচি হলো- আল্লাহর বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে বস্ত্র মুড়ি দিয়ে শয়নকারী! ওঠো এবং সাবধান করো। তোমার রবের বড়ত্ব-শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো।’ -সূরা মুদ্দাসসির: ১-৩

আজানের প্রথম বাক্য ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ।’ এর মানে হলো- আল্লাহতায়ালা একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। সৃষ্টিলোকের রাজত্ব ও সার্বভৌমত্ব একমাত্র তার। এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তিনি বড়ই মহান ও শ্রেষ্ঠ যার হাতে রয়েছে সৃষ্টিলোকের রাজত্ব।’ -সূরা মুলক: ১

আজানে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে সব ধরনের শিরক, বিদয়াত এবং তাগুতি শক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহতায়ালাকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের মালিক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। চার চার বার উচ্চ আওয়াজে আল্লাহু আকবার বলে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হয়, মানুষের মুক্তি, কল্যাণ, ইহলোক ও পরকালের সফলতার জন্য একমাত্র আল্লাহতায়ালার কাছে চাইতে হবে।

আজানের দ্বিতীয় ঘোষণা হলো- ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।’ এর মানে হলো, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি; আল্লাহ ছাড়া কোনো প্রকৃত উপাস্য নেই। তার কোনো অংশীদার নেই। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে নবী! আপনি বলে দিন, আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। -সূরা ইখলাস: ১

‘লোকমান (আ.) তার সন্তানকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিল, ‘হে আমার পুত্র! আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না। নিশ্চয়ই শিরক একটি বড় অন্যায়।’ -সূরা লোকমান: ১৩

এরপর ঘোষণা হয়, ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ’ অর্থাৎ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নবী মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। আল্লাহতায়ালার অনুগত বান্দা হিসেবে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে জীবন পরিচালনায় অনুকরণীয়-অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে মেনে নেওয়ার ঘোষণা এটি। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমাদের জন্য রাসূল (সা.)-এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ -সূরা আহজাব: ২১

এরপর মুয়াজ্জিন ঘোষণা করে, হাইয়া আলাস সালাহ। অর্থাৎ নামাজের জন্য এসো। তোমার বিবর্ণ জীবনকে বর্ণিল করবে নামাজ। নামাজের মাধ্যমে প্রভুর কাছে হৃদয়ের সুখ-দুঃখ বলবে আর প্রভু তোমকে প্রশান্তিময় জীবন দান করবে। আল্লাহতায়ালার দরবারে সেজদা করে এক আল্লাহর আনুগত্যের প্রমাণ দিতে সবাইকে পর পর দু’বার আহ্বান জানানো হয় আজানে। মুয়াজ্জিন বলে, হাইয়া আলাল ফালাহ, এসো কল্যাণের জন্য, সফলতার জন্য, শান্তির জন্য। অশান্ত পৃথিবীতে শান্তির খোঁজে হয়রান তুমি। হে মানুষ! এসো! নামাজের দিকে এসো। জীবন-মরণের কল্যাণ এই নামাজে নিহিত। মুক্তি ও কল্যাণের পিপাসায় যারা তৃষ্ণার্ত তাদেরকে এ আহ্বানে সাড়া দিতেই হবে। নামাজের জায়নামাজে দাঁড়াতেই হবে। এছাড়া ভিন্ন পথে শান্তি সমৃদ্ধি, সুখ ও প্রেম মিলবে না।

আজানের শেষ বাক্যে আবার ‘আল্লাহু আকবার’ দু’বার উচ্চারণ করে মানুষকে সাবধান করার পাশাপাশি মনে করিয়ে দেওয়া হয়- আল্লাহ এক, তিনি একক, তার কোনো শরিক নিই। এ বিরাট ঘোষণা যেন মানুষের হৃদয়মূলে গেঁথে যায় তাই সব শেষে বলা হয়, ‘লা ইলাহা ইল্লাহ, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো প্রভু নেই।’ ইবাদতের একমাত্র মালিক তিনি। সৃষ্টি তার, আইনও চলবে তার।

আজান মূলতঃ নির্ভেজাল তাওহিদ ও রিসালাতের ঘোষণা। আজানের ভেতর আল্লাহতায়ালার পরিচয় নিহিত। যুগ যুগ ধরে ইসলামের নির্যাস ও মূলবার্তা আজানের মাধ্যমেই ঘোষিত হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :