করোনার কবলে কওমি মাদরাসার শিক্ষক-পরিচালক, অতঃপর...

জিয়াউল আশরাফ, অতিথি লেখক
২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল কওমি মাদরাসা শিক্ষা সনদের সরকারি স্বীকৃতি ঘোষণা করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ছবি: সংগৃহীত

২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল কওমি মাদরাসা শিক্ষা সনদের সরকারি স্বীকৃতি ঘোষণা করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

কীভাবে শুরু করবো জানি না। অনেক কথা, অনেক ব্যথা। মনে যখন হাজারও কথা থাকে, তখন সব এলোমেলো হয়ে যায়। তবুও কিছু কথা বলতে চাই, লিখতে চাই। মনের অব্যক্ত কথাগুলো চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়া, মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়া একজন সচেতন মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। সেই সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ থেকে এই লেখা।

আজকের লেখায় কেউ কেউ হয়তো কষ্ট পেতে পারেন, তাই আগেই ক্ষমার নিবেদন রইল। আমিও এই সমাজের মানুষ, আপাদমস্তক কওমি অঙ্গনের সন্তান। কওমির আদর্শ, চিন্তা-চেতনাকে ধারণ করেই বড় হয়েছি। আমি জোর গলায় বলতে দ্বিধা করি না, কওমি মাদরাসা যে আদর্শ শেখায় তা নববী আদর্শ, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আদর্শ। নীতি-নৈতিকতার শেষ আশ্রয়স্থল কওমি মাদরাসা ও কওমি মাদরাসার শিক্ষা ব্যবস্থা।

শূন্য দশক থেকে কওমি মাদরাসার অভাবনীয় অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। পাড়ায়-মহল্লায় অনেক মাদরাসা গড়ে উঠেছে। এর কিছু কমিটি শাসিত, যা পাড়া-মহল্লা বা সমাজের বিত্তশালীদের দ্বারা পরিচালিত। এ জাতীয় মাদরাসা সাধারণত ওয়াকফকৃত জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়। আর অধিকাংশ ব্যক্তি পরিচালিত। যেগুলোকে আমরা প্রাইভেট মাদরাসা বলতে পারি। এগুলো ভাড়া বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত।

একটা সময় পর্যন্ত ধারণা করা হতো, কওমি মাদরাসা মানেই সমাজের পিছিয়ে পড়াদের শিক্ষা ব্যবস্থা। এ ধারণা ভুল। উল্টো কওমি শিক্ষা ব্যবস্থার নানাবিধ সাফল্যের প্রেক্ষিতে সমাজের শিক্ষিত বা এলিট শ্রেণিরাও তাদের সন্তানদের কওমি মাদরাসায় পড়াচ্ছেন। মানুষ মাত্রই তার সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে চায়।

তাই হাল সময়ে মাদরাসা বেড়েছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। এখানে স্কুল-কলেজের মতো বাণিজ্য না হলেও অনেকের কর্মসংস্থান হচ্ছে, পাশাপাশি দিন কেটে যাচ্ছে; ব্যবসাও ভালো হচ্ছে। এখানে ব্যবসা শব্দটি সচেতনভাবেই প্রয়োগ করা হয়েছে। কারণ, ব্যবসা হালাল এবং পবিত্র। এই পবিত্র শব্দটি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নানান কায়দায় ব্যবহার করার ভেতর কোনো কৃতিত্ব আছে বলে মনে করি না।

এবার আসি মূল প্রসঙ্গে। করোনাভাইরাসের ভয়াল থাবায় আজ পৃথিবী কাতর। কোটি কোটি মানুষ ঘরবন্দী। জীবন বাঁচাতে ত্রাহিত্রাহি অবস্থা। বিশ্ব অর্থনৈতিক অবস্থাও করুণ। স্বাভাবিকভাবেই স্কুল-কলেজ-মাদরাসা বন্ধ। ছাত্রদের মাসিক বেতন দিয়ে যেসব মাদরাসা চলে তারাও আছেন বেকায়দায়। সরকারি নির্দেশে তড়িঘড়ি করে মাদরাসা বন্ধ। কোনো কোনো মাদরাসা শিক্ষদের বেতন দেননি বা দিতে পারেননি। শিক্ষকদের মধ্যে কেউ কেউ মুহতামিম বা পরিচালকের ওপর ভরসা করে দ্রুত চলে গেছেন বাড়িতে।

এখন ফোন করছেন মুহতামিম সাহেবকে, এ মাসের বেতনটা দিতে। কিন্তু মুহতামিম সাহেবের সাফ কথা- মাদরাসা বন্ধ, বেতনও বন্ধ। বাড়ি ভাড়া দিতে পারছি না আবার আপনারা বেতন চান?

আমি আশ্চর্য হই তখনই, আপনি মাদরাসার পরিচালক; আপনি বাড়ি ভাড়া দিচ্ছেন, নিজেও ভালো চলছেন, দু’মাসের বাজার ঘরে জমা করেছেন। কিন্তু আপনার শিক্ষকের বেতন দিচ্ছেন না! এটা কেমন মানসিকতা? এটা কোন পর্যায়ের নৈতিকতা? এই প্রশ্ন যাদের মনে আসবে তারা কী আদৌ সুস্থ! আর যাদের মনে আসবে না তারা অসুস্থ!

আমি ১৯৯৯ সাল থেকে ঢাকায়। ২০০৮ থেকে কর্মজীবনে। এই ১২ বছরে অনেক প্রাইভেট মাদরাসার পরিচালককে গাড়ি-বাড়ি করতে দেখেছি। বিশাল কারবার, রমরমা অবস্থা। আগে-পিছে ভক্ত-সেবক পরিবেষ্টিত অবস্থায় চলতে দেখেছি- দেখছি। এত বছর আপনি ব্যবসা করেছেন, দু’হাতে টাকা কামিয়েছেন, গাড়ি কিনেছেন, জমি কিনেছেন, বাড়িও করেছেন! আপনার শিক্ষকরা কিন্তু এর ভাগ চায়নি, লভ্যাংশ খুঁজেনি। মাদরাসা অনেক ভালো চলছে, তবুও বেতন বাড়েনি। ছাত্র সংখ্যা বেড়েছে- এ জন্য অতিরিক্ত বোনাস দেননি। আপনার দস্তরখাকে কয়েক পদের খাবার শোভা পেয়েছে, তাতেও কেউ কোনোদিন আপত্তি জানায়নি।
তাহলে আজ কেন আপনার এ আচরণ?
মাদরাসা বন্ধ, বেতনও বন্ধ- এ কেমন সিদ্ধান্ত?

আপনি কি একবার চিন্তা করেছেন শিক্ষকের সংসার চলে এই সামান্য বেতন দিয়ে। আপনি বেতন দিতে একদিন দেরি করলে যার চুলা বন্ধ থাকে, তার বেতন বন্ধ হলে ঘরের অবস্থা কী হবে? বহন করতে পারবেন- এমন একজন শিক্ষকের ঘরের স্ত্রী, ছোট ছোট সন্তানদের কষ্টে দেওয়া অভিশাপের বোঝা? অবশ্যই পারবেন না।

তাছাড়া শিক্ষকদের বেতন তো আপনার ওপর আমানত ও ঋণ। আমানতের খেয়ানতকারি হিসেবে কেন দায়ভার মাথায় নিতে চাচ্ছেন? তাই সব হালতে সব অবস্থায় মানুষের ওপর দয়ালু হোন।

এমন বিপদ একবার নয় বার বার আসতে পারে। তাই আমাদের ভাবতে হবে, জাগতে হবে। এখনই সময় কিছু করার। কওমির দুই লক্ষাধিক শিক্ষকের জন্য আমাদের এমন কিছু করা দরকার- যেন জরুরি অবস্থায় মাদরাসাগুলো চলতে পারে। এ ব্যাপারে বোর্ডকে দায়িত্ব নিতে হবে। নিদেনপক্ষে নির্দেশনা দিয়ে হলেও কাজ করতে হবে। কওমি মাদরাসাকেন্দ্রিক ৬টি বোর্ড আছে। এই কাজগুলো তাদের দায়িত্বের মধ্যে। সুতরাং বোর্ডের কর্তাস্থানীয়দের নিকট বিনীত অনুরোধ, আপনারা কিছু একটা করুন। মাদরাসাগুলোতে শৃঙ্খলায় আনুন, আমরা পাশে থাকবো। যা বলবেন মাথা পেতে নেবো। তবুও পরিবর্তন চাই, এগিয়ে যেতে চাই, এগিয়ে নিতে চাই। চাই আত্মমর্যাদাশীল ও আত্মপ্রত্যয়ী একটি শিক্ষা কাঠামো।

জিয়াউল আশরাফ: নিবার্হী সম্পাদক, মাসিক নকীব

আরও পড়ুন:
কওমি মাদরাসার শিক্ষকদের জন্য আপৎকালীন তহবিল গঠন আবশ্যক

দুই লক্ষাধিক কওমি শিক্ষকের কথা ভাববার কেউ নেই!

কওমি শিক্ষকদের আর্থসামাজিক নিরাপত্তা বিষয়ে কিছু প্রস্তাবনা

কওমি মেরুদণ্ড যেভাবে সোজা রাখতে পারি